| 18 জুন 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

অন্ধকারের উৎস হতে

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠলেন মহাপ্রভু। এই কালঘুম শতকোটি বর্ষ তাঁর জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে।এর মধ্যে তাঁরই জ্বেলে রাখা সব নক্ষত্র নিভে গিয়েছে। আহা! কী পরম মমতায় একটি একটি করে নক্ষত্র জ্বালিয়ে দিয়ে সাজিয়ে রেখে একটু চোখটা মুদে ছিলেন। কতো সুন্দর সুন্দর সব নাম দিয়েছিলেন— লউবির, বিব্রা, ববিহা ইত্যাদি ইত্যাদি। এখন সব নিভে গেছে, হারিয়ে গিয়েছে চির অন্ধকারের জগতে। মহাবিশ্ব তো আর কিছু নয়, কেবল গাঢ় থেকে প্রগাঢ় থোকা থোকা অন্ধকারের গুণ ফল। মহাপ্রভু চোখ কচলে কচলে চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকারের ভেতর তাকাবার চেষ্টা করে গেলেন বার বার। কিছুই গোচরে আসে না। আবার জ্বালতে হবে বাতি, আবার প্রথম থেকে বানাতে হবে অগ্নিগোলক। 

ভাবতে ভাবতে কেটে যাচ্ছে কাল—মহাকাল।অন্ধকারে একা শিউরে শিউরে উঠছেন মহাপ্রভু। ভাবছেন, আচ্ছা, আমি কেন এমন একা! কেন একা এই অন্ধকারে নিপতিত! আমার কী সগোত্র কেউ নেই? কী নি:সঙ্গতা! আমি কী পতিত তবে!’ 

অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে কিছু ফোটন সংগ্রহ করেন মহাপ্রভু। কিছু ইউরেনিয়াম, হিলিয়াম, আর্গন এমন আরও কিছু না-জানা জিনিষ বিশাল করপুটে ধারণ করে মণ্ড তৈরি করতে থাকেন। আবার জ্বালাতে হবে আলো।তারপর এক ভয়ঙ্কর উত্তুঙ্গ নৃত্যের সূচনা হলো। সমস্ত অন্ধকার জুড়ে কেবল ছায়ার দাপাদাপি। একসময় অসীম গতির সঞ্চার হলো। সেই অসীম গতিতে মহাপ্রভুর হাত থেকে দূরে ছিটকে গেলো অন্ধকারের উৎস থেকে উৎসারিত আলোকসমৃদ্ধ সুবিশাল এক অগ্নিগোলক। কী তার উজ্জ্বলতা! কী তার তেজ! কী শৌর্য এই সৃষ্ট আলোর! তবে তার নাম হোক সূর্য। সূর্য থেকে এদিক ওদিক ছিটকে পড়তে লাগলো শুক্র, শনি, বৃহস্পতি, ধরা ইত্যাদি। কিন্তু সবগুলো কেমন দ্রুত আলো হারিয়ে ফেললো। কেবল সূর্যই তার আলো ছড়িয়ে কিছুটা আঁধার দূর করলো। কিন্তু এই বিশাল অন্ধকার জগতকে একটা সূর্য আর কতোটা আলো ছড়াবে? মহাপ্রভু তাঁর সৃষ্টির প্রলয় নাচনে মত্ত হয়ে থাকলেন দীর্ঘ সময় কাল, আর অন্ধকার থেকে ফোটনের কণাগুলো খুঁজে খুঁজে অগ্নিগোলক বানিয়ে গ্যালাক্সি জুড়ে ছড়িয়ে দিতে লাগলেন অনেক অনেক নক্ষত্র। আর আলোয় আলোয় ভরে উঠতে লাগলো ভুবন। মহাপ্রভু ভাবলেন, এবার তবে বিশ্রাম নেওয়া যাক। মহাপ্রভুর এই বিশ্রামকালে আলো ফের কমে আসতে থাকে, আলো নিভেও যায় কোনো কোনো নক্ষত্রের। অন্ধকার পুনরায় জেঁকে বসে। মহাপ্রভুর খুব শীত অনুভূত হয়, ঠাণ্ডায় কাঁপতে কাঁপতে জেগে উঠে দেখেন সূর্য নিভু নিভু। মহাপ্রভু তাঁর বিশাল মুখের ভেতরে পুরে নেন প্রচুর বাতাস। তারপর জোরে ফুঁ দিতে থাকেন সূর্যের গায়ে। ধীরে কমলা থেকে লাল হয়ে গনগনে হয়ে ওঠে সূর্যের শরীর। মহাপ্রভু আনন্দে উল্লসিত হয়ে নাচতে নাচতে এগিয়ে যান একে একে অন্য নক্ষত্রগুলো জাগিয়ে রাখবেন বলে। তারপর থেকে মহাপ্রভুর এই পরিভ্রমণের শেষ নেই; এক নির্দিষ্ট নিয়মে একে একে সব নক্ষত্র জ্বালাতে জ্বালাতে ভুলে যান সময়ের হিসাব। একদিন তিনি নির্দিষ্ট করলেন, যখন সূর্যকে পরম মমতায় ফুঁ দেবেন সেই ক্ষণটিই হবে সেই দিবসের প্রথম সূর্য— নাম হোক তবে সকাল। এইভাবে দিবসের সৃজন ও সূচনা হলো। তবে, মহাপ্রভু বলতে চেয়েছিলেন স্বকাল, মানে নিজের সময়, কিন্তু যেমন করে হাত থেকে ফসকে গিয়ে গ্রহগুলো হয়েছিলো, হারিয়ে গিয়েছে কতো গ্রহাণু, তেমনি ‘স’-এর নীচ থেকে ‘ব’-ও ঝরে গেল। কতো চেষ্টা করলেন ধরতে— কিন্তু আঁধারে হারিয়ে গেল। তারপর থেকে কেউ আর নিজের কালকে খুঁজে পায় না পরের সকালে। 

মহাপ্রভু সব সৃষ্টির মধ্যে ভালবাসেন সূর্যকে। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেন তার রূপ। মাঝে মাঝে তাঁর চোখ যেন জ্বলে যায়, ঝলসে যায় এই মায়াময় সূর্যের রূপে। কিন্তু সূর্য ভালোবাসে তার গ্রহ ধরাকে। মহাপ্রভু সূর্যকে কাছে ডাকেন, কিন্তু সূর্য সাড়া দেয় না।সূর্য বলে “তোমার নি:শ্বাসে আমার গা জ্বলে যায়। আমি সারাদিন জ্বলতে থাকি। জ্বলে জ্বলে আমার শক্তি ফুরাতে থাকে, আমি ক্রমে উজ্জ্বলতা হারিয়ে তুষ হয়ে যাচ্ছি। অথচ দেখো, কী অপরূপ ওই ধরা! তুমি যখন বিশ্রামে থাকো তখন চাঁদের আলোয় কী মায়াবী দেখায় এই সবুজ শ্যামল গ্রহটি! আমি ধরাকে খুউব ভালোবাসি”। 

মহাপ্রভু তবু সূর্যের প্রেমে মশগুল। এখনও প্রতিদিন সকাল শুরু করেন সূর্যের গায়ে ফুঁ দিতে দিতে।ওদিকে সূর্য তার প্রণয় নিবেদন করে ধরাকে। ধরা বিস্ময়ে স্তম্ভিত হয়ে যায়। বলে, “তোমার স্পর্ধা কতো! আমাকে ডাকছো কাছে! অথচ আমি তোমার কাছে গেলে ঝলসে যাবো। আমি ভালোবাসি চাঁদ। কী মায়াবী! কতো রূপ তার! জোছনায় তো আমাকে উতলা করে তোলে আমার সাগরের ফেনিল উর্মি তো পারে না শুধু এক লাফে চাঁদে গিয়ে পৌঁছাতে। চাঁদ বলে, “তবে এসো ভাই ধরা, আমরা জড়াজড়ি করে মায়া মমতার ঘর গড়ে তুলি।” ধরা বলে “এসো তবে চন্দ্রাবতী, রূপবতী, এসো মোর সোম। তোমার মধুর সোমরসে আমাকে মাতাল করে তোলো প্রতিটি জোছনায়”। 

এদের সবার সব কথা শুনে মহাপ্রভু রাগে ক্ষোভে মাথার চুল ছিঁড়তে থাকেন অনেক, অনেকক্ষণ ধরে।তারপর সেই মহাচুলগুলো সমগ্র মহাবিশ্বে এমনভাবে ছড়িয়ে গেলো এক মহাশক্তিরূপে। মহাপ্রভু এই শক্তির নাম দিলেন মহাকর্ষ। সেই থেকে প্রতিক্ষণেই একে অপরকে আকর্ষণ করছে, টানছে তো টানছেই— কিন্তু কেউই কারও কাছে যেতে পারছে না, আর একে অপরকে ঘিরে ঘুরছে তো ঘুরছেই। এখনও মহাপ্রভু নিয়ম করে ফুঁ দিয়ে যান প্রতি সকালে। আর সেই সূর্য ছড়াতে থাকে প্রভা, সুন্দর হয়ে ওঠে ধরা। কবি বলে ‘প্রভাত’। আজ তো হলোই, কালও হবে সেই এক, একই মনোটোনাস খেলা। অন্ধকারের উৎস হতে আলো জ্বালানোর প্রেম। 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত