নীল রঙের বৃষ্টি

আজ ২৮ অক্টোবর কথাসাহিত্যিক ও সম্পাদক তমাল রায়ের শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


ওদের দুজনেরই নদী ভালো লাগত। ভালো লাগতো মাথার ওপর সিলভার স্কাই। যে আকাশ থেকে ঝরে পরে নীল রঙের বৃষ্টি। আর ওরা বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে চলে যেতো অনেক দূর। তারপর যখন টোপাজ ব্লু সন্ধ্যে নামতো চরাচর জুড়ে ওরা মিশে যেতো পরস্পরের সাথে কোথাও কখনো। ধরা যাক ছেলেটির নাম অনি। আর মেয়েটির নাম মন ওরফে বৈভবী। ছেলেটির ভাল লাগতো লেবু পাতার গন্ধওলা পান্তা ভাত,আর মেয়েটার পিৎজা। মেয়েটা যখন গান গাইতো – শ্রাবণের ধারার মত পড়ুক ঝরে…ছেলেটা গাইতো জিম রিভি। অথবা লেনন – ইমাজিন দেয়ার ইজ নো হেভেন…। না হেভেন যে কোথাও নেই তা মেয়েটাও জানতো। যদি স্বর্গ কোথাও থেকে থাকে তাহলে আছে এই মাটিতেই…মেয়েটার কোলে মাথা রেখে এ কথাই তো বলতো অনি…অনেক দূরের দিকে চেয়ে । মন তখন আসতে আসতে নামিয়ে আনছে ঠোঁট। আর এ সময় খুব স্বাভাবিক ভাবেই ফুল পড়তো,ওদের মাথার ওপর। না তা অন্য কেউ ফেলতো না,আসলে ওরা যে গাছটার নীচে বসতো এই নদীর ধারে তার নাম ছিলো ছাতিম। আর কি মিষ্টি গন্ধে ভরে থাকতো তার চারপাশ। জীবন এ সব জায়গাতে এসেই থমকে দাঁড়ায়। যেন স্তব্ধ হয়ে থাকে চিরটাকাল। কিন্তু তা আর হয় কই।
অনি চাকরী নিয়ে দেশান্তরে…মন বিয়ে করলো এক সরকারি উচ্চপদস্থ কর্মচারী কে। মন এর সন্তানাদি ও হল একটি। আর তা নিয়ে ভর-ভরন্ত সংসার। আর স্বামীটিও বেশ ভাল। ওকে বেশ যত্নে রাখে। এমন কারোকেই তো দরকার ছিল মনের। তাই কি? কে জানে। কেবল যখন আকাশে পূর্ণ চাঁদ উঠতো,অথবা বসন্ত বাতাস বইতো বাইরে,অথবা সে কোনো প্রবল বৃষ্টির দিন ওর মনে হত কি যেন নেই,কে যেন নেই। তা বলে জীবন তো আর থেমে থাকেনা। স্বামী ট্যুরে চলে বিয়ের একদম পর পর ওর খুব ফাঁকা লাগতো। তারপর তো সন্তান এল। আর ব্যস্ততাও। ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসো, টিউশনে নিয়ে যাও। ছেলে একটু বড় হতেই ও আবার মন দিল ছবি আঁকায়। যা নিয়েই তার পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন। নাম ডাক হচ্ছে । এগজিবিশন হল গগনেন্দ্র,একাডেমীতে। রিভিউ প্রকাশিত হয়েছে বড় কাগজে। বেশ অনেকটা প্রতিষ্ঠা যাকে বলে আর কি।
অনির প্রথম প্রথম খুব অসুবিধে হত। চিঠি লিখতো। তা মনের কাছেই যে পৌঁছতো কে বলতে পারে। মনে হয় বাসা বদল করে মন তখন অন্য কোথাও তখন। নইলে একটা ও চিঠির উত্তর দেবে না তার মন? হতে পারে? না কোনো উত্তরই সে পাইনি আজ অবধি। ফলে নিজেকে ডুবিয়ে দিয়েছিল আরো কাজে। কত
কাজ । আর মেনে নিয়েছিলো নিয়তিকে। কি করবে। এর বাইরে আর কি করবারই থাকেইবা। বাবা মারা গেলো ২০০৩ এ। মা ২০০৮ এ। সে সময় ও দেশে এসেছিল বটে। মাতো মা’ই সে শোক সামলে উঠতেই এতোটা সময় লেগে গেছিল যে ততদিনে ছুটি শেষ। আর প্রতিবারই চলে যাবার আগে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করতো এবার আসলে খুঁজে বার করবেই ঠিক তার মন কে। কে জানে সে কেমন আছে এখন। অনি আর শ্রাবণের গান শোনে না। বুকে ব্যথা হয় প্রবল। হঠাৎ গেয়ে ওঠেনা – ইমাজিন দেয়ার ইজ নো হেভেন। স্বর্গ প্রকৃত অর্থে কোত্থাও নে ! সে এখন অন্য মানুষ। দিন কিন্তু তার নিজের মত করে কেটেই যায়। কেবল টোপাজ ব্লু সন্ধ্যে নামলে সে হাতে নিয়ে বসে হুইস্কির গ্লাস। আর কাঁচের টেবিলের ওপর পড়ে থাকা জল দিয়ে কার যেন ছবি আঁকে। থাকে কই সে ছবি,মিনিট কয়েক পর তা ভ্যানিস।
কত বসন্ত পার হয়ে গেছে। ফেসবুকে অ্যাকাউন্ট আছে মনের তা অনি জানতনা। সেদিন পোস্ট করেছিলো বিশ্বভারতীর সুনন্দা ,মন ন্যাশনাল এওয়ার্ড পাচ্ছে সে ছবি ও অন্যান্য। সুনন্দা অনির বন্ধু। সেটাই চোখে এলো অনির। পাঠালো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট। মন তখন রীতিমত সেলেব। সে সবার রিকোয়েস্ট অ্যাক্সেপ্ট ও করেনা। ফলে পরে রইলো অন্য কোনো ফোল্ডারে অনির করা মেসেজ। জীবন তো তখন অন্য ফোল্ডারেই চলছে। আগের জীবন তো আর নেই। নদী নেই,শিউলি গাছ নেই। কতদিন তেমন সিলভার স্কাই নেই। অনি কেবল একটা চিলড্রেন রাইম চালিয়ে বসে বসে হুইস্কির গ্লাসে সিপ সিপ চুমুক –রেন রেন কাম এগেন। কি জানি গলার কাছে কেন কি দলা পাকায়।
মন এসেছিলো কাজে শান্তিনিকেতন। কাজ মিটতে খোয়াই,সেই ময়ূরাক্ষীর ধারে। বিশ্বভারতীর অর্গানাইজ করা এক চিত্র শিল্পী সম্মেলনের পর কোনো এক সন্ধ্যের অবকাশে,মন একাই ময়ূরাক্ষীর ক্যানাল পাড়ে। চেয়ে দেখছিলো আকাশ। তখন ও পুরো সন্ধ্যে নামেনি। এ আকাশে কিছুটা সিলভার এখনো আছে,সাথে অল্প টার্কিশ ব্লুএর শেড। সেই গাছটার খোঁজ করছিলো ও। আর কেমন অন্ধকার ফুঁড়ে বেরিয়ে আসার মত হাজির হল সে -‘মন…’
-হুম।অজান্তেই বেরিয়ে এসেছিল মনের মুখ থেকে,পরে চমকে গিয়ে তাকাতেই…
– ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড আপনি কি মন মানে বৈভবী?
মনের বুকের ভেতর হাতুড়ী পড়ছে। ও কোনো উত্তর করেনি। একটু বেশী দ্রুতই চলে এসেছিলো সেখান থেকে। আর ফিরে এসে কেমন যেন অস্থির,আর ভালো লাগছে না কিছুই। হোটেলের বারান্দায় এসে তাকিয়েছিলো পথের দিকে। না, সে পথে কোনো আগন্তুক ছিলো না। কিন্তু হঠাৎ ধেয়ে এলো এক কালবৈশাখী,যেমন আসা তার স্বভাব আর তার দাপটে ধূলোয় ঢাকলো এই নদী শহর। আর অকাল বৃষ্টি। প্রবল উদ্দাম। মনের চোখেও বোধহয় ধূলো পড়লো। নইলে এত জল কেন ,কোথা থেকে? ফিরে এসেছিলো মন ওখান থেকে পরদিন সকালেই নিজের বাসায়। বাসা তো বাসাই। আর এই প্রথম বাসা আর ঘরের যেন তফাৎটা তার চোখে, র্যা দার মাথায় এল । মনের কি ঘর আছে কোনো? সুখ? আছে? স্বামী তো কোনো ত্রুটি রাখেনি তার। তাহলে? প্রশ্নগুলো যেভাবে উঠে আসছিলো তার মধ্যে সে নিজেই অবাক লাগছিলো। আর চোখ দিয়ে অবিরত ধারা বর্ষণ। ছেলেও ততদিনে একটু বড়। ফলে প্রশ্নের সম্মুখীন হতেই হল। নিজের জিজ্ঞাসু মনের রক্ত বইছে সন্তানের মধ্যেও। মন তেমন কিছু উত্তর করেনি। যা বলেছিলো তা হল ওর আর অনির সেই অনেক আগের কিছু পুরনো সেপিয়া-টোন এলবামের কথা। যা সময়ের হাত ধরে এখন ব্রিটল।
আজ পয়লা আষাঢ়। সকাল থেকে বৃষ্টি পড়ছে টিপ টিপ এক ঘেয়ে। ছেলে কলেজে। মন ব্যস্ত নিজের কাজে। ডোর বেল বাজলো। মন প্রথমটা ভালো শোনেনি,একটা কভার করে দিতে বলেছে কাজল দা,সেটা নিয়ে ব্যস্ত। আবার বাজলো। কিছু বিরক্তি নিয়েই ও দরজা খুললো। আর ভূত দেখার মতই ছিটকে সরে এলো দরজার কাছ থেকে। কেমন এক অদ্ভুত অনুভূতি। সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। কিছুতেই দাঁড়াবে না। বন্ধ করে দিলো দরজা।
আরও কিছুক্ষণ বেল বাজিয়ে অনি নেমে এসেছিলো রাস্তায়। মিনিট ১০ দাঁড়ালো। দুটো সিগারেট খেলো। আর তারপর ফিরে চললো। আগামী কালই তো সিনসিনাটি ব্যাক। লাগেজ প্যাক কর,আরও কত কি। একশো গজ দূরের যে চায়ের দোকান, ওখানে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ চা নিয়ে নাড়া চাড়া করলো। এবার চায়ের ভাঁড়টা ছুঁড়ে ফেলে হাঁটা শুরু করেছে যেই, পেছন থেকে ডাক –‘অনি…অনি’। ও দাঁড়ালো। ঘুরে তাকালো। উদভ্রান্তের মত দৌড়ে আসছে মন। মুখে একটা বিষণ্ণতার হাসি খেলে গেলো অনির। ও কোনো উত্তর করেনি। ফিরে চললো। পেছনে মন দৌড়ে আসছে। ও থামলো। মন কাছে এলো। দুটো পাঁচশো টাকার নোট ওর হাতে তুলে দিলো -তোমার থেকে নিয়েছিলাম, মনে পড়ে? বলেছিলাম ঠিক একদিন ফেরত দেবো।
অনি কিছু বলেনি। টাকা নিলো। ওর সামনে দাঁড়িয়ে কুঁচি কুঁচি করে ছিঁড়ে উড়িয়ে দিলো। আর সপাটে মনের গালে একটা চড়।
বৃষ্টি এত প্রবল যে রাস্তায় কেউ কোথাও নেই। পায়ের তলায় বৃষ্টির জল তখন নদী হয়ে ফুঁসছে। আর দুই মাঝ বয়সীর চোখেও প্রবল ধারাবর্ষণ। না ওরা পরস্পর হাত ধরেনি। কোথাও যায়নি। ওখানে একটা শিউলি গাছকে ওরা এখন খুঁজছে। আর খুঁজছে একটা সিলভার স্কাই,আর টোপাজ ব্লু সন্ধ্যে। পাবে কি না কে জানে। কে যেন বলেছিলো – অবিরাম এক খোঁজের নামই তো জীবন,অনির মনে পড়ল। ছেঁড়া টাকা গুলো এখন নৌকোর মত ভাসতে ভাসতে রওয়ানা দিলো নদী আত্রেয়ীর দিকে। মন আর অনি এখন সেই নৌকো গুলোর দিকে তাকিয়ে অপলক। বৃষ্টির রঙ এখানে নীল। বৃষ্টি যখন নীল বর্ণ ধারণ করে হয়ত সেই নদীতীরে এসব লৌকিক ঘটনাই অলৌকিকের দিকে দুলতে দুলতে যাত্রা শুরু করে। পায়ের তলায় বালি আসছে আবার। স্বর্গ যদি কোথাও থেকে থাকে তবে তা এ মাটিতেই,বিড় বিড় করে আওড়াচ্ছিল অনি।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত