সুপ্রিয় মিত্রের কবিতাগুচ্ছ

আজ ৩১ জুলাই কবি সুপ্রিয় মিত্রের জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


ওঁ বনলতা সেন 

কতদিন হল আসর থেমেছে… আসর থেমেছে
এখন বিকেল নত বাদামী আলোয়…
ফ্যাকাশে গালিচা… শত ছিদ্র
মেলে ধরে শিরা কাটা মেঝে…
মনে পড়ে প্রেম… গাছ গাছ ছায়া… পৌষ সুবাস…
মুখোমুখি জ্ঞান ফেরে,-
দেবীর পায়ের দাগ দরোজা বাহিরে
ঝোপে ধর্ষণের বাসর…
কতদিন হল জানো থেমেছে আসর ?
কেউ নেই কেউ নেই … নেই বসিবার
ওঁ বনলতা সেন … সশব্দে চড় ও সজোরে থাপড় !

 

 

জাহান্নাম থেকে 

১.
ছ্যাঁকা লাগলে যেমনভাবে সরিয়ে নেয় হাত
তেমনভাবে সরে আসার মৌতাত কি ক্ষয়
শাপেও টানে বরেও টানে সে এক নিঃস্ব খাদ
ব্যবস্থা হোক তোমার, – ভ্রমণযোগ্য এক হৃদয়!

অক্ষরে কি মেঘের পরাগ? বর্ষা চিঠির খামে…
ভেতরে যার অরণ্য, সে, বাগানে হারায় খেই
শোকমুগ্ধ চোখের কোলে অমাবস্যা নামে
ভ্রমণযোগ্য হৃদয় জুড়ে বসতবাটি নেই!

ধ্বংস হবার ঠাট্টা এমন সংশয়ে নির্মাণ
বেঁচে থাকার শরীরময় ছিন্ন হবার সুখ
গানের আসর রয়েছে তবু ওষ্ঠতে নেই গান
সন্ধ্যে নামে শুনশান হয় মাঠের মত বুক

শোক – সে কি ব্যর্থ আঘাত? মাটির তৈরি মলম?
আত্মঘাতী বোমার পাশে যত্নে রাখা কলম….

২.
ভুতুড়ে বৃক্ষতলে,পড়ে থাকা ফলের মত একা সে
পরিত্যক্ত বাড়ির দাওয়ায় বিজোড় চটির মত রূঢ়
পুত্রশোকে নিথর মণি,- বিধবার কান্নার মত ফ্যাকাশে
লক্ষবছর মাটিতে চাপা,- আদিম হাড়ের মতন সে ভঙ্গুরও

স্বপ্নের কাজ বাড়িয়ে পালায়, দুই চোখ দুই দিকেতে চরে
দু’হাতের মুঠো যে অমোঘ নয়, – বরাবর পিষে গেছে ফুল
দুই পা ফেরার হবে, সেই জেদে ঘর ভাঙে গড়ে
পাঁজরে বোবার ভাষা, শিরা-জুড়ে জেগে থাকে নীলাভ ত্রিশূল

নিজের বলতে শুধু উদ্বৃত্ত হেঁটে-যাওয়া-পথ-ঘেঁষা দ্বিধা
মাথাব্যথা গোঁজবার ছাদ থেকে দূরে ঝিম এক নদী
দিতেই এসেছে তবু কিচ্ছুটি না থাকার বিধান
তার হাতে হাত রাখা – সে সাহস হয়েছে কোনোদিন?

এখনও জানতে চাও? কে সে, কোথায় তার ঘর…
এক পথ অন্য পথে ভোলায়, অন্ধ সে এবং জাতিস্মর!

৩.
কারও কোলে ঠাঁই নেই, ইহলোকও প্রিয়দের কাঁধে
কারা ভাগ ক’রে নেবে রজনীগন্ধা-শেষ-রথ?
বিষাদ সাধনা করে – একাগ্র – ধ্যানে ব’সে কাঁদে
দুই হাত কাটা পড়লেও, পার কি পাবে – বন্ধুবৎ?

বাবা-মা’রা হাত ধরে কখনও কি চিনিয়েছে দিক?
কাছেই রথের মেলা, হাত ছেড়ে ভুলে….সে কি ভুল?
পাশ ফিরে বিছানায় চিরঘুম চাও ততোধিক
বিষাদ ফুটিয়ে যায় নিয়মিত, – শব্দের হুল…

ভেবেছিলে সেভাবেই ফেলে যাবে অভিমান, ক্ষমা
যেভাবে আর্দ্র হাত হাওয়ায় ভাসায় সাদা খই
জীবন করেছে দাবি আরও কোনও গভীর উপমা –
অভিশাপ। ছি ছি! বলো – জ্বলন্ত একটি বই হই!

উৎসর্গ পৃষ্ঠা কখনও চিতাও… কার নাম লিখবে সেখানে?
– কবির শরীর ঘেঁটে যারা মেতেছিল বোধিজ্ঞানে।

 

 

আড়ালে আড়ালে 
দুপুরগুলো সারাটা দিনের
দুরন্ত সন্তান। পুরোদস্তুর যেন লায়েক ।
সকালের স্মৃতি ,বিকেলের প্রতি অন্ধ পিরিত–
কাউকে ধারে কাছে ঘেঁষতে দেয়না।
আমি এসব বুঝতে শিখেছি। তাই হৃদয়কে
ক্লান্তির রুমালে ভাঁজ করে , সে সময় কলেজ যাই–
 ক্লাস করি – কবিতা লিখিনা কখনো।
তাতে আরো চ’টে গিয়ে অসম্পূর্ণ দহণে দুপুর ,
হলুদ হয়ে ওঠে। তারপর বিকেল গড়ালে
নিজেরই অহংএ জ্বলেপুড়ে কমলা-লাল গোধূলি হয়ে যায়।
ঘরে ফিরি। দরজা খুলি বিবশ যাতায়াতের। দেখি,
কখন সে জানলা দিয়ে ঢুকে আমার জন্যে করেরেখেছ এককাপ লাল চা … 
বিদায় নেবার অপেক্ষায় নাজুক ঝরে পড়ছে 
বারান্দায় রেলিং  সীমান্তে।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত