কবি ঈশ্বরের জগৎকে ভেঙ্গে পুননির্মাণ করেনঃ সুধীর দত্ত

আজ ১২ এপ্রিল।কবি, সুধীর দত্তের জন্মদিন।ইরাবতীর পাঠকদের জন্য রইল কবি‘র কবিতা ও তাঁর কবিতা ভাবনা নিয়ে একটি গদ্য। কবি সুধীর দত্তের প্রতি রইল ইরাবতী পরিবারের পক্ষ থেকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা।



ছেঁড়া দ্বীপ
পাথর পাথর আর চারদিকে দিগন্তরেখার
নীচে যে কুহক জল
সে মাড়িয়ে চলে যায়‚ গোড়ালি অবধি বালি‚
গাঙ–পায়রাদের ডানার শুভ্রতা নিয়ে
সে দ্যাখে উজ্জ্বল রোদ‚ নৌকাটির সারা গায়ে
মাছদের আঁশ লেগে আছে।
এ গভীর মীনরাজ্য‚ পাথরের সিঁড়ি বেয়ে
নেমে যাবে আদিম স্ফটিক স্বচ্ছ জলে।
ও কি আর ফিরবে না? মৌসুমি রাস্তা বরাবর
ওই যে কুদরতি পথ‚ শামুক পাহাড়
দুই দিকে‚ ছেঁড়া দ্বীপ‚ সে চেয়েছে নারীর বুকের ওম নিসর্গের ভিতর‚ বিহ্বল
ঝাউয়ের ভুতুড়ে ছায়া‚ কেয়া ঝাড়‚ ছলাৎছল
চিৎ কাত‚ উপুড় পাথর জুড়ে

গুঁড়ো গুঁড়ো অবিরাম জল।


শব্দ ও উপাধি


রাশি রাশি ঢেকে আছে এক লজ্জা-কাতরতা, খুলি –খুলে ফেলি উপায় ছিল না, আজো নেই।উপাধি জড়িয়ে যায়, কাশ্মির থেকে আনা বহুমূল্য মেষশাবকদের তৃণ, আলোয়ানগুলি। বাতাসও সম্ভ্রান্ত বড়। আগুনের কাছে তাই রেখে আসি পশু-মাংস, ম ম করবে পুড়তে পুড়তে, না হয় তখনযাওয়া যাবে, একা একা, সমুদ্রের ধারে, প্রেয়সীরচুল ওড়ে, বাতাবিলেবুর মতো স্তন থেকেখসে পড়ে তুমুল যৌনতা। না, আর হলো না – যাওয়া, বোধহয়, আরো বেশি বল্কলেরা পুরু,আমাকে জড়িয়ে ধরে, ঢেকে দেয় লিপ্সা ও ডালিম

দুই

অন্ধকারে অবাধ ঢেউয়ের মতো বাসনারা আরো ঢের রূপান্তরকামীলাল কাঁকড়া। সৈকতে ও জলের ভিতর চরে, চরাচরব্যাপীতাদের মসৃণ দাঁড়া ধারালো ও তীক্ষন ঢুকে যায়।আমি ভাবি, পিছনে জলের নিচে যেখানে তরঙ্গ নেই,নিস্তরঙ্গ যেখানে মাছেরা থাকে – সরীসৃপ,যেখানে হাওয়ারা নেই, হাতিয়ারও নেই,আমি আছি, জলতলহীন, স্থির – দেখছি আমাকেইকীরকম অবিভক্ত, টুকরোগুলির মধ্যে, নিজেকে জড়িয়ে।

তিন

শব্দরা স্টেশনে নামল এইমাত্র। এবং তৎপরব্যাগ মাথায় হেঁটে যাচ্ছেহনহনিয়ে মাচান তলায়; পথে সিঁড়ির ওপরএনামেল বাটি পেতে খঞ্জ আর ভিখিরিরা;সমবেত প্রতিদ্বন্দ্বী, তাদের এড়িয়ে, কীভাবে নিজেকেবিশেষত ছায়াদের, চলোরুটি তড়কা ওদের খাওয়াই, সাড়ে ছত্রিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসহয়তো বা বৃষ্টি নামবে, শুনছি তো চন্দ্রকোনা শালবনি পেরিয়েএদিকেই ধেয়ে আসছে মেঘের সন্ত্রাস।শব্দরা এ ভ্যাপসা গরমেপ্যাচপেচে ঘামে ভিজে আর বেশিও মানবিকসাধারণ হবে।


সুধীর দত্তের কবিতা ভাবনাঃ

 

কবিতা যেরকম

প্রতিটা রাগের যেমন একটি রূপাবয়ব আছে, কবিতাও কবির কাছে তেমনি রূপবান এক ভাববস্তু। রূপ একটি নির্মাণ, ভিতর থেকে ঠেলে ওঠা একটি প্রকাশ। কী ঠেলে ওঠে? না, তার প্রতি মুহূর্তের বেঁচে থাকার বিস্ময়, তার আলো ও অন্ধকার, তার আলো ও তাপময় একটি সংগ্রামী বেড়ে ওঠা। সংগ্রাম এই জন্য যে, তাকে বেঁচে থাকতে হয় মৃত্যুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে। এই মৃত্যু ঐতিহ্যের প্রথাজড়তা, অভ্যাসের গন্ডি ও প্রতিষ্ঠিত রুচিবৃত্ত। বেঁচে থাকা মানে একই সঙ্গে অস্বীকার ও স্বীকরণ, গ্রহণ ও অগ্রহণ, ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে ব্যক্তি-প্রতিভার যুদ্ধ, যা ঐতিহ্যের সম্প্রসারণও। এই সম্প্রসারণে যেমন ঐতিহ্যের ভাংচুর ও পুনর্বিন্যাস ঘটে ব্যক্তি-কবিও তেমনি বারবার অতিক্রম করেন নিজেকে ভাষা ও ভাষ্যে, প্রসঙ্গ ও প্রকরণে।
কবি ঈশ্বরের জগৎকে ভেঙ্গে পুননির্মাণ করেন এবং বাস করেন এই বিকল্পে, প্রতিস্থাপিত বিশ্বে। এই জন্যই তিনি ঈশ্বরের প্রতিস্পর্ধী। আঙ্গিকের ভাঁজে ভাঁজে ফুটে ওঠে এই দ্রোহ, এই ক্রমজায়মান স্পর্ধা, বিনির্মাণের প্রহার, ঈশ্বরীয় বিশ্বের ভেঙ্গে পড়া টুকরো ও তার তেজস্ক্রিয় ধূলি। তার মাথার উপর নুয়ে পড়ে আকাশের ছাদ, গ্যালাক্সি আর নীহারিকাপুঞ্জ; এই ভয়ঙ্কর উড়ানপথে কবি এক তরুণ গরুড়, যাকে ভয় পায় দেবতারাও। তার তেজ গতি ও তীক্ষ্ণতায়। এই জাগ্রত ভূমি থেকে ভিতরের চাপে তিনি অনায়াসে উৎক্ষিপ্ত হতে পারেন চেতনার অধিলোকে এবং অবর ভূমির নির্জ্ঞানে। তার কবিতা এই উড়ান পথের ইতিবৃত্ত। সমাজ-বাস্তবতা এই জাগ্রতভূমির ক্ষুদ্রাংশমাত্র; আত্মজৈবনিক ক্ষুৎকাতরতা ও তার দংশন, অবচৈতন্য থেকে বুদ্ধদের মতো জাগ্রত ভূমিতে উঠে আসা কিছু মানবিক রক্তিমতা, ঐশী যাত্রাপথে যা কলঙ্কচিহ্নের মতো অন্ধকারের আবেশে আলো’কে সুন্দরতর করে। কবিতা ত্রিলোকী কবির এই পাখসাট, ডানার আওয়াজ। চেতনার মহর্লোকে কবির যে বাসগৃহ, সেখানে কবি নিজেকে অনুভব করেন মহাপ্রাণতাময় এক সমষ্টি-মানবরূপে। তিনি সেখানে সহস্রশীর্ষ, সহস্রপাদ ও সর্বোতশ্চক্ষু ঈশ্বর। ফলত তাঁর কবিতা বহুস্তরীয়, বহুমুখ, এবং অনেকান্ত। ব্যাপ্তি, গভীরতা ও উচ্চতায় তা যুগপৎ ঐশী ও আদিম। তার চলন একরৈখিক নয়, পরস্পরে অনুপ্রবিষ্ট এক কম্পমান বিপুলতা। তার ক্ষুধা সর্বগ্রাসী অপ্রশম্য ও নিরবধি।
তার পায়ের নিচে সাত পাতাল, মাথার উপর আদিত্যলোক। অন্তরীক্ষের অজস্র জ্যোতিষ্ক তাঁর শরীর; তবুও তিনি সৃষ্টির অতীত; কালের ভিতর দাঁড়িয়েও তিনি অতিক্রম করেছেন কালচক্র। ফলত তার কবিতা শুধু কাল নয়, কালের অতীত আর এক কালের গল্প, যেখানে মুছে যায় সময় ও সময়াতীতের ভেদরেখা। অতীত আর অতীত নয়, বর্তমানে পুনর্জাত হয়ে সে এক অনাগতের আভাস, যুক্তি-তক্কের শৃঙ্খল ভাঙ্গা এক অনির্বচনীয়তা। জীবন ও মৃত্যু তখন পরস্পরে অনুপ্রবিষ্ট এক রহস্যময় পূর্ণতা, এক আপাত-পারম্পর্যহীন বোধমাত্র। অর্থ নয়, ধ্বনির মধ্যে নির্ঋতির অন্ধকার থেকে বিচ্ছূরিত এক তড়িত-মোক্ষণ।
কবিতা এরকমই বৈখরী ভূমিতে পরা বাকের অবতরণ, রহস্যময় এবং ঐশী, বিনির্মিত এক নির্মাণ প্রক্রিয়া যা অনিঃশেষ এবং ক্রমজায়মান। কবিই সেই দিব্য উন্মাদ যিনি নিত্য প্রয়াস চালিয়ে যান সেই গুহামুখের অবরোধ ভেঙে ফেলবার, এবং বলে ওঠে-
আর যদি চিৎকার করি আকাশ ফাটিয়ে
এসো,
তোমার অঙ্গিরা-দেব পিতৃগণ, এসো
এই যে গুহামুখ তার
গোযূথ অশ্ব ও জল – জলরাশি
এক যোগে খুলে দিই, ভয়ঙ্কর সেই সুন্দরের যা সূচনা –

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত