| 22 মে 2024
Categories
এই দিনে গল্প সাহিত্য

ট্রিভিউ

আনুমানিক পঠনকাল: 20 মিনিট

আজ ১৫ মে কবি, কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক পীযূষকান্তি বিশ্বাসের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


অতঃপর, সমস্ত করোনা আক্রান্ত রোগী বেঁচে উঠলেন।  হু ঘোষণা দিলেন,  পৃথিবীর আটশত কোটি মানুষ এখন করোনা মুক্ত। যেন একটা গোটা বিশ্বযুদ্ধের বিজয় ঘোষণা। পৃথিবীর সমস্ত রাষ্ট্রে, মায় সমাজতন্ত্র, ধনতন্ত্রের, পুঁজিবাদী, মেহনতি মানুষদের হয়ে মানবতার জয়। হিন্দু মুসলিম ধনী গরীব সবার জন্য করোনার টেস্ট ফ্রি। একটা অধ্যায় সমাপ্ত হলো। করোনা ছিলো মানবজাতির জন্য জীবন মরণের লড়াই। জীবিতদের জন্য এক বিভীষিকা! অথচ করোনা ভাইরাস নিজেই ছিলেন মৃত।  জড়। প্রকৃতির এ কি খেয়াল? সমস্ত জড়ের কি এটাই অভিলাষ যে একদিন প্রাণ হবে  সে?  করোনা ভাইরাস নিজেও বেঁচে উঠতে চায়। তার শরীর চাই। এই হলো সৃষ্টির আদি রহস্য! মৃত শরীর নিয়েও ভাইরাস রিপ্লিকেট হতে চায়। আর যদি সে প্রাণী শ্রেষ্ঠ  মানব মাংসের গন্ধ পায়  তবে তো কথাই নেই।  হাউমাউখাউ নিয়ে সে ঝাঁপিয়ে পড়বেই জীবের রক্তে, নাকে, মুখে, ফুসফুসে।  কিন্তু আজকাল কি হচ্ছে, মনুষ্য রক্তে কি যেন একটা ভেজাল মেশানো হচ্ছে। সেই সমস্তই করোনা ভাইরাসের অজানা। মনুষ্য চিকিৎসাবিদ্যায় অনেকে একে প্রতিষেধক বলেন। মানুষের কোন অঙ্গেই আক্রমণ করে করোনা ভাইরাস সুবিধা করে উঠতে পারছেন না। ভ্যাক্সিনের চোটে মানুষের নাক, কান, কণ্ঠ, রক্ত , মাংস এখন করোনার কাছেই বিভীষিকা হয়ে দাঁড়িয়েছে।  অতএব এহেন মানব শরীর, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ  করোনার সারভাইভালের জন্য যখন ফুলস্টপ হয়ে দাঁড়ালো, করোনাকুলে স্লোগান উঠলো-লেটস গো ভেজিটেরিয়ান।

ঘাস পাতা ফুল ফল নিয়ে গাছেদের জীবন চলে যায়। গাছের গায়ে লোহিত-কণিকা নেই। প্রাণ আছে, তবুও প্রাণ নেই। মানে শাস্ত্রমতে তাঁকে কেটে রান্না করে খেলে,পণ্ডিতের জাত যায় না। গাছ বড়ই নিরীহ। গলায় পোঁচ মেরে কেটে ফেললেও  মরে যাবার আগে বেশী ছটফট করে না। গাছ জামা জুতো টাই পরে না।  সে বিদেশে যায় না। তার ব্যাংক ব্যাল্যান্স নেই , বড় গাড়ি চড়া তার শখ নেই, তবে একবার অক্কা পেলে তাঁকে মানুষ ট্রাক ভরে দেশবিদেশ নিয়ে যায়, করাত দিয়ে চেরাই করে ঘরবাড়ি বানায়। কেউ কেউ দুর্গন্ধ ও বিষাক্ত বার্নিশ ও চিপকে দেন। গাছ সেসব মেহসুস করেন না। এহেন গাছ শরীরে, করোনা এসে বাসা বেঁধে ফেললেন। কিন্তু বাসা তো বেঁধেছেন কিন্তু বুঝেই উঠে পারছে না গাছের এর নাক কোনটা, মুখ কোনটা, কোনটা ফুসফুস। গাছ মাস্ক পরে না। গাছ হাত মেলায় না। গায়ে ঠাসাঠাসি করে বিমানযাত্রা করে না। তবে  একটা জিনিস পরিষ্কার, গাছ প্রকৃতির নিয়ম মেনে চলেন।  সারভাইভাল ও ফিটেস্টের প্রতিযোগিতায় বেঁচে আছেন। মানুষের সঙ্গে সঙ্গে তার টিকে থাকার লড়াই। আর যেখানে মনুষ্যপ্রজাতি নিজেই তার বিপরীতে দাঁড়িয়ে,তাই উক্ত লড়াইটা বেশ টক্করের।

গাছ বলুন, ঘাস বলুন বা করোনা ভাইরাস বলুন, সৃষ্টির জগতে যখন এসেছেন,  এই পৃথিবীর মাটি বায়ু জলের সমান অধিকার থাকে তার।  যতটা সে আকাশের, ততটাই সে ভূমির। যতটা সে এসিডের, ততটা সে  ক্ষারের। সেইভাবে প্রোটিন, কার্বোহাইড্রেট বা ফ্যাট। এই হলো সহাবস্থান। যেভাবে মানুষ ও গাছ নিজের নিজের জায়গা করে নিয়েছে। জলবায়ুর সমান অধিকার নিয়ে এইভাবে গাছের শরীরে করোনা নিজের সংক্রমণ ঘটিয়ে নিলো। যথারীতি, গাছ সেটা বুঝতে পারলেন না। কোন কাশি বা হাঁচছি, কিছুই হচ্ছে না যদিও। রোগের কোন লক্ষণ নেই।  মাঝে মধ্যে দুএকটি পাতা শুকিয়ে আসে। একটা দুটো গাছ পাতা ঝরিয়ে এই অকালে শুকিয়েও গেছেন। সে তো আগেও শুকিয়ে যেতেন। কিন্তু কিছু মানুষ তা সন্দেহ করলেন, যে গাছের করোনা হতে পারে। কিছু পাগল প্রকৃতি-প্রেমী আছেন, বনে জঙ্গলে প্রজাপতি ধরে বেড়ান সেই রকম কিছু লোক।  কিছু খবরের কাগজের রিপোর্টার এ নিয়ে লেখালেখি করলেন। কেউ ব্লগ লিখলেন। কেউ খবরের কাগজে।  তা পড়ে আম-জনতা হাসাহাসি করলেন, খিল্লি উড়ালেন।  কোন এক জাঁদরেল কবি এই খবরকে মীম বানিয়ে কবিতা লিখলেন ফেসবুকে। আর যেহেতু কবি বক্তব্য রেখেছেন, কবিতাটি ভাইরাল হলো। হাজার খানেক কামেন্টসও পেলেন। গাছকে নিয়ে গান বেঁধে, হারমোনিয়াম বাজিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গর্বিত পিতামাতার সামনে এই প্রথম বার ফেসবুকে লাইভ গান গাইলেন বঙ্গ-ললনা।

গাছ এসব দেখেন নি। জানেন না। গাছের ফেসবুক নেই। লোকালয়ে তাদের বেশী দেখা যায় না। মনুষ্য-প্রজাতি, গাছকে কেটে চেরাই করে, নিজস্ব শ্রেষ্ঠতার প্রমাণ দিয়েছে। মানুষের বড় বড় অট্টালিকা। গাছ, তবুও নিজস্ব জীবনচক্রে মহীয়ান। এমনিতেই গাছ খুব সহনশীল ও তার ইমমিউন পাওয়ারও যথেষ্ট। পাতা ঝরে যায় তবু মরে যান না। জ্বরজাড়ি হলে কোন প্যারাসিটামল বা এন্টিবায়োটিক ছাড়াই গাছ উঠে দাঁড়ান। কিন্তু সমস্যা হলো অন্য কোথাও। অট্টালিকার  ব্যালকনিতে, শিশু পার্কে, অফিসের লনে,  মুঘল গার্ডেনে যে ফুলের বাগানে আছে, তাতে হঠাৎ করেই একদিন লক্ষ্য করা গেলো ব্যাপারটা। গাছে ফুল নেই। পাতাবাহারি গাছে কিছু রংরেরং দেখা যায়, কিন্তু সবুজের মাঝে যে হলুদ, লালা, বেগুনী ফুলগুলি দেখা যেতো, সেই ফুলগুলি আর ফুটলো না।

তো, ফুল না ফুটলে কি হয়?  তাতে মানুষের আর কি এসে যায়?  বাগিচায় ফুল ফুটুক বা না ফুটুক, বসন্ত আসুক বা না আসুক, মানুষ দিব্যি সোশাল মিডিয়ার ফুল ছাড়া ভারচুয়াল দিন কাটাচ্ছে।  ফুলের কি কাজ? ফুল করতেই বা কি পারে?  সমস্যা হলো অন্য কোথাও।  বাগিচার মালী কে নিয়ে। যে গাছ, গুল্মলতা, ঘাস পাতা ঝেড়ে-পুছে , জলদিয়ে, নিংড়ানি দিয়ে, সার দিয়ে, বাগিচা মেইনটেইন করে রাখতেন। মালী গরীব মানুষ। গ্রাম থেকে শহরে অন্নের সন্ধানে এসেছেন। দিন আনেন দিন খান। গাছে ফুল না আসাতে সোসাইটির প্রেসিডেন্ট তাঁকে ডেকে পাঠালেন। এমনিতেই রিসেশনের মার্কেট। বাজার মন্দা। মালীকে বেদম বকাবকি করে তাড়িয়ে দিলেন। মালীর নিজের কর্মক্ষমতায় কোন গাফিলতি নেই, দিনরাত তিনি শ্রম দিয়েছে। তাঁর কী দোষ? রাগে, ক্ষোভে,  মালী কাঁদতে কাঁদতে অভিশাপ দিলেন, যেন পৃথিবীর সমস্ত ফুল শুকিয়ে যায়। কোন গাছে যেন ফুল না ধরে।

ধেঁড়ের অভিশাপে গাঙ শুঁকায় নাকি? সোসাইটির কমিটির স্বেচ্ছাসেবীগণ পড়াশোনা করা লোক, তারা সে কথা জানেন। ইন্ড্রস্ট্রিয়ালিস্ট, আর্মি অফিসার, দেশনেতা, লেকচারার, কোর্টের উকিলদের অনেকেই এখানে থাকেন। তারা ইমারজেন্সি বুঝে,  চাঁদা তুলে একটি ফান্ড তৈরি করলেন। টেলিফোন কোম্পানির চেয়ারম্যান ও হিন্দি সিনেমার এক অভিনেতা দিলেন মোটা টাকার ডোনেশন। ফান্ডের সাহায্যে  বিদেশ থেকে আনা হলো কীটনাশক ও অত্যাধুনিক রাসায়নিক ফার্টিলাইজার। সমাজসেবা হবে বলে সোসাইটির মহিলাসমিতিও যোগদিলেন এই মুহিমে। নিয়ম করে প্রতিদিন গাছে জল দেবার দায়িত্ব নিলেন। কয়েকদিনের ভিতর গাছ ডালপালায় কলেবরে বৃদ্ধি পেলো, সবুজ থেকে সবুজতর হলো।  কিন্তু বাগিচায় ফুল ফুটলো না।

সোসাইটিতে একজন সরকারী কৃষি বিজ্ঞানী থাকেন, তিনি চাঁদা দেওয়া নেওয়াতে বিশ্বাস করেন না। একটু আন-সোশ্যালও বটে। কিন্তু যেহেতু পরিস্থিতি ডিম্যান্ড করছে, তাঁকে ডাকা হলো। সিচুয়েশন পরীক্ষা করে তিনি হাত নাড়ালেন। মাথা চুলকালেন। ইন্সট্রুমেন্টে রিডিং নিলেন। কিন্তু কিছু বুঝতে পারলেন না। সবই ঠিক আছে , এসিড ক্ষার পরিমাণ মতো! সূর্যের আলো পর্যাপ্ত। মাটি ঠিক আছে। বাগিচায় তবু ফুল ফোটে না। বিজ্ঞানীর এই ব্যর্থতার খবর হোয়াটস এপ, ফেসবুক ইন্সটাগ্রামে হিল্লি দিল্লি লন্ডন হয়ে আমেরিকা পৌঁছে গেলো। আমেরিকান নাগরিকেরাও সেখান থেকেও একরকম নানা রকম মুখরোচক খবরাখবর ফেসবুক, ইউটিউবে ছড়িয়ে দিলেন। স্টার আনন্দ, জি নিউজ, আজকাল, এনডিটিভিতে ঘটা করে এই খবর নিয়ে, তাদের দায় দায়িত্ব নিয়ে ২৪ ঘণ্টা ডিবেট চালালেন। বুদ্ধিজীবীরা সমস্ত বুদ্ধি উজাড় করে দিলেন। কিন্তু তাতেও ফুল ফুটলো না।

এই সমস্ত খবরাখবর, আটকে থাকে না। দূর গ্রামে মালীর বাড়িতে পৌঁছালো। মালী খুব আহ্লাদিত। তার অভিশাপে গাঙ শুকিয়ে গেছে।  পৃথিবীর সমস্ত বাগিচা থেকে থেকে ফুল উধাও। সমস্ত গ্রামের মানুষ আহ্লাদিত। পুলকিত।  তাদের মনে মনে একটা প্রতিশোধ নেওয়ার ইচ্ছা ছিলো। সোসাইটির মহানুভব মালিক শ্রেণী এইবার জব্দ হলো। তাদের মুখে মুগুর দেওয়া হলো। গ্রামে হৈ হৈ পড়ে গেলো। মালী যথারীতি হিরোর মর্যাদা পাচ্ছেন। মেহনতি মানুষ জেগে উঠেছে।  বড়লোকদের খুব টাইট দেওয়া গেলো।  বন্ধ্যা গাছ আর পুষ্পহীন বাগিচার নিঃসহায়তা দেখে মানুষ আবার হাসাহাসি করলো । রাস্ট্রপতিভবন থেকেও ফুল উধাও ,  ফুলশয্যাতে ফুল নেই ! জন্মদিনে কেউ ফুল দিলো না , পিতার কবরেও কেউ ফুল নিয়ে এলো না । বঙ্গ-গীতিকার গান বাঁধলেন, দোতারা বাজিয়ে গান গাইলেন  “বড়লোকের বিটি-লো লম্বালম্বা চুল, এমন খোপা বেঁধে দেবো লাল গেন্দা ফুল “ ।

চিরদিন কাহারো সমান নাহি যায় । আর দিন পেরিয়ে মাস আসে । গাছের অবস্থা একটু একটু করে অবনতির দিকে  যেতে থাকে ।  ধান ক্ষেতে ধান গাছ হলো, পাতা হলো , শিষ বের হলো না ।  ধান হলো না । গম ক্ষেতে গমের ঐ এক অবস্থা ।  শর্ষে গাছে শর্ষে হলো না । কৃষক হাও হাও করে উঠলেন । ফড়ে হাওহাও করলেন । আড়তদার হাওহাও করলেন । বিগবাজারএর মাথায় হাত ।  ফুড চেইন কখন যে ব্রেক হয়ে যায় । কে কাকে বাঁচায় ।  কেউ বললো, কৃষিমন্ত্রী একটা গর্দভ । কী করছেন ? কেউ বললেন পরিবেশ-মন্ত্রী এর জন্য দায়ী । ফেসবুক উত্তাল । টুইটার উত্তাল । কেউ বললেন,   প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী পরস্পরের সঙ্গে  রাজনীতি করছেন । কেন্দ্র বলুন আর রাজ্য বলুন, সমস্ত সরকার অপদার্থ । দলে দলে মানুষ পথে নামলেন । গ্রামে গ্রামে, শহরে শহরে মানুষের ঢল । এত-বড় মিছিল মানব ইতিহাসে কখোনো দেখা যায় নি । সরকার বেগতিক দেখে আইন করে এতো মানুষের মিছিল করা বন্ধ করে দিলেন । মানুষও ক্ষেপে গিয়ে সরকারকে উৎখাত করার জন্য বদ্ধপরিকর হলেন । রাজধানী ঘেরাও করা হবে । মহাবিচার হবে । জনতার সামনে তাদের জবাব দিতে হবে ।  প্রত্যেক রাষ্ট্রের ঐ একই ছবি । বিনা রক্তপাতে মানব ইতিহাসে  বিশাল বিপ্লব হয়ে গেলো । কিন্তু মানুষের খাদ্য-সংকটে, ফসল ঘরে এলো না । পৃথিবী একটা খাদ্য সংকটের মুখোমুখী । এই চরম অরাজকতা ।

মানুষ পারেনা এমন কিছু নেই ।  মানুষই সৃষ্টি করে । নিজের সৃষ্টিকর্তাকে সে নিজেই লিখতে পারেন । লেখক চাইলে যেমন ধানকে গম আর গম কে ধান লিখতে পারেন ।  তেমন করোনা কে ফুল আর ফুলকে করোনা দিয়ে রিপ্লেস করতে পারেন । জনমত বলে কোন লজিক হয় না । এখন বিপ্লব যখন ঘটেই গেছে, বিপ্লবের একটা পরিণাম সমগ্র জাতি জানতে চায় । সেইমতো, রাজধানীর রামলীলা ময়দানে বিপ্লবী-নেতা, বিপ্লবী জনতা, সামরিক অধিকারী, ও নানান বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে একটা আপাত-কালীন বিচারসভা বসিয়েছেন। মহাবিচার সভা । হবে মহাবিচার । দলে দলে লোকজন একেট্টা হতে লাগলেন । মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে খবরটা । লোকে লোকারণ্য । এইরকম বিচার মানব ইতিহাসে হয়নি ।  সেই মত সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি, বাই-ডিফল্ট তার জাজ নিযুক্ত হলেন । বিচারপতি, মানুষের জন্য , তিনি স্বীকার করে নিলেন দায়িত্বটা ।  উনি সমস্ত উকিলকে এড্রেস করে নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে দিলেন, এটাই হবে তার জীবনের শেষ বিচার ।  সুপার-ফাস্ট ট্রায়াল হবে । প্রধান বিচারপতি  বললেন  “আমি কেসটি – আমি গ্রাস-রুট লেভেল থেকে কেস শুনতে চাই, এখানেই শুনবাই হবে, এখানেই তার ফয়সালা দেবো, এখানেই সর্বজনসমক্ষে হবে অপরাধীর শাস্তি “ ।

দূর দূর থেকে জনতা এসেছে । এই রকম নয় তারা আইনকানুন জানেন । কিন্তু ঘটনাটা বহুদিন ধরে চায়ের দোকানে, বিয়ে পার্টিতে, ফেসবুকে, বিভিন্ন বইমেলায় ও কবিসম্মেলেনে আলোচিত হচ্ছে । দেশের সমস্যা সমাধানে এতো চিন্তিত জনতা আগে দেখা যায়নি ।  জনতার ভিতর কোলাহলঃ এখানে অপরাধী কে, কী অপরাধ , কে বাদী, কে বিবাদী কিছুই পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না । অনেক সরকারী কর্মচারী, ম্যাজিস্ট্রেট, মন্ত্রীসভার অনেককেই বিচারসভায় দেখা যাচ্ছে । দক্ষিনপূর্বে বুদ্ধিজীবীদের উপস্থিতিও দেখা যাচ্ছে । উত্তরপশ্চিমে মন্ত্রীসভার অনেককে দেখা যাচ্ছে । প্রধানমন্ত্রী এসেছেন, বাগানের মালীকে দেখা যায়, বিজ্ঞানীও চুপিসারে কানে মাইক্রোফোন লাগিয়ে কিছু শুনছেন ।  সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় হাজির জনতা । হাজারে হাজারে জনতা এসেছে । সময় বয়ে যায় । প্রধান বিচারপতির ইশারায় কালবিলম্ব না করে প্রোসেডিং শুরু হলো ।

উকিল-১ উঠে দাঁড়ালেন – উচুস্বরে বললেন –  “কেসটা ফুল না ফোটার,  গাছে ফুল না ফোটার জন্য বাই-ডিফল্ট প্রধানমন্ত্রী দায়ী । উনিই পার্লামেন্টের প্রধান । তাই উনিই বিবাদী “  ।

জনতার ভিতর ফিসফিস । সবাই একটা মীমাংসা চায় ।  অনেকেই ঘাড় নাড়লেন, অনেকেই চুপ রয়ে গেলেন । এতে দেখা গেলো প্রধান বিচারপতিরও সায় রয়েছে । বুদ্ধিজীবীদেরও সায় রয়েছে । সুতরাং প্রধানমন্ত্রীকে কাঠগড়ায় তুলতেই হলো । বাব-বিবাদ শুরু হলো ।

উকিল-১ বলে চললেন –  মি লর্ড, দেশে ফুল না ফোটার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীই দায়ী করি , উনিই এই দেশের কার্যকরী হেড ।  মুখ্যমন্ত্রীদের যদিও কিছু কিছু দায় থাকছে তবু আমি বলবো প্রধানমন্ত্রী মূল ঘটনার জন্য দায়ী । তাঁকে সময় মতো একশন নেওয়া উচিত ছিলো  । 

বলে থামলেন । বিবাদী পক্ষের উকিল নিশ্চয় কিছু ক্রস দেবেন । জনতা তা শোনার জন্য অধীর আগ্রহে কান পেতে রয়েছেন । কিন্তু কেউ কিছু বলছেন না । প্রধানমন্ত্রীর পক্ষের কোন উকিলই মজুদ নেই । কোর্টে শূন্যতা  , রামলীলা ময়দান থমকে দাঁড়িয়েছে ।  লাল-কিলায় তিরঙ্গা তার ওড়া বন্ধ । পুরো দিল্লি  শুনতে চাইছেন, কি তার জবাব । প্রধান বিচারপতি বললেন :  কেউ আছেন প্রধানমন্ত্রীর হয়ে বলার ?   এমনিতে কোটি কোটি জনতা প্রধানমন্ত্রীর টুইট কে রি-টুইট করেন, কিন্তু আজ তার সপক্ষে কেউ কথা বলতে চাইলেন না ।

উকিল ২: সমস্যাটা আমাদের সবার, আর আজকের এই বিচারসভাও  যেহেতু কনভেনশনাল বিচারসভা নয়, তাই অনুরোধ থাকবে, সবাই যেন সবাই কে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে প্রশ্ন করতে পারেন ।

উকিল-১ :  অবজেকশন মাই লর্ড । এটা কোর্ট ।  জিনিসটা ডিবেটের মতো হয়ে যাচ্ছে ।

প্রধান বিচারপতি:  অবজেকশন ওভাররুলড । বাদ-বিবাদ শুরু করা যায় ।

প্রধানমন্ত্রী :  আমাকে দোষ দেবেন, দিন, ফাঁসি দেবেন,  দিন । জনতাই জনার্দন । কিন্তু তার আগে জানতে চাই যার অভিশাপে পৃথিবী বন্ধ্যা হয়ে গেলো , তার কি কোন দোষ নেই , আপনারা তাঁকে কেন প্রশ্ন করছেন না ?

প্রধান বিচারপতি, ভ্রূ কুচকে দেখলেন আত্নপ্রত্যয়ী প্রধানমন্ত্রীকে । প্রধানমন্ত্রীকে তো একটা সুযোগ দিতেই হয়।  মালীর অভিশাপে ফুল ফোটা বন্ধ হয়েছে জনশ্রুতিতে তা শুনেছেন আগেই । তাঁকে একবার ডাকা উচিত । প্রধান বিচারপতি, মালীকে কোর্টে হাজির করার নির্দেশ দিলেন । মালী কাঠগড়ায় এসে দাঁড়ালেন ।

উকিল-২  :-  আপনিই সে মালী ? আপনি কেন এমন ফুল না ফোটার অভিশাপ দিলেন, আপনি কি পৃথিবীর এই ভয়াবহ খাদ্য-সংকটের কথা জানতেন না  ? ফুল না ফুটলে ধান কি করে হবে ?     

মালী  :  সাব হাম বহোত গরীব আদমি হে । হামকো সোসাইটির মেম্বারলোগ রেগেমেগে তাড়িয়ে দিলেন । হামার বাড়িতে ছোটা ছোটা বাচ্চা হে সাব , হামি কি খাবো ? রাগে দুঃখে অপমানে অজান্তেই মুখ থেকে অভিশাপ বেরিয়ে গেলো ।  এতে হামার কোন ভি দোষ নাই ।

প্রধান বিচারপতি  :  ফুল না ফোটার সঙ্গে খাদ্য-সঙ্কটের কি সম্পর্ক ? এতো বোঝা গেল না ।  একজন বিজ্ঞানীকে ডাকা হোক , এই সংকটের একটা সমাধান আজই চাই, উই ডোন্ট হ্যাভ টাইম, ফাস্ট ।

বিজ্ঞানী মজুদ দিলেন, তিনি এলেন কাঠগড়ায় । দীর্ঘ লকডডাউনে তার চুল লম্বা লম্বা, মুখে দাড়ি ভর্তি । স্নানও করেন নি বোধহয়। চোখে উদাসী দৃষ্টি । এদিক ওদিক তাকিয়ে একটা নিঃশ্বাস নিয়ে দাঁড়ালেন । বললেনঃ   যাহা বলিব, সত্য বলিব  ।  জেরা শুরু হলো ।

উকিল-২  :  আপনি উচ্চঅট্টালিকার সোসাইটিতে থাকেন । এ কেমনতর সোসাইটি ?  একজন মালীকে রিক্রুইট করে তাকে কন্টিনিউ করতে পারেন না । তাকে চাকরি থেকে বহিষ্কার না করলে তো সে এই অভিশাপটা দিতো না ।  আর পৃথিবীতে এমন খাদ্যের আকাল এসে পৌঁছাতো না   ?

বিজ্ঞানী:  কিসের অভিশাপ ? কি কথা বলছেন আপনারা ?  অভিশাপ বলে কিছু হয় না । কোর্টে এইসব গাঁজাখুরি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করার জন্য কেন ডেকেছেন?  কোন ক্রিমিনাল  কেস হলে ডাকবেন । যত্তসব ।

কারো কাছে কোন আর প্রশ্ন নেই । কেউ বুঝতে পারছে না , কি হচ্ছে । জনতা ফিসফিস করলেন ।  একে অপরকে জিজ্ঞাসা করলেন ।  তাহলে দোষী কে ? কে অপরাধী ? কী অপরাধ ?  উকিলরাও কনফিউজড । বুদ্ধিজীবীদের কাছে প্রশ্ন নেই । কাকে কী প্রশ্ন করা যায় ? কোন কেসই বানানো যাচ্ছেনা । কে লিড নেবেন ? প্রধান বিচারপতির আজই সমাধান চাই । কথা দিয়েছেন তিনি ।

প্রধান বিচারপতি:   ফুল ফুটছে না, সে ঠিক আছে, কিন্তু  গাছ কি করে বেঁচে আছে ?

বিজ্ঞানী:  সে আপনি গাছকে জিজ্ঞাসা করেন  ।

উকিল-৩ :   কিন্তু আপনি তো কৃষি বিজ্ঞানী, উত্তরটা আপনারই দেবার কথা   ।

বিজ্ঞানী:  আমি বিজ্ঞানী,  চিকিৎসক নই ?  ।

উকিল-৪ :   মানে ?  আপনি তো কৃষি বিজ্ঞানী ।  গাছের চিকিৎসক তো আপনারই হওয়ার কথা ?

বিজ্ঞানী:   গাছের করোনা হয়েছে   ।

উকিল-১, উকিল-২, উকিল-৩, উকিল-৪ হেসে উঠলেন । বুদ্ধিজীবী, প্রধানমন্ত্রী, মালী  সবাই -হেসে উঠলেন । জনতার ভিতর হাসাহাসি । হো হো হো , হি হি হি চলতে থাকলো । প্রধান বিচারপতি হাতুড়ি পিটে বললেন-  অর্ডার, অর্ডার, গাছকে কোর্টে ডাকা হোক  , গাছকে বিবাদি করো  ।

এক মুহূর্তের জন্য রামলীলা ময়দান থমকে দাঁড়ালো । প্রধান বিচারপতি কি বলছেন ? প্রধান বিচারপতির এইরূপ মানুষ আগে দেখেনি । এতো ডেস্পারেট, এতো আগ্রেসিভ ।  একটা গাছকে কোর্টে তোলা হবে । পৃথিবীর ইতিহাসে এই প্রথম কোন গাছে কোর্টে আসবেন । গাছ কোনদিনই কোর্টে আসে না ।  মানুষের এই সমস্ত সাতপ্যাঁচ রাজনীতিতে রুচি রাখে না । কিন্তু আজ পৃথিবীর অসুখ । এই এতকাল মনুষ্যজাতির সঙ্গে পৃথিবীর সুখেদুঃখে তাদের জীবন কেটেছে। মানুষ  নিজেই মানুষের পাশে দাঁড়ায় না, কিন্তু একজন গাছ হয়ে সে এইরকম কথা কি করে বলতে পারে ?  গাছ কোর্টে জবান দিতে এলো । জেরা শুরু হলো একেবারে গোড়া থেকে ।

উকিল-২:  আপনার নাম ?

গাছ:   গাছ  ।

উকিল-২:  গাছ কী ?  কোন সারনেম তো আছে ?  কোন জাত , গোত্র, পদবী ?

গাছ:  জাত নেই  ।

উকিল-২:   ঠিকানা আছে ? মানে কোথায় থাকেন ?

গাছ:  ঠিকানা করিনি, ঘর বাড়ি নেই । কেন ডেকেছেন বলুন । প্রশ্ন কী ?  

উকিল-৩:  আপনি বেঁচে কি করে আছেন ? অথচ ফুল হচ্ছে না কেন ?  ধান হচ্ছে না  কেন ?  বিজ্ঞানী বলছেন যে আপনার করোনা হয়েছে ।  আর আপনি বিনা প্রোটেকশনে এতো লোকের সামনে এসেছেন , মাস্ক পরে আসেন নি কেন ?

গাছ:  মাস্ক ?  হাসালেন । আপনারা মনুষ্যজাতি, আপনাদের ঐ হলো  এক সমস্যা । কি প্রয়োজন, কি প্রশ্ন, কি  বিষয়, আর আসল মুদ্দা কী – তার কিছুই আপনাদের ঠিক নেই ।

উকিল-৩:  যা জিজ্ঞাসা করছি, তার উত্তর দিন । আপনার করোনা হয়েছে – কি হয়নি ?  ইয়েস ওর নো ?

গাছ:   আমার করোনা টেস্ট  হয়নি । ইনফ্যান্ট আমাদের ভিতর কেউ ডাক্তারও নেই । টেস্ট কিটসও নেই,  তা ছাড়া  আমাদের কেউ প্রধানমন্ত্রীও নেই যে তাঁকে দোষারোপ করতে পারি । 

উকিল-৫:  আপনার গলায় ব্যথা আছে ? নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয় ? 

গাছ:  দেখুন আপনাদেরকে ক্লিয়ার করে দিই । মনুষ্য-প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী আমাদের শারীরবৃত্ত নয় । এই যে আমাকে দেখছেন ভালো করে  ? আমি গাছ । আমি একক হয়েও অধিক ।  আমার কোন পদ নেই । ইউ জাস্ট ক্যান নট ডিফাইন মাই এনালগি । আই এম নট লিনিয়ার লাইক ইউ পিউপিল । আই এম জাস্ট এ ট্রি । জাস্ট ট্রি ।

উকিল- ১:  যা বলার সোজাসুজি বলুন । ডোন্ট ফুল দ্য কোর্ট ।  মানুষকে বোকা ভাববেন না । আই নো বেটার ইংলিশ দ্যান ইউ ।

গাছ:  দেখুন  ! এই শরীরটা দেখেছেন ?  আমি একরৈখিক নই । আমি একটি ট্রি । অর্থাৎ গাছ । এইযে আমার উপরের অংশ দেখেছেন, এইটা কাণ্ড, তার উপরে শাখা । শাখার আছে প্রশাখা । এর উপরে পাতা, ফুল, ফল । এক এক জন একটা লেভেলে আছেন । কান্ডের উপর লেভেল আছেন শাখা, শাখার উপর লেভেল আছেন প্রশাখা, প্রশাখার উপর লেভেলে আছেন পাতা, ফুল ফল । তেমনি মাটির নীচে মূল শিকড় থাকে ।  শিকড়ের প্রশাখা আছে, প্রশাখার আবার এক লেভেল নীচের প্রশাখা আছে  ।

উকিল- ৩:  লেভেল ? সেটা কী , সবই তো গাছের অঙ্গ ?  এসবের সঙ্গে আমাদের কেসের কি সম্পর্ক ?  

গাছ:   (একটু শ্বাস নিয়ে)  এখুন, লেভেল আপ হয়, ডাউন হয় । উপরে একজন থাকেন, নীচে অধিক ।  প্রত্যেক প্রশাখার ভাষা , কনটেক্সট, নেমিং কনভেনশন উপরের  শাখা লেভেলে  এসে ইন-ভ্যালিড হয়ে যায় । আবার এক প্রশাখার ভাষা অন্য প্রশাখার কাছে অবস্কিওরড ।  ব্ল্যাক বক্স । অর্থাৎ মিডিয়াম আলাদা । অর্থাৎ এক মিডিয়াম অন্য মিডিয়ামের সঙ্গে বার্তালাপ করতে পারে না । একে বলে ট্রিভিউ ।

উকিল- ২:   এতে , আমার প্রশ্নের জবাব হলো না । সোজা ভাষায় বলেন,  বাগিচায় ফুল কেন ফুটছে না ?

গাছ:  আমি উদ্ভিদ-বাস্তুতন্ত্রের এক প্রতিনিধি মাত্র । এর জবাবের জন্য আমাকে একটু উপর লেভেলে যেতে হবে । প্রশাখাকে জিজ্ঞাসা করতে হবে ? কারণ তিনিই পুষ্পের মুকুল ধারণ করেন , প্রশাখার বক্ষ থেকেই নতুন পল্লব প্রকাশিত হয় ।

উকিল- ২:  প্রশাখা আবার কি ? তাতে ফুল ফুটছে না । গাছ হিসাবে আপনাকে জবাবটদিহিটা করতেই হবে । দায়িত্ব থেকে সরে যেতে পারেন না ।

গাছ:  দেখুন, আগেই বলেছি, আপনাদের এই মনুষ্য-প্রদত্ত ডেফিনিশনে আমরা কাজ করি না । আমাদের নিজস্ব বোধবুদ্ধি আছে । সিস্টেম আছে । আমরাও টুয়েন্টি ফোর বাই সেভেন কাজ করি ।  আমাদেরও ঘুম পায় ।  সিনেমা দেখতে ইচ্ছে করে , ফেসবুকে স্ট্যাটাস দিয়ে গল্পগুজব করতে ইচ্ছে করে । কিন্তু আমরা মনুষ্য আবিষ্কৃত উদ্দাম বেহিসাবি বেপরোয়া যাপনকে জীবনের একমাত্র দর্শন বলে মনে করিনি ।

উকিল-৩:  এতো প্যাঁচাল পাড়ার কি আছে ? জানেন এইসব জবাবের জন্য আপনার জেল হতে পারে । নিজেকে কি মনে করেন ? একখানা ধারালো কুঠারের কাছে আপনার কি অওকাত ?

গাছ:  আমি উদ্ভিদ-বাস্তুতন্ত্রের প্রতিনিধি মাত্র । আমাকে আপনারা কি কুঠারাঘাত করতে ছেড়ে দেবেন ? আমার শিকড় কি আগেও আপনারা উপড়ে ফেলেন নি ? কবে আপনারা জানতে চেয়েছেন আমাদের কথা ? আমাদের অসহয়তার কথা জেনেই বা কি করবেন ? আপনাদের একমাস লকডাউনেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা । আজীবন লকড হয়ে থেকেছেন কখনো ? কি জানেন আমাদের মননের কথা ? কোনদিন জেনেছেন – শিকড়ের যৌন ইচ্ছে কি ? কিশোরী পল্লবের উড়ান ইচ্ছার কথা কিছু জানেন ?

প্রধান বিচারপতি:   এই বাদবিবাদ কোথাও যাচ্ছে না । অর্ডার অর্ডার । শাখা-প্রশাখাকে ডাকা হোক ।

গাছ: কি হবে তাদেরকে ডেকে ?  তারা ভার্চুয়াল । তারা এই মিডিয়ামে আসতে পারবেন না ।  আমার আত্মা ছাড়া তারা চলনহীন । আমার অভিলাষ ছাড়া তারা শুধুই ভার্চুয়াল । আমিই তাদের হোস্ট করি । তাছাড়া,  শাখা-প্রশাখাদের ভাষাও এনক্রিপটেড ।  সে ভাষা আপনারা বুঝবেন না ।

সবাই বুঝতে পারছেন , আলোচনা কোথাও যাচ্ছে না । উকিল হতাশ, প্রধান বিচারপতি হতাশ, সমাজের বিপ্লবীরা হতাশ । জনতার ভিতর আবার ফিসফিস । তারা একটা অন্ত চান । জানতে চান,  ধান গাছে ধান হবে কি , হবে না । ফসল ঘরে উঠবে কি উঠবে না । মানুষ খাবে কী ? জনতার ভিতরে কেউ একজন বললেন । তাহলে লেখককে ডাকা হোক। সেই তো সৃষ্টিকর্তা, সেই কাহিনীকার । গাছ পাতা প্রকৃতির ভাষা সে বোঝে, একজন মধ্যস্থতা করার জন্য দরকার । একজন সাহিত্যকার সেটা পারেন । কথাটা বিচারপতির কানে গেলো । ডাক পড়লো লেখকের । খাতা কলম বগোলে করে একজন লেখক হাজির হলেন বিচারসভায় । গাছের প্রশাখাকেও প্রথমবারের মতো মনুষ্যদুনিয়ায় এক্সপোজ করা হলো একজন আসামী হিসাবে । সে এসে নতমুখে দাঁড়ালো – কাঠগড়ায় । বিচারপতি বললেন, আমাদের হয়ে লেখক প্রশাখাকে জিজ্ঞাসাবাদ করুক , সেই ট্র্যান্সক্রিপট আমাদের দিক ।  লেখক জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করলেন ।

লেখক: প্রশাখা, তোমার নাম কি ?

প্রশাখা: প্রশাখা নং ৪৪৩৭ ।

লেখক: পিতার নাম?

প্রশাখা: প্রশাখা নং ৬৭২ ।

লেখক: ফুল কেন ফুটছে না , পাতা কেন ঝরে যাচ্ছে , পাতারা সালোকসংশ্লেষ করতে পারছে না ?

প্রশাখা: প্রশাখা নং ১৭৩ থেকে জলের সাপ্লাই আসছে না , শাখা নং ১৩৩ থেকে খনিজ আসছে না ।

 

জিজ্ঞাসাবাদ শেষ করে , লেখক উঠে দাঁড়ালেন । প্রশাখাকে ধন্যবাদ জানিয়ে, করজোরে বললেন । “মাননীয় কোর্ট, এই হলো ট্রান্সক্রিপ্ট । ব্যাক টু ইউ । আপনারা শাখা নং ১৭৩ এবং  ১৩৩ কে ডাকতে পারেন ?” ।  প্রধান বিচারপতি প্রশাখা ১৭৩,  শাখা নং ১৩৩কে কাঠগড়ায় ডেকে নিলেন  ।

উকিল-১: আমরা তো শাখার ভাষা জানি না । লেখকই জিজ্ঞাসাবাদ করুক ।

শাখা নং ১৭৩:  যাহা বলিব সত্য বলিব ।

লেখক: আপনি খনিজের সাপ্লাই বন্ধ কেন করেছেন ? ৬৭২ নাম্বারে খনিজ শেষ ।

শাখা নং ১৭৩: সাউথ-ওয়েস্টে গোলমাল আছে । বল্কলে আঠা জমেছে । প্যারেনকাইমা ব্লক আছে স্যার ।

উকিল-৩:  ব্লকেজ আছে তো,  প্লাম্বার কেন ডাকেন নি ? কিংবা সাফাইওয়ালে ডেকে নিয়ে সাফ করে নিতেন ।

শাখা নং ১৭৩: সেটার জবাব কাণ্ড দিতে পারেন, কিংবা গাছ নিজেও দিতে পারেন । এর চেয়ে বেশী ইনফমেশন আমার ফাইলে নেই  ।

লেখক: (গাছের দিকে তাকিয়ে ) সাফাই-কর্মচারী কেন ডাকেন নি, কোন সাফাই আছে ?

গাছ: দেখুন, আগেই বলেছি, আপনাদের এই মনুষ্য-প্রদত্ত সিস্টেমে আমরা কাজ করি না । আপনাদের মিউনিসিপালিটি কি করেন,  আর তার সাফাইওয়ালার কি দায়িত্ব তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথা নেই ।  আপনাদের জেরা শেষ হলে, আমাকে ছেড়ে দিন । আমি যাই ।

রামলীলা গ্রাউন্ডের আশেপাশে সমস্ত রোড ব্লক । মানুষ জানতে চায় এই রাজবিচারের রায় কী ? মানুষ দাঁড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে । মানুষ আর মানুষ চারিদিকে। ওদিকে ফিরোজ-শাহ কোটলার দিক থেকেও প্রচুর মানুষ আসছে । চাঁদনিচকের দিক থেকেও অসংখ্য মানুষের ভিড় । রাজবিচার হচ্ছে, আজই ফয়সালা হবে ।  বহুদিন পরে একটা ঐতিহাসিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হবে । একদিনেই রায়, একদিনেই তার পানিশমেন্ট । মানুষ জানতে চায় তার পরিণতি । কিছুটা ব্রেক নিয়ে, প্রধান বিচারপতি এক গ্লাস জল খেলেন ।

তারপর বললেন:  “কাণ্ডকে ডাকা হোক ”। কাণ্ড এলেন । কাণ্ডকে কাঠগড়ায় দাড় করানো হলো । কাণ্ডকে দেখে খুব ক্লান্ত মনে হলো । গায়ের ছাল-চামড়া ছিঁড়ে গেছে । কপালে ভাঁজ । কিন্তু বজ্রকঠিন বাহু, সুঠাম দেহ তা দেখেই বোঝা যায় ।

উকিল-২: বলুন হে মহানুভব কাণ্ড, কেন সাফাই ওয়ালাকে ডেকে শাখা নং ১৭৩ এর প্যারেনকাইমার ব্লকেজ হটানো হয় নি ? কোথাও লিখিত আবেদন করেছেন ? কেন কাজটা হলো না ?

কান্ডঃ আজ্ঞে, কেন কথা জবাব দেওয়ার মতো সময় আমার কাছে নেই, আমি খুব ব্যস্ত থাকি ।  আমি একজন কর্মচারী । আমি শুধু কাজ করি, সিদ্ধান্ত নিই না । তাছাড়া আমার মাথার উপরে দেখছেন একবার ?  আমার মাথার উপরেই সমস্ত গাছের ওজন ন্যস্ত রয়েছে । 

লেখক: না, তা না ।  মানে এই কোর্টের উকিলগণ ও বিচারপতি চাইছেন, ৬৭২ নাম্বারে খনিজ কেন পৌঁছালো না ।

কান্ডঃ আজ্ঞে, খনিজ কম ।  জলের সাপ্লাই কমে এসেছে । জলই খনিজের পরিবাহক ।

উকিল-৩: মানে জলের অভাব হলো নাকি দেশে ? জল কে সরবরাহ করেন ?

কান্ডঃ স্যার, দেশের খবর রাখা আমার কাজ না । শিকড় থেকে যা আসে, আমি তা আগে সাপ্লাই করে দিই । শাখা থেকে যা আসে আমি তা শিকড়কে সাপ্লাই দিয়ে দিই ।

উকিল-৪: শিকড় ? মানে ?  সে আবার কে ? তার ফোন নাম্বার কী ? কোন ওয়েব সাইট আছে ?

কান্ডঃ শিকড়ের জন্মকুণ্ডলী আমার জানা নেই ।  শিকড় মাটির নিচেকার, এইটুকুই জানি । তার সঙ্গে জাস্ট ট্রানজেকশন করি । এক আসরে তার সঙ্গে ভোদকা নিয়ে বসিনি কোনদিন ।

প্রধান বিচারপতি: এই বাদ-বিবাদ কোথাও যাচ্ছে না । অর্ডার অর্ডার । বিজ্ঞানীকে ডাকা হোক ।

বিজ্ঞানী এইসব আলোচনায় কোন ইন্টারেস্ট পাচ্ছেন না । তার মুখে ক্লান্তি, চোখে ঘুম , দৃষ্টি উদাস ।

উকিল- ১: এই যে বিজ্ঞানী , আপনিই বলুন , পৃথিবীতে কি সত্যিই খরা নেমে এলো ? এতো জল কি করে কমে গেলো মাটির নীচে ?

বিজ্ঞানী: আজ্ঞে , জলস্তর কমেছ বটে, তবে এতোটা এলার্মিং নয় ।

উকিল- ২: তাহলে সমস্যাটা কোথায় ?

বিজ্ঞানী: গাছের করোনা হয়েছে ।

আবার হাসি । সমস্ত জনতাই এবার হেসে মজা নিচ্ছেন । বুদ্ধিজীবীরাও মুচকি হেসে নিচ্ছেন। মন্ত্রী মহাশয়দের বডি ল্যাঙ্গুয়েজেই পরিষ্কার, কেউ এই বিচারের ফলাফল নিয়ে আশাবাদী নন ।

প্রধান বিচারপতি:  অর্ডার অর্ডার ।

লেখক: আজ্ঞে আমার কাজ হয়ে গেলে, আমি কি যেতে পারি ? প্রকাশক ডেকেছেন, প্রুফের কিছু গোলযোগ আছে নাকি । লেখায় কিছু বানান ভুলও বেরিয়েছে ।

উকিল- ২:  আমাদের বাদ-বিবাদের কোন সমাধান হলো না ।

প্রধানমন্ত্রী: আমি আগেই জানতাম । বারবার মন্ত্রীসভায় বলেছি সে কথা । এই সমস্যার কোন সমাধান হচ্ছেনা যতক্ষণ না দুনিয়ার সব শক্তিধর দেশের সঙ্গে আমাদের বন্ধুত্ব হচ্ছে । সবার সঙ্গে বৈঠক করে বিশ্বজুড়ে পরিবেশ সচেতনতা বাড়াতে হবে ।

বুদ্ধিজীবী : যদি একবার শিকড়কে ডাকা যেতো । মি-লর্ড, ডাকা যাবে ? যদি আপনার পারমিশন থাকে ।

প্রধান বিচারপতি শিকড়কে ডাকার অনুমতি দিলেন । শিকড় এলেন।  তার গায়ে জামা নেই । খালি গা । সারা গায়ে ধুলো মাটি মাখা । দেখে প্রকৃতিস্থ মনে হয় না । দু-এক বোতল দেশী টেনেটুনেও রাখতে পারেন । চুল উসকোখুসকো । আচার ব্যাবহার কোর্টের এটিকেটসের সঙ্গে একদম যায় না । তবু পৃথিবীর এখন সংকটকাল, আর মানুষেরই সংকট । একটা জবাব দরকার ।

উকিল- ১: আমরা এতক্ষণ সওয়াল জবাব করে ক্লান্ত, আর আপনাকে ঘাঁটানোর ইচ্ছাও আমাদের নেই । মিস্টার শিকড়, যদি আমাদের একটু বলেন যে জলের সাপ্লাই কেন বন্ধ করলেন আর খনিজের সাপ্লাই কি করে কমে যাচ্ছে ?

শিকড়: হুম। আপাদের বিচারসভায় আমায় প্রথমবারের জন্য ডেকেছেন , ধন্যবাদ । কিন্তু মাফ করবেন । যে জবাব স্বয়ং গাছ দিতে পারেনি,  শিকড়ের কি সাধ্য সে জবাব দেয় ।

উকিল- ৩: কিসব কথা বলেন আপনারা ? সোজা কথার সোজা উত্তর আপনারা কেউ দেন না ।  আপনাদের কি কোন হিডেন এজেন্ডা আছে ? কোন অভিযোগ থাকলে, আমরা মনুষ্যকুলের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দদের একত্রিত করে আপনাদের সঙ্গে একটা মিটিং করিয়ে দিতে পারি । কিন্তু এইটা সেই সময় নয়, এ হলো আপাত-কালীন সময়, আপনার কাছে একটু কোঅপারেশন আশা করি ।

শিকড়: জি, আজ্ঞে। ঠিক আছে । গাছ নিশ্চয় বলেছেন যে আমরা নীচের তলার অধিবাসী । আর আপনারাও যেহেতু মনে করেন যে  আমরা নীচে থাকার নিমিত্ত মাত্র জন্মেছি,  শুধু জল সাপ্লাই দিয়েই আমাদের সার্থকতা  , খনিজ উপর নিচে করার জন্যই আমাদের জন্ম ।

উকিল- ১:  সে কথা বলিনি তো । নীচের তলার মেহনতিদের কথা কে না জানে । শ্রমিক জীবনের সম্পূর্ণ সিস্টেম, সমাজতন্ত্র নিয়ে আমাদের রেডবুক আছে ।  লেনিন লড়েছেন । মাও সে তুং লড়েছেন । বিশ্বজুড়ে বামপন্থী নেতারা রয়েছেন ।  আমরা আজও মেহনতিদের জন্য মিটিং মিছিল করি । ধর্মঘট করি । পদযাত্রা করি । ব্রিগেডে যাই । দলে দলে কবিতা পাঠ করি । ক্রিয়েটিভ নাটক, সিনেমা করি । মুখ্যমন্ত্রী আমাদের ডেকে সম্মান করেন । মেহনতি মানুষের জন্য আমাদের মুষ্টিবদ্ধ হাত।  আমরা লড়ছি এবং লড়বো ।

শিকড়: জি, আজ্ঞে  , ধন্যবাদ ।  গাছ নিশ্চয় বলেছেন, আপনাদের এই মনুষ্য-প্রদত্ত সিস্টেমে আমরা কাজ করি না । এইসব লড়াই আপনারা রাখেন । কেউই নীচুতলার জলতোলা, কাদালাগার ভাষা, পরিভাষা জানেন না । এই যে মাটি মাখা গা, জলকাদা মাখা জীবন – আমাদেরই নিজেদেরই কি ভালো লাগে ? । অথচ আমরা কি আলো চাইনি ? বাতাস চাইনি ? কিন্তু কি জুটেছে ? কাদা, মাটি, ভাঙ্গা কলসির চাড়া, ছেঁড়া ন্যাকড়ার ফালি ? পচা দুর্গন্ধময় জন্তু জানোয়ারের শবদেহ ?  জৈবসার বলে, গু-গোবর সমস্তই আমাদের মুখে আপনারা ঠেসে ধরেছেন , আর বলেছেন এই খাও, এতোটুকুই ভাঁড়ার ।

উকিল-৩: সে তো বুঝলাম, কিন্তু আমদের অন্য একটা প্রশ্ন ছিলো, যদি সেই প্রশ্নের উত্তরটা দিতেন ।  কি এমন হলো মাটির নীচে ? খনিজের কি আকাল হলো ? হঠাৎ সাপ্লাই কেনবা বন্ধ করে দিলেন ?

শিকড়: উঁচুতলার মানুষদের ঐটাই সমস্যা । তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতেই আমাদের জীবন হাড়-কয়লা । কয়লা হয়ে শুধু আমরা পুড়তেই জানি ।  আমাদের নিজস্ব কিছু প্রশ্নই যেন করার নেই । শুধুই উত্তর দিতে হবে ।

উকিল-২: উত্তরটা কী ? সেটা দেবেন ?

শিকড়: দেখুন, আমি শিকড়দের প্রতিনিধি মাত্র । আপনি যদি সত্যই জানতে আগ্রহী হন যে খনিজ কেন আসছে না, তাহলে আপনি ৩৪ নং শাখা শিকড়কে ডেকে নিন। সঙ্গে ৮৬৩ নং প্রশাখা শিকড়কেও ডেকে নেবেন । শুধু  এই তথ্যটুকু দিয়েই আমি আপনাকে হেল্প করতে পারি । ধন্যবাদ ।

উকিল-১ নং: উফ, বাপরে !   শিকড় ! উফ ! ভেরী টাফ কাস্টোমার । মি লর্ড, অনেক সময় না নিয়ে  ৩৪নং শাখা শিকড়কে, সঙ্গে ৮৬৩  নং প্রশাখা শিকড়কেও ডাকার অনুমতি চাইছি ।

গাছ:  হে মাননীয় কোর্ট ,  ৩৪নং শাখা শিকড় , ৮৬৩ নং প্রশাখা শিকড়, কেউই বাংলা জানেন না ।

প্রধান বিচারপতি:  ওরা কি কথাও বলেন না  ? ওদের কি কোন ভাষা নেই ?

গাছ: আজ্ঞে, যে বাংলা আপনারা বলেন সেই ভাষা ওরা জানে না । ওরা যে ভাষায় কথা বলেন, তা এই মিডিয়ামে কেউ বুঝবে না ।  ওদের মুখে ঐ গ্রাম্য চাষাভুষা অমার্জিত কথ্য ভাষা । ওরা স্কুলে যায়না, ইকোনমিক্স পড়ে নাই । ফেসবুকে নেই । ওরা কোর্টের ভাষা জানেন না , মাফ করবেন ।

প্রধান বিচারপতি:  তবুও ডাকা হোক ? কেস খুব ক্লোজে এসে গেছে ।

জনতার ভিড় নিউ-দিল্লি স্টেশন থেকে দেখা যাচ্ছে । কনটপ্লেসে, কারোলবাগ এলাকায় প্রচুর ভিড় । সবাই রামলীলা ময়দানের অভিমুখে । বিচারের খবর মুখে মুখে সমস্ত এন সি আরে পৌঁছে গেছে। জনতা এতো তাড়াতাড়ি মোবালাইজ হয়েছে, প্রেসবালারাও এতো প্রস্তুতি নিয়ে উঠতে পারেনি। এই ঐতিহাসিক বিচার টেলিকাস্ট করতে পারলে তাদের টিআরপি টপে যেতো । জনতা সেই হিসাবে অনেক স্মার্ট । ইন্ডিয়াগেটের দিক থেকে বড় একটা গ্রুপ পায়ে হেঁটে এদিকে আসছে । আর এদিকে মহাবিচারসভায়, একটা ছোট্ট ব্রেকের পর , কাঠগড়ায়, শতচ্ছিন্ন, খালি গা, জলকাদা মাখা শিকড় প্রশাখাকে উপস্থিত করা হলো  ।

৩৪নং শাখা শিকড়: সাব-জিইই…

উকিল-২: আপনার কাছে এতো খনিজ ও জল মজুদ থাকা স্বত্বেও আপনি সেটা শিকড় অব্দি কেন পৌঁছে দেন নি ? এটাই তো আপনার কাজ, কাজের গাফিলতিতে, জানেন কি পৃথিবীতে কি অঘটন ঘটে চলেছে ?

৩৪নং শাখা শিকড়: জি সাব, হাম গরীব আদমি আছে ।  জল শুধু জল । গ্লুকোজ-হীন জল ।  নমক হে, মগর অক্সিজেন নেহি হে  ।

উকিল-১: প্রশাখা শিকড় ৮৬৩ কোথায় ? তাকেও তো ডাকা হয়েছে ।

৩৪নং শাখা শিকড়: জি সাব, হামসবলোগ গরীব আদমি আছে ।  ভুখা আর বিমার । মিট্টিমে লেটকে ঘুমিয়ে আছেন ।

উকিল-৩: কি বলে ?  শুয়ে আছেন ? দেখুন কি ধরনের অসভ্যতা । প্যারেনকাইমা ব্লক । উপরিতলায় প্রশাখা নং ৪৪৩৭ তে জল পৌঁছচ্ছে না ।   আপনারা কি নাকে, কানে তেল দিয়ে ঘুমচ্ছেন ? আপনাদের জন্যই জল উপরে আসছে না ।

৩৪নং শাখা শিকড়: জি সাব, হাম গরীব আদমি আছে, গলতি হয়ে গেছে ।

প্রধান বিচারপতি: অর্ডার অর্ডার । লেখককে ইমার্জেন্সি ডাকা হোক ? ওরা আমাদের ভাষা বুঝতে পারছে না । আমরা ওদের ভাষা বুঝতে পারছি না । লেখকই ওদের ভাষা বোঝার কথা । ব্রিং হিম ব্যাক এগেইন ।

লেখক: বলুন স্যার ।

প্রধান বিচারপতি: ৩৪নং শাখা শিকড়, কি বলছে, বুঝতে পারছেন  ? আপনারা তো লেখক । কি ভাষায় লেখেন ?  এই শিকড়দের ভাষা বোঝেন, জাস্ট ট্রানস্লেট দেম ?

লেখক: মি লর্ড, বুঝিতো । এইতো আমাদের কাজ ।  ফ্যাতাড়ু লিখেছেন ‘যে এই মৃত্যু-উপত্যকা আমার দেশ নয়’ । পড়েছেন ?

প্রধান বিচারপতি: অর্ডার অর্ডার, সাহিত্য নয়, এই শিকড়েরা কি বলছে সেইটা ট্রান্সলেট করে বলুন ।

লেখক: আচ্ছা,  ৩৪নং শাখা শিকড় , আপনি কি বলেছেন এদেরকে ?

৩৪নং শাখা শিকড়: জি সাব, হামনে বোলা,  নং-৮৬৩ বিমার আছে ।  শুধুই জল খাচ্ছে, কোই গ্লুকোজ নাহি  । অক্সিজেনও ভি মিলছে না । গ্লুকোজের সাপ্লাই নেহি আয়া কুছ দিন সে । দম ঘুটতা হে সাব । হাম ভুখা হে, পার ইমানদার আছে সাব , মিট্টি আর পানিসে কিতনা দিন চলেগা , বিমার তো পড়েগা ।  হাম গরীব আদমি আছে, আগর গলতি হয়ে গেছে তো মাফ করে দেবেন।

লেখক: মি লর্ড, উনি বলছেন , এরা খুব গরীব লোক । এরা খিদে আর খাদ্য ছাড়া অন্যকোন ভাষা জানে না । খাদ্য কি , মিছিল কি, কোর্ট কি, বিচারপতি কে সেই পরিভাষা এদের কেউ জানে না । ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কোন পরিভাষাই এদের জানা নেই । এদেরকে মাফ করে দেন ।  

উকিল-৩: মি লর্ড, আমি আগেই বলেছি । কেস পুরোটাই ক্লিয়ার । ৩৪নং শাখা শিকড়টাই কালপ্রিট ।  এই কারণেই  জল উপরে আসছে না । প্যারেনকাইমা ব্লক । প্রশাখা নং৪৪৭৩ তে জল পৌঁছচ্ছে না । ধানের বৃন্তে দুধ আসছে না ।  ধান গাছে ধান হচ্ছে না । পাতা হলুদ হয়ে আসছে । আই রিকামেন্ড রেয়ার অব দ্যা রেয়ার পানিশমেন্ট ফর হিম । ওকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হোক ।

কোর্ট সাইলেন্স । বুদ্ধিজীবী সাইলেন্স । এম এল এ, এমপি , ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজইস্ট্রেট সাইলেন্স । জনতা সাইলেন্স ।

প্রধান বিচারপতি: ৩৪নং শাখা শিকড় আপনার কিছু বলার আছে ?

৩৪নং শাখা শিকড়: জি সাব, হাম গরীব আদমি আছে, গলতি হয়ে গেছে ।

প্রধান বিচারপতি: আর কারো কিছু বলার আছে ? প্রধানমন্ত্রী আপনি কিছু বলবেন ?

প্রধানমন্ত্রী: সবটাই যখন ৩৪নং শাখা শিকড় মেনে নিলেন, আমাকে বাই ইজ্জত বরী করে দেওয়া যায় । আমি তাহলে নির্দোষ । সে আমি আগেও জানতাম ।

প্রধান বিচারপতি:  গাছ, আপনি কিছু বলবেন ?

গাছ: মাটির নীচের শিকড়ের দোষ প্রধানমন্ত্রী কেন নেবেন ? প্রধানমন্ত্রী শিকড় কোনদিন দেখেননি ।  ফুল না ফোটাতে পারা একটা গাছের ব্যর্থতা । গাছের ভিতর যারা বৃক্ষ – তাদের দেখুন এখনো ফুল ফুটছে । ফল হচ্ছে । বৃক্ষ তাই দাঁড়িয়ে আছে ।  ঘাস পাতা ধান গম এইসব হলেন দুর্বল বীরুত উদ্ভিদ । অতি সহজেই তার উপরে দখল নিতে চায় শক্তিধর পরজীবী ।

প্রধান বিচারপতি:  বিজ্ঞানী, আপনার বক্তব্য ?

বিজ্ঞানী: আমি  আগেই বলেছি, গাছের করোনা হয়েছে । করোনা একটা ছোঁয়াচে রোগ । টেস্ট করুন, বেশী করে টেস্ট করুন । নইলে  সম্পূর্ণ রাষ্ট্রই তাতে সংক্রামিত হয়ে যাবে ।  আর তাতে আগে মারা যাবেন বীরুত জাতীয় উদ্ভিদ, তারপর গুল্ম । যাদের শিকড় বহু গভীরে, সেই রকম কিছু বৃক্ষ হয়তো বেঁচে যাবেন । করোনা তবুও থাকবে । এইটাই প্রকৃতি । এইটাই বিজ্ঞান ।

প্রধান বিচারপতি: ধন্যবাদ । সবার কথা শোনা হলো । ভারডিক্ট রেডি ।  ৫ মিনিট পরে তার ফয়সালা শোনানো হবে । আজকেই ফয়সালা শোনানো হবে ।

ভিতরে চলে গেলেন প্রধান বিচারপতি । জনতা , উকিল, প্রধানমন্ত্রী, সবাই নিজের নিজের স্থান গ্রহণ করলেন । সম্পূর্ণ রাজধানী উত্তাল, সমস্ত জাতির চোখ দিল্লির উপর । প্রত্যেকটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী অধীর আগ্রহে টিভি খুলে বসে আছেন। কি হয়, কি হয় । টুইটারে ঝড় উঠেছে । রাজধানী দিল্লির বিচার মডেল নিয়ে গুগল ট্রেন্ড আসছে ।  মস্কো, ওয়াশিংটনে, প্যারিস লন্ডনেও অনুসরণ করার কথা কেউ কেউ বলছেন । কলকাতায় থমকে দাঁড়িয়েছে কলেজ স্কোয়ার, শ্যামবাজার, গড়ীয়াহাটার মোড । শিয়ালদা স্টেশনে, এই মাত্র ঘোষণা হলো রাণাঘাট ও বনগাঁ লোকাল এই ফয়সালা শোনার পরেই ছাড়া হবে ।  কে হতে পারে দোষী, কত দিনের হতে পারে কারাদন্ড , এই নিয়ে আলোচনার ঝড় উঠেছে বিশুর চায়ের দোকানে ।

মিনিট সাতেক বিরতির পর প্রধান বিচারপতি কুর্তি-পাঞ্জাবী পরে কোর্টে প্রবেশ করলেন । একহাতে কলম, অন্য হাতে একটা রিভলভার । সবাই চমকে উঠলেন । জনতাদের ভিতর ফিসফিস । কি করবেন রিভলভার দিয়ে । কেউ বললেন, উনি বিচারপতি ! তাই ওনার পরে ভরসা করা যায় । কেউ বললেন, উনি বলেছিলেন যে যে কালপ্রিট বের হবে,  তাকে এই বিচারসভাতেই তাকে পানিশমেন্ট দেবেন । হয়তো তাঁকে নিজের হাতেই গুলি মারবেন ।

প্রধান বিচারপতি একটু কাশি দিয়ে গলা সাফ করে নিলেন । এবার রায় দেবেন তিনি । রেজিস্টারে কিছু একটা লিখলেন । কলমের নিবটা ভেঙ্গে দিলেন মনে হলো । প্রধান বিচারপতি উঠে দাঁড়ালেন ।

তারপর শুরু করলেন:  “তামাম যুক্তি তর্ক বাদ-বিবাদ শেষে, সবাইকে শোনার পরে এই নতীজায় পৌঁছলাম যে এই কেসটার আসল রুটকজ হলো ভাষা । আমাদের ভাষা,  কোনটা আইন, কোনটা বেআইন সেটা আজও সমস্ত মিডিয়ামে পৌঁছে দিতে পারিনি । আমিও সবার ভাষা বুঝতে পারিনি । আমার বর্তমান পদ, আমার বর্তমান শিক্ষা, আমার বর্তমান কানুন এক্স্যাক্ট কালপ্রিটকে তা সনাক্ত করতে ব্যর্থ । আমি এক সামান্য মানুষ । আমার কি সাধ্য একটা এমন মহানুভব গাছকে বিচার করা । আমিই সেই কালপ্রিট, এটা আমারই অপরাধ । আর আমার এই হলো পানিশমেন্ট”- বলেই রিভলবারটি মাথায় ঠেকিয়ে ট্রিগার চেপে দিলেন । বুলেট তার মাথার এপার ওপার হওয়ার আগে প্রধান বিচারপতির মুখে একটাই কথা শোনা গেলো । “লেটস দ্যা ন্যাচার প্রিভেইল” ।

জনতা উঠে দাঁড়ালেন । জনতার মাথায় হাত ।  বিস্ময়ে তাদের চোখ চড়কগাছ । প্রধান বিচারপতির এমন সিদ্ধান্তে একেবারেই অপ্রত্যাশিত । জনতা পাগল হয়ে উঠলেন । তারা ঢিল, পাথর যা হাতের কাছে ছিলো তাই দিয়ে বিচারসভা লক্ষ্য করে আক্রমণ করলেন । উপড়ে ফেললেন বিচার ব্যবস্থা । সভায় উপস্থিত বুদ্ধিজীবী উকিলদের হত্যাকরে, উল্লাস করে উঠলেন ।  তাদের কানে একটা কথা ধ্বনিত ও প্রতিধ্বনিত হচ্ছে  “লেটস দ্যা ন্যাচার প্রিভেইল “ । রামলীলা গ্রাউন্ড ফেটে পড়েছে মানুষের আদিম চরিত্রে । মনুষ্য-প্রজাতির হিংস্র প্রাকৃতিক দিকটা উন্মোচিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে দ্রুত । মার মার কাট কাট । কে শাসক কে বুদ্ধিজীবীকে কেউ আর দেখছেন না। মব অপ্রত্যাশিত ভাবে আউট অব কন্ট্রোল । ততক্ষণে টিভি চ্যানেলের সাংবাদিকগণ প্রধান বিচারপতির দেওয়া ঐতিহাসিক রায় এর বয়ান টাইপ করে ফেলেছেন । আকাশে বাতাসে একটা কথারই গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে  “লেটস দ্যা ন্যাচার প্রিভেইল” ।

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত