সত্যজিৎ রায়ের গল্প অনাথবাবুর ভয়

অনাথবাবুর সঙ্গে আমার আলাপ ট্রেনের কামরায়। আমি যাচ্ছিলাম রঘুনাথপুর হাওয়া বদলের জন্য।

কলকাতায় খবরের কাগজের আপিসে চাকরি করি। গত ক-মাস ধরে কাগজের চাপে দম বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছিল। তাছাড়া আমার লেখার শখ, দু-একটা গল্পের প্লটও মাথায় ঘুরছিল, কিন্তু এত কাজের মধ্যে কি আর লেখার ফুরসত জোটে? তাই আর সাত-পাঁচ না ভেবে দশদিনের পাওনা ছুটি আর দিস্তেখানেক কাগজ নিয়ে বেড়িয়ে পড়লাম।

এত জায়গা থাকতে রঘুনাথপুর কেন তারও অবিশ্যি একটা কারণ আছে। ওখানে বিনা খরচায় থাকার একটা ব্যবস্যা জুটে গেছে। আমার কলজের সহপাঠি বীরেন বিশ্বাসের পৈতৃক বাড়ি রয়েছে রঘুনাথপুরে। কফি হাউসে বসে, ছুটিতে কোথায় যাওয়া যায়, এই আলোচনা প্রসঙ্গে বিরেন খুব খুশি হয়ে ওর বাড়িটা অফার করে বলল, ‘আমিও যেতুম, কিন্তু আমার এদিকের ঝামেলা, বুঝতেই তো পারছিস। তবে তোর কোন অসুবিধা হবে না। আমাদের পঞ্চাশ বছরের পুরনো চাকর ভরদ্বাজ রয়েছে ও বাড়িতে। ওই তোর দেখাশুনা করবে। তুই চলে যা।’

গাড়িতে যাত্রী ছিল অনেক। আমার বেঞ্চিতে আমারই পাশে বসে ছিলেন অনাথবন্ধু মিত্র। বেটেখাটো মানুষটি, বছর পঞ্চাশেক আন্দাজ

বয়স। মাঝখানে টেরিকাটা কাচাপাকা চুল, চেখের চাহনি তীক্ষ্ণ, আর ঠোঁটের কোনে এমন একটা ভাব যেন মনের আনাচেকানাচে সদায় কোন মজার চিন্তা ঘোরাফেরা করছে। পোশাক আশাকের ব্যাপারেও একটা বিশেষত্ব লক্ষ্য করলাম; ভদ্রলোকে হঠাৎ দেখলে মনে হবে তিনি যেন পঞ্চাশ বছরের পুরানো কোন নাটকের চরিত্র অভিনয় করার জন্য সেজেগুজে তৈরি হয়ে এসেছেন। ওরকম কোট, ও ধরনের শার্টের কলার, ওই চশমা, আর বিশেষ করে ওই বুট জুতো-এসব আর আজ-কালকার দিনে কেউ পরে না।

অনাথবাবুর সঙ্গে আলাপ করে জানলাম তিনিও রঘুনাথপুর যাচ্ছেন। কারণ জিজ্ঞেস করতে ভদ্রলোক কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। কিংবা এও হতে পারে যে ট্রেনের শব্দের জন্য তিনি আমার প্রশ্ন শুনতে পান নি। বীরেনের পৈতৃক ভিটেটি দেখে মনটা খুশী হয়ে উঠল। বেশ বাড়ি। সামনে একফালি জমি-তাতে সবজী ও ফুলগাছ দুই-ই হয়েছে। কাছাকাছির মধ্যে অন্য কোন বাড়ি নেই, কাজেই পড়শীর উৎপাত থেকেও রক্ষা।

আমি আমার থাকার জন্য ভরদ্বাজের আপত্তি সত্বেও ছাতের চিলে কেঠাটি বেছে নিলাম। আলো বাতাস এবং নির্জনতা, তিনটেই অপর্যাপ্ত পাওয়া যাবে ওখানে। ঘর দখল করে জিনিসপত্র গোছাবার সময় দেখি আমার দাড়ি কামানোর খুড় আনতে ভুলে গিয়েছি। ভরদ্বাজ শুনে বলল, ‘তাতে আর কী হয়েছে খোকাবাবু এই তো কুন্ডুবাবুর দোকান, পাচ মিনিটের পথ। সেখানে গেলেই পাবে’ খন বিলেড।’

বিকেল চরটে নাগাদ চা-টা খেয়ে কুন্ডুবাবুর দোকানের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম। গিয়ে দেখি সেটি একটি ভালো আড্ডার জায়গা। দোকানের ভিতর দুটি বেঞ্চিতে বসে পাঁচ-সাতটি পৌঢ় ভদ্রলোক রীতিমত গল্প জমিয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন বেশ উত্তেজিতভাবে বলছেন, ‘আরে বাপু, এ তো আর শোনা কথা নয়। এ আমার নিজের চোখে দেখা। আর তিরিশ বছর হয়ে গেল বলেই কি সব মন থেকে মুছে গেল? এসব স্মৃতি সহজে ভোলবার নয়, আর বিষেশ করে যখন হলধর দও ছিল আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তার মৃত্যুর জন্য আমি যে কিছু অংশে দায়ী, সে বিশ্বাস আমার যায় নি।’

আমি এক প্যাকেট সেভন-ও ক্লক কিনে আরো দু একটা অবান্তর জিনিসের খোজ করতে লাগলাম। ভদ্রলোক বলে চললেন, ‘ ভেবে দেখুন, আমারই বন্ধু আমারই সঙ্গে মাত্র দশ টাকা বাজি ধরে রাত কাটাতে গেল। ওই উত্তর পশ্চিম ঘরটাতে। পরদিন ফেরে না, ফেরে না-শেষটায় আমি, জিতেন বক্সি, হরিচরন আর আরো তিন চারজন কে ছিল ঠিক মনে নেই-গেলুম হালদার বাড়িতে হলধরের খোঁজ করতে। গিয়ে দেখি বাবু ওই ঘরের মেঝেতে হাত পা ছড়িয়ে মরে কাঠ হয়ে আছেন, তার চোখ চাওয়া, দৃষ্টি কড়িকাটের দিকে। আর সেই দৃষ্টিতে ভয়ের যা নমুনা দেখলুম, তাতে ভূত ছাড়া আর কী ভাবব বলুন? গায়ে কোন ক্ষতচিহ্ন নেই। বাঘের আচড় নেই, সাপের ছোবল নেই কিচ্ছু নেই। আপনারাই বলুন এখন কী বলবেন।’

আরো মিনিট পাচেক দোকানে থেকে আলোচনার বিষয়টি সম্পর্কে মোটামুটি একটা ধারণা হল। ব্যাপারটা এই- রঘুনাথপুরে দক্ষিণপ্রান্তে হালদার বাড়ি বলে একটি দুশো বছরের পুরনো ভন্নপ্রায় জমিদারী প্রাসাদ আছে। সেই প্রাসাদে বিশেষ করে তার দোতলার উত্তর-পশ্চিম কোণের একটি ঘরে নাকি অনেক কালের পুরনো একটি ভূতের আনাগোনা আছে। অবশ্য সেই ত্রিশ বছর আগে ভবতোষ মজুমদারের বন্ধু হলধর দত্তের মৃত্যুর পর আজ অবধি নাকি কেউ সে বাড়িতে রাত কাটায় নি। কিন্তু তাও রঘুনাথপুরের বাসিন্দারা ভূতের অস্তিত্ব মনে প্রাণে বিশ্বাস করে বেশ একটা রোমাঞ্চ অনুভব করে। আর বিশ্বাস করার কারণও আছে যথেষ্ট। একে তো হলধর দত্তের রহস্যজক মৃত্যু, তার উপর এমনিতেই হালদার বংশের ইতিহাসে নাকি খুনখারাপিট, আত্মহত্যা ইত্যাদিও অনেক নজির পাওয়া যায়।

মনে মনে হালদার বাড়ি সম্পর্কে বেশ খানিকটা কৌতহূল নিয়ে দোকানের বাইরে এসেই দেখি আমার ট্রেনেরে আলাপী অনাথবন্ধু ম্‌ত্ির মশাই হাসি হাসি মুখে করে দাড়িয়ে আছেন। আমায় দেখে বললেন, ‘শুনছিলেন ওদের কথাবার্তা?’

‘বিশ্বাস হয়?’

‘কী? ভূত?’

‘হ্যাঁ?’

‘ব্যাপার কী জানেন- ভূতের বাড়ির কথাতো অনেকই শুনলাম, কিন্তু সেসব বাড়িতে থেকে নিজের চোখে ভূত দেখেছে এমন লোক তো কই আজ অবধি একটিও মীট করলাম না। তাই ঠিক-’

অনাথবাবু এটু হেসে বললেন, ‘একবার দেখে আসবেন নাকি?’

‘কী?’

‘বাড়িটা’

‘দেখে আসব মানে-’

‘বাইরে থেকে আর কি। বেশি দূর তো নয়। বড় জোর মাইলখানেক। এই রাস্তা দিয়ে গিয়ে জোড়াশিবের মন্দির ছাড়িয়ে ডানহাতি রাস্তায় ঘুরে পোয়াটাক পথ।’

ভদ্রলোককে বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছিল। আর তাছাড়া এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে গিয়ে কী করব? তাই চললাম তার সঙ্গে।

হালদারদের বাড়িটা দূর থেকে দেখা যায় না, কারণ বাড়ির চারপাশে বড় বড় গাছের জঙ্গল। তবে বাড়ির গেটের মাথাটি দেখা যেতে থাকে পৌঁছনোর প্রায় দশ মিনিট আগে থেকেই। বিরাট ফটক, মাথার উপর ভগ্ন পায় নহবতখানা ফটকের ভিতর দিয়ে বেশ খানিক দূর রাস্তা গিয়ে তবে সদর দালান। দু তিনটে মূর্তি আর ফোয়ারার ভগ্নাবশেষ দেখে বুঝলাম যে বাড়ির আর ফটকের মাঝখানের এই জায়গাটা আগে বাগান ছিল। বাড়িটি অদ্ভুদ। কারুকার্যের কোনো বাহার নেই তার কোনো জায়গায়। কেমন যেন একটা বেঢপ চৌকো-চৌকো ভাব। বিকেলের পড়ন্ত রোদ এসে পড়েছে তার শেওলাবৃত দেয়ালে।

মিনিটখানেক চেয়ে থাকার পর অনাথবাবু বললেন, ‘আমি যতদূর জানি, রোদ থাকতে ভূত বেরোয় না।’ তারপর আমার দিকে চেয়েচোখ টিপে বললেন, ‘একবার চট কওে সেই ঘরটা দেখে এলে হত না?’

‘সেই উত্তর-পশ্চিমের ঘর? যে ঘরে-’

‘হ্যাঁ। যে ঘরে হলধর দত্তের মৃত্যু হয়েছিল।’

ভদ্রলোকের তো এসব ব্যাপারে দেখছি একটু বাড়িবাড়ি রকমের আগ্রহ! অনাথবাবু বোধহয় আমার মনের ভাবটা আঁচ করতে পেরেই বললেন, ‘খুব আশ্চর্য লাগছে, না? আসলে কী জানেন? আপনাকে বলতে দ্বিধা নেই। আমার রঘনাথপুর আসার একমাত্র কারণই হল ওই বাড়িটা।’

‘বটে?’

‘আজ্ঞে হ্যাঁ। ওটা যে ভূতের বাড়ি আমি কলকাতায় থাকতে সে খবরটা পেয়ে ওই ভূতটিকে দেখব বলে এখানে এসেছি। আপনি সেদিন ট্রেনে আমার আসার কারণটা জানতে চাইলেন। আমি উত্তর না দিয়ে অভদ্রতা করলাম বটে, কিন্তু মনে মনে স্থির করেছিলাম যে উপযুক্ত সময় এলে অথাৎ আপনি কিরকম লোক সেটা আরেকটু জেনে নিয়ে আসল কারণটা নিজে থেকেই বলব।’

‘কিন্তু তাই বলে ভূতের পেছনে ধাওয়া করে একেবারে কলকাতা ছেড়ে-’

‘বলছি, বলছি। ব্যস্ত হবেন না। আমার কাজটা সম্বন্ধেই তো বলা হয় নি এখনো আপনাকে। আসলে আমি ভুত সম্পর্কে একজন বিশেষজ্ঞ। আজ পঁচিশ বছর ধরে এ ব্যাপার নিয়ে বিস্তর রিসার্চ করেছি। শুধু ভূত কেন ভূত, প্রেত, পিশাচ ডাকিনী, যোগিনী, ভ্যাম্পায়ার, ভডুইজম ইত্যাদি যা কিছু আছে তার সম্বন্ধে বইয়ে যা লেখা তার প্রায় সবই পড়ে ফেলেছি। সাতটা ভাষা শিখতে হয়েছে এসব বই পড়ার জন্য। পরলোকত্ব নিয়ে লন্ডনের প্রফেসার নর্টনের সঙ্গে আজ তিন বছর ধরে চিঠি লেখালিখি করেছি। আমার লেখা প্রবন্ধ বিলেতের সব নামকরা কাগজে বেরিয়েছে। আপনার কাছে বড়াই করে কী লাভ, তবে এটুকু বলতে পারি যে এদেশে এ ব্যাপারে আমার চেয়ে বেশি জ্ঞানি লোক বোধহয় আর নেই।’

ভদ্রলোকের কথা শুনে তিনি যে মিথ্যে বলেছেন বা বাড়িয়ে বলেছেন এটা আমার একবারও মনে হয় না। বরং তার সম্বন্ধে খুব সহজেই একটা বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার ভাব জেগে উঠল।

অনাথবাবু একটুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘ভারতবর্ষের অন্তত তিনশো ভূতের বাড়িতে আমি রাত কাটিয়েছি।’

‘বলেন কী?’

‘হ্যাঁ। আর সেসব কিরকম কিরকম জায়গায় জানেন? এই ধরুন জব্বলপুর, কাসিয়ং চেরাপুঞ্জি, কাঁথি, কাটোয়া, আজিমগঞ্জ, আর কম করে ত্রিশটা নীলকুঠিতে আমি রাত্রি যাপন করেছি। এ ছাড়া কলকাতা এবং তার কাছাকাছির মধ্যে অন্তত পঞ্চশখানা বাড়ি তো আছেই। কিন্তু—’

অনাথ বাবু হঠাৎ থেমে গেলেন। তারপর ধীওে ধীরে মাথা নেড়ে বললেন, ‘ভূত আমায় ফাঁকি দিয়েছে। হয়ত, ভূতকে যারা চায়না, ভূত তাদেরি কাছে আসে। আমি বার বার হতাস হয়েছি। মাদ্রাজে ত্রিচিনপল্লীতে দেড়শ বছরের পুরোন একটা সাহেবদের পরিত্যক্ত ক্লাব-বাড়িতে ভূত একবার কাছাকাছি এসেছিল। কিরকম জানেন? অন্ধকার ঘর, একফোটা বাতাস নেই, যতবার মোমবাতি ধরাব বলে শেলাই জ্বলাচ্ছি, ততবারিই কে যেন ফুঁ দিয়ে লিভিয়ে দিচ্ছে। শেষটায় তেরোটা কাঠি নষ্ট করার পর বাতি জ্বলল এবং আলোর সঙ্গে সঙ্গেই ভূতবাবাজী সেই যে গেলেন আর এলেন না। একবার কলকাতার ঝামাপুকুরের এক হানাবাড়িতেও একটা ইন্টারেস্টিং অভিজ্ঞতা হয়েছিল। আমার মাথায় তো এত চুল দেখছেন? অথচ হাত দিয়ে দেখি এই বাড়ির একটা অন্ধকার ঘওে ভূতের অপেক্ষায় বসে থাকতে থাকতে মাঝরাত্তির নাগাদ হঠাৎ ব্রক্ষতালুর কাছটায়একটা মশার কামড় খেলাম।কি ব্যপার? অন্ধকাওে ভয়ে ভয়ে মাথায় হাত দিয়ে দেখি একটা চুলও নেই ! একবারে মসৃন মাথাজোড়া টাক! একি আমারই মাথা, না অন্য কারুর মাথায় হাত দিয়ে নিজের মাথা বলে মনে করছি? কিন্তু মশায় কামড়টাতো আমিই খেলাম। টর্চটা জ্বেলে আয়নায় দেখি টাকের কোন চিহ্নমাত্র নেই। আমার যে চুল সে চুলই রয়েছে আমার মাথায়। ব্যস, এই দুটি ছাড়া আর কোন ভূতুড়ে অভিজ্ঞতা এত চেষ্টা সত্ত্বেও আমার হয় নি। তাই ভূত দেখার আশা একরকম ছেড়েই দিয়েছিলাম, এমন সময় একটা পুরনো বাধানো প্রবাসিতে রঘুনাথপুরের এ বাড়িটার একটা উল্লেখ পেলাম। তাই ঠিক করলাম একটা শেষ চেষ্টা দিয়ে আসব।’

অনাথবাবুর কথা শুনতে শুনতে কখন যে বাড়ির সদর দরজায় এসে পড়েছি সে খেয়াল ছিল না। ভদ্রলোক তার ট্যাকঘড়িটা দেখে বললেন, ‘আজ পাঁচটা একত্রিশে সূর্যাস্ত। এখন সোয় পাঁচটা। চলুন, রোদ থাকতে থাকতে একবার ঘরটা দেখে আসি।’

ভূতের নেশাটা বোধহয় সংক্রামক, কারণ আমি অনাথবাবুর প্রস্তাবে কোন আপত্তি করলাম না। বরঞ্চ বাড়ির ভিতরটা, আর বিশেষ করে দোতলার ওই ঘরটা দেখবার জন্য বেশ একটা আগ্রহ হচ্ছিল।

সদর দরজা দিয়ে ঢুকে দখে বিরাট উঠোন ও নাটমন্দির একশো-দেড়শো বছরে কত উৎসব, কত অনুষ্ঠান, কত পূজা-পার্বণ, যাত্রা, কথকতা এইখানে হয়েছে, তার কোন চিহ্ন আজ নেই।

উঠোনের তিন দিকে বারান্দা। আমাদের ডাইনে বারান্দার যে অংশ, তাতে একটি ভাঙা পালকি পড়ে আছে, এবং পালকিটি ছাড়িয়ে হাত দশেক গিয়েই দোতলায় যাবার সিঁড়ি।

সিড়িটা এমনই অন্ধকার যে উঠবার সময় অনাথবাবুকে তার কোটের পকেট থেকে একটি টর্চ বার করে জ্বলাতে হল। প্রায় অদৃশ্য মাকড়সার জালের বাহু ভেদ করে কোনরকমে দোতলায় পৌঁছানো গেল। মনে মনে বললাম, এ বাড়িতে ভূত থাকা অস্বাবিক নয়।

দোতলার বারান্দায় দাড়িয়ে হিসাব করে দেখলাম বাঁ দিক দিয়ে সোজা চলে গেলে ওই যে ঘর, ওটাই হল উত্তর-পশ্চিমের ঘর। অনাথবাবু বললেন, ‘সময়নষ্ট করে লাভ নেই। চলুন এগোই।’

এখানে বলে রাখি, বারান্দায় কেবল একটি জিনিস ছিল -সেটি একটি ঘড়ি। যাকে বলে গ্র্যান্ডফাদার ক্লক। কিন্তু তার অবস’আ খুবই শোচনীয় কাচ নেই বড় কাটাটিও উধাও, পেন্ডালামটি ভেঙে কাত হয়ে পড়ে আছে।

উত্তর-পশ্চিমের ঘরের দরজাটি ভেজানো ছিল। অনাথবাবু যখন তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে সন্তর্পণে ঠেলে দরজাটি খুলছিলেন, তখন বিনা কারণেই আমার গা টা ছমছম করছিল।

কিন্তু ঘরের ভিতর ঢুকে অস্বাভিক কিছু লক্ষ্য করলাম না। দেখে মনের হয় একালে বৈঠকখানা ছিল। ঘরের মাঝখানে একটা বিরাট টেবিল, তার কেবল পায়া চারখানাই রয়েছে, উপরের তক্তাটা নেই। টেবিলের পাশে জানালার দিকে একটি আরাম কেদারা। অবিশ্যি এখন আর সেটি আরামদায়ক হবেনা সন্দেহ, কারণ তার একটি হাতল ও বসবার জায়গায় বেতে খানিকটা অংশ লোপ পেয়েছে।

উপরের দিকে চেয়ে দেখি ছাত থেকে ঝুলছে একটি টানাপাখার ভগ্নাংশ। অর্থাৎ তার দড়ি নেই, কাঠের ভাঙ্গাটা ভাঙা এবং ঝালরের অর্ধেকটা ছেঁড়া।

এ ছাড়া ঘরে আছে একটা খাঁজকাটা বন্দুক রাখার তাক, একটি নলবিহীন গড়গড়া, আর দু‘খানা সাধারণ হাতলভাঙা চেয়ার।

অনাথবাবু কিছুক্ষণ একেবারে স্তব্দ হয়ে রইলেন। মনে হল খুব মনোযোগ দিয়ে কী একটা অনুভব করার চেষ্টা করলেন। প্রায় মিনিটখানেক পরে বললেন, ‘একটা গন্ধ পাচ্ছেন?’

‘কী গন্ধ?’

‘মাদ্রাজী ধুপ, মাছের তেল, আর মড়াপোড়ার গন্ধ মেশানো একটা গন্ধ?’

আমি বার দু-এক বেশজোরে নিশ্বাস টানলাম। অনেকদিনের বন্ধ ঘর খুললে যে একটা ভ্যাপসা গন্ধ বেরোয়, সে গন্ধ ছাড়া আর কোন গন্ধই পেলাম না। তাই বললাম, ‘কই,ঠিক বুঝতে পারছিনা তো।’

অনাথবাবু আরো একটুক্ষণ চুপ করে থেকে হঠাৎ বাঁ হাতের তেলোতে ডান হাত দিয়ে একটা ঘুষি মেরে বললেন, ‘বহুত আচ্ছা।’ এ গন্ধ আমার চেনা্ গন্ধ। এ বাড়িতে ভূত অবশ্যম্ভাবী। তবে বাবাজী দেখা দেবেন কিনা দেবেন সেটা কাল রাত্রের আগে বোঝা যাবে না, চলুন।’

অনাথবাবু স্থির করে ফেললেন যে, পরদিনই তাকে এ ঘরে রাত্রিবাস করতে হবে। ফেরার পথে বললেন, ‘আজ থাকলুম না কারণ কাল অমাবস্যা-ভূতের পক্ষে সবচেয়ে প্রশস্ত তিথি। তাছাড়া রু-একটি জিনিস সঙ্গে রাখা দরকার। সেগুলো বাড়িতে রয়ে গেছে, কাল নিয়ে আসব। আজ সার্ভেটা করে গেলুম আর কি।’

ভদ্রলোক আমায় বাড়ি অবধি পৌছে দিয়ে বিদায় নেবার সময় গলাটা একটু নামিয়ে বললেন, ‘আর কাউকে আমার এই প্ল্যানর কথাটা বলবেন না যেন। এদের কথাবার্থা তো শুনলুম আজকে-যা ভয় আর যা প্রেজুডিস এদের, জানলে পরে হয়ত বাধাটাধা দিয়ে আমার প্ল্যানটাই ভেস্তে দেব। আর হ্যাঁ, আরেকটা কথা। আপনাকে আমার সঙ্গে যেতে বলরুম না বলে কিছু মনে করবেন না। এসব ব্যাপার, বুঝলেন কিনা, একা না হলে ঠিক জুতসই হয় না।’

পরদিন দুপুরে কাগজ কলম নিয়ে বসলেও লেখা খুব বেশিদূর এগোল না। মন পড়ে রয়েছে হালদার বাড়িরই উত্তর-পশ্চিম ঘরটায়। আর রাত্রে অনাথবাবুর কী অভিজ্ঞতা হবে সেই নিয়ে একটা শান্তি উদ্বেগ রয়েছে মনের মধ্যে।

বিকেলে অনাথবাবুকে হালদার বাড়ির ফটক অবধি পৌঁছে দিলাম। ভদ্রলোকের গায়ে আজ একটা কালো গলবন্ধ কোট, কাধে জলের ফ্লাস্ক আর হাতে সেই কালকের তিন সেলের টর্চ। ফটক দিয়ে ঢুকবার আগে কোটের দু‘পকেটে দু হাত ঢুকিযে দুটো বোতল বার করে আমায় দেখিয়ে বললেন, ‘ এই দেখুন এটিতে রয়েছে আমার ফরমূলায় তৈরি তেল শরীরের অনাবৃত অংশে মেখে নিলে আর মশা কামড়াবে না। আর এই দ্বিতীয়টিতে হল কারবলিক অ্যাসিড ঘরের আশেপাশে ছড়িয়ে দিলে সাপের উৎপাত থেকে নিশ্চিন্ত।’ এই বলে বোতল দুটো পকেটে পুরে, টর্চটা মাথায় ঠেকিয়ে আমায় একটা সেলাম টুকে ভদ্রলোক বুট জুতো খটখটিয়ে হালদার বাড়ির দিকে চলে গেলেন।

রাত্রে ভালো ঘুম হল না।

ভোর হতে না হতে ভরদ্বাজকে বললাম আমার থার্মস ফ্লাস্কটি দুজনের মতে চা ভরে দিতে। চা এল পর ফ্লাস্কটি নিয়ে আবার হালদারবাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিলুম।

হালদারবাড়ির ফটকের কাছে পৌঁছে দেখি চারিদিকে কোন সাড়াশব্দ নেই। অনাথবাবুর নাম ধরে ডাকব, না সটান দোতলায় যাব তাই ভাবছি, এমন সময় হাঠাৎ শুনতে পেলুম ও মশাই, এই যে এদিকে।’

এবার দেখতে পেলাম অনাথবাবুকে-প্রাসাদের পূর্বদিকের জঙ্গলের ভিতর থেকে বেরিয়ে আমার দিকে হেঁটে আসছেন। তাকে দেখে মোটেই মনে হয় না যে রাত্রে তার কোন ভয়বহ বা অস্বভাবিক অভিজ্ঞতা হয়েছে।

আমার কাছে এসে হাসতে হাসতে হাতে একটা নিমের ডাল দেখিয়ে বললেন, ‘আর বলবেন না মশাই। আধঘন্টা ধরে বনে-বাদাড়ে ঘুরছি এই নিমডালের খোঁজে। আমার আবার দাতনের অভ্যেস কিনা।’

ফস করে রাত্রের কথাটা জিজ্ঞেসা করতে কেমন বাধো বাধো ঠেকল। বললাম, ‘চা এনছি। এখনেই খাবেন, না বাড়ি যাবেন?’

‘চলুন না, ওই ফোয়রার পাশটায় বসে খাওয়া যাক।’

গরম চায়ে চুমুক দিয়ে একটা তৃপ্তিসূচক ‘আঃ’ শব্দ করে আমার দিকে ফিরে মুচকি হেসে অনাথবাবু বললেন, ‘খুব কৌত’হল হচ্ছে, না?’

আমি আমতা আমতা করে বললাম, ‘হ্যাঁ, মানে, তা একটু’

বেশ। তবে বলছি শুনুনু। গোড়াতেই বলে রাখি- এক্সপিডিশন হাইলি সাক্সেসফুল। আমার এখানে আসা সার্থক হয়েছে।’ অনাথবাবু এক মগ চা শেষ করে দ্বিতীয় মগ ঢেলে তার কথা শুরু করলেন।

‘আপনি যখন আমায় পৌঁছে দিয়ে গেলেন তখন পাঁচটা। আমি বাড়ির ভেতরে ঢোকার আগে এই আশপাশটা একটু সার্ভে করে নিলুম। অনেক সময় ভূতের চেয়ে জ্যান্ত মানুষ বা জানোয়ার থেকে উপদ্রবের আশঙ্কা বেশি থাকে। যাই হোক দেখলুম কাছাকাছির মধ্যে কোন সন্দেহ জনক কিছু নেই।’

‘বাড়িতে ঢুকে একতলার ঘরগুলোর মধ্যে যেগুলো খোলা হয়েছিল সেগুলোও একবার দেখে নিলুম। জিনিস পত্তর তো আর অ্যাদ্দিন ধরে বিশেষ পড়ে থাকার কথা নয়। একটা ঘরে কিছু আবর্জনা, আর আরেকটার কড়িকাঠে গুটি চারেক ঝুলন্ত বাদুড় ছাড়া আর কিছুই চোখে পড়ল না। বাদুড়গুলো আমায় দেখেও নড়ল না আমিও তাদের ডিসর্টাব করলুম না। ’

সাড়ে ছ‘টা নাগাদ দোতলার ওই আসল ঘরটিতে ঢুকে রাত কাটানোর আয়েজন শুরু করলুম। একটা ঝাড়-ন এনেছিলুম, তাই দিয়ে প্রথম আরাম কেদারাটিকে ঝেড়েপুছে সাফ করলুম। কদ্দিনের ধুলোজমেছিল তাতে কে জানে?’

‘ঘরের মধ্যে একটা গুমোট ভাব ছিল, ‘তাই জানালাটা খুলে দিলুম। ভূত-বাবাজী যদি সশরীরে আসতে চান তাই বারান্দার দরজাটাও খোল রাখলাম। তারপর টর্চও ফ্লাস্কটা মেঝেতে রেখে ওই বেতছেঁড়া আরাম কেদারাতেই শুয়ে পড়লুম। অসোয়াস্তি হচ্ছিলবেশ, কিন্তু এর ছেয়েও আরো অনেক বেয়াড়া অবস্থায় বহুবার রাত কাটিয়েছি, তাই কিছু মাইন্ড করলুম না।’

‘অশ্বিন মাস, সাড়ে পাঁচটায় সূর্য ডুবেছে। দেখতে দেখতে অন্ধকারটা বেশ জমাট বেধে উঠল। আর সেই সঙ্গে সেই গন্ধটাও ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠল। আমি এমনিতে খুব ঠান্ডা মেজাজের মানুষ, সহজে বড় একটা এক্সসাইটেড হই না, কিন্তু কাল যেন ভেতরে ভেতরে বেশ একটা উত্তেজনা অনুভব করছিলুম।’

‘সময়টা ঠিক বলতে পার না, তবে আন্দাজে মনে হয় ন’টা সাড়ে ন‘টা নাগাদ জানালা দিয়ে জোনাকি ঘরে ঢুকেছিল। সেটা মিনিটখানেক ঘোরাঘুরি করে আবার জানালা দিয়েই বেরিয়ে গেল।’

‘তারপর কখন শেয়াল, ঝিঁঝির ডাক থেমে গেছে, আর কখন যে আমি ঘুমিয়ে পড়েছি সে খয়াল নেই।’

‘ঘুমটা ভাঙল একট শব্দে। ঘড়ির শব্দ। ঢং ঢং ঢং করে বারোটা বাজল। মিঠে অথচ বেশ জোর আওয়াজ। জাত ঘড়ির আওয়াজ, আর সেটা আসছে বাইরের বারান্দা থেকে।’

‘কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমটা ছুটে গিয়ে সর্ম্পূন সজাগ হয়ে আরো দুটো জিনিসে লক্ষ্য করলুম।এক-আমি আরামকেদারায় সত্যিই খুব আরামে শুয়ে আছি। ছেড়াটা তো নেইই, বরং উল্টটো আমার পিঠের তলায় কে যেন একটা বালিশ ‘গুঁজে দিয়ে গেছে। আর দুই আমার মাথার উপর একটি চমৎকার ঝালর সমেত আস্ত নতুন টানাপাখা, তা থেকে একটি নতুন দড়ি দেয়ালের ফুটো দিয়ে বারান্দায় চলে গেছে এবং কে জানি সে দড়িতে টান দিয়ে পাখাটি দুলিয়ে আমায় চমৎকার বাতাস করছে।’

‘আমি অবাক হয়ে এসব দেখছি আর উপভোগ করছি, এমন সময় খেয়াল হল অমাবস্যার বাত্তিরে কী করে জানি ঘরটা চাদের আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠল। তারপর নাকে এল একটা চমৎকার গন্ধ পাশ ফিরে দেখি কে জানি একটা আলবোলা রেখে গেছে আর তার থেকে ভুরভুর করে বেরোচ্ছে একবারে সেক্ষা অম্বুরী তামাকের গন্ধ।’

অনাথবাবু একটু থামলেন। তারপর আমার দিকে ফিরে হেসে বললেন, ‘ বেশ মনোরম পরিবেশ নয় কি?’

আমি বললাম, ‘শুনে তো ভালোই লাগছে। আপনার রাতটা তাহলে মোমুটি আরামেই কেটেছে?’

আমার প্রশ্ন শুনে অনাথবাবু হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে আমি আর ধৈর্য রাখতে না পেরে বললাম, ‘তাহলে কি সত্যি আপনার কোন ভয়ের কারণ ঘটে নি? ভুত কি আপনি দেখেন নি?’

অনাথবাবু আবার আমার দিকে চাইলেন। এবার কিন্তু ঠোটের কোণে সে হাসিটা নেই। ধরা গলায় কড়িকাঠের দিকটা ভালো করে লক্ষ্য করেছিলাম কি?’

আমি বললাম, তেমন ভলো করে দেখি নি বোধ হয়। কেন বলুন তো?’

অনাথবাবু বললেন, ‘ওখানে একটা বিশেষ ব্যাপার রয়েছে, সেটা না দেখলে বাকি ঘটনাটা বোঝাতে পারব না। চলুন।’

অন্ধকার সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে অনাথবাবু কেবল একটি কথা বললেন, ‘আমার আর ভুতের পেছনে ধাওয়া করতে হবে না সীতেশবাবু। কানদিনও না। সে শখ মিটে গেছে।’

বারান্দা দিয়ে যাবার পথে ঘড়িটার দিকে চেয়ে দেখলাম সেরকমই ভাঙা অবস্থা।

ঘরের দরজার সামনে পৌছে অনাথবাবু বললেন, ‘চলুন।’

দরজাটা ভেজানো ছিল। আমি হাত দিয়ে ঠেলে ঘরের মধ্যে ঢুকলাম। তারপর দু‘পা এগিয়ে মেঝের দিকে চোখ পড়তেই আমার সমস্ত শরীরে একটা বিস্ময় ও আতঙ্কের শিহরণ খেলে গেল।

বুট জুতো পরা ও কে পড়ে আছে মেঝেতে?

আর বারান্দার দিক থেকে কার অট্টহাসি হালদারবাড়ির আনাচে-কানাচে প্রতিধ্বনিত হয়ে আমার রক্ত জল করে আমার জ্ঞানবৃদ্ধি-চিন্তা সব লোপ পাইয়ে দিচ্ছে? তাহলে কি-?

আর কিছু মনে নেই আমার।

যখন জ্ঞান হল, দেখি ভরদ্বাজ আমার খাটের গায়ের দিকে দাড়িয়ে আছে,আর আমায় হাত পাখা দিয়ে বাতাস করছেন ভবতোষ মজুমদার। আমার চোখ খুলতে দেখে ভবতোষবাবু বললেন, ‘ভগ্যে সিধুচরণ আপনাকে দেখেছিল ও বাড়িতে ঢুকতে, নইলে যে কী দশা হত আপনার জানি না। ওখানে গেস্‌ছিলেন কোন আক্কেলে?’

আমি বললাম, ‘অনাথবাবু যে রাত্রে-’

ভবতোষবাবু বাধা দিয়ে বললেন, ‘আর অনাথবাবু!কাল যে অতগুলো কথা বললুম সেসব বোধ হয় কিছুই বিশ্বাস করেন নি ভদ্রলোক। ভাগ্যে আপনিও তার সঙ্গে সঙ্গে রাত কাটাতে যাননি ও বাড়িতে। দেখলেন ওঁর অবস্থা। হলধরের যা হয়েছিল, ‘এঁরও ঠিক তাই। মরে একবারে কাঠ, আর চোখ ঠিক সেই ভাবে চাওয়া,সেই দৃষ্টি সেই কড়িকাঠের দিকে।’

আমি মনে মনে বললাম, না, মরে কাঠ নয় মরে কী হয়েছেন অনাথবাবু তা আমি জানি। কালর সকালে গেলে দেখতে পাব তাকে- গায়ে কালো কোট, পায়ে বুট জুতো- হালদারবাড়ির পূর্বদিকের জঙ্গল থেকে নিমের দাতন হাতে হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছেন।

 

 

 

.

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত