| 14 এপ্রিল 2024
Categories
ধারাবাহিক সাহিত্য

রাজকন্যা ও দস্যুরাজ (পর্ব-৩)  

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট

চিঠিমালা

প্রিয়তমা রাজকন্যা, 

আমি আজ আপনাকে যে চিঠি লিখতে বসেছি সে কোনো অলৌকিক ঘটনার থেকে কম নয়। আমি যে জীবিত আছি তার একমাত্র কারণ হয়তো আপনার সাথে একটিবার  পুনরায় সাক্ষাতের ইচ্ছা। না বলা কথাগুলো আপনার কাছে পৌঁছাতে না পারলে মরেও শান্তি পাবো না হয়তো। আগের চিঠিতেই বলেছি আমার ওপর কী কঠিন দায়িত্ব বর্তেছে, ধনরাশি স্থানান্তরের রাতে যখন একের পর এক ঘোড়ায় টানা টাঙ্গাতে লোহার সিন্দুক তোলা হচ্ছিলো তখনও বুঝতে পারিনি কী বিপদের সম্মুখীন হতে চলেছি আমরা।  পরিকল্পনা মতন মধ্যরাতে বেরিয়ে  চল্লিশ ক্রোশ দূরে যে স্থানে আমাদের পৌঁছুতে হবে সেখানে পৌঁছাতে বিকেল গড়িয়ে যাওয়ার কথা। সেপাই সান্ত্রী পেয়াদার পর্যাপ্ত ব্যবস্থা ছিল। তাঁরা ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে টাঙ্গার পাশে পাশে চলবে। টাঙ্গা চালকরাও সেপাইদের মধ্যে থেকেই বেছে নেওয়া। সবার প্রথমে থাকবেন অশ্বারোহী বাহিনী প্রধান। আর আমি থাকবো মধ্যবর্তী কোনো এক টাঙায়। আড়ম্বর থেকেই বোঝা যায় এই স্থানান্তরের গুরুত্ব। মধ্যরাত অতিক্রান্ত হওয়ার আগেই ত্রিশটি অশ্বের ষাট জোড়া খুরের শব্দ তুলে কোষাগার থেকে আমাদের গুপ্ত যাত্রা শুরু হল। অন্ধকার অরণ্য পথে দূর থেকেও কেউ যাতে আন্দাজ করতে না পারে তার জন্য কোনো মশাল জ্বালানো হয়নি। অন্ধকারের মধ্যে সব ঠিক আছে কিনা জানার জন্য একজন অশ্বারোহী,  মিছিলের  গোড়া থেকে শেষাংশ কিছুক্ষণ অন্তর ঘোড়া ছুটিয়ে যাতায়াত করছে। ব্রিটিশ চর অনেক আছে রাজ্যে এবং তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ আছে স্বদেশীয় তস্করদের। দুধর্ষ তস্কর দলকে নিজেদের সুবিধা মতন ব্যবহার করে তাঁরা। তাই অত্যন্ত সাবধানতা প্রয়োজন। 

ভোর হতে তখনো কিছু সময় বাকি আছে বোধ করি, এমন সময় যার ভয় ছিল সেটাই হলো। হঠাৎ শুনতে পেলাম কয়েকজন সেপাইদের তীক্ষ্ণ আর্তনাদ ও অশ্ব থেকে ভূপাতিত হওয়ার শব্দ। এর  সাথে শুরু হলো হ্রেষাধ্বনি ও হুটোপাটির আওয়াজ। “ঠগী”। অস্ফুটে বলে উঠলো আমার টাঙ্গা চালক। সৈন্যরা সম্মুখ সমরের প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হলেও অন্ধকার রাতে এরকম অতর্কিতে চোরাগোপ্তা আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য কতটা পারদর্শী তা ঈশ্বরই  জানেন। আর্তনাদ এর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। আমি আসন্ন বিপদের কথা চিন্তা করে হঠাৎ চিৎকার করে টাঙ্গা চালককে আদেশ করলাম “টাঙ্গা ছোটাও”। কিন্তু সে এই আদেশ পালনের আগেই দেখলাম তার গলায় কিছু একটা উড়ে এসে জড়িয়ে গিয়ে ফাঁস  লেগে গেলো। আর্তনাদ করে উঠলো সে। সঙ্গে সঙ্গে একটা ছায়ামূর্তি টাঙায় লাফিয়ে পড়লো। এক ভীষণ পদাঘাতে তাকে ফেলে দিয়ে দখল নিলো টাঙ্গার। আমি এই আকস্মিক ঘটনায় স্তম্ভিত ও হতচকিত হয়েছিলাম কিছুক্ষণের জন্য। টাঙ্গার দখল নেওয়া ঠগীও আমার উপস্থিতি টের পায়নি। সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বিপদের গভীরতা আন্দাজ যখন করলাম তখন টাঙ্গা মূল পথ ছেড়ে অন্য পথে বাঁক নিয়েছে। কিছুতেই ঠগীদের আস্থানায় টাঙ্গা নিয়ে যেতে দেওয়া যাবে না। ধন ও প্রাণ বিনাশ দুইই অবসম্ভাবী তাহলে। মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে ছাপোষা মানুষও যে অকুতোভয় হয়ে অসম্ভব কিছু করে ফেলতে পারে তার প্রমাণ পেয়েছিলাম সেদিনই আমি পিছন থেকে ঝাঁপিয়ে পরলাম টাঙ্গা চালনারত সেই দুধর্ষ ঠগীদের একজনের উপর, যাদের কাছে হত্যা নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। আকস্মিক আক্রমণে হতভম্ব হয়ে গেলেও তার শক্তি ও কৌশল এর কাছে আমায় পরাজিত হতে হলো অচিরেই। প্রাথমিক বিহ্বলতা কাটিয়ে সে প্রথমেই ধারালো অস্ত্রের আঘাত হানলো। বাম বাহুর উপরি ভাগে এসে পড়লো সেই আঘাত। যন্ত্রনায় আর্তনাদ করে উঠলাম। তা সত্ত্বেও ওর অস্ত্র ধরা হাতটি কব্জির কাছটায় মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে টাঙ্গার একটি লৌহদণ্ডের ওপর সজোরে আছাড় মারলাম। মুঠো আলগা হয়ে অস্ত্রটি বোধহয় পড়ে গেলো। বাম বাহুর বস্ত্র রক্তে ভিজে উঠছিলো। এরপর এক বজ্রকঠিন মুষ্টির আঘাত নেমে এলো আমার বাম কশের উপর। পুব আকাশে হাল্কা লাল আভা দেখতে দেখতে জ্ঞান হারিয়েছিলাম। 

চৈতন্য যখন ফিরলো তখন দেখলাম আমি একটি অনুজ্বল অমসৃণ প্রস্তর প্রাচীর ঘেরা কক্ষে শুয়ে আছি। একটি মাত্র মশাল এই কক্ষকে সম্পূর্ণ আলোকিত করতে পারেনি। ওঠার চেষ্টা করতেই বুঝতে পারলাম বাম বাহু ও চোয়ালে প্রবল যন্ত্রনা। দেহ দুর্বল। হয়তো জ্বরও আছে। দেখলাম বাম বাহু তে পট্টি বাঁধা হয়েছে। হয়তো কোনো ভেষজ ওষুধের প্রলেপও দেওয়া হয়েছে ক্ষতের উপর। পট্টির উপর সবুজ আভা নীচ থেকে ফুটে উঠেছে। আমি যারপরনাই হতবাক হলাম। যে ঠগীরা শুধু লুন্ঠন এর জন্য মানুষ খুন করে,  তাঁরা যে শুধু আমাকে প্রাণে মারেনি তা নয় চিকিৎসাও  করেছে। উদ্দেশ্য কী? তবে কী আমায় অপহরণ করা হয়েছে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য? নাকি অন্য কেউ আমায় ঠগী দের হাত থেকে রক্ষা করে ভিন্ন কোনো স্থানে নিয়ে এসেছে।  যদি তাই হয় তাহলে কে বা কারা করলো এরকম?  তাদেরই বা কী অভিপ্রায়? আমাদের দলের বাকিদেরই বা কী হলো?  তাঁরা কী সবাই মৃত? আর ধনরাশি? কোথায় সেসব? তার সবই কী লুন্ঠিত হয়েছে? আমার উপর যে কার্যভার দেওয়া হয়েছিল তার কী সত্যি এমন করুন পরিসমাপ্তি ঘটেছে?  এই গ্লানি আমি কোথায় রাখবো?  এর চেয়ে  বোধহয় মৃত্যু অনেক সম্মানের হতো। কিন্তু আপনাকে আরেকটিবার চোখের দেখা না দেখে মৃত্যুর কথা কল্পনা করাও আমার কাছে অসম্ভব। এই সব ভাবছি এমন সময় একটি চার-পাঁচ  বছরের সুললিত কৃষ্ণকায় বালক আপন মনে হাতে একটি কাঠের তরবারি দিয়ে অদৃশ্য শত্রুর সাথে যুদ্ধ করতে করতে কক্ষে প্রবেশ করলো। আধশোয়া অবস্থায় আমাকে দেখে থমকে দাঁড়ালো।  কিছুক্ষণ আমায় নিরীক্ষণ করে পিছন ফিরে “পিত্তি, পিত্তি” বলে কাউকে ডাকতে ডাকতে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো। বালকটিকে দেখে এতো যন্ত্রনা সত্ত্বেও আমার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠেছে বুঝতে পারলাম। পরক্ষনেই এক বিশালাকায় পেশীবহুল মানুষ প্রবেশ করলো কক্ষে। কষ্টিপাথরে ছেনির উপর  হাতুড়ির নিপুন আঘাতে আঘাতে খোদিত হয়েছে যেন এই নিখুঁত মানবমূর্তি। দেহের অনাবৃত উপরিভাগ ঘামে সিক্ত। তার উপর মশালের কম্পমান আলোর খেলা চলছে। পরনে হাঁটু পর্যন্ত খাটো ধুতি। কপালে লাল ফেট্টি, সিঁদুরের তিলক। চোখ দুটো জ্বল জ্বল করছে। শক্ত চোয়াল হলেও নৃশংসতার লেশমাত্র নেই বরং একটা সরলতার ছাপ বিদ্যমান। রাজকন্যা, আপনি তো জানেন কোনো পুরুষ আপনার দিকে তাকালেও আমি কি রকম ঈর্ষান্বিত হয়ে পড়তাম। অথচ আজ আমিই আপনাকে অপর এক পুরুষের দেহ সৌষ্ঠবের বর্ণনা দিচ্ছি। নিশ্চই  বুঝতে পারছেন আমি কতটা মুগ্ধ।  অকস্মাৎ বিদ্যুৎ ঝলকেের মতো সন্দেহ হলো যে এই নিশ্চয়ই সুন্দরগড়ের দস্যু সর্দার পৃথ্বী। বালকটির ডাকও সে রকমই ছিল। আমার সন্দেহ যে সঠিক তা স্বয়ং পৃথ্বীর মুখেই শুনলাম এবং আমার সকল প্রশ্নের উত্তরও পেলাম। ধনরাশি স্থানান্তরের খবর যেমন ঠগীদের কাছে ছিল তেমনই ছিল পৃথ্বীর কাছেও। ঠগীর আক্রমণের  সময় পৃথ্বীর দস্যুদলও সমভিপ্রায়ে কাছে পিঠেই ছিল। দস্যুসর্দার পৃথ্বীর পরিকল্পনা ছিল কিছুটা ভিন্ন। সব নয়, একটিমাত্র সিন্দুক লুঠ করে এবং তা দিয়ে কিছু গরিব মানুষের গ্রাসাচ্ছাদনের ব্যবস্থা করা।  ঠগীরা পৃথ্বীর চিরকালের শত্রু কারণ তাঁরা হত্যা করে। পৃথ্বীর দস্যুদল ঠগী দের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় পরাস্ত করে সবকটা সিন্দুক উদ্ধার করে ও আহতদের নিজের আস্তানায় নিয়ে এসে শুশ্রুষা শুরু করে। তার নিজের দলেরও অনেকেই আহত হয়েছে এই কাড়াকাড়িতে। আমি উদগ্রীব হয়ে জানতে চাই আমাদের দলের কে কে আছেন এই আহতদের মধ্যে?  সে জানায় আমি, ও আরো তিনজন ছাড়া সবাই হয় নিহত হয়েছেন না হয় পিঠটান দিয়েছেন। আমি পৃথ্বী কে বলেছিলাম তুমি যে আমাদের এখানে নিয়ে এসেছো রাজার কাছে খবর নিশ্চয়ই পৌঁছবে,  তখন রাজা নিশ্চয়ই সৈন্য পাঠাবে আমাদের উদ্ধারের জন্য।  “রাজার সৈন্যকে আমি ডরাই না।” হুংকারে আমি  চমকে উঠেছিলাম। “রাজা আগে জানবে পৃথ্বীর আস্তানা কোথায় তারপর তো সৈন্য পাঠাবে” বলার পর সেই অট্টহাস্য আমি কখনো ভুলবো না। পৃথ্বীর সাথে কথাবার্তায় যেটুকু বুঝলাম আমরা চারজন তার হাতে বন্দী। সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত আমাদের এই বন্দী অবস্থাতেই থাকতে হবে। তারপর আমাদের চারজন আর একটি বাদ দিয়ে সমস্ত সিন্দুক যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়া হবে।  কিন্তু যথাস্থানটি যে কোথায় সেটা ধোঁয়াশাই থেকে গেছে। 

কোমর বন্ধের মধ্যে আমার কিছু দরকারি ও আধা-দরকারী কাগজপত্র ও আমার জন্মদিনে আপনার উপহার দেওয়া সেই কলমটি দৈবক্রমে আমার সঙ্গেই  আটকে ছিল। আমার সঙ্গে সঙ্গে অজান্তে সেগুলোও উদ্ধার করেছে সস্যু সর্দার পৃথ্বী। আর সেই জন্যই আপনার দস্যুরাজ অপর এক দস্যুসর্দার এর গোপন আস্তানায় বসে তার রাজকন্যাকে চিঠি লিখতে পারছে। জ্বর রয়েছে শরীরে। বাম বাহু এখনো যন্ত্রনাক্লিষ্ট। কিন্তু আপনাকে এই অভূতপূর্ব আশ্চর্য ঘটনাবলী জানাতে বসে একটু আরাম বোধ করছি বোধহয়। মনে হচ্ছে আপনি যেন আমার উষ্ণ ললাটে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন।  আমার সামান্য কষ্টে আপনার আঁখিপাত ছলোছল হতো।  সারা মুখ ব্যাথায় ভরে যেতে দেখেছি কতবার।  আজ আমায় এমন অবস্থায় দেখলে আপনার যে কী অবস্থা হতো তা সহজেই অনুমেয়। আমাদের আবার দেখা হবে রাজকন্যা। কোথায়,  কী ভাবে,  কী পরিস্থিতিতে আমি জানি না।  কিন্তু মন বলছে আমাদের আবার দেখা হবেই। আমি যে এখনো জীবিত আছি, মৃত্যুর এতো কাছ থেকে ফিরে এসেছি তার একমাত্র কারণ হয়তো আমাদের অসমাপ্ত থেকে যাওয়া সম্পর্ক। দস্যুসর্দার পৃথ্বীকে দেখে মনে আশা জাগে রাজকন্যা। মনে হয় আমি সুস্থ হয়ে এখানে থেকে বেরিয়ে আসতে পারবো। পৃথ্বী দস্যু হলেও অমানবিক পশু নয় তার প্রমাণ আমি নিজে। আজ তবে এখানেই শেষ করি রাজকন্যা? খুব শীগ্রই আবার আপনাকে চিঠি লিখতে পারবো আশা করি।

আপনার সাত জন্মের শত্রু 

“আপনার দস্যুরাজ”

 

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

 

চিঠিমালা ৭

দস্যুরাজ,

কত কথা যে জমে আছে আপনার সঙ্গে কিন্তু আজকাল মনের ক্লান্তি সঙ্গ দিতে নারাজ। কখনও সে হাল ছেড়ে দিচ্ছে, কখনও সে জানান দিচ্ছে এই তো আর কিছুদিন। আমি যেন স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি বাতাসে আপনার প্রশ্বাসের শব্দ। আপনার ফিরে আসার খবর যেন চারিদিকে ছড়িয়ে আছে।  

আজকে আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছে এই চিঠি আপনার হাতে যখন পৌঁছোবে, (যদি আদৌ পৌঁছোয়) এটা পড়ে আপনার এত ভালো লাগবে যে আমার থেকে দূরে থাকার ব্যথা কিছুটা লাঘব হবে। আবার মাঝেমাঝে মনে হচ্ছে, উল্টোটাও হতে পারে। কথায় কথায় ছোটদের মত ঠোঁট ফুলিয়ে রাখা যে আপনার স্বভাব! তা অন্য অনেক স্বভাবের মতই আমার অত্যন্ত প্রিয় এটা আপনার জানা বলেই অনেকসময় কপট রাগ দেখাননি এমন কথা হলফ করে বলতে পারি না। সত্যিই আপনার কাছে এই পত্রাবলীসমূহ কোনদিন পৌঁছোবে কিনা জানি না। হ্যাঁ দস্যুরাজ, আমি মাস খানেক আগেও বিশ্বাস করতাম আপনি ফিরে আসবেন। পারবেন না আপনার রাজকন্যার বিরহ সইতে অথচ আপনি পারলেন। আজও কী ভীষণ রকম পারছেন…।

দস্যুরাজ, বেশ কিছু দিন হল আমি শাস্ত্রীয় নৃত্যের প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছি। খুব ইচ্ছে করছে নাট্যশাস্ত্রের এই প্রাচীন কলা আয়ত্ত করি। এটুকু পড়ে আপনার চোখ চকচকে হয়ে উঠবে জানি। আমি কোন বিশেষ বিষয়ের ওপর আগ্রহ প্রকাশ করলে বরাবর আপনি খুশি হয়েছেন, কিন্তু নেপথ্যের কাহিনী জানলে হয়তো উষ্মা প্রকাশ করবেন।

পুষ্পদংশন গ্রামের যুবরাজ হৃদকমল রায় চৌধুরী দিন দুয়েক আগে হঠাৎই  আমাদের বাড়ি এসে উপস্থিত। তাঁর ভাবি বঁধুটির সঙ্গে দরকারি বিষয়ে কিছু আলোচনাই এই আসার কারণ দর্শানো হয়েছে। আমাদের বাড়ির লোকজন যদিও এই হঠাৎ আগমনে যারপরনাই খুশি হয়ে তাঁর সবরকম সুযোগ সুবিধের জন্য আন্তরিকভাবেই লিপ্ত হলেন এবং দ্বি-প্রাহরিক আহার্যের ব্যবস্থাদির পর আমাকেও সাজিয়ে গুছিয়ে তাঁর কাছে পৌঁছে দেওয়া হল। প্রথমদিন একান্তে আপনার সঙ্গে সারদা মায়ের ঘাটে দেখা হওয়ার সঙ্গে এই দেখা হওয়ার কোন মিল নেই দস্যুরাজ। সেদিন সাজের আড়ম্বর ছিলনা, অথচ মিলনের উত্তেজনা ছিল। আর দ্বিতীয়তে সাজের আড়াল আছে, দেখা হওয়ার ভীতি আছে, মনের আড়ম্বর নেই।

ঠিক হল গঙ্গা আমাকে যুবরাজ পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে বাইরেই অপেক্ষায় থাকবে আমার ফেরার। হ্যাঁ দস্যুরাজ, আজকাল গঙ্গা আমার প্রধান সহচর হয়ে উঠেছে। ওকে ছাড়া আমি আজকাল একটি পাও ফেলতে পারি না। জানি, এটুকু পড়েই আপনার স্পন্দন দ্রুত লয়ে চলবে। আমার দস্যুটিকে দেওয়া এ এক মিষ্টি প্রতিশোধ আমার।

পূর্ব নির্ধারিত সময়ে আমি এবং গঙ্গা অতিথি নিবাসের বাইরে দাঁড়িয়ে ভেতরে প্রবেশ করবো কিনা ইতস্তত করছিলাম তখন ভেতর থেকে মিশ্র মালহার ভেসে এলো। 

আপনার মনে আছে দস্যুরাজ আমাদের প্রথম একসঙ্গে মল্লারে অবগাহন? শ্রাবণের কোন দ্বিতীয় প্রহরের ষড়যন্ত্র ছিল যেন…!আমরা সারদা মায়ের ঘাটে বসে একান্তে ভিজেছিলাম পরস্পরের প্রেমে। আজ অতিথি নিবাসের ভেতর থেকে মল্লার ভেসে এলে সব হুড়মুড়িয়ে মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল, সেই আমার প্রথম মল্লার। সেই শেষ…। এর আগে পরে কিছু হতে পারে না যেন আর।

ভেতরে প্রবেশ করে তাকে দেখতে না পেয়ে ইতিউতি খুঁজছিলাম। হঠাৎ গম্ভীর কণ্ঠে “এদিকে আসুন” শুনে খানিক চমকে গিয়েছিলাম। দেখলাম উনি জানলার কাছে দাঁড়িয়ে। তখনও বাইরে তাকিয়ে আছেন।মনে মনে ভাবলাম উনি আমাকে দেখলেন কী করে! যেন আমার কথা বুঝতে পেরেই যুবরাজ হৃদকমল উত্তর দিলেন, “আসলে আমি মানুষের শব্দ চিনতে পারি। সেই যেদিন প্রথম সামনে এলেন শুনেছিলাম! সেই শব্দ চিনতে আমার আর দ্বিতীয়বার ভুল হবেনা।”

সৌম্যদর্শন হৃদকমল রায় চৌধুরীকে যতটা ভেতর ফাঁপা ভেবেছিলাম, এখন অতটা খারাপ লাগলো না। মুখে বললাম, “আমাকে কেন ডেকেছিলেন সেটা জানতেই যখন আমার আসা। সেটা শুনেই আমি যেতে পারি।” আমাকে প্রায় ধমকে তিনি যা বললেন, এবং তারপর আমাদের পারস্পরিক কথাবার্তা এভাবেই চলতে শুরু করে..

-দাঁড়ান, বিবাহ তাড়াহুড়ো আর ছেলে খেলার  বিষয় নয়, এটুকু বোঝার বয়স আপনার হয়েছে বোধকরি।

-আমি তো শুনতেই এসেছি। আপনি তো সেই থেকে শব্দের সমীকরণ বোঝাচ্ছেন। আপনি বলুন শুনছি। আমিও খানিক রূঢ় হলাম।

-ওহ আপনি রেগেও যান! বেশ তো! যে জন্যে ডাকা আপনাকে, আমি গৌরচন্দ্রিকা পছন্দ করি না তাই সরাসরি মূল কথাতেই যাই।আমি এই বিবাহে সন্তুষ্ট নই। বাবামশাইয়ের কথা রাখতেই মত দিয়েছি মাত্র,ভবিষ্যতে আমার থেকে খুব বেশি কিছু আশা রাখবেন না।

এতটুকু শুনে দস্যুরাজ আমার মিশ্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে ভেতরে। খুব আনন্দ আর বিস্ময়ের যৌথ সংমিশ্রণে যে আবেগ চোখে ফুটে উঠছে তাকে কিছুতেই দমন করতে পারছিলাম না কিন্তু সঠিকটাই বুঝলাম কিনা সেটি সম্পর্কে আরও নিশ্চিত হতে চাই তাই মুখে অস্ফুটে শুধু বললাম “কারণটা জানতে পারি?” তিনি আবার একই কথা বললেন, “বিবাহ যেহেতু ছেলেখেলা নয় তাই, আমি আপনাকে সমস্ত জানাতেই আজ ছুটে এসেছি, বা বলতে পারেন আমার অপারগতা আমাকে নিয়ে এসেছে এখানে।” এই বলে তিনি আমার সামনে এসে দাঁড়ালেন, এবার আর এই অহঙ্কারী মানুষটিকে অতটা খারাপ লাগলো না দস্যুরাজ। কেমন মায়া হল একটু এবং অদ্ভুত ভাবে কবি রিচার্ড অ্যাডামস্ এর একটি কবিতার কয়েকটি পংক্তি মনে পড়ে গেল। আমি মনের আনন্দ ভেতরে দমন করলাম অত্যন্ত সংযতভাবে। “আপনি বলুন, আমি শুনছি” খুব সন্তর্পণে বললাম। তিনি আবার জানলার কাছে ফিরে গিয়ে আকাশের দিকে উদাসীন ভাবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর বললেন, “বিবাহই সব প্রেমের উপসংহার হতে পারে না জেনেও আমি রাজনন্দিনীকে ভালোবেসেছি।” প্রিয়তম দস্যুরাজ আমার বুকের ভেতরে তখন উচ্চৈঃশ্রবার পায়ের শব্দ দামামা বাজাচ্ছে…তবু নিজেকে সংযত রেখে প্রশ্ন করলাম “রাজনন্দিনী?” তিনি হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন যেন দেবরাজের রাজসভার সমস্ত আলোয় তাঁর মুখ উদ্ভাসিত হলো। বললেন, “হ্যাঁ রাজনন্দিনী, যদিও এই পোশাকি নাম আমারই দেওয়া। তাঁর আসল নাম নন্দিনী। তিনি বাবামশাইয়ের দরবারে রাজনর্তকী।” এটুকু বলতেই সৌম্যকান্তি মুখটি রাঙা হয়ে উঠলো। তিনি অনর্গল বলে গেলেন, সবাই রাজনর্তকীদের ঘৃণার চোখে দেখলেও, আমি ওঁকে শ্রদ্ধা করি। আমি ওর শিল্পকলাকে শ্রদ্ধা করি। ভারতের সবচেয়ে প্রাচীন কলাকে আমি শ্রদ্ধা করি। আমাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাই আমাদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে। আমি রাজনন্দিনীকে ছাড়া অন্য কোন মুখ ভাবতেই পারি না। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। এটা আমার অক্ষমতা। আপনার ওতে কোন দায় নেই যদি এরপরেও আপনি এই বিবাহে আগ্রহী হোন তবে আমি আগেই বলেছি আমার থেকে খুব বেশি প্রত্যাশা রাখবেন না। আমার এটুকুই বলার ছিল” এটুকু বলে তিনি শান্ত হলে আমি কিছুটা অদ্ভুত ভাবেই এসব প্রসঙ্গ পাশ কাটিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, প্রাচীন কলা? নর্তকী? অর্থাৎ নৃত্যকলা নাকি নাট্যশাস্ত্র?” উনি অবাক চোখে আমাকে কয়েক মুহূর্ত নিরীক্ষণের পর বললেন, নাট্যশাস্ত্রেরই একটি অংশ। নৃত্য, শাস্ত্রীয় নৃত্য। সর্বপ্রাচীন নৃত্যকলা, ভারতনাট্যম।” আমি আরও আগ্রহী হয়ে বললাম, আমাকে একটু বিশদে বলা যায়?” তিনি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন, হয়তো মনে মনে বুঝলেন ওঁর ভালোবাসার মানুষের প্রতি আমার মনে কোন রকম বিরাগের সৃষ্টি হয়নি।বললেন, “নিশ্চয়ই বলবো, তবে এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকলে দুজনেই ক্লান্ত হয়ে পড়বো তাই আপনারই গৃহে আমার আতিথ্য গ্রহণ করুন চারুশিলে।” ওনার বলার ধরণে উভয়েই হেসে ফেললাম। তারপর তিনি যা বললেন, তার মর্মার্থ হল, ভারতবর্ষের নৃত্যের ইতিহাস অত্যন্ত বিশৃঙ্খল, তবুও যেটুকু আমরা জানতে পারি, তাতে বলা যায় নাট্যশাস্ত্র রচনাকালের আগেই আমাদের দেশে নৃত্যের প্রচলন ছিল। তার প্রমাণ বিভিন্ন প্রাচীন ধ্বংসস্তুপ বা ভাস্কর্য থেকেই পাওয়া যায় তবে পূর্বে এই নৃত্যধারার নাম ছিল ‘দাসী আট্যম’। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন দেব মন্দিরে নৃত্যগীতের মাধ্যমে দেবতাদের তুষ্ট করার রীতি প্রচলিত ছিল। যারা নৃত্যগীত পরিবেশন করতেন তাদের বলা হত ‘দেবদাসী’, আর এঁদের নামানুসারে এই কলার নাম হয় দাসী আট্যম। পূর্বে চারটি পদ্ধতিতে ভারতনাট্যম প্রচলিত ছিল। সাদির নাট্যম, ভগবত মেলা নাটক, কুরুভাঞ্জি ও কুচিপুড়ি। এখন ভারতনাট্যমের যে ভাবধারা আমরা দেখতে পাই তা রাজা সরফোজির রাজত্বকালে প্রবর্তিত হয়। তাঞ্জোরের রাজার সময়কাল  অর্থাৎ ১৫৭২ থেকে ভারতনাট্যম নৃত্য বিকাশের স্বর্ণযুগ বলা হয়। এই নৃত্যের নামের ইতিহাস নিয়ে মতবিরোধ আছে।অনেকে বলেন ভারতের নৃত্য বলে ভারতনাট্যম। আবার অনেকে বলেন ভরত মুনির নাট্যশাস্ত্রই এই নৃত্যধারার ভিত্তি বলে এর নাম ভরতনাট্যম। নামের ইতিহাস যাই হোক, এই নৃত্যের ভিত্তি হল ভক্তি, এবং যেহেতু নারী শক্তির আঁধার তাই এই নৃত্যে মূলত নারীরাই অংশ নেন। এই পর্যন্ত বলার পর হৃদকমল থামলেন। আমি বাধ্য ছাত্রীর মতো মন দিয়ে শুনলাম।” আপনিই বলুন যে কলার এমন ইতিহাস, তাকে সাধারণ জনতা ব্রাত্য কেন করে রেখেছে?” প্রশ্নে হকচকিয়ে গিয়ে চুপ করে রইলাম। ফেরার সময় ওঁকে বললাম, “এই বিবাহ আদৌ হবে কিনা জানি না। হলেও বিবাহের শেষ পরিনতি কী হবে তাও অজানা তবে এটুকু হলফ করে বলতে পারি, আমার শিক্ষকবন্ধুটির প্রতি শ্রদ্ধা বেড়ে গেল। চলি, আশা করি আবার দেখা হবে।” দস্যুরাজ, আমাদের অতিথি নিবাসটি বেশ বড় এবং আড়ম্বরপূর্ণ হলেও আমার কোনদিনই একে স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে হয়নি।আজ যখন বেরিয়ে এসেছিলাম পেছন ফিরে একবার তাকিয়ে মনে হল, সৌম্যদর্শন যুবরাজ হৃদকমল রায় চৌধুরীকে ছাড়াও এই অতিথি নিবাসে ছেড়ে এলাম এক আকাশ শ্রদ্ধা আর এক পৃথিবী অসম বন্ধুত্ব।বাইরে বেরিয়ে এসে চোখে একরাশ উদ্বেগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গঙ্গার হাতটি জড়িয়ে বললাম “সখা অবাক হবার এখনও শেষ নয়, আগে একজন ভারতীয় উচ্চাঙ্গ নৃত্য ভারতনাট্যমের গুরু খুঁজে বার করো দেখি আমার জন্য।” গঙ্গা আমার হাত ছেড়ে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমি দাঁড়ালাম না। একটা অদ্ভুত ঘোরে আচ্ছন্ন হয়ে হেঁটে নয়। প্রায় উড়তে উড়তে নিজের ঘরে পৌঁছোলাম আর এই অনাহূত আনন্দের জন্য এতক্ষণ আপনার দিকে তাকানোই হয়নি দস্যুরাজ।এখন বুকের যে অংশে আপনার বাস, সেখানে আপনার মুখটি দেখে বুঝলাম, ঘন বর্ষার সম্ভাবনা আছে। মেঘ যথেষ্ট গভীর, একাধিকবার যুবরাজকে সৌম্যদর্শন অভিহিত করা, এবং গঙ্গার হাতে হাত জড়িয়ে ফেরার কারণে, মেঘের আহ্বান যথেষ্ট সুতীব্র। এবার মল্লারে ভাসি দস্যুরাজ।আসুন আমাতে সমাহিত হোন। ভালোবাসা।

“আপনার রাজকন্যা”

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত