ঘুমকাতুরে

শময়িতার সন্দেহটা এখন আর সন্দেহের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সে বুঝে গেছে, তার কপাল পুড়তে চলেছে। না-হলে যে শ্রয়ন সন্ধে গড়াবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমে ঢলে পড়ত। বিছানাটা পর্যন্ত ঝাড়তে দিত না। একটু উঠতে বললে কোন ঘরে গিয়ে যে শুয়ে পড়ত বোঝা যেত না। খুঁজতে খুঁজতে ওর দম বেরিয়ে যেত। সেই শ্রয়নই কিনা এখন রাত এগারোটাতেও বাড়ি ঢোকে না! কোথায় যায়! নিশ্চয়ই কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়েছে!
নাকি আমি যাতে ওর ঘুমের ব্যাঘাত না ঘটাই, সে জন্য অফিস থেকে চুপিচুপি বাড়ি ঢুকে অন্য কোনও ঘরে গিয়ে একচোট ঘুমিয়ে নেয়! তার পর পেটের মধ্যে যখন ছুঁচোয় ডন মারে, তখন আর থাকতে না পেরে খাওয়ার জন্য জামাটামা গুঁজে বুটটুট পরে এমন ভাবে ঘরে ঢোকে যেন এক্ষুনি অফিস থেকে ফিরল!
কিন্তু না। সেটাও যে না, তাও প্রমাণ হয়ে গেল।  ক’দিন ধরে তন্ন তন্ন করে গোটা বাড়ি খুঁজেও সে তার স্বামীকে কোত্থাও পায়নি। তা হলে কি এই বাড়ির মধ্যে এমন ঘরও আছে, যার হদিশ সে জানে না!
হতেই পারে। এখন অবস্থা অনেকটা পড়ে গেলেও এক সময় তো সবই ছিল। লোক-লস্কর। লেঠেল-বাহিনী। এমনকী বিশ্বস্ত গুপ্তচরও। ছিল প্রচুর জমিজমাও। ওদের জমিদারি নাকি বহু দূর অবধি বিস্তৃত ছিল। এখন অবশ্য সেই অর্থে বলতে গেলে কিছুই নেই। থাকার মধ্যে শুধু আছে ওর বাপ-ঠাকুর্দার তৈরি করে যাওয়া এই বাড়ি। কেন যে এত বড় বাড়ি বানিয়েছিলেন কে জানে! এক একটা ঘর তিন তলার সমান উঁচু উঁচু। কড়িবরগার ছাদ। সেখান থেকে লম্বা লম্বা রড দিয়ে আদ্যিকালের সিলিং ফ্যান ঝোলানো। চালালেই ঘটাং ঘটাং আওয়াজ হয়। যত না হাওয়া লাগে, তার চেয়ে বিরক্ত লাগে বেশি। ওগুলো খুলে ফেলে নতুন ফ্যান লাগানোর কথা বলতে গেলেই শ্রয়ন একেবারে রে রে করে ওঠে। বলে, না না না। ওগুলো খোলা যাবে না। ওগুলো আমাদের পূর্বপুরুষের স্মৃতি।
গোটা বাড়িতে লোক বলতে সাকুল্যে তিন জন। সে, তার স্বামী আর তাদের একমাত্র ছেলে। অথচ দোতলাতেই বিশাল বিশাল এগারোখানা ঘর। ঘর তো নয়, এক-একটা ফুটবল খেলার মাঠ। কেউ হুট করে ঢুকলে ডবল বেডের খাটটাকেও তার মনে হবে ঘরের কোণে যেন একটা ছোট্ট জলচৌকি পড়ে আছে।
এ ছাড়া, এ দিকে ও দিকে ছোট ছোট ঘর তো আছেই। কিছু তালা দেওয়া, কিছু হাট করে খোলা। এখান সেখান থেকে নেমে গেছে চোরাগোপ্তা সরু সরু সিঁড়ি। উপরেও উঠে গেছে বেশ কয়েকটা। বাইরে থেকেও আছে খানকয়েক লোহার ঘোরানো সিঁড়ি। কোনওটা দোতলা, কোনওটা তিনতলা অবধি। সেগুলি আর ব্যবহার হয় না। বেশির ভাগ পা-দানিই উধাও হয়ে গেছে। কারা যে নিয়ে গেছে!
বিয়ের পর এতগুলো বছর কেটে গেলেও এ বাড়ির সব ক’টা ঘর এখনও তার খুলে দেখা হয়নি। নীচে ক’টা ঘর আছে কে জানে! উপরের কয়েকটা ঘর তো পায়রাদের দখলে চলে গেছে। তাদের বকম বকমে প্রথম দিকে ওর ঘুমই হত না। এখন অবশ্য অভ্যাস হয়ে গেছে।
কত লোক এসে ওদের ধরে। থাকার জন্য তো বটেই, কেউ কেউ বন্ধ ঘরগুলো গো-ডাউন হিসেবেও ভাড়া নিতে চায়। তার উপরে আছে নতুন নতুন গজিয়ে ওঠা প্রমোটারদের নানা প্রলোভন। শুধু সে ভাবে চাপ দিতে পারে না শময়িতার মামাতো ভাইয়ের জন্য।
শময়িতা বহু বার তার স্বামীকে বলেছে, নীচের ঘরগুলো তো খোলাও হয় না। পড়ে থেকে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। পয়-পরিষ্কার করে ভাড়া দিয়ে দাও না… টাকার টাকাও আসবে। ঘরগুলোতেও আলো-বাতাস ঢুকবে।
কিন্তু শ্রয়নের সেই এক কথা— না। আমাদের বংশের কেউ কখনও বাড়িঘর ভাড়া দেয়নি। আমিও দেবো না। না খেতে পেয়ে মরে গেলেও দেবো না। এটা আমাদের ঐতিহ্য।
শময়িতা বহু বার চেষ্টা করেও ওকে বোঝাতে পারেনি, দিন বদলে গেছে। সময়ও পাল্টে গেছে। সময়ের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলতে না পারলেই পিছিয়ে প়ড়বে। বিপদে পড়বে। তোমাদের খুড়তুতো ভাইদের দেখো…
ওদের খুড়তুতো ভাইদের বাড়িটাও ওদের মতোই বিশাল। ওদের বাড়ির লাগোয়াই। খুড়তুতোরা চার ভাই। কেউই কিছু করে না। ওদের গায়ের রং এত ফর্সা যে, যে-পাড়ার লোকেরা দু’পুরুষ আগেও ওদের দিকে চোখ তুলে তাকাবার সাহস পেত না, ওদের প্রজা ছিল, অবস্থা পড়ে গেছে দেখে তারাও ওদের পিছনে লাগে। দেখলেই, সাদা পাটালি বলে খেপায়।
আর ওদের বাবা? মানে শ্রয়নের কাকা? প্রত্যেক দিন সকালে বাজার যাওয়ার আগে ব্যবহারে-ব্যবহারে শতচ্ছিন্ন ময়লা একটা ফর্দ পাড়ারই একটা মুদিখানা দোকানে জমা দিয়ে যান। ফেরার সময় সেই ফর্দ মিলিয়ে মুদিওয়ালার রেডি করে রাখা প্রতিদিনকার তেল, নুন, মশলা নিয়ে বাড়ি আসেন।
শ্রয়ন নাকি একবার তার কাকাকে জি়জ্ঞেস করেছিল, এক মাসের না হোক, অন্তত সারা সপ্তাহেরটা তো একসঙ্গে কিনে রাখতে পারেন।
উনি বলেছিলেন, সে তো পারিই। কিন্তু কাল যদি মরে যাই?
কাকার কথা শুনে শ্রয়ন থ হয়ে গিয়েছিল। শ্রয়নদের অবস্থা অবশ্য তার কাকাদের মতো নয়। কাকারা কোনও কিছুই ধরে রাখতে পারেননি। বহু আগেই সব বেচেবুচে দিয়েছেন। এখনও এই বাড়িটা ছাড়াও শ্রয়নদের আরও একটা বাড়ি আছে। দেশের বাড়ি। সেই বাড়িটা আরও বড়। সাত ভূতে খাচ্ছে। শময়িতা ওই বাড়ির কথা জানার পরে ছ’মাসে ন’মাসে অন্তত একবার কোনও রকমে ঠেলেঠুলে শ্রয়নকে পাঠাত। যারা ওদের জমি ভাগে চাষ করে তাদের কাছ থেকে টাকা তুলে আনার জন্য। কিন্তু যেহেতু জমিগুলো একলপ্তে নয়, ভিন্ন ভিন্ন লোকে ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় চাষ করে এবং এখন নতুন নতুন নিয়মকানুন যা হচ্ছে, আর যে ভাবে রন্ধ্রে রন্ধ্রে রাজনীতি ঢুকে পড়ছে, তাতে জমিতে থেকেই জমি রক্ষা করা যাচ্ছে না। আর তারা তো গ্রাম থেকে পাঁচশো মাইল দূরে বসে আছে। সুতরাং ছড়ানো-ছেটানো চাষের জমিগুলো সব দখল হয়ে যাবার জোগাড়়।
শময়িতা কত বার বলেছে, জমি কখনও কারও বাপের হয় না। দাপের। আমরা ওখানে থাকিই না, তো দাপট দেখাব কী! তা ছাড়া, আমরা তো আর ওখানে থাকতে যাব না। শুধু শুধু অত জমি ওখানে ফেলে রেখে কী হবে? একদিন দেখবে সব দখল হয়ে গেছে। এ বার আস্তে আস্তে জমিজমাগুলো বিক্রি করার চেষ্টা করো। দরকার হলে ক’টা দিন ওখানে গিয়ে থাকো। কিন্তু কে শোনে কার কথা! ঘুম পেলে ও আর কিচ্ছু চায় না।
এই ঘুমের জন্যই শ্রয়ন কোনও দিন চাকরি বাকরি করেনি। খুড়তুতো ভাইদের মতোই পূর্বপুরুষের রেখে যাওয়া টাকাতেই বসে বসে খেত। বিয়ের পর শময়িতাই বলেছিল, জানো তো, রাজার ধনও ঝিনুক মাপতে ফুরিয়ে যায়। শুধু পড়ে পড়ে ঘুমোলে চলবে? এত ভাল রেজাল্ট তোমার, কিছু একটা করো। না। তোমাকে টাকার জন্য চাকরি করতে বলছি না। আসলে, কাজের মধ্যে থাকলে তোমার মনটাও ভাল থাকবে, তাই…
সে হ্যাঁ-ও বলেনি, না-ও বলেনি। তার পর এমপ্লয়মেন্ট গ্রেজেট দেখে শময়িতাই একটা চাকরির সন্ধান দিয়েছিল। ওকে দিয়ে শময়িতাই দরখাস্ত লিখিয়েছিল। এবং শময়িতা নিজে গিয়েই সেটা পোস্ট করে এসেছিল। ইন্টারভিউয়ের দিন শময়িতাই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিল। এবং ইন্টারভিউয়ে ঢোকার ঠিক আগের মুহূর্তে শ্রয়নের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলেছিল, তুমি যদি খুব ভাল করে ইন্টারভিউ দাও, তা হলে টানা তিন দিন তোমার ছুটি। যত ইচ্ছে ঘুমিয়ো। আমি তোমাকে একবারও ডাকব না।
ওই কথা শুনে চকচক করে উঠেছিল শ্রয়নের চোখ। সত্যি?
শময়িতা বলেছিল, সত্যি। আর তাতেই কাজ হয়েছিল। কিন্তু এই ঘুমের জন্য ও কম দিন অফিস কামাই করেছে? গেলেও, অফিসে বসে বসেই ও ঘুমোত। সেই জন্য ওর সহকর্মীরা পর্যন্ত ওর নাম দিয়ে দিয়েছিল— ঘুমকাতুরে। সেই বদনাম ঘোচানোর জন্যই শময়িতা রোজ সকালে তাকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে দিত।
ক’দিন আগে হঠাৎ কী হল, শ্রয়ন অফিস থেকে ফিরেই চা খেতে খেতে শময়িতাকে বলল, জানো তো, আমাদের অফিসের কলিঙ্গদা, যে সব থেকে বেশি সিগারেট খেত, একেবারে চেনস্মোকার, গত কাল থেকে সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন।
শময়িতা জানতে চাইল, কেন?
— কেন আবার? ওর বউ খেতে বারণ করেছে, তাই।
— বাঃ, তোমাদের কলিঙ্গদাকে তো বেশ ভাল বলতে হবে।
— কেন? আমি ভাল না?
— তোমাকে যে ভাল বলব, তুমি কি তোমার বউয়ের কথা শোনো?
— শুনি না বুঝি? এক বড় অপবাদ? ঠিক আছে, কাল থেকে তুমি যেটা বারণ করো, আমি আর সেটা কিছুতেই কবর না।
— কী?
— পড়ে পড়ে আর ঘুমোব না।
— তুমি? ঘুমোবে না? তা হলেই হয়েছিল।
— এই তো? চ্যালে়ঞ্জ। কাল থেকে তোমাকে আর ডাকতে হবে না। আমি নিজে তেকেই সক্কালবেলায় উঠে যাব। দেখে নিয়ো।
শময়িতা একটু হেসে বলল, তার সঙ্গে তা হলে এটাও দেখতে হবে, সূর্য পশ্চিম দিকে উঠেছে কি না…
— সুর্যের কথা আমি বলতে পারব না। আমি আমার কথা বলছি।
— ঠিক আছে, দেখা যাবে।
সত্যি সত্যিই শ্রয়ন যে এটা করতে পারবে শময়িতা তা কল্পনাও করতে পারেনি। হ্যাঁ, এখন ক’দিন ধরে ওকে আর ডাকতে হচ্ছে না। শ্রয়ন নিজে থেকেই সকাল সকাল উঠে পড়ছে। অফিসেও বেরিয়ে পড়ছে ঠিক সময়ে। এই সব দেখে শময়িতার মনে হঠাৎ খটকা লাগল, আচ্ছা, অফিসে গিয়ে ও আবার ঘুমোচ্ছে না তো! একটা ফোন করে দেখব! মনে হতেই মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়েছিল শময়িতা। তার পর বেশ কয়েক বার পর পর চেষ্টা করে গেল শ্রয়নকে মোবাইলে ধরতে। কিন্তু না। ওর ফোনে নট রিচেবল। অগত্যা শময়িতা ফোন করল, অফিসের ল্যান্ড নম্বরে। দুটো রিং হতে না-হতেই ও প্রান্ত থেকে ভেসে এল, হ্যালো?
— শ্রয়ন আছে?
— না। ও তো আজ আসেনি।
— আসেনি?
— না। ও তো দু’-তিন দিন ধরে আসছে না।
— মানে?
— আপনি কে বলছেন?
কথাটা শুনে শময়িতা বলতে যাচ্ছিল, আমি ওর ওয়াইফ বলছি। কিন্তু না। ও আর একটা কথাও বলল না। সঙ্গে সঙ্গে লাইন কেটে দিল।
এ রকম উত্তর শোনার জন্য শময়িতা একদম প্রস্তুত ছিল না। ভাবতে লাগল, দু’-তিন দিন ধরে ও অফিসে যাচ্ছে না! কিন্তু রোজই তো খেয়েদেয়ে অফিসের নাম করে বেরোচ্ছে। তা হলে যাচ্ছে কোথায়! তবে কী… হ্যাঁ, হতেই পারে। রাইয়ের হাজব্যান্ড হীমবন্তদা তো স্কুল টিচার। যথেষ্ট সচ্ছল অবস্থা। তবু বউ-ছেলেমেয়েকে আরও একটু ভাল রাখার জন্য একটা কোচিং সেন্টার খুলেছিলেন। পাশের পাড়ায় একটা গ্যারেজ ঘর ভাড়াও নিয়েছিলেন। শুধু সকালেই নয়, বিকেলেও দফায় দফায় ইলেভেন-টুয়েলভের ছেলেমেয়েরা সেখানে টিউশন নিতে যেত। শনি-রবিবারও বাদ যেত না।
সব ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু তার মধ্যেই ঘটে গেল একটা অঘটন। ওই পাড়ার ছেলেরা হঠাৎ একদিন তাঁকে শুধু বেধড়ক পেটালই না, মারতে মারতে প্রায় আধমড়া করে দিল। এবং বলে দিল, এ অঞ্চলের ত্রিসীমানার মধ্যে যেন আর না দেখি…
রাই অবাক। তার স্বামীর মতো স্বামী হয় না। একেবারে মাটির মানুষ। কোনও সাতেপাঁচে থাকেন না। আর তাঁকে কিনা এ ভাবে মারধড়? পা়ড়ার দু’জনকে নিয়ে দৌড়ে গিয়েছিল সে। থানায় গিয়ে শুনেছিল তাঁর স্বামীর কেলোরকীর্তির কথা। লাস্ট ব্যাচ চলে যাওয়ার পরেও, অন্যদের থেকে পিছিয়ে পড়া সদ্য কোচিংয়ে আসা ক্লাস ইলেভেনের একটি মেয়েকে উনি স্পেশাল ক্লাস নেওয়ার জন্য থাকতে বলেছিলেন। কয়েকটি অঙ্ক দেখিয়ে দেওয়ার পরেই উনি নাকি আচমকা মেয়েটিকে জাপটে ধরে পাগলের মতো অসভ্যতা শুরু করে দেন।
প্রথমটায় হকচকিয়ে গেলেও পর মুহূর্তেই মেয়েটি চিৎকার করে ওঠে। আশপাশের লোক জড়ো হয়ে যায়। তারা দরজা ঠেলে ভিতরে ঢুকে দেখে মাস্টারমশাই ঘরের কোণে সিঁটিয়ে আছেন আর মেয়েটি ভয়ে-আতঙ্কে হাউহাউ করে কাঁদছে। খবর পেয়ে দৌড়ে আসে গলির মুখে ক্যারামবোর্ড খেলতে থাকা পাড়ার ছেলেরা। তাদের বুঝতে অসুবিধে হয় না কী ঘটেছে। ওরা তার স্বামীকে কলার ধরে টেনে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে ঘর থেকে বার করে এনে রাস্তার উপরে ফেলে এলোপাথাড়ি কিল-চড়়-লাথি মারতে থাকে।
মার সহ্য করতে না পেরে অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। খবর যায় লোকাল থানায়। পুলিশ এসে তাঁকে উদ্ধার করে নিয়ে যায়।
শুধু ওই মেয়েটিই নয়, ওই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরে নাকি একে একে আরও অনেক মেয়েই মুখ খুলেছিল। বলেছিল, তাদের সঙ্গেও নাকি উনি অসভ্যতা করেছেন। কিন্তু ভয়ে, লজ্জায়, কে কী বলবে ভেবে তারা চেপে গেছে। কেউ কেউ বাড়িতেও জানিয়েছিল ব্যাপারটা। কিন্তু বেশির ভাগ বাড়ি থেকেই নাকি বলেছিল, যা হবার হয়ে গেছে। কাউকে কিছু বলতে যাস না। এ সব জানাজানি হলে মানসম্মান নিয়ে টানাটানি হবে। থানা পুলিশ হবে। আজেবাজে প্রশ্ন করবে। বিয়ে দিতে গেলে সমস্যা হবে। তার চেয়ে বরং চুপ করে থাকাই ভাল। দরকার হলে ওখানে আর পড়তে যাস না।
এই সব শুনে হাসিখুশি প্রাণোচ্ছল রাই কেমন যেন গুটিয়ে নিয়েছিল নিজেকে। কারও সঙ্গেই সে ভাবে আর মিশত না। শময়িতার সঙ্গেও না। যেন স্বামী নয়, দোষটা সে-ই করেছে। এটা দেখে রাইয়ের জন্য সমবেদনা হলেও মনে মনে বেশ খুশিই হয়েছিল সে, আর যাই হোক, তার স্বামী অন্তত ও রকম নয়।
কিন্তু অফিসে ফোন করে এ কী শুনল সে! ও দু’-তিন দিন ধরে অফিসে যাচ্ছে না! ভাগ্যিস ওর মোবাইলে নট রিচেবল আসছিল। তাই বাধ্য হয়ে অফিসের ল্যান্ড নম্বরে ফোন করেছিল। না হলে তো সে জানতেই পারত না, তার বিশ্বাসটাকে ঘুণপোকারা ভিতরে থেকে কী ভাবে কুরে কুরে ফোঁপরা করে দিয়েছে।
তখনই তার সন্দেহ দানা বেঁধে উঠেছিল। মনে মনে বলেছিল, না। ও ঠিক করেনি। তার বিশ্বাসে আঘাত করেছে। এ জন্যই কি যখন তখন হুটহাট করে ও বেরিয়ে যাচ্ছে! রাত করে ফিরছে! তার মাইনের কোনও হিসেব পাচ্ছে না সে! কানাঘুষোয় জানতে পারছে, তার স্বামী একটু একটু করে দেশের জমিজমা বেচে দিচ্ছে! তার মানে সে যা সন্দেহ করছে সেটা সত্যি! ও অন্য কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়েছে! তার পিছনেই ঢালছে সব টাকা! ছিঃ ছিঃ ছিঃ। আমার কথা না হয় বাদই দিলাম। এ সব করার আগে কি ছেলের মুখটাও ওর একবার মনে পড়ল না! জানাজানি হলে লোকের কাছে আমি মুখ দেখাব কী করে! মা-বাবাই বা কী ভাববেন! আচ্ছা, ক’দিন আগে কতগুলো কাগজে আমাকে দিয়ে ও সই করিয়েছিল না! টিক দেওয়া জায়গাগুলো দেখিয়ে বলেছিল, সই করতে। ও বলেছিল দেখে সে সই করে দিয়েছিল। একবার চোখ বুলিয়ে দেখারও প্রয়োজন মনে করেনি। ওগুলো কীসের কাগজ ছিল! ও আবার কায়দা করে ডিভোর্সের কাগজে সই করিয়ে নেয়নি তো! চার দিকে যা শুনছি, আমার তো এখন সন্দেহ হচ্ছে…
না। আমি ওকে ছাড়ব না। এর একটা হেস্তনেস্ত করে ছাড়ব। ওর সত্যিই যদি কাউকে মনে ধরে থাকে, তা হলে তাকে নিয়েই থাকুক। আমার কাছে আসতে হবে না। বাবা-মায়ের একমাত্র মেয়ে আমি। তাঁদের অবর্তমানে গোটা বাড়িটাই আমার। আর বাবার যা ফিক্সড ডিপোজিট করা আছে, সে সব তো আমিই পাব। তার সুদে আমার আর আমার ছেলের বাকি জীবনটা খুব ভাল ভাবেই চলে যাবে। দরকার নেই তাকে। ঠিক আছে, দেখি… বলেই, ফোন করেছিল তার মামাতো ভাইকে। সে থাকে পাশের পাড়ায়। ওই এলাকার বেশ হোমড়াচোমড়া। পার্টি করে। সব শুনে সে বলল, কিচ্ছু ভাবিস না, আমি তো আছি। তোকে পরে ফোন করছি।
শময়িতা জানে, ও এই রকমই। পরে ফোন করছি বলেছে মানে ও আর ফোন করবে না। নানা নক্কাছক্কা করে বেড়ায়।
কিন্তু না। তার কিছুক্ষণ পরেই সে ফোন করল। এবং শময়িতাকে কিছু বলতে না দিয়েই বলল, শোন, তুই যে ওর অফিসে ফোন করেছিলি, ওখানে তোর পরিচয় দিসনি তো?
— না।
— ঠিক আছে। ও এলেও ওকে একদম কিচ্ছু বলবি না। ওকে বুঝতেই দিবি না যে, তুই টের পেয়েছিস। বুঝেছিস? ও যখন কাল অফিসে বেরোবে, তার আগে তুই শুধু আমাকে একটা মিস কল করবি, বুঝেছিস? তোকে আর কিচ্ছু করতে হবে না। যা করার আমিই করব। দেখি ওর ক’টা পাখনা গজিয়েছে…

মামাতো ভাইয়ের কথা মতোই কাজ করেছিল শময়িতা। সমস্ত যন্ত্রণা চেপে রেখে রোজকার মতোই ডাইনিং টেবিলে খাবার বেড়ে দিয়েছিল সে। হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে কিছুতেই সামলাতে পারছিল না। এই লোকটাই সে? যে তাকে একদিন ভালবেসে বিয়ে করেছিল! এই-ই সে! বারবার চোখ চলে যাচ্ছিল শ্রয়নের চোখের দিকে।
শ্রয়ন যখন এঁঠো হাত বেসিনে ধুয়ে জামাপ্যান্ট পরার জন্য শোবার ঘরে ঢুকল, শময়িতা তখন পাশের ঘরে গিয়ে রোজকার মতো স্বামীর হাতে তুলে দেবার জন্য রুমাল, পার্স আর চশমাটা নিয়ে, না, মিস কল নয়, চুপিচুপি ফোন করে তার মামাতো ভাইকে খুব চাপা গলায় জানিয়ে দিল, ও এক্ষুনি বেরোচ্ছে।
শ্রয়ন বাড়ি থেকে  বেরিয়ে গলির মুখে এসে টপাটপ বোতাম টিপল মোবাইলের। তার পর দাঁড়িয়ে রইল। সামনে দিয়ে একটা বাস চলে গেল। যেটা ওর অফিসের সামনে দিয়ে যায়। কিন্তু ও তাতে উঠল না। ও ইচ্ছে করলেই একটা কেন, একসঙ্গে দু’-চার-পাঁচটা নতুন গাড়ি কিনতে পারে। কিন্তু মৃত্যুর আগে যেহেতু ওর বাবা বলে গিয়েছিলেন, দ্যাখ, আমাদের তো বাপ-ঠাকুর্দার রেখে যাওয়া টাকার সুদে সংসার চলে। সেই সুদ কিন্তু দিনকে দিন কমছে। ফলে যতটা সুদ আসছে, তার চেয়ে কম খরচ করতে হবে। কিছু কিছু করে সুদের টাকা জমিয়ে মূল টাকার সঙ্গে ফিক্সড করতে হবে। না হলে মহাবিপদ। কারণ, আমার তো মনে হয়, যে হারে সুদ কমছে, সেই দিন আর বেশি দূরে নেই, যে দিন সুদ দেওয়া তো দূরের কথা, নিরাপদে টাকা গচ্ছিত রাখছে বলে ব্যাঙ্কগুলি উল্টে টাকা চাইবে। সুতরাং এখন থেকে সতর্ক হতে হবে। খরচের বহর কমাতে হবে। এক্ষুনি রাশ টানতে না পারলে আর দেখতে হবে না…
সেই কথা মাথায় রেখেই বাবার মৃত্যুর পরে ও খরচ কমাতে শুরু করেছিল। বাড়িতে দু’-দুটো গাড়ি থাকলেও ও ট্রামে বাসেই যাতায়াত করত। যখন চাকরি পেল তত দিনে গাড়ি দুটো পড়ে থেকে থেকে লড়ঝড়ে হয়ে গেছে। কেজি দরেও বিক্রি করা যাবে না। ও আর গাড়ি কেনেনি।
দু’মিনিটও হল না, ওর সামনে একটা ওলা এসে দাঁড়াল। ও সেটায় উঠে পড়ল।
ট্যাক্সিটা স্টার্ট দিতেই ওর পিছু নিল একটা নয়, গলির এ মুখে এবং ও মুখে অপেক্ষা করতে থাকা দু’-দুটো ঝাক্কাস বাইক। দুটো বাইকেই চালক ছাড়াও পিছনে একজন করে ছেলে।
টিভি সেন্টারের সামনে দিয়ে এসে ট্যাক্সিটা লর্ডস বেকারির মোড় থেকে বাঁ দিকে বাঁক নিল। আনোয়ার শাহ রোড ধরে খানিকটা গিয়ে, ডান হাতের লেক গার্ডেন্সের ব্রিজে উঠল। তার পর লেকের ভিতর দিয়ে শরৎ বসু রোড হয়ে এ গলি ও গলির ভিতর দিয়ে একেবারে ভবানীপুরে। আইকোর বিল্ডিংয়ের পিছনে একটা ঝাঁ-চকচকে নতুন আটতলা বাড়ির সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার পর সেই বাড়িটার কারুকাজ করা বিশাল লোহার ফটক দিয়ে সোজা ঢুকে গেল ভিতরে।
এই বাড়িটার নীচেই কার পার্কিং প্লেসের সামনের বেশ খানিকটা জায়গা নিয়ে পার্টি অফিস। সকাল-সন্ধে ভিড় লেগেই থাকে। যত না পাড়ার ছেলে থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে অন্যান্য এলাকার ছেলেরা। এত ভিড় হয়ে যায় যে, কার পার্কিং প্লেসে আর কুলোয় না। ফুটপাতে চেয়ার বিছিয়ে বসে পড়ে। এই সকালবেলাতেই বসে রয়েছে পার্টির তিন-চার জন ছোকরা।
বাইকবাহিনীর কাছ থেকে ফোন মারফত সেই খবর পৌঁছে গেল শময়িতার মামাতো ভাইয়ের কাছে। পৌঁছতেই সে মনে মনে বলল, পেয়েছি ব্যাটাকে। পালাবে কোথায়! আমার হাত থেকে ওর আর নিস্তার নেই। ওকে একেবারে হাতেনাতে ধরব। ভেবেই, বাইকের চার জনকে ওখানে পাহাড়ায় থাকতে বলে শময়িতার বাড়ি থেকে শময়িতাকে তার সদ্য কেনা অল্টোয় তুলে সোজা হাজির হল সেখানে।
পার্টি অফিসের সামনে যে ছোকরাগুলো বসে ছিল, তাদের প্রায় সকলেই শময়িতার মামাতো ভাইকে চেনে। তাকে গাড়ি থেকে নামতে দেখেই তারা এগিয়ে গেল। উনি তখন শময়িতার মোবাইলে তোলা শ্রয়নের ছবিটা দেখিয়ে ওদের কাছে জানতে চাইল, এই লোকটাকে কি তোমরা চেনো?
ওরা ‘চিনি’ বলতেই শময়িতার মামাতো ভাই বলল, এই লোকটা কি এখানে রোজই আসে?
ওদের মধ্যে থেকে একজন বলল, রোজ নয়, তবে প্রায়ই আসে। কেন বলুন তো? কোনও লাফড়া হয়েছে নাকি?
সে কথায় উত্তর না দিয়ে মামাতো ভাই উল্টে প্রশ্ন করল, কার কাছে আসে?
ওদের মধ্যে থেকে অন্য জন বলল, কার কাছে আবার? উনি ওনার নিজের ফ্ল্যাটে আসেন।
— নিজের ফ্ল্যাট! চমকে উঠল শময়িতা। তার পরেই কী মনে হতে, নিজের মনেই বলল, বুঝেছি, তার মানে নতুন কোনও সংসার পেতেছে এখানে! ঠিক আছে, দেখাচ্ছি মজা…
মামাতো ভাই ওদের কাছে ফের জানতে চাইল, উনি কি এখানে ফ্ল্যাট কিনেছেন নাকি ভাড়া নিয়েছেন?
— না না। ভাড়া না। ভাড়া নিলে তো আমরা জানতাম। উনি কিনেছেন। তাও তো প্রায় পাঁচ-ছ’মাস হয়ে গেছে। তবে যত দূর জানি উনি রাতে থাকেন না। ওনার নাকি অন্য জায়গাতেও বাড়ি আছে।
উদ্বিঘ্ন হয়ে শময়িতা জিজ্ঞেস করল, সঙ্গে কে থাকে?
ছেলেগুলো কিছু বলতে যাবার আগেই মামাতো ভাই বলল, সে যে-ই থাকুক না কেন, অফিসে না গিয়ে ও যখন এখানে এসেছে, তখন নিশ্চয়ই সে আছে। তোমরা জানো ও কোন ফ্লোরে থাকে?
— হ্যাঁ হ্যাঁ, ফাস্ট ফ্লোরে।
— চলো তো…

ওরা যখন বাড়ির ভিতরে ঢুকে লিফটের জন্য অপেক্ষা না করেই সিঁড়ি দিয়ে তরতর করে উঠছে, তখন নিজের মনেই বিড়বিড় করতে লাগল শময়িতা, এই জন্যই কিছু দিন ধরে দেখছি, ও আমাকে এড়িয়ে চলছে। রাত করে বাড়ি ফিরছে। তার মানে…
দোতলায় উঠে কলিংবেল টিপছে তো টিপছেই। বারবার টেপাতেও না খোলায় মামাতো ভাইয়ের নির্দেশে ওই ছোকরাগুলো দরজা ধাক্কানো শুরু করল। শুরু করল হাঁক পেড়ে ডাকাডাকি। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে এ ফ্ল্যাটের ও ফ্ল্যাটের লোকেরা দরজা খুলে বেরিয়ে এলেন। জানতে চাইলেন, কী হয়েছে?
অনেকক্ষণ পরে অবশেষে যে লোকটা লুঙ্গি পরে ঘুম-জড়ানো চোখে দরজা খুলে বেরিয়ে এল, সে আর কেউ নয়, শময়িতার স্বামী— শ্রয়ন। ঘুমের ঘোরেই সে জিজ্ঞ়়েস করল, কে?
শময়িতা বলল, আমি।
শময়িতার গলা শুনে যেন চারশো চল্লিশ ভোল্টের শক খেল সে। মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল তার ঘুম। কেন? কী হয়েছে? প্রশ্ন করতে যাওয়ার আগেই প্রায় ধাক্কা মেরে শ্রয়নকে সরিয়ে ঘরের ভিতরে ঢুকে গেল ও। এ ঘর ও ঘর সে ঘর দেখল। না। তিনটে বড়় ঘরের একটাতেও কেউ নেই। কেউ কেন, ঘরে কোনও আসবাবও নেই।
থাকার মধ্যে আছে শুধু একটা ঘরে ব়়ড় একটা আনকোরা খাট। তাতে আরও আনকোরা নরম তুলতুলে বিছানা। পলিথিনের মোড়ক অবধি খোলা হয়নি। এক পাশে গুটিয়ে রাখা তোষক। আর দু’দিকে ছড়িয়ে আছে মাথায় দেওয়ার দুটো বালিশ। একটা কোল বালিশও।
খাটের নীচ-টিচ ভাল করে দেখে, কাউকে না পেয়ে ও দিকের করিডরে গিয়ে উঁকি মেরে শময়িতা দেখার চেষ্টা করল, কলিংবেল আর চিৎকার চেঁচামেচি শুনে কেউ ও দিক থেকে পালিয়েছে কি না। না। সে সুযোগ নেই। কাউকে কেন, অন্য কারও কোনও চিহ্নই যখন ও খুঁজে পেল না, তখন শ্রয়নের  মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ও জিজ্ঞেস করল, সে কোথায়?
শ্রয়ন অবাক হয়ে জানতে চাইল, কে?
— কে বুঝতে পারছ না? যাকে নিয়ে এখানে সংসার পেতেছ, সে।
— সংসার!
— আকাশ থেকে পড়ছ, না? এই তো এরা আছে… বলেই, ওই বাড়ির নীচ থেকে যে ছোকরাগুলো তাদের সঙ্গে গিয়েছিল, তাদের দিকে তাকিয়ে শময়িতা বলল, এই, তোমরা বলো তো এর সঙ্গে কে থাকে…
ছোকরাগুলো এ ওর মুখের দিকে চাওয়াচাওয়ি করতে লাগল। সেটা দেখে শময়িতা বলল, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তোমরা বলো।
ওরা একটু ভ্যাবাচেকা খেয়ে বলল, কই, কেউ না তো…
— তা হলে কি উনি এখানে একা থাকেন?
— হ্যাঁ, তাই-ই তো দেখি।
— এটা আমাকে বিশ্বাস করতে হবে? যার অত বড় বাড়ি। বাড়িতে অতগুলো ঘর। একটু খড়কুটো পর্যন্ত নাড়তে হয় না। চাওয়ামাত্র হাতের সামনে সব কিছু পেয়ে যায়। ও সব ছেড়েছুড়ে সে এখানে একা থাকার জন্য আসে?
এতক্ষণ চুপচাপ ছিল শ্রয়ন। এ বার মুখ খুলল সে— আসে। তোমার মতো বউয়ের হাত থেকে বাঁচার জন্য আসে।
— আমার মতো বউ মানে? আমি কী করেছি?
— কী করেছ জানো না? কোনও দিন শান্তিতে একটু ঘুমোতে দিয়েছ?
মামাতো ভাই বলল, ঘুমের সঙ্গে এখানে থাকার সম্পর্ক কী?
— আমি এখানে ঘুমোতে আসি।
— ঘুমোতে!
শ্রয়ন বলল, হ্যাঁ, ঘুমোতে।
— কিন্তু ওরা যে বলল, এটা তোমার ফ্ল্যাট?
— না। আমার না।
মামাতো ভাই জিজ্ঞেস করল, তা হলে কার?
— আমার ছেলের।
শময়িতা যেন আকাশ থেকে পড়ল। ছেলের? মানে? বাবাই জানে?
— না।
মামাতো ভাই ফ্ল্যাটের চার দিকে তাকিয়ে বলল, এটার দাম তো মনে হয় কোটি টাকার নীচে হবে না…
— আমি কি একবারও বলেছি কোটি টাকার কম?
শময়িতা বলল, এত টাকা তুমি কোথায় পেলে?
— দেশের ওই চাষের জমিগুলো আর রাখা যাচ্ছিল না। যে কোনও সময় দখল হয়ে যেত। তাই তুমি বারবার করে বলেছিলে দেখে ওগুলো বিক্রি করে দিয়েছি।
শময়িতা বলল, অতখানি জমি বিক্রি করে দিয়েছে? সেটা দিয়ে তুমি মাত্র তিন কামরার এইটুকু একটা ফ্ল্যাট কিনেছ?
— না। সব টাকা দিয়ে কিনিনি। বাকি টাকা ছেলে আর তোমার নামে ফিক্সড করে দিয়েছি। মনে নেই, তোমাকে দিয়ে সে দিন কতগুলো কাগজে সই করালাম? তুমি তো উল্টেও দেখলে না কীসে সই করছ। অন্ধের মতো সই করে দিলে। ওগুলো ছিল ব্যাঙ্কের ফিক্সড ডিপোজিটের কাগজ।
এটা শুনে শময়িতার দিকে তাকাল মামাতো ভাই। শময়িতা বলল, সেটা তো আমাকে আগে বলতে পারতে। ঠিক আছে, চলো।
— কোথায়?
— বাড়িতে।
— না। আমি যাব না।
— কেন?
— ঠিক আছে, আমি যেতে পারি। তবে একটা শর্তে।
— কী শর্ত?
— ঘুমোবার সময় আমাকে আর কখনও বিরক্ত করবে না…
— আর? মাথা খারাপ? একদম বিরক্ত করব না।
মামাতো ভাই বলল, তা হলে এই ফ্ল্যাটটা?
এই বাড়ির নীচ থেকে যে ছোকরাগুলো তাদের সঙ্গে এসেছিল, তাদের একজন বলে উঠল, এটা ছেড়ে দিলে আমাদের বলবেন দাদা, যে দামে কিনেছেন, তার থেকে অন্তত দশ লাখ টাকা বেশিতে বিক্রি করিয়ে দেব।
শময়িতা মুচকি হেসে বলল, সে তো বলবই। তবে মনে হয় না, আমাদের বিক্রি করার কোনও দরকার হবে। বলেই, ফ্ল্যাটের দরজায় তালা লাগিয়ে সবার সঙ্গে শময়িতাও নীচে নেমে এল। মনে মনে বলল, সত্যি, ঘুমোনোর জন্য যে কেউ এ রকম একটা ফ্ল্যাট কিনতে পারে, বাপের জন্মে শুনিনি। সত্যি কার পাল্লায় পড়েছি আমি। রক্ষে করো ঠাকুর। রক্ষে করো।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত