| 24 ফেব্রুয়ারি 2024
Categories
নক্ষত্রের আলোয়

মেধাবী ব্যক্তি, অসামান্য কবি বিনয় মজুমদার । শামসুর রাহমান

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

কবিতা এক মায়াবিনী যেন, বিচিত্র তার রূপ, অশেষ তার আকর্ষণ, তার নূপুরে বাজে নানা সুর। বাংলা কবিতার ইতিহাস একটু নেড়ে-চেড়ে দেখলেই আমার উক্তির সারসত্য প্রমাণিত হবে। চর্যাপদের কাল থেকে আজকের বাংলা কবিতার মধ্যে বিভিন্ন ধ্বনি, নানা রূপেরই সন্ধান পাব। বাংলা কবিতা বলতে আমি, বলা নিষ্প্রয়োজন পশ্চিমবঙ্গ এবং বাংলাদেশের মিলিত কাব্যফসলই বোঝাচ্ছি। লক্ষ করেছি, অনেকে বাংলা কবিতা মানে পশ্চিমবঙ্গে রচিত কবিতাবলিকেই শনাক্ত করেন, বাংলাদেশের কবিদের অস্তিত্বসুদ্ধ বেমালুম ভুলে থাকেন। যা হোক, এ নিয়ে আমাদের কোনো খেদ নেই। অন্যদের ক্ষীণদৃষ্টির কথা ভেবে মৃদু হাস্যরসের উদ্রেক হয়। ব্যতিক্রম যে একেবারেই নেই, তা বলব না।
বিনয় মজুমদারকে আমি কখনো দেখিনি, অর্থাৎ তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি। শুধু তাঁর ছবি দেখেছি, বেশ কিছু কবিতা পড়েছি। বিনয় মজুমদারের ফিরে এসো, চাকা কাব্যগন্থটি কয়েক বছর আগে কিনে পড়েছি। বিনয় বয়সে আমার কয়েক বছরের ছোট, কিন্তু কবি হিসেবে ছোট নয়। তাঁর ফিরে এসো, চাকা এবং অঘ্রানের অনুভ‚তিমালা উৎকৃষ্ট দুটি কাব্যগ্রন্থ। ফিরে এসো, চাকা-য় জীবনানন্দ দাশের প্রভাব স্পষ্ট, কিন্তু এতদসত্তে¡ও একজন নতুন কবির নতুন কণ্ঠস্বরও শনাক্ত করা যায় সহজে
একটি উজ্জ্বল মাছ একবার উড়ে
দৃশ্যত সুনীল কিন্তু প্রকৃত প্রস্তাবে স্বচ্ছ জলে
পুনরায় ডুবে গেলো এই স্মিত দৃশ্য দেখে নিয়ে
বেদনার গাঢ় রসে আপক্ক রক্তিম হলো ফল
কিংবা যখন নিম্নোক্ত পঙক্তি পড়ে চমকে উঠি
দেবদারু, স্পষ্ট পেঁচকের মতো গহ্বরের
স্বস্তি অভিলাষী, তবু ফিরে আসি পূর্ববর্তী ফুলে
ক্বচিৎ কখনো কোনো ফোঁড়া হলে নিষিদ্ধ হলেও
যে-কারণে তার কাছে অগোচরে হাত চলে যায়।

আরও উল্লেখযোগ্য পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করা যায়। উৎসাহী কবিতাপ্রেমী বিনয় মজুমদারের কাব্যগ্রন্থগুলো সংগ্রহ করে পড়লে প্রকৃত কবিতার স্বাদ পাবেন। ফিরে এসো, চাকা-র আগে গায়ত্রীকে নামে বিনয় মজুমদার একটি কবিতার বই প্রকাশ করেন। ফিরে এসো, চাকা আগের বইটিরই পরিবর্ধিত সংস্করণ। বিনয় গায়ত্রী চক্রবর্তীকে ভালোবেসেছিলেন প্রবলভাবে। গায়ত্রী বিদেশে চলে যান। চক্রবর্তীর ‘চক্র’ শব্দটির অর্থ যে চাকা তা আমরা সবাই জানি। তাই ফিরে এসো, চাকা, ‘গায়ত্রী ফিরে এসো’ শব্দগুচ্ছেরই অপর নাম তা বুঝতে কষ্ট হয় না। পরে কবি বিনয় মজুমদার মানসিক রোগী হয়ে পড়েন। যুগপৎ প্রতিভাদীপ্ত কবি এবং মানসিক রোগী। কৃতী ছাত্র হিসেবে পরিচিত, মানসিক বিপর্যয়হেতু উদ্ভট আচরণ, অসামান্য প্রতিভা ইত্যাদির জন্যে বিনয় মজুমদার আজ এক কিংবদন্তিতে পরিণত।
তিনি বেশ কিছুদিন ধরে কলকাতা থেকে দূরে প্রাকৃতিক পরিবেশে বাগানঘেরা পৈতৃক বাড়িতে বাস করেন, নিঃসঙ্গ জীবন তাঁর। বাড়ির একটি অংশে, যতদূর জানি, একটি দম্পতি থাকেন। সাধু-সন্তেরই মতো বিনয় মজুমদার নামক কিংবদন্তির জীবন। কখনো-সখনো কোনো তরুণ কবি কিংবা ছোট কাগজের সম্পাদক তাঁর কাছে শ্রদ্ধাভরে, লেখা প্রার্থনা করেন, জানতে চান কিছু কথা। এভাবেই কেটে যাচ্ছে বাংলা ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবির জীবন।
বিজ্ঞান এবং গণিতশাস্ত্রের সঙ্গে বিনয়ের নিবিড় পরিচয়ের কথা আমাদের অজানা নয়। তাঁর সাম্প্রতিক একটি কাব্যগ্রন্থের নাম আমিই গণিতের শূন্য। এই বইয়ের কবিতাগুলো অনেকের কাছে কবিতা হিসেবে গ্রাহ্য না-ও হতে পারে। কিন্তু আমি তাঁদের সুরের সঙ্গে সুর মেলাতে নারাজ। গ্রন্থটিতে ‘প্রদীপ এসেছে ঘরে’ শীর্ষক একটি কবিতা মুদ্রিত আছে
প্রদীপ এসেছে ঘরে আমার নিকটে।
প্রদীপের ডাকনাম প্রদীপই, অন্য কোনো
নাম তার নেই। প্রদীপের বাড়িতে এখন
ছ’টা চার বাজে। আমার তো ঘড়ি নেই।
সেইহেতু সময় জানতে হলে জিজ্ঞাসা করেই
জেনে নিই। সবার নামানুসারে সব কিছু
স্থির হলে প্রদীপের কাজ
আলো বিতরণ;
তা সে পারে, বৈদ্যুতিক তার টাঙিয়ে আলো জ্বালবার
বিদ্যা তার জানা। আমি জানি প্রদীপের ছায়া আছে।
প্রদীপের একটি বান্ধবীর নাম ছায়া। আমি প্রদীপকে
জিজ্ঞাসা করলাম ‘তোমার ছায়া নামে এক বান্ধবী আছে,
প্রদীপ?’ প্রদীপ উত্তর দিল ‘চিনতাম।’

পঙ্ক্তি ক’টি পড়লে মনে হতে পারে, যেন আমরা একটি বিবৃতি পড়ছি। কিন্তু কোনো কোনো বিবৃতিও কবিতা হতে পারে, যেমন বিনয়ের এই পঙ্ক্তিমালায় কবিতার স্বাদ রয়ে গেছে। আমিই গণিতের শূন্য পুস্তকে কবি কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। বিবৃতি বলে রচনাগুলোকে উপেক্ষা করা সমীচীন নয়। সম্ভবত এই বইয়ের কবিতাবলিকে ফিরে এসো, চাকা কিংবা অঘ্রানের অনুভ‚তিমালা-র সমপর্যায়ে রাখা যাবে না, কিন্তু উড়িয়ে দেয়াও অসমীচীন।
ব্যতিক্রমধর্মী কবি নিজস্ব জগতে আছেন নিজের মতোই। সিংহভাগ সময় তাঁর কাটে ঘরে মশারি খাটিয়ে, কখনো কখনো তোড়ঙ খুলে দেখেন কাগজপত্তর, কোনো কোনোদিন দাড়ি কামান, কাছেই দোকানে যান চা খাওয়ার জন্যে, নক্ষত্রের আলোয় কী যেন খোঁজেন, মাঝে মাঝে লেখেন ছোট কাগজে, কখনো কখনো অনুরোধ করেন নাছোড় সম্পাদকের তাগিদে। আমাদের প্রিয় কবি বিনয় মজুমদার, যাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়নি কোনোদিন, অথচ যাঁকে পেয়েছি তাঁর অনেক উৎকৃষ্ট কবিতায়, আরও লিখুন, বেঁচে থাকুন দীর্ঘকাল নিজের মধ্যে, তাঁর অনুরক্ত ভক্তদের জন্যে, বাংলা কবিতার জন্যে।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত