সন্ধি

গুপ্ত রাজধানী অযোধ্যায় নিশুত রাতে মন্ত্রণা সভা বসেছে, আছেন রাজপুরোহিত,  মহামন্ত্রী বৈতরিক এবং ভুক্তির প্রধান প্রাদেশিকেরা এবং রাজ গুপ্তচর গুঢপ্রদেশিক। উত্তর সীমান্তে ক্ষত্রপ প্রধান কিদারা একে একে রাজ্য জয় করে গুপ্ত সাম্রাজ্যের  সীমানায় এসে  যুদ্ধে বন্দী করেছেন মহারাজ রামগুপ্তকে! সন্ধি অথবা যুদ্ধ ছাড়া পরিত্রাণ নেই। সন্ধি হিসেবে রাজমহিষী ধ্রুবারুপাকে তার চাই। তবেই রামগুপ্ত মুক্তি পাবেন। সবাই যুদ্ধের পক্ষে হলেও স্বয়ং মহারাজ রামগুপ্ত ঘোর বিরোধী। তিনি পত্র পাঠিয়েছেন ধ্রুবাকে প্রেরণ করা হোক। তিনি যে কোন শর্তেই মুক্ত হতে চান। মন্ত্রণা কক্ষের বৃহৎ দ্বার খুলে প্রতিহারী জানালে যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত এসে পড়েছেন। এমন সময় যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত প্রবেশ করলেন। তিনি যুদ্ধের সময় সুদূর দাক্ষিণাত্যে ছিলেন।

– যুবরাজ,  আপনি কি স্থির করলেন, মহামন্ত্রীর প্রশ্ন।

– আমি তো একই কথা বলবো। যুদ্ধ।

-রাজার পত্র পড়ে শোনানো হচ্ছে-“মহারানী ধ্রুবা দেবীকে শক শিবিরে অর্পণ করা ছাড়া কোন উপায় দেখছি না। জনগণ  শান্তিকামী। একজনের জন্যে আমার সকল প্রজাকে কি করে যুদ্ধের মুখে কি করে ঠেলে দিই” তাই অতিসত্বর…! এইটুকু পড়ে থামলেন মহামন্ত্রী!

– তাই বলে,  মহারানীকে, তিনি আমাদের কুললক্ষ্মী।  শিউরে উঠলেন রাজপুরোহিত।

সভার স্তব্ধতা ভঙ্গ করে যুবরাজ চন্দ্রগুপ্ত তার শানিত তরবারি বার করে বলে উঠলেন কক্ষনো নয়! দেবীকে প্রত্যার্পণ সম্ভব নয়। আমি তাঁর সঙ্গে যাব।

– তিনি প্রধানা মহিষী।  ভাবী উত্তরাধিকারীর রাজমাতা। মহারাজ যদি সিদ্ধান্ত নিয়েই থাকেন তাকে পাঠাবার,তবে আমি সঙ্গে যাব। এটা আমার সিদ্ধান্ত। প্রত্যেকে চুপ। আশীর্বাদ করলেন রাজপুরোহিত– জয়ী হয়ে আসুন কুমার। আপনি আপনার বীর পিতার সার্থক উত্তরাধিকারী।

ভোরের বেলায় শিবির রওনা হল, অন্ধকার নামার পরে গিরি পর্বতের আড়ালে কুমার চন্দ্রগুপ্ত  স্ত্রী বেশ ধারণ করলেন। উত্তর সীমান্ত শেষ হতে হতে গভীর অন্ধকার নেমে এল সন্ধ্যার বুকে। কিদিরা মহারানী কে পেয়ে গভীর রাতেই তৈরী হলেন দেবীকে দেখতে। মদিরাসক্ত শক দলপতি সামান্য কয়েকজন অনুচর বর্গ এবং রাণীর এক সখীকে আমল দেবার প্রয়োজন ও বোধ করলেন না। ধ্রুবাদেবীকে রাত আরো নিশুত হলে ওড়না সরিয়ে দেখতে গেলেন মত্ত ক্ষত্রপরাজ। স্ত্রী রুপী কুমার চন্দ্রগুপ্ত মুহূর্তে তার শাণিত তরোবারি উঠিয়ে এক কোপে উড়িয়ে দিলেন ক্ষত্রপরাজ কিদারার মাথা! ধ্রুবা দেবীকে পিঠে উঠিয়ে পরবর্তী শিবিরে এসে ভ্রাতা রামগুপ্তকে নিতে এল,কিন্তু অসীম ঘৃণায় মুক্ত করলেন না! অনেকটা পথ এসে মনে পড়ে গেল মহামন্ত্রী ও রাজপুরোহিতকে দেওয়া কথা, পিতা রাজাধিরাজ  সমুদ্রগুপ্তকে মনে করে আর পেছন ফিরলেন না।

রাত্রি অতিক্রান্ত। বহু শক সেনা সংঘর্ষে মৃত এবং রাজার মৃত্যুতে ছত্রভঙ্গ।  বেশ কিছু গুপ্ত সেনা দূরে লুকিয়ে ছিল গিরিমুখে । শিবির থেকে নিষ্ক্রান্ত হবার পর হঠাৎ মহারাণী ধ্রবাদেবী বললেন, কুমার আমার এক প্রিয় জিনিষ  ফেলে এসেছি! অন্যের হাতে পড়লে বিপদজনক! বলেই ঘোড়ার মুখ ফেরাতে বললেন।

শিবিরে ঢুকে তাঁর স্বামী মহারাজ রামগুপ্তের মুখোমুখি হলেন লিচ্ছবি কন্যা ধ্রুবারুপা।
রামগুপ্ত বলে উঠলেন
– জানতুম প্রিয়া তুমি ফিরে আসবেই। তুমি মুক্ত করে নিয়ে যাবে আমায় রাজপ্রাসাদে! কৃতঘ্ন চন্দ্রগুপ্তকে আমি ফিরেই  হত্যা করবো।
বলা শেষ হওয়া মাত্রই, তীক্ষ্ণ ছুরিকা বার করে রাজ মহিষী ধ্রুবা আমুল ঢুকিয়ে দিলেন রামগুপ্তের বুকে!!!

— কি জিনিস সে দেখি দেবী!  আপনি আনতে গিয়েছিলেন! ধ্রুবা  কৌতুকের হাসি হেসে বললেন, গিয়েছিলাম কুমার কিন্তু খুঁজে পেলাম না যে!!

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত