আফরোজা সোমা’র কবিতা

আজ ০২ অক্টোবর অধ্যাপক,সাংবাদিক,কবি ও কথাসাহিত্যিক আফরোজা সোমা’র জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

আমি

ফুল হতে বাতাসে মিশে যাচ্ছে যে রেণু,
এ তার মতই- অলক্ষণীয়;
কিন্তু নয় গন্তব্যহীন,
নিদারূণ ধূ ধূ একাকীত্বই এর রহস্য;
‘নাই’ হওয়াটাই তার অবিনাশের পথ।

কে বলে, এর নামে বাজি ধরো না!

পরাগ রেনু, যে উড়ে যায়
দলছুট ঘোড়ার কেশরের বাতাসের টানে;
তার নামেই শুরু হোক যত বাজির দান!

 

সোনাই

ছুঁইও না আমারে তুমি, আমি আজ জলে টলোমলো।

 

এইটুকু বলিয়া সোনাই রোদনে মজিল। সোনাইয়ের দুঃখে কান্দে গাছের পাতা যত। সোনাইয়ের দুঃখে কান্দে বনের পাখি শত।

 

সোনাইরে চিনি না আমি। শুধু জানি তার নাম।

 

দাদিজান বলেছে আমায়, সোনাইয়েরা কোনো দিন মরে না সংসারে; সোনাইয়েরা কোনো দিন বাঁচে না সংসারে। নানা দেহে সোনাইয়েরা চিরকাল ফিরে ফিরে আসে সংসারে।

 

অবশেষে বুঝিলাম মনে, আমারই দেহের ভেতর সোনাই বাস করে;  আমারই নয়ন দিয়াই সোনাই কান্দে।

 

সোনাইয়েরে জিগাই আমি : ও সোনাই তুমি কান্দো কেরে, তোমার দুঃখ কিয়ের কও।

সোনাই তো বলে না কিছুই, থাকে নিরুত্তর।

সোনাইরে পুনরায় করি জিজ্ঞাস : তোমার দুঃখ কিয়ের, কও।

মৃদু স্বরে বলে সোনাই :  আমি আমার কান্দন কান্দি নাগো, তোমার কান্দন কান্দি।

 

সোনাইয়েরে ডাকি আমি, চাই তার তাবৎ পরিচয়।

সোনাই তো বৃত্তান্ত জানায় না কিছুই। শুধু কয়, আকাঙ্ক্ষাই সংসারে সোনাই বলে পরিচিত হয়।

 

সোনাইয়ের লাগে না ভালো সংসারে। সোনাইয়ের লাগে না ভালো নিতি নিতি এই মরে যাওয়া। তবু, সোনাই ফিরে ফিরে আসে সংসারে। তবু, আমাদের মনের মধ্যে এক সোনাই বসত করে।

 

ভালোবেসে একদিন

তখনও কোমলতা ছিল
গাছে গাছে ফুটেছিল জারুল প্রচুর,
তখনও পরস্পর পুরোটা জানি না আমাদের,
তখনও ভোরের রোদ কী সুন্দর, ‘শুভ সকাল’
বলতে বলতে এসে বসেছে জানালায়।

রোদের সায় পেয়ে, জারুলের প্রাচুর্য নিয়ে,
আরও কোমলতর কেন হয়ে ওঠে মানুষ?
কেন আরো পরস্পর জানাজানি চায় তারা?
কেন আরো বেশি ভালোবাসতে চেয়ে একদিন
তারা খুঁজে পায় ভালো না বাসার যথেষ্ঠ কারণ?

 

সুইমিংপুলে মনোলগ

কেমন যেন ভালোবাসা ভালোবাসা বোধ হচ্ছে
কেমন যেনো বোধ হচ্ছে শূণ্যতা;
মুখের ভেতর কেমন যেনো তেতো তেতো লাগছে
এ-কি প্রেম!

এই সুন্দর রোদ্দুরে, ফুরফুরে হাওয়ায়
সুইমিংপুলের চারিদিকে ছড়ানো প্রাণের মাঝে এসে
প্রেম প্রেম ওম ভেবে এ কেমন শূন্যতার ধাত!

শোনো, সামান্য বিরতি নিয়ে জল থেকে উঠে
মেয়নিজ দিয়ে ফ্র্যাঞ্চফ্রাই আর একটা বিয়ার নিয়ে
রোদ্দুরে খানিক বসো, খাও, জিরাও,
সঙ্গে একটা সিগারেট ধরিয়ে দাও আরামসে টান;
তারপর দেখো — রোদেলা আকাশের নিচে
গাছের সবুজ কী সুন্দর!
ছেলেদের সুঠাম শরীর কী সুন্দর!
মেয়েদের গোলাপ তণু,
ছিনালের মুখের পবিত্র আভা,
পকেটমারের মুখ– কী সুন্দর!
তোমার মুখের তেতো স্বাদ– কী সুন্দর!
ভালোবাসা ভালোবাসা বোধ– কী সুন্দর!
অদ্ভুত অলঙ্ঘনীয় শূণ্যতা,প্রেম, সেও, আহা! সুন্দর!

 

কালিদাসের বউ-এই কালে

উড়ে গেছে মায়াপাখি দূরে শহরের নিদারূন ব্যস্ততায়,
কী করুণ অপেক্ষায় বউ তার কাজের ফাঁকে ফাঁকে
বারে বারে আকাশের দিকে চায়; এই বুঝি
এলো বুঝি মেঘমালা তার কুশল জানতে এলো।

মায়ামেঘ থামে না, উড়ে উড়ে দূরে দূরে যায়,
যায় পাখি শহরে; তাই, সব পাখি নিজ ঘরে
প্রতিদিন থাকে না তো আর;
থাকে শুধু তন্বী বধূ ঘর ভরা লোক মাঝেও
থাকে সে একা; তার সাথে রয়ে যায়
কালিদাস কবি হতে উড়ে আসা মেঘের কাহন;
রয়ে যায় কপালের মাঝখানে
অস্ফুটে রেখে যাওয়া আলতো চুম্বন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত