গৌর কিশোর ঘোষের ‘শিকার’ দেশভাগের আখ্যান

Reading Time: 3 minutes    একটি অমূর্ত বোধ বা ভাবনাকে লেখক যখন শব্দের পর শব্দ  সাজিয়ে মূর্ত করে তোলেন, তখন একটি গল্প জন্ম নেয়। সেই গল্প পাঠ করে পাঠক সন্ধান পায় এক জগতের। যে জগৎ লেখক অবচেতন বা সচেতনভাবে নির্মাণ করে যায়। লেখকের বর্ণিত প্রতিটি শব্দের সাঁকো বেয়ে পাঠক হয়ে ওঠে লেখকের পরম সুহৃদ। লেখকের আকারহীন বোধ যখন শব্দের নকশায় লেখকের সামনে হাজির হয়, তখন তা প্রকারান্তরে হয়ে যায় লেখকের অভিজ্ঞতা। কখনো সে অভিজ্ঞতা একটি সময়ের। কখনোবা একটি কালের। আর সেই সময় বা কাল যুগে যুগে উত্তীর্ণ হয় পাঠকের নিবিড় চিন্তনে। এভাবেই কিছু কিছু গল্প হয়ে ওঠে কালোত্তীর্ণ।   গৌরকিশোর ঘোষের ‘শিকার’ গল্পটি তেমনই একটি গল্প। গল্পটির মূল উপজীব্য দেশভাগ। দেশভাগ নিয়ে অজস্র গল্প আছে। কিছু গল্প ইতহাস বর্ণন করে তো কিছু গল্প আবেগ। কিন্তু দেশভাগ নিয়ে রূঢ় বাস্তবতার গল্প খুব একটা বেশী চোখে পড়ে না। আটপৌরে ভঙিতে লেখক বলে গেছেন সেই সময় বা সেই কালের গল্প।   আড়ম্বরহীনভাবে শুরু গল্পটির। একটি বাড়িতে মরা-কান্নার সাথে পাঠকের যাত্রা শুরু হয় গল্পটিতে। সে বাড়ির মেজো বউ কুসুমের বিলাপের সাথে শুরুতেই পরিচয় করিয়ে দেন লেখক। আর এই বিলাপই পাঠককে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে লেখকের সৃষ্ট সে গল্পের আনাচেকানাচে। কুঁড়োরাম এ গল্পের মূখ্য চরিত্র। একটি নিম্নবিত্ত পরিবারের কর্তা তিনি। যতটা না কর্মঠ তারচেয়ে বেশী মুখর। কুসুমের বিলাপে বিলাপে পাঠক আস্তে আস্তে গল্পের নাটাইয়ের সন্ধান পায়।   ‘ মরি মরবো, শ্বশুরের ভিটেতেই মরবো, যাবো না কুথাও’—— কুসুমের মুখের এই সংলাপ পাঠকের জন্য দিকনির্দেশক। একটি গল্পে সংলাপের চিত্র আর ভূমিকা ঠিক কি তা এই গল্প লক্ষ্য করলে বোঝা যায়। কুঁড়োরামের পরিবার ইচ্ছের বিরূদ্ধে প্রস্তুত হচ্ছে দেশ ত্যাগের জন্য। কুঁড়োরাম হিন্দুস্তান, পাকিস্তান বোঝে না। বোঝে শুধু তার গাঁ কে। গাঁয়ের মাটিকে। সেই মাটিকে আপন ভেবে থেকে গিয়েছিলো কিছুদিন দেশভাগ হবার পরেও। তবে তা বেশিদিন নয়। চারপাশের সকল শক্তিমন্ত হিন্দু পরিবার যখন হুড়হুড় করে পালালো, এমনকি আশেপাশের সকল গাঁ ফাঁকা হয়ে যেতে লাগলো তখন কুঁড়োরাম সিদ্ধান্ত নিলো দেশত্যাগের।   বিত্তহীন একটি পরিবারের সবচেয়ে বড় বিত্ত হলো আবেগ। কাঁধউচো থালাখান, ছিক্ষেত্তরের বাটিখান, তেঁতুলের আচারের ঠিলেডা বা পুরনো একটু ঘি—-সবকিছু বস্তায় ভরে নিয়ে গেলেও ওদের মন-মগজে স্মৃতি জট পাকিয়ে রয়। কী যেন ফেলে যাচ্ছে! পুরুষ পুরুষের পায়ের ছাপ পড়ে আছে যে বাড়ির আনাচেকানাচে তার ধুলোটুকুও যেন আগল হয়ে সামনে দাঁড়ায়। ধবধবে পাকাচুলওয়ালা মাথা, চওড়া লালপেড়ে শাড়ি পড়ানো আলতা মাখা পা, কচি কচি কয়েকটা হাত বারবার ওদের যাত্রাপথে বাঁধা দেয়। পিছু ডেকে চলে তাদের। কিন্তু ওরা সামনে এগোয়। সুপারি গাছের মাথা, চিনিটারা আমগাছের ডগা আর হাজারখাগী কাঁঠালগাছ আস্তে আস্তে দৃষ্টির সীমানা পেরিয়ে যায়।   দেশত্যাগ মানেই তো অচিন যাত্রা। সে যাত্রায় সামিল কুঁড়োরাম ও তার পরিবার নিশ্চিত নয় গন্তব্য সম্পর্কে। এমনকি পথ সম্পর্কেও অজানা তারা। সে অজানা পথে যখন কিছু মানুষ ওদের ঠকিয়ে ভাগছে তখন একটি কুকুর সঙ্গী হয় ওদের। তবে সেই সময়ে পথে পথে পথে এমন পথিক কম নয়।   ‘ দেশ গাঁয়ে আর লোক থাকবি না বোধ হয়’——-টুইটুম্বুর লঞ্চগুলো যখন কুঁড়োরামদের পিছনে ফেলে চলতে থাকে তখন এক বস্তা বাসন মধুমতির আবর্তিত জলে ফেলে কুঁড়োরাম বুঝিয়ে দেয় মাঝেমাঝে বেঁচে থাকাটাই একমাত্র দায়।   গল্প এগোয়। এগোয় কুঁড়োরামের পরিবার। লঞ্চ থেকে ট্রেন, ট্রেন থেকে হাঁটা পথ এক একটি হেনস্থা ওদের বুঝিয়ে দেয় শিকড় উপড়ে ফেলার যন্ত্রণা। নতুন দেশ, নতুন মানুষ। নতুন নতুন প্রবঞ্চনা। ততক্ষণে সর্বহারা হয়ে ওঠা পরিবারটির নতুন পরিচয় উদ্বাস্তু। নিজ দেশে বিত্তহীন হলেও আলো বাতাসের সাথে আত্মীয়তা কখনো কমেনি ওদের। কিন্তু নতুন দেশ শুধুই অন্ধকার কুঠুরি ওদের জন্য। যে একে একে অন্ধকারে হারিয়ে যায় বাতাসী, হারিয়ে যায় কুঁড়োরাম।   উদ্বাস্তু পরিবারটি আবার পথে নামে নতুন গন্তব্যের জন্য। নিস্তব্ধ গঙ্গার সকল স্তব্ধতা ঘিরে থাকা পরিবারটি পথ ধরে অজানার।   ‘ সোরকারবাবু সাতজন লোক। আট লম্বর নৌকা। সাতজন লোক আর একঠো মো-ও-ট’———-মাঝির এই সুর চমকে দেয় পাঠককে গল্পের শেষে। হারিয়ে যাওয়া বাতাসী অবিকল এই সুরে হাক দিতো বাতাসে ভেসে বেড়াতে বেড়াতে।   দেশভাগ নিয়ে এই গল্পটির রূঢ় দৃশ্যকল্পই আলাদা আবেদন সৃষ্টি করে। যা পাঠককে স্তব্ধ করে দেয়। নিগূঢ় বাস্তব সে ছবি পাঠকের অভিজ্ঞতায় অসহায় নির্মমতা হয়ে আঁকা হয়ে রয়।    

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>