সিলভিয়া প্লাথের ডায়েরি থেকে

বিশ শতকের মধ্যবর্তী সময় ইংরেজী কবিতার ভূবন আলো করে রেখেছিলেন কবি সিলভিয়া প্লাথ। মাত্র ৩০ বছরের জীবনে তিনি লিখেছেন দু’হাত ভরে। কবিতা, উপন্যাস এবং ছোটগল্পের পাশাপাশি ১১ বছর বয়স থেকেই সিলভিয়া প্লাথ নিয়মিত-অনিয়মিতভাবে ডায়রি লিখেছেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

::প্রথম পরিচ্ছদ ::
‘দ্যা আনঅ্যাবরেইজড জার্নাল অব সিলভিয়া প্লাথ’
১৯৫০ সালের আগস্ট মাসে লেখা ডায়েরির নির্বাচিত অংশ:
আজ আগস্টের প্রথম দিন। দিনটি গরম, ধোঁয়াশা আর ভেজা। এখন বৃষ্টি হচ্ছে। আমি একটা কবিতা লেখার চেষ্টা করছি। কিন্তু কোন এক রিজেকশন স্লিপে যা লেখা ছিলো সেই কথাই আমার মনে হচ্ছে শুধু:অনেক বৃষ্টির হবার পর, ‘বৃষ্টি’ শিরোনামে লেখা কবিতাটি পুরো দেশের বৃষ্টির সঙ্গে ঝরে পড়ছে।
***
মানুষ ভালোবাসি আমি। একজন ডাকটিকিট সংগ্রাহক যেমন তার পুরো সংগ্রহকে ভালোবাসে, তেমনি আমি সকল মানুষকে ভালোবাসি। প্রত্যেকটি গল্প, ঘটে যাওয়া ঘটনা, কথোপকথনের প্রত্যেকটি ছোট কথাকে আমি রসদ হিসেবে ধরে নেই। আমার ভালোবাসা নৈর্ব্যক্তিক নয় আবার সেটা একক বস্তুগতও নয়। একজন খোঁড়া ব্যক্তি, একজন মৃত্যুপথযাত্রী, একজন পতিতা- এভাবে আমি সকল মানুষ হতে চাই আর লেখায় ফিরে এসে আমি আমার চিন্তা, আবেগ দিয়ে ওই মানুষটির মতো করে লিখতে চাই। কিন্তু আমি তো আর সর্বজ্ঞানী নই। আমার একটাই মাত্র জীবন, আমার জীবনই আমাকে বাঁচতে হবে। এবং শুধুমাত্র বাস্তবিক আগ্রহের জায়গা থেকে আপনি আপনার জীবনকে সব সময় কল্পনা করতে পারবেন না।
***
বর্তমান সময়ই আমার কাছে চিরকালীন বলে মনে হয়। আর এই চিরকালীন বিষয়টি সব সময় পরিবর্তিত হয়, বয়ে চলে এবং গলে যায়। এখানে দ্বীতিয় ধাপটি মানে বয়ে চলা বিষয়টি হলো জীবন। এবং জীবন যখন শেষ হয়ে যাবে তখনই সেটা মৃত। এবং জীবনকে দ্বীতিয়বার নতুন করে শুরু করার সুযোগ আপনার নেই। জীবন অনেকটা চোরাবালির মতো… শুরু থেকেই যা নিয়ে কোন আশা করা যায় না। খুব যথেষ্ট না হলেও একটা গল্প, একটা ছবি খুব অল্প আকারে তার সংবেদনের নতুন মাত্রা দিতে পারে। বর্তমান ছাড়া আসলে আর কিছুই সত্য নয়। ইতিমধ্যে বিগত শতাব্দীগুলোর ভারে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসতে চায়, এমনটাই আমার উপলব্ধি। শত বছর আগে আমার মতো কোন মেয়ে বেঁচে ছিলো একদা। ওই মেয়েটি আজ মৃত। আমি হচ্ছি বর্তমান কিন্তু আমি জানি একদিন আমাকেও চলে যেতে হবে। গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলো, জ্বলে ওঠা আলোগুলো, বালুচরের মতো, আসে ফের চলেও যায়। আর আমি মারা যেতে চাই না।
২৯ মার্চ, বৃহস্পতিবার, ১৯৫১
লেখার সময় কিছু মানুষের অবশ্যই নিরবতা আর শান্তি থাকতে হয়। বর্তমানে আমি একটু খারাপ অবস্থার মধ্যে আছি যদিও, স্বর্গীয় অনুপ্রেরণার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কিছু লিখতে চাইছি। এক কোণায় বসে আছে মোটামত গোলগাল আকারের আমার দাদী, জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছেন, আগামীকাল যে কোট পরবো আমি সেটা সেলাই করছেন। ফ্রিজ থেকে ক্লিক ক্লিক শোঁ শোঁ শব্দ আসছে। নিচতলার বাথরুম থেকে আমার ছোট ভাইয়ের দাঁত মাজার বিশ্রি শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। বাস্তবত, ‘এটা নিছক একটা মধ্য-মধ্যবিত্তের ঘরের বিজ্ঞাপন’ ছাড়া আর কিই’বা বলা যায়। খসখসে দেয়ালের ওয়ালপেপারে হলুদে আর আঙুলের ছাপের কথা আর নাই’বা বললাম। … এটা হাস্যকর যদিও, কিন্তু আমি এখন বাসায়, আর আমি জানি না ভবিষ্যতে ঠিক কতগুলো সুরম্য প্রাসাদ দেখতে পাবো। আমার প্রিয় ছোট বাসার নোংরাভাব নিয়ে আমি চিন্তিত না। মানুষের চিন্তার যে কত মিল এই মুহূর্তে আমি সেটা খুব ভালো ভাবে বুঝতে পারছি। ধনী সুদুর্শণ কোন ছেলে খুব সন্তপর্ণে ঘরে এসে, কোন মেয়েকে নিয়ে সন্ধ্যার ককটেইল পার্টির পোষাকে বাইরে নিয়ে যেতে আসবে, এমন ছেলেদেরও আমি থোড়াই কেয়ার করি। … আমি বলি, নতুন মানুষের সঙ্গে পরিচয় হবো, এই উদ্যেশ্যে আমি তাদের সঙ্গে বাইরে বেরুতে চাই। আমি তাদের প্রশ্ন করতে চাই, এর পেছনে তাহলে কী যুক্তি আছে? আসলে কেমন পুরুষ তোমাদের পছন্দ, ছেলেরা কী শরীর সর্বস্ব অ্যামেরিকান রাণীদের মতো শুধুই মেয়েদের বাহিরের গভীরতা দেখে? তাহলে তাদের সঙ্গে এমন জায়গায় কেন যাবে যেখানে তুমি কোন কথাই বলতে পারবে না? যাদের সঙ্গ তোমরা কামনা করো, তাদের সঙ্গে এভাবে তুমি কখনো দেখা করবে না নিশ্চই। এভাবে এক পার্টি থেকে অন্য পার্টিতে যাওয়ার চেয়ে চিলেকোঠায় বসে কিছু পড়া অনেক ভালো। তুমি তোমার মতো হয়ে উঠতে পারবে কেবল তখনই, যখন এমন কারো সঙ্গে তুমি দীর্ঘ সময় পার করবে না, এবার এই বিষয়টির মুখোমুখি হও বাছারা। তোমাদের কথা বলার সক্ষমতা অর্জণ করতে হবে। এটা কঠিন যদিও। কিন্তু এটা শেখার জন্য রাতগুলোকে ব্যবহার করো, তখনই বলার মতো তোমার কিছু থাকবে। এমন কিছু যেটা ‘আকর্ষণীয় বুদ্ধিমান পুরুষ মানুষটি’ শুনতে চাইবে।
একটি খোলা চিঠি: শুধুই তোমার জন্য
আমি তোমাকে প্রিয়তম বলে ডাকবো না, এটাই ভালো হবে মনে হয়। অন্তত আজ রাতের জন্য আমি ঠিক এতটা মধুর হতে পারি না। যার সঙ্গে আমি কথা বলতে চাই সে কিভাবে শুরু করবে, সেটা আমি তোমাকে বলতে চাই। কখনো নিজের সঙ্গে, কখনো ম্যারির সঙ্গে, কখনো এডি’র সঙ্গে আমি সব সময়ই কথা বলি। বেশির ভাগ সময় আমার সঙ্গেই বলি। এমন একজন পরিপূর্ণ মানুষকে নিজের প্রিয় মানুষ হিসেবে যখন পেতে চাইছি হঠাৎ করেই, তখন তোমাকে ঘিরেই আমি আমার পৃথিবী সাজাবো। এখনও সময় আসেনি বলে, আমি তোমাকে এটা লিখছি না। তুমি যখন শাররীক এবং মানসিকভাবে আমার জীবনেরই একটা অংশ হতে যাচ্ছো… তখন আমি তোমাকে কখনোই লবো না এটা, বছরে একবারের জন্যও না, আর বলার প্রয়োজনও নাই… এখানে শব্দের উচ্চারণ বৃথা, কেননা তুমি সেটা অবশ্যই বুঝবে।
পেরি আজ বললো যে তার মা তাকে বলেছে,’মেয়েরা অনন্তকালের জন্য নিরাপত্তা চায় আর ছেলেরা চায় একজন সঙ্গী। তারা আসলে দুইজনই দুটি ভিন্ন বিষয় কামনা করে’। আমি খুব দোদুল্যমানতার মধ্যে আছি। আমি যখন বুঝতে পারলাম যে আমি কখনোই একজন পুরুষ হতে পারবো না, তখনই আমি মেয়ে হওয়াকে অপছন্দ করছি মূলত। অন্যভাবে যদি বলি, আমি আমার সঙ্গীর নেতৃত্ব আর ক্ষমতার প্রতিই আমার সমস্ত শক্তি ব্যয় করবো। আমার স্বাধীন কাজ বলতে একটাই, হয় সঙ্গীটিকে গ্রহণ করা বা প্রত্যাখান করা। এমন চিন্তায় স্বস্তি পাচ্ছি বলেই আমার যত ভয়। আমি যদি শুধুই তোমার প্রিয় মানুষটি হতে পারি, পরবর্তীতে আমার এসব ভয়ের কথা ভেবে আমি হাসবো। যখন তুমি আমার মধ্যেকার বিষয়গুলোকে বাড়িয়ে তোলো, আমার ভালো লাগে। বিয়ে নিয়ে আমি গর্ব করি, আবার বিয়ের মতো বিরক্তিকর এমন প্রথার সম্মান ও গুরুত্বের কথা ভেবে আমি বিষ্মিত হই। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এই বিষয়টি আমি অবশ্যই বিবেচনা করবো।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত