টানা পাঙ্খার গল্প

দামু মুখোপাধ্যায়

প্রাচীন যুগে রাজ সিংহাসনের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ হিসেবে ভারতে চামরের আত্মপ্রকাশ। রাজঅঙ্গে হাল্কা বাতাস বইয়ে দেওয়াই ছিল তার মূল উদ্দেশ্য। শুধু ভারতই বা কেন, মধ্যপ্রাচ্যের সুলতানদের দরবারেও শোভা পেত নানান কিসিমের চামর। হিন্দুদের পুজোআচ্চাতেও তার বহুল ব্যবহার বহাল রয়েছে। আর মুসলিম পরম্পরায় মুশকিল আসানের হাতে চামর দোলানোর দৃশ্য বহুজনের শৈশব স্মৃতিতে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে। এখনও পথে-ঘাটে ক্কচিত্‍ কালো জোব্বা আর তসবি গলায় দরবেশদের চামর হাতে চোখে পড়ে। ১৯৫৭ সালের ২৫শে জুন পলাশীর আমবাগানে নবাব সিরাজ-উ-দ্দৌলার ফৌজকে দুরমুশ করে বাংলার সিংহাসন দখল করল কোম্পানি বাহাদুর। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের পরে ১৮৫৮ সালে ইন্ডিয়া গভর্নমেন্ট অ্যাক্ট পাশ হলে কোম্পানির সম্পত্তি থেকে সরাসরি ব্রিটিশ উপনিবেশের লেবেল সাঁটল ভারতের কপালে।

তালপাতার বড় বড় পাখা নিয়ে বারান্দা বা দাওয়ায় মোতায়েন থাকত পাঙ্খাওয়ালারা।


ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমল থেকে দলে দলে ইংরেজ তরুণ এদেশে পাড়ি দিতে শুরু করেন। নিছক চাকরি নয়, সেই সঙ্গে বেনামে ব্যবসা করে কাঁচাটাকা কামানো আর তাই দিয়ে আয়েশ-আরাম করার স্বপ্নে মশগুল হয়ে ভারতমুখো জাহাজে সওয়ারি হতেন তাঁরা। কিন্তু জন্ম থেকে ব্রিটেনের ঠান্ডা স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় অভ্যস্ত প্রাণ এদেশের দাপুটে গ্রীষ্মের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলতে হামেশা নাকাল হতো। হাঁসফাঁস গরম থেকে রেহাই পেতে জানলা-দরজায় টাটি অথবা খসখসের পর্দা বা চিক টাঙিয়ে চার বেলা যেমন জল ছিটানো হতো, তেমনই তালপাতার বড় বড় পাখা নিয়ে বারান্দা বা দাওয়ায় মোতায়েন থাকত পাঙ্খাওয়ালারা। সেই সমস্ত পাখার হাতল ছিল প্রায় তিন-চার ফিট লম্বা। মাটিতে ভর দিয়ে তাকে খাড়া করা হতো। পাখার বেড়ে মখমলের ঝালর বসানো থাকত। সাহেবের কুর্সির পাশে দাঁড়িয়ে সেই পাখা দুলিয়ে বাতাস করত তালিমপ্রাপ্ত নফর। শুধুমাত্র তালগাছের পাতাই নয়, বাঁশের কঞ্চি, বাকল, ঘাস, বিভিন্ন রকম কাপড় এমনকি চামড়ার তৈরি পাখা ভারত ও দক্ষিণ এশিয়ার নানান দেশে ব্যবহার করা হতো। হাটুরে থেকে জমিদার, বামুনঠাকুর থেকে গাড়োয়ান- প্যাচপেচে গরমে প্রাণ জুড়োতে হাতপাখার বিকল্প ছিল না। ইতিহাস বলে, ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে পাখার প্রচলন হয়। মধ্যযুগে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে তা চালু ছিল।

হাতপাখার সাহায্যে যতটা হাওয়া বওয়ানো যায়, তার চেয়ে বড় জায়গা ঠান্ডা রাখতে ভিন্ন প্রযুক্তির প্রয়োজন দেখা দিল। ইতিহাস বলছে, অষ্টম শতকে আরবে দড়িতে টানা পাখা ব্যবহার করা হতো। ভারতে তার আবির্ভাব হয় ইওরোপীয়দের হাত ধরে। প্রচলিত মতে, গুমোট আবহাওয়ায় অনেকটা জায়গা জুড়ে হাওয়া খাওয়ার এই অভিনব কৌশল এদেশে প্রথম চালু করে পর্তুগিজরা। পরে তা অনুসরণ করে ইংরেজ। ঐতিহাসিক এইচ ই বাস্টিড তাঁর Echoes From Old Calcutta (১৯০৮) বইয়ে লিখেছেন, কলকাতায় টানা পাখার আবির্ভাব হয় ১৭৮৪ থেকে ১৭৯০ সালের মধ্যে। ১৭৮৩-৮৪ সালে জনৈকা সোফিয়া গোল্ডবর্নের চিঠিতে ভারতীয় পাখার উল্লেখ পাওয়া যায় বলে তিনি জানিয়েছেন। গোল্ডবর্ন দু’রকম পাখার কথা লিখেছিলেন। তালপাতার হাতপাখা ছাড়া দড়িতে টানা আর এক ধরণের পাখার কথা তিনি লিখেছেন, যা সাহেব-সুবোদের ঘরের সিলিং থেকে ঝুলত। তবে বাস্টিডের মতে, পর্তুগিজদের অবদানের ঢের আগে ভারতের মানুষ এই পাখার ব্যবহার সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিল। সম্রাট শাহজাহানের ছেলে যুবরাজ দারা শুখোর ব্যক্তিগত চিকিৎসক, পরবর্তীকালে সম্রাট অওরঙ্গজেবের দরবারের নিয়মিত সদস্য ছিলেন ফরাসি চিকিৎসক তথা পরিব্রাজক ফ্রাঁসোয়া বার্নিয়ে। তাঁর Travels in the Mughal Empire বইয়ে ১৬৬৩ সালের জুলাই মাসে এক মুঘল অমাত্যের বাড়ির অন্দরমহলের বর্ণনায় টানা পাখার দেখা পাওয়া যায়।

সেই সময় কলকাতার প্রায় প্রতিটি সচ্ছল ইংরেজ পরিবারে ঘরের সিলিং থেকে টানা পাখা ঝুলত। চন্দননগরের একটি বাড়ির ইন্টেরিয়র, ১৮৭০ সাল। উপরে টানা পাখা দেখা যাচ্ছে।


উত্তর ভারতের সেই পাখা পরে বাংলা মুলুকেও ব্যবহার হতে শুরু করে। ১৭৭৪ সালে ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে স্থাপিত ক্যালকাটা সুপ্রিম কোর্টের বেঙ্গল ইনভেন্টরি অনুসারে,  ১৭৮৩ সালের ৩ জুন তারিখে মৃত রিচার্ড বেচারের সম্পত্তির তালিকায় একটি ‘কাপড়ের পাখা’র উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তখনও টানা পাখার ব্যবহার সীমিত ছিল। ১৭৭৫ সালে মহারাজা নন্দকুমারের বিচারের সময় দেখা যায়, দিনে বেশ কয়েকবার বিচারকরা ঘামে জবজবে পোশাক পাল্টাতে বাধ্য হতেন। ১৮০০ সালে লর্ড ওয়েলেসলি সেন্ট জন’স চার্চ এবং শহরের অন্যান্য গির্জায় দড়িতে টানা পাখা বসানোর ব্যবস্থা করেন। তবে তখনও কলকাতা শহরের সব ইংরেজ বাড়িতে মনে হয় এমন ব্যবস্থা চালু হয়নি। ১৮১০ সালে উইলিয়ামসনের লেখায় তাঁর বাড়ির পরিচারকদের তালিকায় পাঙ্খাওয়ালা বা পাঙ্খাবরদারের কোনও উল্লেখ মেলে না। আবার ১৮১৩ সালে আঁকা শিল্পী ডি’অয়লির ছবিতে ডাইনিং টেবিলের ওপর নকশাদার কাপড়ে মোড়া পাখা ঝুলতে দেখা যায়, যার দড়ি হাতে দণ্ডায়মান এক খালাসি। এর আগে ১৭৯০ সালে ফরাসি পর্যটক গ্রাঁপ্রের লেখনী জানাচ্ছে, খাবার টেবিলে ডিনার পরিবেশিত হওয়ার সময় ইউরোপীয় অতিথিদের প্রখর গ্রীষ্মের গুমোট গরম থেকে বাঁচাতে হাতপাখা নিয়ে মোতায়েন থাকত একদল পরিচারক। প্রত্যেক অতিথির চেয়ারের পিছনে দাঁড়িয়ে একজন পরিচারক হাতপাখা দুলিয়ে বাতাস করত। ১৮৫৬ সালের আগস্ট মাসে আমেরিকা থেকে প্রকাশিত Putnam’s Monthly Magazine of American Literature, Science and Art-এ অবশ্য জানানো হয়েছে যে, সেই সময় কলকাতার প্রায় প্রতিটি সচ্ছল ইংরেজ পরিবারে ঘরের সিলিং থেকে টানা পাখা ঝুলত।

টানা পাখার বাতাস।


সিলিং থেকে ঝোলানো পাখা লম্বায় ৮ ফিট, ১২ ফিট আবার কখনও ২০ বা ৩০ ফিটও হতো। হাল্কা কাঠ দিয়ে তৈরি হতো তার কাঠামো বা ফ্রেম। তার ওপর লংক্লথ অথবা নকশাদার কাগজ মুড়ে দেওয়া থাকত। পাখার নীচের অংশে বুনে দেওয়া হতো মসলিনের ঝালর। সিলিংয়ের ৩-৪টি হুক থেকে বাহারি দড়ির সাহায্যে তা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো। আর একটি লম্বা দড়ি পাখার শরীর থেকে বেরিয়ে মুখোমুখি দুই দেওয়ালে গাঁথা দু’টি পিতলের চাকার ওপর দিয়ে গিয়ে দেওয়ালের একটি গর্ত দিয়ে ঘরের বাইরে পৌঁছত। সেখানে দড়ির শেষ প্রান্তটি ধরা থাকত পাঙ্খাবরদারের হাতে। মেঝের উপরে পা মুড়ে বসে সে ওই দড়ি ধরে বিশেষ ছন্দে টান দিত। মনিবের চাহিদা অনুযায়ী কখনও অতি দ্রুত দড়ি টানা হতো, আবার কখনও ফরমায়েশ মেনে ধীর লয়ে পাখা টানতো পাঙ্খাবরদার। অফিস-কাছারি-গির্জায় একাধিক টানাপাখার ব্যবস্থা থাকত। প্রতিটি পাখার দড়ি একগাছি মোটা দড়িতে এসে মিলত। তা ধরে টানলে একই সঙ্গে অনেকগুলি পাখা নড়াচড়া করে গোটা হলঘরে বাতাস সঞ্চার করত।

টানা পাখার হাওয়া কিন্তু সমান ভাবে ঘরের ভিতর খেলতো না। দড়ি টানলে পাখা সামনে এগোত, আবার পরমুহূর্তে দড়ি ছাড়লে তা নিজের ভারে দুলে পিছু হঠে যেত। আবার টেনে তা সামনে আনা হতো। এই রকমই ছিল পাখার চলন। ঘরের যে দেওয়ালের দিকে পাখা টানা হতো, সে দিকে হাওয়া জোরে বইতো। ১৮৯৫ সালে জি এফ অ্যাটকিন্সনের লেখা Curry And Rice বই থেকে জানা যায়, ঘরের এই দিকটিকে বলা হতো ‘বম্বে সাইড।’ আর দড়ি ছেড়ে দিলে নিজের ভারে পাখা বিপরীত চালে যে দিকে দুলতো, তার নাম ‘বেঙ্গল সাইড।’ আসলে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ধেয়ে আসা মৌসুমী বায়ুর যাত্রাপথ অনুসারেই এই নামকরণ। জলকণা বয়ে আনা বাতাস প্রথমে ভারতের পশ্চিম উপকূলে আছড়ে পড়ত, তখন তার গতিবেগ থাকতো অনেক জোরালো। সেই বাতাস পশ্চিম থেকে যখন পূবে বাংলা মুলুকে এসে পৌঁছত, তখন তার গতি হ্রাস পেত। এই কারণে ঘরের যে দিকে পাখার হাওয়ার ঝাপটা বেশি, তা বম্বে, আর যে দিকে কম, তা বাংলা।

একজন বৃটিশ উচ্চপদস্থ অফিসারের স্ত্রী তার বসার ঘরে, বহরমপুর, ১৮৬৩। উপরে টানা পাখা।


কোম্পানির সাহেব অথবা দেশি ধনীদের বাড়ির দুই অংশে পাখা টাঙানো হতো- খাওয়ার ঘর ছাড়া শোওয়ার ঘরে খাটের ওপরেও পাখা ঝুলতো। প্রখর গ্রীষ্মের রাতে পাখার মৃদুমন্দ বাতাস না বইলে সাহেব-সুবো-রাজা-জমিদারদের ঘুম উবে যেত। মোলায়েম হাওয়ায় ঠান্ডা ঘরের পালঙ্কে যখন গভীর নিদ্রায় মগ্ন গৃহস্বামী, তখন ঘামে ভিজে ডাঁশ আর মশার কামড় সহ্য করে ঢুলতে ঢুলতে রাতভর পাখা টেনে যেত পাঙ্খাবরদার।  শোনা যায়, এই কাজে বিশেষ কদর ছিল কানে খাটো মানুষের। বাড়ির নিভৃত কোণে তার উপস্থিতিতে পাছে গোপন কথা ও কীর্তি ফাঁস হয়ে যায়, সেই আশঙ্কাতেই বধিরদের জন্য এই চাকরি বাঁধা ছিল। আবার বংশ পরম্পরায় এই কাজে বহাল হওয়ার রীতিও ছিল। পাঙ্খাবরদাররা সকলেই এদেশের নিম্ন শ্রেণিভুক্ত। তাদের আর্থিক সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত কম বেতনে কাজে বহাল করা হতো। খাতাপত্তর উল্টে জানা যাচ্ছে, আঠারো শতকে সারাদিন পাখা টানা বাবদ মাথাপিছু তিন আনা মাইনে পেত পাঙ্খাওয়ালা। রাতে কাজ করলেও একই হারে বেতন ধার্য করা হতো। অনেক সময় পাখা টানা ছাড়াও তাদের বাড়ি বা দপ্তরের বেশ কিছু ফুটফরমায়েশ খাটতে হতো।

পাঙ্খাবরদার। পাঙ্খাবরদাররা সকলেই এদেশের নিম্ন শ্রেণিভুক্ত। তাদের আর্থিক সঙ্কটের সুযোগ নিয়ে অত্যন্ত কম বেতনে কাজে বহাল করা হতো।


১৯২৪ সালে লেখা ই এম ফর্স্টারের আ প্যাসেজ টু ইন্ডিয়াউপন্যাসে পাঙ্খাওয়ালার বিবরণ মেলে। বইয়ের ২৪ নম্বর অধ্যায়ে ডক্টর আজিজের বিচার চলাকালীন আদালত কক্ষের বাইরে বসে দড়ি টানতে থাকা এক পাঙ্খাওয়ালাকে দেখে উপন্যাসের নায়িকা মিস অ্যাডেলা কোয়েস্টেডের মনে দার্শনিক ভাবনা জেগে ওঠে। ভারতীয়দের প্রতি শাসক ইংরেজ শ্রেণির স্বভাবসুলভ বিরূপতা ছাপিয়ে সামান্য এক পরিচারকের মধ্যে এক অন্য ভারতকে যেন আবিষ্কার করেন অ্যাডেলা। পাখার দড়ি টানা সেই তরুণের বিবরণ দিতে গিয়ে ফর্স্টার তাকে জগন্নাথদেবের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ব্যস্ত এজলাসের বাইরে বসে থাকা মানুষটির গায়ের রং ঘোর কালো। যন্ত্রের মতো সে পাখার দড়ি টেনে চলেছে। আদালতের উত্তেজনা তাকে স্পর্শ করছে না। তার চোখেমুখে লেপে রয়েছে এক ঐশ্বরিক নির্লিপ্ততা। ঔপন্যাসিকের জবানে, ‘a perfect naked god’। শোনা যায়, ১৯১৩ সালে ঔরঙ্গাবাদ আদালত প্রাঙ্গণে দেখা এক নবীন পাঙ্খাবরদারকে দেখেই চরিত্রটি ফুটিয়ে তুলেছিলেন ফর্স্টার। তবে তাকে চিনতে ভুল করেননি লেখক- জাগতিক বৈভবের মাঝে নিজের দারিদ্রের প্রকট উচ্চারণে আদপেই কোনও ভ্রূক্ষেপ করার ফুরসত মিলত না পাঙ্খাবরদারের। তার কাজ শুধু, সব ভুলে মনিবের স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য বাতাসের জোগান দেওয়া।

তবে বিত্তবান ছাড়া ঘরে পাখা টাঙানোর শৌখিনতা বজায় রাখা সেকালেও অসম্ভব ছিল। ১৮৭৯ সালে কলকাতায় প্রথম বিজলিবাতি জ্বালানো হয়। ১৮৯৯ সালে চালু হয় বৈদ্যুতিক পাখা। প্রযুক্তির মোক্ষম চালে টানাপাখার যুগের অবসান হয়। কাজ ফুরোয় পাঙ্খাওয়ালাদেরও।

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত