শেক্সপীয়ারের নাটকের সৃজনশীল চলচ্চিত্রায়ন

শেক্সপীয়ারের কোনো না কোনো নাটকের চলচ্চিত্রায়ন সকলেই দেখেছেন। কিন্তু খুব সামান্যই আমরা জানি যে শেক্সপীয়ার নিয়ে কত শত শত ছবি পৃথিবীর দেশে দেশে তৈরি হয়েছে, হচ্ছে― যার মধ্যে বিপুল আয়োজনের তারকাখচিত ব্যয়বহুল ছবি যেমন রয়েছে, তেমনই ব্যক্তিগত ও ছোট কোনো গ্রুপের উদ্যোগে ১৬ মিঃমিঃ-য়ে নিতান্ত স্বল্পবাজেটের ছবিও রয়েছে। রয়েছে সুবিশাল ঐতিহাসিক ক্যানভাসকে ধরার ব্যাপক প্রচেষ্টা, আবার সম্পূর্ণ উত্তর-আধুনিক নানা চলচ্চিত্রিক নিরীক্ষাও।

আজ থেকে প্রায় পাঁচ যুগ আগেই শেক্সপীয়ারের চলচ্চিত্র-সম্ভাবনা নিয়ে বিতর্ক উঠেছিল। হার্লি গ্রানভিল-বেকার  বললেন যে জর্জ কুকোর  বা রাইনহার্ডের  ছবিগুলিতে শেক্সপীয়ারের সংলাপ-ঋদ্ধতার প্রতি সামান্যই সুবিচার করা হয়েছে। ওঁর মতে চলচ্চিত্র ও নাটক একেবারেই দুই মেরুর দুই শিল্প এবং ভাল হয় চলচ্চিত্রকার যদি শুধুমাত্র শেক্সপিয়ারের গল্পটি নিয়ে তা দিয়ে ছবি তৈরি করেন।

আলফ্রেড হিচকক এই দৃষ্টিভঙ্গীর বিরুদ্ধে তীব্র আপত্তি জানিয়ে বলেছিলেন যে, যথার্থ লোকেশন শুটিংয়ের মাধ্যমে মঞ্চের কৃত্রিমতা থেকে বরং শেক্সপীয়ারকে উদ্ধার করার এক অপার সম্ভাবনা চলচ্চিত্রের রয়েছে।

বস্তুত চলচ্চিত্র এমন এক শিল্প যা সময়কে ভাঙ্গতে পারে- মন্তাজ, গড়তে পারে― mise-en-scene, এগোতে পারে – ফ্লাশ ফরোয়ার্ড, পিছাতে পারে- ফ্লাশব্যাক, স্থির ধরে রাখতে পারে – ফ্রীজশট্। সময়কে নিয়ে এত বেশী খেলতে আর কোনো শিল্পই কি পারে? ফলে যে কোন ধ্রুপদ সাহিত্যের চলচ্চিত্রে নিরীক্ষার সম্ভাবনা অসীম। খুব তাৎপর্যপূর্ণ একটা কথা বলেছিলেন গ্রেগরী কুজনেৎসভ; `মঞ্চের চেয়ে সিনেমার সুবিধা এইখানে যে চলচ্চিত্রে শুধুমাত্র যে ঘোড়া দেখানো যায় তা নয়, একজন মানুষের চোখের দৃষ্টির ক্লোজ আপও ধরা যায়, আর এটা ছাড়া শেক্সপীয়ারের জন্যে সিনে-ক্যামেরা বসানো অর্থহীন।”  আর যেভাবে পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে শেক্সপীয়ারের ছত্রিশটি নাটক নানাভাবে চলচ্চিত্রায়িত হয়েছে, হ’চ্ছে এবং যেভাবে চলচ্চিত্রমাধ্যমটি এ যুগে এক বিশাল গণভিত্তি পেয়েছে, এ কালে জন্মালে শেক্সপীয়ার হয় তো বলতেন, জগৎ মঞ্চ নয়, এক-পর্দা !

১৯৪৪ সালে লরেন্স অলিভিয়ারের `পঞ্চম হেনরী’ চলচ্চিত্ররূপে আবির্ভূত হলে সমালোচকরা উপলব্ধি করলেন শেক্সপীয়ারের নাটককে পর্দায় জীবন্ত উপস্থিত করার কী অপার সম্ভাবনা চলচ্চিত্রের রয়েছে ! ১৯৪৮ সালে অলিভিয়ারের `হ্যামলেট’ এ ধারণাটাকে আরো পোক্ত করল। একই বছর মুক্তি পেল অরসন ওয়েলসের `ম্যাকবেথ’। অলিভিয়ারের `হ্যামলেট’ ছিল অনেকটাই মঞ্চের পরিবর্ধিত রূপ। কিন্তু ওয়েলসের `ম্যাকবেথ’ যথার্থই সিনেমাটিক – এক সম্পূর্ণ চলচ্চিত্র।

শেক্সপীয়ার মঞ্চে ও পর্দায় – মাত্রিকতার রকমফের

থিয়েটার বাস্তবতার মায়া (illusion) তৈরি করে। চলচ্চিত্রও তাই-ই করে। দ্বিমাত্রিক চলচ্চিত্রপর্দাকে এই বিভ্রম সৃষ্টি করতে হয় যে তা ত্রিমাত্রিক। কাজটা সর্বদা সহজ নয়। বিশেষ করে শেক্সপীয়ারের মত ধ্রুপদ কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে। তবে দর্শকদের যৌথভাবে দেখার ব্যাপারটিতে চলচ্চিত্র ও থিয়েটারের চরিত্র প্রায় সমগোত্রীয়। উভয় ক্ষেত্রেই মিলনায়তনে এক সঙ্গে বহু মানুষ বসে কোনো শিল্পকর্ম একত্রে দেখার যে অভিজ্ঞতা, তা ঘরে একা বা পরিবারের কয়েকজন টিভির ছোট পর্দায় কিছু দেখার চেয়ে একেবারেই ভিন্ন।

যে কোন শেক্সপীয়ার চলচ্চিত্র-নির্মাতাকেই এই দুইয়ের দ্বন্দ্বে ভুগতে হয় যে তিনি কোন্ ধারাটাকে বেশি অনুসরণ করবেন, ছাপার অক্ষর না মঞ্চ ? হয়তো সেই শেক্সপীয়ার-চলচ্চিত্রগুলিই সেরা হয়েছে যেখানে নির্মাতা ধরে নিয়েছেন যে দর্শক নাটকটি জানেন। বস্তুত ক্যামেরার অবস্থান, দূরত্ব ও লেন্স নির্বাচনের মাধ্যমে একজন চলচ্চিত্রকার দর্শকের চিন্তার ধারাকে অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করে ফেলার স্বাধীনতা পান। এখন প্রশ্ন, একটা শেক্সপীয়ার-চলচ্চিত্র হবে কি শুধুই কমিক বইয়ের মত গল্পের সচিত্র চিত্ররূপ মাত্র ? অবশ্যই নয়। মানুষ যখন কোনো শেক্সপীয়ার-চলচ্চিত্র দেখেন, তখন এই নতুন মাধ্যমটির কাছে শুধুমাত্র দৃশ্যের চিত্ররূপ নয়, ধ্রুপদ নাটকটির একটা নতুন ব্যাখ্যাও প্রত্যাশা করেন।

মঞ্চনাটকের কিছু প্রাথমিক ধারণা, যেমন কোন ব্যক্তিচরিত্রের উপর সুনির্দিষ্টভাবে আলো ফেলা, শানিয়ে তোলা সংলাপ এবং চরিত্রদেরকে প্রয়োজনের মুহূর্ত মাত্র বেশি দেখানো― চলচ্চিত্রে অচল। তবে মঞ্চের দৃশ্য-পরিবর্তনের ঝুট-ঝামেলা চলচ্চিত্রে সম্পাদনার সময়ে কাট্-য়ের মাধ্যমে অনেক দ্রুততর করার সুযোগ রয়েছে।

আরেকটি যে উপায় চলচ্চিত্রকারের তুণে রয়েছে তা হচ্ছে যথার্থ লোকেশনে যথার্থ দৃশ্য বাস্তবভাবে শুট্ করা। যেমন কিং লীয়ারের হীথ-দৃশ্য কোনো প্রকৃত বিরান প্রান্তরে তোলা কিংবা গড়ে নেওয়া যথার্থ আবহের পশ্চাৎভূমিটি। যেহেতু শেক্সপীয়ারের নাটক অভিনীত হোত সহজ সরল প্রায় শূন্য এলিজাবেথীয় প্রসেনিয়াম মঞ্চের জন্যে (হয়তো একট ব্যালকনি বা একটা ভেতরের ছোট কুঠূরী মাত্র ছিল বাড়তি মঞ্চস্থাপত্য), ফলে শেক্সপীয়ারের চলচ্চিত্র-নির্মাতাদের প্রয়োজন রয়ে যায় নিজের মত করে প্রয়োজনীয় দৃশ্যরূপটা গড়ে তোলার। কিন্তু চলচ্চিত্রে ক্যামেরা গতিশীল। ফলে মঞ্চের স্থিরীকৃত কম্পোজিশনকে চলচ্চিত্রে সদাই পরিবর্তনশীল হতে হচ্ছে। সেক্ষেত্রে যাঁরাই নাটক বা সংলাপকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র করেন তাদের সেট ডিজাইন নাটকের সেট ডিজাইন থেকে পৃথক হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে শেক্সপিয়ারের নাটকের দৃশ্যপট নিয়ে একটি কথা বলতে চাই। তা’ হ’চ্ছে এ যুগের দৃষ্টিভঙ্গীতে দৃশ্যপট সৃষ্ট নয়, ষোড়শ শতকের এলিজাবেথীয় দর্শক যেভাবে কল্পনা করতেন, সে ভাবে সৃষ্ট হলেই বরং তা হয় তো শেক্সপীয়ারের চিন্তার বেশী কাছাকাছি হবে।

তবে চলচ্চিত্রের এক বিশেষ বাড়তি সুবিধা রয়েছে― ক্লোজ আপ। ম্যাকবেথের রক্তাক্ত হাত, রোমিওর ছোঁয়া পেয়ে জুলিয়েটের মুখের সুখানুভূতি, ঝড়-দৃশ্যে বৃদ্ধ লীয়ারের চোখে এক ফোঁটা অশ্রু, ক্লোজআপে এসব দেখানোর মাধ্যমে এক নিগূঢ় শিল্পানুভূতি সৃষ্টির  বাড়তি ক্ষমতা চলচ্চিত্রের রয়েছে।

এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে, সব গুরুত্বপূর্ণ শেক্সপীয়ার-চলচ্চিত্রের পেছনেই একটা নাট্য-মঞ্চায়নের ইতিহাস রয়েছে। কুজনেৎসভ ‘হ্যামলেট’ ও ‘কিং লীয়ার’ চলচ্চিত্র নির্মাণ করার আগে মঞ্চে প্রযোজনা করেছেন। অলিভিয়ের সব কয়টি শেক্সপীয়ার চলচ্চিত্রই পর্দার আগে মঞ্চে প্রযোজনা করেছেন। পিটার ব্রুক-পল স্কফিল্ডের ‘কিং লীয়ার” তাঁদের মঞ্চ-প্রযোজনারই পরিবর্ধিত রূপ। এ যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রিক ইমেজস্রষ্টা তারকোভস্কি মঞ্চে ‘হ্যামলেট’ করেছিলেন। এই অতৃপ্ত দুঃখবোধ রয়েই গেল পর্দায় তিনি কী ভাবে ডেনমার্কের যুবরাজকে আনতেন তা আমরা আর কখনোই দেখতে পাব না!

ইংরেজ জাতির অতিরিক্ত শেক্সপীয়ার-ভক্তি তাদেরকে শেক্সপীয়ারের ক্ষেত্রে করে তুলেছে কিছুটা আড়ষ্ট ও রক্ষণশীল যা শেক্সপীয়ারের সৃজনশীল নিরীক্ষায় বাঁধা সৃষ্টি করে এসেছে। ফলে দেখি শেক্সপীয়ারের নাটকের সবচে সাহসী, সবচে’ যুগোপযোগী সৃজনশীল নিরীক্ষার কেন্দ্র ক্রমশ লন্ডনের মঞ্চ হতে অন্যত্র, যেমন- পূর্ব ইউরোপের দিকে সরে গিয়েছে। শেক্সপীয়ার চলচ্চিত্রের ক্ষেত্রেও ঘটেছে এই একই রকম বিকেন্দ্রীকরণ। সেরা শেক্সপীয়ার-চলচ্চিত্রকারেরা— কুরোশাওয়া, কুজনেৎসভ, অরসন ওয়েলস, জেফিরেল্লী এঁরা কেউই ইংরেজ নন।

শেক্সপীয়ারের রূপান্তর— সংলাপে ও ইমেজে এবং শিল্পসঙ্গততার প্রশ্ন

সেই নির্বাক যুগেই, ১৯১৬ সালে এডউইন থানহাউজার ‘কিং লীয়ার’ নিয়ে উল্লেখযোগ্য ছবি তৈরি করেছিলেন। ডি, ডব্লিউ, গ্রিফিথ করেছিলেন ‘দি টেমিং অব দি শ্রু’ (১৯০৮)। ছবিটি দেখিনি। তাই জানি না সেই বাক্যহীন পর্দায় গ্রিফিথ ঠিক কী ভাবে মুখরা রমণীকে বশীকরণ করেছিলেন !

একজন চলচ্চিত্র-পরিচালক শেক্সপীয়ারকে পরিবর্ধন ও পরিমার্জনে কতখানি স্বাধীনতা নেবেন, এটা এক বড় বিতর্ক। চলচ্চিত্রের মুল কাজ ইমেজ বা চিত্রকল্প সৃষ্টি করা, রবীন্দ্রনাথ যাকে বলতেন ‘রূপের চলৎপ্রবাহ’। চলচ্চিত্রে কথা বেশি থাকলে তা চিত্রকল্পের চলৎপ্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আর শেক্সপীয়ারের ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বহুমাত্রিক, এর পরতে পরতে জড়িয়ে আছে কাব্যসুষমা, প্রতীক ও রূপক। ফলে শেক্সপীয়ারের এই ঋদ্ধ ভাষার অন্তর্নিহিত কাব্যশক্তির পরিপূর্ণ ও যথার্থ চিত্ররূপ দেয়া মোটেই সহজ কাজ নয়। মঞ্চে অন্য আর সব কিছুই সংলাপের অধীন, কিন্তু চলচ্চিত্রে সংলাপও চিত্রকল্পের অধীন, তা সে আত্মকথন, স্বগতোক্তি বা নেপথ্য-সংলাপ যাই-ই হোক না কেন। সংলাপ দীর্ঘ হলে চলচ্চিত্রে সংলাপের মাঝে ইন্টারকাট করে বাকি সংলাপটি পরে দেবার সুযোগ অবশ্য চলচ্চিত্রকারের রয়েছে। এতে দৃশ্যের একঘেঁয়েমিটা কমে। অরসন ওয়েলস ওঁর ‘ফলস্টাফ’ বা ‘চাইম্স অব মিডনাইট’ (১৯৬৫) ছবিতে স্বগতোক্তিকে সংলাপে রূপান্তরিত করে অন্য চরিত্রদের মাধ্যমে তা শুনিয়েছেন। শেক্সপীয়ারের প্রথম দিককার নাটক, যেখানে দীর্ঘ লিরিক্যাল সব সংলাপ রয়েছে এবং যেখানে অনেক ক্ষেত্রে, এসব দীর্ঘ সংলাপই নাটকটির শক্তি, তার চেয়ে ওঁর পরিণত জীবনের মহত্তম ট্রাজেডিগুলিই, যেখানে শুধু সংলাপ নয়, পরিবেশ ও আবহও একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, ভালো চলচ্চিত্রায়নের জন্যে তা বেশী উপযোগী বলে প্রতিভাত হয়েছে।

          তবে চলচ্চিত্রে সমস্যা হয় কি, যেমন ধরা যাক ‘ম্যাকবেথ’ -য়ের ডাইনীরা কিছু বলছে। মঞ্চে সংলাপটার দিকেই দর্শকের মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব। কিন্তু পর্দায় দর্শকরা ডাইনীরা কি বলছে তার চেয়ে বেশি আগ্রহ দেখায় ডাইনীরা তাদের চুলোর হাঁড়িতে কি কি জিনিস ফেলছে! ফলে চলচ্চিত্রকে বাস্তববাদী হতেই হয়। ‘ম্যাকবেথ’-য়ের জঙ্গলকে জঙ্গলই হতে হয়, ভেরোনা শহরের চত্বরকে হতে হয় শহরেরই চত্বর। মাধ্যমগত এই পার্থক্যের কারণে একজন চলচ্চিত্রকার শেক্সপীয়ারের নাটকের কোনো বিশেষ অংশ বাদ দিতে পারেন। আবার কখনো বাদ দিতে পারেন বিষয়বস্তুগত কারণেও। যেমন অলিভিয়ের ওঁর ‘পঞ্চম হেনরী’ (১৯৪৪) -তে মূল টেক্সটের অনেক অংশ, যেসব জায়গায় হেনরীর নিষ্ঠুরতা প্রতিফলিত, যেমন হেনরী যখস ফরাসী বন্দীদের হত্যার আদেশ দিচ্ছে কিংবা বলছে ধর্ষণের কথা, এসব অংশ বাদ দিয়েছেন। এ বিয়োজন বিষয়বস্তুগত বিয়োজন, যেরকম বিষয়বস্তুগত বিয়োজন ও পরিবর্তন সত্যজিৎ রায়ও করেছেন রবীন্দ্রনাথের পোস্টমাস্টার বা চারুলতা (নষ্টনীড়)-র চলচ্চিত্রায়নে।

অলিভিয়ারের হ্যামলেট : ফ্রয়েডীয় ক্যামেরা অ্যাঙ্গেল, সিঁড়ির ট্রাকশট্ ও

এক অভিমানী যুবরাজ

সেই ১৯১০ সালেই ‘হ্যামলেট’ নিয়ে ছবি হয়েছে। খোদ ডেনমার্কেই। পরিচালক আগস্ট ব্লুম। হয়েছে চলচ্চিত্র যখন একেবারেই হাঁটি হাঁটি, একটা ম্যাজিক মাধ্যম মাত্র, সেই ১৯০০ সালে। করেছিলেন ক্লিমেন্ট মরিস। অভিনয়ে সারা বার্নহার্ডট। তবে এ পর্যন্ত ডেনমার্কের যুবরাজকে নিয়ে যে অসংখ্য চলচ্চিত্র পৃথিবীর দেশে দেশে তৈরি হয়েছে, তার মধ্যে সবচে আলোচিত নিঃসন্দেহে লরেন্স অলিভিয়ারের ‘হ্যামলেট’ (১৯৪৮), ইনোকেন্তি স্মকতুনোভস্কি অভিনীত গ্রেগরী কুজনেৎসভের ‘হ্যামলেট’টি (১৯৬৫) এবং ফ্রাঙ্কো জেফিরেল্লীর ‘হ্যামলেট’ (১৯৯০)।

যুবরাজ হ্যামলেটের দু’টি মিশন। একটি ব্যক্তিগত প্রতিশোধ ‘‘a father killed, a mother stained”। আরেকটি সামাজিক-রাজনৈতিক ‘‘to set (it) right ……the pursy times”। আর এই দুই কাজেরই শত্রু ও লক্ষ্য— রাজা ক্লডিয়াস। অলিভিয়ার তাঁর ‘হ্যামলেট’ -য়ে অবশ্য প্রথম দিকটির উপরই বেশি জোর দিয়েছেন। ‘এ এমন এক মানুষের ট্রাজেডি যে মনস্থির করতে পারেনি’ – হ্যামলেট সম্পর্কে এই হচ্ছে অলিভিয়ারের মূল্যায়ন। আর তা উপস্থাপনে অলিভিয়ার যে দৃষ্টিভঙ্গী বেছে নেন, তা – ফ্রয়েডীয়। লিঙ্গীয় তীক্ষ্নতায় বর্শা ও ছুরির উত্থিত অবস্থান, দীর্ঘ সঙ্কীর্ণ করিডোরের শেষে যোনির চিত্রকল্পে গাট্রুর্ডের ঢাকা বিছানা এবং গাট্রুর্ডরূপী ভরা যৌবনের সাতাশ বছর বয়েসী অভিনেত্রী আইলিন হারলি ও পুত্র হ্যামলেটের সম্পর্কের কামজ ইঙ্গিত, এটাই তুলে ধরে যে অলিভিয়ার ওঁর ‘হ্যামলেট’- য়ে ব্যাপকভাবেই ফ্রয়েড দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। হ্যামলেট ও গাট্রুর্ড প্রেমিক-প্রেমিকার মত চুম্বন খায়, বিছানায় তাদের ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ রূপ নেয় যৌনাত্মক ভঙ্গীমার। এসবই ‘হ্যামলেট’ সম্পর্কে অলিভিয়ারের ঈডিপীয় ধারণার চলচ্চিত্রিক প্রকাশ। এটা কৌতূহলোদ্দীপক যে, যে বছর অলিভিয়ার সফোক্লিসের ‘ঈডিপাস’ মঞ্চস্থ করেন তার পরের বছরই ‘হ্যামলেট’ ছবিটি নির্মাণ করেন। অবশ্য চলচ্চিত্রায়নের জন্যে অলিভিয়ার নাটকটির শরীরে এত পরিবর্তন-পরিবর্ধন করেছেন যে উনি নিজেই বলতে চাইতেন ওঁর ছবিটি ‘হ্যামলেট’ নয়, ‘An Essay on Hamlet.’

বিষয়বস্তুগতভাবে অলিভিয়ার যেসব জায়গায় মূল পাঠ থেকে সরেছেন, তার মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য হচ্ছে শেষ দৃশ্যে গাট্রুর্ড যেন জেনেশুনেই বিষপান করে। এক ধরণের সচেতন আত্মহত্যাই, যার উদ্দেশ্য যেন ক্লডিয়াসের অশুভ বন্ধন থেকে ছিন্ন হয়ে হ্যামলেটের সঙ্গে একাত্ম হওয়া।

তবে অলিভিয়ার ওঁর ছবিতে চলচিত্র মাধ্যমটির ব্যবহারে যথেষ্ট চলচ্চিত্রিক চেতনার পরিচয় দিয়েছেন। ক্যামেরার কোণ ও অবস্থানে বিভিন্নতা এনে দুর্গের সিঁড়ির নানা রকম ব্যবহার করেছেন খুবই সৃজনশীলভাবে। সিঁড়ির এই মোটিফটি মাউজট্রাপ-দৃশ্যে, ওফেলিয়া-দৃশ্যে, তরবারী -খেলার দৃশ্যে এবং শেষ দৃশ্যেও খুবই বুদ্ধিদীপ্তভাবে ব্যবহৃত হয়েছে।

যে শট্টিতে পাহাড়ের কোণায় আত্মহত্যায় উদ্যত ‘হ্যামলেট’ ছুরিটি ফেলে দেয় নীচের সাগরে, আমরা দেখি প্রচন্ড ঢেউ আছড়ে পড়ছে পাহাড়ের পাদদেশে। এ যেন যথার্থই ‘‘Sea of troubles”-এর দৃশ্যগত প্রতীকীরূপ !

যে দৃশ্যটিতে পলেনিয়াস ওফেলিয়াকে হ্যামলেটের ভালবাসা সম্পর্কে সাবধান করে দিচ্ছে আমরা দেখি ডীপ ফোকাস ফটোগ্রাফির এক খুবই শৈল্পিক ব্যবহার করেছেন অলিভিয়ার। উদ্ভ্রান্ত ওফেলিয়া দেখছে প্রায় শত ফুট দূরে হ্যামলেট চেয়ারে বসে। হ্যামলেট পলেনিয়াসকে দেখতে পাচ্ছে না, দেখছে শুধু ওফেলিয়ার ভঙ্গিমা, যেন সে তার ভালবাসাকে প্রত্যাখ্যান করছে। এ শট্টি থেকেই দুই প্রেমিক-প্রেমিকার ভালবাসার মধ্যে অবিশ্বাসের বীজ অংকুরিত হোল। কোনো কোনো সমালোচক এ দৃশ্যকে যথার্থই বলেছেন; ‘‘Longest distance love-scene on record”!

‘টু বি অর নট টু বি’ স্বগতোক্তি দৃশ্যে মিড্শটে হ্যামলেট চিবুকে হাত দিয়ে চেয়ারে চিন্তিতভাবে বসে। পরে নাট্যদল এল। দেখি হ্যামলেট অত্যন্ত পেশাদারী দক্ষতায় নাট্যদলটিকে দিচ্ছে ‘মাউজট্রাপ’- য়ের মহড়া। সূক্ষ্ম ক্যামেরা কোণ ও অবস্থানের পরিবর্তনের মাধ্যমে চেয়ারটা একটা প্রপস্ থেকে পরিবর্তিত হয়ে গেল পরিচালকের চেয়ারে। খুবই বুদ্ধিদীপ্ত এক সিনেমাটিক রূপান্তর তা।

যখন আমরা সফোক্লিসের ‘ইডিপাস,’ শেক্সপীয়ারের ‘হ্যামলেট’, কিং লীয়ার’ বা ব্রেশটের ‘ককেশিয়ান চক সার্কেল’- য়ের মত বিশ্বজয়ী ধ্রুপদ নাটকসমূহ নিয়ে কথা বলি, তখন এই সচেতনতাটা দরকারী যে এগুলি শিল্পের কোনো হঠাৎ তাৎক্ষণিক সৃষ্টি নয়। এসব ধ্রুপদ সৃষ্টির পেছনে রয়েছে শত শত বছরের লোক-ঐতিহ্য ও মানবপ্রজ্ঞার এক সমষ্টিগত বহিঃপ্রকাশ। সপ্তদশ শতকে এসে বোঝা গেল যে, রেনেসাঁর স্বপ্ন সামান্যই বাস্তবায়িত হয়েছে। বুর্জোয়ার লক্ষ্য ছিল মুনাফা। যে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় মুনাফা নেই, তাতে তার সামান্যই আগ্রহ। রেনেসাঁর প্রথম যুগের মুক্তবুদ্ধি ও মানবতার জয়গানের পরে এই পিছু হটায় অনেক শিল্পী তাই নিরাশ হয়েছিলেন। ইংল্যান্ডে নাটকের রমরমা বিকাশকে সমাজপ্রভূ পিউরিটানরা খর্ব করতে চেয়েছে, ইতালীতে ব্রুনোকে পুড়িয়ে মারা হো’ল, গ্যালিলিওকে বাধ্য করা হোল মুচলেকা দিতে। ফলে রেনেসাঁ উচ্ছ্বাসের পরেই দেখি একটা নৈরাশ্যবাদী পর্যায়, দ্য ভিঞ্চি বা টমাস মুরের শেষ জীবনের লেখাগুলি যার ইঙ্গিতবহ। এল এক বিষন্নতার যুগ, নাটকে- ওয়েবস্টার, টার্নার, স্থাপত্যে – বারোক। এই বিষন্নতা ও সংশয় শেক্সপীয়ারও দেখিয়েছেন- ‘মেজার ফর মেজার’, এবং ‘হ্যামলেট’- য়ে তো বটেই।

হ্যামলেট নাটক পরিচালনা করে, চিঠি জাল করে, দক্ষতার সঙ্গে ডুয়েল লড়ে, পলোনিয়াসকে হত্যা করে- সে নিষ্কর্মা নয় মোটেই। তবে সে বড্ড বেশী ভেবেছিল। কথাও বেশী বলেছিল কাজের চেয়ে, যা লেয়ার্তেস করেনি। পুরোপুরি সামন্ত মূল্যবোধে আচ্ছন্ন লেয়ার্তেস পিতার হত্যার প্রতিশোধ নেবার ব্যাপারে সংশয়হীন। কিন্তু উইটেনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র হ্যামলেট রেনেসাঁর আলো পেয়েছে, শুনেছে দূরলোকের মানবতার হাতছানি। প্রচলিত মত ও পদ্ধতির প্রতি তার সংশয় তো তাই স্বাভাবিকই। তবে হ্যামলেটের অতিরিক্ত দোদ্যুলমানতা কিম্বা ওথেলোর অতি দ্রুত বিপজ্জনক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এর কোনোটাই যেন ঠিক শেক্সপীয়ারের পছন্দপুষ্ট নয়, কারণ দেখি এসব পথ চরিত্রদের জীবনে ভয়ঙ্কর পরিণতিকে ঠেকাতে পারেনি।

তবে ডেনমার্কের এই অভিমানী যুবরাজটি চিরকালই আগামীর মানুষের কাছে প্রিয় রইবে কারণ তার প্রতিবাদের অবস্থানে সে হার মানেনি এবং মৃত্যুর মুহূর্তেও আগামী প্রজন্মের মানুষের কাছে সে পৌঁছে দিতে চেয়েছে তার সংগ্রামের কাহিনী। কেই-না ভালবাসবে সেই প্রতিবাদী তরুণটিকে শত বাঁধার মাঝে দাঁড়িয়েও যে বলে; ‘Call me what instrument you will, though you fret me, you cannot play upon me”!

হ্যামলেট চরিত্রের এই প্রতিবাদী দিকটির উপরই বেশি জোর দিয়েছেন গ্রেগরী কুজনেৎসভ ওঁর ‘হ্যামলেট’ (১৯৬৫) ছবিটিতে। বস্তুত শেক্সপীয়ারের হ্যামলেট, কর্ডেলিয়া বা পোর্শিয়া তো এক ধরনের মুক্তিদাতাই। হ্যামলেট ও কর্ডেলিয়া ব্যর্থ হয়েছিল কারণ তারা এসেছিল তরবারী হাতে, কিন্তু পোর্শিয়া সফল হয়েছিল কারণ এই নবযুগের চাতুর্যপূর্ণ অশুভের বিরুদ্ধে পোর্শিয়া সজ্জিত হয়ে এসেছিল বুদ্ধির অস্ত্রে।

কুজনেৎসভ যখন ‘হ্যামলেট’ করলেন তখন কথা উঠেছিল যে অলিভিয়ার যা করেছেন তার চেয়ে উন্নত কোনো হ্যামলেট-ছবি তৈরি কি সম্ভব? কুজনেৎসভের ‘হ্যামলেট’ প্রমাণ করেছে যে তা খুবই সম্ভব। অভিনয়ে ইনোকেন্তি স্মকতুনোভস্কি কিছু কম যাননি লরেন্স অলিভিয়ারের চেয়ে। আর সিনেমাটিক উপস্থাপনায়, বিশেষ করে আবহসঙ্গীতের ক্ষেত্রে, কুজনেৎসভের ‘হ্যামলেট’, এক কথায় অনন্য। আর এককভাবে কুজনেৎসভের কয়েকটি দৃশ্য, বিশেষ করে ওফেলিয়ার উন্মাদ-দৃশ্যটি তো― অসাধারণ।

          তবে এই দুই ‘হ্যামলেট’- য়ের মূল পার্থক্য অবশ্যই নাম-চরিত্রের মূল্যায়নে। অলিভিয়ার হ্যামলেটকে বুঝতে চেয়েছেন ফ্রয়েডের তত্ত্বের মাধ্যমে, কুজনেৎসভ― মার্কসের। ফলে পার্থক্যটা দর্শনগতই। অলিভিয়ারের হ্যামলেট একজন বিবেকতাড়িত একক যুবক যে অশুভ শক্তির দ্বারা লাঞ্ছিত। কিন্তু ইনোকেন্তির হ্যামলেট একজন মুক্তিদাতা তরুণ যাকে কর্তৃপক্ষ ডেনমার্ক নামক কারাগারে আটকে রেখেছে। এ হ্যামলেট একজন সংবেদনশীল আধুনিক মানুষ ফিলিস্টাইন রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে যে লড়ছে— একা। যে বিশদতায় কুজনেৎসভ দেখান ক্লডিয়াসের হ্যামলেটবিরোধী সূক্ষ্ন প্রচারণা, গুপ্তচরবাহিনী ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার নানা শক্তি, তার ফলে ক্লডিয়াস যথার্থই হয়ে ওঠে এ যুগেরও এস্টাব্লিশমেন্টের প্রতীক।

জেফিরেল্লীর ‘হ্যামলেট’ (১৯৯০) যেন এই দুইয়ের মাঝামাঝি। গাট্রুর্ড এখানেও এক যৌনাবেদনময়ী নারী। হ্যামলেট যখন গাট্রুর্ডের কাছে প্রতিবাদে মুখর, তখন ক্যামেরায় ধরা শরীরী আন্দোলনকে মনে হয় যেন কামজ আন্দোলন। গাট্রুর্ডও হ্যামলেটকে চুম্বন করে প্রেমিকার মতই।

জেফিরেল্লীর চিত্রনাট্য গতিশীল। যদিও হ্যামলেটের পিতার প্রেতাত্মাটি তেমন বিশ্বাসযোগ্য ঠেকেনি। কিছুটা মঞ্চঘেঁষা ছবি জেফিরেল্লীর। তবে গোটা দুর্গটাকে একটা বিশাল মঞ্চের প্রতিরূপ ধরে নেয়াতে বিষয়টা উৎরে গেছে। গাট্রুর্ড ঘোড়া চালিয়ে বেড়াতে যাচ্ছে ক্লডিয়াসের সঙ্গে। উপরের দরজায় দাঁড়িয়ে হ্যামলেট বলে; ‘‘Frailty thy name is woman” । তারপরেই হ্যামলেট দরজার কপাট বন্ধ করে দেয়। এ যেন হ্যামলেটের নিজের মধ্যে গুটিয়ে যাওয়ারই প্রতিকী রূপ। বেশ সিনেমাটিক। ক্লোজ আপেরও বেশ কিছু ভাল ব্যবহার করেছেন জেফিরেল্লী। যেমন হ্যামলেটের হাতের ক্লোজ আপ― মাটি নিয়ে পিতার সমাধির উপর দিচ্ছে। ছবিটাতে সিঁড়িকে জেফিরেল্লী বিশেষভাবেই ব্যবহার করেছেন। হ্যামলেট সুউচ্চ সিঁড়ি বেয়ে অনুসরণ করে পিতার প্রেতাত্মাকে, কিম্বা ওফেলিয়া-দৃশ্যেও, সিঁড়ির ব্যবহারটা বুদ্ধিদীপ্ত। আর ‘টু বি অর নট টু বি’-র স্বগতোক্তি দৃশ্যটি তো বেশ ব্যতিক্রমীভাবেই জেফিরেল্লী ধারণ করেন মাটির নীচের সমাধিস্থলে।

জলে ওফেলিয়ার মৃতদেহ ভাসছে। ক্যামেরা tilt up করে, জেফিরেল্লী দেখান দিগন্ত বিস্তৃত নীল সমুদ্র। প্রকৃতিকেও যেন একটা ভূমিকা দিতে চায় জেফিরেল্লীর ক্যামেরা। ‘‘Readiness is all” হ্যামলেট এ কথা বলার আগে ক্ষণিকের জন্যে সূর্যাস্তের একটা শট্ প্রতিস্থাপন করেন জেফেরেল্লী। একটা মহাকাব্যিক রূপ যেন দিতে চান হ্যামলেটের বক্তব্যের। ছবির শেষ দৃশ্যে, ‘‘Rest is silence”– হ্যামলেট মৃত, পাশে উপবিষ্ট বিষন্ন হোরেশিও। ক্যামেরা ধীরলয়ে জুম আউট করে। গোটা পরিপ্রেক্ষিতটাই মনে হয় যেন এক বিশাল মঞ্চ। জীবনটাই এক মঞ্চ― বলেছিলেন বটে শেক্সপীয়ার। এবং জেফেরেল্লী শেক্সপীয়ারের এই ধারণার প্রতি যথেষ্টই সুবিচার করেছেন।

অরসন ওয়েলস ও লিজা হোয়াইটের ‘ওথেলো’ :

ঈর্ষা ও বর্ণবাদের দ্বান্দ্বিকতা

শেক্সপীয়ারের সেই সিংহহৃদয় কিন্তু দুর্ভাগ্যতাড়িত কৃষ্ণাঙ্গ মুর নিয়ে নির্মিত উল্লেখযোগ্য ছবিগুলো হচ্ছে অরসন ওয়েলসের ‘ওথেলো’ (১৯৫২), টনি রিচার্ডসনের ‘ওথেলো’ (১৯৫৫), স্টুয়ার্ট বার্জের লরেন্স অলিভিয়ার অভিনীত ‘ওথেলো’ (১৯৬৫), রুশ সের্গেই ইয়ুৎকেভিচের ‘ওথেলো’ (১৯৫৫)- নাম ভূমিকায় সের্গেই বান্দারচুক, জেফেরেল্লীর অপেরা-ছবি ‘ওথেলো’ (১৯৮৫) এবং লিজ হোয়াইটের সম্পূর্ণ এক কৃষ্ণাঙ্গ ইউনিটের আফ্রো-আমেরিকানীয় ‘ওথেলো’ (১৯৮০)।

          প্রতিভাবান ও ব্যতিক্রমী মার্কিন পরিচালক অরসন ওয়েলসের শেক্সপীয়ার-বিষয়ক ছবি তিনটি― ‘ম্যাকবেথ’ (১৯৪৮) ‘ওথেলো’ (১৯৫২) এবং ‘চাইম্স অব মিডনাইট’ (১৯৬৫)।  অরসন ওয়েলস সব সময়ই এমন চরিত্র নিয়ে কাজ করতে পছন্দ করেছেন যারা বিশাল মাপের এবং যাদের মনোজগতের দ্বন্দ্বের মাঝে সেই বিশেষ যুগের দ্বন্দ্বটা ফুটে ওঠে, ‘সিটিজেন কেন” যার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ফলে এটা যেন স্বাভাবিক ছিল যে ওয়েলস ওথেলোকে নিয়ে ছবি করতে চাইবেন। অত্যন্ত কষ্টকর অর্থ-সমস্যার কারণে ওয়েলস ছবিটি নির্মাণ শেষ করেছেন দীর্ঘ চার বছরে। ফলে ছবিটাতে বেশ কিছু কারিগরি ত্রুটি রয়ে গেছে।

তাঁর আরো অনেক ছবির মত ‘ওথেলো’-তেও ওয়েলস ছবির শেষ শট্টি দিয়ে ছবিটি শুরু করেছেন। আর সে শট্ হচ্ছে পাহাড়ের উঁচুতে এক শূন্য খাঁচাটি যাতে ইয়াগোকে শেষে ঝোলানো হবে। গোটা ছবিতে চারবার এই শূন্য খাঁচার শট্ ফিরে ফিরে আসে- একটা leitmotif – য়ের মত।

‘ওথেলো’ ছবিটির প্রথম অংশে অরসন ওয়েলস যেভাবে বিশাল দালানকোঠার স্থিতি ও শান্ত জলরাশিকে দেখিয়েছেন তা নাটকের প্রথম অঙ্কের সব কিছু শান্ত ও স্বাভাবিক, স্থিতির এই রূপটাকেই তুলে ধরেছে যথার্থভাবে। এর সঙ্গে প্রতিতুলনীয় সাইপ্রাসের শট্গুলি যেখানে বাঁকানো পিলার, মাটির নিচের পথ, ভয়ঙ্কর খাঁড়ি ও সমুদ্রগর্জন নিয়ে সাইপ্রাস মূর্ত হয়ে ওঠে অশুভের পীঠস্থান হিসেবে— যে সাইপ্রাসে ইয়াগো রাজত্ব করে।

          ওথেলোর ইর্ষা যত তীব্র হতে থাকে ওয়েলস ততই সিনেমাটিক কিছু উপাদানের মাধ্যমে পর্দায় একটা বিশৃঙ্খল আবহ সৃষ্টি করেন। ছবির প্রথমে ওথেলোকে আমরা দেখি পরিষ্কার আলোতে। তারপরে ক্রমশ দেখি- ছায়াতে। সাউন্ডট্রাকেও প্রথম অংশের ধীরলয়ের ছন্দোময় শব্দাবলীর জায়গা নেয় ক্রমশ: তালহীন কর্কশ সব আওয়াজ, এক যথার্থ বিশৃঙ্খলতা, যেন ওথেলোর কথারই প্রতিচ্ছবি; ‘‘And when I love thee not, chaos is come again”।

          ‘ওথেলো’ শেক্সপীয়ারের এমন একটি নাটক যেখানে সময় উপাদানটি উল্লেখিত হয় বারে  বারেই। হতভাগিনী ডেসডিমোনা যখন তার সকল সারল্য নিয়ে ক্যাসিওর পক্ষে ওকালতি করে তখন ওথেলোকে বার বার জিজ্ঞেস করতে থাকে কখন সে ক্যাসিওকে ক্ষমা করবে, কোন্ সময়? ডিনারের আগে না পরে? আজ না কাল ?

জীবন সম্পর্কে অধিকতর অভিজ্ঞতার অধিকারী ওথেলো ডেসডিমোনাকে বলেছিল; ‘‘We must obey the time”। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক, সাইপ্রাসের ওই বিশৃঙ্খল জগতের সময়ের নিয়ন্ত্রক আর কেউ নয়― ইয়াগো। ইয়াগো গতির মধ্যে কাজ করে ভাল। ওয়েলস তাঁর চলচ্চিত্রটিতে গতির এই উপাদানটিকে ব্যবহার করেছেন শিল্পোত্তীর্ণ দক্ষতায়। যেমন ইয়াগো যখন ওথেলোকে অর্ধ-মিথ্যায় উত্তেজিত করছে আমরা দেখি দু’জনে হেঁটে আসছে – দ্রুত। তারপরেই সাউন্ডট্রাকে আমরা শুনি তাদের পায়ের শব্দ। ইয়াগো যতই ওথেলোর উপরে কর্র্তৃত্ব স্থাপন করে ফেলতে পারছে ততই দেখি ক্যামেরা-অ্যাঙ্গেল বঙ্কিম হচ্ছে। ইয়াগো যখন ওথেলোকে ক্যাসিও-ডিসডিমোনার বানোয়াট প্রেমকাহিনী শোনাচ্ছে সাউন্ডট্রাকে আমরা শুনি সাগরের ছান্দিক শব্দ। যখন ওথেলো ক্ষিপ্ত হয়ে বলে ওঠে; ‘ওকে আমি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলব’ আমরা সাউন্ডট্রাকে শুনি সাগরজলের পাড়ে আছড়ে পড়ার প্রচন্ড আওয়াজ – এক লাগসই ও কার্যকর সাউন্ডমন্তাজ।

          তবে কী না ইয়াগোর ‘সময়’- য়ের ঊর্ধ্বেও আরেক সময় আছে, যা চিরন্তন নিয়তি, গ্রীক নাটকের সেই নেমেসিসই যেন, অনিবার্যভাবে যে সময়ের বেড়াজালে ইয়াগোও এক সময় আটকে যায়। তবুও বলব ওয়েলসের ‘ওথেলো’ শেষ হয় যেন কিছুটা নৈরাশ্যেই। ইয়াগোর শাস্তি ঘটে বটে, তবে অশুভের যে ভয়াবহ গিরিখাত ওয়েলস আমাদের চারপাশে দেখালেন তা’ থেকে সহজে উত্তরণের কোনো আশ্বাস যেন মেলে না।

          তবে মাধ্যমগতভাবে ওয়েলসের ‘ওথেলো’ চলচ্চিত্রভাষায় ঋদ্ধ। ওয়েলস অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ ছবিতেও জলের প্রতিবিম্ব এবং আয়নাকে ব্যবহার করেছেন। চোখও যেন একটি আয়না, যেখানে ভালবাসার মানুষের ছবি প্রতিবিম্বিত হয়। উদ্ভ্রান্ত ওথেলো ডেসডিমোনার চোখে খুঁজে পেতে চায় নিজের অস্তিত্বের নোঙ্গর। চোখ এখানে আয়না, বা হয়তো ক্যামেরার লেন্সই তা, যেমনটি জিগা ভের্তভ মনে করতেন এবং সৃষ্টি হয়েছিল ওঁর ক্যামেরা-চোখ বা কিনো-আই তত্ত্বটির।

          ওয়েলস ওঁর ‘ওথেলো’-তে একটা দ্বিতীয় শয়নকক্ষের দৃশ্য সৃষ্টি করেছেন। আমরা দেখি দেয়ালে প্রক্ষেপিত ছায়ায় স্বামী-স্ত্রী প্রেমালিঙ্গনে আবদ্ধ এবং ওথেলো বলছে; ‘‘If I were now to die / I were to be most happy”। ছায়ার এই ব্যবহার বুদ্ধিদীপ্ত ও সিনেমাটিক। আমরা বুঝতে পারি এই হতভাগ্য দম্পতির ভালবাসা ও জীবনও ওই ছায়াটির মতই ক্ষণস্থায়ী হতে চলেছে।

          দূরত্ব বিষয়ক একটা উল্লেখযোগ্য শট্ আছে ওয়েলসের ছবিটিতে। ডেসডিমোনা প্রাসাদে ঘুরে ঘুরে ওথেলোকে খুঁজছে। ডীপ ফোকাস ও ক্রশ কাটিং শটে আমরা দেখি দূরে ওথেলো মিলিয়ে যাচ্ছে। দুজনের মধ্যে এই দূরত্ব শুধুমাত্র শারীরিক নয়, তাদের মানসিক দূরত্বেরই যেন সিনেমাটিক প্রতীক তা।

ওয়েলস ওঁর ছবিটিতে লো-কী লাইটিংয়েরও সুদক্ষ ব্যবহার করেছেন। শিকগুলোকে লো-কী লাইটিংয়ের মাধ্যমে কখনো কখনো ধরেন silhouette -য়ে, যা একটা আলাদা প্রতীকী রূপ এনে দেয় শট্গুলিতে। তবে ওয়েলস যেন ওথেলোর কৃষ্ণ রঙ নিয়ে তেমন ভাবিত ছিলেন না। খুব হাল্কা রঙ দিয়ে মেক আপের কাজ সারতে চেয়েছেন তিনি যা ছবিটির নান্দনিক মানকে কিছুটা ক্ষুণœ করেছে।

সের্গেই ইয়ুৎকেভিচের ‘ওথেলো’-ও মেকআপ সমস্যায় ভুগেছে। ওথেলোরূপী বান্দারচুকের কৃষ্ণ রঙ কখনো কম গাঢ় থেকেছে। এবং জলে হাত লাগার এক শটে দৃষ্টিকটুভাবে সে রঙ উঠেও গেছে। তবে অন্যান্য ক্ষেত্রে ছবিটি বেশ সিনেমাটিক। সাধারণভাবে আমরা দেখি শেক্সপীয়ারের অশুভ চরিত্ররা- এডমন্ড, ইয়াগো, এঞ্জেলোরা বিচ্ছিন্ন একক সত্তা- এলিয়েনেটেড। ইয়ুৎকেভিচ ওঁর ‘ওথেলো’- তে ইয়াগোর এই এলিয়েনেটেড সত্তার উপরই বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। অনন্য নান্দনিক ব্যবহার করেছেন খাঁচা ও শিকলের বিভিন্ন শটের।

১৯৬৬ সালে স্টুয়ার্ট বার্জের করা ‘ওথেলো’ আমার আলোচনায় তেমন আনছি না। কারণ যদিও লরেন্স অলিভিয়ার এই ‘ওথেলো’-তে অভিনয় করেছেন, তবুও এ ছবিটি সিনেমাটিক ভাষা ব্যবহারে খুবই সীমিত এবং ছবিটি মূলত ১৯৬৪ সালের ন্যাশনাল থিয়েটারের প্রযোজনারই ক্যামেরায়িত রূপ মাত্র।

          তবে মেকআপগত কোনো সমস্যাই ছিল না লিজ হোয়াইটের। ওঁর ‘ওথেলো’-র সকল অভিনেতা-অভিনেত্রী, পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, মায় সহকারী ক্রুরা পর্যন্ত- কৃষ্ণাঙ্গ। ওথেলোর নামভূমিকায় অভিনেতা ইয়োফেট কোটো একজন ঘোর কৃষ্ণাঙ্গ আফ্রিকান, এবং ভেনিশিয়ানদের ক্ষেত্রে, কিছুটা হালকা রংয়ের মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গদের ব্যবহার করেছেন লিজ। কোটোর মধ্যে রয়েছে একজন শক্তিমান কৃষ্ণাঙ্গ যুবকের কাঁচা আবেগ, আর স্বল্প কালো চামড়ার অন্যদের মধ্যে রয়েছে মার্কিনী নাগরিক বৈদগ্ধের প্রলেপ। কোটোর ব্যাকগ্রাউন্ডে আফ্রিকার জুলু আবহসঙ্গীত। যে আবহসঙ্গীতের মাঝ দিয়ে বর্ণ ইতিহাসের বুদ্ধিদীপ্ত ইঙ্গিতটি তিনি মূর্ত করে তোলেন। এভাবে মার্কিন ও আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গদের সামাজিক সাংস্কৃতিক ইতিহাস ও অবস্থানের তারতম্যকে যেন সূক্ষ্মভাবে মেলে ধরেন লিজ হোয়াইট। ছবিটি নির্মাণের বেশ আগে, সেই ১৯৬০ সালে ওঁর নাট্য কোম্পানী নিয়ে লিজ হোয়াইট হার্লেমে ‘ওথেলো’ মঞ্চস্থ করেছিলেন। বোঝাই যায়, ছবিটি চলচ্চিত্রায়নে ওঁর প্রস্তুতি ছিল দীর্ঘ দিনের।

          লিজ শেক্সপীয়ারের মূল রচনা কর্তনে দ্বিধা করেননি। ভেনেশীয় নাগরিক ও সিনেটের গোটা দৃশ্যটিই বাদ দেন তিনি। তাঁর ছবি শুরুই হয় সাইপ্রাস থেকে। অন্যত্রও লিজ মূল রচনায় পরিবর্তন এনেছেন তবে তা কোনো অংশে অলিভিয়ার ‘হ্যামলেট’ -য়ে বা ওয়েলস ওঁর ‘ম্যাকবেথ’ -য়ের ক্ষেত্রে যেসব পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন, তার চেয়ে বেশি নয়।

          ডেসডিমোনাকে হত্যার আগে লিজের ওথেলো দেখি ওর সোনার চেইনটি দাঁত দিয়ে কামড়ে ধরেছে। সিঁড়ি দিয়ে সে উঠতে থাকে হাঁটু ভেঙ্গে। তার যন্ত্রণাময় মুখচ্ছবির মধ্যে যেন মূর্ত হয়ে ওঠে শত শত বছরের কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাসদের যন্ত্রণার প্রতিচ্ছবি। যদিও দর্শকের সহানুভূতি তার দিকে ঝুঁকে পড়ে, কিন্তু পরের শটেই আমরা দেখি একটা চূড়ান্ত ক্লোজ আপে শৃঙ্খলিত মুখ ও প্রায় দৃষ্টিহীন চোখ। এক ভয়ঙ্কর অশুভের প্রতীক যেন হয়ে ওঠে তা। মুহূর্তে আমাদের কাছে মূর্ত হয়ে ওঠে যে ওথেলো শুধুমাত্র ঘটনার হতভাগ্য শিকারই নয়, সে হতে চলেছে এক নির্মম খুনীও। হত্যার দৃশ্যে লিজ হোয়াইট ঘরের আলো রেখেছেন স্বল্প নীলাভ। এই ঈষৎ নীলাভ আলো গোটা পরিবেশটিকে দিয়েছে এক ভয়াবহ বিমানবিক রূপ।

          ইদানীংকার নারীবাদী সমালোচনা-সাহিত্যে এমিলিয়াকে ‘ওথেলো’-র একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়, যে এমিলিয়া পুরুষপুঙ্গবদের বিরুদ্ধে একটা নৈতিক ও দৃঢ় অবস্থান নিয়ে দাঁড়িয়েছিল। লিজ হোয়াইটের এমিলিয়াও সেই ধাঁচেই গড়া। পুরুষদের নৃশংসতার জগতে এক দরদী মানবিক চরিত্র।

গতানুগতিক চলচ্চিত্র ও নাট্য-প্রযোজনাতে ‘ওথেলো’ -র ঈর্ষার দিকটির উপরেই বেশি জোর দেয়া হয়ে থাকে। কিন্তু ‘ওথেলো’ কি শুধুই ঈর্ষার নাটক? শেক্সপীয়ার সর্বদাই বহুমাত্রিক, ‘ওথেলো’-তে তো বটেই। মধ্যমমানের প্রযোজক-পরিচালকেরা ঈর্ষার ব্যাপারটিতেই জোর দিয়ে স্বস্তি খুঁজে পেতে চান। কিন্তু সৃজনশীল পরিচালকেরা অন্বেষা করেন অন্য অন্য মাত্রাগুলিরও। সম্পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গদের সমন্বয়ে লিজ হোয়াইটের চলচ্চিত্রটি সেরকমই ভিন্ন মাত্রান্বেষী একটি ব্যতিক্রমী শেক্সপীয়ার-চলচ্চিত্র।

কুরোশাওয়ার ম্যাকবেথ : লো-অ্যাঙ্গেল ক্যামেরা ও উচ্চাকাক্সক্ষার প্রান্তসীমা

ম্যাকবেথ, স্কটল্যান্ডের সেই উচ্চাকাঙ্খী সামন্তকে নিয়ে যেসব চলচ্চিত্র হয়েছে, তাদের মধ্যে আলোচনার জন্যে আমরা বিশেষ উল্লেখযোগ্য তিনটি ছবিকে বেছে নেব- অরসন ওয়েলসের ‘ম্যাকবেথ’ (১৯৪৮), রোমান পোলানস্কির `ম্যাকবেথ’ (১৯৭১) ও আকিরা কুরোশাওয়ার জাপানী ম্যাকবেথ – ‘থ্রোন অব ব্লাড’(১৯৫৭)।

          এ ছবিগুলির মধ্যে কুরোশাওয়ার ছবিটি অনেক দিক থেকেই অনন্য বলে এ ছবিটি ঘিরেই আমরা আমাদের আলোচনা কেন্দ্রীভূত করতে চাই।

          শেক্সপীয়ারের যুগে রিফর্মেশনের কারণে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের মর্যাদা বেশ ধাক্কা খেয়েছিল। তবে সব সময়ই তা যে বিজ্ঞানের পথে গেছে, তা নয়। প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম সম্পর্কে যে সংশয় সৃষ্টি হয়েছিল, অনেক ক্ষেত্রেই তা স্থিত হয়েছে কোনো অন্ধকার শক্তির আধারে― এডমন্ডের প্রকৃতিবাদ, ইয়াগোর আপেক্ষিকতাবাদ কিম্বা ম্যাকবেথের মায়াবাদ। শেক্সপীয়ারের খল চরিত্ররা মূলত ব্যক্তিস্বতন্ত্র্যবাদী একক সব সত্তা। তাদের অশুভ ইচ্ছা বা একক উচ্চাকাঙ্খা যখন সম্প্রদায়ের যৌথতার বিরূদ্ধে গেছে, তখনই তাদের পতন ঘটেছে― ম্যাকবেথ তার বড় প্রমাণ।

          হ্যামলেট বলেছিল বটে; ‘আপনার মোটা রাজা বা রোগা ভিখারী কিন্তু একই টেবিলের দুই পদের খাদ্য- একজন লোক হয়তো এমন একটা পোকা দিয়ে মাছ ধরেছে যা কোনো রাজার দেহকে খেয়েছিল, আবার মাছটি ওই পোকাটাকে খেল।

          ক্লডিয়াস : কী বলতে চাও তমি?

          হ্যামলেট : কিছু না। শুধু দেখাতে চাচ্ছিলাম যে রাজাও ভিখিরীর নাড়ীভুঁড়ির মধ্য দিয়ে যেতে পারে।”

          একজন ভিখারীর মত একজন রাজাও মরণশীল। ফলে তার সকল দম্ভ, জাঁকজমক, অর্থহীন অহমিকা মাত্র।

          সাধারণভাবে রাজতন্ত্রের ব্যাপারে শেক্সপীয়ারের তেমন বাড়তি কোনো শ্রদ্ধাবোধ ছিল বলে মনে হয় না। তবে ‘ম্যাকবেথ’-য়ে তিনি রাজতন্ত্রকে মেনে নিয়েছেন। রাজা ডানকানের আমল সুখের ছিল। আশা করা যাচ্ছে ম্যাকডাফের আমলও ভাল হবে। মাঝে কেবল ম্যাকবেথের অশুভ উচ্চাকাঙ্খার ফলশ্রুতির এই অন্ধকার দিনগুলি ছিল মন্দ। কিন্তু কুরোশাওয়া বিশ শতকের মানুষ। তিনি দেখাতে ছাড়েননি যে সামন্ততন্ত্র, তা সে ম্যাকবেথের আমলেই হোক বা তার আগেপরেই হোক, কোনো সময়েই ভাল কিছু নয়। ম্যাকবেথ বিচ্ছিন্ন কিছু নয় , এই ব্যবস্থারই এক নির্মম স্রষ্টা ও শিকারও। তাই দেখি তার লেডী ম্যাকবেথ বা আসাজি দ্বিধাগ্রস্ত ম্যাকবেথকে খুনে প্ররোচিত করতে পারছে এই বলে যে, বর্তমান সামন্তপ্রভুও এভাবে খুন করেই গদীনশীন হয়েছিলেন। রক্ত ও বিশ্বাসঘাতকতা মিশে আছে সামন্ত-ব্যবস্থার পরতে পরতে ।

জাপানী নন্দনতাত্ত্বিক ঐতিহ্য , লোকজ বিশ্বাস ও পশ্চিমা আধুনিক চলচ্চিত্রের এক ধ্রুপদ সংশ্লেষন হ’চ্ছে কুরোশাওয়ার- ‘থ্রোন অব ব্লাড’। প্রথম শটেই টাইটেল কার্ডে বাঁশীর তীক্ষ্ন আওয়াজ তুলে ধরে ছবির ধ্রুপদ অশুভ চিত্র। ছবি শুরু হয় সাউন্ডট্রাকে প্রার্থনা সুরের মত এক সঙ্গীতে যেখানে বলা হচ্ছে এই সেই দূর্গ যেখানে এক উচ্চাকাক্সক্ষী সামন্ত বাস করত। কুয়াশাচ্ছন্নতার মাঝে আমরা দেখি জঙ্গলঘেরা এক পাহাড়ী দুর্গ। শেক্সপীয়ারের বিরনাম উড এখানে স্পাইডারওয়েব বা মাকড়শাজাল জঙ্গল, ডানসিনান এখানে মাকড়শাজাল দুর্গ এবং ম্যাকবেথ হচ্ছে রাগীমুখের এক উচ্চাকাক্সক্ষী সামন্ত- ওয়াসিজু ।

জঙ্গলে ঘোড়া চালিয়ে যাওয়া ওয়াসিজু ও মিকি (ব্যাঙ্কো ) পথ হারালো । লো-অ্যাঙ্গেলে ভাঙ্গা ডালপালার ছড়ানো রূপ মাকড়শার জালের ইমেজ সৃষ্টি করে। মাকড়শাজাল জঙ্গল- প্রতীকী নামটিই হয়ে ওঠে দ্যোতক অর্থবহ। মানুষ যেন নিয়তিরূপী এক মাকড়শার জালে আবদ্ধ। ওই যে কিং লীয়ার- য়ের গ্লচেষ্টার বলেছিল , দুরন্ত বালকদের কাছে কীট -পতঙ্গ যেমন, ঈশ্বরের কাছেও আমরা তার চেয়ে কীই- বা বেশী আর !

এই জঙ্গলে ছোট কুঁড়েঘরে চরকা কাটে এক অলৌকিক বৃদ্ধা। সে গান গায়; ‘এ জীবনে কিছুই রবে না । পরকালেও জবাবদিহি করতে হবে না । রবে না কিছুই – তবে সবচে আগে যাবে অহঙ্কার।” এবং পথ হারানো দুই ঘোড়াসওয়ারকে শোনায় সেই অমোঘ নিয়তি, ওয়াসিজু রাজা হবে, এবং রাজা হবে মিকির বংশধরেরা। ফেরার পথে জঙ্গলের গোলকধাঁধা যেন হয়ে ওঠে ম্যাকবেথেরই মনের জটিল গোলকধাঁধার প্রতিচ্ছবি।

যে সমাজ কাঠামোর প্রতিভূ ওয়াসিজু, সেখানে এক প্রান্তে রয়েছে যথেচ্ছ ক্ষমতা ও অহমিকার উচ্চ সামন্তরা এবং অসহায় দূত, সাধারণ সৈন্য ও ভৃত্যরা যেন একেবারেই ভিন্ন মেরুর এক বাসিন্দা। এদের উপরে প্রথম পক্ষের ক্ষমতা প্রায়— ঈশ্বরসুলভ। আবহটাই সামুরাই ঐতিহ্যানুযায়ী সামরিক ও জঙ্গী।

তবে বাস্তববাদী কুরোশাওয়া মাঝে এক চমৎকার লিরিক্যাল শটে দেখিয়ে দেন কৃষকেরা মাঠে ধান কাটছে- যা মূর্ত করে তোলে এই দুর্গের অর্থনৈতিক ভিত্তিটিকেও।

তবে কুরোশাওয়ার ম্যাকবেথের এই জগৎ এক পাষাণী জগৎ। ভালবাসা, মমত্ব, কৃতজ্ঞতাবোধ এসব মানবিক অনুভূতিগুলি পুরোপুরিই অনুপস্থিত এই সামন্তব্যবস্থায়। এমন কী ওয়াসিজু ও তার স্ত্রী আসাজির (লেডি ম্যাকবেথ) মধ্যে কুরোশাওয়ার ক্যামেরা সবর্দা বজায় রাখে এক দূরত্ব। কুরোশাওয়া কখনোই স্বামী-স্ত্রী হিসাবে তাদের মাঝে ভালবাসা-মমত্বের কোন দৃশ্য দেখান না । আসাজি নিরুত্তাপ গলায় ভয়ঙ্কর সব কথা বলে যা এক জমাট শীতল আতঙ্কের জন্ম দেয়। কুরোশাওয়ার এই লেডী ম্যকবেথটির বাক্যালাপ সংক্ষিপ্ত কিন্তু সরাসরি― এ জগত দাঁড়িয়ে আছে রক্ত আর হত্যার উপরেই। প্রথম আঘাত সর্বদা তোমাকেই হানতে হবে, অন্যথায় অন্যের আঘাতে তুমিই নিহত হবে।

আসাজির মুখ সাদা রঙে রঙ করা। এ জাপানী নোহ্ ঐতিহ্য। গোটা ছবিতে আসাজিই একমাত্র  চরিত্র যার মুখচ্ছবি এরকমটি। তবে ওয়াসিজুরূপী তোশিরো মিফুনে যে সর্বদা একটি রাগী মুখচ্ছবি বজায় রাখেন, তাও নোহ্ ঐতিহ্য। অনেক কম বাক্য ব্যবহার করেই আসাজি খুনের প্ররোচনায় ওয়াসিজুকে উদ্বুদ্ধ করে। স্বল্পবাক এই সরংব- বহ- ংপবহব, এও নোহ্ ঐতিহ্য। সামন্তপ্রভুকে হত্যার পর আসাজি নেচে ওঠে নোহ্ ঐতিহ্যে। স্টাইলাইজ্ড এই নৃত্যের ভঙ্গিমা দর্শকদের মনে মেরুদন্ড শিরশির করা এক অশুভ অনুভূতির জন্ম দেয়।

জাপানী নোহ্ ও কাবুকী ছাড়াও জাপানী পটচিত্রেরও (scroll painting) ছাপ আছে ছবিটিতে। পটচিত্রের তৎকালীন বিশিষ্ট জাপানী শিল্পী কোহাই এসাকি এ ছবিটিতে শিল্পনির্দেশকের কাজ করেছিলেন।

সামান্তপ্রভু ও মিকি দু’জনের হত্যাই কুরোশাওয়া দেখান পর্দার আড়ালে। প্রথম জনের ক্ষেত্রে ওয়াসিজু ফ্রেমে ঢোকে রক্তাক্ত বল্লম নিয়ে। আর মিকির ক্ষেত্রে সওয়ারহীন ঘোড়া এক ফিরে আসে দুর্গে- ইঙ্গিতে মূর্ত।

গোটা ছবিতে অসংখ্য জ্যামিতিক কোণ ব্যবহার করেন কুরোশাওয়া। ক্যামেরার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে দেখান গাছগাছালির ডালপালার নানা তীক্ষ্ন ভঙ্গিমা। ছবিটির কুয়াশাচ্ছন্ন জঙ্গল, ধোঁয়াশার মাঝে ঘোড়াসাওয়ারদের চলাচল এবং দুর্গের অন্যান্য প্রতিটি ইমেজই সাদা-কালো সিনেমাটোগ্রাফির এক ধ্রুপদ উদাহরণ।

বনের পাখি ঘরে উড়ে এল অশুভের ইঙ্গিত বয়ে। এমন কী সাউন্ডট্রাকে কাকের ডাকও বহন করে আনে অশুভের এই আবহ। আক্রমণের লংশট্টি কুরোশাওয়া নেন গাছের মাঝে মাঝে ক্যামেরা ট্রাক করে। জঙ্গলটাই যেন হয়ে ওঠে ছবির এক চরিত্র। এমন কী ইঁদুরেরাও দুর্গ ছেড়ে চলে যাচ্ছে। জাপানী ওই লোকজ প্রবাদটিরই উল্লেখ করে চারজন সাধারণ সৈন্য যে, যখন কোনো গৃহে আগুন লাগে, আগে ইঁদুরেরা চলে যায়। এ দৃশ্যটি অবশ্য একটু নাটকঘেঁষা। তথ্যটি বলার জন্যই যেন কথা বলছে সৈন্যরা।

শেক্সপীয়ারের রচনায় পরিবর্তন করে কুরোশাওয়া দেখান যে আসাজি গর্ভবতী হয়েছেন যা মিকিকে হত্যার তাৎক্ষণিক কারণ হিসাবে প্রণোদনা যুগিয়েছে, এবং পরে দেখান আসাজির গর্ভপাত ঘটেছে। ওয়াসিজুর কোনো উত্তরাধিকারী নেই। জঙ্গলের প্রেতাত্মার ভবিষ্যদ্বাণী অনিবার্য হয়ে উঠছে। বিষয়বস্তুগতভাবে কুরোশাওয়া আরো এক জায়গায় শেক্সপীয়ার থেকে সরেছেন। শেক্সপীয়ার বলেছেন নারীর যোনিপথ থেকে নির্গত কারো হাতে ম্যাকবেথের মৃত্যু হবে না। এবং ম্যাকবেথ যার হাতে নিহত হোল সেই ম্যাকডাফ ছিল সেরকমই একজন মানুষ। কিন্তু কুরোশাওয়া কোনো একক ব্যক্তির হাতে নয়, ওয়াসিজুর মৃত্যু ঘটালেন তারই অধীনস্থ সৈন্যদের দ্বারা। সাধারণ সৈন্যরা― মধ্যযুগের জাপানী সামান্ততন্ত্রের দ্বারা যারা নির্মমভাবে নির্যাতিত, তারাই ওয়াসিজুকে হত্যা করে। তবে এটা কোনো ব্যক্তিগত উদ্ভ্রান্ত প্রতিশোধ নয়, যেন এক যৌথ রাজনৈতিক সিদ্ধান্তই। তীরন্দাজদের কে কুরোশাওয়া দেখান না তেমন, দেখান শুধুমাত্র তাদের ছোঁড়া তীরগুলিকে, যেন এ তীর আসছে কোনো ব্যক্তি-সৈনিকদের কাছ থেকে নয়, যেন এক নেমেসিস, ইতিহাসের কোনো নেপথ্য নিয়তির কাছ থেকেই।

কুয়াশাচ্ছন্ন প্রান্তর দিয়ে এগিয়ে আসছে বনভূমি, বৃক্ষাদি— অশরীরী আত্মার নিয়তিই যেন। ওয়াসিজুর চক্র পূর্ণ হয়েছে। বিরনামের জঙ্গল যেন ফিরে এসেছে― তীর হয়ে। ঝাঁকে ঝাঁকে যেসব তীর ছুটে এসে হত্যা করল ওয়াসিজুকে, তাও তো ওই জঙ্গলের বৃক্ষেরই তৈরি।

এই অশুভ সামন্তব্যবস্থা, মানুষের সৃষ্ট এই দুর্গ, তার কাঠামো ও ক্ষমতাব্যবস্থা -এ সবের বিরুদ্ধেই যেন প্রকৃতির প্রতিশোধ- `থ্রোন অব ব্লাড’। ওয়াসিজু প্রকৃতির আইনকে ভঙ্গ করেছিল, তার প্রতিশোধেই প্রকৃতির আত্মা যেন কখনো ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ন্ত কাক হয়ে, কখনো বা জঙ্গলের কাঠে তৈরী সৈন্যদের তীর হয়ে প্রতিশোধ নিল জাপানী ম্যাকবেথের উপর।

তবে প্রকৃতির এই প্রতিশোধের দৃষ্টিভঙ্গি যতটা না শেক্সপীয়ারের তার চেয়ে বেশী যেন বা ইংরেজ হৃদ-কবিদের, বা হয়তো সাম্প্রতিক পরিবেশবাদীদের। প্রকৃতি নিজে হেঁটে এগিয়ে এসে তার বুক থেকে উচ্ছেদ করল এক দুষ্ট ক্ষত- এক দুষ্ট রাজাকে।

কুরোশাওয়া অবশ্য ম্যাকবেথের উত্তরসূরি নিয়ে ভাবেননি। তিনি শুধুমাত্র তার পতন দেখিয়েছেন। এবং কী অসাধারণ সেই শেষ দৃশ্যটি যখন ওয়াসিজু তার নিজের সৈন্যদের দ্বারা নিহত হচ্ছে। এক অনিবার্য নিয়তির মতই যেন এগিয়ে আসে বিদ্রোহী সৈন্যরা। তীর ছোঁড়ে , প্রথমে একটি , তারপর ঝাঁকে ঝাঁকে— অসংখ্য তীর। সৈন্যদের ভীড় থেকে প্রশ্ন ভেসে আসে `কে হত্যা করেছিল পূর্বতন সামন্তপ্রভুকে’? এবং অসামান্য সিনেমাটিক সেই শট্টি যখন যে দিক দিয়ে আমরা মোটেই আশঙ্কা করছি না হঠাৎ পর্দার সেই দিক থেকে এক তীর এসে এফোঁড় ওফোঁড় করে দিল ওয়াসিজুর গলা। এবং হঠাৎ সাউন্ডট্রাক পুরো নিস্তদ্ধ হয়ে যায়। এবং ভেসে আসে মন্ত্রসুলভ সেই সঙ্গীত- উচ্চাকাক্সক্ষার সীমাবদ্ধতার কথা, যা দিয়ে ছবিটি এক সময় শুরু হয়েছিল।

শেষ দৃশ্যের ক্লোজআপটিতে মিফুনে অসামান্য অভিনয় করেছেন। নোহ্ নাটকের সেই চিরন্তন রাগী মুখচ্ছবিকে ছাপিয়ে, সকল যন্ত্রণার ঊর্ধ্বে, ওয়াসিজুর মৃত্যুর ক্ষেত্রে আমরা দেখি মুহূর্তের জন্যে এক শান্ত মুখচ্ছবি- জীবন নামক যন্ত্রণা থেকে মুক্তির এক সমাহিত ভাব। শেক্সপীয়ারের চরিত্ররা এক সময় তাদের ভুল বুঝতে পারে। কিন্তু ততদিনে অনেক দেরি হয়ে যায়। কুরোশাওয়া সেই ঐতিহ্যই বজায় রাখেন। তাঁর ম্যাকবেথও তার পতনের অনিবার্যতা উপলদ্ধি করে- ক্ষণিকের জন্যে হলেও।

শেষ শটে মিফুনে যেভাবে চারপাশে দাঁড়ানো তার সৈনিকদের পায়ের কাছে পড়ে যান তা চকিতে স্মরণে আনে এক সময় দূত বা মিকির হত্যাকারীর ওয়াসিজুর সামনে হাঁটু গেড়ে বসার ভঙ্গীটির কথা। চক্র ঘুরে গেছে। সর্ম্পকও। প্রায় ঈশ্বরীয় ক্ষমতার সামন্তপ্রভু আজ হাঁটু গেড়ে বসেছে তারই অধীনস্তদের  পায়ের কাছে। মহাভারতের ভীস্মের মতই তীরবিদ্ধ ওয়াসিজুর এ এক শরশয্যা যেন, একই রকম মহাকাব্যিক , কিন্তু কতই না পার্থক্য ! শেক্সপীয়ার রাজতন্ত্রকে পুনর্বাসিত করেছিলেন, কিন্তু কুরোশাওয়া দেখালেন যে রক্তলিপ্সু সামুরাই সামান্তশ্রেণীর মাঝে মুক্তি নেই। সাধারণ সৈন্যদের যৌথ প্রতিরোধই- মুক্তির পথ। কুরোশাওয়ার সবচে’ প্রগতিশীল ছবি নিঃসন্দেহে- ‘থ্রোন অব ব্লাড’। তবে ম্যাকবেথের নিয়তিটাকে পুরোটাই পুর্বনির্ধারিত করে কুরোশাওয়া হয় তো শেক্সপীয়ারের নাটকটির অন্তর্লীন শক্তিকে কিছুটা সীমিত করেছেন।

অরসন ওয়েলস ওঁর ‘ম্যাকবেথ’- য়ে নাটকটির রাষ্ট্রনৈতিক মাত্রাটিকে এড়িয়ে গেছেন। ওঁর ডানকান ও ম্যাকডাফ খুবই তাৎপর্যহীন দু’টি চরিত্র। কোনো  রাষ্ট্রনৈতিক দ্বন্দ্ব নয়, ওঁর `ম্যাকবেথ’- য়ে দ্বন্দ্বটা তিনি দেখিয়েছেন মূলত ডাকিনী-যোগিনী প্রেতাত্মাদের অন্ধকার রাজতন্ত্রীয় শক্তির সঙ্গে খ্রীস্টীয় বিধিবিধানের দ্বন্দ্ব যেন। তাছাড়া কুরোশাওয়ার মত যুদ্ধের রক্তাক্ত ভয়াবহতা দেখাতে ওয়েলস দ্বিধা করেছেন। ফলে ওঁর যুদ্ধদৃশ্যগুলো কুরোশাওয়ার যুদ্ধের মত বাস্তব হয়নি।

অরসন ওয়েলস মূলত ওঁঁর ‘ম্যাকবেথ’-য়ে বিশ্বের তিরিশ ও চল্লিশ দশকের অশুভ ঘটনাবলীর দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন বলে মনে হয়। তবে ফ্যাসীবাদের অশুভকে আরো সরাসরি জেনেছিলেন রোমান পোলানস্কি। শৈশবে পোলান্ডে নাৎসী শক্তি দ্বারা পোলানস্কি ও ওঁর পরিবারের উৎপাটিত হওয়ার স্মৃতি আজীবন তাড়িত করেছে পোলানস্কিকে। তাই ১৯৭১ সালে যে ‘ম্যাকবেথ’ তিনি চিত্রায়িত করেন সে সম্পর্কে নিজেই বলেছেন যে, ম্যাকডাফের দুর্গে ঢুকে ভাড়াটে খুনীরা যেভাবে ওঁঁর স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করেছিল, তা যেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ওঁর নিজের শৈশবে ওঁদের বাড়িতে নাৎসী এস. এস. বাহিনী ঢোকার অভিজ্ঞতারই সমতুল্য।

ওয়েলসের ‘ম্যাকবেথ’ -য়ে রাষ্ট্রনীতি কম, খ্রীস্টধর্মেরই জয় যেন শেষে। কিন্তু পোলানস্কির ‘ম্যাকবেথ’-য়ে যেন খ্রীস্টধর্ম ও রাজতন্ত্র উভয়ই অর্থহীন- এক নৈরাশ্যবাদী আঁধার গ্রাস করে রাখে ওঁর গোটা ‘ম্যাকবেথ’ ছবিটির শরীর। পোলানস্কির কাছে রাষ্ট্র ও সরকারের ক্ষমতা ভঙ্গুর, কিন্তু এসব ডাকিনী-যোগিনীদের ক্ষমতা যেন চিরন্তন। পোলানস্কির ‘ম্যাকবেথ’ -য়ে মানুষের সৃষ্ট সব রাজনৈতিক সংগঠন ও ব্যবস্থাই যেন চূড়ান্তভাবে এসব অশুভ শক্তির হাতে অসহায়।

শেক্সপীয়ারের ম্যালকম ছিল কিছুটা শুভচেতনা ও সারল্যেও প্রতীক। কিন্তু পোলানস্কি তাকেও দেখিয়েছেন ক্ষমতালিপ্সু অরেকজন রাজনীতিবিদ হিসাবে মাত্র। পোলানস্কির ‘ম্যাকবেথ’ -য়ে ম্যাকডাফের জয়টাও যেন নিতান্তই হঠাৎ ঘটে যাওয়া। ম্যাকবেথের ক্লান্তির সুযোগে প্রদত্ত এক মোক্ষম আঘাতে যেন জেতে সে। এভাবে শেক্সপীয়ারের ন্যায়বিচারের অনিবার্যতার ধারণাকে পোলানস্কি করে তুলতে চেয়েছেন কিছুটা আধুনিক ক্লিশেতে – সব কিছুই আপতিক।

পোলানস্কি ওঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ছবির শেষে একটা সংযোজন জুড়ে দিয়েছেন। তা’ হচ্ছে ডোনালবেইন, ম্যালকমের ভাই, যাকে আমরা গোটা ছবিতে লক্ষ্য করেছি কিছুটা হিংসুটে ও ক্ষমতালোভী হিসাবে, ডাকিনীদের খোঁজে চলছে। আগামীতে সে আরেক ম্যাকবেথ হতে যাচ্ছে এ যেন তারই ইঙ্গিত। অশুভের চক্র থেকে মুক্তি নেই! শেক্সপীয়ার দেখিয়েছিলেন এক শুভ রাজা থেকে আরেক শুভ রাজায় প্রত্যাবর্তন— পোলানস্কি দেখালেন এক অশুভ প্রেতাত্মা থেকে আরেক অশুভ প্রেতাত্মায় প্রত্যাবর্তন। মানবজাতির এটাই যেন নিয়তি। কিছুটা নৈরাশ্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গি সন্দেহ নেই। তবে যাঁরাই পোলানস্কির ছবি সম্পর্কে জানেন তারা ওঁর এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কেও জানেন এবং পোলানস্কি তা’ কখনো লুকানোরও চেষ্টা করেননি- ‘রিপালসন’ (১৯৬৫), রোজমেরীজ বেবী (১৯৬৮), ‘চায়নাটাউন’ (১৯৭৪)। তবে জীবন সম্পর্কে শেক্সপীয়ারের দৃষ্টিভঙ্গি অতটা নেতিবাচক নয় নিশ্চয়ই এবং পোলানস্কির ছবিটির সীমাবদ্ধতাও এইখানেই।

আমার ব্যক্তিগত বিবেচনায় তিনটি ‘ম্যাকবেথ’ চলচ্চিত্রের মধ্যে কুরোশাওয়ারটিই সবচেয়ে বেশি শেক্সপীয়ারীয় দর্শনের কাছাকাছি হতে পেরেছে। ইংরেজভাষী ছবি দু’টিতে ফ্যাশনেব্ল নৈরাশ্যের ছাপ এসে পড়েছে। কিন্তু কুরোশাওয়া যদিও কোন কৃত্রিম আশাবাদ আরোপ করতে চাননি, কিন্তু দেখিয়েছেন, আরেক কোনো রাজতন্ত্রে বা ডাকিনী-যোগিনীদের কৃপায় নয়, অশুভের প্রতিকার সম্ভব সম্মিলিত মানুষের মানবিক প্রচেষ্টাতেই।

কুজনেৎসভের লীয়ার : ঈশ্বর স্বর্গে নেই এবং মর্ত্যে সবকিছুই চলছে গোলমেলে

এক আত্মম্ভরী বৃদ্ধ রাজা ও তার অকৃতজ্ঞ কন্যাদের এ কাহিনী ইউরোপীয় লোকসাহিত্যের এক সুপ্রাচীন কাহিনী। তবে Ôকিং লীয়ার’-য়ের গুরুত্ব কাহিনীর জন্যে নয়, এই আপাত সাদামাটা সরল কাহিনীর মধ্য দিয়ে শেক্সপীয়ার মানবনৈতিকতা ও জীবনজিজ্ঞাসার ক্ষেত্রে এমন কিছু গভীর প্রশ্ন এনেছেন, যা এ নাটকটিকে এক অতলান্ত গভীরতা এনে দিয়েছে।

লীয়ার শুধুই এক আত্মম্ভরী বৃদ্ধ পিতার প্রতীক নয়, এই পক্ককেশ বৃদ্ধ হয়ে ওঠে সামন্ত পিতৃতন্ত্রেরও প্রতীক, যে রকম পিতৃতান্ত্রিক চরিত্র শেক্সপীয়ারের আরো আছে- প্রস্পেরো, হ্যামলেটের পিতা কিম্বা  ‘মেজার ফর মেজার’- য়ের ডিউক। ইতিহাসের সব যুগসন্ধিক্ষণেরই বোধহয় আছে নিজস্ব লীয়ার। সামন্ততন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রে উত্তরণের যুগে ফ্রান্সে বালজাকের ওল্ড গোরিও, রুশদের তুর্গেনেভের ‘স্তেপের কিং লীয়ার’ এবং যিনি কিং লীয়ারকে আদৌ পছন্দ করেননি, নিয়তির পরিহাসে সেই তলস্তয় নিজেই পরিণত হয়েছিলেন যেন এক লীয়ারে !

‘কিং লীয়ার’ নিয়ে যে ক’টি ছবি হয়েছে তাদের মধ্যে প্রথমেই উল্লেখের দাবি রাখে গ্রেগরী কুজনেৎসভের ‘কিং লীয়ার’ (১৯৭০)। কুজনেৎসভের উপর মেয়েরহোল্ড ও গর্ডন ক্রেগের নাট্যতত্ত্বের ব্যাপক প্রভাব ছিল। ছবিটিতে তার ছাপ আছে। তবে এ ছবিটির ক্ষেত্রে যা সবচেয়ে’ গুরুত্বপূর্ণ, তা’ হ’চ্ছে, কুজনেৎসভ কী ভাবে লীয়ারের যুগটাকে মূল্যায়ন করেছিলেন।

এলিজাবেথীয় যুগটা যথার্থই ছিল, ম্যাকবেথের ভাষায় বলতে গেলে; ‘so foul and fair a day‘ । একদিকে এলিজাবেথীয় রাজত্বের অর্থনৈতিক রমরমা, ফ্লান্ডার্সের পশমের জমজমাট ব্যবসা, আরেক দিকে ভেড়ার এনক্লোজারের ফলে গ্রামাঞ্চল জুড়ে ভূমিহীন , কর্মহীন, নিঃস্ব, হতদরিদ্র ভবঘুরের দল, টম-অব-বেডলাম চরিত্র সৃষ্টি করে শেক্সপীয়ার যাদের অমর করে রেখেছেন।

‘কিং লীয়ার’ প্রযোজনার সময় ওঁর অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাসমূহ নিয়ে অসামান্য এক ডায়েরি লিখেছেন কুজনেৎসভ যা ‘King Lear: The Space of Tragedy‘ নামে গ্রন্থরূপে প্রকাশিত। যারাই শেক্সপীয়ারকে নাটকে বা চলচ্চিত্রে রূপ দিতে চান, এ গ্রন্থ তাদের অবশ্য পাঠ্য। লীয়ারের যুগ সম্পর্কে কুজনেৎসভের মন্তব্য হচ্ছে; Òরাজা ও তার পরিবার বাস করে প্রাসাদের  জাঁকজমকতায়, সামন্তপ্রভুরা বাস করে পাথুরে দুর্গে এবং এর বাইরে সব  রুক্ষ প্রান্তর ও দারিদ্র্যপীড়িত গ্রাম।” কুজনেৎসভ বলেন; ‘অরাজক সামন্ত লুন্ঠনকারীরা পশমের দাম নিয়ে আলাপ করছে এবং ফ্লান্ডার্সে পশম প্রক্রিয়াজাতকরণের নতুন পদ্ধতির আবিষ্কারের গুজবের সঙ্গে মিশে থাকছে সাবাথের ডাইনীদেও সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য ও বিশদ তথ্যবলী।”

বৃদ্ধ লীয়ার হচ্ছে সেই অন্তর্বতীকালীন যুগদ্বন্দ্বের বেদনার আর্তির প্রকাশ। যে যুগ প্রতিফলিত হয় গ্লচেষ্টারের চেতনায়; ‘Love cools, friendship falls off, brothers divde, in cities mutinies, in countries discord, in places treason, and the bond crack ‘ ‘t’  wixt son and father‘ এ সেই দুঃসময় যখন একজন পাগল একজন অন্ধকে পথ দেখায়, যখন চোখ থেকেও মানুষ হোঁচট খায়। ধনবাদী লোভের এই দুঃসময়েই বোধহয়, যখন মানবিক সকল বন্ধন ছিন্ন, কর্ডেলিয়ার বন্ধন অনুযায়ী ভালবাসতে পারার প্রশ্নটি ছিল এতো জরুরী।

বরিস পাস্তেরনাকের অনুবাদ আর দিমিত্রি শস্তোকোভিচের আবহসঙ্গীতে যে কিং লীয়ার কুজনেৎসভ সৃষ্টি করেন তার প্রথম দৃশ্যে রুক্ষ পাহাড়ের কৃষকদের শটের মধ্য দিয়ে বিষয়বস্তুর ভাবগম্ভীরতাটাকে কুজনেৎসভ মূর্ত করে তোলেন। চলচ্চিত্রমাধ্যমের যে দু’টি পদ্ধতি, ডিটেল্সের বিশদ বয়ান- mise-en-scene, বা সুনির্দিষ্ট কোনো ডিটেল্সকে বেছে নেওয়া— মন্তাজ, কোনোটিরই বাড়তি ব্যবহার করেননি কুজনেৎসভ। দৃশ্যগুলোকে তিনি বরং একজন ভাস্কর্যশিল্পীর মতই ক্যামেরার সাহায্যে কুঁদে কুঁদে তৈরি করে  গিয়েছেন।

ক্যামেরাকে কুজনেৎসভ ব্যবহার করেছেন আয়নার মত নয়, যেন অন্তর্ভেদী এক্স-রে মেশিনের মত। প্রবেশ করেছেন চরিত্রদের ভেতরে, মনোজগতের গভীরতম প্রদেশে। আর এক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে করেছেন- ক্লোজ আপের ব্যাবহার। লীয়ার, কর্ডেলিয়া, এডগার, এডমন্ড, ফুল- প্রতিটি চরিত্রের অসংখ্য ক্লোজ আপ ধারণ করেছেন। দেখিয়েছেন চোখের চাহনী, ঠোঁটের বাঁকা ভঙ্গিমা বা সামান্য মাথা নাড়ানোর ভঙ্গিমার মধ্যে চরিত্রের মনোজগতের ইঙ্গিত। চরিত্ররা অভিনয়ও করেছেন চমৎকার চলচ্চিত্রিক। বিশেষ করেই উল্লেখ করতে হয় লীয়াররূপী ইউরি ইয়ার্ভেতের অসামান্য অভিনয়ের কথা।

ঈশ্বরবিহীন এক আকাশের তলে রুক্ষ হীথ প্রান্তরে ঘটে গেল মানবনাট্যের বেদনাময় সেই ঘটনাবলী। ব্যক্তিগতভাবে Ôকিং লীয়ার’-য়ের এই হীথদৃশ্যটিকে আমার শেক্সপীয়ারের সবচে এস্টাব্লিশমেন্টবিরোধী দৃশ্য বলে মনে হয়।

ঈশ্বর নেই, রাজতন্ত্র নেই, সনাতন মূল্যবোধের সবই আজ বিপর্যস্ত ও প্রশ্নায়িত। তবে শুধুমাত্র ঈশ্বর ও ধর্ম প্রসঙ্গে নয়, অর্ধোন্মাদ লীয়ার, ফুল ও নগ্ন এডগারের মধ্য দিয়ে মানবজীবনের আর্থসামাজিক বিষয়ে এমন বহু কথাও এনেছেন শেক্সপীয়ার যা আজো সমাধানের অপেক্ষায়।

লীয়রের তীব্র আর্তি; ‘poor, naked wretches whereso`er you are‘, আর তারপরই চোখ যায় নগ্ন এডগারের প্রতি এবং এই উপলব্ধি যে; ‘I have taken/ Too little care of this‘ । রাজা লীয়ার ও তার সর্বস্বান্ত প্রজা টম, আজ মুখোমুখি। শুধু দুই ব্যক্তি নয়, ‘আছে’ ও ‘নেই’-য়ের দুই শ্রেণীরই যেন প্রতিভূ হয়ে ওঠে তারা । কুজনেৎসভ ওঁর ছবিতে অনেক কয়েকজন টম-অব-বেডলাম দেখিয়েছেন, কিন্তু শেক্সপীয়ারের নাট্যব্যঞ্জনা এতটাই শক্তিশালী যে মাত্র একজন টমকে দেখিয়েই তিনি গোটা শ্রেণীটির ব্যথা, বেদনা ও আর্তিকে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছিলেন।

শেষের ওই মর্মস্পর্শী লাইনগুলিতে, যখন লীয়ার কার্ডেলিয়াকে বলছে, আমরা দু’জনে পাখির মত গান গাইব, পুরোন দিনের গল্প বলব, আর রাজপ্রসাদের গল্প শুনব― তারকা থেকে রাজা লীয়ার নেমে এসে পরিণত যেন হলেন জীবন-চলচ্চিত্রের এক সাধারণ দর্শকে। দর্শকের বেঞ্চে এসে পা তুলে বসে যেন বলছেন, একটু জায়গা দাও তো ভাই বসি, দেখি কে উঠল, কার কপাল পুড়ল!

ঐতিহাসিক নাটকগুলোর মত ‘কিং লীয়ার’-য়ের শেষে কোনো নতুন রাজার অভিষেক নেই। ক্ষমতার দায়িত্ব তিনজনের কাছে যৌথভাবে ন্যস্ত হোল- কেন্ট, এডগার, আলবানি। শেক্সপীয়ার বোধ হয় ব্যক্তি রাজতন্ত্রের উপর আর ভরসা পাননি।

বেদনার যে অতলান্ত গভীরতা কুজনেৎসভ এ ছবিতে দেখিয়েছেন তাতে প্রশ্ন উঠতে পারে ওঁর ‘কিং লীয়ার’ কি এক নৈরাশ্যবাদী চলচ্চিত্র ? আমার তা কখনোই মনে হয়নি। বরং `কিং লীয়ার’-য়ের মহত্তম নৈরাশ্যের মধ্যে মানব জীবনের বৃহত্তর সম্ভাবনার এমন অনেক ঈঙ্গিতই রয়েছে, যা অন্তত এযুগের রাজারচলতি কৃত্রিম আশাবাদের চেয়ে, বেশী ইতিবাচক।

কুজনেৎসভ যদি ওঁঁর ‘কিং লীয়ার’-য়ে নীরবতাকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, পিটার ব্রুক তাঁর ছবিটিতে গুরুত্ব দিয়েছেন- নাটকীয়তাকে। পিটার ব্রুক দু’টো ‘কিং লীয়ার’ করেছিলেন। একটা ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অ্যান্ড্রু ম্যাকলাফের সঙ্গে যৌথভাবে, দ্বিতীয়টি বৃটেনে একাই- ১৯৬৯ সালে। প্রথমটিতে লীয়ারের ভূমিকায় ছিলেন অরসন ওয়েলস, দ্বিতীয়টিতে পল স্কফিল্ড। সঙ্গত কারণেই দ্বিতীয় চলচ্চিত্রটিই আজ বেশ আলোচিত, বা সমালোচিতও। ব্রুকের বিরুদ্ধে চলচ্চিত্র -মাধ্যমটির সঠিক ব্যবহারে অদক্ষতার অভিযোগ এসেছে। অভিযোগ এসেছিল যে যাঁরা শেক্সপীয়ারের ‘কিং লীয়ার’ পড়েননি, ওঁরা এ ছবি বুঝতেই পারবেন না।

আসলে কাহিনীটির শুধুমাত্র চিত্রায়ন নয়, চলচ্চিত্র-নির্মাণের ক্ষেত্রে শেক্সপীয়ারের নাট্য- সম্ভাবনার প্রতি একজন ¯্রষ্টা তখনই সুবিচার করতে পারেন যখন এই নাট্য সম্ভাবনা দৃশ্যগতভাবে আরেকজনের মাঝে জন্ম নিতে পারে। শেক্সপীয়ারের এই সর্বগ্রাসী ট্রাজেডিটির ব্যাপকতা ধারণা করতে প্রয়োজন যথাযথ সাহসী নিরীক্ষা এবং ব্রুক ঠিক সেটাই করেছেন। অক্ষরের পৃষ্ঠা ও মঞ্চের আধিপত্য থেকে ব্রুক ‘কিং লীয়ার’- কে মুক্তি দিতে চেয়েছেন। শেক্সপীয়ার নাটকের যে মূল কথা, একটা শেক্সপিয়ার-অভিজ্ঞতা, সেই অভিজ্ঞতার দৃশ্যরূপকেই হয়তো তিনি স্বাধীনভাবে চলচ্চিত্রায়িত করতে চেয়েছিলেন।

ব্রুক ডেনমার্কের উত্তর জাটল্যান্ডের আলোছায়ার প্রকৃতির মাঝে সাদাকালোয় ওঁঁর ছবিটি শুট্ করেছেন। ফলে জাটল্যান্ডের শীতকালীন যে শীতলতা তা ওঁঁর গোটা ছবির শরীরে গ্রন্থিত হয়ে রয়েছে। ইচ্ছা করেই রেখেছেন কিছু আউট-অব-ফোকাস্ শট্, ব্যবহার করেছেন একাধিক এলিয়েনেশন পদ্ধতি এবং গোটা ছবিটিই হলিউডী নিখুঁততা থেকে যোজন দূরে। একজন নবতরঙ্গের পবিচালকের মতই ব্রুক ‘লীয়ার’ -য়ে রেখেছেন হাতকাঁপা হ্যান্ডহেল্ড শট্, শুধু মাত্র চোখের সুবিশাল ক্লোজ আপ, জাম্পকাট, জুম এবং সম্পাদনার ধারাবাহিকতার ইচ্ছাকৃত বিচ্ছিন্নতা।

ব্রুকের ‘কিং লীয়ার’-য়ে শেষ দৃশ্যে লীয়াররূপী পল স্কফিল্ড পর্দার বাইরে হেঁটে চলে যায়। ব্রুকের ক্যামেরা বেশ কিছুক্ষণ ফ্রেমে শূন্য পর্দা ধরে রাখে। ‘লীয়ার’-য়ের সেই ‘নাথিংনেস’- য়েরই প্রতীকী শট্ যেন তা কিম্বা কর্ডেলিয়ার মত লীয়ারও ‘‘Gone forever”।

কুরোশাওয়াও করেছেন তাঁর নিজেস্ব লীয়ার -‘র‌্যান’ (১৯৮৫)। ‘র‌্যান’-য়ে কুরোশাওয়া বৃদ্ধ লীয়ারের তিন কন্যাকে তিন পুত্রে রূপান্তরিত করেছেন। সামন্তযুগের জাপানে রাজ্যপাট বিভাজনে কন্যার বদলে পুত্র হওয়াটাই সামাজিকভাবে বেশি বাস্তব ছিল। রঙয়ে তোলা এ ছবির দৃশ্যগত সৌকর্ষ অনন্য। রঙ নিয়ে খেলাও করেছেন কুরোশাওয়া। লাল হচ্ছে রক্তের রঙ, আর হলুদ হচ্ছে অসুস্থতা আর পান্ডুরতার রঙ। ছবিতে যুদ্ধ, হত্যা ও রক্তাক্ত ঘটনাবলী যতই বাড়তে থাকে, আমরা দেখি লাল ও হলুদ রঙ ততোই জোরালো হতে থাকে এবং শেষের দৃশ্যাবলীতে লাল ও হলুদ রঙটাই যেন গোটা পর্দার দখল নিয়ে নেয়। নতুন আরেকটি জিনিষ এ ছবিতে আনলেন কুরোশাওয়া। তা হচ্ছে বুদ্ধের বাণী। যুদ্ধ ও হত্যার এই ভয়াবহ পরিবেশে বুদ্ধের শান্তির বাণী কুরোশাওয়ার কিং লীয়ার-কে একটা আলাদা মাত্রা এনে দিয়েছে।

গ্রেনাডা টেলিভিশন ১৯৮৩ সালে মাইকেল এলিয়টের পরিচালনায় নির্মাণ করে এক Ôকিং লীয়ার’। নাম ভূমিকায় – লরেন্স অলিভিয়ার। এটা দেখতে পারাটা কৌতুহলোদ্দীপক ছিল যে বিশ্বের অন্যতম সেরা এই অভিনেতা ওঁঁর জীবনের শেষ পর্যায়ে এক প্রাচীন রাজার ভূমিকায় কেমন অভিনয় করলেন। অলিভিয়ারের অভিনয় যথার্থই হয়েছিল, যদিও অলিভিয়ারের দাড়িহীনতা বা অত্যন্ত স্বল্প দাড়ি পিতৃতান্ত্রিক বৃদ্ধ লীয়ারের ইমেজকে ফুটিয়ে তুলতে তেমন সহায়তা করেনি। তবে সমস্যা ঘটেছে অনত্র— মাধ্যমগত। ন্যাশনাল থিয়েটারের মঞ্চে বা বারবিকানে যে অভিনয় চমৎকার মানানসই, পর্দায় তা’ তেমন জমেনি। তবে মাধ্যমগত এই সীমাবদ্ধতা যে কাটিয়ে ওঠা যায়নি, তার দায় অলিভিয়ারের ততটা নয়, যতটা ছবির পরিচালক এলিয়টের উপরই বর্তায়।

একেবারেই ভিন্ন আঙ্গিকের এক ‘কিং লীয়ার’ বানিয়েছেন ষাট-সত্তর দশকে নিরীক্ষাধর্মী চলচ্চিত্রের অন্যতম পুরোধা- জ্যাঁ লুক গাদার । গদারের ‘ডন লীয়ার’ ছবিটি যেন বিগাঠনিকবাদের (deconstructivism) এক নিরীক্ষা। কোন সুস্পষ্ট কাহিনী নেই। যেটুকু কাহিনীর কাঠামো রয়েছে তা, আবর্তিত অবসরপ্রাপ্ত মাফিয়া প্রধান ডন লীয়ারো ও তার কন্যা কর্ডেলিয়াকে নিয়ে। কোনো এডমন্ড নেই, তবে জারজ ও ‘ natural ‘ প্রশ্নটি আছে। কোনো ‘ফুল’ চরিত্রও নেই, যদিও জানা যায় গদার উডি অ্যালেনকে এ চরিত্রটির জন্যে বলে রেখেছিলেন। রাজকীয় লাইব্রেরির চাকুরে পঞ্চম উইলিয়াম শেক্সপীয়ার জুনিয়ার ( শেক্সপীয়ারের কোনো আত্মীয় কী না তা অনুল্লেখ ) চেরনোবিল-উত্তর ইউরোপে খুঁজতে বেরিয়েছে ‘কিং লীয়ার’ নাটকের পান্ডুলিপিটি। পিটার সেলার্স অভিনয় করেছেন এ চরিত্রটিতে। হাতে নোট বই। বিচ্ছিন্ন খন্ড খন্ড চিত্র, মাঝে মাঝে ঘুরে ফিরে আসে ‘কিং লীয়ার” নাটকের নানা প্রতীক, উপমা, সংলাপ ও বাক্যাংশ। এই পরিবেশে ছবিতে প্রবেশ করে সাইবেরিয়া থেকে আগত জনৈক অধ্যাপক কুজনেৎসভ এবং তিনি ১৯৭০ সালে করা তাঁর ‘কিং লীয়ার” নির্মাণের কাহিনী শোনান লীয়ারো, কর্ডেলিয়া আর পিটার সেলার্সকে। লীয়ারের সংলাপ কখনো বলেছে পিটার সেলার্স, কখনো বা কয়েকটি চরিত্র— একই সঙ্গে। চরিত্রদের পরিচিতিকে কখনো কখনো অবুলপ্ত করে গদার আনেন  এক ধরণের ব্রেশটীয় এলিয়েশন এফেক্ট। হোটেলের বারান্দায় বসে লীয়ার বলে; ‘Who is that can tell me who I am ?‘ হোটেলের ভেতর থেকে এক তরুণী বেরিয়ে আসে। লীয়ারের কাঁধে হাত রেখে ক্যামেরার দিকে মুখ করে বলে যে কথাটি ফুল বলেছিল; ‘Lear’s shadow‘।

কুজনেৎসভের ছবির অংশ বিশেষ, মার্কিন মারকুট্টে ছবির আলেখ্য, ভার্জিনিয়া উলফের উপন্যাস, জোয়ান অব আর্ক, মার্কিন ধনতন্ত্রের সমালোচনা, এসব নিয়ে গদারের ‘ডন লীয়ার’ এক পাঁচমিশালী সিনেমাটিক নিরীক্ষা। গদারের এ ছবি সামান্যই শেক্সপীয়ারীয়। মূলত ছবিটি বিগাঠনিকবাদের এক চলচ্চিত্রক নিরীক্ষা। উৎস যতটা না শেক্সপীয়ার, তার চেয়ে বেশি— জ্যাক দেরিদা।

গদারের ছবি শিল্প হিসাবে হয় তো তেমন সফল হয়নি। তবে একটা কাজ গদারের ছবিটা করেছে। তা’ হচ্ছে শেক্সপীয়ারের মূল রচনাটিকে ভেঙ্গে চূর্ণ চূর্ণ করে, বিক্ষিপ্ত ও প্রক্ষিপ্ত করে, গদার লীয়ারের ইমেজটকে ভেঙ্গেছেন। লীয়ার, পশ্চিমা সভ্যতার এই শেষ পিতৃতান্ত্রিক (শেষ কি?), যে নির্বোধ অসহিঞ্চু পিতৃতান্ত্রিকতার উপর দাঁড়িয়ে আছে পশ্চিমামানস, তার ঈশ্বরচেতনাসহ, তাকে ভেঙ্গে বিগঠিত করে গদার এক সাহসী কাজেই করেছেন বলতে হবে।

জেফেরেল্লীর ‘‘রোমিও জুলিয়েট”  : তারুণ্য ও ক্লোজ আপের নন্দনতত্ত্ব

ফ্লাঙ্কো জেফেরেল্লীর ‘রোমিও জুলিয়েট’- ও এক পিতৃতন্ত্রবিরোধী ছবি। জেফেরেল্লীর ‘রেমিও জুলিয়েট’-য়ের সামাজিক আবহ এমন যেখানে পিতারা শাসন করে। পুত্রদের পৌরুষত্ব প্রকাশের প্রধান উপায় মূলত: পথেঘাটে হিংসাত্মক ঘটনা ঘটানো এবং মেয়েদের অবমাননা করার মধ্য দিয়ে। নারীদের থেকে তারা দূরত্ব রক্ষা করে চলতে চায় (হয়তো আকর্ষণটা অতি তীব্র বলেই!) এবং বলাই বাহুল্য, তাতে- ব্যর্থ হয়।

ইতালির জেফেরেল্লী বরাবরই ইংরেজি সাহিত্য ও সংস্কৃতি সঙ্গে সর্ম্পকযুক্ত ছিলেন। ১৯৬০ সালে ‘রোমিও জুলিয়েট’ মঞ্চে প্রযোজনা করেছেন, ১৯৬৭-তে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন ‘টেমিং অব দি শ্রু’। অ-ইংরাজ এই চলচ্চিত্র পরিচালকই শেক্সপীয়ারের সবচে বেশি নাটককে চলচ্চিত্রায়িত করেছেন। এর আগে অবশ্য জর্জ কুকোরও ‘রোমিও জুলিয়েট’ (১৯৩৬) নিয়ে উল্লেযোগ্য ছবি করেছেন, তবে নানা কারণেই জেফেরেল্লীর ছবিটি অধিক আলোচিত।

জেফেরেল্লী, অন্তত ‘রোমিও জুলিয়েট’-য়ে, সেই ধরণের শিল্পী, যিনি শিল্পদেবীর অনেকখানি জায়গা কামদেবকে ছেড়ে দিতে চেয়েছেন। আর ‘রোমিও জুলিয়েটে’-য়ে তার সুযোগও ছিল প্রচুর। এ নাটকে একাধিকবার প্রতিতুলনা টানা হয়েছে তরবারির সঙ্গে উত্থিত লিঙ্গের (‘‘My naked weapon is out”)। জেফেরেল্লী ‘রোমিও জুলিয়েট’ বানিয়েছেন ১৯৬৮ সালে। ১৯৬৮ সালে- দুনিয়াজুড়ে তারুণ্যের আন্দোলনের সেই বিশেষ বছর, যখন যুদ্ধবিরোধিতা, শান্তি ও পুরনো প্রজন্মের প্রতি ঘৃণার মনোভাব এবং যৌন নৈতিকতার বদ্ধ ঝাঁপদুয়ারগুলি হঠাৎ করেই খুলে গেল।

জেফেরেল্লীর ক্যামেরা যুবকদের দেহকে ধরে মূলত: তাদের দেহের যৌন আকর্ষণের দিকগুলিই তুলে ধরতে। যুবকেরা সবাই সুদর্শন, বিশেষ কওে টিবল্ট, এবং রোমিও তো বটেই। যে ভাবে বাণিজ্যিক ছবিতে নারীদেহকে প্রদর্শন করা হয়, প্রায় সে ভাবেই দৃষ্টিনন্দন এসব যুবকদের শরীরকে দেখান জেফেরেল্লী। এমন কী রোমিও ও জুলিয়েটের তারুণ্য উচ্ছল শয্যাদৃশ্যেও আমরা জুলিয়েটের নগ্ন দেহের একটি মাত্র শট দেখি, তাও সেকেন্ডের ভগ্নাংশ মাত্র, সেক্ষেত্রে রোমিওর নগ্নতাকে দেখানো হয় তিনটি শটে। এখানেও পুরুষের দেহই প্রধান্য পাচ্ছে।

যুবকেরা নানা অশ্লীল কৌতুক করে, করে অঙ্গভঙ্গী। একমাত্র রোমিওই বিরত থাকে এসব অশ্লীল কৌতুক থেকে। রোমিওকে আমরা প্রথমে দেখি লং শটে হেঁটে আসে। হাতে সাদা এক গুচ্ছ ফুল। সাউন্ডট্রাকে একটা সুরেলা মধুর আবহসঙ্গীত। রোমিও, হাতে ফুল, এরকম শট্ আরো আছে জেফেরেল্লীর ছবিতে। ষাট দশকের যুদ্ধবিরোধী চেতনার এক প্রতীক যেন হয়ে ওঠে রোমিও— এক শান্তিপ্রিয় অহিংস যুবক।

জেফেরেল্লী ছবিটাতে পাত্র-পাত্রীর হাতের শট্কে ব্যবহার করেছেন নানাভাবে; ‘Let’s lips do what  hands do‘– নৃত্য-দৃশ্যে, ব্যালকনি-দৃশ্যে, চিঠি-দৃশ্যে, এবং চূড়ান্ত মৃত্যুদৃশ্যেও। আর এ সব শট্ই ধারণ করা হয়েছে ক্লোজ আপে, কখনো এক্সট্রিম ক্লোজ আপে। মিডশটগুলোতে পেছনের দৃশ্যরূপ জেফেরেল্লী চমৎকারভাবে করেছেন ডাচ্ পেইন্টিংসয়ের আলোকে- কখনো বা রেমব্রার বর্ণচ্ছটায়।

তবে এই হতভাগ্য প্রেমিক-প্রেমিকার আত্মত্যাগ বৃথা যায়নি। ভেরোনার পথে পথে শান্তি ফিরে এসেছে। শেষ শটে জেফেরেল্লী দেখান মন্টেগু আর ক্যাপুলেটরা যৌথভাবে শোভাযাত্রায় হেঁটে এই তরুণ-তরুণীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।

‘রোমিও জুলিয়েট” টীনএজ প্রেমের এক ধ্রুপদ উৎস হয়ে রয়েছে। মাত্র পনের বছরের অলিভিয়ার হাসিকে জেফেরেল্লী ওঁর ছবিতে জুলিয়েটের জন্যে নির্বাচিত করেছিলেন। দেশে দেশে যুগে যুগে এই একই প্রেমকাহিনী নিয়ে অজস্র চলচ্চিত্র হয়েছে। আমাদের উপমহাদেশেও। প্রতি এক যুগ পরপরই একটি করে ‘ববি’ বা একটি ‘কেয়ামত সে কেয়ামত’ যে বক্স অফিসের সব রেকর্ড ভেঙ্গে ফেলে, তা খুব স্বাভাবিকই। কারণ ইতিমধ্যে আরেক নতুন টীনএজ প্রজন্ম তৈরি হয়েছে, যারা প্রেমের ভুবনে প্রবেশে উদগ্রীব। তাদের জন্যে চাই তাদের মতই একপ্রস্থ— ‘‘রোমিও জুলিয়েট”।

টেলিভিশনে শেক্সপীয়ার : ছোট পর্দা ও শেক্সপীয়ারীয় বিশালত্বের দ্বন্দ্ব

বিবিসি টেলিভিশন ১৯৭৮ থেকে ১৯৮৫ সালের মাঝে শেক্সপীয়ারের সকল নাটককে চলচ্চিত্রায়নের এক ব্যাপক উদ্যোগ হাতে নেয়। বিবিসি-র দাবি যে, শেক্সপীয়ারের সব নাটক প্রযোজনার এই প্রকল্পটি টেলিভিশন ইতিহাসের সবচে’ ব্যয়বহুল ও উচ্চাকাক্সক্ষী এক প্রকল্প। বিবিসি-র এই পরিশ্রমী উদ্যোগ প্রশংসনীয় কাজ সন্দেহ নেই, তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা টেলিভিশনের নাটকই হয়েছে, চলচ্চিত্র হয়নি। বড় জোর হয়েছে ক্যামেরাবদ্ধ নাটকের চলচ্চিত্র হওয়ার প্রচেষ্টা।

তবে আসলে এটা বিবিসি-র নির্মাতাদের দোষ নয়। সমস্যাটা অন্যত্র― মাধ্যমগত। গভীর কোন রূপায়ন কি টেলিভিশনে আদৌ সম্ভব? লীয়ার যখন মৃত কর্ডেলিয়াকে বাহুতে তুলে নিয়ে ঢোকে, টিভির ছোট পর্দায়, কৃত্রিম সাজানো সেটে এরকম গভীর এক দৃশ্যও কেমন যেন হাস্যকর ঠেকে! তাছাড়া টেলিভিশনের সীমিত সময়সীমার মধ্যে শেক্সপীয়ারকে পূর্ণাঙ্গভাবে করাও কঠিন। সাড়ে তিন ঘন্টার ‘করিওনেলাস’ -কে কেটেছেঁটে আড়াই ঘন্টায় নামানো হয়েছে এবং বলা বাহুল্য এই অপার সম্ভাবনাময় নাটকটির নাট্যগুণকে তাতে খর্বিতই করা হয়েছে। টেলিভিশনের জন্যে করা পিটার ব্রুকের ‘কিং লীয়ার ’ -য়ের এমন সমালোচনাও এসেছে যে, সংক্ষিপ্ত করতে যেয়ে ব্রুক শেক্সপীয়ারকে বিকৃতই করে ফেলেছেন।

আরেক বড় সমস্যা হচ্ছে লোকেশন বা পশ্চাৎভূমি স্থির করা। কৃত্রিমভাবে সেট করলে বড্ড চোখে লাগে। যত যত্ন নিয়ে আর নিখুঁতই করার চেষ্টা হোক না কেন, মানুষ তো আর ঈশ্বর নয়, ফলে মানুষের তৈরি সেট কখনোই প্রকৃতির মত সর্বাঙ্গীন সুন্দর হয় না, কৃত্রিমতা থেকেই যায়। যারা মোস্তফা মনোয়ারের সেট ডিজাইনে করা ঢাকা টেলিভিশনে ‘মুখরা রমণী বশীকরণ’ দেখেছেন, তারা ওঁকে কি সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়েছিল, তা বুঝবেন। সর্বক্ষেত্রে যথার্থ ষোড়শ শতকের লোকেশন কোথায় মিলবে? এ সমস্যার একটা সমাধান হচ্ছে, ইনডোর শুটিং-য়ের ক্ষেত্রে পশ্চাৎভূমিকে এক ধরনের পেইটিংয়ের রূপ দেওয়া। বিবিসি-র কোনো কোনো প্রযোজনায় যেমনটি সফলভাবে করা হয়েছে। যেমন জোনাথার মিলার ওঁঁর ‘টেমিং অব দি শ্রু’-র টিভি প্রযোজনাতে ডাচ পেইটিংয়ের চমৎকার ব্যবহার করেছেন।

তবে এটা কিছুটা অভিজ্ঞতার উপলদ্ধিও যে, শেক্সপীয়ারের কোনো কোনো নাটক, যেগুলিতে বড় যুদ্ধ দৃশ্য রয়েছে, যেমন চতুর্থ ও পঞ্চম হেনরী, টেলিভিশনের তেমন উপযোগী নয়। টিভি চিত্রায়নের জন্য বরং বেশী উপযোগী কিছু কিছু নাটক, যেমন ‘মেজর ফর মেজর’, যার এপিসোডিক গঠনটি টেলিভিশনের জন্যে অনেক বেশি উপযুক্ত প্রমাণিত হয়েছে।

তবে জেন হাওয়েল  বা এলিজা মোশিনস্কি  প্রমাণ করেছেন যে, টেলিভিশনের ছোট পর্দাতেও শেক্সপীয়ারের ভালো উপস্থাপনা সম্ভব। হাওয়েল মঞ্চ-ঐতিহ্যের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখিয়েছেন, মোশিনস্কি চলচ্চিত্রের প্রতি, কিন্তু দু’জনেই টিভির পর্দায় শেক্সপীয়ারকে সফলভাবে উপস্থিত করতে সক্ষম হয়েছেন। এসব সফল প্রযোজনাগুলোতে পাত্রপাত্রীরা অনেক সময়ই মঞ্চঘেঁষা অভিনয় করেছে। কিন্তু আবার ক্যামেরার মুভমেন্টগুলো ঘটেছে সিনেমাটিক, এবং ফল দাঁড়িয়েছে- টেলিভিশনীয়। এ এক নতুন নন্দনতত্ত্ব।

শেষের আগে

যেহেতু শেক্সপীয়ারের প্রটাগনিস্টরা লীয়ার, ওথেলো, কর্ডেলিয়া, টিমন এরা সবাই শেষে করুণ মৃত্যুর পরিণতি লাভ করে, তাই কেউ কেউ বলেন, শেক্সপীয়ার নৈরাশ্যবাদী। আসলে বাস্তববাদী শেক্সপীয়ার হয় তো অনুভবে জানতেন, ওঁর যুগটিতে, যখন মুনাফাকেন্দ্রিক এক নতুন সভ্যতার জয়জয়কার ঘটতে চলছে, ওঁর মানবতাবাদী নায়কদের অবস্থান ইতিহাসের বিপরীত দিকে। তাদের পতন তিনি দেখেছেন, কিন্তু তাদের মধ্য দিয়ে এমন কিছু প্রশ্ন এই নবসভ্যতার প্রতি তিনি রেখে গেছেন, যার সদুত্তর এই সভ্যতাকে দিতে হবে- টিঁকে থাকতে হলে। তা প্রযুক্তির উন্নতি যতই হোক না কেন।

শেক্সপীয়ারের পরিবেশনার দায়িত্ব গত শতক পর্যন্ত শুধুমাত্র মঞ্চেরই ছিল। আজ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনেও শেক্সপীয়ারের সৃজনশীল পরিবেশনার সম্ভাবনা স্বীকৃত হয়েছে। মঞ্চ নাটকের সঙ্গে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রশ্ন এটা নয়। তবে শেক্সপীয়ারের নাটককে এক নতুন আঙ্গিকে দেখার সুযোগ চলচ্চিত্র করে দিয়েছে। বস্তুত: চলচ্চিত্র যে নাটককে চিত্রায়িত করতে পারছে, এটা একটা শিল্পমাধ্যম হিসাবে চলচ্চিত্রের অপার সম্ভাবনারই প্রতিফলন। তবে অধুনা চলচ্চিত্র-নির্মাণে চলচ্চিত্র-ক্যামেরার চেয়ে কম্পিউটার বা লেজার ডিস্কের ভূমিকা বাড়ছে- স্পিয়েলবার্গের সাম্প্রতিক ছবিগুলি।

লুমিয়ের যে ধরনের চলচ্চিত্র উদ্ভাবন করেছিলেন, তার প্রেক্ষিতটা ক্রমশই পাল্টে যাচ্ছে। তবে ‘ইমেজ’ বা চিত্রকল্প সৃষ্টির আর পিছুফেরা নেই। যা আছে তা চিত্রকল্পগুলির আরো সুনির্দিষ্ট, দৃষ্টিনন্দন ও বাস্তব রূপ। আগামী প্রজন্মের মানুষেরা ভাগ্যবান, তারা মানবচরিত্র চিত্রনের সর্বসেরা কারিগর শেক্সপীয়ারকে, আরো সঠিক ইমেজে, এবং আরো যথার্থভাবে দেখতে পাবেন।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত