সুতপা সেনগুপ্তের কবিতা

আজ ০৭ নভেম্বর অধ্যাপক,কবি ও অনুবাদক সুতপা সেনগুপ্তের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


প্রাকৃত

বিবাহে বিশ্বাস নেই, জানাই প্রস্তাব
এসো যেন কাঁকড়ার মতো দুইজন
খোলা আকাশের নীলে উদ্যত মিলনে
যে যার খোলের ছিলা খেলায় নির্জন

বালি নিয়ে খেলা করে যাবো সারাদিন
যদি পারো তুমি করো আরোই দুষ্কর
কোনো কাজ, স্নানরোদে নাবিকেরা এলে
বুঝিয়ে বাংলাদেশ সজল তুখোড়

অভিমান কোরো, তবু বিবাহ প্রস্তাব
কখনা না করবো না বলে করোনা আক্ষেপ
এই বালিয়াড়ি জুড়ে আভুমা প্রণয়
দেখো, অনশ্বর থাকবে, সমুদ্র সাক্ষী।

 

 

গালিবের কবিতা – ২২
মূলঃ মির্জা গালিব
অনুবাদঃ সুতপা সেনগুপ্ত

ঈর্ষা বলে যে, অন্যের সাথে দোস্তি তার!
বিবেচনা বলে, ওই মোহহীন বন্ধু কার!

মদের পেয়ালা প্রতি ফোঁটাতেই জাদুভরা
মজনু চলেন লায়লার এক চোখ-ঠারায়।

আকাঙ্ক্ষাই তো দীনহীনদের মনের জোর
বলির দানায় মরু, পারাবার জলকণায়।

আমি আর কিছু অঘটন, যেন উন্মাদনা
সুখের শত্রু, ভবঘুরেমির পরমসখা।

ঈর্ষার বশে পরস্পরকে কেন আঘাত
হাঁটুতে আমার শরণ, আয়না মিতে তোমার।

শিরিনের ছবি বানাত আসাদ কুঁদে পাথর,
পাথরে কেবল মাথা খুঁড়ে প্রেম হয় না তো।

 

 

 

কাব্যগ্রন্থ ‘ধুতুরা’র (১৯৮৫) সবগুলি  কবিতা 

আমি কিছুদিন হোলো চারপাশ থেকে বড়ো দূরে
আমাকে শীতের বড়ি দিয়ে যায় কুয়াশার হাত
ধমনী জড়িয়ে থাকে কঠিন রঙের দস্তানা
আমার বান্ধবীটি নার্স হয়ে গেছে বহুদিন

ওয়াগন-ভর্তি ঘুম চলে গেল কোথায় বিদেশে
আমার পকেট থেকে পড়ে যায় অজস্র সময়
মুঠো ভর্তি করে রাখি চকচকে শস্তা আধুলি
সন্ধেবেলা ঘরে ফিরে ঘ্রাণ পাই চিড়িয়াখানার

কেরোসিন কিনি স্বপ্নে, গায়ে ঢালতে শীত করে খুব
কুকুরের চেন দিয়ে বেঁধে রাখতে চাই সারা দিন
কারণ রাত্রিবেলা একা লাগে, ঝরা পাতা লাগে
ঠান্ডা-খাবার-মোড়া কাগজে খুঁজিনা আর নিরুদ্দিষ্টের প্রতি চিঠি

৬. ১. ৮৫

মনে পড়ে সেইসব স্বপ্নের দিন
স্কুল-স্কার্টের নিচে লুকোনো সেফটিপিন, এক্কা দোক্কা খেলা
দল বেঁধে জেব্রার মতো আসা যাওয়া
স্কুলবাসে লিখে রাখা অঞ্জলী তোর সাথে আড়ি
তারপর একদিন উপবিষ্ট বোধিগাছে
তারপর একদিন কৌমারহর ……

২৫. ১. ৮৫

মগজখননকারী দেবদূত এসেছে আজ আমার মূর্খের পৃথিবীতে
আমি তাকে উপঢৌকন দিতে নামিয়ে এনেছি গোটা শহরের হাততালি
তবুও রাস্তার মোড়ে স্কুলের ছেলেরা হৈ চৈ করে সিটি দিলো
আমার যৌবন দেখে তারা ভাবে তেরো বছরের বেশী কিছুতে হবো না

অপরাধজগতের সবচেয়ে পবিত্র কাজ আমিই করেছি
নরকের দোর খোলা ছিল একদিন, আজ সভয়ে ঢেকেছে কারবালা
আমার পায়ের ছাপ যেখানেই পড়ে আছে দুর্বোঘাস গজায় না আর
এভাবে ঈর্ষাহীন পরিব্যাপ্ত চরাচর আমার নিজের প্ররোচনা

২১. ২. ৮৫

জাগে সার্কাসের সমস্ত ঝাড়লন্ঠন আমার শরীরে
এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দিই, জ্বলে উঠে ফের
এইভাবে সার্কাসের সঙ তৈরী করি নিজের সার্কাস
হাড়ে হাড়ে বাজে করনেট

তুমি দর্শকের পাশে বসে আছো, বিচারক
আমার নিন্দের ধূপে টোকা দাও, ঝরে পড়ে ছাই
আর চাবুকের রাত্রি, লজ্জা পেয়ো না ভানুমতী
তুমি বেঁচে আছো বলে বেঁচে আছে আমার সার্কাস

খেলায় হেরেছি আজ, ভুল হয়েছিল
পিছলে পড়ে গেছি দর্শকের মাঝখানে
হাসির দমক, আহত হয়েছে একটি মেয়ের গোড়ালি
সেই থেকে বসে আছি বশংবদ আমি

চাবুকের রাত্তিরের প্রার্থী, আর চাবুকে চাবুকে উজ্বল
উপভোগ করছি আমি, তারিফ করছি আরো বেশী

২১. ২. ৮৫

সাপের জিভের মতো ত্বক তোর, শরীরের আধখানা উধাও
কসাই এসেছে কিনতে, খুলে নিয়েছে আত্মার বকলস
এবার পালাতে পারি তুই আর আমি এই শহর ছাড়িয়ে
অবশ্য কোথায় যাবো, যেখানেই যাবো তোকে তাড়া করবে লোকে

কেন যে কুচ্ছিৎ এত, তবে আয় আমার শরীরে এসে ঢোক
যেসব গুণের কথা বলতাম এইবার সেসব তোর হোক
দাঁড়াস পথের প্রান্তে, ধূলোয় মাখাস তোর নয়নের জল
আমার দর্পণ তুই ধীরে ধীরে জড়িয়ে নে মিথ্যের খোলস

২২. ২. ৮৫

সাবাশ আমার হাড়ে বাজিয়েছো বেশ তো বাঁশরী
ছলাৎ সারেঙ্গী হলো বুকের রক্তের ভাঁড়খানি
যত প্রেম ঢেলে দিচ্ছো তত কেটে বসছে হাতে দড়ি
এবার লতার ঘায়ে মুর্চ্ছা যাবে তন্বী ডোমনী

নিঃশ্বাস ঝরোখা থেকে হলকা বয় রুনুঝুনুঝুনু
গ্রীবা কন্ঠা কোমরের তারগুলি ভীষণ কোমল
যত কষ্ট পাই তত বেজে উঠি, সেলাম হে গুণী
দরবারী আলাপ শুনে ঝরে পড়ছে গগনের চুমু

২২. ২. ৮৫

সিনেমা ভেঙ্গেছে, তুমি শহরের অলিগলি ছেড়ে
এসেছো মধ্য রাস্তায়
অনেক দূরের পথ যেতে হবে, রাত করে বাড়ী ফেরা
শুরু হলো আবার তোমার
তুমি কি বিষণ্ণ হবে ট্রামরাস্তা ধরে হেঁটে যেতে
হাতে ধরা থাকবে অন্ধকার বাতি
শব্দের পেছনে পেছনে বুনো কুকুরের মতো লালা ঝরবে গোটা আত্মা দিয়ে
তোমার পায়ের ছাপ লিখে দেবে শহরের প্রতিটি বাড়ীর দরজায়
তবু কেউ দরজা খুলে দেবে না তোমাকে
তুমি আঘাটায় যাবে, সেখানে বেশ্যা ভেবে লোক ঘিরবে মৌমাছির মতো
কোন সুরসিক লোক ধাক্কা দিয়ে বলে যাবে একস্ট্রিমলি সরি ম্যাডাম
তুমি আঘাটায় যাবে, সিনেমা ভেঙ্গেছে, তুমি আর কোথা যাবে
অনেক দূরের পথ যেতে হবে রাত করে বাড়ি ফেরা
শুরু হোলো
আবার
তোমার

২২. ২. ৮৫

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত