Something about Antonio Gramsci's Russian Revolution

আন্তোনিও গ্রামশির `রুশ বিপ্লব নিয়ে কিছু কথা’

Reading Time: 8 minutes

ভূমিকা ও তর্জমা : বিধান রিবেরু

ভূমিকা

ইতালির মার্কসবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনীতিবিদ আন্তোনিও ফ্রান্সেসকো গ্রামশি এই লেখাটি লিখেছিলেন রাশিয়ায় ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে যে বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব সংঘটিত হয় সেটির পরিপ্রেক্ষিতে। লেখাটি ইতালির একটি পত্রিকা ‘ইল গ্রিদো দেল পোপোলো’ বা ‘জনতার চিৎকারে’ প্রকাশ হয় ঐ বছরেরই ২৯ এপ্রিল। লেখার নিচে আন্তোনিও গ্রামশির পুরো নাম লেখা ছিলো না, ছিলো শুধু নামের অদ্যাক্ষর। এই নাতিদীর্ঘ নিবন্ধটি ছিলো ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের উপর গ্রামশির করা প্রথম মন্তব্যধর্মী লেখা।

আমরা জানি, রাশিয়ায় রাজতন্ত্র, স্বৈরশাসন, দুর্নীতি, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ, যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক সৈনিকের মৃত্যু, খাদ্যের সঙ্কট, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি সব মিলিয়ে অতিষ্ঠ জনগণ ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ফুঁসে ওঠে। যার শুরুটা হয়েছিলো পেত্রগ্রাদে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ২৩ ফেব্রুয়ারি (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারে ৮ মার্চ) আন্তর্জাতিক নারী দিবসে ধর্মঘট ও বিক্ষোভ প্রদর্শনের মধ্য দিয়ে। এরপর ২৪ ফেব্রুয়ারি দুই লক্ষ শ্রমিক ধর্মঘটের ডাক দেয়, যা পরের দিন থেকে সাধারণ ধর্মঘটে পরিণত হয়। রাজপথে বিক্ষোভকারী ও পুলিশের মধ্যে সংঘর্ষ বাধে। ২৬ তারিখ শহর রক্তাক্ত হয়, প্রাণ যায় দেড় শতাধিক আন্দোলকারীর। ‘বিপ্লবী সৈন্যবাহিনী এবং জনগণের মধ্যে ভ্রাতৃসুলভ মিলন’—সৈনিকদের এই আহ্বান জানিয়ে বলশেভিকরা প্রচারপত্র বিলি করে। এরইমধ্যে ২৭ ফেব্রুয়ারি পেত্রগ্রাদ রক্ষী সেনাদল যোগ দেয় বিপ্লবীদের দলে। সেদিনই বলশেভিক পার্টি একটি ইশতেহার প্রচার করে, যেখানে জারতন্ত্রের উচ্ছেদ ও অস্থায়ী বিপ্লবী সরকার গঠনের আহ্বান জানানো হয়। ২৭ ফেব্রুয়ারির সন্ধ্যা নাগাদই রাজধানী চলে আসে বিপ্লবীদের পক্ষে— শ্রমিক, সৈন্য ও নাবিকদের হাতে। পেত্রগ্রাদের এমন বেহাত হওয়ায় পরের দিন ২৮ ফেব্রুয়ারি মস্কোও চলে যায় বিপ্লবী জনতার কব্জায়। পেত্রগ্রাদ ও মস্কোয় জনতার এমন উত্থান মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে দেয় পুরো রাশিয়ায়।

শ্রমিক, সেনা ও কৃষকের এই বিপ্লবী রূপ দেখে ভয় পেয়ে ক্ষমতা ছেড়ে অস্থায়ী সরকার গঠন করতে বাধ্য হন জার দ্বিতীয় নিকোলাস। জনগণের চাপে পটপরিবর্তনের এই ঘটনাই ফেব্রুয়ারি বিপ্লব নামে পরিচিত, যা ঐ বছরই অক্টোবর বিপ্লবের ভিত্তিভূমি ও অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। ফেব্রুয়ারির বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবকে লেনিনের নেতৃত্বে বলশেভিকরা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবে পরিণত করেছিলো অক্টোবরে। সুইজারল্যান্ডে দীর্ঘ দশ বছরের নির্বাসন কাটিয়ে এপ্রিলে লেনিন রাশিয়াতে এসে জনগণকে তিনটি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন—শান্তি, রুটি ও ভূমি—যুদ্ধের পরিবর্তে শান্তি আসবে, খাদ্যের সঙ্কট দূর হবে, আর ভূমির হবে সুষম বন্টন। মানুষ আস্থা রেখেছিলো লেনিন তথা বলশেভিকদের উপর। লেনিনের প্রত্যাবর্তনের মাসে, অর্থাৎ এপ্রিলেই গ্রামশি ইতালিতে বসে বলেছিলেন ফেব্রুয়ারির ঐ বিপ্লব সর্বহারার বিপ্লব। এবং এটি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকেই ধাবিত হবে। গ্রামশি বলছেন, এই বিপ্লবের চরিত্র ফরাসি বিপ্লবের (১৭৮৯-৯৯) চেয়ে আলাদা। আর বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে রুশ বিপ্লব কোনভাবেই ফ্রান্সের তৎকালের চরমপন্থী ও বৈপ্লবিক রাজনৈতিক সংঘ জ্যাকোবিন ক্লাবের মতো নয়। রাশিয়ায় দীর্ঘদিন ধরে জমতে থাকা চাপা ক্ষোভ থেকে সমাজের ভেতরে ভেতরে যে পরিমাণগত পরিবর্তন ঘটেছিলো, তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে এই ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের মাধ্যমে, সে কারণেই গুণগত একটি পরিবর্তন পরিলক্ষিত হয় সেসময়। সেটাকে চিহ্নিত করতে ভুল করেননি গ্রামশি। সেই পরিবর্তন শুধু জারকেই বিদায় দেয়নি, বিদায় করেছিলো সমাজে প্রচলিত ও বিদ্যমান অনেক কিছুকেই। নীতিনৈতিকতার এক অন্য মাত্রা যোগ করেছিলো এই বিপ্লব। যার পরিণতি আমরা পরে অক্টোবরে দেখতে পাই।

আলোচ্য নিবন্ধে গ্রামশি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব আসন্ন। নিবন্ধের একজায়গায় তিনি বলছেন, “এই [ফেব্রুয়ারি] রুশ বিপ্লব কেবল সর্বহারাদের একটি ঘটনা নয়, তারচেয়েও বেশি কিছু, এটি সর্বাহারাদের পদক্ষেপ, যা স্বাভাবিকভাবেই সমাজতান্ত্রিক আমলে ধাবিত হতে বাধ্য।” বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব যে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দিকে গড়াচ্ছে সেটা কোনো দৈবগুণে গ্রামশি দেখতে পাননি, ইতিহাসকে নিবিড় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন সর্বহারাদের জয় আসন্ন। কারণ রাশিয়ায় উনবিংশ শতাব্দীর শেষ প্রান্ত থেকে যেভাবে কলকারখানা গড়ে উঠছিলো, সেটার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে যেভাবে শ্রমিকের সংখ্যা বাড়ছিলো, বাড়ছিলো শ্রমিকদের অসন্তোষ, তার প্রথম বহিঃপ্রকাশ ঘটে পরের শতাব্দীতে এসে, ১৯০৫ সালে।  এই বছরেই রুশ বিপ্লবের সূচনা হয়। এটার পেছনেও একটি বড় কারণ ছিলো যুদ্ধ, রাশিয়া ও জাপানের মধ্যে। বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ঝঞ্ঝামুখর রাশিয়ায় বারবারই শ্রমিকরা পথে নেমেছে, সংঘর্ষে প্রাণ হারিয়েছে। এই ঘটনাগুলো কিসের ইঙ্গিত বহন করছে তা ঠিকই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন গ্রামশি। এই অনুমান আরো জোরালো হয় ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের সময় ঘটে যাওয়া একটি ঘটনা দেখে— জেলখানার কয়েদীদের আচরণ। গ্রামশি ঘটনাটিকে নির্দেশক হিসেবে হাজির করেন লেখায়। সেখানে তিনি বলেন, বিপ্লবের কারণে কারামুক্ত হওয়ার পরও সাধারণ কয়েদীরা স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠেনি। সৎ থেকেছে। পরিশ্রম করে ভবিষ্যৎ জীবন নির্বাহ করার অঙ্গীকার করেছে। সমাজের এই পরিবর্তন হুট করে আসেনা, সেটি গ্রামশি বোঝেন। তাই স্পষ্ট করেই তিনি ঘোষণা দেন, এই পরিবর্তন আরো বৃহত্তর পরিণতির দিকে যাবে।

আরো একটি বিষয় গ্রামশি লক্ষ্য করেছিলেন, সেটি হলো ফেব্রুয়ারিতে শ্রমিক ও জনতা যে বিপ্লব করলো, সেই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় কিন্তু আরেক জার বা স্বৈরশাসক আসেনি। বরং একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হলো, নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ও সাংবিধানিক সভা গঠন করার লক্ষ্যে। গেওর্গি লোভবের অন্তবর্তীকালীন সরকার পরে যে রাজতন্ত্রের আজ্ঞাবহ হয়ে ওঠে, আস্থা হারায় জনগণের সেসব কথা গ্রামশির কথায় আসেনি। আসার অবশ্য সুযোগও ছিলো না। তারপরও ইতালির এই চিন্তাবিদের লেখাটিকে বলা যায়, ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর, অক্টোবর বিপ্লবের আগে রুশ সমাজে যে পরিবর্তন সাধিত হচ্ছিলো সেটির উপর একটি তড়িৎ ও গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন।  

তবে অক্টোবরের ২৫ তারিখ (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৭ নভেম্বর)সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, অর্থাৎ সর্বহারা-শ্রমিক-কৃষক-জনতার বলশেভিক পার্টির জয়ের প্রায় দুই মাস পর গ্রামশি আরেকটি ছোট প্রবন্ধ লেখেন ‘‘পুঁজি’র বিরুদ্ধে বিপ্লব’ শিরোনামে, যেটি প্রকাশ হয় ২৪ ডিসেম্বর (গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার) ‘আভান্তি!’ বা ‘এগিয়ে চলো’ পত্রিকায়। সেখানে তিনি রুশ বিপ্লবে রাশিয়ার জনগণ কেন জয়লাভ করেছে সেটা সংক্ষেপে ব্যাখ্যা করার পাশাপাশি এটাও বলেন, কার্ল মার্কসের ‘পুঁজি’ বইটির বিরুদ্ধেই বিপ্লব করেছে বলশেভিকরা।

গ্রামশি বলছেন, রাশিয়াতে মার্কসের বইটি যতটা না সর্বহারাদের কাছে পরিচিত ছিলো, তারচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলো বুর্জোয়া মহলে। তাছাড়া সর্বহারারা ‘মার্কসবাদী’ হতে যায়নি, বরং মার্কসের চিন্তাকে নিজেদের জীবনযাপনে পরিণত করেছিলো। মার্কসের বক্তব্যের যে সারকথা, সেটাকে তারা ধারণ করেছে ও প্রয়োগ করেছে। মার্কসের বক্তব্য অনুযায়ী ইংল্যান্ডে আগে বিপ্লব হবে, এই কথায় আস্থা রেখে রুশ বিপ্লবীরা হাত-পা গুটিয়ে রাখেনি। তারা প্রতিনিয়ত শ্রেণীবিভক্ত সমাজে সর্বহারাদের অধিকার আদায়ে সোচ্চার প্রতিবাদ করে গেছে। যুদ্ধ ও রাজশাসনের জাতাকলে পড়ে রুশ জনগণ স্বভাবতই বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে পেরেছিলো। সেই অনুভূতিকে আরো গাঢ় করেছে সমকালের বিপ্লবী রাজনীতি। বিপ্লব পরবর্তী এই দ্বিতীয় রচনায় গ্রামশি আশা প্রকাশ করে বলছেন, বিপ্লবীরা কম সময়ের মধ্যেই নিজেদের পরবর্তী লক্ষ্য ঠিক করে নেবে। আর সেটা বুর্জোয়াদের চেয়ে দ্রুত গতিতে হবে। কারণ হিসেবে গ্রামশি বলছেন, এতোদিন ধরে বিপ্লবীরা যে বুর্জোয়াদের ভুলত্রুটির সমালোচনা করছিলো, সেগুলো তারা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে পারবে, অতিক্রম করতে পারবে অতীতের ব্যর্থতা। রুশ বিপ্লব সম্পর্কে এসব মন্তব্য যখন করছেন গ্রামশি, তখন তাঁর বয়স ২৭ বছর অতিক্রম করেছে। ত্রিশের আগেই গ্রামশি নিজের দেশে একজন গুরুত্বপূর্ণ বিপ্লবী নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান।   

ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন গ্রামশি। তিনি জন্ম নেন ১৮৯১ সালের ২২ জানুয়ারি। তাত্ত্বিক দুনিয়ায় নয়া মার্ক্সবাদী ধারার পুরোধা ব্যক্তি গ্রামশির উল্লেখযোগ্য একটি অবদান হলো তিনি সাংস্কৃতিক আধিপত্য (cultural hegemony) বিষয়ক ধারণাকে স্পষ্ট করে তুলে ধরেছিলেন। সেখানে তিনি দেখিয়েছেন পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থায় কেমন করে শাসক শ্রেণী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিজেদের স্বার্থে কাজে লাগায়, সাধারণ মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তার করে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯২৬ সালের ৯ নভেম্বর গ্রামশিকে কারারুদ্ধ করেছিলো বেনিতো মুসোলিনির ফ্যাসিবাদী সরকার। কুড়ি বছর কারাগারেই কেটেছে তাঁর। সেখানে থাকাকালে শরীরের অবনতি ঘটে। পরে ১৯৩৭ সালের ২৭ এপ্রিল প্রচণ্ড অসুস্থ্য অবস্থায় মারা যান তিনি। কারাগারে প্রতিকূল অবস্থার মধ্যেই গ্রামশি ইতিহাস ও রাজনীতি নিয়ে বিভিন্ন অন্তর্দৃষ্টি সম্পন্ন লেখা লিখেছেন। পরে সেগুলোর সংকলন ‘প্রিজন নোটবুকস’ নামে বেরিয়েছে। এই গ্রন্থটিকে ধরা হয় বিংশ শতাব্দীর রাজনৈতিক তত্ত্বের এক উঁচুদরের মৌলিক কাজ হিসেবে।

অনুবাদের জন্য বর্তমান নিবন্ধটি নেয়া হয়েছে গ্রামশির রাজনৈতিক রচনার একটি সংকলন থেকে। বইটির নাম: ‘সিলেকশন ফ্রম পলিটিকাল রাইটিংস (১৯১০-১৯২১)’। ক্যুইনটিন হোরে সম্পাদিত বইটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন জন ম্যাথ্যুজ। ১৯৭৭ সালে নিউ ইয়র্ক থেকে বইটি বের করেছে ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশার্স।

দোহাই

১. Antonio Gramsci, Selections from Political Writings 1910-1920, edited by Quintin Hoare, translated by John Mathews, International Publisher, 1977 , New York.

২. (লেখকের নাম নেই), সোভিয়েত ইউনিয়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, বিদেশী ভাষায় সাহিত্য প্রকাশালয়, (প্রকাশের সাল নেই), মস্কো।

৩.Antonella Salomoni, Lenin and the Russian Revolution, Translated by David Stryker, Interlink Books, 2004, Massachusetts.

……………………………………………………………………

AG

রুশ বিপ্লব কেন প্রোলেতারিয়ো বা সর্বহারাদের বিপ্লব? কাগজপত্র পড়ে, কাটছাটের পর ছাড় পাওয়া প্রকাশিত বিভ্রান্তিকর প্রতিবেদন দেখে, এই প্রশ্নের উত্তর জানা কষ্টকর। আমরা জানি, প্রোলেতারিয়েত বা সর্বহারারাই (শ্রমিক ও সেনাসদস্য) বিপ্লব সম্পন্ন করেছে, আমরা এও জানি, শ্রমিকদের প্রতিনিধি সম্বলিত একটি পর্ষদের অস্তিত্ব রয়েছে, যাদের কাজ হলো প্রতিদিনকার বিষয়াদি দেখভাল করা প্রশাসনিক বিভিন্ন অঙ্গের কার্যক্রম নজরদারি করা। কিন্তু এটাই কি যথেষ্ট সর্বহারাদের করা বিপ্লবকে সর্বাহারা বিপ্লব বলার জন্য? সর্বহারা লোকজন যুদ্ধটাও করেছে, কিন্তু সেটাও নয়, শুধু সেটার জন্যও ওই ঘটনাকে সর্বহারার বিপ্লব বলা যাবে না। সর্বহারার হয়ে ওঠার জন্য, অন্য, আত্মিক ব্যাপার উপস্থিত থাকা চাই। ক্ষমতার প্রশ্নের চেয়ে বিপ্লবে আরো কিছু থাকতে হয়: সেখানে নৈতিকতার প্রসঙ্গ থাকতে হয়, জীবনযাপনের ধরনের বিষয়টিও থাকতে হয়। বুর্জোয়া সংবাদপত্রগুলো ক্ষমতার দিকটিকেই বেশি জোর দিয়ে দেখেছে। সেসব পত্রিকা আমাদের বলেছে কিভাবে একটি স্বৈরতান্ত্রিক ক্ষমতা অন্য একটি ক্ষমতার দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়েছে, অবশ্য এখনো সেটি পরিষ্কার করে ব্যাখ্যা করা হয়নি, তবে তাদের প্রত্যাশা এটি বুর্জোয়া শক্তিই হবে। আর এর সঙ্গে সঙ্গে তারা সমান্তরাল রেখাও টেনে দিয়েছে: রুশ ও ফরাসি বিপ্লবের মধ্যে, দুই বিপ্লবের মধ্যে একই রকম ঘটনা খুঁজে পেয়েছে তারা। অথচ মাত্র একটি ক্ষেত্রেই দুটি ঘটনার মিল পাওয়া যায়, একটি সহিংসতার সঙ্গে যেমন আরেকটি সহিংসতার, অথবা একটি ধ্বংসের সঙ্গে যেমন আরেকটি ধ্বংসের মিল পাওয়া যায়, তেমন।

আমরা, যাহোক, বুঝতে পারি এই রুশ বিপ্লব কেবল সর্বহারাদের একটি ঘটনা নয়, তারচেয়েও বেশি কিছু, এটি সর্বহারাদের পদক্ষেপ, যা স্বাভাবিকভাবেই সমাজতান্ত্রিক আমলে ধাবিত হতে বাধ্য। কম সংখ্যক বাস্তব, সারগর্ভ খবর দিয়ে এই ঘটনার সম্পূর্ণ প্রমাণ পাওয়া যাবে না। তবে সমাজতন্ত্রের দিকে যাত্রার সপক্ষে কিছু নির্দিষ্ট প্রকৃত তথ্য পাওয়া যাবে।

এই রুশ বিপ্লবের সঙ্গে জ্যাকোবিনবাদের কোনো যোগ নেই। বিপ্লবে স্বৈরতন্ত্রকে গুড়িয়ে দিতে হয়—কিন্তু সহিংসতা ব্যবহার করে জনগণের অধিকাংশকে গুঁড়িয়ে দেয়ার কোনো দরকার নেই। জ্যাকোবিনবাদ একটি বিশুদ্ধ বুর্জোয়া প্রপঞ্চ: এটি ফরাসি বুর্জোয়া বিপ্লবকে একটি চরিত্র দিয়েছে। বিপ্লব ঘটানোর পর বুর্জোয়াদের আর কোন বৈশ্বিক কর্মসূচী ছিলো না। এটি আপনাআপনিই নিজেকে কিছুদূর নিয়ে যায়, নির্দিষ্ট শ্রেণী স্বার্থেই, সেই একচোখা নীতির যারা অনুসারী, মুষ্টিমেয় ও নিচু মানসিকতার, তাদের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটে। বুর্জোয়া বিপ্লবে সহিংসতার দুই ভাজের বৈশিষ্ট্য আছে: এটি পুরনো রীতিকে ভাঙে, আর নতুনটাকে চাপিয়ে দেয়। এই বিপ্লব নিজের ক্ষমতা ও এর ভাবনা আগের প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণীর উপরই শুধু নয়, লোকজন, যাদেরকে ভবিষ্যতে শাসন করা হবে, তাদের উপরও চাপিয়ে দেয়। এটি এক স্বৈরাচারী আমল দিয়ে আরেক স্বৈরাচারী আমলের প্রতিস্থাপন।

রুশ বিপ্লব এই কর্তৃত্ববাদকেই নস্যাৎ করেছে, আর প্রতিস্থাপিত করেছে সর্বজনীন সমর্থনের দ্বারা, যা বিস্তৃত হয়েছে নারীদের পর্যন্তও। কর্তৃত্ববাদকে সরিয়ে বিপ্লব সেখানে বসিয়েছে মুক্তিকে, সর্বজনীন চেতনার মুক্তকণ্ঠের সংবিধানকে। কেন রুশ বিপ্লব জ্যাকোবিনদের মতো নয়— অন্য ভাবে বললে, তারাও কেন একজনের স্বৈরশাসনের বদলে উদ্ধত সংখ্যালঘুর স্বৈরশাসকে বসালো না, যারা বিপ্লবকে জয়যুক্ত করার জন্য সবকিছু করতে রাজি ছিলো? ওটা তারা করেনি কারণ, তারা জনসংখ্যার ভেতর গরিষ্ঠের অভিন্ন লক্ষ্যের দিকেই ধাবিত হচ্ছে। তারা নিশ্চিত যে যখন সকল রুশ সর্বহারাকে পক্ষাবলম্বনের জন্য বলা হবে, তখন তারা দ্বিধায় ভুগবে না। এটা সকলের মনের ভেতরেই আছে, যা পরে অনড় সিদ্ধান্তে পরিণত হবে, পুরোপুরি আধ্যাত্মিকতা মুক্ত পরিবেশে ও যখন মত প্রকাশ বদলে যাবে না পুলিশি হস্তক্ষেপে, এবং যখন ফাঁসিকাঠ বা নির্বাসনের আর কোনো ভয় থাকবে না।  এখন এমনকি কলকারখানার সর্বহারারাও এই রূপান্তরের জন্য তৈরি, কৃষিকাজে যুক্ত সর্বহারারাও, তারা সম্প্রদায়গত সাম্যবাদের ঐতিহ্যিক কাঠামোর সঙ্গে পরিচিত। সমাজের কাঠামোর জন্য এই সর্বহারারা পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবীরা জ্যাকোবিন হতে পারে না: রাশিয়ায় তাদের যা করতে হবে তা হলো, সর্বজনীন সমর্থন থেকে যে দ্ব্যর্থক প্রতিক্রিয়া আসছে সেটাকে দৃঢ় করতে হবে এবং শেষ পর্যন্ত যেন নিজেদের মধ্যেই সহিংসতা না হয় সেজন্য বুর্জোয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে (দ্যুমা, জ্যেমস্তভ) জ্যাকোবিনবাদের দিকে হেলে পড়া থেকে বিরত রাখতে হবে।

*          *          *

বুর্জোয়া সংবাদপত্রগুলো আরো একটি কৌতুহলোদ্দীপক ঘটনাকে গুরুত্ব দেয়নি। রুশ বিপ্লব শুধু রাজনৈতিক বন্দীদেরই মুক্ত করেনি, সাধারণ অপরাধীদেরও মুক্ত করেছিলো। যখন একটি কারাগারে সাধারণ অপরাধীদের বলা হচ্ছিলো তারা মুক্ত, জবাবে তারা বলেছিলো, তাদের মনে হচ্ছে এই স্বাধীনতা গ্রহণের অধিকার তাদের নেই, কারণ অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত তাদের করতেই হবে। ওদেসাতে তারা কারাগার প্রাঙ্গনে জড়ো হয় এবং নিজেদের ইচ্ছাশক্তি দিয়েই শপথ করে তারা সৎ থাকবে, আর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় নিজেদের শ্রম দিয়েই তারা জীবনধারণ করবে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের দৃষ্টিকোন থেকে দেখলে এই খবরটি জার ও গ্র্যান্ড ডিউকদের পদচ্যুত করার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জার তো বুর্জোয়া বিপ্লবীদের দ্বারাও উৎখাত হতে পারতেন। কিন্তু বুর্জোয়াদের চোখে এই অভিযুক্ত কয়েদীরা হয়তো তাদের আইনি কাঠামোর শত্রু হিসেবেই বিবেচিত হবে, কারণ এরা তাদের সম্পদ ও শান্তির উপর নিঃশব্দে হামলা চালায়। আমাদের দৃষ্টিতে তাদের মুক্তির একটি মর্মার্থ আছে: রাশিয়ায় জীবনকে দেখার নয়া ধরণ, যা তৈরি করেছে বিপ্লব। এটি শুধু একটি ক্ষমতার দ্বারা আরেক ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, এটি জীবনযাপনেরও প্রতিস্থাপন। বিপ্লব নতুন নৈতিক মাত্রা সৃষ্টি করেছে, ব্যক্তির বস্তুগত মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে মনের মুক্তিকেও প্রতিষ্ঠা করেছে। বুর্জোয়াদের বিচারে যাদের গায়ে কুখ্যাত ‘সাবেক অপরাধী’ ছাপ মারা, যারা নানা ধরনের দুষ্কৃতির হোতা হিসেবে নথিভুক্ত, সেই কয়েদীদের কিন্তু পুনরায় স্বাভাবিক জীবন দিতে কুণ্ঠিত হয়নি বিপ্লবীরা। শুধুমাত্র সামাজিক উথালপাথালের সময়েই এমন ঘটনা ঘটতে পারে, যখন জীবনযাপন ও বিদ্যমান মানসিকতা বদলে যায়। মুক্তি মানুষকে স্বাধীন করে, তাদের নীতির দিগন্তকে করে প্রসারিত, এর প্রভাবেই স্বৈরশাসনের আমলে যারা জঘন্য অপরাধী তারাই কিন্তু কর্তব্যের ডাকে শহীদ হয়ে যায়, সততার প্রশ্নে হয়ে ওঠে নায়ক।

একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, এক কারাগারে ‘অপরাধীরা’ মুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে নিজেরাই নিজেদের রক্ষক হিসেবে ঘোষণা করে। আগে কখনো তাঁরা এমন কাজ কেন করেনি? এই জন্য যে, তাঁদের কারাগার বিশাল দেয়াল দিয়ে ঘেরা আর জানালায় গরাদ বসানো ছিলো বলে? যারা তাদের মুক্ত করতে গিয়েছিলো তাদের নিশ্চয় আদালতের বিচারক ও কারারক্ষকদের চেয়ে দেখতে ভিন্ন রকম লাগছিলো, আর এই যে ‘সাধারণ অপরাধী’ যারা, তারাও নিশ্চয় আগে যেমন কথাবার্ত শুনে অভ্যস্ত, সেটার চেয়ে ভিন্ন কিছু শুনেছিলো, এমন কিছু যা তাদের সচেতনতাকে সেভাবেই পরিবর্তন করেছে, এমন হুট করে ‘এতোটা মুক্ত’ হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা কয়েদিদের বুঝতে সাহায্য করেছে— মুক্তি ও স্বেচ্ছায় নিজেদের ওপর প্রায়শ্চিত্ত চাপানোর ফারাকটা কি। তারা নিশ্চয় অনুভব করেছিলো যে পৃথিবী বদলে গেছে, বদলেছে তারাও, সমাজের যারা তলানিতে থাকে, বিচ্ছিন্ন, তাদেরও এখন গোনা হয়, তারাও বদলেছে, বেছে নেয়ার স্বাধীনতাটুকু তাদেরও ছিলো।

মানবেতিহাসে জন্ম নেয়া ঘটনাগুলোর মধ্যে রুশ বিপ্লবই সবচেয়ে রাজকীয় ঘটনা। রুশ বিপ্লবের ফল স্বরূপ যারা ‘সাধারণ অপরাধী’ ছিলো তারা এমন মানুষে পরিণত হয়েছে, যাদের ইম্মানুয়েল কান্ট, অবিমিশ্র নৈতিক আচরণের তাত্ত্বিক, বলতেন—এক ধরনের মানুষ যারা বলেন: স্বর্গের বিশালতা আমার উর্ধ্বে, চেতনার আজ্ঞা আমার ভেতরে। খবরে প্রকাশিত ছোটছোট এসব খবর আমাদের সামনে যা তুলে ধরে, তা হলো আত্মার মুক্তি, নৈতিক সচেতনতার নতুন প্রতিষ্ঠান। এটি হলো নতুন বিন্যাসের আগমন, যার দ্বারা অধিকৃত হয় সেসব শিক্ষা যা আমাদের প্রভুরা শিখিয়েছিলেন। এবং আবারো এই আলো এসেছে পূর্ব থেকে বয়স্ক পশ্চিমা বিশ্বকে আলোকিত করতে, পশ্চিম এই ঘটনায় হতবাক, পশ্চিমের ভাড়াটে লেখকরা এই ঘটনাগুলোকে বিশুদ্ধ তুচ্ছতাচ্ছিল্য ও মূঢ়তা দিয়ে বিরোধিতা করতে পারেন।

তর্জমা: বিধান রিবেরু

বোধিনী

১. এগুলো পরামর্শমূলক পর্ষদ, যথাক্রমে জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে। এসব পর্ষদ গঠন করা হয়েছিলো জারের শাসনামলে যেন প্রতিনিধিত্বশীল সরকার গঠনের যে জনপ্রিয় দাবী সেটা যেন মাথা চাড়া দিয়ে না ওঠে। কিন্তু এসব পর্ষদের ভেতরেই জার আমলের বিরোধিতা শুরু হয়।

(লেখাটি প্রথম প্রকাশ হয় বাংলা ট্রিবিউনে ৯ অক্টোবর ২০১৭ তারিখে)

               

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>