শূন্য চাবি


আজ ২৫ জুন কবি,কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক পারমিতা চক্রবর্ত্তীর জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


চারুলতার চোখে স্বপ্নের জলকেলি। আঠারোর তরুণী চারুলতা শিক্ষিত, স্মার্ট। বাবা মামা’ র একমাত্র মেয়ে হয়েও চারু চিরকালই মাটির গন্ধ পছন্দ করত৷ সৌন্দর্যের দিক দিয়ে ট্র্যাফিক সিগন্যালকে বন্ধ করার ক্ষমতা চারুলতার ছিল। কবিতা লিখতে ভালোবাসত সে৷ কলেজে আবৃত্তি করার সময় আলাপ হয় আকাশের সাথে। ইকনমিক্সের স্টুডেন্ড আকাশ৷ বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি , স্পষ্টবক্তা আকাশকে ভালোবেসে ফেলে চারু৷ শুরু হয় অন্তহীন পথ চলার অঙ্গীকার৷ চোখে তারুণ্য থাকলেও চারুলতা বুঝতে পেরেছিল , এ সম্পর্কের ইতিকথা৷ মা প্রথম যে দিন শুনেছিল আকাশের কথা অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল চারুর দিকে ৷ সেই রাতেই ছাদের কার্নিস বেয়ে পথ চলা শুরু আকাশের সাথে ৷
সদ্য চাকরি পাওয়া আকাশে’র ছিল না বাসস্থানের ঠিকানা ৷ ছিল বাবা মা’র আর্শীবাদ ৷ পূঁজি বলতে ছিল চারুলতার গচ্ছিত কিছু টাকা আর অফুরান ভালোবাসা। বন্ধুর ফ্ল্যাটে কিছুদিন থাকার ব্যবস্থা করে আপাত সন্তষ্ট আকাশ ছুঁয়েছিল চারুলতার ঠোঁট৷ প্রথম রাতটা ছিল আকাশে বিছানো গোলাপের মত৷ চারুলতা পুরোপুরি সমর্পণ করেছিল আকাশের কাছে নিজেকে ৷ রাত যখন গভীর অবিন্যস্ত চারুর মা’র মুখটা বার বার মনে পড়েছিল৷ মা’র সাথে ঘুমানোর অভ্যাসটা কখনও যে চোখের জলের কারণ হতে পারে আগে কখনও ভাবেনি চারু।
এমন সময় পাশ থেকে হাতটা চেপে ধরে আকাশ আর ও আবিষ্ট হয়ে বলেছিল “চারু, তোমাকে এবার মা বাবার সাজানো স্বপ্নরাজ্য থেকে বেরোতে হবে ৷ এই মুহূর্তে আমাদের দু’জনেরই চাকরি করা খুব দরকার ৷ আমি বস’কে বলে তোমার চাকরীর ব্যবস্থা করে দেব ৷ মা মারা যাবার পর থেকে মেসে থাকা অভ্যাস ৷ ভীষণ ছন্নছাড়া জীবন আমার ! পারবে না তুমি আমাকে আমার মত করে গুছিয়ে তুলতে ?”
ছোট্ট একটা শব্দ করে চারুলতা বলেছিল এখন থেকে সব কিছুই ‘আমাদের’ ৷ তুমি, আমি’র রসায়ন’কে আর আনতে দেওয়া যাবে না আমাদের মধ্যে ৷
সেই রাতটা ভীষণ একান্ত , আপেক্ষিক ছিল আকাশের কাছে মা মারা যাবার পর আকাশের রুদ্ধ জীবনে চুরির শব্দ, শাড়ির গন্ধ পুরোপুরি হারিয়ে গিয়েছিল ৷ অতীতের দরজা বন্ধ করে বর্তমানে’র আলোর মুখে দাঁড়িয়ে আকাশ৷ শব্দ, ওম, অন্ধকার সব মিলে মিশে একাকার !
সকালে ঘুম থেকে উঠে চারুলতা’কে পাশে দেখে আকাশ একটুকুও সময় নষ্ট করেনি ৷
শুরু হল একটি দিন,  একটি সকাল ৷ চারুলতাকে সাথে নিয়ে অফিসের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ল আকাশ ৷ অফিস বসের কাছে ভীষণ রকম আড়ষ্ট হলে ও তার বহিঃপ্রকাশ করেনি চারু৷ সেটা বুঝতে পেরেছিলেন মিঃ মৈনাক চ্যাটার্জী , আকাশের বস ৷ ভীষণ ভাল মানুষ তিনি । চারুলতাকে দেখে কেন যেন মায়া হল মৈনাকবাবুর৷ চারুলতা , আকাশকে রাতে ডিনারের ইনভিটেশন করে ফেললেন ৷ চারুলতার মনে তখন দ্বিধার পাহাড়ে দ্বন্দ্ব হেঁটে বেড়াচ্ছিল ৷ তবুও কিছুটা ভয়কে সম্বল করে বেরিয়ে পড়ল চারুলতা ৷
মৈনাক বাবুর বাড়ি গিয়ে অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল চারুর ৷ খুব সুন্দর ৮ বছরের একটি ফুটফুটে মেয়ে বসেছিল হহুল চেয়ারে। পাশে দাঁড়িয়ে মৈনাকবাবুর আশি বছরের বৃদ্ধ মা ৷ মেয়েটির নাম তিতলি ৷ তিতলি’কে জন্ম দিয়েই ওর মা অন্য একজনের হাত ধরে চলে যায় ৷ তিতলি বড় হয় তার ঠাম্মার কাছে ৷ প্রথম দেখাতে চারুলতা ওর নিস্পাপ চোখ দুটোকে ভালোবেসে ফেলেছিল৷ ভালোবাসা বড় দুঃসাধ্য বিষয় অনুভব করেছিল সেদিন- চারু ৷
মৈনাকবাবু সে দিনই তার অফিসে চারুলতা’র চাকরির প্রোপোজালটা অ্যাকসেপ্ট করতে রাজি হয়ে যান এবং একটা ফ্ল্যাট ভাড়া দেখে দেবার প্রতিশ্রুতি ও দেন তাদের ৷ সুতোর মধ্যে মস্ত বড় ফাঁক সে দিন থেকেই বাড়তে শুরু করল ৷ সন্দেহের বীজে যন্ত্রণা দানা বাঁধতে শুরু করেছিল ৷ আকাশ পুরো ব্যাপারটা মন থেকে মেনে নিতে না পারলে মুখে কিছু প্রকাশ করেনি ৷
একটু একটু করে মৈনাকবাবুর বাড়িতে চারুর যাতাযাত বাড়তে শুরু করল ৷ তিতলি চারুলতাকে “ভাল মা ” নামে ডাকাত। “মা” ডাকটা চারুলতা’কে ভীষণ নমনীয় করে তুলেছিল । দিনের শেষে একটা আকর্ষণ অনুভব করত চারু ৷ আস্তে আস্তে তিতলির বাড়িতে অনিমিয়ত যাতাযাতটা নিয়মিত হতে লাগল ৷ আর … আকাশের সাথে সম্পর্কের ছিদ্র বাড়তে লাগল ৷
একদিন প্রবল নেশাগ্রস্থ অবস্থায় চারুলতাকে বাড়ি থেকে বের করে দেয় আকাশ ৷ অবসন্ন চারু সারারাত বাইরে বসে ভেবেছিল , যে অনিশ্চয়তা’র হাত ধরে একদিন সে বেড়িয়েছিল সেই অনিশ্চয়তা তাকে নিঃস্ব করল ! বার বার মনে হয়েছিল তিতলি’র কথা ৷ অবচেতন মনের কিনারে মাতৃত্ব হাহাকার করলেও হতদরিদ্র সমাজে’র কাছে বড় অসহায় …

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত