পালঙ্ক

আজাদ টিম্বার্সে ছোটাছুটি লেগে গেছে। স্যারকে অনেক বলেও রাজি করানো যায়নি। তিনি আজ নিজে থেকেই একটা পালঙ্ক বানিয়ে দেবার আবদার করেছেন। পাক্কা তিন দিন ধরে এখানে ওখানে খুঁজে খুঁজে সেরা বার্মাটিক সেগুনকাঠ নিয়ে আজাদ টিম্বার্সের মালিক নিজেই এসেছেন উত্তমের কাছে। উত্তমের তো মাথায় হাত। গতকালকেই অনিমেষ আর জয়ন্তকে এক সপ্তাহের ছুটি দিয়ে দিয়েছে। কি আর করবে বেচারা। দুই মাস ধরে ছুটির জন্য কেঁদেকেটে অস্থির ওদের ছুটি দিতেই হয়েছে। রাগ লজ্জা মিশিয়ে ফোন দিয়ে হতচ্ছাড়া দুটোকে বাস টার্মিনাল থেকে ফেরত আনার পরেই জানা গেল সিলেটে যাবার টিকেট ফেরত নেয়নি বাস কাউন্টার। সব শুনে উত্তমের কন্ঠ আরে ধুরো! স্যার তোগোরে পেলেনের টিকিট কাইট্টা দিবনে, আগে জলদি পালঙ্ক বানা।

পরশু দিন স্যার পালঙ্ক না পাইলে বাঁশ ডলা খাবি। এগারো ঘন্টা পরে পালঙ্ক রেডি। অনিমেষ আর জয়ন্ত নিজেদের ঘুম হারাম করে স্যারের ঘুমের পালঙ্ক বানিয়ে কাহিল। উত্তম মনে মনে হাসে। বিরবির করে বলে, কাজ তো মাত্র শুরু রে বাবা। রেজাউল ‘আল করিমে’র আস্তর আনিয়ে পুডিং কাটার কাজ করছে।দুই আস্তর পুডিং কাটতে পাক্কা ছয় ঘন্টা লাগে। আরে ছয় ঘন্টার কাজ কি আর দুই ঘন্টায় হয় রে পাগলা। তা যতই লোক লাগিয়ে দাও। রাকিবের অন্য জায়গায় কাজ ছিল। সেসব ফেলে মেশিন পত্র নিয়ে রেডি হয়ে বসে আছে, পুডিং শুকালেই লেকার মারা শুরু করবে। ভেতরে ভেতরে সে অস্থির হয়ে পড়ছে সময় যেন ফুরাচ্ছেই না।

রাকিবের অস্থির পায়চারি আর বিড়ি ফোকা দেখেও ধীরস্থির রেজাউল। কাজে ফিনিশিং চাই। ফিনিশিং ছাড়া সে কোন কাজ করে না। ধুরো ছাতা! টাইম মেশিন থাকলে রাকিবের সুবিধাই হত। সময় এগিয়ে দিত। ফ্রেম বানানোর মিস্ত্রি মেনালের মন খারাপ। স্যারের পালঙ্ক বানানোর কাজের কোন অংশেই তাকে দরকার হয়নি। হলে ভালই হত। স্যারের যে কোন কাজ করে দেববার তার খুব শখ, আবার কিছু টাকাও পাওয়া যেত। ভোরের আযানের সাথে রাকিব লেকারের রঙ শুরু করতে পেরেছে। পালঙ্কের গায়ে গায়ে রঙের স্প্রে করে আর রাকিব সবাইকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলতে থাকে ‘লোকে তাকায় থাকব’।

রাকিবের কথা মিথ্যে হয়নি রাস্তায় নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে স্যারের বাড়ি অবধি সবাই তাকিয়েই ছিল। আরিব্বাবা! কি পালং বানাইছেরে একখান। ঘরের মাঝখানে পাতা পালঙ্ক দেখে স্যারের চক্ষু ছানাবড়া। এরকমই তো চেয়েছিলেন। নতুন ম্যাট্রেস আর বেড শিট বিছানোর পর আরো যেন বেড়ে গেল পালঙ্কের শোভা। মহা-মসিবত রাতে বিছানায় শরীর এলিয়েও তো ঘুম আসে না স্যারের। এত শব্দে ঘুম আসে কি করে। বার্মাটিক সেগুনের ভেতর ঘুনপোকার বাস। পোকাদের রতি খেলার শব্দ যে হৃদয় বিদারক। কট্র কট্র কট্র কট্র কট্র কট্র… উফ্ কিছুতেই ঘুম আসছে না।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত