Site icon ইরাবতী

ছোটগল্প: মানব তোমার জনম । মাহবুব আলী

Short story manab tumar janam Mahbub_Ali
Reading Time: 9 minutes

মাকড়সার অদৃশ্য সুতোয় ঝোলানো ছিল সেই রাত, কয়েকজন যুবক এখানে-ওখানে মোবাইলে ফেসবুকিং কিংবা গেমে নিবিষ্ট, এমন সময়ই নিক্ষিপ্ত হয় এমনকিছু, কেউ কেউ দেখেছে চার কি পাঁচ, কিংবা ছয়তলার কোনো এক জানালা থেকে উড়ে এলো, কেউ ছুঁড়ে ফেলেছে, আসলে দশতলা ভবনের কোন্‌ স্তর হয়ে ঠাহর করা যায় না, আবার কেউ তেমনভাবে দেখেনি বা দেখতে পারেনি, দেখার কথা নয় উৎস মুখ, তবে সেই কিছু একটা বাতাসে ভেসে ভেসে প্রথমে টিনঘরের চাল, তারপর গড়াতে গড়াতে নরম মাটিতে আছড়ে পড়ে আর খুব অস্ফুট কাতরধ্বনি উচ্চারিত হয়; সেই স্বর এক শিশুর। কয়েকজন খুব দ্রুত এগিয়ে যায়, আজকাল কালোটাকা-জালটাকা ঘরে রাখা বিপদ, তেমনই কিছু হতে পারে, আশ্চর্য সেখানে শিশুর আর্তচিৎকার একবার, আহা সেও তো কোটি টাকার চেয়েও মূল্যবান জীবন, তার শরীর কাপড়ের পুটলি থেকে অনেকখানি বেরিয়ে গেছে, উপুড় হয়ে কাদামাটিতে গুঁজে আছে চোখ-মুখ সদ্যোজাত, তার লালচে ফরসা ছোট্ট ছোট্ট দুটো পা একটির উপর অপরটি, বড় মায়াবী আর করুণ দৃশ্যের সূচনা করে।

মানুষগুলো যেমন হতচকিত, দশতলা ভবনের কোন্‌ তলা থেকে, কোন্‌ থাই অ্যালুমোনিয়াম শাটার জানালা দিয়ে ফেলে দেওয়া হলো, এমন দু-চারটি কৌতূহল জিজ্ঞাসায় অস্থির আর কেউ কেউ কী করবে অথবা করা উচিত ভেবে দিশেহারা কিংবা সিদ্ধান্তে আসা না আসার উপক্রম, আসলে জীবিত নাকি মৃত, এইসব দ্বন্দ্বের মধ্যে শিশুটি পুনরায় কেঁদে ওঠে অর্থাৎ বেঁচে আছে, তখন সকল জল্পনা-কল্পনার সাময়িক অবসান হয়ে যায় আর তাদের মধ্যে অগ্রণী ভূমিকা নিয়ে ফেলে দিবাকর। সে শিশুটিকে কোলে তুলে এদিক-ওদিক অস্থির কোনো যানবাহন খোঁজে, পেছনে আরও কয়েকজন, অবশেষে কাছের হাসপাতাল যেতে সিএনজি বেগবান হয়, আরও দু-জন সঙ্গে আসে, তখন সত্য অনুমাননির্ভর সদ্যোজাত শিশুটি যে মেয়েশিশু, শরীরে মাতৃজরায়ুর স্রাব আর তাজা রক্তের প্রলেপ বিদ্যমান, এরপর পুরোনো সাদা কাপড় উলটে দেখা যায়, নাভিতে সেলাই, হালকা রক্ত চুইয়ে পড়ছে, তখন অনেকেই নিশ্চিতভাবে বুঝে নেয় শিশুটি সমাজে তৈরী নিয়মকানুনে অবৈধ, যাকে কেউ জন্ম দিতে চাইছিল অথবা চাইছিল না, গ্রহণ করতে রাজী নয় অথবা কে জানে কী, বোধকরি সকল লজ্জা আর কলঙ্কের হাত থেকে কোনো মানুষের মুখ লুকোবার আর বেঁচে থাকার কি অদম্য প্রয়োজন; জন্মই যখন আজন্ম পাপ। জন্ম কি অবৈধ হতে পারে?

দিবাকরের মন পৃথিবীর সকল বিষাদ মেখে নিতে নিতে সেই রাতকে অসম্ভব কপিশ-ভয়াবহ আর হতাশাময় করে তোলে। মেয়েটি বাঁচবে তো? এই তো কিছুক্ষণ আগে দুর্বল চিৎকারে ক্ষুরধার তীব্রতায় জানিয়ে দিয়েছে, সে এসেছে…সে বেঁচে আছে, কিন্তু এখন কেমন নিস্তেজ, তার বুকের ঢিপঢিপ ছন্দ খুঁজে পেতে সিএনজির চলমান গর্জনের মধ্যে খুব অস্থির একবার মুখের কাছে অন্যবার কানে কাপড়ে জড়ানো পুটলি চেপে ধরে খুঁজে নিতে অদম্য কাতর প্রয়াস। একটু কি বোধ পাওয়া যায়? সে বড় উদ্‌ভ্রান্ত দিশাহীন পাশেরজনকে জিজ্ঞেস করে, –

‘দাদা দেখুন তো বেঁচে আছে? শ্বাস পড়ছে?’

‘কেমনে বলি?…ভাই ড্রাইভার আর কত দূর?’

লোকটি কাপড়ে জড়ানো শিশুটিকে স্পর্শ করে একটু চেপে চেপে বুঝে নেওয়ার চেষ্টায় হতাশ হয়। তার দু-চোখের মণিতে রাতের আশপাশ অদ্ভুতরকম দুর্বোধ্য-অস্থির কিংবা যন্ত্রণায় আরও স্থবির হতে থাকে। সিএনজি ড্রাইভার সামনে তাকিয়েই জবাব দেয়।

‘আয়া পড়ছি আর কি।’

‘এরা কি মানুষ না রাক্ষস? হা ভগবান! বাঁচিয়ে দাও বাঁচিয়ে রাখো ভগবান।’

দিবাকরের বুকে কেমন শূন্য শূন্য হাহাকার বেজে চলে, যা কোনোদিন অনুভূত হয়নি, অথবা এমন হওয়ার কথা ছিল বা পড়তে পারে কল্পনাও ছিল না, এসবের মধ্যে কি করুণ প্রার্থনা করে যায়; ঈশ্বর বাঁচিয়ে দাও…বাঁচিয়ে দাও।

‘বুঝলেন দাদা, মানুষজন কু-কর্ম করে, পেট ফাঁসায়…আ রে হালায়, কত ব্যবস্থা আছে, সেগুলা নিতে পারিস না?’

‘কে জানে কী কেস!’

‘পুলিশি ঝামেলা হইব না তো? হলোই বা।’

তৃতীয়জন এইমাত্র মুখ খুলে নিশ্চুপ থেকে যায়, সময় এমনই আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা যে কেউ কাউকে দেখতে পায় না, দেখারও কি প্রয়োজন, কেউ পরস্পরকে চেনেও না, সামনে আলো-অন্ধকার রাস্তা আর এসবের মধ্যেই মানুষজন কি সুন্দর হেঁটে বা গাড়িতে ঘরে ফেরে; পৃথিবীতে আসলে কোনো ঘটনাই ঘটে নাই। দিবাকর কোনো মন্তব্য করে না, কথা বলতে পারে না, ইচ্ছেও নেই, কেননা তখন একটি চিন্তা অন্যসকল ভাবনাকে সরিয়ে দিয়েছে, যদিও মাথার মধ্যে হাজারও কথা কিলবিল করতে থাকে। পুলিশকে তো জানাতে হবে, জানানোরও কী আছে, তারা ঠিক গন্ধ শুঁকে শুঁকে উপস্থিত হয়, অন্যদিকে জানানোর প্রয়োজন আছে, একটি জীবন, একটি হত্যা, ঠিক জানা নেই এই সকল অপরাধ গোপন করার মধ্যে কোন্‌ অপরাধ? প্রশ্নটি দু-একবার জটিল অঙ্কের মতো ঘুরে ঘুরে আরও কঠিন ও সমাধানহীন পড়ে, সে থাক; শিশুটির সাড়াশব্দ নেই, কান্না কি শ্বাস নিগর্মনের, কান্নার মধ্যে তো অনেককিছু থাকে, ব্যথা-প্রতিবাদ-আবদার, কখনো অস্তিত্বের ঘোষণা দিতেও আসে, কান্না করতে হয়; দিবাকরের কান্না পায় কোনো অসহায় পরিণতির কথা ভেবে, কোনো অচেনা উদ্বিগ্নতায়, হায় একটি প্রাণ, তার কোনো অপরাধ নেই, নিষ্পাপ, সে জানে না তার কী অপরাধ; তাকে কেন বাতাসে ছুঁড়ে ফেলা হলো, নিশ্চিত মৃত্যু জেনে, আসলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া, তার গ্রহণযোগ্যতা নেই, যে মাতা নয় মাস গর্ভে লালন করে গেছে, সেও তাকে চায় না।

রাত জেঁকে বসে আর আশ্চর্য সারাদিনের তাপদাহ শেষে বুড়িগঙ্গার বাতাসে ভেসে আসে সুশীতল মনোরম পরশ, যানজটও তেমন নেই, রাস্তার দু-পাশে এখানে-ওখানে দিনভর ব্যস্ত টাকা-পয়সার লেনদেন, পশরার হাতবদল, সেইসব দোকানপাটের বেশকিছু বন্ধ হতে থাকে, দিবাকরের দৃষ্টি অন্ধকারে ছলছল ভাসতে ভাসতে দেখে নেয় নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা আলো ছড়ানো ল্যাম্পপোস্টগুলোয় আসলে কোনো বালব্‌ নেই, সব মৃত জোনাকপোকা, অদ্ভুতভাবে জ্বলছে আর নিভছে, বুঝি তার মনে দোলায়মান আশা-নিরাশার টানাপোড়েন।

মানুষের জীবনে এই যে দু-একটি অনাহূত-অপ্রত্যাশিত ঘটনা-দুর্ঘটনা, যা বলে-কয়ে আসে না, তার জন্য সে দায়ীও থাকে না, অথচ প্রকৃতির মতো নিঃসংকোচে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে হয়, উপায় থাকে না অথবা থাকে, এড়ানো যায় না, সেখানে লাভ-লোকসান হিসাব নেই, কোনো আনুষ্ঠানিকতা; কিন্তু হাসপাতালে সবকিছুই ফরমালিটি, কাগজে নাম-বয়স-ঠিকানা-অসুবিধা আর সংযুক্তি টাকার হিসাব, এমনকি খুচরো পয়সাও কাগজকলমে লিপিবদ্ধ রাখতে হয়। দিবাকর আর দু-জন মানুষ যখন তড়িঘড়ি জরুরি বিভাগে এসে দাঁড়ায়, রাত বেশ পেরিয়ে গেছে, একজন তিরিশ-বত্রিশ বয়সি মানুষ চেয়ারে বসে টেবিলের উপর ফেলে রাখা রেজিস্টারে কিছু লিখছে নাকি পড়ছে বোঝা যায় না, সম্ভবত হিসাব মেলাবার, তার তেমন লক্ষ্য নেই, তাদের ব্যতিব্যস্ত শব্দে, এলোমেলো কথায় যে আবেদন প্রকাশ করা হয় প্রত্যুত্তরে সে জানালা কাউন্টার থেকে ছুঁড়ে ফেলে নির্দেশ, এ ছাড়া বলতে গেলে বিন্দুমাত্র মনোযোগ দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না এবং অনেক শ্লথ গতিতে একটি ছাপানো ফরম এগিয়ে দিলে সেখানে রোগির নাম, বয়স আর কী কী তথ্য লেখার পরামর্শ আসে। দিবাকর অসহায়ের মতো একবার ডানে অন্যবার বায়ে তাকিয়ে অবশেষে লম্বা করিডোরে অচেনা সান্ত্বনা কিংবা আস্থার সন্ধান করে, আর আশ্চর্য এমন কলিকালেও দু-একজন দরদী মানুষ আছে, মধ্যবয়সি একজন এগিয়ে সামনে দাঁড়ায়, দিবাকর আর দু-জন সেই মুহূর্তে যতটুকু সম্ভব উগড়ে দেয় সকল কথা…ঘটনাক্রম। শিশুর নাম নেই, পিতামাতা কে জানা নেই, ঠিকানা? মধ্যবয়সি খুব দ্রুত ওজন নেয়, যেনবা কোনো পাপ, কোনো ভুল, কোনো প্রতিহিংসা; জীবন বা আত্মার কোনো ওজন নেই। পৃথিবীর ওজন কত? পৃথিবীর ওজন পাঁচ হাজার নয়শত চুয়াত্তরের পর ডানদিকে একুশটি শূন্য বসালে যে সংখ্যা তত কিলোগ্রাম, আশ্চর্য শিশুটির ওজন মাত্র দুই দশমিক আট কিলো; এই পালকতুল্য ভারটুকু কেউ বইতে রাজী নয়, তার ছোট্ট ছোট্ট দুটো হাত, দুটো পা, একটি মায়াবী নিষ্পাপ মুখ কারও কাছে বিষময়, আর তাই অনিশ্চিত কোনো গন্তব্যে, নিশ্চিত মৃত্যুর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষটি এরপর একটি কক্ষ নম্বর বলে দেয় আর তারা খুব দ্রুত সেখানে এগিয়ে যায়। ডাক্তার প্রথমে ফরমে লেখা তথ্য পড়ে নিতে থাকে, কাপড়ের পুটলি খোলা হয়, শিশুটিকে বড় নিস্তেজ প্রায় মৃত ভেবে পরীক্ষা করে বোধগম্যতার মধ্যে এনে দেখতে দেখতে তার ছোট্ট হাতের দু-একটি আঙুল নড়ে ওঠে জানান দেয়, সে বেঁচে আছে। দিবাকরের বুক থেকে পাথরের অনেকখানি সরে যেতে যেতে কিছু কথপোকথন যোগ হয়।

‘অভিভাবক কে?’

‘আমি দিদি আমি।’

‘বেবিকে ইনকিউবেটরে নিতে হবে, শরীরে তাপ নেই, প্রিম্যাচিউর ডেলিভারি, বাসা কোথায় আপনার? বেবির মা কোথায়…কোন্‌ ক্লিনিকে? প্রেগন্যান্সির কয় সপ্তাহ? জানা নেই? শিশু ওয়ার্ডের শেষমাথায় যান, সেখানে গিয়ে মেশিনের ব্যবস্থা করেন।’

ফরমালিটির সবকিছু ঠিকমতো শেষ হতে হতে রাত আরও গভীর। দিবাকর, সঙ্গে আসা আসহাবুর একপাশে দাঁড়িয়ে পড়ে, সেখান থেকে দূরে, বেশ দূরে দরজার কাচের মধ্যদিয়ে দেখা যায়, একটি শিশু ইনকিউবেটর মেশিনের মধ্যে কি নিশ্চিত জীবন-মৃত্যুর যুদ্ধে এগিয়ে গেছে…এগিয়ে যায়। এপাশে বাইরে আকাশের তারাগুলো মেঘ নাকি ধুলোর আস্তরণ ভেদ করে স্বচ্ছ হয়ে উঠতে পারে কি না, দিবাকরের বুকে চাপ চাপ ব্যথা, অস্ফুট দুঃখকথা বেদনানীল বিষ হতেই থাকে, কেন এত কান্না জড়ো হয়, শিশুটি কে, তার সঙ্গে তো কোনো সম্পর্ক নেই, নেই কি, আজ তাই সে অভিভাবক; এ তার গর্ব…অহংকারের মানবজনম। দিবাকর আর যেমন পত্রিকার অফিস থেকে সারাদিনের কাজ শেষে রাতে ঘরে ফেরে, আর কখনো ফেসবুকে বসে এর-ওর সঙ্গে যোগাযোগের ফুরসত পায়, তার জন্য ঈশ্বর পরীক্ষার কিংবা আস্থার ক্ষেত্র বিস্তার করে রেখেছে কে জানে, সেই ঘটনা পুনরায় আরও একবার কল্পনায় বা ভেবে নিলে জীবন আঁতকে ওঠে, কত উঁচু থেকে নেমে এলো শিশুটি, সে কি জানে নাকি সেই বোধ আর অন্যান্য বিষয়াবলী তৈরি হয়েছে? দিবাকর শিহরে ওঠে, তার হাই-অ্যাংজাইটি, চারতলা ভবনের রেলিং-এ দাঁড়িয়ে নিচের মানুষজন দেখে আশ্চর্য কখনো ভেবে নেয়, সে মৃতদের কোনো শহরে বাস করে, আর তাদের জন্য বিভিন্ন প্রান্তের শত শত খবর কম্পিউটারে কম্পোজ করে যায়, এতেই জানা হয়ে যায় কত ঘটনা-দুর্ঘটনা, আশা-নিরাশা-প্রত্যাশা আর সে-সবের বিপরীতে শঠতার মায়াজাল, এই ঘটনাও তেমনই এক প্রতারণা কিংবা মানুষের অসতর্ক মুহূর্তের রংধনু কারসাজি, ইন্দ্রীয়সুখ কিংবা পাপ, পাপ কী, পূণ্য? সেই ছোট্ট এক শিশু, তার আর্তস্বর, জীবনের কান্না, সে নিষ্পাপ; একটি জীবন বনাম মানুষের সভ্যতা।

‘যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাত্রে

তার মুখে খবর পেলুমঃ

সে পেয়েছে ছাড়পত্র এক

নতুন বিশ্বের দ্বারে তাই ব্যক্ত করে অধিকার

জন্মমাত্র সুতীব্র চিৎকারে।’

এই শিশুর কোনো অধিকার নেই, পৃথিবীতে লক্ষ লক্ষ কোটি মানুষের কোনো অধিকার নেই, এই যে সদ্যোজাত এখন জীবন-মৃত্যুর প্রান্তসীমায় কি ভয়ংকর যুদ্ধে একাকী লড়ে যায়, তারও বুঝি কোনো অধিকার নেই, যে বা যারা তাকে এনেছে, সেখানেও কোনো দাবি অধিকার নেই, আছে শুধু লজ্জা অপরাধ আর হত্যার মতো বীভৎস নৃশংসতা; দিবাকর মানুষের জীবনযাপনে হাজার শিষ্টাচার আর নৈতিকতার নিয়মকানুনে অনাহূত একজন। মানুষ কেন এমন করে? চোখের সামনে রাস্তায় একটি-দুটি গাড়ি কখনো দুম্‌ করে চলে যায়, জীবন অস্তিত্বের ধোঁয়াময় বেঁচে থাকার মতো কিছু শব্দ আর ধুলো, যেভাবে হাসপাতাল চত্বরে এসে দাঁড়ায় অ্যাম্বুলেন্স, সেখানে অসুস্থ মানুষজন, স্ট্রেচারে ব্যস্ততা, কারও হাতে কম্পমান স্যালাইন বোতল ঝুলে থাকে, বাতাসের মৃদু ঢেউয়ে ডেটল কিংবা ফিনাইল গন্ধের সঙ্গে অচেনা দুর্গন্ধের তেজ, মানুষের হাজারও কথাবার্তা নিয়মকানুন আর এরমধ্যে বাঁচা-মরার লড়াই, এসব নিয়েই মানুষের জীবনযাপন; সভ্যতা আর ইতিহাসের বড়াই।

‘দাদা বাচ্চাটা বাঁচবে তো? অত উঁচু থেকে ফেলে দেয়া। আপনার কী মনে হয়?’

‘জানি না ভাই।’

‘আপনার বাসা কি ওখানে? কী করেন? অনেক খরচ করলেন। ইনকিউবেটরের ভাড়া তো অনেক। চব্বিশ ঘণ্টা পার হলেই…কতদিন রাখতে হবে?’

‘জানি না।’

‘বুঝলেন আমি মাঝে মধ্যে ওখানে গিয়ে বসি। বন্ধুরা আসে। আড্ডাবাজি হয়। এত বছর ধরে যাওয়া-আসা…কোনোদিন এমন ঘটনা দেখিনি। আচ্ছা দশতলার কোন্‌ ফ্লোর থেকে পড়েছে দেখেছেন?’

‘বলতে পারব না। আমি পথিক, ওই মাঠের রাস্তা দিয়ে ঘরে ফিরি।’

‘এরা মানুষ! সমাজটা একেবারে গেছে। এত পাপকাজ! খবরের পাতা খুললে দেখেন এইসব অপরাধের খবর। মানুষের নীতি-চরিত্র বলে কিছু নাই। এই পাপেই পৃথিবী শেষ হবে দাদা।’

‘আপনি কী করেন?’

‘আমার একটা দোকান আছে, টেইলর্স, ছোটখাটো ব্যবসা, তেমন টাকাপয়সা থাকলে খরচ করতাম দাদা। আপনি?’

‘আমি খবরের কাগজে কাজ করি।’

‘বাহ্‌ তবে তো ভালো খবর পেয়ে গেলেন।’

অ্যা ব্যাড নিউজ ইজ অ্যা গুড নিউজ। দিবাকরের কথা বলতে ইচ্ছে করে না, তেমনভাবে বসে থাকতেও, মন চায় বেঞ্চ থেকে উঠে পায়চারি করে, এই বেঁচে থাকা, কাজ আর আনন্দ অন্বেষণ সব বুঝি মরে গেছে, তার নাসারন্ধ্রে রক্ত, শ্মশান কিংবা কবরের ভস্ম, কর্দমাক্ত ধুলোর গন্ধ, অনপনেয় দাগের মতো সেঁটে আছে; কিছুতেই সরে যাচ্ছে না। চোখের সামনে সেই দৃশ্য, ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মতো কেঁপে কেঁপে উঠছে, প্রথমে কী ভেবেছিল, আর সকলের মতো প্রাণহীন, মাথা আর কোমরে আঘাত চিহ্ন, শ্বাস পড়ছে না, তবে কি হালকা চিৎকার বা আর্তনাদ শোনার ভুল? শিশুটির মুখ নরম মাটিতে কাত হয়ে পড়ে আছে, পায়ের উপর অন্য পা, চোখদুটো মায়ের পেটে থাকা নিমীলিত নিশ্চিন্ত, কে জানে তার বয়স একদিন, আর পৃথিবীতে মানুষের সভ্যতা কোটি কোটি দিন-মাস-বছর কিংবা যুগ-শতাব্দী পেরিয়ে নৃশংসতাকে জয় করতে পারে নাই। দিবাকর মাথা উঁচু করে আরও একবার উঁকি মেরে দেখতে চায়, সেখানে কি একটু স্বস্তি বা আশার ইঙ্গিত আছে, যার জন্য আকাশের ম্লান চাঁদের মতো দূরের জোনাকি হয়ে অপেক্ষা করে থাকে একজন?

একটি মেসে থাকা হয়, সেখানে আজ রাতে ভালো তরকারি রান্নার কথা, তাই সকাল সকাল বের হয়েছিল, দুপুরে অ্যাসিডিটির জন্য লাঞ্চ করা হয়নি, কিন্ত…কে জানে ঈশ্বর অন্য জরুরি দায়িত্ব তুলে দিয়েছে, সে পারবে তো; ঈশ্বর বাঁচিয়ে দাও…বাঁচিয়ে দাও। দিবাকর অস্থির যন্ত্রণায় শেষমেশ উঠে পড়ে, বেঞ্চের চারপাশে আগুন, নরকের মতো দাউ দাউ জ্বলছে, এই পৃথিবী সবুজ-শ্যামল গাছগাছালি, শহরের ইট-পাথরের ঘরবাড়ি-দেয়াল পুড়ে পুড়ে কাঠ-কয়লা-ছাই, এসবের মধ্যেই মানুষের আঙিনায় ফুলের বাগান, সেখানের সৌরভ ভেসে ভেসে মুছে দিতে পারে না রক্ত-প্রলেপের দাগ আর গন্ধ, কারও কারও জেগে থাকা চোখ শুধু দেখে যায় অনেককিছু, যা কখনো বলা হয় না, বলা যায় না, বলতে পারে না; সত্যি কি তাই? সে এদিক-ওদিক পুব-পশ্চিম দু-চার পা হেঁটে আসে, সারারাত থাকতে হবে, এখন এই পর্যায়ে এসে মেসে ফিরে যাওয়া যায় না, যেতে পারবে না, পারলেও স্বস্তিহীন দুঃস্বপ্নের সময় নরকের যন্ত্রণায় এপাশ-ওপাশ করে রাখা ছাড়া আর কী আছে? এরপর পুলিশ, ঘটনা বিস্তারিত বয়ান চাই, সই-স্বাক্ষর আর কী কী সব ফরমালিটি। তারা তিনজন এসেছিল, একজন সামাদ মিয়া চলে গেছে, ওয়ারিতে থাকে, তার বাসা আর মোবাইল নম্বর টুকরো কাগজে জমা রেখেছে। দিবাকরের দৃষ্টি ইনকিউবেটর দেখতে দেখতে পুনরায় ঘোলা হয়ে আসে, অস্বচ্ছ হয়ে যায় চারিদিক, দূর আকাশের তারাগুলো কত অমসৃণ আর বেদনায় মৃতদের মতো ডুবে যেতে থাকে। মানুষের কি জীবন!

আজকাল এখানে-ওখানে কত ভয়ংকর খবর পড়া হয়, পড়তে মন চায় না, পড়েও না, তারপরও কী-বোর্ডে আঙুলগুলো যখন চোখ হয়ে একটি একটি করে অক্ষর তুলতে থাকে, মনিটরের রঙিন পটভূমিকায় ভানুমতির হাসিকান্নার ঝরে যাওয়া মুক্তো-পান্না জমা হয়, সেখানে কেন শুধু কান্না আর বিষাদ বিলাপের কথা, রক্ত-উদ্বমনের বেগ, ইতিহাসের বীভৎস নৃশংসতা আরও কত কী, মনের অজান্তে যা জানতে চায় না, জেনে নিতে ভয় হয়, তবু জেনে যায় আর এভাবেই মানসিক ঋজুতা ভেঙে পড়ে, অসুস্থতা আঁকড়ে ধরে, বিশাল কোনো অজগর কিংবা অক্টেপাস পেঁচিয়ে ধীরে ধীরে মন্থর দম বন্ধ মেরে ফেলতে চায়, সেখান থেকে স্লিপ অ্যাপেনিয়ায় ঘাম ছড়ানো জেগে ওঠার মতো তবু মুক্তি নেই। কত আর দেখতে হবে নিষ্ঠুর পরিত্যক্ত অসহায় জীবনের হত্যাকাণ্ড? দিবাকর টাইপ করে,-

‘বোদা, পঞ্চগড়। সাতাশে সেপ্টেম্বর, দু হাজার একুশ, সোমবার। ধানক্ষেতে পাওয়া গেল নবজাতক। এলাকাবাসী ভোরে ধানক্ষেতে শিশুর কান্না শুনে খুঁজে পায় সদ্যোজাত শিশু। জনৈক কিশোরী বিবাহের প্রলোভনে নিজ আত্মীয়ের সঙ্গে অবৈধ মেলামেশায় গর্ভবতী হলে লোকলজ্জার ভয়ে ভোররাতে ধানক্ষেতে সন্তান জন্মদান করে ফেলে রেখে যায়। ধর্ষণকারী ধনেশ বিবাহে অস্বীকৃতি জানালে এই ঘটনা ঘটে।

‘কেন্দুয়া, নেত্রকোনা। ষোলো নভেম্বর, দু হাজার একুশ, মঙ্গলবার। উপজেলার কান্দিউড়া ইউনিয়নের গোগ গ্রামের জনৈক জান্নাত আক্তার শিলা বিবাহের তিনমাস পর সন্তান জন্ম দিলে লোকলজ্জা ও সামাজিকভাবে হেয় হওয়ার ভয়ে শিশুটিকে রাতের অন্ধকারে ধানক্ষেতে ফেলে দেয়। এলাকাবাসী শিশুটিকে উদ্ধার করে।

‘গলাচিপা, পটুয়াখালি। সাতাশে নভেম্বর, দু হাজার একুশ, শনিবার। উপজেলার রাবনাবাদ নদের পাড়ে ভোরবেলা রক্তমাখা শিশুর লাশ ভাসতে দেখা যায়। পুলিশের ধারণা, রাতের কোনো সময়ে শিশুটি ভূমিষ্ঠ হলে রক্তমাখা অবস্থাতেই নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, যা ভেসে ভেসে খেয়াঘাট এলাকায় এসে ভেড়ে।’

দিবাকর কত ঘটনার কথা মনে করতে পারে নাকি পারা যায়, সে তো এক কাহিনি শেষে আরেক গল্পের শুরু; যার সবগুলো টেনে নিয়ে যায় অচেনা-অজানা-দুর্ধর হৃদয়বিদারক বিষাদ গন্তব্যের পরিসীমায়, মানুষের মন ভাঙে, আকাশ কাঁদে, কে জানে আবর্জনা স্তূপে ফেলে দেওয়া প্রাণের উপর হাজার মাছির ভন ভন স্বরে কোনো অভিমানী আর্তি লুটিয়ে থাকে কি না! দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়ক-ডাস্টবিন-আবর্জনার স্তূপ-ঝোপজঙ্গল-ক্ষেত আর নিরিবিলি-নির্জন জায়গায় প্রতিদিন গড়ে তিনজন নবজাতক পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। এসব শিশু শপিং বা পলিথিন ব্যাগ-বস্তা-কার্টন, কখনো কাগজ বা কাপড়ে মুড়িয়ে ফেলা হয়, যার বেশিরভাগই মারা যায়, কোথাও কুকুরের টানাহ্যাঁচড়া বা ছিঁড়ে খাওয়ার ভয়ংকর দৃশ্য, কখনোবা দিনের আলোয় মুখে তুলে নিরাপদে সরে যায়; এইসব ক্যামেরাবন্দি ছবি প্রকাশিত হয় কাগজে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব শিশুর পিতামাতা বা অভিভাবক খুঁজে পাওয়া যায় না, শনাক্তের জন্য প্রয়োজনীয় টুলস বা ডিএনএ টেস্টের ব্যবস্থা নেই বা অপ্রতুল। এই বীভৎস অপরাধের মধ্যে কিছু ব্যতিক্রমি দৃষ্টান্তও চোখে পড়ে, পরিত্যক্ত নবজাতক খুঁজে পাওয়া যায়, পুলিশ আসে, দরদী মানুষ কেউ নিজের সন্তান হিসেবে লালনপালনের দায়িত্ব নেয়, হয়তো সেখানে স্বার্থ থাকে অথবা নেই, মানবিকতা সমুজ্জ্বল। দিবাকর কি তেমনই কোনো কোমল মনের মানুষ, যার বুকে উথালপাতাল ঢেউ মাতমের মতো অদ্ভুত আর নিরবিচ্ছিন্ন কাতর বিষাদ অন্ধকার বধির, নিজেকে নিশ্চুপ আর্তনাদে ভারাক্রান্ত করে তোলে, তার সামনে কিছু নেই, কিছুই দেখে না, যে দৃশ্য রাতের গহিনে সবকিছু ওলটপালট অমসৃণ ঝাপসা-অস্বচ্ছ করে স্তব্ধ বিলাপে বাতাসে দীর্ঘায়ত বেদনা তুলে দূর থেকে দূরে ভাসিয়ে নেয়, জীবন বুঝিবা নিঃসীম হাহাকারের খাঁ-খাঁ শূন্য তেপান্তর। মানুষ ধু-ধু বালুর মধ্য দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে, পেছনে ফেলে রাখে শতাব্দীর অন্ধকার গহ্বর, অথবা সামনে, তার কোলে রাজকীয় বিদায় সাজে কন্যা এক, পিতা নিঃসীম প্রান্তরে মরু লু হাওয়া এড়িয়ে গর্ত খনন করে যায়, সেই মৃত্যুকূপের গভীর থেকে কাতর আওয়াজ ভেসে আসে ‘বাবা আমাকে ফেলে দিলে কেন…ফেলে দিলে কেন বাবা?’ বাবা অনেক উঁচু থেকে ঝরিয়ে দেয় বালুর পাহাড়; ক্রমশ অন্ধকার হয়ে আসে আলো-বাতাস। দিবাকর নিশ্বাস নিতে পারে না, জলের গভীরে ডুবে যেতে যেতে অস্থির চারিদিক হাতড়ে খুঁজে চলে একটু আলো একটু বাতাস। তারপর ঘোর অন্ধকারে কোথায় হারাতে হারাতে আচমকা কেঁপে কেঁপে বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়ায়, আসলে কি দাঁড়াতে পারে, সব যে টলোমলো; রাত কত? চারিদিক শব্দহীন নিস্তব্ধ শূন্যতা, ঝাপসা দিশাহীন অন্ধকার, বুঝিবা এখানের চারপাশ মৃতদের দেশ, মহাশ্মশান-গোরস্তান, বাতাসে গলিত মানুষের পচা দুর্গন্ধ আর অনিঃশেষ যন্ত্রণায় ভেসে যেতে থাকে। দিবাকর এসবের মধ্যে দূরের কাচঘেরা ইনকিউবেটরে থেমে থেমে বড় উন্মুখ, নিবিড় জিগীষায় কিছু খুঁজে পেতে বড় অস্থির; একটু কি জেগে ওঠে জীবন?

এদিকে গহিন রাত যন্ত্রণার সূক্ষ্ম সুতোয় জীবন-মৃত্যুর সীমারেখায় একাকী নিশ্চুপ ঝুলে যেতে থাকে। 

Exit mobile version