| 1 মার্চ 2024
Categories
ধারাবাহিক প্রবন্ধ

রাধাকৃষ্ণপ্রেমের দ্বিতীয় কাব্য  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (পর্ব-৩) । দিলীপ মজুমদার

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

 

[বড়ু চণ্ডীদাসের প্রামাণ্য জীবনী  পাওয়া যায় নি। অনুমান করা হয় তিনি পঞ্চদশ শতকের মানুষ। মিথিলার কবি বিদ্যাপতির সমসাময়িক। বিদ্যাপতির মতো তাঁর লেখায় নাগর-বৈদগ্ধ্য নেই। জয়দেবের পরে তিনি রাধাকৃষ্ণ প্রেমলীলার কাব্য লিখেছেন।  গীতিরস থাকলেও  তাঁর শ্রীকৃষ্ণকীর্তন একটি কাহিনিকাব্য। নানা কারণে এই কাব্যটি বাংলাসাহিত্যে উল্লেখযোগ্য] আজ থাকছে ৩পর্ব।

 

 

।। ভারখণ্ডান্তর্গত ছত্রখণ্ড । ।

বড়াইএর কাছে রাধা তাঁর বিড়ম্বনার কাহিনি ব্যক্ত করেন। ছলনাময় কৃষ্ণের আচরণ বুঝতে পারেন না তিনি। কখনও কৃষ্ণ মহাদানী সাজেন, কখনও আবার ভারবহনকারী।  ভার বহন করতে গিয়ে কৃষ্ণ নষ্ট করে দিয়েছেন রাধার পসরা। কিন্তু কোন অনুতাপ নেই তাঁর।  কৃষ্ণ এর পরেও বলে যাচ্ছেন রাধার দেহসম্ভোগের কথা।

রাধাকে নীরব দেখে কৃষ্ণ আবার তোষামদ শুরু করেন। প্রশংসা করতে থাকেন রাধার রূপের। বলে যান যে রাধা  তাঁর বিরহজ্বালা দূর করতে পারেন।

বড়াই কৃষ্ণকে জানান যে তাঁর কাকুতি-মিনতিতে তুষ্ট হয়েছেন রাধা। দ্রবীভূত হয়েছে তাঁর হৃদয়। সম্মত হয়েছেন তিনি রতিদানে।

বড়াই কৃষ্ণকে বলেন, ‘খর রৌদ্রে রাধা ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। তুমি তার মাথায় ছত্র ধারণ করে তাকে কুঞ্জে নিয়ে যাও।’

সে কথা শুনে কপট রাগ করে কৃষ্ণ বলেন, ‘কি ? আমাকে রাধার মাথায় ছত্র ধারণ করতে করতে হবে? এত অপমান?’

রাধা বলেন, ‘সুরতির আকাঙ্খা থাকলে অপমান সহ্য করতে হবে।’

কৃষ্ণ বলেন,  ‘রাধা, আর বিরহজ্বালা সহ্য করতে পারছি না।’

-‘ যোগী সেজে বসে আছ তুমি। বিরক্ত করছ পরনারীকে। বিয়ে করে সংসার করতে পারো না?’

গম্ভীর হবে কৃষ্ণ বলেন, ‘আমি হরি, আমিই হর, আমি মহাযোগী, আমি দেবাদিদেব। তোমার কাছে করজোড়ে রতি ভিক্ষা করছি রাধা।’

 

 

।। বৃন্দাবনখণ্ড ।।

কালিন্দী নদীর তীর। মন্দ মন্দ বায়ু প্রবাহিত হচ্ছে। অভিসারে এসেছেন কৃষ্ণ। অপেক্ষা করে আছেন রাধার জন্য। রাধার জন্য শয্যারচনাও প্রস্তুত। বাজছে সংকেতবেণু।

বড়াই রাধাকে বললেন, ‘রাধা তুমি আর বিলম্ব করো না। তুমি তো জানো কৃষ্ণ বড় অভিমানী। তোমার বিলম্বে তার অভিমান হবে।’

বড়াই এর মুখে বৃন্দাবনের কথা শুনে আনন্দিত হলেন গোপবালিকারা। রাধাকে নিয়ে তাঁরা যাত্রা করলেন বৃন্দাবনের দিকে। বড়াইকে সম্মুখে রেখে চলতে লাগলেন চন্দ্রাবলী। গোপবালিকারা গান গাইতে লাগলেন মনের আনন্দে। কৃষ্ণের কাছে গিয়ে তাঁরা বললেন, ‘হে কৃষ্ণ,  লজ্জা সংকোচ ত্যাগ করে আমরা এসেছি তোমার কাছে। আমাদের তুমি ত্যাগ করো না কানাই।’

তাঁদের কথা শুনে কৃষ্ণ আনন্দিত হলেন। নানাভাবে তাঁদের মনস্তুষ্টি বিধানের চেষ্টা করলেন তিনি। তাঁরা চলে যাবার পরে কৃষ্ণের হৃদয়াসীনা হয়ে বসলেন রাধা। তখন তাঁর বসন স্খলিত, জঘন কাঞ্চিমুক্ত।

কৃষ্ণ গাঢ়কণ্ঠে বললেন, ‘রাধা, তোমার জন্য রচনা করেছি এই বৃন্দাবন। এখানে একটি নিভৃত স্থান আছে, তোমাকে সেখানে নিয়ে যাব।

তারপরে কৃষ্ণ রাধার রূপের প্রশংসা শুরু করলেন। তাঁর দেহের বিবিধ অঙ্গগুলিকে তুলনা করতে লাগলেন বিবিধ ফুলের সঙ্গে। রাধার চরণযুগল হৃদয়ে ধারণ করার অনুমতি প্রার্থনা করে তিনি বলতে লাগলেন, ‘রাধা, তুমি আমার  রতনভূষণ, তুমিই আমার জীবন।’

 

 

।। কালীয়দমন খণ্ড ।।

বৃন্দাবনের মধ্য  দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে যমুনা নদী। সেই নদীতে কালীদহ নামে আছে একটি গভীর হ্রদ। সেই হ্রদে বাস করে কালীয়নাগ নামে এক বিষধর সাপ। তার উগ্র বিষে হ্রদের জল বিষময়। কোন জন্তু পান করতে পারে না সেই জল।

গোপীদের বিদায় দিয়ে মথুরা নগরে যাবার পথে জলক্রীড়া করার ইচ্ছা হল কৃষ্ণের। কালীদহের কদম্বতলায় এলেন তিনি। গোপবালকদের নিষেধ অমান্য করে কদম্ববৃক্ষ থেকে তিনি ঝাঁপ দিলেন কালীদহে।

কালীয় নাগ সপরিবারে দংশন করতে লাগল কৃষ্ণকে। তীব্র বিষের জ্বালায় চৈতন্য হারালেন কৃষ্ণ। লোকমুখে এ কথা শুনে ছুটে এলেন নন্দ আর যশোদা। মাটিতে লুটিয়ে কাঁদতে লাগলেন তাঁরা। কাঁদতে লাগল গোপবালকেরা। সেই বিলাপে মুখরিত হল চারদিক।

বলভদ্র বুঝতে পারলেন কৃষ্ণ আত্মবিস্মৃত হয়ে মোহগ্রস্ত হয়েছেন। তাঁকে জানাতে হবে পূর্ব বৃত্তান্ত। তাহলেই তাঁর চৈতন্য ফিরে আসবে।

বলভদ্র কৃষ্ণের ঈশ্বরসত্তার কথা,  নানা অবতাররূপে পৃথিবীকে রক্ষা করার কথা বলায় কৃষ্ণের চৈতন্য ফিরে এল। সকলে স্বস্তির শ্বাস ফেললেন।

 

 


আরো পড়ুন: রাধাকৃষ্ণপ্রেমের দ্বিতীয় কাব্য  শ্রীকৃষ্ণকীর্তন (পর্ব-২)


 

।। বস্ত্রহরণ খণ্ড ।।

সখীদের সঙ্গে নিয়ে গজপতিছন্দে রাধা জল আনতে চলেছেন যমুনায়। ঘাটেই দেখা কৃষ্ণের সঙ্গে। কৃষ্ণকে দেখে সখীরা বিহ্বল। চোখে তাঁদের পলক পড়ে না।

রাধা কৃষ্ণকে বললেন, ‘একটু সরে দাঁড়াও কানাই।  আমাদের জল ভরতে দাও।’

কৃষ্ণের এমন ভাব যেন তিনি চেনেন না রাধাকে। বললেন, ‘ কে তুমি? কার বধূ? কেন জল আনতে এসেছ যমুনায়?’

রাধা রেগে গিয়ে বলেন, ‘যার বধূ  হই না কেন, তাতে তোমার কী?’

কৃষ্ণ বলেন, ‘কাঁধের কলস নামিয়ে রাখো। কথা আছে তোমার সঙ্গে।’

-‘কি কথা?’

-‘এই তাম্বুল নাও তো আগে।’

-তাম্বুল দিয়ে কি বলতে চাও তুমি?’

-‘শোনো সুন্দরী, আমি হলাম সমস্ত যমুনার অধিকারী।’

-‘বুঝতে পেরেছি তোমার মতলব। তোমার সঙ্গে কোন কথা নেই আমার।’

রাধার মন জয় করার জন্য কৃষ্ণ তাঁকে স্বর্ণময় কিঙ্কিনী, পট্টবস্ত্র, স্বর্ণময় বাঁশি  দিতে চাইলেন। রাধা সম্মত হলেন না কিছুতেই। তখন কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, ডালিমের মতো তোমার পয়োধর দুটি আমার মন মাতিয়েছে।’

রাধা ক্রুদ্ধভাবে বলেন, ‘আমার পয়োধর মাকাল ফল সদৃশ। দেখতে সুন্দর, কিন্তু মুখে দিলেই মৃত্যু।’

রাধার নিষ্ঠুর কথা শুনে দুঃখ পেলেন কৃষ্ণ। বড়াই তিরস্কার করলেন রাধাকে। তিনি রাধাকে সরস বচনে কৃষ্ণের তুষ্টি বিধান করতে পরামর্শ দিলেন। কৃষ্ণও জানালেন তাঁর বিরহজ্বালার কথা।

রাধা বললেন, ‘পথে-ঘাটে কেন তুমি প্রকাশ্যে এ সব বলো কানাই! কে কোথায় শুনতে পাবে। আমার শাশুড়ি বড় দুর্জন, শুনতে পেলে আমার দুর্দশার অন্ত থাকবে না।’

কৃষ্ণ আর পীড়াপীড়ি করলেন না। ফিরে গেলেন রাধা।

দিনকয়েক পরে সখীদের নিয়ে রাধা আবার এলেন যমুনার তীরে। কৃষ্ণ বললেন, ‘রাধা, তুমি যমুনার জলে স্নান করতে পারো।  সর্পভয় আর নেই। তাকে আমি হত্যা করেছি।’

কৃষ্ণের আশ্বাসে জলে নামলেন রাধা ও তাঁর সখীরা। জলকেলিতে মত্ত হয়ে উঠলেন তাঁরা। এই সুযোগে কৃষ্ণ তাঁদের বসন-ভূষণ নিয়ে উঠে বসলেন কদম্বতরুতে। সে কথা জানতে পেরে গোপীরা বড় বিড়ম্বনা বোধ করতে লাগলেন। অর্দ্ধজলমগ্ন হয়ে দক্ষিণ বাহুদ্বারা বক্ষোদেশ আবৃত করে রাধা বলতে লাগলেন, ‘এ তোমার কি ব্যবহার কানাই? দাও আমাদের বসন দাও।’

কৃষ্ণ বলেন, ‘তীরে উঠে হাত জোড় করে দাঁড়াও। তাহলেই পাবে তোমাদের বসন-ভূষণ।’

অগত্যা তাই করতে হল রাধা ও তাঁর সখীদের। কৃষ্ণ দুচোখ ভরে দেখলেন নগ্ন যুবতীদের রূপ। তারপরে ফিরিয়ে দিলেন বসন-ভূষণ। শুধু লুকিয়ে রাখলেন রাধার হারটি।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত