সুবোধ-স্বপ্না মরে গেছে

 

কাঁটা ছবিতে ১৯৭১ সালের একটি চরিত্র সুবোধ, সুবোধচন্দ্র দাস। যে কিনা বউকে নিয়ে নিজের গ্রামের বাড়ি সাতক্ষীরা থেকে ঢাকায় এসে ভূতের গলিতে বসবাস করছিল। তার বউয়ের নাম স্বপ্না রানী দাস। সুবোধ ঢাকায় সিনেমা হলে টিকেট বিক্রেতার চাকরি করত। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর কয়েক মাস আগে তারা ঢাকায় এসেছিল এবং চলমান যুদ্ধের মধ্যে সেই দম্পতি একদিন আজিজ ব্যাপারির বাড়ির উঠানের কুয়োর মধ্যে পড়ে মারা যায়। সুবোধ এমন একটা চরিত্র যে কিনা ভীত, পলায়নপর, অসহায় এবং যাকে দেখে যে কারোরই একবাক্যে মনে হবে, লোকটা বোকা।

ঠিক এরকম একটা চরিত্রের সন্ধান চলছিল কাঁটা ছবির জন্য, কিন্তু এই সময় বোকা লোক পাওয়া কি এত সহজ? বিশেষ করে থিয়েটার, টেলিভিশন কিংবা সিনেমা করিয়েদের ভিড়ে বোকার জায়গা কোথায়? আমাকে প্রথম নির্বাচন করা হয়েছিল একটি ঢুলি চরিত্রের জন্য। তখন সুবোধ হিসেবে যাকে নিয়ে ভাবা হচ্ছিল, পরিচালকের ভাষ্যমতে, সে বেশি চালাক। আমিও কম চালাক না। বোকা লোকের চরিত্রে অভিনয় দেখিয়ে সুবোধ চরিত্রটি বাগিয়ে নিলাম।

চলচ্চিত্র দেখার অভিজ্ঞতা ও স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্য আছে। সমাজদেহে ব্যক্তিসত্তা সুবোধ বা ব্যক্তিমননের মধ্যে রয়েছে যে সুবোধ তার সন্ধান করি সুবোধ চরিত্রে অভিনয়ের তাগিদে। মনের মধ্যে নিত্য যে সুবোধ লালিতপালিত হয়, স্বপ্নের মধ্যে সে হয়তো ঘুম পাড়ে। সমাজে সুবোধরা আজ থেকেও যেন নেই, খুব ম্রিয়মান তার উপস্থিতি। কেন? চরিত্রায়ণের প্রশ্নে উত্তর খুঁজতে থাকি। ঢাকার দেয়ালে গ্রাফিতি দেখি, সুবোধ তুই পালিয়ে যা, সময় এখন পক্ষে না। দেখি, একজন ভাঙাচুরা মানুষ খাঁচা খুলে বেরিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু চাইলেই তা পারবে কি? সুবোধ সমাজের বহমান বাস্তবতায় টিকে থাকার পথ না পেয়ে মারা পড়ছে কিংবা পালানোর পথ খুঁজছে। নিজের সঙ্গে নিজের এমন বোঝাপড়া চলছে ভেতর ও বাইরের এই পরিস্থিতিতে। কাঁটা সিনেমায় মানসিকভাবে বিপর্যস্ত সুবোধের সঙ্গে থাকবে তার বউ স্বপ্না ।

এই পরিস্থিতিতে, মগবাজার কাঁটা ক্যাম্প বা নারিন্দার শ্যুটিং বাড়ি পর্যন্ত বোঝাপড়া চলেছে ডিরেক্টরের সঙ্গে। চলেছে নিবিড় পর্যবেক্ষণ। স্ক্রিপ্টে বর্ণিত সুবোধের কথাবলার ঢঙ কেমন, দেহ ভঙ্গিমা, আকার, ওজন, আর্থিক সামর্থ্য, শিক্ষাদীক্ষা, মনোগড়ন, পরিবারের মোট সদস্য, কেনই বা বারবার উদ্বাস্তু হতে হয় ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন ছবির পরিচালক টোকন ঠাকুর।

এরকম বহুমাত্রিক সুবোধ কাজ করে কাঁটা সিনেমার গল্প-চিত্রনাট্য লেখার গুণে। কাঁটার চিত্রনাট্য পড়েই মোহ বেড়ে যায়। ইচ্ছে জন্মে আবার পড়বার। বারবার জেনে নেবার আগ্রহ জন্মায় ঘটনার ঘনঘটায়। সুবোধ এমন একটি কাঙ্ক্ষিত চরিত্র, যে চরিত্রে অভিনয় করতে পারার স্বপ্ন থাকে যেকোনো অভিনেতার জীবনে। তেমনই আমার জীবনে সুবোধ চরিত্র করার সুযোগ এলো। আহা কি আনন্দ আকাশে বাতাসে! ঠিক একই মাত্রায় বা তার চেয়ে কঠিন হয়ে উঠল চরিত্র নির্মাণের সময়টা। এজন্য নাওয়া খাওয়া ঘুম উধাও হয়ে গেল।

আমার ওজন ছিল ৭৬ কেজি। পরিচালক বললেন, গ্রামের মুচির ছেলে ১৯৭১ সালে ঢাকায় সিনেমাহলে টিকিট বিক্রির চাকরি করে, কয় টাকাই বা আর বেতন পায়? সুবোধের ওজন ৬৫ কেজি হতে হবে। তারপর শুরু হলো আমার উপর নাৎসি নির্যাতন। প্রথমেই যা করা হলো, আমার খাবারের উপর সেন্সর আরোপ করা হলো। যা খেতাম আগে তা তিনভাগের একভাগ করা হলো। হরিজন সম্প্রদায়ের একজন মানুষ হিসেবে তৈরি করার জন্য মাটিতে খাবার দেওয়া হত আমাকে এবং অনেক সময় সামনে থেকে ভাতের থালা সরিয়েও নেওয়া হত। এখানেই শেষ নয়, হাতে দুড়মুজ ধরিয়ে ৫০ ফিটের একটি রাস্তা সমান করার কাজ দিলেন নির্মাতা, সাথে ইট ভাঙা তো আছেই। কাঁটা’র অন্যান্য টিম মেম্বারদের সহযোগিতা সমেত টানা ৩৬ দিনে নির্মিত সেই রাস্তা ’কাঁটা’ ছবিতেই দর্শক দেখতে পাবে। সিটি কর্পোরেশনের লোক নিয়ে আসা হয়েছে, কিন্তু বালতি বালতি গু পরিষ্কার করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আমাকে। অর্থাৎ ‘কাটা’র অন্যতম প্রধান চরিত্র সুবোধ চন্দ্র দাসকে। কারণ, পরিচালক বললেন, ‘হতে পারে সুবোধ মেথর বাড়ির ছেলে’। যা আমি কোনোদিন কল্পনাও করিনি। চোখ নাক মুখ বেঁধে আমাকে পিঠমোড়া করে বেঁধে শ্যুটিং বাড়ির উঠোনে ঘন্টার পর ঘন্টা ফেলে রাখা হয়েছে। ডিরেক্টর বললেন, ‘মনে করো কাল সকালবেলা ১৪ ডিসেম্বর, তোমাকে পাওয়া যাবে রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে’। ডিরেক্টর তার চরিত্রের প্রয়োজনে যা যা বলতেন সে অনুয়ায়ি অ্যাসিসট্যান্টরা আমাকে নির্মমভাবে বেঁধে ফেলত। আমার মনে হত বাড়াবাড়ি হচ্ছে। এমনকি এক অ্যাসিসট্যান্ট আমাকে একরাতে মেরে রক্তাক্ত করে ফেলল। আমি ধারণা করি, সে অ্যাসিসট্যান্ট ব্যক্তিগতভাবে আমাকে পছন্দ করত না। সহ্যই করতে পারতো না আদতে। রক্তাক্ত অবস্থায় ডিরেক্টরের কাছে বিচার গেলে তিনি বললেন, ‘এ তো আমি চাইনি’। আমি রীতিমত অসুস্থ হয়ে গেলাম। মিডফোর্ড হাসপাতালে ভর্তিও হলাম কিন্তু সুবোধ চরিত্রে অভিনয় করার নেশায় নিজেই ফিরে এলাম ‘কাঁটা’ ক্যাম্পে। তার দুয়েকদিন বাদেই আমি ‘কাঁটা’ ক্যাম্প থেকে পালিয়ে যাই। ভাবলাম দুই কোটি লোকের শহরে আমাকে আর খুঁজে পায় কে? কিন্তু আমার কী দুর্ভাগ্য! কাঁটা’র স্ক্রিপ্টসুপারভাইজার কাম অ্যাসিসট্যান্ট ডিরেক্টর তুরা পরবর্তী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে আমাকে ধরে ফেলে। হয়েছে কী, আমার বোনের কবিতার বইটি ছিল ’কাঁটা’ ক্যাম্পে, সেখানে ওর ফেসবুক প্রোফাইল লিংক ছিল। সেই লিংক ধরে আমার বোন চামেলী বসুর সঙ্গে যোগাযোগ করে তুরা। এবং আমি ধরা খাই, কারণ আমার নাম সুবোধচন্দ্র দাস আর আমার ভাইয়ের নাম পরাণ। ভালো ভালো কথা বলে ক্যাম্পে ধরে এনে আবার সেই নিপীড়িত সুুবোধচন্দ্র তৈরির অনুশীলন কেন্দ্রের ছাত্র, মুক্তি নেই, সুবোধের মুক্তি হয় না। সুবোধ পালাতে পারে না। সে সময়ে আমার চেহারার গদাই লস্করি নাদুসনুদুস ভাব কেটে যেতে থাকে। এবং আমার মধ্যে এক রুক্ষ শ্রমিকের অভিব্যক্তি ফুটে ওঠে। ব্যক্তিগত ভাবে এ আমার কাম্য ছিল না কিন্তু সুবোধ চরিত্রের প্রয়োজনে অন্তত তিনমাস এই ধরণের ৩৬টি ট্রিটমেন্ট আমার উপর করা হয়েছে। আমার ক্যারিয়ারে সুবোধ চরিত্রের গুরুত্ব কতখানি এটা যারা বুঝতে পারতেন না, তারা আমাকে স্বাস্থের ব্যাপার সর্তক করতেন বারেবারে, যদিও তারা ছিলেন আমারই সুহৃদ। কিন্তু আমার নির্মাতার প্রতি আস্থা ছিল। সেই আস্থা নিয়ে একদিন খুব গোপনে, ক্যাম্পের সবার চোখ এড়িয়ে ডিরেক্টরের কাছে গিয়ে প্রায় আধাঘন্টা চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকলাম। ডিরেক্টর বললেন, ’কী চাও?’ আমি হাউমাউ করে কেঁদে তার কাছে জানতে চাই, ’আপনি আসলে আমার কাছে কি চান?’ তিনি নির্বিকারভাবে বললেন, ‘সুবোধ, একটি চরিত্র চাই’।
কষ্ট ছাড়া কি কেষ্ট মেলে!
ক্যাম্পে সুবোধ চরিত্রে নতুন নতুন মুখ স্বপ্নার সঙ্গে মহড়া করে, আমি দেখতাম। স্ক্রিপ্ট পড়ি বারবার এবং প্রতিযোগিতায় নামি সুবোধ চরিত্র ধরে রাখার প্রশ্নে। ডিরেক্টর মনে মনে ধরে নিয়েছেন হয়ত আমি পারব, সেটা টিমের সদস্যরাও আন্দাজ করেছিলেন অনেকেই ।

’কাঁটা’ ছবিতে সুবোধ চরিত্র চারটি। এই চরিত্রে অভিনয় করতে পারার অভিজ্ঞতা চার সুবোধের চার রকম। পরিচালক যেমনটি চেয়েছেন। যেমন ১৯৮৯-৯০ সালের সুবোধ অনিমেষ আইচ ’কাঁটা’ ক্যাম্পে এলে তার জন্য চা সিঙারা পুরি এনে পরিবেশন করার দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। ছোট সুবোধ রাজশাহী থেকে সোহেল তৌফিক এলে তাকে খাটের ওপর বিছানা করে দিয়ে মেঝেতে ঘুমাতে হতো আমাকে। কারণ কি? ডিরেক্টরের চাওয়া একাত্তরের সুবোধকে বেশি সুবোধ হতে হবে। কারণ হিন্দু হয়েও শুধুমাত্র যুদ্ধের কারণে তাকে দাঁড়ি রেখে টুপি মাথায় দিয়ে কলেমা মুখস্ত করতে হচ্ছে, বাঁচার জন্য। এমনকি ১৯৭১ এর স্বপ্না রানি দাস বা আমার বউয়ের সিঁথির সিদুর মুছে ফেলা হলো, হাতের শাঁখা-পলা খুলে ফেলা হলো আমি বেঁচে স্বামী বেঁচে থাকতেই। আমি যে সিনেমায় একটি সেন্ট্রাল ক্যারেক্টার, সেই সিনেমারই আরেকটি ক্যারেক্টারের বিছানা করে দিতে হচ্ছে আমাকে। এ নিয়ে আমার মধ্যে যে মানসিক চাপ তৈরি হত না এমন নয়। অবশ্য সেটে সেরকম ভাব নিয়ে থাকার সুযোগ কারোরই ছিল না। ’৭১ সুবোধ চরিত্র নির্মাণে আমি শারীরিক ঝুঁকি নিয়েছি, ভয়ানক চ্যালেঞ্জ নিয়েছি, শরীরের ওজন ৭৬ থেকে ৬৪ কেজিতে এনেছি, রোগে ভুগেছি, কিন্তু কাজ করেছি কিসের নেশায়। বাংলার খেটে খাওয়া ঘাম ঝরানো নিম্নবর্গের মানুষের মুখের অভিব্যক্তিকে খুঁজে পেতে চেয়েছিলেন নির্মাতা। মুচি বাড়িতে ১৯৭১ সালের প্রিন্ট করে বাঁধানো লোকনাথের ছবি আনতে গেছি। ২৪ ঘন্টা ধ্যানস্থ থেকেছি, সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি প্রতিটি কাজে।


মানুষ ধ্যানস্থ থেকে কাজ করে গেলে সবই পারে। অনেক কাজ বাকি আছে। ভুতের গলির মহল্লাবাসীদের স্মৃতিপটে ঘুরেফিরে আসে ব্যাপারির বাড়ির ভাড়াটিয়া সুবোধ-স্বপ্নার কথা। নয়নতারা ফুটে থাকে পোড়োবাড়ির দেয়ালে। উঠোনে তুলশিগাছটি চোখে পড়ে। নারী পুরুষের লাশ তোলা হয়, কুয়ো থেকে। সেই লাশ ছিল স্বপ্না রানি দাস ও সুবোধ চন্দ্র দাসের। বেঁচে থাকবার আশায় একদিন যারা সাতক্ষীরার কোনো গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে পালিয়ে যেতে চাইলেও পালাতে না পেরে কুয়োর মধ্যে মরে গিয়েছিল।
‘কাঁটা’তে এইসব দেখতে পাবে দর্শক।
১। ভূতের গলির আজিজ ব্যাপারির বাড়ির পাতকুয়ো
২। সুবোধ চন্দ্র ও স্বপ্না ঢাকা থেকে পালাতে চেয়েছিল
৩। ভয়ার্ত সুবোধ ও স্বপ্না
৪। বিভ্রান্ত সুবোধ
৫। ভূতের গলিতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী
৬। ঢাকার দেয়ালে সুবোধের গ্রাফিতি
৭। মহল্লাবাসীদের সাথে মিলাদ পড়ছে সুবোধ

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত