| 1 মার্চ 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

অন্তর্মুখী

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

এক সময় ঘরটা অগোছালো থাকতো। এখানে ওখানে জামাকাপড়, বিছানার উপর বই, টেবিলের উপর ধুলো! বাসার লোকে বলতো গুছিয়ে রাখো। হিতৈষীরা অবশ্য জীবনটাকেও গুছিয়ে রাখতে বলেছিলো। অনিমেষ গোছায় নি।

মনে আছে, ভার্সিটিতে পড়বার সময় একবার অনিমেষের লেখা একটা চিঠি পড়ে ফেলেছিলাম লুকিয়ে লুকিয়ে। নকলও করে রেখেছিলাম। চিঠিটা ছিলো এমন-

“লায়লা,

চলো মুখোমুখি বসি। চলো স্থির হই, যতটা স্থির হলে প্রার্থনায় বসা যায়। নিমীলিত সন্ধ্যায় চলো চুপ হয়ে দেখি পরস্পরের জীবন। তোমার আর আমার জীবন এখন একই সূচাগ্রে দাঁড়িয়ে। এখান থেকে কালো আর আলো সমান সমান পথ। সময় আর সমস্যার হিসাব করে জীবনকে নিছক একটা দায়িত্বের ছকে বেঁধে ফেলার চেয়ে চলো কাটাকুটি খেলার মতো দেখে ফেলি কয়েকটা স্বপ্ন, আর কেটে বাদ দিয়ে দিই পুরোনো কয়েকটা হতাশা। তুমি যেমন দুরন্ত জীবনের কথা বলো, তেমনটা যদি নাও হয়, অন্তত বারান্দায় বসেই রাতের আকাশে একটা দুটো তারা খুঁজবো- পৃথিবীর ওই প্রান্তে অন্য কোনো যুগলের সৌভাগ্য হয়ে খসে পড়বে সে তারা। আমরা একসঙ্গে তুর্কি শিখবো- ‘কাতিবিম’ এর মতো আরও কতো রোমান্টিক কবিতার অনুবাদ হয় নি এখনো! আমরা গলির মুখের কুকুরদেরকে রোজ খাইয়ে আসবো, দারিদ্রের আশীর্বাদে ঘরে ঘরে দুধে-ভাতে থাকবে সকল সন্তান। এই তো আমাদের বিশ্বভ্রমণ, এই আমাদের দরিদ্রসেবা।

দেখো, সবাই যেমন নির্মেঘ জীবনটা চায় তেমনই কি সবসময় পায়? তবু দুঃসময় থেকে সুসময়ে মানুষ পৌঁছে দেয় মানুষকে। আমি গান গাইতে পারি না। তোমার কণ্ঠে আমার গানটি গেয়ো- আমি তোমায় পৌঁছে দেবো উদার একটা পৃথিবীতে।

”অনি”

লায়লা সাধারণ মেয়ে। আর পাঁচটা মেয়ে জীবনটা যেরকম চায়, সেও তাই। অনিমেষ কল্পনাপ্রবণ। জীবন ওর অল্প ক’জনকে ঘিরে একটা ছোট্ট বৃত্তে বন্দি। লায়লা স্বাভাবিক নিয়মে বড় হলো। বয়স পঁচিশ পেরুলো, কৈশোরের অনুভূতিগুলোও পেরিয়ে গেল দ্বার। অনিমেষও বেড়ে ওঠলো কিন্তু সময়মতো বড় হলো না ঠিক। প্রেমটা ওদের টিকলো না। যেমন করে একেকটা স্টেশনে এসে সহযাত্রীদের সহযাত্রা হঠাৎ থেমে যায়, তেমনি থেমে গেলো, তার আগে কালক্ষেপণ হলো দীর্ঘ ছয় বছর।

কিন্তু অনিমেষকে বোঝায় কে! বাসায় এসব নিয়ে কোনো রা কাটবার সুযোগ অতগুলো বছরে সে একবারও পায়নি। এবারে আর সেই সাহসটাই হলো না। আসলে ছেলের ভবিষ্যৎ যাতে নিঃঝঞ্ঝাট হয়, তা কোন বাবা-মা চান না? ছেলের যে সংঘাতে বাবা-মায়েরা ঠিক পাশে দাঁড়াতে পারেন সেখানে খোলামেলা একটু আলোচনা, একটু সহানুভূতির সাথেও বিরোধিতাটা চালিয়ে যাওয়া যায়। তাতে সম্পর্কগুলো আরেকটু সহজ থাকে। কিন্তু অনিমেষ বঞ্চনা পেয়ে পেয়ে কাছের মানুষগুলোর সাথে কেমন একটা অদৃশ্য দূরত্ব তৈরি করে নিয়েছে।

সমবয়সী হওয়ার কারণে আমার সাথে অনিমেষের সম্পর্কটা ঠিক কাকাতো- জেঠাতো ভাই কিংবা বাসার লোকের মতো ছিলো না, ছিলো বন্ধুর মতো। তাই ভিতরের খবর কিছুটা আমি জানতাম। তবুও সব গল্প সে আমার সাথে করতে চাইতো না। সুখের গল্পগুলো শুনতে পেতাম। দুঃখের গুলো সে একাই সামাল দিতো। অনিমেষ খুব চাপা ছিলো কিনা! কিন্তু বিচ্ছেদের পর চাপা কষ্টের বাঁধ ভাঙলো। অসহায় হয়ে আমাকে সে অনেক কিছুই বলতে চাইলো, আমিও শুনলাম। বুঝতে পারি, যেমন করে পাঠকের অভাবে অখ্যাত কবির কবিতাগুলো খাতার ভাজে বন্দি পড়ে থাকতে থাকতে কবির হতাশা বাড়ায় তেমনি একজন পাশে বসে শোনার মানুষের অভাবে ব্যর্থ প্রেমিকের প্রেমের গল্পগুলোও প্রেমিকের হৃদয়ে বাড়িয়েছে তোলপাড়। বুঝতে পারি, অনিমেষ বড্ড আহত। দিন সরে তবু তার মন সরে না। তার চোখের সামনে শুধু শেষ একটা পোস্ট না করা চিঠি আর হঠাৎ ঝড়ে মুখ থুবড়ে পড়ে যাওয়া একটু একটু করে কুড়িয়ে পাওয়া ছয়টা বছর।

এই ঘটনার প্রায় চল্লিশ বছর পর হঠাৎ একদিন অনিমেষের ঠিকানায় আরেকটা চিঠি এলো। চিঠিটা খুললাম। পাকা হাতে ছোট ছোট করে লেখা।

“অনিমেষ,

কেমন আছো? এতোদিনে নিশ্চয়ই যোগ্য পাত্রীটিকে বিয়ে করে সংসার করে ছেলে-মেয়েদেরকে ও বিয়ে দিয়ে দিয়েছো?
আমারো সংসার হয়েছে, দুরন্ত জীবন হয়েছে। কতো দিনের কতো গল্পে সয়লাব হয়ে আছে মন। হয়নি কখনো শুধু একজন কাউকে পাশে বসিয়ে তার কাছে একান্ত কথাগুলো জমা রাখবার জন্যে একদন্ড অবসর। এ বাসায় প্রথম যেদিন এসেছিলাম সেদিন সকলে মিলে রঙেতে, কলরবে, চঞ্চলতায় এমন সমারোহ জুড়ে দিয়েছিলো যে ভুল করেও একবার মাথায় আসেনি প্রাচুর্যেও বুঝি ক্লান্তি আছে। সেই থেকে তো শুরু, তারপর আর পেছন ফিরে তাকাতে হয় নি। পরিবারের প্রতিটা সিদ্ধান্তে আমার ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে ঠিক প্রশ্রয় দেওয়া না গেলেও বাকি আর সবার সাথে সাথে আমারো সব চাহিদা পূরণ হয়ে গেছে ঠিক সময়মতো। অজান্তে যে যাই বলুক সামনে এলে সবাই পরিবার সেজেছে, শুভাকাঙ্ক্ষা দিয়েছে কুশলী হয়ে। প্রচন্ড জ্বরের দিনে কেউ কপালে একবার হাতটা বাড়িয়ে না দিলেও পাঁচটা পরিচারিকা দিনে পাঁচবার করে ঔষধ-পথ্য বাড়িয়ে দিয়েছে ঠিকই। ভেবে দেখলাম, যেখানে না চাইতেই সব চাহিদাপূরণ সময়মতো হয়ে যায় সেখানে কেউ এসে মুখ ফুটে একবার ‘তুমি কি চাও?’ না বললেই বা কি! কিন্তু পরে আবার মনে হলো, সেই তো ঠিকই মানিয়ে নিলাম। যে কথাটি তুমি হয়তো বলতে চেয়েছিলে অনেক আগেই, সুখ মানেই শান্তি নয়। হাজার মানুষ, লক্ষ মানুষ, কোটি মানুষের ভিড় ঘোচাতে পারে না নিঃসঙ্গতা, আজ বুঝি।
যাক, এসব কথার কথা। হয়তো ভুলে গেছো অনেক আগেই। কিন্তু আজ সাহস করে তোমাকে কথাগুলো লিখতে পারলাম বলে আমি নিজেকে হয়তো একটু ক্ষমা করতে পারবো।
চিঠি দিও। স্ত্রী-পুত্র-পরিবার সমেত একটা ছবি তুলে পাঠিও।

লায়লা”

চিঠিটা পড়া শেষ করেই ভাবলাম এক লাইনে জবাবটা লিখে পাঠিয়ে দিই, অনিমেষ বছর চারেক আগে পাগলা গারদে মারা গেছে। তারপর ভাবলাম থাক। যে ঘুরে দাঁড়াতে চায় নি তার অসফল জীবনের দায় তার নিজের। ক্ষমাপ্রার্থী চিঠির উত্তরে এমন চিঠি পেলে ক্ষমা না পেয়ে পাবে হয়তো আঘাত। কোনো চিঠি না পেলে বাড়বে শুধু অপেক্ষা। অপেক্ষায় আঘাত নেই।

নতুন চিঠিটা অনিমেষের অগোছালো ঘরটাতে আরেকটা ছোট্ট উপদ্রব হয়ে পড়ে রইলো।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত