কবির প্রেম

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

আমার একটা প্রেমের গল্প লেখার কথা।লিখবো বলে অন্তত পাঁচ দফা টেবিলে বসেছি।কিন্তু কোন ভাবেই লেখা এগুচ্ছে না। নাহ, ভুল বললাম, লেখা এগোনোর জন্য তো লেখা শুরু হওয়ার একটা ব্যাপার আছে।লেখাটা আসলে শুরুই হয়নি।মানে লিখিনি কিছুই, না একটা শব্দ কি একটা বাক্যও!একটা প্রেমের গল্প লেখা এত কঠিন, আমি যদিএই প্রেমের গল্প লেখার নিয়ত নিয়ে টেবিলে না বসতাম, টেরই পেতুম না।

আমার জীবনে প্রেম বিষয়ক অভিজ্ঞতা যা আছে, তাকে ঠিক প্রেমের অভিজ্ঞতা না বলে জটিলতার অভিজ্ঞতা বলাই বেশি যুক্তিযুক্ত। প্রেম সেখানে প্রেমে শুরু হইলেও, শেষ পর্যন্ত জটিলতার ধাক্কায়, বাস্তবতার নাকানি-চুবানি খেয়ে জানালা নয়। রীতিমত সদর দরজা পার করে ফুৎ করে উড়ে পালিয়েছে। প্রেম আমাকে ঠিক মানায় না বোধহয়। কিংবা আমিই প্রেমকে মানিয়ে নিতে পারিনে।

জীবনে প্রেম নামের বিলাসিতা, (হ্যা আমি বিলাসিতাই বলি একে, আগে অবশ্য বলতাম না, আগে বলতাম ভালোবাসা) আমার খুব বেশিদিন পোষায় না। আমি হাঁপিয়ে উঠি। হাঁপিয়ে উঠি বলেই, প্রেমকে গা ঝাড়া দিয়ে হাঁসের মত উঠে পড়ি প্রেম সরোবর থেকে। ওহ, এটা আমার কথা নয় অবশ্য, আমার এক সাবেক প্রেমিকের কথা। তিনি আমাকে হাঁস বলেছিলেন। রাজহাঁস বলতে পারতেন, তাতে আমার অহংকারী, দাম্ভিক, গর্বিত সত্ত্বার একটা বেশ রূপ ফুটে উঠতে পারতো, নিজেকে রানি রানি ভাবতে পারতাম। কিন্তু তিনি যা বলেছিলেন, সে এক নিতান্ত ডোবার জলে পাখা ঝাপটানো পাতিহাঁস। পাতিহাঁস শুনে আমি বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম। তাও অবশ্য মাত্র কয়েক ঘণ্টায়কেটেগেছে। মন খারাপ ব্যাপারটাতেও ওই হাঁস তত্ত্বই কাজ করে হয়তো। মানে জাস্ট একখানা ঝাড়া মারলেই মন খারাপের বাউলা বাতাস, ধুলিকনা, খড়কুটো সব ঝরে মরে সাফ হয়ে যায়। পরীক্ষিত।

আচ্ছা, কোন প্রেমের কথাটা লিখবো বুঝে উঠতে পারছি না। এরকম নয় যে নিজের জীবনের কথাই লিখতে হবে। আমি তো আর আত্মজীবনী লিখতে বসিনি। এটা স্রেফ গল্প। আমি বানিয়ে টানিয়েও লিখে দিতে পারি। স্রেফ কল্পনা থেকে। কিন্তু মাথায় এসব কিছুই কাজ করছে না। ঠিক করেছি, সরাসরি জীবনের কথা সব লিখে দেব। প্রায়ই ইচ্ছে করে, আত্মজীবনীই লিখে ফেলি। সত্য, নির্ভেজাল, স্পষ্ট আত্মবর্ণণা। সব থাকবে, বাদ পড়বে না কিচ্ছু।

কাজটা কঠিন। ভাবতে হবে অনেক। জীবন তো আর দুধে ধোয়া তুলসিপাতা নয়। জীবন অনেকটা জুড়ে কাদায় মাখামাখি, এঁটোকাটায় ভরা। যাগগে, আত্মজীবনী নিয়ে পরে ভাববোখন। এখন ভাবি প্রেম নিয়ে।

জীবনের প্রথম প্রেমটা নিয়েই ভাবতে পারি। প্রেম হল এক কবির সাথে। যে সে কবি নয়, রীতিমত সর্বস্বত্যাগী কবি। কবিতার জন্য সমাজ সংসার ত্যাগ করতে প্রস্তুত। তো সেই কবি, যার কিনা দীর্ঘ চল্লিশ বছরের একাকীত্বের ইতিহাস, তিনি আমার প্রেমে পড়লেন। যে সে প্রেম নয়। একেবারে বয়োসন্ধিকালের মত সব ভুলানো প্রেম। সকাল বিকেল বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বারান্দায় আমার মেলে দেয়া ভেজা সালোয়ার কামিজ কি শাড়ির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকা টাইপ প্রেম। হয়তো মারিজুয়ানা, কি চরস কি সস্তা দেশি গাজার প্রভাব থাকতে পারে, কিন্তু প্রেমও ছিল বৈকি।

তিনি রোজ আমাকে চুমু খেতে চাইতেন। চুমু হলো সেই বস্তু যা ভালোবাসাকে পোক্ত করে। আবার চুমুই তাই, যা আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, প্রেমটা আপনি আসলে কতটুকু চাইছেন,মানে প্রেমের গভীরতা আর কি! চুমু হল প্রেমের গভীরতা পরিমাপক। চুমু খেতে খেতেই আপনি নিজেকে মেপে নিতে পারবেন। (এগুলি অবশ্য সেইসময় বুঝি নাই। বয়স বাড়লে এবং আরো কয়েকটা প্রেমের বিপর্যয় ঠেকায়ে ঠেকে শিখছি)

তো সেই কবির ঘরে চুমু খেতে খেতে আমি আবিস্কার করেছিলাম, কবিকে আমি চাইনে। চুমুটাও ঠিক জমছেনা। চুমুটা ঠিক চুমু হয়েও উঠছেনা। হয়তো আমার সার্বিক অংশগ্রহণ নেই বলেই। কেন অংশগ্রহণ নাই, সেটা ঠিক বুঝলাম না, তবে এ ঠিক বুঝে নিলাম, কবির কবিতা ভালো লাগছে, তার পাগলামি ভালো লাগছে, তার একাকীত্ব ভালো লাগছে, তার বেহিসাবী দেউলিয়াপনা ভালো লাগছে, তার প্রেম, তার বিহ্বলতা পছন্দ হচ্ছে, কিন্তু চুমুটা কিছুতেই জমছে না।

আমি তাকে বললুম সেই কথা। চুমুটা ঠিক চুমু হচ্ছে না যেন!

কবি অবাক। এমন কথা জিন্দেগিতে শোনে নাই। সে প্রবল আবেগে আমাকে জড়িয়ে ধরে আরো তীব্র চুমুতে আমাকে আচ্ছন্ন করে দেবার বাসনা নিয়ে প্রায় ঝাপিয়ে পড়লো। আর চুমু তো কেবল সূচনামাত্র। চুমু মানে ক্রমশ শরীরে দিকে যাওয়া। ঠোঁট থেকে গ্রীবায়, বুকে, স্তনে, স্তনবৃন্তে, নাভির কারুকাজে। বাহ, আমিও কবিতার ভাষায় কথা বলতে শুরু করেছি দেখছি। এতসব বলে কী লাভ। সরাসরি বলা যেতে পারে ঠোঁট থেকে বুকে, স্তনে, পেটে, যোনীতে এবং শেষ পর্যন্ত ওই যোনীতেই। ভালোবাসা তবে ঠোঁট থেকে যোনীর দিকে যাত্রা!

তো, প্রথমবার মিলনের পর নতুন করে বুঝলাম, ভালোবাসার ভিতরে ঘাম, ক্লেদ, অস্বস্তি আর বিরক্তিও বিদ্যমান। তবে এইসব ক্লেদ, ঘামকে তুচ্ছ করে যখন অন্ধ আবেগ আমাদের আরো ঘামে আরো ক্লেদে মাখামাখি করতে চালিত করে, সেই অন্ধ আবেগটাই আসলে মূখ্য। মানে, অন্তত শারীরিক মিলনে এই অন্ধত্বটুকু খুব জরুরি।

তো সেই গোপন, অস্থির শরীর কাটাছেঁড়ার মুহূর্তে আমি আবিস্কার করলাম, এই বেলা আবেগের অন্ধত্ব আমার নেই, অন্তত কবির প্রতি। মানে সেই অবস্থাতেও আমি খুতখুত করছি, বিরক্ত হচ্ছি, অসুবিধা বোধ করছি এবং আরামদায়ক কোন আনন্দ আমাকে স্পর্শ করছে না।

সেদিন বিষয়টা শেষ হল, এবং বিরক্তি সত্ত্বেও সপ্তাহে একবার করে চলতে লাগলো। যেহেতু একে ভালোবাসা বলে, প্রেম বলে ডাকা হয়, আমিও এই ব্যবস্থার ভিতরে নিজেকে চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম। কিন্তু এক একটা পর্ব এক একটা বিরক্তির বিবমিষায় আমাকে ঠেলছিল কোন এক অন্ধকার খাদের কিনারে। ব্যাপারটা একা বয়ে নিয়ে যাওয়াও একটা বেদনাদায়ক ব্যাপার ছিল বটে।

অবশেষে আমি কবিকে খুলে বললাম। বললাম, ভালো লাগছে না। কোথায় যেন কী একটা ব্যাপার আছে, ধরা যায় না, ছোঁয়া যায় না, কিন্তু আছে। হয়তো ধরতে পারছি না। হয়তো ঠিক খাপ খাচ্ছে না। হয়তো ঠিক জমে উঠছে না।

আমার সরল স্বীকারোক্তি, কিংবা বলা যেতে পারে সরল আপত্তিতে কবি, যার আঠারোটি বই প্রকাশ হয়েছে এবং প্রতিটিই ব্যপক জনপ্রিয় ও পাঠক সমাদৃত, যাকে ছাড়া বইমেলা জমে না, যার পাগলামি ভরা কথা না শুনলে নতুন কবিদের আত্মায় উৎসাহের বাণ ডাকে না, তিনি আমার সব কথা মন দিয়ে শুনে প্রায় আধা ঘণ্টা কি চল্লিশ মিনিট গুম হয়ে বসে রইলেন ঘরের মোড়ায় দুইপা তুলে।আমি তার বিচ্ছিরি বসার ভঙ্গি লক্ষ্য করলাম।করে অবাক ও হলাম। তার বসার ভঙ্গি পরিচিত, কিন্তু এতটা বিচ্ছিরি আগে কখনো লাগে নাই।

কবি তিনটি সিগারেট খেলেন। তারপর হঠাৎ প্রায় লাফিয়ে উঠে আমাকে টানতে টানতে নিয়ে গেলেন বিছানায়।

সেইদিন, গ্রীষ্মের তুমুল দাবদাহের সেই দিনে, কাক পালানো দুপুরে, ভাত ঘুমের সময়ে কবি তার সস্তা ডিভানে ততধিক সস্তা বিছানার চাদরে, বালিশের ওয়ারে মাখামাখি করে, আচরে পিছরে, ধাক্কিয়ে, উল্টিয়ে, নখ-দন্ত বাগিয়ে তুমুল আড়ম্বরে আমাতে অধিষ্ঠিত হইলেন। এবং বলাবাহুল্য আমার অভ্যন্তরে তার অবস্থানের এক মিনিট দশ সেকেন্ড কালটি তিনি প্রবল বেগে নিজের পৌরুষ প্রমাণের যত চেষ্টা করিতে লাগিলেন, তাহা পুরোটাই একটি আপাদমস্তক কৌতুকে পর্যবসিত হইলো। এর আগের ঘটনার ব্যাপারে আমার আপত্তি, আমার মূল্যায়ন, আমার পর্যবেক্ষণ সম্পর্কে যেহেতু তিনি আগে জানতেন না, (মানে ভাবেনই নাই আর কি যে আমি এইসব পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করতে সক্ষম) তাই এই বেলা আমাকে নিজের পৌরুষ ভালোমত বুঝাইতে তিনি যা কসরত করিলেন, তা পুরোটাই এক বেমক্কা হাস্যরসের ব্যাপারহয়ে উঠলো। যদি আমি দর্শকসারিতে থাকতাম, তবে অবশ্যই হাসিতাম, কিংবা আমার নিজের দুরবস্থা ও দুর্ভাগ্য দেখে দুঃখ পাইতাম। যেহেতু এখানে আমি তাহার নিচে নিজেকে আবিস্কার করেছি, সঁপে দিতে বাধ্য হয়েছি, তাই পুরো ব্যাপারটাই একটা দুঃখজনক বিরক্তি আর বিবমিষায় আমাকে ছেয়ে ফেললো।

বাথরুম থেকে গা ধুয়ে এসে কবিকে বললাম, যাই।

কবি উপুড় হয়ে শুয়ে ছিল, বললো, পরে যাও, আরেকটু থাকো…

আমি বললাম, না, বিচ্ছিরি গরম এই ঘরে

কবি বললো, তুমি থাকলেই বসন্ত থাকে, তুমি চলে গেলে আবার গ্রীষ্ম নামবে…

আমি বললাম, আমি তবে কি পাবো? আমার তো সবসময় গ্রীষ্মক্লান্ত! তুমি তো বসন্ত নও…

কবি বললো, চা বানাও, মুড়ি দিয়ে খাই

আমি বললাম, তোমার বাসা, তুমি জানো চা চিনি কই থাকে, আমি গেস্ট। আমি বসি, তুমি বানাও।

আমার কথা শুনে কবি বিহ্বল চোখে আমাকে দেখতে লাগলো। আমি বেরিয়ে আসলাম।

এরপর যা ঘটলো তাকে বলে বিচ্ছিরি বিচ্ছেদ। কবি হাউমাউ করে তেড়ে এলো। তার শরীর চাই। আমাকে চাই। কারণ এটা তার ভালোবাসার অধিকার। আমি বললাম, পারছি না। ব্যাপারটা একদম উপভোগ্য না।

এইবেলা তার আর সহ্য হলো না।

তুমি এইগুলা কী বলো? “শরীর শরীর…তোমার মন নাই কুসুম?”

মানিকের ডায়ালগ দিব্যি নিজে ঝেড়ে দিল।

আমি বললাম, বেশ, মনই আছে। তুমি তবে মনটুকু নিয়াই সন্তষ্ট থাকো না কেনে?

কবি ফের অবাক। দেখলাম তার মুখের বাম দিকটা বেকে বেকে যাচ্ছে। এতদিন জানতাম স্ট্রোক হইলে এমন হয়। আজ জানলাম অবাক হইলেও কোন কোন প্রেমিকের এমন হইতে পারে।

কবি অবাক হইলো। আমাকে বললো, প্রেমে শরীর আসে।

বেশ তো, আমারেও ভালো লাগাও….

তোমার কেন ভালো লাগে না, সেই তো বুঝতেসি না…

কী আপদ! এ আমি ক্যামনে বোঝাই? তাও আবার বয়স বেয়াল্লিশ ছুঁয়েছে যার, গনিকালয়ে গিয়ে মাঝরাতে গনিকার ক্লান্ত শয্যায় শুয়ে কোবতে লেখার গল্প যে করে তুমুল আড্ডায়, লিখে দেয় যত্রতত্র, তার মুখে এ কী বোকার মত কথা?

আমি চুপ করে থাকি। কবি বলে, তুমি বড্ড বেশি বেশি করছো। এত তাড়াহুড়ো কিসের তোমার?

কেন নয়?

সময় দাও…সব ঠিক হয়ে যাবে?

কী ঠিক হবে?

মানে তোমারো ভালো লাগবে

কবে?

উফ! কবি বড্ড বিরক্ত!

হবে হবে…একটু ধৈর্য্য ধরো।

কেন ধরবো ধৈর্য্য!

শোন, বহুদিন পর হচ্ছে তো, এইজন্য আর কি! এখন তুমি আছো, নিয়মিত দেখা হলেই আমি আবার ফর্মে ফিরতে পারবো।

লজ্জার মাথা খেয়ে বলেই ফেলে কবি। তারপর চরস মেশানো সিগারেটে বড় একটা টান দেয়। তারপর শুয়ে পড়ে টান হয়ে, নিশ্চিন্তে। যা বলার বলে ফেলেছে। আর চিন্তা নেই- এমন ভাব একখানা।

দুপুরে কাক ফের কা কা ডাকে। সাইকেলের টুং টুং আর বড় রাস্তায় গাড়ির হর্ণ- সব একসাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে দোতলার জানালা দিয়ে ঢুকে পড়ে। কবির ধুলোমলিন আউলা ঝাউলা ঘর ছেড়ে বেরিয়ে আসি আমি। পিছন থেকে সে একবার ক্ষীণ স্বরে ডাকে। আমি সদর দরোজা খুলে বেরিয়ে আসি, সিঁড়ি বেয়ে নেমে যাই দ্রুত। সামনের গলিতে একটা অলস কুকুর চোখ বুজে শুয়ে আছে। ওকে পেরিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাই।

ভালোবাসার নামে একবার আমি মিলিত হয়েছি আমার প্রেমিকের সাথে। ভালোবাসার নামে দ্বিতীয়বার, এমনকি তৃতীয়বার আমি মিলিত হয়েছি আমার কবি প্রেমিকের সাথে। এরপর চতুর্থবার, এরপর পঞ্চমবার, ষষ্ঠ, সপ্তম, অষ্টম, নবম, দশম…এবং আরো আরো কত বার আমি ধর্ষিত হয়েছি এবং এরপর যতবার আমি ধর্ষিত হয়েছি, কবির ভাষায় সেই ছিল প্রেম। আর সেই প্রেম আমার শরীরে, আত্মায়, মগজে, এমনকি হৃদয়ে শতশত আস্ফালনের মত দাগ রেখে গেছে। ক্লান্ত, বহু ব্যবহারে জীর্ণ, অক্ষম, অজ্ঞান এবং অশিক্ষিত পৌরুষের রেখে যাওয়া সেইসব দাগ- বাড়ি ফিরে আমি খুলে মেলে দেখি। আয়নার সামনে নিজেকে এক টুকরো মাটি মনে হয়, যে মাটিতে যেভাবে ইচ্ছে প্রবেশের ব্যর্থ অভিপ্রায়কেই যে প্রেমিক প্রেম আর প্রেমের অধিকার মনে করেছে।টুং করে মোবাইলে ম্যাসেজ আসার সংকেত বাজে। খুলে দেখি, কবির ম্যাসেজ।একটিই শব্দ লেখা তাতে- ‘মাগী’।এরপর রাতে দিনে সকালে বিকেলে এ রকম রকমারি শব্দে আমার ম্যাসেজ ইনবক্স ভরে ভরে উপচে পড়তে থাকে- ঠিক যেন কবিতা!

প্রথম প্রেমের পরিসমাপ্তির কথা জেনে আমার বন্ধুরা আসে। সান্তনা দেয়। তারা ভাবে, কবির ভবঘুরে জীবন যাপন, নেশা আর অর্থবিত্তের অভাবেই এই বিচ্ছেদ ঘটেছে। আমি তাদের জানিয়ে দেই, না, শারীরিকভাবে আমাকে তিতিবিরক্ত করা এবং তৃপ্ত করতে না পারাই এই বিচ্ছেদের কারণ। শুনে আমার বন্ধুদের মুখ হা হয়ে যায়। ওরা চুপ করে থাকে। চা বানানোর সময় আমি কিচেনে গেলে পরস্পরের গা টেপাটেপি করে। এরপর আমার প্রতি সমস্ত সহানুভূতি ও সান্তনার বাণী উইথড্র করে তারা যে যার পথে ফিরে যায়।

বন্ধুরা চলে গেলে সেইরাতে বন্ধ করে দেই মোবাইল ফোন খানা। টুং টুং সুরতুলে ‘খানকি মাগী বেবুশ্যে’ নামের কবিতাদের আসার পথ রুদ্ধ হয়।এরপর মাথার কাছে দখিনের জানালাটা খুলে দেই।হুহু বাতাসে ঘর ভেসে যায়।গায়ের টিশার্ট আর স্কার্টটা খুলে রেখে শুয়ে পড়ি একাকী সাদা বিছানায়, নগ্ন।দারুণ হাওয়া এসে আমার শরীরজুড়ে খেলতে খেলতে চলে যায়, আসে, আবার যায়, আবার আসে।পর্দার ফাঁক দিয়ে আলো আসে ছিটেফোটা, ছায়ারাও আসে।এভাবে আলো আর বাতাসের বিছানায়, আমি কখনো মেলে ধরি নাই নিজেকে। এভাবে কখনো নগ্ন ঘুমোইনি একা। বহুদিন পর আচমকা ঘুমিয়ে পড়ি কখন-নির্বিবাদে। গত ছয়মাসে ঘুমের ভিতরে ছুটে আসা আগুনে বেলুন আমাকে বাতাসের আগে ছুড়ে দিয়ে মুহূর্তেই হারিয়ে গিয়েছে শূণ্যতায়, আর আমি সমস্ত রাত সেই শূন্যতার ভিতরে বাতাসের উপরে ভেসে উঠবার সেই অনুভবকে আরো তীব্র করে পেতে চেয়ে মরমে মরে মরে মৃতপ্রায় বেঁচেছি।

বহুকাল বাদে নিজের বিছানায় গভীর ঘুমে তলাই, ভোর অব্দি, সকাল অব্দি। স্বপ্নটা আর ফিরে আসে না। কবিও হারিয়ে যায় কোথায় কোন গভীর অতীতে। তাকে আর কোনদিন আমার মনে পড়ে নাই।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত