নীলমনিলতার গান

বাসটা খুব দ্রুত হাইওয়ের পথ ধরে চলছে…একতা পরিবহন, সিট নং-১৩।দুপুর আড়াইটা বাজে,খুব খিদে পেয়েছে সেই সাথে পানির তৃষ্ণা। সম্ভবত হলদে মাইলফলকে লেখা সাজাপুর নামের একটা জায়গা পার হচ্ছি। জায়গাটার দুপাশে শুধু বড় বড় পুকুর, গ্রীষ্মের দুপুরে সবকিছু শান্ত কিন্তু মরিচীকার মতো লাগছে। শুধু অশান্ত আমার ভিতরটা। আমি ভাবছি শরীরের দাগ পানি দিয়ে ধুয়ে ফেললেই মুছে যায়, শরীরের ব্যাথা কদিন পরেই চলে যায়। কিন্তু মনের দাগ কি দিয়ে মুছে যায়? মনের ক্ষত কি দিয়ে সেরে যায়? যতই দিন যায়, সেই স্মৃতির ক্ষত নাড়াচাড়া করলে ভিতর থেকে পচাগলা দুর্গন্ধ, পুজ, রক্ত বের হয়ে এসে আরো ক্ষতবিক্ষত করে দিয়ে যায়। ভোলা কি এতো সহজ? আমার চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে।পাশ থেকে এক ভদ্রমহিলা বারবার আড়চোখে দেখছেন আমাকে, দেখুক। এখন সব হিসেব নিকেশের বাইরে আমি, সেই বহুদিন আগে থেকেই।
 
আমার ছেলেমেয়ে দুটোর সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। মেয়েটার সাথে দেখা হল কিন্তু ছেলেটার সাথে আর দেখা করতে পারলাম না। ও ডে শিফটে। আমিও আর দেরী করতে পারলাম না, কারন এখানে রাতে থাকার মত কোন জায়গা আমার নেই। একটা থেকে ছেলেটার স্কুল শুরু। আমার স্বামী রফিকুল ইসলাম ওকে স্কুলে দিয়ে মেয়েটাকে আবার নিয়ে যাবে।
 
এখনো স্পষ্ট মনে পরে আঠারো বছর আগের এক সন্ধ্যার কথা। ছেলে পক্ষ আমাকে দেখতে আসলো। ছেলের বাবা নেই। ছেলের চাচা, ছেলে আরও কয়েকজন মিলে আমাকে দেখতে আসলো। আমি ভালো করে ছেলেকে দেখতেও পারলাম না, শুধু জানলাম-ছেলে কোন এক সরকারী অফিসে মোটামুটি বেতনে চাকুরি করে। রাত দুইটায় আমার বিয়ে হয়ে গেল। পরেরদিন আমাকে আমার শ্বশুর বাড়ি বরিশালে নিয়ে আসা হল। দুই মাস পর রফিকুল আমাকে তার চাকরীর জায়গায় নিয়ে গেলেন। সংসার শুরু করলাম। এক রুমের একটা ভাড়া বাসা, ঘরের ভিতরেই কেরোসিনের চুলায় আমি রান্না সেরে নিতাম। বাড়ীর অন্য সব ভাড়াটের সাথে কলতলা আর বাথরুম ভাগাভাগি করতাম। রফিকুলকে তার বাড়ীতে টাকা পাঠাতে হতো, তার বড় এক ভাই বাড়ীতে থাকতো, ওনার সংসারে।সেই সাথে আমার ছোট ননদের তখনো বিয়ে হয়নি, ও থাকতো গ্রামে ভাসুরের সাথে।
 
প্রথম দিকে রফিকুলের অল্প বেতনে কোনো মতে চলতাম। চলতে খুব কষ্ট হতো, মাসের বিশ তারিখ না যেতেই হাত টানাটানি, টাকাপয়সা কিছুই থাকতো না। কোনোমতে জোড়াতালি দিয়ে চলছিলো সংসার। এতোকিছুর পরেও সুখী ছিলাম নিজের এই ছোট সংসার নিয়ে, যেটাকে আমি আমার একান্ত নিজের বলে দাবী করতে পারতাম। এরপর আমার ছেলেমেয়ে দুটো হল। তখন আর হচ্ছিল না। ততদিনে আমিও কিছুটা বুঝে উঠতে শুরু করলাম সংসার।
 
আমি একটা পার্লার থেকে কাজ শিখে নিজেই পার্লার দিয়ে ফেললাম। দুইটা মেয়েও পেলাম পার্লারের কাজের জন্য। আমি দিনরাত পরিশ্রম করতে থাকলাম এটাকে দাড় করানোর জন্য। আমার সাথের মেয়ে দুইটার মধ্যে একজনের নাম ছিল নেলী। ওর থাকার জায়গা ছিল না, হোস্টেলে থাকতো, ওখানকার-ই একটা কলেজে ডিগ্রি পড়তো, আর আমার পার্লারে কাজ করে কিছু আয় করত, বেশ চটপটে মেয়ে। ধীরে ধীরে এতই ব্যস্ত হয়ে পরলাম যে সংসারে আমি সময় দিতে পারছিলাম না। একদিন রফিকুল বলল- আচ্ছা নেলীকে আমাদের সাথে রাখলে কেমন হয়? ওর থাকারও একটা জায়গা হল, আর বাচ্চাদের পড়াতেও পারলো, সেইসাথে তোমাকেও কাজে সাহায্য করলো। ভেবে দেখলাম,খারাপ হয় না।
 
নেলী চলে আসলো আমাদের সাথে থাকার জন্য।বাচ্চারা নেলী আন্টী বলতেই পাগল। নেলী কাজের চেয়ে অন্যদিকে মন দিতো বেশী। হয়তো নতুন কোনো রান্না করছে চায়নিজ আইটেম, আমার বাচ্চারা আর স্বামী সেগুলো খুব তৃপ্তি সহকারে খাচ্ছে। নেলীর চুল সামনে থেকে ছোট করে কাটা থাকতো, নানা ঢঙে সে চুল বাঁধতো, চুড়িদার সালোয়ার পরতো, সবসময় পরিপাটি।
 
আর আমি ভোরে উঠে বাসার সবার জন্য নাস্তা, দুপুরের রান্না, আরো ঘরের কাজবাজ শেষ করে তাড়াহুড়ো করে পার্লারে দৌঁড়াতাম। মাথার চুলের, জামাকাপড়ের কোনো ঠিক নেই। আমার অনেক নিয়মিত কাস্টমার এসে আমাকে খুঁজতো, তারা আমার কাছেই কাজ করাতে চাইতো। সাথে আরেকটা মেয়ে থাকতো। নেলী মাঝেমাঝেই কাজ ফাঁকি দেয়া শুরু করলো। শরীর খারাপ বা পড়ালেখার ছুঁতোয়। রফিকুলকেও দেখতাম প্রায়ই অফিস থেকে তাড়াতাড়ি বাসায় চলে আসছে। নেলীর শরীর কেমন বা পড়ালেখা কেমন চলছে তার খোঁজ নেয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়তো। আমি অবাক হয়ে যেতাম। দীর্ঘ এতোদিনের সংসারে আমার স্বামী কখনো আমার শরীর খারাপ হলে জিজ্ঞেস করা বা যত্ন করা তো দূরে থাক, একটু কপালে হাত ছুঁয়ে জ্বরটা দেখেনি কখনো। সংসারের সচ্ছলতা আনতে গিয়ে কখন যে আমার সংসারটাই আমার কাছ থেকে দূরে চলে যাচ্ছিলো, আমি টের-ই পাইনি। যখন পেলাম, তখন অনেক দেরী হয়ে গেছে।
 
রফিকুলকে একদিন সরাসরি জিজ্ঞেস করলাম- বাইরে কি শুনি? সবাই কি বলে এসব? রফিকুল নিরুত্তর। কয়েকদিন পরে উনি বললেন- আমি আর তোমার সাথে থাকতে পারছিনা, নেলী রাগ হচ্ছে, মন খারাপ করছে। তুমি বাইরে যা শুনেছ,সব সত্যি। আমি তোমাকে অনেক ভালবাসার চেষ্টা করেছি বিয়ের পর থেকে,কিন্তু মন থেকে পারিনি। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও। এরপরও আমি কয়েকদিন চেষ্টা করলাম কিন্তু পারলাম না। পিছনে ফেলে রেখে আসলাম আমার তের বছরের সংসার, আমার ছেলে মেয়ে, আমার সবকিছু, নাহ আমি আমার বাচ্চাদুটোকেও আনতে পারিনি, রফিকুল আনতে দেয়নি।
 
প্রায় পাঁচ বছর হতে চলল। আমার মেয়ে এবার ক্লাস নাইনে, আর ছেলেটা ক্লাস ফাইভে। আমি অত পড়ালেখা করিনি বলে একটা এন জি ওতে ছোট একটা চাকরী নিয়েছি। কোন মতে চলে যাচ্ছে। বাসা থেকে আবার ছেলে দেখছে, কারন আমি আমার বড়ভাইয়ের সংসারে আছি, সাথে আমার প্যারালাইজড মা। আমার বড়ভাই মেডিকেল কলেজের প্যাথলজী ল্যাবের টেকনিশিয়ান, নিজের সংসার চালাচ্ছেন সেই সাথে মার আর আমার দায়িত্ব নিতে যেয়ে উনি হিমশিম খেয়ে যান, ছেলেমেয়েরাও বড় হচ্ছে, পড়ালেখার খরচ বাড়ছে। অন্য দুই ভাই ওতো খোঁজখবর নেন না আমার। বড়ভাইয়ের একটাই চিন্তা, শেষ বয়সে আমাকে কে দেখবে?
 
ইদানীং এক ভদ্রলোক আমাকে প্রায়ই কল করেন। আমার বড় ভাইয়ের পরিচিত বন্ধুমানুষ। দাড়ি আছে, সবসময় জর্দা দিয়ে পান খান, কাঁচাপাকা চুল। ওনার স্ত্রী ও ফুপাতো ভাইয়ের সাথে ঘর ছেড়েছে। বাসায় প্রায়ই এসে সোফায় ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকেন, আমার সাথে কথা বলতে চান।
 
 
 
অধিকাংশ সময়ই আমার বড় ভাবী না হয় বাচ্চারা যেয়ে গল্প করে। ভাবী দু এক সময় জোর করে আমাকে পাঠান। বিশ্বাস করেন, উনি যখন কথা বলেন, আমি ওনার ভিতর অন্য কাউকে খুঁজি, আগের কেউ…উনি আমাকে অনেক আশা দেখান, সংসারের আশা। বলেন- ওনার দুই ভাই ,এক বোন,মা। এদেরকে আমি যেয়ে আবার মানুষ করা শুরু করবো, ওনার মাকে দেখবো। আমি মনে মনে হাসি। একটা জীবনে কতজনকে ভালোবাসবো আমি, কয়জনের সংসারের হাল ধরবো আমি? নাহ এখন আমি অনেক ক্লান্ত, আমার সেই সাহস বা বয়স কোনটাই আর নেই।
 
একটা জীবন, চলার পথে কত মানুষের সাথে দেখা হয়ে গেলো, নিজের কষ্ট সেই সাথে তাদের দুঃখ-কষ্টও যোগ হয়। জীবন স্রোত থেমে থাকে না, সবসময়ই বহমান। মানুষগুলো হয়তো হারিয়ে যায়, তাদের সাথে হয়তো শেষ পর্যন্ত পথ চলাও হয়না কিন্তু সবার এই সুখ-দুঃখের কাহিনী নিয়ে শেষ পর্যন্ত বয়ে চলে নিজের আত্মাটা, সেই একমাত্র সাথে থাকে, একমাত্র সঙ্গী। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করি, ঝিমুনির মতো আসে, শেষ বিকেলের কুসুম রঙা রোদ এসে পড়ে আমার মুখটায়, চলন্ত গাড়ির বাতাসে আমার ক্লান্তি আরো বাড়ে।
 
ভালো কথা,আমি তো আমার নামটাই বলিনি। আমার নাম রেহানা, দীর্ঘ তেরোটা বছর আমাকে কেউ ডাকতো “রেনু” বলে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত