ট্রফি

আজকাল সবসময় একটা অস্থিরতা কাজ করে মনের মধ্যে। কোথাও যেন কি একটা হিসেবের গড়মিল,যেন হঠাৎই কোথাও তাল কেটে গেছে।কিন্তু কোথায়,সেটাই ঠিক ধরতে পারছে না অনিন্দ্য। আপাত দৃষ্টিতে দেখলে সবই ঠিকঠাক যাচ্ছে,ঠিক যেরকম যাবার কথা।দারুন চাকরি, সুন্দরী স্ত্রী, সন্তান,বাড়ি, গাড়ি,আর কি চাই একটা মানুষের জীবনে।এইরকম একটা জীবনই তো তার স্বপ্ন ছিলো।

পাড়া গাঁ এর ছেলে,মধ্যবিত্ত পরিবার,বাবা পোস্ট আপিসের ছাপোষা কেরানি। খুব বেশি সৌভাগ্য থালায় সাজিয়ে ভগবান এ দুনিয়ায় পাঠাননি তাকে।কিন্তু ছোট থেকেই প্রবল উচ্চাকাঙ্খী সে।মনের মধ্যে ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে এভাবে বাঁচার জন্য সে জন্মায় নি।এখান থেকে বেরোতে হবে তাকে।তার নিজের দুনিয়া সে নিজে তৈরি করবে।ভাগ্যের সাথে আপোষ করবে না।আর সেই কাঁচা বয়সের বুদ্ধিতেও সে একটা কথা খুব ভাল ভাবে বুঝেছিল,যে শিক্ষাই হল সেই পথ যা বেয়ে সে তার লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে।

তাই পড়াশোনাটাকেই পাখির চোখ করেছিল সে।আশেপাশের সহপাঠী, ভাইবোনেদের প্রতি তার করুণা ছাড়া আর কিছু হতনা।মনে হত, এদের মধ্যে জন্মে,দুটো কথা বলে সে তাদের কৃতার্থ করছে।এরা কিভাবে ভাগ্যকে স্বীকার করে,এই জীবনকে মেনে নিয়েছে,ভাবলে করুণা হত তার।নিজেকে তার শিকরহীন মনে হত।নিজেকে আরও বেশি করে লেখাপড়ার মধ্যে ডুবিয়ে দিতো সে।ফলস্বরূপ উচ্চ মাধ্যমিকে জেলার মধ্যে প্রথম হয়ে বাইরের দুনিয়ায় পা রাখালো অনিন্দ্য। তারপর একে একে তার ঝুলিতে শুধুই সাফল্য।একের পর এক পাহাড়চূড়া অতিক্রম তাকে পৌঁছে দিয়েছে সাফল্যের শীর্ষে।

প্রতিটা সাফল্য তাকে আরো বেশি করে মুক্তির স্বাদ দিয়েছে। মুক্তি তার অতীত থেকে,গড়পড়তা মধ্যবিত্ত জীবন থেকে,যেই জীবনকে সে জন্মাবধি ঘৃণা করে এসেছে,যেই জীবনের প্রতিটি চিহ্ন সে সযত্নে মুছে ফেলেছে।তার জীবনের প্রতিটি অধ্যায় তার নিজের রচিত, একজন সত্যিকারের সেল্ফমেড ম্যান।

তবে আজ হঠাৎ করে কি হল।কেন এই অস্থিরতা? কিসের অভাব অনিন্দ্যর? তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মানুষ সে নিজে।স্ত্রী সন্তান সবাই আছে,কিন্তু অনিন্দ্যর সাথে তাদের মানসিক যোগ কতটুকুই বা?সত্যি কথা বলতে স্ত্রী সন্তানেরা তার কাছে একেকটি ট্রফি, তার জীবনে অর্জন করা বাকি ট্রফিগুলোর মত।নইলে সন্দিপ্তার মত ডাকসাইটে সুন্দরী যেদিন অনিন্দ্যর মত মফস্বলি ছেলের গলায় মালা দিয়েছিল, সেদিন তার সোসাইটিতে চর্চা কম হয়নি এই নিয়ে।তাদের সন্তানেরা যে যার জীবনে প্রতিষ্ঠিত এখন।সবই ঠিক সেরকমই এগিয়েছে,যেরকম অনিন্দ্য চেয়েছিল।

কিন্তু আজ কাল অনিন্দ্য ঘুমোতে পারছে না।ঘুমোলেই ঝনঝন শব্দে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। পাশে সন্দিপ্তাকে জাগিয়ে প্রথম প্রথম বলেছে অনিন্দ্য। কিন্তু সন্দিপ্তাও আজকাল বিরক্ত হয়।তাই অগত্যা অনিন্দ্য একাই রাত জাগছে।সারাবাড়ি খুঁজে দেখেছে অনিন্দ্য,শব্দের উৎস সন্ধান করেছে।কিন্তু কিছুই পায়নি।আজকাল কোন কাজে মন বসাতে পারছে না অনিন্দ্য। সারাদিন অস্থির লাগছে।পরিচিত মনোবিদের কাছেও গিয়েছিল সে।সেডেটিভ দিয়েছেন তিনি।আর কাজ থেকে ছুটি নিয়ে কিছুদিন ঘুরে আসতে বলেছেন কোথাও।প্রথম দু চার দিন সামান্য উপকার পেলেও আজকাল আর সেডেটিভও কাজ করছে না।

অনিন্দ্য ঠিক করে,কোথাও বেড়িয়ে আসবে কিছুদিনের জন্য।হয়তো এই বাড়ি,এই পরিবেশ থেকে দূরে গেলে শব্দটাও বন্ধ হয়ে যাবে।সন্দিপ্তা জানিয়ে দিয়েছে ও এখন কোথাও যেতে পারবে না।ওর এনজিওর বার্ষিক ফান্ড রেইজার অনুষ্ঠান আছে।সুতরাং অনিন্দ্য একাই যাবে।এমনিতেও দুজনের সম্পর্কটা একটা লোকদেখানো ছাড়া কিছুই তো নয়।কোনদিনই ছিলো না।সন্দিপ্তা বড় বেশী আদর্শবাদী। সুন্দরী শিক্ষিতা আধুনিকা সন্দিপ্তা বরাবরই একরোখা।যেটা করবে মনে করে,করেই ছাড়ে।তা সে মধ্যবিত্ত বাড়ির ছেলে অনিন্দ্যকে বিয়ে করা হোক,বা নিজের এনজিও তৈরি করা হোক।যতদিন অনিন্দ্যর বাবা মা বেঁচে ছিলেন,সন্দিপ্তাই যোগাযোগ রাখত।

অনিন্দ্য ঠিক করে ছুটিতে যাবার আগে দিন দুয়েকের জন্য দেশের বাড়িতে ঘুরে আসবে।ভাই ফোন করেছিল গত সপ্তাহে। বসত বাড়ি ছাড়াও সামান্য কিছু জমি ছিল বাবার।তাতে যা চাষ আবাদ হয় সেই টাকার ভাগ অনিন্দ্য কোনদিনও চায়নি।ভাই কলকাতায় এলে গাছের ফলমূল,সবজি দিয়ে যায়।অনিন্দ্যর সাথে কথা কমই হয়।গত সপ্তাহে ফোন করে জানালো,ভাইএর ছেলে নাকি কোথায় চান্স পেয়েছে।পড়াশোনার জন্য টাকা দরকার।জমিটা বেঁচে দিতে চায়,যদি অনিন্দ্যর আপত্তি না থাকে।অনিন্দ্যর মেজাজটা চড়ে আছে ফোনটা পাবার পর থেকে।আজ পর্যন্ত নিজের অধিকার দাবি করেনি বলে আজ এতদূর সাহস।কথাগুলো সামনা সামনি শোনানো দরকার।

কত বছর পর এল অনিন্দ্য এই বাড়িতে।সেই মা মারা যাওয়ার পর শেষবার এসেছিল।বাড়িঘরের অবস্থা দেখে বোঝা যায়,ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়।কিন্তু অনিন্দ্যর খুব যত্নআত্যি করছে ওরা।মাথায় তুলে রাখছে বলা যায়।অনিন্দ্যর মত বড়মানুষ বাড়িতে এসেছে,পাড়া প্রতিবেশী আসছে দেখা করতে।মনে মনে বিরক্ত হলেও মুখে প্রকাশ করা যায় না।রাতে খাওয়া দাওয়ার পর ভাই ঘরে এল একটা ট্রাংক নিয়ে।খুলে দেখালো,ছোট থেকে পাওয়া অনিন্দ্যর সব ট্রফি,মেডেলে ভরা।বললো,”দ্যাখ দাদা,মা এগুলো সব যত্ন করে তুলে রেখেছিলো, আমিও রেখেছি। তুই চাইলে নিয়ে যেতে পারিস। চাইলে আমার কাছেও রাখতে পারিস।আমার কাছেও যত্নেই থাকবে।”অনিন্দ্য কিছু উত্তর দিলো না।মনে মনে ঠিক করলো,কাল চলে যাবার সময় নিয়ে যাবে।
কথা বার্তা যা বলার,কালই বলবে।আজ খুব ক্লান্ত লাগছে।

সারাদিনের ক্লান্তিতে তাড়াতাড়িই ঘুমিয়ে পরেছিলো অনিন্দ্য। মাঝ রাতে যথারীতি ঘুম ভেঙে গেল রোজকার মত,সেই ঝনঝন শব্দে।অনিন্দ্য উঠে বসলো।আজ যেন শব্দটা একটু অন্যরকম, যেন খুব কাছ থেকে আসছে,হয়তো ঘরের ভিতর থেকেই।আলো জ্বালবার জন্য বিছানা থেকে নামতেই কিছু পায়ে লেগে ঝনঝনিয়ে ছিটকে গেল।কোনরকমে ঠোক্কর খেতে খেতে আলোর সুইচটা জ্বাললো অনিন্দ্য। সারা ঘরে ইতস্তত ছড়ানো সমস্ত ট্রফি, মেডেল সব।এগুলো এভাবে ছড়ালো কে?ঘুমোনোর আগে তো ট্রাংকের ভেতরেই ছিল গোছানো।আচমকাই আলোটা নিভে গেলো। এইসব দিকে ভীষণ লোড শেডিং হয়।অনিন্দ্য বিছানা এসে বসতেই আবার ঝনঝন শব্দ শুরু। শব্দটা যেন অনিন্দ্যর দিকেই এগিয়ে আসছে।অনিন্দ্যর পায়ের কাছে,যেন বিছানা বেয়ে উঠছে সব ট্রফিগুলো।অনিন্দ্যকে ঘিরে ধরেছে।উফ্ কি শব্দ।যেন অট্টহাসি হাসছে সব ট্রফি। অনিন্দ্যকে চেপে ধরছে।যেন বলছে,আমরাই তোমার আপন,তোমার সবকিছু।নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে অনিন্দ্যর। দু’হাতে প্রাণপনে ছুঁড়ে ফেলার চেষ্টা করছে অনিন্দ্য। কিন্তু ট্রফিগুলো আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরছে তাকে,শরীরে কেটে বসছে যেন।অনিন্দ্য চিৎকার করতে চাইল।কিন্তু গলা দিয়ে আওয়াজ বেরোচ্ছে না।গলার ভেতরটা যেন মরুভূমি। অনিন্দ্য জ্ঞান হারালো।

জ্ঞান ফিরতে দেখলো,মেঝের উপর ভাইয়ের কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে।সবাই উদ্বিগ্নমুখে তাকিয়ে আছে তার দিকে,মুখে জলের ঝাপটা দিচ্ছে।অনিন্দ্য উঠে বসলো।চারিদিকে তাকিয়ে দেখল,ঘর আগের মতই পরিষ্কার, কোথাও কোন ট্রফি ছড়িয়ে নেই।ঘরের কোনে ট্রাংকটা রাখা, যেমন শোয়ার আগে রাখা ছিলো।

পরদিন সকালে কলকাতা ফেরার আগে অনিন্দ্য ভাইকে বললো জমিটা যেন বিক্রি না করে।পড়াশোনার সব খরচ সে দেবে।ট্রফির ট্রাংকটা গাড়ির ডিকিতে তুলে নিলো।গ্রাম থেকে বেরোবার মুখে বড় দীঘিতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো ট্রাংকশুদ্ধ সমস্ত ট্রফি আর মেডেল।তার জীবনে এগুলোর আর দরকার নেই।

পরিশিষ্টঃ গল্পটা এখানেই শেষ হতে পারত, কিন্তু আরেকটু না বললে অসম্পূর্ণ রয়ে যাবে।অনিন্দ্য বেরিয়ে যাবার পর ভাইএর ফোন থেকে কলকাতায় সন্দিপ্তার ফোনের একটা ফোন যায়।
“বৌদি,দাদা এইমাত্র রওনা দিল।সব তোমার প্ল্যানমত হয়েছে।কিন্তু দাদার শরীরটা ঠিক নেই।রাতের ধাক্কাটা সামলাতে সময় লাগবে একটু।তুমি একটু দেখো দাদাকে।আমি জানি তুমি দাদাকে কতটা ভালবাসো।যা করেছি আমরা,ওর ভালোর জন্যই করেছি।তবু মনটা খারাপ লাগছে।তুমি সামলে নেবে জানি।এতদিন ধরে তুমিই আমাদের সংসারটা টানছো।তুমি না থাকলে ভেসে যেতাম।তোমার বুদ্ধির উপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে।তোমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোট করব না।ভালো থেকো।দাদাকে দেখে রেখো।”

ফোনটা রেখে সন্দিপ্তা জালনার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।সে জানে,এই প্রথমবার অনিন্দ্য তার কাছে ফিরবে।

 

প্রচ্ছদ ছবি: মাসুক হেলাল

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত