এল ফাগুন

নদীর এপারটায় গাছপালা বেশি । একটু গেলেই টিলা , পাহাড় , জঙ্গল ।

এর মধ্যে বেশ কিছুটা জায়গা দখল করেছে দুই বন্ধু । কাছাকাছি বয়েস । একজন বারো পেরিয়ে তেরো , একজন পনেরো ছুইঁ ছুইঁ ।

ফুলগাছের লতা খুঁজে খুঁজে এনে লাগিয়েছে বড় গাছের পাশে দিয়ে । ছেলেটা গাছের নরম ডালগুলো নুইয়ে এনে লতার দড়ি দিয়েই বেঁধে দিয়েছে । তার ওপর দিয়ে লতাদের তুলে দিয়েছে ফাঁকে ফাঁকে । বর্ষার জল পেয়ে চিকন পাতারা ফনফন করে বেড়ে উঠেছে শক্ত ডালের আশ্রয়ে । মাঘ পেরিয়ে ফাগুন আসতেই ফুলের কি বাহার ।

গাছের তলায় লতার ছাউনিতে ছায়া হয়ে থাকে ।দুপুরের রোদের হাত থেকে পালিয়ে গল্প করে দুজনে ।

“ কেমন মজা বল ? কেউ দেখতে পাবে না আমাদের । এইখানে গরমও লাগছে না । নদীর ঠাণ্ডা বাতাস বয়ে আসছে যে । কি আরাম । আআহ ।”

“ হ্যাঁ , কাঁহাতক গরু নিয়ে দৌড়ে বেরানো যায় । দাদা বলে আমরা নাকি রাজার ছেলে । পরে শহরে চলে যেতে হবে ।আমার আসল বাবা মাকে আটকে রেখেছে সেখানে।”

“ চলেই যাবি , না রে ? সে যা । এখানে ত আমার কপালে শাশুড়ি ননদের কিল খাওয়া থাকবেই । ”

“ ছেলেপুলে হলে খাতির করবে তখন ।”

“ দূর , আমার ছেলেপিলে হবে না । আমার সোয়ামি চুপিচুপি বলে দিয়েছে । সে সোয়ামি হতে লারবে । কাউকে বলা বারণ । তুই বলে তাই বললাম । কাউক্কে বলিস না যেন ।”

“ হুঁঃ অতই হাবা নাকি আমি ?”

“ নোস ? তো চুরি করতে গিয়ে ধরা পরে মায়ের হাতে মার খাস কেন রোজ রোজ ?”

“ মার কাছে বিশ্বের লোক নালিশ করতে আসে না ? মার বেশি খাইনা । এক ঘা দিলে তারপর মা নিজেই কেঁদে হাপুস হয়ে ক্ষীরের হাঁড়ি নামিয়ে দেয় শিকে থেকে ছেলেদের সবার পেট ভরে যায় । এক ঘা খেলে যদি সবার পেট ভরে ত সেটা খেয়ে নেওয়াই ভাল না ?”

“ এই সবার ভাল করতে গিয়েই মরবি এক দিন রে । তুই যে চোর বদনাম নিস তোর চ্যালারা কেউ তাতে টুঁ শব্দটি করে ?”

রাগে লাল হয়ে ওঠে মেয়েটার টুকটুকে গাল ।

সেই দিকে চেয়ে ফিক করে হেসে ফেলে ছেলেটা ।

“ এই ত , তুই কত শব্দ করছিস । আমার ওইতেই কাজ চলে যাবে ।”

খেপে গিয়ে দুমদুম করে দুই কিল দেয় মেয়েটা ।

পিঠ বাঁকিয়ে ঠোঁট উলটোয় শ্যামলা খোকা ।

“ যা ছোট ছোট মুঠি । টের ও পাওয়া যায়না ।”

“ তবে রে –”

ক্ষেপেক্ষুপে ফাজিল বন্ধুর গায়ে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবার চেষ্টা করে রাই ।

ধাক্কাধাক্কি কখন যে গড়িয়ে গিয়ে আদর হয়ে যায় । শক্ত করে জড়িয়ে রাখে দু জন দু জনকে । যেন মিশে যাবে এক জন আরেক জনের সংগে । কখনও এ ওপরে থাকে , কখনো ও । হাপরের মত নামাওঠা করতে থাকে বুক । ঘামে ভেসে স্নান দুজনে । শেষে হাঁফাতে হাঁফাতে ক্লান্ত রাই বন্ধুর বুকে মাথা রেখে শুয়ে  থাকে ।

কি আরাম । কি শান্তি ।

ঘুমিয়ে পড়ে দুজনে অনেক সময় । যমুনার হাওয়া আলতো করে আঁচলে মুছে নেয় ওদের আদরখেলার স্বেদকনা ।

রাই ধড়মড় করে উঠে বসে এক সময় ।

“ কানু রে , ঘরে যাই । কখন এক কলসী জলের ছুতোয় বেরিয়ে এসেছি । আজ দুঃখ আছে কপালে ।”

“ হুঁ রাজার বেটি গরু চরানো রাখালের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে এসেছিস যেমন ।”

ঠেস দেওয়া কথা শুনে লাল হয়ে ওঠে ফর্সা গাল । নাকের পাটা ফুলতে থাকে ।

“ বটে ? বসে থাকিস কেন তবে আমার জন্যে ? লজ্জা করেনা ? রোজ রোজ এদিক থেকে বাঁশিতে শিস দিয়ে পরের বউকে ডাকিস ।

বেহায়া হ্যাংলা ভিখিরি –”

রাগে তেতে ওঠে সোনার মত রঙ ।

মিটিমিটি হাসতে থাকা বন্ধু দু হাতে বুকের মধ্যে টেনে নিয়ে বলে , “ হ্যাংলাই ত। তোকে দেখার লোভ কোন দিন যাবে না আমার ।রেগে গেলে কি ভালই দেখায় রে ।”

জল পড়তে থাকে  মেয়ের পটলচেরা চোখের পাতা ভিজিয়ে ।

গাল বেয়ে গড়ায় মুক্তোর দানা ।

“ আসব না আর । এর পর শহরে চলে যাবি , চিনবিও না । জানি না বুঝি । সারা দিন বসে থাক , তবুও আসব না ।”

“ পারবি রাই ? আমি ডাকলে না এসে থাকতে ? ”

ঝর ঝর করে নেমে আসে বাঁধ ভাঙা জল ।

“ কত গালি খাই ,মার খাই জানিস ? কি না বলে লোকে । তবু আসি তুই বসে আছিস একা সেই ভেবে –”

আরেক জনের শ্যামলা গাল বেয়ে জল গড়ায় ।

বুকের মধ্যে জড়িয়ে রাখে বন্ধুকে ।

মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় দুজনার চোখের জল ।

 

 

কত কত দিন পড়ে দ্বারকার মহিষী রুক্মিণীর কপালে ভাঁজ পড়ে বিরক্তির । রাজ অন্দরে কতই নারী আশ্রয় পায় রাজপুরুষদের ঘিরে । তাতে রাজন্যদের সুনামে কোন ছায়া পড়ে না কোন যুগেই । আগে পড়েনি । আর ভবিষ্যৎ যুগেও পড়বে মনে হয়না । উচ্চপদাধিকারী পুরুষের দ্বারে চিরকালই নারী সুলভ । ওতে কোন দোষ ধরে না সমাজ ।

তবে কেন বাসুদেব পুরুষোত্তমের নামের সংগে শিশুকালের পরিচিত গ্রাম্য কিশোরীর নাম বার বার জনমানসে উঠে আসে ?

আজ পট্টমহিষী স্বামীর সম্মুখীন হয়েছেন এ প্রশ্ন নিয়ে ।

রুক্মিণীর সর্বস্ব শ্রীকৃষ্ণ । রীতিমত যুদ্ধ করে তাঁকে লাভ করেছেন বাসুদেব ।

তবে কেন সারাদেশে সাধারন মানুষ রাধারমণ , রাধেশ্যাম , প্যারীলাল , প্যারীমোহন বলে মন্দির বানায় ?

এতে যে পরকীয়া প্রেমের অসম্মান লেগে থাকে তাতে আহত হন রানী ।

 

যাঁর পায়ে নিজেদের বিলিয়ে দেবার জন্য সমস্ত ভারতের সুন্দরী বিদুষী নারী আকুল, তাঁকে কিনা সামান্য ধূলিধুসর অমার্জিত গোপবধূর জন্য পরকীয়ার অপবাদ নিতে হবে ?

 

আসন্ন গোধূলির ছায়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন পুরুষোত্তম ।

“ তুমি যাকে পেয়েছ আর্যে , সে রাজপুত্র , বীর , শরীর ও মনে সফল পুরুষ নিশ্চই ? ”

এত বছরের দাম্পত্য পেরিয়েও এই গভীর দৃষ্টির সামনে উদ্বেল হয়ে ওঠেন রানী ।

ধরা গলায় বলেন ,“ সে ত সারা দেশ জানে দেব-”

বিশ্বকম্পিত করা মন্দ্রকন্ঠ মন্ত্রের মত উচ্চারণে ভেসে যেতে থাকে ,“ সেই ধূলিধুসর অপাপবিদ্ধ কিশোরী ছাড়া আর কেউ জানে না , শিখিপাখা , কেয়ুর কঙ্কন , পীত রেশমবস্ত্র , স্যমন্তকমণির সজ্জা ছাড়াও একটি মানুষ ছিল । তার কিছু ছিল না । এমনকি যথেষ্ট খাদ্য ও ছিল না । সেই ক্ষুধার্ত বালকের সব কষ্ট ভাগ করে নিয়েও তাকে সর্বস্ব দিয়ে ভালবাসার সাহস ওই একটি মানুষেরই ছিল।

সে ফিরে কিচ্ছু চায়নি । এমনকি স্ত্রীর মর্যাদা পাবে না , সেও জানত । শুধুই লাঞ্ছিত হবে সমাজে , সেও জানত ।

মহারানী দুঃস্বপ্নেও কখনও এমন একটি ছেলেকে দেহমন সব দিয়ে ভালবাসার কথা ভাবতে পারো?”

পাংশু হয়ে উঠেছিলেন রুক্মিণী ।

মনে হয়েছিল বড় অন্যায় অনধিকারচর্চা করে ফেলেছেন ।

জড়িত কণ্ঠে মার্জনা চাইতে যাওয়ায় তাঁকে নিরস্ত করলেন স্বামী ।

“ যে ভালবাসা কিছুই চায়না প্রতিদানে সেই ভালবাসাই ঈশ্বর । রুক্মিণী , তার কাছে আমি যুগ যুগ ধরে বন্দী হয়ে আছি ।

আমি স্বেচ্ছায় তার নামধারন করে অপবাদকে শিরোভূষণ করে নিয়েছি যে । ভালবাসাকে এটুকু স্বীকৃতি দেবনা ? যতদিন সুর্‍্যচন্দ্র থাকবে এই ছোট্ট মেয়েটির নাম বেঁচে থাকবে মানুষের মনে ।”

অশ্রুর মুক্তো ঝরে পড়ে যাদব পট্টমহিষীর কপোল বেয়ে ।

জানু মুড়ে বসে পড়েন ভালবাসার মানুষটির পায়ের কাছে ।

“ আমি কত ভাগ্য করে আপনাকে পেয়েছি বাসুদেব । নারীকে , তার ভালবাসাকে এত বড় স্বীকৃতি আর কেউ কখনও দেয়নি । এইজন্যই আপনি পুরুষোত্তম ।”

দেবালয়ে সন্ধ্যাবন্দনার ঘণ্টাধ্বনি শোনা যায় ।

কত কত দূরে বয়ে চলে যমুনা , তার পারে বৃষভানুনন্দিনী শ্রীরাধিকার বাড়ি ।

One thought on “এল ফাগুন

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত