মিলার পাহাড়

মেয়েটাকে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছি বলে আমার আসলেও ভাল লাগতেছে। আমিও মনে মনে চাইছিলাম এমন কিছু হোক! এমনকি মেয়েটা ফাঁসি নিয়ে নিক অথবা বিষ খেয়ে ফেলুক, তবু আমার সাথে বিয়েটা না হোক। এমন যন্ত্রনায় পড়বো জানলে শালার এই পথে আসি আমি! আমার কপালটাই অমন, ঘাসে পা দিলে ঘাসফুল মরে যায়, ফলে হাত দিয়ে ফটো তুলতে গেলে ফলের বোঁটা ছিঁড়ে যায়, পাশ কেটে পাশের জনকে পথ দিতে গেলে ধাক্কা লেগে সেই মানুষটা ডেঞ্জার জায়গায়ই পড়ে…।

সিগারেট ধরিয়ে মাথার পাগড়ি টাইপ জিন্নাহ টুপিটা দূরের অন্ধকারে ছুঁড়ে মারি, তারপর ধানক্ষেত না সরিষাক্ষেত ঠাওর করতে পারি না কিন্তু পায়জামার দড়ি খুলে শুসু করি। এতো শান্তি লাগছিলো শুসু করতে, মনে হচ্ছে শুসুর পানির সাথে সারাদিনের টেনশন আর বিষাদ বেরিয়ে গেলো বুলেটের গতিতে! এখন আবার শুরু করা যাক যন্ত্রনা লোড করা। পায়জামার ফিতায় মনে হয় জন্মের গিট্টু দিয়ে ফেলেছি! সিগ্রেট দাঁতে চেপে ফুঁ দিয়ে ছাই ফেললাম। এতোক্ষণ ধরে শুসু করছি নাকি! যে জ্বলে অর্ধেক হয়ে গেছে সিগারেট। আরেব্বাস! পাহাড়ের মাথায় কহিনূর হীরার মত লাল রঙের ঐটা চাঁদ নাকি! মেয়েটা তো ঐদিকেই দৌড়াচ্ছিলো। একবার বলেওছিলাম, ‘কিছুটা এগিয়ে দিয়ে আসবো?’ দুইদিকে মাথা নেড়ে কাঁদতে কাঁদতে গাড়ি থেকে নেমে গেলো খালি পায়ে। 

পাহাড়ের মাথায় চাঁদ উঠতেছে, মনে হলো অশোকবৃক্ষের নীচে দাঁড়িয়ে আছি আমি, একা এবং অসংখ্য আমি লাল আভায় ছেয়ে যাওয়া ধানক্ষেত বা সরিষাক্ষেত। পাহাড়টা খুব দূরে নয়, মেয়েটার মত টেনে দৌড় দিলে আধা ঘন্টার ভেতরে পৌঁছে যাবো চূড়ায়। খুব উপরে চলে যাওয়ার আগে আগে ছুঁয়ে ফেলা যাবে লাল চাঁদকে হা হা হা…!

খুব ধপাস করে কানের পাশ দিয়ে মাটিতে পড়লো কিছু। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখি বেল বা জাম্বুরা গাছের নীচে দাঁড়িয়ে আছি আমি। শালার ষোলকলা পূর্ন হতে বাকি নাই দেখি! নীচের শক্ত মাটি বা পাথরে পড়ে জিনিসটা ফেটে গন্ধ বের হয়েছে, পাকা বেল। আমি কি ন্যাড়া! বেল তো আমার মাথায়ই পড়ার কথা মাটিতে না পড়ে। যেমন এই মেয়েটা পড়েছিলো আমার উপরে, যেমন আমি এসেছিলাম এই গাঁয়েতে। 

বাড়িতে গিয়ে অনেকদিন ফিরে না এলে আমরা অফিসে ভেবে নিয়েছি মুন্নার বিয়ে দিছে তার বাপে। কেবল শিক্ষিত ছেলে বলে আরো আগে কাবু করতে পারে নাই। না হলে তার এক বছরের বড় ভাইয়ের তিনটা ছেলেমেয়ে। বন্যায় পথঘাট বন্ধ বলে ঢাকায় ফিরতে পারছিলো না মুন্না। বাপ কাবু করে ফেলেছে। শুধু আমি না, লীলাও মুখ কালো করে আংশকার কথা জানিয়ে গেলো সেদিন। তার পরদিন মুন্নার ফোন, ঠিক মুন্নার না, তার চাচাত ভাইয়ের। শহরে এসে ফোন দিয়েছে সে, মুন্নার আব্বা হঠাৎ করে মারা গেছেন। মুন্নার টাইফয়েড, তবে ভালর পথে! কি যে হলো শুনে, অবশ্য আমার এমনই হয়, লেজ খোয়ানোর পরে লাজ হয়। শরীফকে ফোন দিলাম, লীলাকে ফোন দিতেই সে নাছোড়বান্দা। অফিস থেকে আগে আগে বেরিয়ে বাসায় চলে গেলাম, দ্রুত একটা ব্যাগ বানিয়ে কমলাপুর রেলস্টেশন। এখন লীলা যদি দেরি না করে, বিকেলের ট্রেন ধরে মধ্যরাতে সিলেট, সেখান থেকে বেবিটেক্সি নিয়ে মুন্নাদের বাড়ি বিয়ানীবাজার। স্টেশনেই থাকবে মুন্নার চাচাত ভাই। বিয়ানীবাজার নামটা আমার এমনিতেও প্রিয়, কোনো একদিন যাবার ইচ্ছা ছিলো, তবে সাহস জোগাড় করার জন্য আরেকটু দরকার বলে মনের ইচ্ছা মুখে আনি নাই।

কি রে, আমরা তো ভাবছিলাম এসে দেখবো তোর শিন্নি হচ্ছে! 

লীলাকে দেখে গলা শুকিয়ে গেছে মুন্নার, ইশারায় সামলে নিলো শরীফ। বললো, আমরা আসবো শুনে তার বোন এমন গোঁ ধরলো যে রেখে আসা যাচ্ছিলো না। তাছাড়া বাসায় একা রেখে আসা সেইফও না! মুন্নার ভাবি জড়িয়ে ধরে লীলাকে ভেতরের ঘরের দিকে নিয়ে গেলেন। যেতেই মুন্না ঘুষি দিলো আমার নাকে, ব্যাটা খচ্চর।

একটা মধ্যম উঁচু টিলার উপর মুন্নাদের বাড়ি, পিছনের দিকের উঠানের মাথায় দাঁড়ালে তার বাবার কবর দেখা যায়। লাল রঙ্গের একটা কাঁচা মাটির ঢিবি, বাঁশের বেড়ার ভেতরে গাছের ডালপালা দেয়া মনে হয়। আশেপাশের কবরগুলো পাকা দেয়ালঘেরা, পুরনো, কেবল নতুন নাজুক কবরটি মুন্নার বাবার। লোকটাকে কখনো দেখিনি, তবে প্রতিবার বাড়ি আসার আগে আগে ভয়ে ভয়ে থাকতো মুন্না, সেই ইউনি ফার্স্ট ইয়ার থেকে। আসতোও না সব ছুটিতে, না আসলেও দেদারসে টাকা খরচ করতো সে। চাকুরিতে ঢোকার পর তার গলা শুকিয়ে যেত বাড়ির ফোন গেলে, লীলার কথা কোনও ভাবেই বাড়িতে বলতে পারছিলো না মুন্না। তবে কবরের দিকে তাকিয়ে কেনো যেনো মনে হলো একজন ভাল মানুষের দেহ রাখা আছে ওখানে।

মৃতের চারমাস হয় নাই বলে অন্যের মাটিতে পা রাখতে পারবেন না মুন্নার আম্মা, কিন্তু ননদের একমাত্র মেয়ের বিয়ে, মুন্নাও সেরে উঠেছে অনেকটা, সুতরাং বিয়েতে যাওয়া দরকার, কাজের মেয়েটাকে তার কাছে রেখে ঘরের সবাই বিয়েতে রওয়ানা দিলাম আমরা। 

তুই যা বেটা, তোর কাজিন, আমরা তোর শহর ঘুরে দেখি একদিন

মুন্না রাজি হলো না। বিয়েতে হেভি খাওয়াদাওয়া আছে বেটা, একা একা খেয়ে কোনো মজা আছে? 

সুতরাং আমরা লাইটেস ভরে রওয়ানা দিলাম তার ফুফুর বাড়ি। 

একটা বাজারের নাম যেনো চেনা চেনা লাগলো, তবে কোথাও কোনো পাহাড় দেখলাম না! 

তোদের এইদিকে পাহাড় নাই বেটা? শুনলাম না সিলেটে পাহাড় আর পাহাড়?

আছে, মুখ বন্ধ কর, আমার ঘুম পাচ্ছে

লীলা এসে বললো একটা পরীর মত দেখতে বউ! 

আরেকবার এসে চুপিচুপি বললো একটা সর্বনাশ হইছে রে, বর নাকি আসবে না।বিয়েতে তার মত নেই!

এমনিতে বরযাত্রী দেরি করছিলো বলে এক ব্যাচ খাইয়ে নিছেন কনের বাবা। গরমের দিন, সন্ধ্যার দিকে মাংস আর রাখা যাবে না।পরের ব্যাচে খেতে বসেছি আমরা, অর্থাৎ কনেপক্ষের মেহমানের খাওয়া শেষ করে ফেলা দরকার, ঠিক সেই মুহূর্তে এই সংবাদ, অল্পের জন্য গলায় মাংস আটকে যাচ্ছিলো আমার। মুন্নার ভাবির একটা বেনারসি পরেছিলো লীলা। তার দিকে হাভাতের মত তাকিয়েছিলো মুন্না, বিষয়টা বুঝতে কয়েক সেকেন্ড লাগলো তার, ঠিক সেই সময় ঘরের ভেতর আর্তনাদ শুরু হলো, প্লেটে পানি ঢেলে উঠে গেলাম আমি।

বিয়ের বর আসেনি, সে এখানে বিয়ে করবে না। ঘাড় ধরে হারামজাদারে যে এনে ফেলা হবে সেই ব্যবস্থাও রাখে নাই, চিঠি লিখে নিরুদ্দ্যেশ! একদিক দিয়ে ভালই হয়েছে, এমন নরাধমের কাছে বিয়ে না হওয়াই ভাল!

মুন্না এসে আমার হাত জড়িয়ে ধরলো! কনের মামাও! ছাই ফেলতে ভাঙ্গা কুলা আমাকেই নাকি বাকি কাজটা সেরে দিতে হবে। ভাঙ্গা বিয়ের বউয়ের আর বিয়ে হয় না। এতবড় বদনাম আর কিছুতেই নাই। অসম্ভব! আমি এতিমখানায় বড় হয়েছি, এখন মেসে থাকি মানে এই না যে আমি এক মিনিটের নোটিশে আগুনে ঝাঁপ দিবো। দিলে আমি ভালোবাসায়ই ঝাঁপ দিতাম, এই এলাকার একটি মেয়েকে আমি কখনোই ভুলবো না।তার সাথে সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করেছি বছর দেড়েক আগে, কিন্তু দেড় মিনিটও আমি তাকে না ভেবে থাকতে পারি না। মেয়েটি আমাকে গার্হস্থ জীবন, প্রকৃতি আর ভালোবাসা চিনিয়েছিলো চিঠির শব্দে শব্দে! বড় ঘরের মেয়ে, দুই’বেণির মেয়ে, আলাভোলা মেয়ে! আমার এতিমখানার জীবনে তাকে প্যাচিয়ে ফেলার লোভ থেকে মুক্ত করতে পেরেছিলাম নিজেকে। সেই এলাকার মেয়েকে বিয়ে! অসম্ভব। 

অসম্ভব মুখ দিয়ে বলতে পারি নাই বলে ফাতেমা খানম নামের মেয়েটির সাথে কবুল বলতে হলো আমার!

মনে হচ্ছিলো মুন্না আর শরীফকে খুন করে মাঠের মাঝখানে গেঁড়ে ফেলি! মুন্না না হয় লীলার কাছে বাঁধা, কই শরীফকে তো বলার সাহস পেলো না কেউ! তাও আবার কায়দা করে টয়োটা একটা যোগাড় করে তাদের দুজনকে ঢুকিয়ে তাদের গাড়িকে ফলো করতে বলা হয়েছে, মুন্নাদের বাড়িতেই যাচ্ছে সবাই! 

-গাড়ি থামান, আমি বমি করবো

স্লো করে ব্রেক করলাম আমি, ইচ্ছা করছে একেই এখানে মেরে পালিয়ে যাই! বললাম বমি টমি কিছু না, আপনি পালিয়ে যেতে চান…

-গেলে যাবো, আপনি এখানেই বসে থাকুন।

গাড়ির সব লাইট অফ করে দিলাম, কয়েক সেকেন্ড লাগলো ধাক্কা খেতে। দুই ধারে ধানক্ষেত না সরিষাক্ষেত! পাকা না কাঁচা জানি না, তবে শাদা, বিশাল নরম একটি আবহ শুয়ে আছে সেই ক্ষেতের উপর! পাশেই কোথাও পাহাড় আছে, একটা কালো ছায়াও ঢেকে রেখেছে ক্ষেতের কিছু অংশ।কোন পাহাড়? মাঘাইমা পাহাড়? ছাতলা?

বলুন তো বিয়েটা কি আপনিই ভাঙ্গছেন? বরকে যে চিঠি লিখা হইছে কনে প্রেগনেন্ট বলে, সেটা আপনি লিখছেন তাই না? 

-হ্যাঁ লিখছি, আপনার সমস্যা?

আপনি প্রেগনেন্ট না, তাই না?

মেয়েটা এবার আর কোনো উত্তর দিলো না, দ্রুত হাতে মাথার চুলে ক্লিপ দিয়ে আটকানো বিয়ের ওড়না খুলতে লাগলো। তার পর একে একে সব গহনা খুলে সিটের পাশে রাখলো, তারপর সম্ভবত স্যান্ডেল। কোনো মতে শাড়িটাকে জুত জাত করে গাড়ির দরজা খুলে বাইরে গিয়ে দাঁড়ালো! উদ্ভ্রান্তের মত চারদিক দেখতে লাগলো সে! আরিব্বাস! কেউ যদি আগে থেকেই অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকে, আমাকেই এখানে খুন করে কনে নিয়ে পালিয়ে যাবে।আমিও গাড়িতে বসে দ্রুত চারপাশ দেখে নিলাম, ফর্সা চরাচরে কেউ কোথাও নেই তবে একহারা গড়নের একটা গাছ আছে! তার আড়ালে কি কেউ! বললাম ‘এগিয়ে দিয়া আসবো?’

দুইদিকে মাথা নেড়ে মেয়েটা হঠাৎ করে সামনের ক্ষেতে নেমে পড়লো, একবার ফিরেও তাকালো না আমার দিকে। আমি গাড়ির চাবি খুলে বাইরে বেরিয়ে এলাম, মেয়েটা সেই পাহাড়ের দিকেই দৌড়াচ্ছে! কেউ কি পাহাড়ের তলে অপেক্ষায় আছে তার জন্য! যাক থাকলে ভালো, না থাকলেও আমার কোনো সমস্যা নাই!

দাঁড়িয়ে থাকবো না গাড়িতে গিয়ে বসে থাকবো না দ্রুত ড্রাইভ করে মুন্নাদের গাড়ি আটকাবো! আমার এখন কি করা দরকার! মেয়েটা কয়েক সেকেন্ডের ভেতর নাই হয়ে গেছে শাদা আবহের নীচে, আমি কি অপেক্ষা করবো পাহাড়ের চূড়ায় তার মাথা দেখা পর্যন্ত! আমার কেমন যেনো অস্থির লাগছে হঠাৎ, মেয়েটাকে কেনো জোর করে এগিয়ে দিতে গেলাম না! শাড়ি পরে কতদূর যেতে পারবে মেয়েটা? কাদার ভেতর দিয়ে দৌড়াবেই বা কিভাবে! গাছের নীচ ছেড়ে সেই জায়গায় এসে দাঁড়ালাম, মেয়েটা শেষবার যেখানে দাঁড়িয়েছিলো। মাটির উপর কি এটা! বই? হাহাহ…বিয়ের কনের কাছে বই! গাড়ি থেকে নামার সময় ধাক্কা লেগে পড়ে গেছে, বইটি তুলে পেছনের সিটে, মেয়েটার অন্যান্য জিনিসের উপর রাখতে যাবো দেখি ‘ওয়্যার এন্ড পিস’ পুরনো একটি এডিশন! কোণার দিকের কাভার সামান্য ছেঁড়া! বজ্রপাত হলেও এতোটা ভয় পেতাম না, বইটি তো আমারই! পনেরো বছর বইটি তো আমার বিছানার পাশেই ছিলো। মিলা নাকি বইটির কথা এতো শুনেছে, তার লোকাল লাইব্রেরিতে পাচ্ছে না…!

আরে এটা কোনো কথা হলো! আমার জিনিস তোমার কাছেই থাকলো বলে বিকেলের পোস্টে বইটি পাঠিয়ে দিয়েছিলাম আমি। বইটির পাতার ফাঁকে ফাঁকে কিছু চিঠি! লাইটার জ্বালিয়ে দেখলাম আমারই লেখা ১২/১৩টি চিঠি পাতার ভাজে। মিলা কী কখনো তার পুরো নাম লিখেছিলো ঠিকানায়? ঠিকানা তো দেয়া থাকতো তার বান্ধবীর, শুধু মিলা’ই লিখতো সে, পত্রমিতালী’র এড্রেসে শুধু মিলাই পেয়েছিলাম আমি।

চিৎকার করতে থাকলাম। মুখে রক্ত তুলে চিৎকার করি, মিলা… মিলা আমি পাবলো…আমি পাবলো মিলা…

সুনশান ধানের ক্ষেতে কোনো কম্পন নেই, কোথাও কোনো শব্দ নেই…।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত