| 23 মে 2024
Categories
সিনেমা

জেন,কিম কি দুক কিংবা ভারবাহী জীবন । মুরাদ নীল

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

 

তখনো কিম কি দুক নামক লোকটাকে আমি চিনি না,তাঁর কোন সিনেমা দেখি নাই।বিবিধ হেরে যাওয়া আর যাপনের ক্লান্তি,গ্লানি মুছতে সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি বুড়ো বটগাছটার নিচেই শুয়ে বসে কাটাই। কখনো ছেলে ছোকড়ার দলের সাথে,কখনো বা একাই।নিয়ম করে আরেকজন অবশ্য এই বটতলায় বসেন। নুরুল কাকা। ছোটবেলায় এই কাকাকে আমরা কয়েকজন ভাগ্যবান দুএকবার দেখেছি আমাদের গ্রামে। মায়ের মুখে শুনেছি,কাকা মাঝে মাঝে নিরুদ্দেশ হয়ে যান।কেউ কেউ বলেন পকেটকাটা নুরুল! ” নুরুল থাকে ভারত দ্যাশে,পকেট কাটি ব্যারায়।” তখন অবশ্য কে পকেটমার আর কে সাধু,এইসব নিয়া আমাদের ভাবনা ছিলো না,ছিলোনা আসলে ভাববার অবকাশ।যাহোক,সন্ধ্যা বেলায় যখন বটতলায় একা একা বসে থাকি,নুরুল কাকা এসে বসেন। কাকা ঝিমান,কখনো কখনো “দিল্লিতে নেজামুদ্দিন আউলিয়া” বলে গুণগুণ করেন।আর শ্বাস ছাড়েন। দীর্ঘশ্বাস। কী দুঃখে যে কাকা দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন আমি বুঝিনা। বহুকাল ভারত দেশে থাকা কাকার রাস্তার ধারে লাল ধপধপে ইটের বাড়ি।বউ আছে,ছেলে আছে। আবাদি ধানের ভাত খান।তিনবেলা ডার্বি সিগারেট ফোঁকেন।এই লোকের আবার কিসের দুঃখ!

___ ভাইস্তা…
__ হ্যাঁ,কাকা।
__ কি ভুল করি যে ছোট বেলায় ঘুঘুর গোশত খাছি বাবা, দুঃখ আর গ্যালো না ব্যাহে।

আমার এক ডানপিটে ব্রিলিয়ান্ট মামাতো ভাই ছিলো।সুজন ওরফে মাসুদ রানা।যার একটা বাক্সভর্তি শুধু সেবা’র বই।এই ভাই ঘুঘু পালতেন। তিনটা সুন্দর ঘুঘুর পাখনা কেটে চিহ্ন দিয়া রাখা পোষা ঘুঘু। নেশাটা আমার ঘাড়েও চেপেছিলো। ঐ হাফপ্যান্ট পড়া বয়সে তখন শুক্রবারের বিটিভি ছাড়া আমার কিছু ভালো লাগে না। আমার মাথায় আর মনে শুধু ঘুঘু। আমিও তিনটা ঘুঘু পুষবো। পাখনা কেটে চিহ্ন দিয়ে রাখবো,আমার পোষা ঘুঘু! ঘুঘু ধরতে পারি নাই তখনো,কিন্তু বাঁশের কঞ্চি কেটে খাঁচা বানিয়ে রাখছি।ঘুঘুকেতো রাখতে হবে খাঁচায়। আম্মা নিষেধ করতেন, বাবারে! ঘুঘু ধরা যায় না বাবা। ঘুঘু পুষলে,ঘুঘুর গোশতো খাইলে ঘুঘুর অভিশাপ লাগে,জীবনে দুঃখ যায় না। কিন্তু আমিতো ঘুঘুরে জবাই করে গোশতো খাবো না।আমি পুষবো,পোষ মানাবো। আমার তিনটা ঘুঘুর তিনটা নাম থাকবে। প্রিয় নাম ধরে আমি আমার ঘুঘুগুলারে ডাকবো। ঘরের পেছনে ছিলো তেঁতুলগাছ।সেই গাছে দেখি ঘুঘু বাসা বাঁধছে।আমার আনন্দ আর অপেক্ষা থামে না।দেখতে দেখতে ঘুঘু দম্পতি একজোড়া ডিম দেয়। ডিম থেকে বাচ্চা।তিনটা না! হোক একজোড়া,সমস্যা কী? একজোড়াই পুষবো। একদিন বিকেলে বাচ্চাদুইটাকে গাছ থেকে নামাই। তখনো উড়তে শেখে নাই।ঘরে রাখি বাচ্চা দুইটারে। খ্যারের ঘর আমাদের। খ্যার মানে খড়। বর্ষা আসার আগে এই ঘরের খড় পাল্টাইতে হয়।কিংবা নতুন খড় দিয়া ফুটা,ফাকফোকড় বন্ধ করা লাগে । কিন্তু আমার জুয়াড়ি বাপ নিজের জুয়ার টাকা আর মা আমাদের ছয় ভাই বোনের জন্য একবেলা ভাত জোগান দিতে পারেন না। বর্ষা আসে,আমাদের খড়ের চালের ফুটা বন্ধ হয় না। মাঝ রাতে বর্ষার আকাশ তার জমানো পানি সমস্ত নল দিয়া ঢালতে থাকে।আমরা ফুটার নিচে মাথায় গামলা আর ছেড়া ছাতা নিয়া জবুথবু বসে থাকি। বৃষ্টি পড়ে। কার কাছে যে এই বৃষ্টি করুনা, কার কাছে বিলাসীতা,কার কাছে আপদ! সকাল বেলা উঠে আগে ঘুঘুর বাচ্চা দুইটাকে দেখি। আপদের বৃষ্টি থেকে আমরা হয়তো কাঁথা কাপড় জড়িয়ে কোনমতে বেঁচে গেছি। বাচ্চা দুইটা মরে গেছে। তারপর কত বছর কেটে গেছে।ঘুঘুর বাচ্চা দুইটা মরে যাওয়ার শোকও হয়তো অল্পদিনেই কেটে গেছে।ঘুঘুর নেশায় বন জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানো কিশোর কিছুটা হিমু,কিছুটা সঞ্জীব, কিছুটা অঞ্জনে আসক্ত হয়ে তখন শহরের পথঘাটে ঘুরতে থাকা এক উদ্দেশ্যহীন তরুণ।আদতে তরুণ বয়স আর শরীরে গ্রামের সেই বোকা কিশোরটাই! আচ্ছা, কোথায় ছিলাম যেন? হ্যাঁ,নুরুল কাকার কাছে। নুরুল কাকার দুঃখের কারন ঘুঘুর গোশত। নিরীহ ঘুঘু মারার কারনে আজ মতিন কাকা ঘুঘুর মতো দুঃখী।আচ্ছা,ঘুঘু কি আসলেই দুঃখী? ঘুঘুর দুঃখ কিসে? এবং আমিও কি দুঃখী নই?আমারওতো দুঃখ আছে।এবং বৃষ্টির রাতে বাপ মা ছাড়া একজোড়া বাচ্চা ঘুঘুরে আমিইতো মেরে ফেলেছি। নুরুল কাকা এবং আমি,আমরা দুইজন দুঃখী লোক।ঘুঘুর অভিশাপে আমরা দুঃখী হয়ে গেছে।কিন্তু আমাদের কার দুঃখ কিরকম,কেউ জানি না। সন্ধ্যা থেকে বাজারের শেষ মানুষটা ফেরা পর্যন্ত আমরা বটতলায় পাতা চাঙড়ায় বসে থাকি।

ঘরে ফিরি।বটতলার বাইরে তখন আমার দেশ আর পৃথিবী বলতে সেই একলা ঘর। খিদে পেলে আম্মাকে বলি, আম্মা ভাত খাবো। খেয়ে ঘরের জানালা,দরজা বন্ধ করে দেই।কানে হেডফোন গুঁজি,মন স্থির রাখার জন্য কৃষ্ণ দাশের রাঁধে গোবিন্দ কীর্তন শুনি। বেশিক্ষণ শুনতে পারি না।ইদানিং সবই কেন জানি পানসে লাগে।মহীনের ঘোড়াগুলি,পিংক ফ্লয়েড,ফিভার রে আর কাঁহাতক শোনা যায়! ডেভিড লিঞ্চ,মিকেলেঞ্জেলো আন্তোনিওনির সিনেমাও ভালো লাগে না তখন। তখন আমার নতুন কিছুর দরকার ছিলো। দর্শন আর সাহিত্যের প্রায় সবগুলা ব্যাপারেই একটু অতিউৎসাহী হয়ে নতুন কিছু খুঁজতে থাকি। জেন দর্শন বা জেন ফিলোসফি,জেন গল্প,কোয়ান,জেন প্যারাডক্সের সাথে পরিচয় হয় তখন।নেট সার্চ করে যা কিছু পাই পড়তে থাকি।নতুন একধরণের অবসেসন শুরু হতে থাকে। ছোট্ট একটা গল্প,হুবহু মনে নেই এখন। গল্পে আসলে কী ছিলো? তেলাপোকা না ব্যাঙ? না টিকটিকি? এক লোক রাতে ঘুমানোর আগে একটা তেলাপোকা মেরেছিলো,ঘুমের মাঝে বা স্বপ্নে লোকটা দেখলো সে একটা তেলাপোকা হয়ে গেছে,আর তাকে পিষে মারতেছে আরেকটা লোক। এই গল্প নিয়ে তখন আমি ততটা ভাবিনি। তখন শুধু জেন গল্প পড়া,জেন নিয়ে ঘাঁটতেই ভালো লাগতো। তো ঘাঁটতে ঘাঁটতেই জেন সম্পর্কিত একটা কিছু পড়তে গিয়ে সন্ধান পেলাম কিম কি দুক নামের এক কোরিয়ান ফিল্ম মেকারের। পেলাম “স্প্রিং,সামার,ফল,উইন্টার এন্ড স্প্রিং” নামের এক সিনেমার।

নির্জন পাহাড়ের নিচে লেক।নির্জন সেই লেকের একটা মঠে বাসিন্দা বলতে শুধু দুইজন মানুষ। একজন জেন গুরু আর বছর ছয় সাতেকের এক ছাত্র। মঠে রোজকার কাজ আর প্রার্থনার মধ্য দিয়ে কাটতেছিলো গুরু ছাত্রের দিন।এক সকালে ছাত্র মঠ থেকে বের হয়ে একটু দূরে চলে গেলো। লেকের স্বচ্ছ পানি,পানিতে কী সুন্দর মাছ! ছাত্র যেনো খেলার অনুষঙ্গ খুঁজে পেলো। একটা পাথর সুতায় বেঁধে সেই সুতাটার অপর প্রান্ত বেঁধে দিলো মাছের পিঠে। একই ভাবে কিছু ব্যাঙ আর সাপের পিঠেও বেঁধে দিলো পাথর।ভারবাহী মাছ,ব্যাঙ আর সাপের যন্ত্রণাময় ছোটাছুটি দেখে ছাত্রের হাসি আর আনন্দ থামে না। যেন প্রভু খেলতেছে তার ভৃত্যের সাথে কিংবা গাধাকে নিয়ে মালিক।গুরু সবই দেখলেন।কিন্তু নীরব থাকলেন। ছাত্রটি যখন রাতে ঘুমিয়ে গেলো,তখন গুরু ছাত্রের পিঠে বড় পাথর বেঁধে দিলেন।সকালে উঠেই ছাত্রকে বললেন,যাও, খোঁজো সেই মাছগুলো,ব্যাঙ আর সাপকে।তাদের পিঠ থেকে পাথর মুক্ত করো।যদি সেগুলো মরে গেছে,মনে রেখো বাকি জীবন তোমাকে মনের মাঝে সেই পাথরগুলো বয়ে বেড়াতে হবে।

সিনেমার এইখানে এসে আমি আটকে যাই।আগাতে পারি না। নুরুল কাকাকে মনে পড়ে। আমার শৈশব,কৈশোর মনে পড়ে। এক জোড়া বাচ্চা ঘুঘুর কথা মনে পড়ে। মনে পড়ে চৈত্রের খাঁখাঁ রোদে পাঠকাঠি আর ঝুলের ফাঁদ নিয়ে ফড়িঙ তাড়া করার স্মৃতি।রঙিন ফড়িঙ ধরাতে আনন্দ ছিলো বেশি।ফড়িঙ এর লেজে সুতা আর গাছের পাতা বেঁধে দিয়ে যন্ত্রণাকাতর ওড়াওড়ি দেখার আনন্দ মনে পড়ে।মনে পড়ে বর্ষায় দলবেধে চটকা জাল পেতে মাছ ধরার স্মৃতি। “চান্দা মাছ খেয়ে অমাবশ্যা নষ্ট “, এই প্রবাদের মাহাত্ম্য, মাজেজা তখন বুঝতাম না। কিন্তু জালে চান্দা মাছ উঠলে আমরা নিতাম না।চান্দা মাছ কে খায়?! তখন এই চান্দা মাছের কাঁটাযুক্ত লেজে কচু ডাঁটা গেঁথে দিয়ে আমরা পরিশ্রম উসুল করতাম। নিজের শরীর আর ওজনের চেয়ে বড় কচু ডাঁটা নিয়ে খাবি খেতে থাকা চান্দাকে দেখে আমরা মজা পেতাম,আনন্দ হতো।


আরো পড়ুন: সেলুলয়েডের কবি

কত সিনেমা দেখে আমার জীবনের কত স্মৃতি মনে পড়েছে,কত সত্যকে আবিষ্কার করেছি। কিমের স্প্রিং,সামার,ফলও কি স্মৃতির সাথে সাথে কোন সত্যের মুখোমুখি দাড় করিয়ে দিলো? নিজেকে ভারবাহী গাধা কিংবা সিসিফাস মনে হয় এখন।কিংবা সেই ফড়িঙটা,যার লেজে পাতা সমেত সুতা বাঁধা।কিংবা সেই চান্দা মাছ,লেজে বিঁধে থাকা কচুডাঁটা নিয়ে অতল স্রোতে খাবি খেতে থাকা, সাঁতরানোর ব্যর্থ প্রয়াসের সেই চান্দা মাছ। কিম দাড় করিয়ে দিলো কি নিয়তিবাদ আর কর্মফলের মুখোমুখি? এভ্রিথিং ইজ প্রিডিটারমাইন্ড। মতিন কাকা আর আমার ঘুঘুর মতো দুঃখ হবে,কে লিখেছিলো এই নিয়তি? মতিন কাকা ঘুঘুর গোশতো না খেলে,আমি ঘুঘুর বাচ্চা না মারলে আমাদের কপালে কি দুঃখ লেখা হতো না? আমরা সুখী হতাম? প্রত্যেক সন্ধ্যায় বটতলায় আমরা কাকা ভাতিজা বিষণ্ণ,মৌন না থেকে কি সুখের গল্প করতাম?

আজ কে তাহলে আমার এই পুচ্ছে বাঁধা ভার ফড়িঙ, চান্দামাছের জীবন দেখে আনন্দ পায়? কেইবা বেঁধে দিচ্ছে এই ভার,আমার এই ছোটার চেষ্টায় ছটফটানো দেখে কেমন তার আনন্দ?


Its hard to tell that the world we live in is eithere a dream or reality…

সেই জেনগল্পটা,চুয়াংজু আর প্রজাপতি।একরাতে ঘুমের ভেতরে চুয়াংজু স্বপ্নে দেখলেন তিনি প্রজাপতি হয়ে উড়তেছেন।কিন্তু ঘুম ভেঙে গেলে দেখলেন বিছানায় শুয়ে থাকা তিনি চুয়াংজু! প্রজাপতি না! চুয়াংজু ভাবতে লাগলেন, কোনটা স্বপ্ন আর কোনটা বাস্তব? স্বপ্নে উড়তে থাকা প্রজাপতিটা চুয়াংজুর স্বপ্ন ছিলো, না কি এখন যে চুয়াংজু শুয়ে আছে সে একটা প্রজাপতির স্বপ্ন? তাহলে বাস্তব কোনটা?
……

কতজনের কাছে ঘেষতে চেয়েছি,প্রেম চেয়েছি।চেয়েছি গন্তব্যে পৌঁছাতে।মানুষের গন্তব্য কি মানুষের কাছেই? কিন্তু কত পথ যে পাড়ি দিলাম,কত পথ ঘুরে দেখি শেষমেষ কোথাও যেতে পারিনি আমি। শুধু একটা প্যারাডক্সে ঘুরপাক খেতে থাকা, আর কবিতার মতো দিনশেষে নিজের চিবুকের কাছে একা।কারো কাছে যেতে পারিনি। তারপর আবার ফিরে আসি আমি জেনের কাছে।কিম এর কাছে।

Having no destination, I’m never lost….

গন্তব্যই যেহেতু নেই,কোথায় আর হারাবো? আ বিগ জিরো বা অনন্ত শূন্যের পথে মিলিয়ে যাবার আগে শুধু ঘুরপাক খেতে থাকা এই পৃথিবীতে।আচ্ছা, এই পৃথিবী কি একটা স্বপ্ন? এই যাপন কি স্বপ্নে? নাকি আছি রিয়ালিটিতেই? Its hard to tell…..

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত