আমরা তো আদার ব্যাপারী। বাংলাসাহিত্যের বইগুলিই স্বামীজীকে জানার প্রামাণ্য দলিল স্বরূপ। স্বামীজির খাওয়াদাওয়া নিয়ে লিখতে বসে সামনে খোলা প্রখ্যাত সাহিত্যিক শংকরের “অচেনা অজানা বিবেকানন্দ” গ্রন্থ খানি। বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে রসনারসিক বিবেকানন্দকে দেখলে মাথা ঘুরে যায় আমাদের! শুধুই ভোজনরসিক নন তিনি। রন্ধনগবেষকও বটে। মানুষকে নিজের হাতে রেঁধে খাওয়াতে পারলে বর্তে যেতেন যিনি।
পড়ে চলেছি আর লিখেছি নিজের মত করে। প্রিয় সাহিত্যিকের স্বামীজিকে নিয়ে সাগর সম গবেষণা থেকে এক আঁচলা তুলে নিলাম সেই বিবেক বারি। প্রণাম শঙ্কর! প্রণাম স্বামী বিবেকানন্দ!
মনে মনে আওড়ে চলেছি ” আপনাকে এই জানা আমার ফুরাবে না…”
স্বামীজির আমিষ না নিরামিষ, কি পছন্দের ছিল? বা কোন ক্যুইজিন তাঁর প্রিয় ছিল? বাঙালি, নবাবী না সায়েবী? তার আবার অনেক ফ্যাচাং। ঘটিবাংলার না বাঙাল বাংলার? প্রাদেশিক না বিদেশী? কেমন খাওয়াদাওয়া পছন্দের ছিল তাঁর?কি রান্না করতেন তিনি? হ্যাঁ তাঁর স্বল্পায়ু জীবনের ধন কিছুই ফেলা যায়নি । মাত্র ৩৯টা বছরে বিশ্বের কোণা কোণা থেকে কে নিকৃষ্ট, কে উৎকৃষ্ট সব খাদ্য হাতড়ে বেড়িয়েছেন। স্থান-কাল-পাত্র ভেদে জম্পেশ রেঁধেছেন। মানুষকে নিজে হাতে রেঁধে খাইয়ে তৃপ্ত হয়েছেন। বেঁচে থাকলে আরও কতকিছু যে এই বইটিতে স্থান পেত সেটাই ভাবি শুধু।
অন্নপূর্ণার কৃপাধন্য দেশের বিলাসবহুল ফাইভ স্টার মার্কিনী হোটেলের শতপদের রাজকীয় ব্যুফে খেতে গিয়ে চোখ জলে ভিজে গেছে নিজের দেশের অনাহারে ক্লিষ্ট মানুষদের জন্য। আবার সেই পরিব্রাজকের উত্তরাখণ্ড ভ্রমণকালে হৃষিকেশের এক ঝুপড়ির কচুপাতায় ছড়ানো ভাত ও ত্যালাকুচো পাতার ঝোল খেতে খেতে থকে যাওয়া। ফিরে এসে সিমলে স্ট্রীটে মায়ের রান্না চেটেপুটে খেয়ে বুঝি মনে হয়েছে তাঁর “সব পেলে নষ্ট জীবন” ।
জীবনের সব স্বাদ পেয়েছিলেন বলেই বুঝি নিমেষের মধ্যে ফুরিয়ে গেছিল জীবন রসায়ন। রসনা তৃপ্তির সব গল্পগাছা। রান্নার মনস্তত্ত্বর সঙ্গে দার্শনিকতার মেলবন্ধন।
“যে রান্নাটাও ভাল করতে পারে না, সে কখনও পাকা সাধু হতে পারে না, শুদ্ধ মনে এক চিত্তে না রাঁধলে খাদ্যদ্রব্য সাত্ত্বিক হয় না।”… এসব কথা জোর দিয়ে তিনিই বলতে পারেন যিনি একাধারে রন্ধনশিল্পী অন্যধারে প্রকৃত সাধু।
প্রখ্যাত সাহিত্যিক শংকর তাঁর “অচেনা অজানা বিবেকানন্দ” গ্রন্থে দেখি মানুষের প্রতি ভালবাসা, গরম চা, সুগন্ধী তামাক এবং মাথাখারাপ করে দেওয়া লঙ্কা এই চারটে ব্যাপারে বিবেকানন্দ ছিলেন সীমাহীন। বিবেকানন্দ ও খাওয়াদাওয়া এই বিষয়টির ব্যাপ্তি ও গভীরতা আটলান্টিক মহাসাগরের সঙ্গে তুলনীয়।
স্বামীজি চলে গেছেন ১৯০২ সালের ৪ঠা জুলাই । আর এই এতগুলো বছর ধরে সারা ভারতবর্ষের অভুক্তদের দুঃখ সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছেন সেই সাধু, সেই মনিষীই। এই সেই মানুষ যিনি বারেবারে শিবজ্ঞানে জীবসেবা করে গেছেন। অসুস্থ এবং অনাহারি দেশবাসীকে মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষার জন্য নিজের মঠের জমি পর্যন্ত বিক্রি করে দিতে রাজি ছিলেন। পঞ্জাবের দুর্ভিক্ষের পরিস্থিতিতে সখারাম গণেশ ও জনৈক পাহাড়ি ভদ্রলোককে তিনি বলেছিলেন, “দেশের একটি কুকুর পর্যন্ত যতক্ষণ অভুক্ত থাকবে ততক্ষণ আমার ধর্ম হবে তাকে খাওয়ানো এবং তার সেবা করা, বাকি সব অধর্ম।” আরও একবার জনৈক বেদান্ত বিশারদের মুখের ওপর তিনি বলেছিলেন, “পণ্ডিতজী, যারা একমুঠো অন্নের জন্য কাতরাচ্ছে প্রথমে তাদের জন্যে কিছু করুন, তারপর আমার কাছে আসুন বৈদান্তিক আলোচনার জন্যে।”
নিজে খেতে ভালোবাসতেন আর মানুষকে খাওয়াতে ভালোবাসতেন বলেই কি পেটের জ্বালা যে মহাজ্বালা তা মর্মে মর্মে উপলব্ধি করে গেছেন আমৃত্যু।
স্বামীজি যে নিজের চোখে দেখেছিলেন ভারতবর্ষের মানুষের তিনরকম পর্যায়। অনাহার, অর্ধাহার ও কখনও এলাহি ভুরিভোজ। এই থ্রি-ইন-ওয়ান অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে হয়ত সব গরীব দেশের সকল সাধু সন্ন্যাসীকেই এগুতে হয় কিন্তু তাঁর মত ভেবেছিলেন ক’জনা?
কোন সময়ে স্বামীজিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, “আপনি এতো লঙ্কা খান কেন?”
স্বামীজির উত্তরটি স্মরণীয় : “চিরজীবনটা পথে পথে ঘুরে বেড়িয়েছি আর বুড়ো আঙুলে টাকনা দিয়ে ভাত খেয়েছি। লঙ্কাই তো একমাত্র সম্বল ছিল। ঐ লঙ্কাই তো আমার পুরনো বন্ধু ও মিত্র। আজকাল না হয় দু’চারটে জিনিস খেতে পাওয়া যাচ্ছে, কিন্তু চিরটাকাল তো উপোস করে মরেছি।”
এমন কি রসগোল্লা প্রসঙ্গে একবার হেডমাস্টার সুধাংশুশেখর ভট্টাচার্য মহাশয় সোজা ব্যাটে খেলেছিলেন, “শোন, স্বামী বিবেকানন্দ মিষ্টি খাওয়ার লোক ছিলেন না, তিনি যা পছন্দ করতেন তার ব্যবস্থা করলে তোমাদের চোখে জল ছাড়া কিছু থাকবে না, তার নাম লঙ্কা।”
একদিন সাহিত্যিক শঙ্করের ইশকুলে ঘোষণা হল, “দু’খানা প্রমাণ সাইজ জিভে-গজা পুরস্কার পাবি, যদি বলতে পারিস একমাত্র কোন্ দেশে সম্রাট, সন্ন্যাসী ও সূপকার অর্থাৎ রাঁধুনিকে একই নামে ডাকা হয়?” উত্তর দিতে পারেন নি শঙ্কর সে যাত্রায়।
“কনসোলেসন প্রাইজ হিসেবে একখানা জিভে-গজা আমার শ্রীহস্তে অর্পণ করে পটলাদা বললেন, “ইন্ডিয়া! শব্দটা হলো মহারাজ! একমাত্র এই পবিত্র দেশে সম্রাটও মহারাজ, সন্ন্যাসীও মহারাজ, আবার রাঁধুনিও মহারাজ। বোধহয় এই কারণেই বিবেকানন্দ ছিলেন নরেন্দ্র, সন্ন্যাসী, আবার ওয়ার্ল্ডের শ্রেষ্ঠ রাঁধুনি। ওয়ার্লডের মধ্যে তিনিই একমাত্র ভারতীয় যিনি সপ্তসাগর পেরিয়ে আমেরিকায় গিয়ে বেদান্ত ও বিরিয়ানি একসঙ্গে প্রচার করবার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন।”
হক কথা। প্রাচীন ভারতে সূপকার মানে রাঁধুনি এবং একমাত্র এই দেশেই রাঁধুনি ও ঠাকুর সমার্থক শব্দ। সেই কারণেই তিনি সম্রাট, সন্ন্যেসী ও সূপকার হয়ে উঠেছেন কালেকালে। বলেছিলেন ভালো সন্ন্যেসী হতে গেলে ভালো রাঁধুনি হওয়া প্রয়োজন। সঠিক অনুপাতে মিশিয়েছিলেন বেদান্ত এবং বিরিয়ানির ককটেল।
স্বল্প দৈর্ঘ্যের জীবনচক্রের সেরা সময়টা স্বামীজি তো বিদেশের মাটিতে আদরের ইন্ডিয়ার সনাতন হিন্দুধর্ম প্রচার করলেন আর এদেশে যখন ছিলেন তখন তো নিঃস্ব, মামলা মোকদ্দমায় জর্জরিত। তার মধ্যেই আচমকা পিতৃবিয়োগ। এবার শুরু অনাহার অথবা অর্ধাহার। আবার পরে যখন বিশ্ববিজয় করে স্বদেশে ফিরলেন তখন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে শরীরটা আধমরা। ভুরিভোজ দূর অস্ত। একটানা একুশ দিন নির্জলা কাটাতে হয়েছিল কবিরাজের নির্দেশে।
শংকর বলছেন,
“তাহলে! যে লোকের খাওয়াদাওয়াই বারণ, একখানা বরফি খেয়েছে বলে গুরুভাইরা যাঁর নামে ডাক্তারের কাছে অভিযোগ করছে এই কারণেই তার অসুখ বেড়েছে, তাকে নিয়ে কীভাবে লিখবো?”
প্রিয় শশী ডাক্তারের কাছে সেই নালিশ প্রসঙ্গেও স্বামীজি বলছেন সরল দস্যি ছেলের মত।
“আমি লউ-এ একটি বরফির ষোলভাগের এক ভাগ খেয়েছিলাম”
উত্তর কলকাতার সিমুলিয়ার তিন নম্বর গৌরমোহন মুখার্জি স্ট্রিটে নিজের বাড়িতে একরত্তি বিলের বয়স তখন মাত্র পাঁচ বছর। সংঘর্ষটা হল মায়ের সঙ্গে এবং রণস্থল খাওয়ার আসন। ডান হাতে খেতে খেতে বাঁ হাতে গ্লাস থেকে জল খাওয়া নিয়ে প্রবল মতবিরোধ! এঁটো হাতে গ্লাস নোংরা হবে যে। কিন্তু সেযুগে বাঁ হাতে জল খাওয়ার রেওয়াজ ছিল না। মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে নরেন বঙ্গীয় রীতি পাল্টালেন। পাঁচবছরের যে শিশু হিন্দু রীতিনীতিতে যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে সেই তো ভবিষ্যতের সার্থক সাধু হয়ে উঠবে তাই না?
নিষ্ঠাবান বৈষ্ণব বাড়ির মেয়ে ছিলেন ভুবনেশ্বরী দেবী। গোবর ন্যাতা, তুলসী, গঙ্গাজলের আছড়া দেওয়া এমন পরিবার থেকে সিমলে স্ট্রিটে এসে তিনি দেখলেন দত্ত পরিবার আদ্যন্ত আমিষভক্ষক। ভোজনরসিক ও রন্ধন-বিলাসী বাবা বিশ্বনাথ বাড়িতে বাবুর্চি আনিয়ে প্রায়ই নানা মোগলাই খাদ্যের আয়োজন করতেন।
” একটি দৃশ্যে দেখা যায় খেতে বসে বালক নরেন পাতে কিছু নিতে রাজি নন। কারণ তরকারির সঙ্গে মাছের স্পর্শ ঘটেছে এবং পরিবেশিকা দিদি স্বর্ণময়ীর সঙ্গে তার বাদানুবাদ চলেছে। ভাই-বোনের কথা কাটাকাটির আওয়াজ শুনে স্নানের জায়গা থেকে পিতৃদেব বিশ্বনাথ বিরক্তি প্রকাশ করলেন, “ওর চোদ্দপুরুষ গেঁড়িগুগলি খেয়ে এল, আর এখন ও সেজেছে ব্রহ্মদত্যি, মাছ খাবে না!””
মা-বাবার সঙ্গে নরেন, ভাই মহিম ও বোনরা চলেছে রায়পুরে। ঘোড়াতালাওতে মাংস রান্না হল। দিদিমার প্রভাবে মেজভাই মহিম তখন মাছ-মাংস মুখে দেয় না। পরবর্তীকালে মহেন্দ্রনাথ লিখছেন : “আমি খাব না, বমি আসতে লাগল। দাদা মুখে মাংস গুঁজে দিয়ে পিঠে কিল মারতে লাগল, বলল–’খা। তারপর আর কি? বাঘ নতুন রক্তের আস্বাদ পেলে যা হয়।”
মঠ-মিশন প্রতিষ্ঠার আগের কথা। নরেনের সাংগঠনিক শক্তির প্রথম প্রকাশ মেলে রান্নাসংক্রান্ত ব্যাপারেই।নরনারায়ণ সেবার প্রাথমিক পদক্ষেপ অভাবনীয় এক প্রতিষ্ঠান ‘গ্রিডি ক্লাব’ সংগঠন, যার বাংলা মহেন্দ্রনাথ করেছেন ‘পেটুক সঙ্ঘ’।এই দলের উদ্দেশ্য কেবল ভোজন নয়, সেই সঙ্গে রান্না নিয়ে রীতিমত রিসার্চ। প্রতিষ্ঠাতার দৃষ্টি সারা বিশ্বের দিকে প্রসারিত। ভবিষ্যতের সন্ন্যাসী এই সময় পুরনো বইওয়ালার কাছ থেকে খণ্ডে খণ্ডে বিভক্ত ফ্রেঞ্চ রান্নার বই কিনেছেন একের পর এক। তাঁর কমবয়সের ফ্রেঞ্চকুকিং এর সাধনা। ফরাসীরা বড়ই সৃষ্টিশীল, এঁদের সংস্পর্শে যাঁরাই আসেন তাঁরাও সৃষ্টিশীল হয়ে ওঠেন।তার স্পষ্ট প্রমাণ গ্রিডি ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতার গবেষণামূলক রন্ধনে।
এই পর্যায়ে শঙ্করের বইটিতে পাচ্ছি,
“নরেন্দ্রনাথের সফলতম আবিষ্কার হাঁসের ডিম খুব ফেটিয়ে চালে মাখিয়ে কড়াইশুটি ও আলু দিয়ে ভুনি-খিচুড়ি। পলোয়ার চেয়ে এই রান্না যে অনেক উপাদেয় একথা বহুবছর পরেও বিশেষজ্ঞরা স্বীকার করেছেন! বাবা রাঁধাতেন কালিয়া এবং পলোয়া, আর সুযোগ্যপুত্র আরও একধাপ এগিয়ে গিয়ে নতুন ডিশের মাধ্যমে পূর্বপশ্চিমকে একাকার করে দিলেন।” এমনি ছিল স্বামীজির ইনোভেশন।
বাবার অকালমৃত্যুর পর থেকে নরেন্দ্রনাথের জীবনের অনাহার ও অর্ধাহারের পর্বের শুরু। এই পর্ব চলেছে বরানগর পেরিয়ে পরিব্রাজক বিবেকানন্দের সঙ্গে মুম্বাইয়ের জাহাজঘাটায় খেতড়ির দেওয়ান মুন্সি জগমোহনের কাছ থেকে বিদায় নেওয়া পর্যন্ত।

ভালো লাগলো
ভাল লাগল, অনেক কিছু জানলাম