| 3 মার্চ 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

রাজকন্যা ও দস্যুরাজ (পর্ব-৮)

আনুমানিক পঠনকাল: 5 মিনিট

ইংরেজদের রাতের ঘুম কেড়েছে লোকমান্য তিলক এর “স্বরাজ” এর ডাক। দেশ জুড়ে উঠেছে জাতীয়তাবাদ এর হুংকার। প্রতিহিংসাপরায়ণ ব্রিটিশ রাজ চড়াও হয়েছে স্বাধীন রাজ্যের উপর। বর্ধিত অনুদান না পেলে আক্রমণ করতেও পিছপা হবে না তারা। এমন কঠিন সময়ে সুন্দরগড়ের রাজকুমারী প্রতিবিম্বর সাহায্য নিয়ে দস্যুসর্দার পৃথ্বীকে কী বার্তা পাঠাতে চাইছে তা কেউ জানে না। আর অন্তহীন বিরহ অপেক্ষায় দিন কাটছে প্রতিবিম্বর।

 

প্রিয়তমা রাজকন্যা,

মাঝে মাঝে এই পত্রালাপই অবসাদের কারণ হয়ে দাঁড়ায় জানেন। মনে হয় এই যে এতো চিঠি লিখছি তা আপনার কাছে কি আদৌ কখনো পৌঁছে দিতে পারবো? আর কি কখনও দেখা হবে আমাদের? যদি পৌঁছে দিতে নাই পারি, যদি এই পত্রাবলীতে আপনার ছোঁয়া নাই লাগে, যদি প্রত্যেকটা অক্ষর আপনার দৃষ্টি স্পর্শ নাই পায় তাহলে কী প্রয়োজন এই নিরর্থক লেখার। আবার পরমুহূর্তেই মনে হয় আপনাকে বলার জন্য কত কথা কত ঘটনা মনের মধ্যে জমা হয়ে যায়। সেগুলো নিঃসরণ করার জন্যও একটা মাধ্যমের প্রয়োজন। তাই আপনাকে এই পত্র লেখা থেকে বিরত থাকতে পারি না। জানি না এই জীবনে আপনার সঙ্গে আমার পুনরায় সাক্ষাৎ হবে কিনা, কিন্তু যখনই আপনাকে লেখা চিঠির তাড়ার দিকে দেখি, মনের মধ্যে অদ্ভুত আশা জন্মায়, যে আমাদের দেখা হবে, হবেই। চিঠিমালা স্পর্শ করলে মনে হয় একদিন আপনার হাত ধরে আপনার হাতে তুলে দেবো আমার এই বিরহ যাপন।

এদিকে সুন্দরগড়ে একের পর এক অভূতপূর্ব ঘটনা ঘটে চলেছে। ইংরেজ আধিকারিকদের একটি দল রাজকোষ পরিদর্শনে এসেছিলো। তারা যে অনুদান বৃদ্ধির ফরমান জারি করেছিল তাতে তারা অনড়। সংকুচিত রাজকোষ দেখে তাদেরকে বিরক্তি ও ভ্রুকুঞ্চন ছিল দেখার মতন। লালমুখোদের মুখ রাগে আরও লাল হয়েছিল। বিপুল পরিমান অর্থ যে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তা চর মারফৎ তাদের কানে পৌঁছেছে তাতে সন্দেহ নেই। সারা দেশ জুড়ে ক্রমবর্ধমান জাতীয়তাবোধ, স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা, মারাঠার বাল গঙ্গাধর তিলকের ‘স্বরাজ’ এর আহ্বান এমনিতেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ঘুম কেড়েছে। লোকমান্যর “স্বরাজ বিল” পত্রপাঠ নস্যাৎ করেছে তারা। এমন অবস্থায় ইংরেজরা তাদের পা এর তলার নরম মাটি শক্ত করার জন্য উঠে পরে লাগবে এটাই স্বাভাবিক। স্বাধীন সাম্রাজের উপর রাশ টানার চেষ্টা করছে তারা। তাদের রাজকোষ নিঃশেষ করে নিজেদের মজবুত করতে চাইছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বর্ধিত অনুদান দিতে না পারলে যেকোনো পরিণতি এমনকি ইংরেজ আক্রমনের জন্য ও প্রস্তুত থাকার হুমকি দিয়ে গেছে তারা। সুন্দরগড়ের রাজামশাই শান্তিপ্রিয় প্রজাবৎসল। স্বাভাবিক ভাবেই তিনি উদ্বেগপূর্ণ দিনযাপন করছেন।

এরই মাঝে রাজকুমারী প্রজ্ঞাপারমিতা আমার মাধ্যমে পৃথ্বীর সঙ্গে যোগাযোগের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। একদিন রাজকুমারীর প্রধান সহচরী আনন্দী আমার গৃহে রাজকুমারীর লেখা বার্তা নিয়ে হাজির হয়। আনন্দী জানায় রাজকুমারীর হুকুম গোপনে পৃথ্বীর কাছে তাঁর লিখিত বার্তা পৌঁছে দিতে হবে। আমি যতটা না বিস্মিত তার থেকেও বেশি উদ্বিগ্ন হয়েছি এই ভেবে যে একাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে আমার আর পৃথ্বীর গোপন বন্ধুত্ব সর্বসমক্ষে না চলে আসে। রাজকুমারী আমাকে তাঁর ডেরায় গোপনে নিয়ে যাওয়ার কথাও বলেছেন আগে। সেরকম কোনো হুকুম এলে কিভাবে যে তা সম্পন্ন করবো সে কথা ভেবে যথেষ্ট চিন্তিত হয়ে পড়েছি আমি। রাজকুমারীর বার্তা হাতে নিয়ে চিন্তিত অন্যমনস্ক হয়ে বসেছিলাম, হঠাৎ আনন্দীর “যে দস্যুদের হাত থেকে রাজকোষ রক্ষা করেছে সে একটা সামান্য কাজের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ছে? এ কিরকম কথা?” বিদ্রুপে ক্রোধান্বিত হয়ে পড়েছিলাম। “তুমি এখন যাও আনন্দী। বার্তা পৌঁছে খবর পাঠাবো।“ বলেছিলাম তাকে এবং একটু রূঢ় ভাবেই বলেছিলাম। মুখ বেঁকিয়ে ঘাড় ঝাকিয়ে সে তখন চলে গেছিলো। আপনাকে বলা হয়নি আগে, এই আনন্দীকে  রাজপ্রাসাদে বেশ কয়েকবার দেখেছি। উচ্ছ্বল প্রাণবন্ত একটা মেয়ে। সেরেস্তা হোক বা রন্ধনশালা, আস্তাবল হোক বা অস্ত্রাগার সব জায়গাতেই এর অবাধ আনাগোনা। আমার যতবারই চোখ পড়েছে ওর দিকে আমি লক্ষ্য করেছি ও আমার দিকেই একদৃষ্টে দেখছে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই কখনো স্মিতহাস্য, কখনো লাজুক হাসি, কখনো ব্যাঙ্গাত্মক হেসে চোখ সরিয়ে নিয়েছে বা চলে গেছে সামনে থেকে। আমার মনে হয় সে আমাকে পছন্দ করে। আমি নিশ্চিত আগে হলে এই কথা জেনে আপনার নাক ফুলতো। আপনার সেই অভিমানী মুখটা যেন দেখতে পাচ্ছি চোখের সামনে। আর আমি আপনাকে বাহু বন্ধনে নিয়ে বলছি “ও আমায় পছন্দ করতেই পারে কিন্তু আমি তো করি না”, তারপর আপনার অভিমানী মুখে হাসির রেখা দেখা দিচ্ছে। আমি জানি না আজ একজনের ঘরনী হওয়ার পরেও আমার ওপর অভিমানের জায়গাটা আপনার মনে আছে কিনা আদৌ। হয়তো নেই, না থাকাটাই স্বভাবিক। নতুন সম্পর্কের প্রলেপ নিশ্চয়ই পড়েছে স্মৃতির উপর। 

পৃথ্বীর সঙ্গে আমার এরকম কথা হয়েছিল যে আমার কোনো প্রয়োজন পড়লে বা তাঁকে কিছু সংবাদ দেওয়ার প্রয়োজন পড়লে আমি যেন আমার গৃহের প্রধান ফটকে লাল শালু বেঁধে রাখি। সে নিজেই যোগাযোগ করে নেওয়ার ব্যবস্থা করবে। রাজকুমারী প্রজ্ঞা পারমিতার বার্তা পৃথ্বীর কাছে পৌঁছনোর জন্য এই কৌশল ব্যবহার করলাম প্রথমবার। এবং পরের দিনই কর্মস্থল থেকে গৃহে ফেরার পথে আগের বারের মতোই যেন মাটি ফুঁড়ে পাগড়ি ও মুখবন্ধে মোড়া একজন আমার সামনে উপস্থিত হল। তার হাতে আমার ফটকে বাঁধা শালু প্রমাণ করছে সে পৃথ্বীরই লোক। তার হাতে রাজকুমারীর লিখিত বার্তা হস্তান্তর করে গৃহে ফিরে এসেছিলাম। আমি জানিনা রাজকুমারী পৃথ্বীকে কী লিখেছেন, আমি এও জানি না এর কোনো উত্তর ও আসবে কিনা। তবে এটা জানি উত্তর এলে আমার মাধ্যমেই আসবে। এখন শুধু অপেক্ষা করা ছাড়া কিছুই করণীয় নেই। 

আশ্বিন মাসের চকিত বৃষ্টি আর তার কিছু পরেই নীল আকাশে পেজা তুলোর মতো মেঘের আড়াল থেকে রৌদ্রের লুকোচুরি আমাকে কলিকাতার কথা মনে করিয়ে দেয় রাজকন্যা। কলিকাতায় এখন দুর্গাপূজার প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে নিশ্চয়। মনে আছে আমরা কুমোরটুলি তে গিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা দূর্গামূর্তি গড়া দেখতাম?এবার প্রথম আপনাকে ছাড়া দুর্গাপূজা কাটবে আমার। রাজপ্রাসাদেও এবার পূজার প্রস্তুতি কিছুটা স্তিমিত। রাজ্যের উপর ইংরেজদের খড়গ ঝুলছে। রাজ্য বিপত্তির সম্মুখীন। রাজামশাই এই অবস্থায় কী সিদ্ধান্ত নেন সেটাই এখন দেখার। আশা করি সবকিছু শেষ পর্যন্ত ঠিক হয়ে যাবে। আজ এখানেই শেষ করি রাজকন্যা। ভালোবাসা জানবেন। 

“আপনার দস্যুরাজ”

 

জীবন কখনও বহতা নদীর মতো কখনও থমকে যাওয়া সময় যেন। রাজেশ্বরীর জীবনেও নদীর উচ্ছ্বাস তো আছেই, তবে প্রতিবিম্বের অনুপস্থিতিতে তা যেন বিষাদ উপমার নামান্তর মাত্র। না চাইলেও জীবন তো থেমে থাকে না। ঘটমান প্রবাহ থেকে বিচ্যুত হয় সে,তবুও চলাই তার ভবিতব্য।

আমার দস্যুরাজ, 

আমি আজকাল খুব ভালো থাকার প্রচেষ্টায় মাঝেমধ্যেই ভুলে যাই, এই আমার জীবন বয়ে নিয়ে যেতে হবে আরও কিছুদিন,  তাই ভালো থাকার প্রচেষ্টা আর ভালো থাকার অভিনয়ের মাঝের সূক্ষ্ম পার্থক্যটা যেন জীবনের থেকে বড় না হয়ে যায়..আরও কিছুদিন এইজন্য বললাম, কারণ শেষবার আপনাকে দেখার ইচ্ছেরা মনে তীব্রভাবে জেগে আছে..হ্যাঁ দস্যুরাজ আপনার রাজকন্যা ভালো নেই। আপনি কাছে নেই, এটাই সমস্ত ব্যথার  অযুত কারণ।

আজ ১লা আশ্বিন দস্যুরাজ। যখন তখন বৃষ্টির আসার মাসের শুরু। এইদিনটি রাজকন্যা আর দস্যুরাজের দিন,এইদিনটি ভালোবাসার বৃষ্টি যাপনের দিন। কথা ছিল এইদিনে আমরা পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি না কেন, যেন যুগল শ্রাবণের ধারা হয়ে ঝরে পড়ি পরস্পরের প্রাণে। আপনি কথা রাখলেন না দস্যুরাজ। পা রাখলেন ভাঙ্গনের পথে। তবু দস্যুরাজ, তবুও আপনার রাজকন্যার মন ভাঙ্গার খতিয়ান হোক অথবা দুটি মনের কাছে আসার গল্প, আপনাকে কিছু না বললে যে আমার দৈনন্দিন যাপন থমকে থাকে…

হীরার দুষ্টুমি, আজকাল সরকার বাড়ির চৌকাঠে গড়াগড়ি খায় না। সূর্যতপার সংস্কৃত উচ্চারণ সহযোগে প্রভাতী ভজনের পূজার দিকেও মন নেই যেন কারো!

আজকাল সরকার বাড়ির আকাশে বাতাসে অলির গুঞ্জন ধ্বনিত হয় দস্যুরাজ। প্রথম দিকে আমি বুঝতে পারিনি কিছুই, যখন নিশ্চিত হলাম, তখন কোন ভাবনার অবকাশ ছিল না। বেশ কিছুদিন থেকেই গঙ্গার চোখে অদ্ভুত এক মাদকতা খেয়াল করছিলাম যা ভালোলাগা পর্ব অতিক্রম করে ভালোবাসার দিকই নির্দেশ করছিল। জানি না এই পত্রাবলী কখনোই আপনার কাছে পৌঁছোবে কিনা, যদি সত্যি পৌঁছোয় কখনও, এতটুকু পড়ে আপনার নেশাতুর চোখে নিশ্চিত অগ্নিসংযোগ হবে এতক্ষণে। না দস্যুরাজ আপনার ধারণা অমূলক, গঙ্গার চাউনিতে যে প্রেমের সুগন্ধ পাই, তা দীঘির জন্য। দীঘির দীঘল চোখেও গঙ্গার প্রতি তীব্র ভালোবাসা দেখেছি দস্যুরাজ। আপনার রাজকন্যা দুজনেরই একান্ত আত্মার মানুষ। তবুও এখনও দুজনের কেউই আমাকে বলতে পারেনি পরস্পরকে ভালোবাসার কথা। দস্যুরাজ আপনি কত ঘটনার সাক্ষী থেকে বিরত রাখলেন নিজেকে। এই যে আরেকটি রাজকন্যা আর দস্যুরাজের কাহিনীর সূত্রপাত, এই যে কাহিনী এখানে খোলা পায়ে হেঁটে এসে চাঁদের রাজ্যে প্রবেশের অধিকার পেলো, আপনি জানলেন না। আপনি স্নেহের হাত বুলিয়ে দিতে পারলেন না এই অসীমে। 

আমি জানি না দস্যুরাজ, আমার এই একার পথ কখনও আপনার পথের গানের সঙ্গে সঙ্গত করবে কিনা, তবুও আশা রাখি অলৌকিকের, তবুও আশা রাখি স্বপ্ন সফল হওয়ার। ভালোবাসা জানিয়ে আজ এখানেই শেষ করছি দস্যুরাজ।

“আপনার রাজকন্যা”

 

 

(চলবে)

 

 

 

আগের পর্বগুলো ও লেখকের অন্যান্য লেখা পড়তে ক্লিক করুন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত