শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প শুক্লপক্ষ

রাজা চলেছেন ভিখারির ছদ্মবেশে। ভিখারির চীরবাস পরনে, গায়ে মাখা ভুসোকালি, সর্বাঙ্গে ক্ষতচিহ্ন, একটি চোখ কানা, একটি পা খোঁড়া। তাঁর ছদ্মবেশে কোনও ত্রুটি নেই। হাতে ভিক্ষাপাত্র, শুধু তাঁর চীরবাসের অন্তরালে একটি গোপন কোমরবন্ধে লুক্কায়িত রয়েছে একটি চর্মপেটিকা। তাতে মহামূল্যবান মণিমাণিক্য, স্বর্ণখচিত রাজকীয় পাঞ্জা, এ সম্পদ যে লাভ করবে সে একদিনেই রাজ্যের শ্রেষ্ঠ ধনীদের অন্যতম হয়ে যাবে।

প্রতি মাসের শুক্লপক্ষে রাজা ছদ্মবেশে বহির্গত হন। প্রতি শুক্লপক্ষে রাজ্যের একজন ভাগ্যবান রাজানুগ্রহে ধনিত্ব লাভ করে আর লাভ করে রাজার অজেয় শক্তিধর পাঞ্জা, যার প্রভাবে সে রাজ্যের সর্বত্র মাননীয়, গণনীয় হয়ে ওঠে। তার কর্মের কোনও দোষ ধরা হয় না। তার ক্ষমতা রাজার তুল্যই হয়ে ওঠে প্রায়। সামান্য পার্থক্য মাত্র। সবাই জানে, অপেক্ষা করে, কিন্তু সেই ভাগ্যবানদের পরিচয় কেউ পায় না।

.

নাগরিক এবং প্রজাকুলে নানা শ্রেণির ব্যক্তি রয়েছেন। পূজনীয় ব্রাহ্মণেরা, শ্রদ্ধেয় ক্ষত্রিয়, মহাভাগ বৈশ্যকুল, নমস্য শূদ্রেরা। রয়েছেন কৃষিজীবী, বণিক, করণিক, শিক্ষাদাতাগণ, সৈনিক, শান্তিরক্ষী, শ্রমজীবী, প্রণম্যা বারবনিতারাও। এঁরা যে-কেউ রাজানুগ্রহ লাভের অধিকারী, যেমন কোনও ভিখারি কাঙাল, তেমনি আবার হয়তো ধনীদেরই কেউ।

শুক্লপক্ষে প্রতি রাত্রে প্রতিটি গৃহের সম্মুখে একটি করে দীপ জ্বলে। মানুষেরা নিত্যকর্ম বা গৃহকর্মের মধ্যেও অন্যমনস্ক থাকে। রাজকীয় পদধ্বনির জন্য সজাগ থাকে তাদের শ্রবণ, প্রাতঃকালে সকলেই দুয়ার উন্মোচন করে সাগ্রহে দেখে, তাদের অলিন্দে সিঁড়িতে বা অন্য কোথাও রাজা তাঁর চর্মপেটিকা উপঢৌকন রেখে গেছেন কি না। শুক্লপক্ষে প্রত্যেকেই রাজার চিন্তা করে। রাজার জন্য অপেক্ষা করে।

*

শুক্লপক্ষ শুরু হয়েছে।

নগরের একপ্রান্তে একটি ক্ষুদ্র বিপণি, নানা জাতীয় খাদ্যশস্য, মশলা বিক্রি করে বিক্রেতা। লোকটি অসাধু, ওজন চুরি করে, মূল্য বেশি নেয়, কটু কণ্ঠে দরাদরি করে।

কিন্তু শুক্লপক্ষে তার অন্য চেহারা। সে জানে, রাজা হয়তো এই পথ দিয়ে যাবেন। তিনি বিনীত, ভদ্র, সাধু ও নিরপেক্ষ ব্যক্তিকেই পছন্দ করেন। রাজা পছন্দ করেন শুভ্র পরিধেয়, পরিচ্ছন্ন, পরিবেশ, সংযত আচরণ। পছন্দ করেন আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, বংশগৌরবে গরীয়ান, বর্ণভিত্তিক বৃত্তি-আশ্রয়ী প্রজাকে। লোকটি তাই শুক্লপক্ষে ভিন্ন মানুষ হয়ে যায়।

প্রতিপদের সন্ধ্যায় এক আগন্তুক বিপণিতে প্রবেশ করল। লোকটি সসম্ভমে উঠে দাঁড়ায়। বহুবছর ধরে সে রাজার অপেক্ষা করছে। এই কি রাজা? রাজাকে সে দেখেনি। রাজা কোন বেশে আসবে তাও সে জানে না। তাই উগ্র সম্ভ্রমের সঙ্গে সে বলল,—আদেশ করুন ভদ্র, আপনার সন্তোষ ছাড়া আমার উদ্বৃত্ত কিছুই থাকবে না।

আগন্তুকের চেহারাটি রাজকীয় বটে। শালপ্রাংশু মহাভুজ, বৃষস্কন্ধ, তীক্ষ্ণ নাসা এবং তীব্র চোখ। ঈগল পক্ষীর একটা আভাস তার সর্বাঙ্গে। পরিধানে সূক্ষ্ম পশমি বস্ত্র, হাতে বলয় ও মূল্যবান অঙ্গুরীয়।

আগন্তুক ব্যবসায়ীর দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে বললেন—আমার কিছু শুষ্ক দ্রাক্ষা ও যবচূর্ণ প্রয়োজন।

বিক্রেতাটি দ্রব্য ওজন করে বিনীতভাবে পেটিকায় পূর্ণ করে দিল।

আগন্তুক দ্রব্যের পরিমাণ দেখে সবিস্ময়ে বললেন—কী আশ্চর্য! গতকাল আমার ভৃত্য এই বিপণি থেকে সমমূল্যের একই দ্রব্য নিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তা পরিমাণে এর দুই-তৃতীয়াংশ হবে।

আমি বিদেশি পর্যটক, এ-দেশের মূল্যমান জানি না।

বিক্রেতাটি নানাবিধ বিনয়ের শব্দ করে বলল—ভৃত্যরা সবসময়ে বিশ্বাসভাজন হয় না।

আগন্তুক চিন্তান্বিত মুখে বললেন—আমার ভৃত্যৃটি পুরাতন, এবং এতকাল বিশ্বাসভাজনই ছিল। এখন তার মতিভ্রম হয়ে থাকতে পারে।

এই বলে তিনি ব্যবসায়ীকে সাধুবাদ দিয়ে প্রস্থান করলেন। দ্রব্যপূর্ণ পেটিকাটি বহন করতে তাঁর কষ্ট হচ্ছিল। ভৃত্যটি অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, সুতরাং তাঁকে নিজে আসতে হয়েছে। বহনকার্যে তাঁর পটুত্ব কম।

রাস্তায় পদাপর্ণ করেই তাঁর কিছু স্মৃতিভ্রম হয়ে থাকবে। সম্মুখে অনেকগুলি পথ পরস্পরকে ভেদ করে গেছে। তিনি দিক নির্ণয় করতে পারছিলেন না। জনৈক পথিককে সবিনয়ে প্রশ্ন করলেন—আমি নগরের উত্তর ভাগে যাব, আমাকে সহজ পথটি দেখিয়ে দিন।

পথিক সবিস্ময়ে তাঁর মুখ নিরীক্ষণ করে সবিনয়ে বলল—ভদ্র, আপনার বোঝাটি আমার হাতে দিন। চলুন, আপনাকে পৌঁছে দিচ্ছি।

সঙ্গে-সঙ্গে অপরাপর কয়েকজন পথিক সাগ্রহে এগিয়ে এসেছিল। সকলেই আগন্তুককে অযাচিত সাহায্য করতে উন্মুখ। তাঁদের পরোপকারস্পৃহা দেখে আগন্তুক বিস্মিত হলেন। গত রাত্রিতে তিনি সদ্য এ-নগরে পদার্পণ করেছেন। এখনও সম্যক পরিচয় পাননি। যেটুকু পেলেন। তাতে বিমুগ্ধ হলেন। অচেনা পথিক যদি আত্মীয়েরও অধিক যত্নে অন্যের ভার বহন করে, যদি পথ প্রদর্শন করে দেয় তবে এ-নগরী অবশ্যই স্বর্গতুল্য।

.

সুঠাম রাজপথগুলি সম্পূর্ণ কলঙ্কমুক্ত। কোথাও কোনও আবর্জনা চোখে পড়ে না। তৈলসিক্তবৎ রাজপথের পাশেই হরিৎ তৃণক্ষেত্র, ছায়াময় বনস্পতির সারিবদ্ধ সৌন্দর্য। সূর্যোদয়ের বহুপূর্বেই পথমার্জনাকারীরা তাদের কর্মে তৎপর হয়েছে। রাজপথে প্রথমে সম্মার্জনীতে ধূলিমুক্ত করে তৎপরে চন্দনচূর্ণমিশ্রিত জলে নিষিক্ত হচ্ছে। কর্মীরা গান গাইছেন। তাঁদের মন হর্ষোৎফুল্ল। হয়তো রাজা এই পথে, এই সময়ে যাবেন।

এক বাতুল ভাগ্যান্বেষী কর্মসন্ধানে এসে আশ্রয়লাভে নিশ্চেষ্ট হয়ে বৃক্ষতলে নিদ্রিত। অন্য সময় হলে তার ভাগ্যে সম্মার্জনীর আঘাত লাভ হতে পারত, কারণ এ-রাজ্যে পথবাস নিষিদ্ধ। কিন্তু আজ একজন পুরকর্মী তাকে দেখতে পেয়ে কাছে গিয়ে অবনত হয়ে বিনয়বচনে বললেন— মহাশয়, এ বৃক্ষচ্ছায়া আপনার নিরাপত্তার পক্ষে প্রশস্ত নয়। ভদ্র, এই দীনের কুটীরে চলুন। আমার স্ত্রী আপনাকে পাদ্যার্ঘ্য দিয়ে বরণ করবেন। আমরা অতিথি ও দেবতায় পার্থক্য করি না।

এই বলে পুরকর্মী পথিকের মুখশ্রীর দিকে অপলক চেয়ে রইলেন। তাঁর হৃদয়ে অমরাবতীর ঘণ্টা বাজতে লাগল। রাজা! এই কী রাজা!

পথিক এই আতিথেয়তায় মূক হয়ে আবেগে অশ্রু বিসর্জন করে বললেন—এই ভাগ্যহীনের জীবনে এমন সমাদর আর ঘটেনি। আপনার মঙ্গল হোক।

সেদিন ভাগ্যান্বেষীর ভাগ্যে পূর্ণ আহার জুটল। তিনি বিশ্রামের জন্য শয্যা পেলেন। সে রাত্রে তাঁর দেহে পক্ষীকুলের পুরীষ বর্ষিত হল না। শুক্লপক্ষের তৃতীয়া তিথিতে নগরের দক্ষিণভাগে এক গৃহস্থের ঘরে এক শিক্ষানবিশ চোর সিঁধ কাটছিল। অন্য সময় হলে সে অবশ্যই কৃতার্থ হত। কিন্তু এই শুক্লপক্ষে গৃহস্থরা রাজার অপেক্ষায় উত্তর্ণ থাকে। তাদের নিদ্রা অত্যন্ত ভঙ্গুর, মায়ামৃগের মতো তা ক্ষণে-ক্ষণে পালায়।

গৃহস্থ উঠলেন। চোরটি তখন সদ্য গৃহে প্রবেশ করেছে। গৃহস্থের একেবারে সম্মুখে পড়ে। গেল। ভয়ে সে তটস্থ। গৃহস্থেরও সেই অবস্থা। করজোড়ে বললেন—আপনার যাঞ্চা কী?

চোর সভয়ে বলিল—আমি পরস্বাপহারক। আমাকে দয়া করে লঘু শাস্তির বিধান করুন। আমি অপরাধ স্বীকার করছি এবং আত্মসমর্পণ করছি।

গৃহস্থ মৃদু হাসলেন। রাজা কোন বেশে আসবেন তা তো কেউ জানে না। চতুর রাজা কত পরীক্ষা করেন মানুষকে, কতভাবে কাছে আসেন। তিনি স্নিগ্ধ বচনে বললেন—ঈশ্বরের করুণায় আমার তৈজসপত্র ও সম্পদ আপনার তুলনায় বেশি। আপনার সঙ্গে ঐশ্বর্য ভাগ করে নিয়ে সমবন্টন ও সমভোগের আনন্দ লাভ করতে দিন। কোনও মানুষই তার বৃত্তির জন্য পতিত হয় না, যদি সে অভাবগ্রস্ত ও নিরুপায় হয়। আপনি আশ্বস্ত হোন, আমি চৌরোদ্ধরণিক ও শান্তিরক্ষীর হাতে আপনাকে সমর্পণ করব না। বরং এতকাল যে আমি আমার পরিবেশ সম্পর্কে উদাসীনতাবশত আমার সম্পদ একা ভোগ করেছি সেজন্য আমি লজ্জিত। আপনার অবস্থার জন্য আমিই দায়ী।

এই বলে গৃহস্থ চোরকে আলিঙ্গন করলেন। সদ্য নিদ্রোথিত তাঁর স্ত্রী-পুত্র কন্যারা এই স্বর্গীয় দৃশ্য দেখে স্ত্রীলোকেরা উলুধ্বনি ও পুরুষরা করতালি দিল।

স্ত্রৈণ ও কাপুরুষ ব্যক্তিকে রাজা পছন্দ করেন না। তা বলে রাজ্যে স্ত্রৈণ ও কাপুরুষ ব্যক্তির অভাব নেই। প্রায় সকলেই তাই।

রাজার রাজস্ব বিভাগের কর্মী এক দুর্বলচিত্ত লোকের মুখরা স্ত্রী ছিল। শুক্লপক্ষের প্রতিপদ থেকেই স্ত্রীর কণ্ঠস্বর নিম্নমুখী হয়েছে। গৃহে শান্তি বিরাজমান। হতক্লান্ত লোকটি দিনশেষে, কর্মাবসানে গৃহে প্রত্যাবর্তনের চিন্তায় বিভীষিকা দেখত।

এখন সে অনায়াসে, অকুতোভয় গৃহে প্রত্যাগমন করে। রাজা মুখরা স্ত্রীলোক পছন্দ করেন না। রাজা পছন্দ করেন পতিভক্তিপরায়ণা, গৃহস্থলক্ষ্মী।

লোকটি গৃহে প্রত্যাগমন করলে অপরাপর দিনের মতো দজ্জাল স্ত্রী অভাব অভিযোগের কথা তোলে না। বরং গৃহ-মার্জনা করে, সাংসারিক কর্তব্যগুলি সমাধান করে, সূর্যাস্তকালে স্নানান্তে। দক্ষিণের দ্বারদেশে বসে সযত্নে দেহের পরিচর্যা করে, যাতে স্বামী দেখে খুশি হন। গুণ্ঠনে। লজ্জাবতী হয়ে কপাটের আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকেন উৎসুক নেত্রে। বধূটি জানে, এখন শুক্লপক্ষ। রাজার চোখ ঘুরে বেড়াচ্ছে সর্বত্র।

লোকটিও জানে। অপরাপর দিন গৃহে প্রত্যাগমনের পরই লোকটি কূপ থেকে জল উত্তোলন করে, শিশুকে কোলে করে থামায়, স্ত্রীর অপারগতাহেতু পড়ে থাকা গৃহকর্ম করে দেয়, এমনকী স্ত্রীর ললাট-বেদনার উপশম কল্পে সেবা করে।

লোকটি চতুর্থী তিথিতে ঘরে ফিরে এল। স্ত্রী জল উত্তোলন করে রেখেছেন, সে হস্তাপদ প্রক্ষালন করল। তার চলায় ফেরায় পুরুষোচিত্ত গাম্ভীর্য ও উপেক্ষা। গৃহকর্মের কিছু শিথিলতা প্রত্যক্ষ করে স্ত্রীকে সংক্ষিপ্ত উপদেশ দিল। স্ত্রী স্বামীর সম্মুখে আসন পরিগ্রহ করলেন না। দণ্ডায়মান থেকে সমস্ত বিনীত বদনে শুনলেন, এবং অপরাধ স্বীকার করলেন।

স্বামীর লঘু আহার্যের ব্যবস্থা করে স্ত্রী তাঁর বিশ্রামের ব্যাঘাত যাতে না হয় সেইজন্য পুত্রকন্যাদের গৃহান্তরে নিয়ে গেলেন। অপরাপর দিন তিনি যেমন পুত্র-কন্যাদের কাছে তাদের পিতার চরিত্রের নানাবিধ দুর্বলতার কথা বলেন, আজ তা মোটেই করলেন না। বরং বলতে লাগলেন—তোমাদের পিতা এক মহৎ পুরুষ। তাঁর চরিত্রের দীনভাব, অক্ৰোধী স্বভাব, সেবাপরায়ণতা ও ত্যাগ দৃষ্টান্তস্বরূপ। তিনি সহনশীলতায় পর্বততুল্য। তোমরা তোমাদের জীবনে তাঁর অনুসরণ করো। তিনি আমার দেবতা, তোমাদেরও তিনি ধ্যেয় হোন।

এইসব কথা তিনি আবেগের সঙ্গে বললেন। বলতে-বলতে চোখে জল এসে গেল। রাজার সহস্র শ্রবণ উৎকর্ণ রয়েছে চারদিকে! তিনি কি শুনছেন?

.

কর গ্রহণের জন্য নাগরিক ও জানপদবর্গের কাছে ঘুরে বেড়াচ্ছে করবিভাগের রাজকর্মচারীরা। তারা সকলের কাছে গিয়ে বলছে কর মানে হাত। করগ্রহণ মানে হাতে হাত মিলানো। আপনারা উন্মুক্ত হৃদয়ে সহযোগিতার হাতখানি প্রসারিত করুন। প্রদান ও গ্রহণে আমাদের হৃদয়ের বিনিময় হোক। বন্ধুত্ব, সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্ব উজ্জ্বল হোক।

চাষি, নাগরিক ও ব্যবসায়ী সবাই করপ্রদানে উন্মুখ। রাজকর্মচারীরা গলদঘর্ম হচ্ছেন, তবু হাসিমুখে তাঁরা কাজ করে যাচ্ছেন। বিতর্ক নেই, কটুভাষণ নেই, হিসাবের গোলমাল নেই, করপ্রদানকারীরা উচ্চৈস্বরে বলছেন—রাজাকে যা দেওয়া যায় তার দশগুণ ফিরে আসে। আমার যে বাহু কর দেয় সহস্র বাহু এসে সেই বাহুর শক্তি বৃদ্ধি করে।

সবাই জানে, রাজা দেখছেন, রাজা শুনছেন।

শান্তিরক্ষীরা ঘুরছেন সর্বত্র। তাঁদের চোখে ঠমক, বা মুখে কটুকাটব্য নেই, তাঁরা অপরাধীকে অন্বেষণ করার চেয়ে অপরাধের অন্বেষণেই বেশি তৎপর। অপরাধ সংঘটনের আগেই তা নিবারণ করছেন। উদ্যোগী হত্যাকারীর হাত হত্যার আগেই তাঁদের হস্তে ধরা পড়ছে। লুণ্ঠনকারীরা লুণ্ঠনের সুযোগ পাচ্ছে না। প্রতি অর্ধপ্রহরে শান্তিরক্ষীর শকট সর্বত্র পরিভ্রমণ করছে। নিরলস সজাগ সতর্ক।

বহিরাগত বণিকেরা রাজকর্মচারীদের করণে উপস্থিত হচ্ছেন কর্মময় দিবাভাগে। একজন বললেন—আমার এ-রাজ্যে ব্যবসায়ের আজ্ঞাপত্রটি এখনও স্বাক্ষরের অপেক্ষায় আছে। সময় মূল্যবান। এই বলে উনি কোষ থেকে মুদ্রার পেটিকা বের করেন উৎকোচ প্রদানের জন্য।

সংশ্লিষ্ট রাজকর্মচারী সভয়ে চেয়ে থাকেন। রাজা নয় তো!

এই হয়তো রাজা! তিনি হাত বাড়িয়ে উৎকোচ প্রদানরত হাতখানি চেপে ধরে বলেন—শ্রদ্ধাভাজন, আপনার সেবার জন্যই আমি বেতনাদি লাভ করি। তাতেই আমার চলে যায়। অতিরিক্ত কিছুই ভালো নয়। আপনার আজ্ঞাপত্রটি অবিলম্বে স্বাক্ষর করে দেওয়া হচ্ছে।

অকুতোভয়ে সালঙ্কারা যুবতীরা, কামিনীকুল চলেছে রাজপথে। পুরুষেরা তাঁদের দিকে দৃষ্টিক্ষেপ করছে না, কেবলমাত্র পদপ্রান্ত ছুঁয়ে যাচ্ছে তাদের শ্রদ্ধাসিক্ত দৃষ্টি। তাঁদের আভরণ বা। দেহসৌন্দর্যকে অনুসরণ করছে না কোনও লোভী বা কামুকের দৃষ্টি। যুবকেরা সসম্মানে পথ ছেড়ে দিচ্ছে। শুক্লপক্ষে কোনও যুবকই কোনও যুবতীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয় না। রাজা বলেন, পুরুষদের বিবাহ-প্রস্তাব পৌরুষের পক্ষে হানিকর। পুরুষদের থাকবে কর্মতৎপরতা, মঙ্গলমুখী সুরত। সে কেন নারীচিন্তা করবে?

এমনকী স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে দেহমিলনও শুক্লপক্ষে নিয়ন্ত্রিত হয়। স্ত্রীর আগ্রহ ও প্রস্তাব ব্যতিরেকে কোনও পুরুষই স্ত্রীর সঙ্গে উপগমন করেন না। স্ত্রীর সম্মতি ব্যতিরেকে দেহমিলন বলাৎকারের তুল্য অপরাধ।

বারবনিতাদের পল্লিতে স্নিগ্ধ দীপ জ্বলছে। দরজার পাশে মঙ্গলঘট। পত্রে পুষ্পে শোভিত দ্বারদেশ।

আমোদপ্রিয় নাগরিক এসে উপস্থিত হলেন একটি গৃহে।

সুসজ্জিত পতিতাটি ভূমিতে লুটিয়ে প্রণাম করলেন। করজোড়ে বললেন—প্রভু, আমি প্রকৃত নারী নই, নারীত্বের ছায়ামাত্র। হৃদয় ও প্রেম ছাড়া নারীর আর কোনও সম্পদ নেই। গৃহ ও সংসার ছাড়া তার কোনও আশ্রয়ও থাকে না। আমি ব্যতিক্রমদুষ্টা, শাশ্বত নারীত্বের আমি কেউ নই। আমি শরীরী মাত্র, রোগ সংক্রমণের ভয়দুষ্টা। আমি কেবল সাময়িক কামহরণ করতে পারি, কিন্তু পুরুষকে তৃপ্ত করতে পারি না। আতিথ্য গ্রহণের আগে আমাকে আশীর্বাদ করুন যেন আমি এই পঙ্কিলতা থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তা হই।

নাগরিক বিস্মিত হন, বলেন—ভদ্রে, ভূমিকার কী প্রয়োজন? আমরা কেউ কারও কাছে বদ্ধ নই। আমি নিজেও প্রবৃত্তি-আক্রান্ত, ক্লান্ত ও পিপাসু। আমাকে আশ্রয় দাও। তুমিও প্রার্থনা করো, যেন আমি প্রকৃতিজাত দুষ্ট আচরণ থেকে মুক্ত হই। পুরুষের প্রধান পৌরুষ সংযমে ও আত্মশাসনে। আমিও ব্যতিক্রমদুষ্ট, অসহায়। তোমার গৃহের ধূলার স্পর্শ আমার ললাটে মঙ্গলচিহ্নস্বরূপ লেপন করো।

রাজা শুনছেন। রাজা দেখছেন।

আজ পূর্ণিমা।

শূন্য সভাকক্ষে দীপ নির্বাপিত। চারজন প্রস্তরীভূত নীরব দৌবারিক চারটি দ্বার প্রহরা দিচ্ছে। নিস্তব্ধতা।

রাজা সিংহাসনে বসে আছেন। সামনে প্রসারিত তাঁর ক্লান্ত পা, দুটি হাত দুদিক থেকে উঠে এসে গম্বুজের মতো ভার রক্ষা করছে তাঁর চিবুকের। অন্ধকারে তাঁর মুখ দেখা যাচ্ছে না। কেবল ঈগলচঞ্চর মতো তাঁর দীর্ঘ নাসার সামান্য আভাস পাওয়া যায়। কপিশ চোখ দুখানিতে জ্যোৎস্নার প্রতিবিম্ব। আর তাঁর মুকুট থেকে একটি মাণিক্যের দ্যুতি মাঝে-মাঝে প্রতিভাত হচ্ছে।

রাজা একা। রাজা নীরব।

সভাগৃহের অলিন্দের স্তম্ভগুলির পরিসর দিয়ে জ্যোৎস্নার দুগ্ধধারা ভেসে আসছে। আজ শুক্লপক্ষের শেষ।

রাজা বসে রইলেন। চিন্তান্বিত। ব্যথিত। উদ্বিগ্ন। নগরীর কোলাহল তাঁর কানে আসছে। কাল থেকে তিনি নগর বা জনপদ পরিভ্রমণ করবেন না। কাল থেকে পক্ষকাল কৃষ্ণপক্ষ।

গভীর একটি শ্বাসমোচন করলেন তিনি।

সভাকক্ষে সারি-সারি শূন্য আসনগুলির মধ্যে হঠাৎ একটি বিশীর্ণ ছায়া নড়ে উঠল। চন্দ্রালোকের আভায় দেখা গেল একটি মানুষ যেন এইমাত্র প্রেতলোক থেকে শরীর-গ্রহণ করল। দীর্ঘ পদক্ষেপে এগিয়ে আসতে লাগল রাজার দিকে।

রাজা বিস্মিত বা চমকিত হলেন না। তাঁর কপিশ চোখ কেবল স্থির চোখে ছিল। ওষ্ঠে একটু দয়ালু হাস্য।

রাজা নিজের অঙ্গুরীয় নিরীক্ষণ করতে-করতে বললেন—তুমি কে?

লোকটি অশ্রুরুদ্ধ কণ্ঠে বলল—মহারাজ, আমিই সেই ভাগ্যবান যার ভাগ্য এই শুক্লপক্ষে আবর্তিত হয়েছে।

রাজা গম্ভীরকণ্ঠে বললেন—দ্বারে দৌবারিক, প্রাসাদ সুরক্ষিত, এখানে প্রবেশ করলে কী উপায়ে?

অমার্জনা করে লোকটি হাসল। বলল—সর্বজ্ঞানই আপনার অধীন। আপনি সবই জানেন। হে দয়াল রাজা, আমি একদা নরহত্যা, নারীধর্ষণ, পরস্বাপহরণ সবই করেছি। নগরীর যে-কোনও সুরক্ষিত গৃহে গোপনে প্রবেশ করা আমার কাছে অতি সহজ।

রাজার মুকুটের সেই মাণিক্যের দ্যুতি লোকটির চোখে এসে পড়ল। রাজা বললেন— তারপর?

—রাজাদেশে আমার দীর্ঘ মেয়াদের কারাদণ্ড হয়।

—তুমি কি অনুতপ্ত? তোমার প্রায়শ্চিত্ত কি সম্পূর্ণ?

লোকটি তার বিশীর্ণ মুখ তুলে বলল—রাজা আমি তার কি জানি। যখন বিচারের জন্য আপনার সম্মুখে আনীত হয়েছিলাম তখনই আপনাকে প্রথম দেখি। ওইরূপ সুঠাম সুন্দর তনু, ওই রাজকীয় গাম্ভীর্য ও করুণাঘন মুখশ্রী, কপিশ চোখের স্নেহ ও তীব্রতা আমাকে বাকরুদ্ধ করে দেয়। আমি বিহ্বল হয়ে পড়ি। সেই বিহুলতা এমনই ছিল যে আমার দণ্ড কতখানি কঠোর তা পর্যন্ত আমি অনুভব করতে পারিনি। তারপর দীর্ঘ কারাবাস। কারাগারে আমাকে কঠোর অনুশাসনে চলতে হত, ছিল অসম্ভব কায়িক শ্রম, নিদ্রা বা আহার যথেষ্ট ছিল না। শুনেছি, প্রতি শুক্লপক্ষে রাজা বহির্গত হন, অনুসন্ধান করে উপযুক্ত ব্যক্তিকে তাঁর উপঢৌকন দিয়ে যান। সেই উপঢৌকনের সঙ্গে থাকে রাজকীয় পাঞ্জা, যার প্রভাবে যে-কেউ রাজার প্রায় সমকক্ষ হয়ে ওঠে। প্রতি শুক্লপক্ষে লক্ষ-লক্ষ প্রজার মতো আমিও প্রতীক্ষা করতাম রাজকীয় পদধ্বনির। যদি রাজা আসেন, যদি তাঁর দয়া হয় তবে আমি মুক্তিলাভ করব, ঐশ্বর্যশালী হব। প্রতীক্ষায় এবং বিরহে দিন কাটে। শ্রম বড় কষ্টকর হয়ে ওঠে, কারাবাস অনন্ত বলে মনে হয়। স্ত্রী-পুত্রদের ভবিষ্যৎ জানি।

কারাবাসে কোনও প্রমাদ নেই, স্নেহ নেই, আত্মমর্যাদা নেই। কিন্তু আমার একটি চিন্তা সর্বদা ছিল। রাজার চিন্তা, রাজকর্মে, নিদ্রায়, জাগরণে, সর্বদাই মন বলত, রাজা আসবেন। রাজা উপহার দেবেন, মুক্তি দেবেন। ক্রমে এই চিন্তায় আমি এক অসহনীয় সুখ লাভ করতে থাকি। মাঝে-মাঝে অভিমান হত, রাজা আসে না কেন? এই অভিমান থেকে একদা আমার প্রলোভন বিদায় নিল। আমি প্রতিদিন শয়নকালে ও শয্যাত্যাগের সময়ে প্রার্থনা করতাম রাজা, আমি উপঢৌকন চাই না, মুক্তিও নয়। মহারাজ, মানুষ এ-রাজ্যে শুক্লপক্ষে সদাচার করে, কৃষ্ণপক্ষে যথেচ্ছাচার। কারণ কৃষ্ণপক্ষে আপনি রাজাবরোধে থাকেন, বহির্গত হন না। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে বিপরীত হয়। আপনার প্রতি আমার পিপাসা এত বেড়ে ওঠে যে শুক্লপক্ষের প্রতীক্ষা শেষ হলে কৃষ্ণপক্ষব্যাপী আমি আরও ব্যাকুল হয়ে আপনার অনুধাবন করতাম। আপনার প্রদত্ত ঐশ্বর্য নয়, আপনাকেই আমার প্রয়োজন। আর কিছু চাই না। আমার কারাবাস আরও দীর্ঘতর হোক বা। আমাকে মৃত্যুদণ্ডই দেওয়া হোক, আমি কেবল আপনার মুখশ্রী তার বিনিময়ে একবার মাত্র প্রত্যক্ষ করতে চাইতাম! এইভাবে আমার কারাবাসের সময় উত্তীর্ণ হয়ে যায়। চতুদর্শী তিথিতে, শুক্লপক্ষে, গতকাল আমি মুক্তিলাভ করি। ইতিমধ্যে আমার স্ত্রী গতপ্রাণা হয়েছেন, পুত্রকন্যারা ইতোভ্রষ্টস্ততঃনষ্ট হয়েছে, কারও উদ্দেশ জানি না। একাকী রাজপথে চলেছি, মন কেবল বলছে —রাজা! রাজা! শুক্লপক্ষের চতুর্দশী, রাজা ছদ্মবেশে পথে বিচরণ করছেন। তাই আমি পথচারীদের দিকে তাকাই, পরিচর্যা করি। সকলের মুখেই আমার রাজার আদল দেখতে পাই। তবু বুকভরা হাহাকার—রাজা! দেখা দাও। রাত্রিবাসের স্থান ছিল না। এক বৃক্ষতলে শয়ান ছিলাম। আজ ব্রাহ্ম-সময়ে ঘুম ভেঙে দেখি আমার বুকের ওপর আপনার সেই পেটিকা। তাতে রাজার ঐশ্বর্য, রাজকীয় পাঞ্জা।

এই বলে লোকটি তার কোমর থেকে লুক্কায়িত পেটিকাটি বের করে কৃতাঞ্জলিপুটে রাজার সামনে ধরে রইল। বলল—আপনার পেটিকা। গ্রহণ করুন মহারাজ।

রাজা মৃদুহাস্যে বললেন—তুমি গ্রহণ করবে না?

লোকটির মুখ অশ্রুতে ভেসে যাচ্ছিল। বলল—আপনার পবিত্র পাঞ্জা আমি বক্ষদেশে সংলগ্ন রেখেছি, কারণ তাতে আপনার হাতের ছাপ আছে। আর, আপনার যা কিছু ঐশ্বর্য আছে তা সবই আমি পেয়েছি। রাজদর্শনের বিধি অনুসারে এটুকু আমার রাজদর্শনের প্রণামীস্বরূপ আপনি গ্রহণ করুন।

রাজা উচ্চহাস্য করলেন। দৌবারিকরা ছুটে এল। রাজা হস্তোত্তোলন করে তাদের নিবারণ। করলেন। তারপর সিংহাসন থেকে দু-হাত প্রসারিত করলেন রাজা। বললেন-বৎস দাও। কিন্তু আমাকে স্পর্শ করো না। তোমার প্রেম এতই তীব্র যে আমাকে স্পর্শ করলেই তুমি লয় পাবে।

লোকটি দিল। রাজা গ্রহণ করে বললেন—প্রতি শুক্লপক্ষের পূর্ণতিথিতে এই পেটিকাটি আমিই লাভ করি বৎস।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত