| 3 মার্চ 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

রাজকন্যা ও দস্যুরাজ (পর্ব-৪)

আনুমানিক পঠনকাল: 4 মিনিট

চিঠিমালা-৮

প্রিয়তমা রাজকন্যা,

আজ অনেকদিন পর  নিজের নব বাসস্থান থেকে আপনাকে চিঠি লিখছি। পুরাতন বাসস্থান বদল হয়েছে আমার খুব সম্প্রতি। সাধারণ কর্মী আবাসন ছেড়ে আমায় আসতে হয়েছে উচ্চপদাধিকারীদের জন্য ঠিক করা গৃহে। শেষ কদিনের ঘটনায় আমার এক বিশেষ স্থান হয়েছে এই রাজ্যে। আমায় বীরের সম্বর্ধনা দেওয়া হয়েছে লুন্ঠিত ধনরাশি যথাস্থানে পৌঁছে দেওয়ার পর। কিন্তু আসল বীরের কাজ যে করেছে সে সুন্দরগড়ের দস্যু পৃথ্বী। সে কথা আমি চাইলেও কাউকে বলতে পারবো না। বন্ধুত্বের অঙ্গীকারবদ্ধ আমি। হ্যাঁ রাজকন্যা, আমার সাথে পৃথ্বীর এক সুন্দর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। যে কদিন তার আস্তানায় ছিলাম সেই কদিনের মধ্যেই দস্যু সর্দার এর ভেতর লুকিয়ে থাকা আসল মানুষটিকে আমি চিনেছি। তার চারবছর বয়সি মাতৃহারা পুত্রের প্রতিও স্নেহাসক্ত হয়ে পড়েছি যথেষ্ট। সে যেমন পৃথ্বী কে “পিতি” ডাকে তেমনি আমার নাম তার কাছে প্রতিবিম্ব থেকে “তিম্ব” হয়ে গেছে। কী যে মধুর লাগে শিশু কণ্ঠে এই ডাক কী বলবো! আমি তার নাম দিয়েছি দুষ্টু কুমার। পৃথ্বীর আস্তানা থেকে বেরিয়ে আসার আগে গোপনে কিছু কথা আমায় পৃথ্বীকে দিতে হয়েছে। তার মধ্যে প্রথম, আমাদের বন্ধুত্ব  গোপন রাখা। আর দুই, মাঝে মাঝে পৃথ্বীর আস্তানায় তার আথিত্য গ্রহণ করা। দ্বিতীয়টি কিভাবে সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করায় পৃথ্বী জানায় সে দায়িত্ব তার। বন্ধুত্বের এমন অনুরোধ অস্বীকার করা যায় না। জড়িয়ে ধরে সম্মতি জানিয়েছিলাম তাকে। পৃথ্বীর সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব কীভাবে গড়ে উঠলো তা যতদিন না আপনাকে বলতে পারছি আমার শান্তি নেই। বলাই বাহুল্য বন্ধুত্ব যখন গড়ে উঠেছে তখন সে আপনার কথাও জেনেছে। আমি আপনাকে ভালোবাসি, সে কথা জানার পর, সে আপনাকে  সুন্দরগড়ে আমার কাছে কীভাবে নিয়ে আশা যায় সে ব্যাপারে রীতিমতো পরিকল্পনা শুরু করে দেয়। তাকে বোঝাই ভালোবাসা মানে যে শুধু পাশাপাশি একসাথে জীবন যাপন নয়। বহু ক্রোশ দূরে থেকেও পরস্পরকে ভালোবাসা যায়। ভালোবাসা মনের ব্যাপার আর আমার মনেই আপনি বসবাস করেন। মাঝে মাঝে পৃথ্বী অন্যমনস্ক হয়ে যেত। হয়তো তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ে যায় সময় সময়, যে দুষ্টু কুমারের জন্মের সময় প্রসব বেদনা সহ্য করতে না পেরে পরলোক গমন করেন। 

প্রায় দেড় সপ্তাহ পর সবাই সুস্থ হয়ে উঠলে, চোখ বাঁধা অবস্থায় ভোর রাতে পৃথ্বীর ডেরা থেকে ঘোড়ার পিঠে চেপে বেরোই আমরা। চাইলে সবকটি সিন্দুকই নিজের কাছে রেখে দিতে পারতো পৃথ্বী। আমরা চারজন অসহায় অসুস্থ অবস্থায় কিছুই করতে পারতাম না। মাত্র একটি  সিন্দুক বাদে বাকি সবকটি সিন্দুকই সে ফেরত দিলো। আমি ছাড়া যে বাকি তিনজন এখানে ছিলেন তার মধ্যে অশ্বারোহীবাহিনী প্রধান ছিলেন। আর বাকি দুজন সেপাই। এই তিনজনের কাছে এমন ভাবে সম্পূর্ণ ঘটনা সাজানো হয়েছে যাতে মনে হয় আমিই পৃথ্বীর সঙ্গে আপস আলোচনা করে, প্রয়োজনে রাজার প্রতিশোধের ভয় দেখিয়ে শুধু মাত্র একটি সিন্দুক নিতে রাজি করিয়েছি দস্যুদের। অবশিষ্ট ঘোড়া, সিন্দুক আর আমাদের চারজনকে এমন একটা জায়গায় পৌঁছে দিয়ে যায় দস্যুদলের লোকজন যেখানে পরিভ্রমণকারী রক্ষীরা নিত্য যাতায়াত করেন। আমাদের পৌঁছে দিয়ে দস্যুদল অরণ্যের মধ্যে নিমেষেই হারিয়ে যায়। রাজরক্ষীরা কিছু সময়ের মধ্যেই আমাদের সেখান থেকে উদ্ধার করেন।

সূর্য ডুবতে আর বেশি দেরি নেই। প্রত্যেক দিন এই সময়টাতে মন বড় ব্যাকুল হয়ে ওঠে। মনে হয় সব ফেলে রেখে চলে যাই সারদা মায়ের ঘাটের মন্দির সংলগ্ন সেই সিঁড়িটায়, যেখানে কত গোধূলী কাটিয়েছি আপনার পাশে বসে। কিন্তু আপনি এখন  অন্য কোনো একজনের বাগদত্তা। আপনার জীবনে ফিরে গিয়ে আপনার আর আপনার পরিবারের বিড়ম্বনার কারণ হতে চাই না আমি। আমার ভবিষ্যৎ হয়তো এই সুন্দরগড়েই রচিত হবে ধীরে ধীরে। শুধু আপনার সঙ্গে আরেকটি বার যে দেখা হবেই সে বিষয়ে একটা দৃঢ় বিশ্বাস দানা বেঁধেছে মনের গভীরে। সেই দিনেরই অপেক্ষা এখন আমার। এই মুহূর্তে আমার মর্যাদা কয়েকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে।  রাজ পরিবারের কাছের লোক হয়ে উঠছি ধীরে ধীরে। হয়তো অচিরেই রাজা মশাই এর সাথেও সাক্ষাৎ হবে। কোষাগারের কাজ ছাড়াও আরো গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব এসে পড়ছে এখন আমার কাঁধে। তার মধ্যে প্রধান হলো রাজ অতিথির আদর আপ্যানয়ের সমস্ত কাজের পরিদর্শন।  রাজার অন্তরঙ্গ বন্ধু পুষ্পদংশন গ্রামের জমিদার আগামী মাসেই সপরিবারে আতিথ্য গ্রহণ করবেন সুন্দরগড়ে। তার সমস্ত আয়োজন এর কার্য-দর্শন এর ভার পড়েছে আপনার দস্যুরাজের উপর।  শুনছি ওনার একমাত্র পুত্রের হবু স্ত্রী আর তার পরিবারের কিছু লোকও থাকবেন অতিথিদের মধ্যে। এতো দ্বায়িত্বের কাজ কখনো আমি করিনি রাজকন্যা। সাহিত্য আর গণিতচর্চা করেই দিন কেটেছে আমার। তবুও এক অদ্ভুত বল পাচ্ছি মনে। মনে হচ্ছে প্রতিটা পদক্ষেপে আপনি আমার সঙ্গে রয়েছেন। যেভাবে সাহস জুগিয়ে যেতেন যেকোনো কাজের আগে,  আজও যেন অদৃশ্য থেকে সেই একইরকম ভাবে নির্ভয়ে এগিয়ে যেতে বলছেন লক্ষের দিকে।

ভালোবাসা

আপনার সাত জন্মের শত্রু

আপনার দস্যুরাজ

 

 চিঠিমালা -৯

 দস্যুরাজ,

জানেন আজকাল আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে পুষ্পদংশন গ্রামটা ঠিক কেমন, শুনেছি ঘুম থেকে উঠেই নাকি হরিণ শাবককে বাড়ির বাগানে ঘুরে বেড়াতে দেখা যায়…।হৃদকমল, রাজনন্দিনীরা কি তাই এত উদার! পরিবেশই তো মানুষকে উদার করে, আর উদার না হলে কি আমাকে এই দয়াটুকু ওরা করতে পারতেন! আমাকে বিবাহ না করার সিদ্ধান্ত কি আমাকে দয়া করাই নয়?

হ্যাঁ দস্যুরাজ, আপনি কাছে নেই। এইসময় সামান্য আনন্দটুকুও যেন অতিরিক্ত আমার জন্য, তবুও হৃদকমল বিবাহ প্রত্যাখ্যান করার পর থেকেই  আজ কিছুদিন হল যেন সঙ্কোশ নদীর মতোই পাহাড়িয়া উচ্ছ্বাস আমার সর্বাঙ্গে। সরকার বাড়ির লোকজন অবশ্য আমার এই উচ্ছ্বাসের কারণ হৃদকমলের হঠাৎ আগমনকেই ঠাউরেছেন।

হৃদকমল যাবার সময় বলে গেছেন আমরা অর্থাৎ আপনার রাজকন্যা, হৃদকমল এবং হৃদকমলের রাজনন্দিনীর পরের সাক্ষাৎ হবে সঙ্কোশ নদী ঘেরা দমনপুরে। রাজনন্দিনী গোপনে আলাপ করতে চেয়েছেন আপনার রাজকন্যার সঙ্গে।

জানিনা দমনপুরটাই যুবরাজ কেন বেছে নিলেন। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে দস্যুরাজ, আমাদের একসঙ্গে কাটানো প্রথম চড়ুইভাতি এবং আমাদের প্রথম পারস্পরিক ব্যথা পাওয়ার দিনটির কথা? মনে আছে সেই অশ্বত্থগাছটির কথা! যার ডালে বাঁধা কাঠের দোলনায় সূর্যতপা আর আপনাকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখে দিঘির হাতে আপনাকে চিরকুট পাঠিয়েছিলাম? মনে আছে সেই চিরকুটের প্রতি পংক্তিতে আপনার রাজকন্যা প্রথম অভিমানী বৃষ্টি পাঠিয়েছিল? আর আপনার সেই নিষ্ঠুর উত্তরের কথা মনে আছে? যেখানে আপনি মাত্র কয়েকটি শব্দবন্ধে আপনার রাজকন্যার প্রতি অবহেলা পেশ করেছিলেন অবলীলায়? লিখেছিলেন “সমস্ত কিছুর এমন কাঁটাছেঁড়া বন্ধ করুন।” আমি এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে হয়তো চলেই আসতাম, কিন্তু আমার মনে একটা প্রশ্ন থেকেই যেত, তাই পরের চিরকুটে লিখে পাঠিয়েছিলাম,” আমার অভিমানের এই নামকরণের কারণ কী শুধুই আমাকে আঘাত দেওয়া?” আমাকে অবাক এবং বাকরুদ্ধ করে দিয়ে উত্তর এসেছিল ” এটা অভিমান নয়, এটা শুধুই কাঁটাছেঁড়া।” তাহলে অভিমান কাকে বলে দস্যুরাজ?ভালোবাসার মানুষটিকে অশ্রদ্ধা করার ওই অভিঘাতের কথা আজও এতদিন পরেও দৃষ্টিপথে বৃষ্টি নামায় আমার। সেসব কথা থাক আজ…।

আপনি চলে যাবার পর কয়েকটি মাস কেটে গেছে, তবুও আপনার না থাকায় আমি আজও অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারিনি দস্যুরাজ।আপনার সঙ্গে এই একক কথার খেলায় মাঝেমাঝে ক্লান্ত লাগে আজকাল।

আজ এখানেই শেষ করছি। ভালোবাসা জানালাম প্রিয়তম।

“আপনার রাজকন্যা”

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত