ন বৃত্তীয় (পর্ব-৩)

গত পর্বের পরে…

প্রথম পর্বঃ

https://irabotee.com/story-8/

দ্বিতীয় পর্বঃ

https://irabotee.com/story-10/

সার্টিফিকেটগুলো কুড়িয়ে নেই। মনে মনে বলি, সাহস নয় দুঃসাহস। এই দুঃসাহস আমার বেঁচে থাকার অন্য নাম।  গর্ভধারিণী মাকে যে রক্ষা করতে পারে না, প্রেমিকার সম্মান যে ধুলায় মেশাতে ভাবে না ক্ষনকাল বেঁচে থাকার সাধ তার দুঃসাহসই বটে! পথে নামি ঠা ঠা রোদে, পথ আমাকে নেয় তার মতোই অসহায় বলে, পাপী তাপী হেঁটে যায় নিশ্চুপ কেবল নামের দাবি মেটানোর স্বার্থে শুয়ে থাকে সে। তেমন আমার অর্থহীন বেঁচে থাকার নাম অসহায় দুঃসাহস বটে!

এই শহরে একজন মানুষের খেয়ে পরে টিকে থাকতে কতো টাকা লাগে? কতো টাকা লাগে? কতো টাকা লাগে? হিসাব তো করিনি কোনোদিন! কেমন ভাবে থাকা এই থাকা? এই শহরের জ্যামে ফসিল হয়ে থাকা সার বাঁধা গাড়ি কী হিসাবে ধরবো? নাকি রেলগাড়ি দিয়ে আসতে আসতে নাক চেপে ধরা দুর্গন্ধময় বস্তির দিন, নাকি সোহানা যে বায়না ধরে, চলেন বসুন্ধরার ফুড কোর্টে যাই, সেই জীবনের হিসাব করবোখেয়ে পরে বেঁচে থাকতে কতো টাকা লাগে? টিকে থাকতে কতো টাকা লাগে? লাখ টাকার এক প্রশ্ন নিয়ে ব্যর্থ আমি বের হয়ে আসি। আবার হাঁটি…….হাঁটতে হাঁটতে পৌছে যাই সোহানার ঠিকানায়

সে তখন নবম শ্রেণি, সে তখন ষোল। আমার পলাতক ছায়া ছুঁয়ে তার স্বপ্ন শুরু হলো…….সপ্তাহে পাঁচদিন পড়াতে আসি বিনিময়ে সোহানার চাকরিজীবী বাবা .হাজার দুয়েক টাকা দেয়। সেই টাকায় আপাতত খাওয়াপরার বেশ খানিকটা যোগান হয় আমার। ত্রিভুজের তিন কোনের সমষ্টি দুই সমকোণের সমান বুঝতে বুঝতে বুঝতে কন্যা কখন যে মোবাইলের নাম্বার মুখস্থ করে নিলো আমি সুবোধ পারি নাই বুঝতে!

এই যে দেখো ত্রিভূজের তিন কোনের সমষ্টি দুই সমকোন

স্যার আপনার মোবাইল নাম্বারটা হলো ০১৭…..

তুমি পড়, খাতাটা কই? কম্পাসটা দেখি

স্যার, ধানমন্ডি সাতাশে দারুন একটা কফি শপ হয়েছে চলেন একদিন খেতে যাই

কাল ভয়েস চেঞ্জ পড়া দিয়ে গিয়েছিলাম। শেখা হয়েছে? বলতোইম্পারেটিভ সেনটেন্সে ভয়েস চেঞ্জ করার সময় কি দিয়ে শুরু করতে হয়?

স্যার কারিনা কাপুরের ছেলে তৈমুরের চোখ দুটো একেবারে কারিশমা কাপুরের মতো। দেখছেন ইউটিউব ?

ইম্পারেটিভ সেনটেন্সে ভয়েস চেঞ্জ করার সময় লেট দিয়ে শুরু করতে হয়, যেমন…….

স্যার এবার জন্মদিনে আপনাকে একটা স্মার্ট ফোন কিনে দেবো। ফেসবুক হোয়াটস আ্যপ ভাইভার একাউন্ট খুলে দেবো। তারপর ভিডিও কল দিয়ে কথা বলবো!

সোহানা? সোহানা!!

আমি তারে সম্পাদ্য বুঝাই, হায় খোদা! কে তৈমুর কে কারিশমা! আমি  কী তার খবর জানি? না জানার প্রয়োজন রাখি? কেমনে বুঝাই এই মেয়েরে! মেয়ে জ্যামিতিটা বুঝ,ভয়েস চেঞ্জ বুঝ। নইলে টিউশনি টা যাবে আমার!এই মেয়ে এসব বুঝেনা

হায় সুবোধ আমি, মাটি কোপাতে কোপাতে যে পিতা জন্ম দিয়েছে আমাকে, সে মাটিতে ঠাঁই হয় নাই আমার। শেকড় ছিঁড়ে ঠাঁই হয় যেখানে, সে মাটি ঠাঁই দেয় না আমারে। কিংবা আমিই গাঁথিনা শেকড় তার গভীরে। পালিয়ে যাওয়ার নিয়তি যার তারে তুমি ডাকো কোন সর্বনাশের অতলে?

বলে কী? বলে কী মেয়ে, বয়সের রঙীন চশমা চোখে দেখে না,দেখতে শেখে নি রূঢ় বন্ধুর ক্ষমাহীন বাস্তবতা জীবনেরচশমায় কেবল তার ছাদবাগানে ফোটা রঙীন গ্লাডিওলাস আর বাহারী পাখা মেলা প্রজাপতি! ভালোবাসা……. ভালোবাসা……..আমার মতো শেকড় ছেঁড়া উত্তুঙ্গু পাতার কাছে বড় বিলাসী বর্ণগুচ্ছ তবু       প্রলোভিত করে  আকর্ষনের প্রাকৃতিক অপ্রতিরোধ্য আহবান

আমি এক দ্বিধাযুক্ত কদমে সাড়া দেই আহবানে তার, সে দ্বিগুন আকর্ষনে কাছে টানে আমাকে। আমি প্রথমবারের মতো পুরুষ হই, ছুঁয়ে দেখি নারীর প্রেম, স্বর্গ হতে আসে প্রেম, স্বর্গে যায় চলে। এই পিঠ উপচানো কেশগুচ্ছ যেনো দূর পাহাড়ের দেশ থেকে ভেসে আসা মেঘপুঞ্জ আমাকে ডাক দিয়ে উড়ে যায় আবার অজানা রাজ্যে। চলে যায় আমার আকাশ খালি করে। আমি চৈত্রের ঊষর ভূমি, চাতকের মতো ধেয়ে যায় তার পানে জলাশয় সন্ধানে। নবযৌবনের উচ্ছ্বাস তার আবেদনে। কপোলের ভাঁজে ভাঁজে নিজেকে সপে দেয়ার বাসনা। আমি দেখি আঁখি পল্লবে তার সমূলে পুরুষ হবার সর্বনাশের আহবান, আহবান ছুঁয়ে ছুঁয়ে ছুঁয়ে……….আমি তীব্র তাড়িত হই, আমি পোঁছাতে চাই স্বর্গের সিঁড়িতে

স্যার, আমি এখানে। স্যার, আমি আপনাকে ভালোবাসি, আপনার সাথে গাছতলায় ভাত রেঁধে খাবো তবু আপনার সাথেই থাকবো স্যার……

একদল নেশাখোর যুবক এসে ঘিরে ধরে চারদিকে

কুত্তার বাচ্চা, আমরারমহল্লায় থাইকা আমরার উপরে বাটপারি, মাইয়া নিয়া ফূর্তি! সাহস কত!

আমি নত হই, পায়ে ধরি, কাপুরষজনোচিত, ঘৃণ্য জীবের মতো পায়ে পড়ি তাদের

ভাই ভাই আমি কিচ্ছু করি নাই, আমি কিচ্ছু করি নাই ভাইমেয়েটা নিজেই নিজে নিজেই চলে এসেছে, আপনারা নিয়ে যান, আমারে মাফ করে দেন স্যার…….. আমি বাপ মা হীন এতিম গরীব ভাই……..আমার প্রতি যুবকদের দয়া হয়, লালা ঝরা জিভ ঝুলিয়ে ক্ষুধার্ত হায়েনারা তুলে নেয়, সোহানার কাতর অবিশ্বাসের দৃষ্টি থেকে আমি পালাই আবার, পালাই………

 

বাকী অংশ পরের পর্বে…

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত