| 19 এপ্রিল 2024
Categories
নারী

সমাজ যৌনতার বাইরে নারী-পুরুষ সম্পর্ক ভাবতে শেখেনি

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট
অন্বেষা বন্দ্যোপাধ্যায়
 
টলমল পায়ে ঐশিক সবে ইস্কুলে যেতে শুরু করেছে। দু’এক জন করে বন্ধুও হচ্ছে। তারা সকলেই মেয়ে। ছেলেদের সঙ্গে ঐশিকের মোটেই বনছে না। ছেলের এই অবস্থা দেখে মা-বাবা, আত্মীয়রা তো হেসে কুটোপাটি। ভাবখানা — দেখেছ কেমন মেয়েদের সঙ্গেই বন্ধুত্ব করছে। এখনই এত্ত মেয়ে বন্ধু!’
 
নার্সারি বা একটু জুনিয়র ক্লাসের বাচ্চাদের আত্মীয়ের মধ্যে এই ধরনের কথোপকথন কান পাতলেই শোনা যায়। এতে তাঁদের কোনও দোষ দেওয়া যায় না। কারণ আমাদের সমাজের বাঁধুনিটাই যে এ রকম। ছোটবেলা থেকেই ‘বন্ধু’র বদলে মেয়ে বন্ধু-ছেলে বন্ধু মাথার মধ্যে গেঁথে দেওয়া হয়। সে জন্য ছেলেমেয়েকে পাশাপাশি হাঁটতে দেখলে বা একসঙ্গে বসে কোথাও আড্ডা মারতে দেখলে বা খেতে দেখলে — সহজেই তা হয়ে ওঠে ‘প্রেম’, আর বিবাহিত হলে ‘পরকীয়া।’ সে কথাই বললেন হলদিয়া গভার্নমেন্ট কলেজের সমাজতত্ত্বের শিক্ষিকা ও বন্ধুত্ব নিয়ে গবেষণা করা অনন্যা চট্টোপাধ্যায়।
 
তাঁর কথায়, ‘ছেলেমেয়ের অবাধ মেলামেশা যে থাকতে পারে, ভেঙে বলতে গেলে যৌনতার বাইরেও যে একজন নারীর সঙ্গে এক জন পুরুষের সম্পর্ক থাকতে পারে ও তা নিখাদ বন্ধুত্বের, সেই জায়গাটাই এখনও সমাজ গ্রহণ করতে শেখেনি। তাই শিশু মনেও এই পুরোনো ধ্যানধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।’ মনোবিদ শাওনি বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে, ‘বন্ধুত্ব স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক — এই প্রশ্ন যখন উঠছে তখন নিশ্চিত করা দরকার ‘বন্ধুত্ব’র কাম্য সংজ্ঞা। নিজের মনে এর একটা পরিচ্ছন্ন উত্তর থাকা প্রয়োজন।’
 
 
 
কিন্তু কেন নারী-পুরুষের বন্ধুত্ব নিয়ে সব সময়ই এই তির্যক দৃষ্টিভঙ্গি? নারী অধিকার কর্মী ও অধ্যাপক শাশ্বতী ঘোষ মনে করছেন, ‘যুগ যুগ ধরেই বলা হচ্ছে ঘি আর আগুন একসঙ্গে থাকতে পারে না। মেয়েরা ঘি ও ছেলেরা আগুন। সেটাই আমাদের সমাজের মননে গেঁথে গেছে। তাই কৃষ্ণের সঙ্গে কৃষ্ণার যে অসাধারণ সুন্দর বন্ধুত্ব তা আমরা গ্রহণ করতে পারি না।’
 
কালনায় ‘পুরুষ’ বন্ধু নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তাতে অবশ্য অবাক নন কেউ-ই। শাশ্বতী-শাওনি-অনন্যারা মনে করছেন, যুগ যুগ ধরে চলে আসা Heteronormative assumptions বহু মানুষের মনে প্রায়ই অন্যরকম সন্দেহের উদ্রেক ঘটায়। শাওনির মতে, ‘প্রাপ্ত বয়সের কোনো নারী বা পুরুষ, যিনি বিষমকামী, তিনি অপর লিঙ্গের কারোর প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ না করেও তাঁকে স্রেফ ভালোবাসবেন বা পছন্দ করবেন — এ ধারণা বহু মানুষ আজও মন থেকে মেনে নিতে পারেন না। সামাজিক কাঠামো, gender role expectation এর জন্য অনেকটাই দায়ী। তবে, শুধু ভারত নয়, এই ধারণা পাশ্চাত্যেও বর্তমান।’
 
শাশ্বতী যোগ করলেন, ‘বিয়ের পর থেকে স্ত্রী সম্পত্তি — এটাই রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তাই স্বামী ‘অ্যালাউ’ করছেন কি না তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মানে স্বামী যদি অন্য পুরুষের সঙ্গে কথা বলতে দেন, তা হলেই স্ত্রী তা বলতে পারবেন। এমনকী ২০১৫-১৬র ফ্যামিলি হেল্থ সার্ভেতে উঠে এসেছে স্বামীর ‘অ্যালাউ’ করার প্রশ্ন, তাতেই তো স্পষ্ট কতটা গভীরে এর শিকড়।’
 
 
 
তা হলে কি ২০২০ তেও এই ভুল ধারণার বশবর্তী হয়ে থাকবেন সকলে? শাওনি মনে করছেন, মানসিক rigidity থেকে বেরোতে পারলে gender রোল সম্পর্কে নিজের অবচেতনের ধারণাগুলিকে বদলানো সম্ভব। বললেন, ‘বন্ধুত্ব থেকে প্রেমের শুরু হতেই পারে, তবে না হওয়াকেও সমান চোখেই দেখা প্রয়োজন। নারী ও পুরুষ যৌনসঙ্গী হতে পারে বলেই তাঁদের একমাত্র সংযোগের কারণ কেবল সেটাই হবে, এ ধারণা অত্যন্ত অপরিণত।’ পাশাপাশি তিনি জোর দিলেন, সামাজিক দায়বদ্ধতাকও। বললেন, ‘প্রিন্ট বা অডিও-ভিস্যুয়াল মিডিয়াতে নারী ও পুরুষের ‘বন্ধুতা’ কে কোনো ‘পরিণতি’ দেওয়ার অতি প্রচলিত চেষ্টাকেও প্রশ্ন করা উচিত।’
 
তাই পরিশেষে বলাই যায়, সমাজের এই বস্তাপচা চিন্তাকে ছুড়ে ফেলে, মুক্ত মনে ছেলে-মেয়েকে নিজেদেরই এগিয়ে আসতে হবে। তা হলেই গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠবে লিঙ্গ নির্বিশেষে নারী-পুরুষ বন্ধুত্ব।
কৃতজ্ঞতা: এইসময়

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত