অকাল বোধন

সৌমী আচার্য্য

কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে আনমনে বাইরে তাকিয়েছিলো তিয়াসা। শরতের এই সকাল তার বরাবর খুব প্রিয়। বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট বাগানটার এককোণে থাকা শিউলি গাছের নীচটায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বাসন্তী বোঁটার শিউলি। মিষ্টি একটা গন্ধ পায় তিয়াসা। বাবার জন‍্য মনটা কেমন করে।ঝাউগাছের গায়ে আটকে থাকা কুয়াশা ওর চোখের কোণে আশ্রয় নেয়। দশ বছর আগে যখন সবে এম.এ তে ভর্তি হয়েছে হঠাৎই একদিন বাবা জানিয়ে দিলেন, তিনি নতুন করে জীবন আরম্ভ করতে চলেছেন। তিয়াসা খুব কেঁদে ছিলো, খুব!  মা স্থির হয়ে চুপ করে ছিলেন। বাবা যখন একেবারে চলে যাচ্ছেন মা শুধু বলেছিলো, সত্যিই চলে যাচ্ছো গো?

বাবা পেছন ফিরে তাকান নি। তিয়াসা কেবল দেখেছিলো মার ঘোলাটে চোখ আর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া। মা আজো মেনে নিতে পারলো না বাবার যাওয়া। এক বারো মা জানতে চায় নি কে সে? যার সাথে বাবা নতুন ঘর বাঁধছে। কেবল নিজের জীবনের প্রতি উদাসীন হয়ে গেছে মা। খায় না ঠিকঠাক। কথা কম বলে, ঘুমায় না। ডাক্তারের পরামর্শে ঘুমের ওষুধ দেওয়া হয়। তাই এখনো ঘুমাচ্ছে তিয়াসার মা রূপা বেঘোরে। তিয়াসার একার সকাল হঠাৎই বদলে যায় জোড়ালো কন্ঠস্বরে।
দিইচি গো দিদি। আজ এক্কেরে নুড়ো জ্বেলে দিইচি।
গেট খুলতে খুলতে চিৎকার করতে থাকে পলা।তিয়াসা ঠোঁটে আঙুল রেখে গম্ভীর গলায় বলে,
আস্তে কথা বল পলা। মা এখনো ঘুমোচ্ছে।
পলা চুপ করে গেলেও কান এঁটো করা হাসিটা ঠিক থেকেই যায়। দ্রুত বাগান পেরিয়ে তিয়াসার কাছে এসে দাঁড়ায়। চাপা স্বরে বলে, আজ আবার এইচিলো। তুমি যেটা শিকাইছিলে জোড়ে জোড়ে কইদিচি। তিয়াসা স্মিত হেসে বলে, কি বললি?
ঝমঝম করে বলে ওঠে পলা।

কলাম, নজ্জা করে না। সমোত্ত মানুস্ হাত পা সব আচে, সাত সকালে সাজ ও তো কম করোনি বাপু তবে হাত পাতচো কেনো? আর হাত পাতচো তো না দিলি মুখ খিস্তি করচো কেনো?
তিয়াসা কৌতুহলী হয়ে বলে বলিস কি! এত কিছু বললি! তোকে কিছু বললো না?
পলা বলে, তা বলবেনে। ছেড়ে দেবে ভেবেচো! দাঁড়াও।ভাতটা চাপায় এসে কচ্চি…।
পলা চলে যায়। তিয়াসা অল্প হেসে বলে পাগলী! অবাক লাগে তিয়াসার বছর সাতাশ আঠাশ পলাকে দেখলে। প্রতিদিন সাড়ে ছটার মধ‍্যে কাজে চলে আসে সেই কালীনারায়ণপুর থেকে। ওর মুখে সব সময় একটা আলগা হাসি লেগেই আছে অথচ বাড়িতে পঙ্গু স্বামী। বছর পাঁচেক আগে বাড়ির তৈরীর লেবার হিসাবে কাজ করতে গিয়ে উঁচু ভাড়া থেকে পরে চিরকালের মতো পঙ্গু হয়ে গেছে।ওর আট বছরের ছেলেটা বাবাকে দেখাশোনা করে।সারাদিন পাঁচবাড়ি কাজ সেরে রাতে বাড়ি ফেরে পলা। কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে তিয়াসার পাশে এসে দাঁড়ায় পলা। বলে, বুঝলে দিদি? আমায় বলে, হারামজাদী মাগী তোর নাঙের কাছে টাকা চেয়েচি নাকি? তোর এত ঝাল নাগচে কেনো?
বলে এই মারে কি সেই মারে।
তিয়াসা বড়ো চোখ করে বলে, সে কি রে তোর ভয় করলো না?
ভয় আবার করলো না! কিন্তু ঐযে যেদিন ওদের জুলুমের কথা তোমায় কচ্চিলাম আর তুমি বললে ‘দ‍্যাক পলা, অন‍্যায়ের পতিবাদ করতি হয় নইলে নিজেও অন‍্যায়ের শিকার হবি। ব‍্যাস মনে পরলো আর আমিও রুকে উঠলাম। অবশ‍্যি সব মাসি গুলান আমার হয়ে বলেচে বলে ওরা থেমি গেলো।
তিয়াসা বললো, বেশ করেছিস যা এবার চা কর। পলা পেছনে ফিরে যেতে গিয়েও দাঁড়িয়ে বললো
জানো দিদি, শুধু কল‍্যানীতে নামার পর খড়খড়ে গলায় এক ষণ্ডা মতো হিজড়ে কলো, তোর শনি এয়েচে তোরে খাবে রে মাগী।
কথাটা শুনে তিয়াসার ভেতরটা কেঁপে গেলো। পলা চলে গেলো ভেতরে। তিয়াসার এই বৃহন্নলাদের উপর কোনো অনুকম্পা নেই। এদের শারীরিক ক্ষমতা যথেষ্ট অথচ ভিক্ষা করে ট্রেনে, ভিক্ষা না দিলে জুলুম, মারধোর সব চলে। তিয়াসা সম্মান করে পলার মতো লড়াকু মেয়েদের। সে নিজেও তো কারো কাছে হাত পাতে নি। কত কি মনে পরতে থাকে তিয়াসার। বাবা যাবার পর মাকে সামলানো, আউট হাউসের ভাড়ায় সংসার চালানো। দিনরাত টিউশানি করে পয়সা জোগাড়। চোখের সামনে বদলে যেতে দেখলো তিয়াসা কল‍্যানী, কাঁচড়াপাড়া।বড়ো বড়ো দোকানে স্টকিষ্টের কাজ করেছে বহুদিন। এই তিন বছর হলো কাঁচড়াপাড়ায় এক বড়ো মাল্টিস্টোরের ম‍্যানেজার হিসাবে যোগ দিয়েছে। এখন অবস্থা একটু ফিরেছে।কিন্তু নিজের জীবনে কাউকে চাইতে পারেনি তিয়াসা। বাবা তাকে বিশ্বাস করতে ভুলিয়ে দিয়েছে। পলার আওয়াজ আসে-ও দিদি, উঠবে নে নাকি? ওঠো, মাসিমা উঠেছে ঘরে এসো।

(২)
চারিদিকের ঢাকের বাদ‍্য বেজে গেছে। বহু মণ্ডপ এই চতুর্থীতেই দর্শনার্থী সামলাতে ব‍্যস্ত। তিয়াসা মায়ের জন‍্য একটা হালকা নীল শাড়ি কিনেছে আজ। বাড়ি ঢুকে মা দরজা খুলতেই জড়িয়ে ধরে তিয়াসা বলে, কি করছো গো মা? কি সুন্দর গন্ধ! স্মিত হেসে রূপা বলেন, পিঁয়াজি করছি, চেঞ্জ করে আয়। একসাথে খাবো। তিয়াসা মাকে শাড়িটা দিয়ে চুমু খেলো, রূপা বলে উঠলো, এই তো একটা শাড়ি দিলি কদিন আগে আবার একটা! অকারণ খরচ করিস কেন?পুরো বাবার মতো হয়েছিস। রূপা রান্না ঘরে চলে যান। তিয়াসার মন ভারী হয়ে আসে। বলতে চায়, মা আমি তোমার মতো। চরিত্রহীন, কর্তব‍্যবোধহীন বাবার মতো নই। কিন্তু বলতে পারে না। গলার কাছটা দলা পাকিয়ে আসে। ফ্রেশ হয়ে মার সাথে বারান্দায় বসে পিঁয়াজি, চা খায়। এমন সময় ফোনটা বেজে ওঠে। তিয়াসা ফোনটা ধরতেই ওপাড় থেকে রিনরিনে গলা ভেসে আসে
ও মাসি মা একনো বাড়ি আসে নি কো। কিচু জানো গো? পলার ছেলের গলা। তিয়াসা বলে, কে রে পল্টু নাকি?
-হ‍্যাঁ গো মাসি, মা বাড়ি আসে নি কো।
-ও পল্টু, কাঁদছিস কেন? এসে যাবে একটু পরে, চিন্তা করিস না। কোথা থেকে ফোন করছিস?
-পাশের বাড়ির নেপু কাকা দেছে।
-তুই বাড়ি যা পল্টু। মা এসে যাবে। ফোনটা রেখে চিন্তিত মুখে বলে তিয়াসা, কি হলো বলো তো মা!আজ আবার মাইনে আর বোনাস একসাথে দিয়েছি। প্রায় চার হাজার। অন‍্য বাড়ি থেকেও নিয়েছে নাকি টাকা! কি যে হলো, কোথায় গেলো পলা?
রূপা চোখ কুঁচকে বলে, না ফিরলে পঙ্গু স্বামী আর বাচ্চাটা মরে যাবে। তিয়াসার বুক কেঁপে ওঠে। রাতে কিছুই খেতে পারে না ওরা। পলার খবর দশটা পর্যন্ত পায় নি। তিয়াসা মাকে ওষুধ খাইয়ে শুইয়ে দেয়।নিজে ফোনটা মুঠো করে ধরে বসে থাকে চেয়ারে।ফোনটা আসে রাত বারোটায়
– ম‍্যাডাম, আমি নেপাল বলছি
-হ‍্যাঁ নেপালবাবু বলুন, পলা ফিরেছে?
-একটা খারাপ খবর আছে ম‍্যাডাম, বৌদিকে জি.আর.পি লাইনের ধার থেকে রক্তাক্ত অবস্থায় পেয়েছে। রাণাঘাট হাসপাতালে ভর্তি। ৪৮ ঘন্টা না গেলে কিছু বলা যাচ্ছে না।
ফোন রেখে টেবিলে মাথা দিয়ে কেঁদে ফেলে তিয়াসা।

(৩)
পলার এক কামরার ইঁটের ঘরটায় আলো বাতাস ভালোই আসে। পলার মুখের দিকে চেয়েছিলো তিয়াসা। বাঁ চোখটা খুলে এসেছে যেনো কোটর থেকে। চোখটা হয়তো নষ্ট হয়ে যাবে। মুখটা এখনো ফোলা, কালসিটে সারা মুখে। খুব আস্তে আস্তে কথা বলছে। তিয়াসা ওর বাঁ হাতটা ধরে আছে।
-টেরেনে হেবি ভীড় ছ‍্যালো। গা ঘেঁষে সব নোক।আমি দরজায় কাছেই ছ‍্যালাম। হঠাৎ হেঁড়ে গলায় কে যেন বললো, ব‍্যাগের চেন খুলছে, চেন খুলছে।পকেটমার রে পকেটমার। মার মাগীকে মার। আমি বুচতে পারিনি দিদি হিজড়ে গুলো আমাকে পকেটমার কচ্চে। দ‍্যাখতি দ‍্যাখতি সবাই আমারে ঘিরে ধরলো। আমার সামনে থাকা বৌডা চিল্লে চিল্লে কলো, আমার ব‍্যাগে টাকা নেই। টাকা নেই।দিদি, আমি কিচ্চু জানি নে। তোমার দিয়া টাকা গুলো বেলাউজের মধ‍্যি ছেলো। টেনে হিচড়ে বার করে আমার হকের টাকা ছিনায় নেলো!
ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকলো পলা।তিয়াসাও অঝোরে কাঁদছে। বলে ওঠে, চুপ কর আর শুনতে চাই না। কিন্তু পলা বলেই চললো, কি মারটাই মারলো। কত কলাম আমি পকেটমার নই, আমারে মেরো না। জানো দিদি আমায় মারতে মারতে ঐ হেড়ে গলার হিজড়েডা কলো, আমাদের ব‍্যবসা বন্ধ করবি হারামজাদি? তোর বেঁচে থাকাই শ‍্যাষ। টেরেন তখন রাণাঘাট চাবি গ‍্যাটে ঢুকতেছে আমারে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিলো। আর কিচু মনে নাই, কিচু মনে নাই। তিয়াসা পলার হাতটা বুকে চেপে ধরে। পলা বলে, আমি যদি নুলো হয়ে যাই। আমার ছেলেডা মরে যাবে গো দিদি!
তিয়াসা সোজা হয়ে বলে,
কিচ্ছু হবে না তোর। আমি তো আছি। প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছি, বাঁচতেও শেখাবো। যতদিন না তুই আবার উঠে দাঁড়াস। তোদের সব ভার আমার।আমার দুটো নুন ভাত জুটলে তোদরো জুটবো।
দশমীর বিসর্জনের ঢাকের আওয়াজে পলার চোখের জলে বোধন হয় আরেক দুর্গার। নতুন ভাবে বাঁচার আরেক অর্থ খুঁজে পায় তিয়াসাও।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত