বিশ্বায়নের কিছু দূরে

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

মেঘখানা আকাশে টুসটুসে পাকা আমের মতো ঝুলে আছে। আছে তো আছেই। ঢালবো ঢালবো ক’রেও ঢালছে না। কেমন ভেজা-ভেজা ঠাণ্ডা বাতাস। সরলা নিমদাঁড়িয়া স্টেশন থেকে দুটো সিট এক্সট্রা নিয়ে উঠেছে। গা দেখানো পলিপ্যাকে বাড়ি থেকে বয়ে আনা ছেঁড়া ন্যাতাকানি নিয়ে জানালার ধারের সিট-দুটো ভালো ক’রে মুছে নেয়। চাঁপাপুকুর স্টেশন থেকে ফজিরন উঠবে। আর পরিচিত যদি কেউ ওঠে সেইজন্য আরও একটা সিট দখল ক’রে রাখা। বসিরহাট কিংবা ভ্যাবলা থেকে অফিস-দিদি, স্কুলের দিদি, কলেজের মেয়েগুলো বেশি ওঠে। আর ওরা ওঠবার পরই কারও-না-কারও সঙ্গে ট্রেনে সিট-রাখা নিয়ে একচোট হয়ে যায় সরলার। ওরা ট্রেনে ওঠার পরেই ট্রেনের কম্পার্টমেন্টটা কেমন যেন মেটে হাঁড়িতে রাখা জিয়ল মাছগুলোর মতো খলবল ক’রে ওঠে। তবে আঁশটানি নয়। বর্ষাকালে কদমতলায় গেলে কদমফুলের গন্ধে যেমন চতুর্দিক ম ম করে তেমনই মনে হয়।

সবেমাত্র দুর্গাপুজো শেষ হয়েছে। শেষ শরতের শিউলি-কুড়ানো মেঘ-রোদ্দুর খেলার সঙ্গে ট্রেনে হকারদের হাতে-হাতে এখন স্নো, ক্রিম, পাউডার, নেলপালিশ, টিপ, নাকের-কানের কত কী যে জিনিস রয়েছে ভাবা যায় না। বাবলা খুব সুন্দর ক’রে বিক্রি করে – কী গো দিদি, নেবে নাকি দেবদাস কানের? পরলেই একেবারে – ‘ডোলা রে ডোলা রে ও ডোলা’। বাবলার বিক্রির বিজ্ঞাপনে গম্ভীরমুখের স্কুলের দিদিমণিরাও হেসে ফ্যালে।

সরলা মাঝেমধ্যেই এটা-সেটা নেয়। তবু মণিহারির পসরা উঠলেই মাছ-লোভাতুর মার্জারীর মতো দৃষ্টি দেয়। মনে হয় ওই মলম গায়ে-মুখে মেখে ঠোঁট-চোখ রাঙিয়ে হার-চুড়ি নাকের আর কানের ঝম্‌ঝমিয়ে বাজালে লক্ষ্মণ কি তাকে ছেড়ে যেতে পারতো? তেরো মাসের বিয়ের জীবনে সাত মাসের বাচ্চা পেটে বাঁধিয়ে দিয়ে পালালো। সময়মতো সরলার ছেলে হলো। তবে ছেলেটা কী যে ব্যামো নিয়ে জন্মালো। জন্ম-ইস্তক যে ক’দিন বেঁচেছিল হলুদপানা হয়ে ছিল। কাঁদতো কেমন চিঁ চিঁ ক’রে। মাই টানতে পারতো না। আঁতুড়েই ম’রে গেল ছেলেটা। সরলার বুকে তখন টলমল করতো দুধ। বাড়ির পেছনে কলাবাগানের দক্ষিণ পাশটায়, যেখানে ছেলেটাকে মাটি দেওয়া হয়েছিল, সেখানে দুধ গেলে-গেলে ঢেলে দিয়ে আসতো। সাদা সাদা বটের আঠার মতো দুধের ধারায় সরলার জামা-ব্লাউজ ভিজে যেতো। ফজিরন কোথা থেকে কালো কালো আরশোলার নাদির মতো ওষুধ এনে দিলে সেই দুধ চোঁয়ানো বন্ধ হয়। যত দিন যায় কচি ছেলেটার দেহ মাটির সঙ্গে মাটি হয়ে যেতে-যেতে সরলার মনে ছেলে-মরার ক্ষতটা সেরে ওঠে। কিন্তু বাৰ্মা কলোনির গতরে-খাটা তাগড়া জোয়ান, সম্বন্ধ ক’রে বিয়ে হওয়া স্বামী লক্ষ্মণের সম্পূর্ণ বিনা কারণে সরলাকে ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ক্ষতটা সারে না। কেউ কেউ এখনও বলে, লক্ষ্মণ নাকি দুবাই গেছে টাকা কামাতে। সেখানে এক কোদাল মাটি কোপালে নাকি এক কোদাল টাকা ওঠে। মেলা টাকা জমিয়ে সরলার জন্য রুপোর মল, সোনার নথ গড়িয়ে তবে নাকি সে নিমদাঁড়িয়া ফিরবে। লক্ষ্মণের এই অলীক ফিরে আসায় কখনও সরলার মন সায় দেয়, কখনও বিষ উগরায়। এলেই হলো। বাদাবনে শেয়াল দে লক্ষ্মণকে খাওয়াবে। তবে মনের জ্বালা জুড়োবে।

বই বিক্রি করে হরেনকাকুর যথেষ্ট বয়স হয়েছে। এ লাইনে হকারি করতে-করতে সে দাড়িগোঁফ পাকিয়ে ফেলেছে। মালতীপুরের বকুলমাসিও ট্রেনে হকারি করতো। বকুলমাসি লজেন্স বিক্রি করতো। হরেনকাকু বকুলমাসিকে বিয়ে করলো। বকুল অবশ্য এখন আর লজেন্স বিক্রি করে না।

— দেখি বাবা একটু সাইড। হ্যাঁ, ট্রেনের পথে মুচকি হাসুন। বাড়ি গিয়ে অন্যকে হাসান। লেবুতলায় জামাই-শাশুড়ির কিস্‌সা। শ্বশুরের আরোগ্য লাভ। হ্যাঁ দিদি, বইগুলো মাত্র পাঁচ টাকায়। আপনি যে-কোনো বইয়ের দোকান থেকে কিনতে যান, দশ টাকার নিচে পাবেন না। এছাড়া আছে ছোটদের মজার ছড়া –

ওপারে কে রে

আমি খোকা —

মাথায় কী রে —

আমের ঝাঁকা।

হ্যাঁ দিদি, সামনের স্টেশনে নেমে যাবো। ট্রেনের পথে বাজে খরচ মনে ক’রে একটা বই নিয়ে যান দিদি।

হরেনকাকুর শেষের কথাগুলো সরলার কাছে কেমন কান্নার মতো শোনায়।

বসিরহাট স্টেশন থেকে শিবুদা ওঠে।

— দেবো নাকি দিদি ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখিয়ে এক পিস্। এক টাকায় একটা কচি শশা।

শিবুদা সরলার দিকে তাকিয়ে হাসে।

— কী গো সরলাদি, দেবো নাকি একটা?

– দাও তা।

ব্লাউজের ভিতর গোপন জামার ভিতর থেকে রংচটা রুমালে গিঁট দিয়ে বাঁধা খুচরো-আধুলি-নোট সব মিলিয়ে আঠাশ টাকা আছে। তার থেকে সন্তর্পণে এক টাকা তুলে শিবুর হাতে দেয়।

বসিরহাট স্টেশনে ক্রসিং আছে। বেশিরভাগ হকারই নেমে যায়। আপ ট্রেনে উঠে যায়। বিট্‌ লবণ মাখানো শশাটা সরলা বেশ খচরমচর ক’রেই খেয়ে ফ্যালে। বসিরহাট স্টেশন থেকেই ওঠে সেই বউটা। কোনোরকমে ঠেলেঠুলে সরলার সামনে এসে দাঁড়ায়। নিমদাঁড়িয়া থেকে বয়ে নিয়ে আসা এক্সট্রা সিট-দুটোর দিকে তাকায়।

– লোক কোথায়?

– ওঠ্‌পে।

— উঠবে মানে? কোন্‌ স্টেশন থেকে উঠবে?

— চাঁপাপুকুর থেকি ওঠ্‌পে।

– না-না, সে হবে না। সে কখন উঠবে, তার জন্য আমরা দাঁড়িয়ে যাবো নাকি!

বউটা একটা সিটের ছেঁড়া রুমাল সরিয়ে জোর ক’রেই ব’সে পড়ে। সরলার শরীর-মনে রাগের কুণ্ডলি পাক খেয়ে ওঠে। বউটার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত কর্কশ চাউনিতে চেয়ে দ্যাখে সরলা। বউটা সে-সব খেয়াল করে না। নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে বসতেই ব্যস্ত।

সরলা বেশ চিবিয়ে-চিবিয়ে বলে – রাতে জল হয়েছ্যালো। জানলার ধারের ছিট্‌ ভিজে ছ্যালো। আমি বাড়ি থেকে ন্যাতাকানি এনি মুছিচি।

– ভালো করেছো। আমি তাই শুকনো জায়গায় বসতে পারলাম।

বউটার কথা বলার ধরনে সরলার গা’টা জ্ব’লে যায়। মাথার ভিতর কেমন যেন কাঁকড়াবিছে কামড়ে দেয়।

ট্রেন চলতে শুরু করে। সরলা একটু ঝাঁকুনি খায়। বউটাও নিজেকে সামলে নেয়। লেডিস কম্পার্টমেন্ট, তাই পুলিশবাবুরা ওঠে। ওরা সংখ্যায় তিনজন। তার মধ্যে বিশ্বেশ্বর মাল হলো গিয়ে হেড হোমগার্ড।

ট্রেনের বাইরে বড় বড় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বউটা তাড়াতাড়ি জানালা বন্ধ করে।

সরলার মনের ভিতর বিরক্তিটা ঝাঁঝে পরিণত হয় — ঠ্যাং সরাও। গায়ে ঠেকতেছে।

বউটা হাসিমুখে বলে — সরি।

বিশ্বেশ্বর মাল সরলার সাথে একটা বায়োস্কোপি হাসি বিনিময় সারে। সরলা বুকের কাপড় তুলতে গিয়েও একই জায়গায় রাখে, আর বিশ্বেশ্বর মাল সেদিকে চেয়ে চোখ টিপে দেয়।

বউটার হাতের মোবাইলটা বেজে ওঠে। কার সঙ্গে গ’লে প’ড়ে যেন কথা বলছে বউটা।

বিশ্বেশ্বর মাল সরলার কাছে জানতে চায় – কোন্‌ চিজ?

সরলা ঠোঁট উলটে দেয়। সে চেনে না।

 

লেডিস কম্পার্টমেন্ট। প্রত্যেকে প্রায় প্রত্যেকের নাম না-জানলেও মুখ চেনা। বাড়ি থেকে বের হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর মধ্যে এই দু’-তিন ঘণ্টায় সকলে কেমন তেঁতুলপাতার সংসার পাতিয়ে নেয়। একে-অপরের সুখ-দুঃখের খবর রাখে। একে-অন্যকে সুখ-দুঃখের কথা বলে। কেউ কেউ বাড়িতে ভালোমন্দ হ’লে প্রিয় বান্ধবীটির জন্য টিফিন কেরিয়ারে ভ’রে নিয়েও আসে। পুলিশ তিনজন নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। একজন দাড়িওয়ালা চাচা হয়তো ভুল ক’রেই উঠে পড়ে, আর ভ্যাবলা স্টেশন এলে পুলিশবাবুরা তাকে নামিয়ে দেওয়ার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।

নতুন বউয়ের প্রেম-অভিমানের মতো বাইরের আকাশটাও এই-আলো-এই-মেঘের লুকোচুরি খেলছে। বাইরে বৃষ্টিটা ধ’রে গিয়ে আকাশটা মেটে হাঁড়ির পাছার মতো ভুষোকালি মেখে দইয়ের ভাঁড়ে থম্‌থমে হয়ে আছে। তবে গুমোট ভাবটা আর নেই। বউটা জানালাটা খোলবার দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে সরলাকে বলে – প্লিজ একটু খুলে দেবে!

সরলা নিজের সিট থেকে ঝুঁকে এসে জানালাটা খুলতে যায়। বউটার গা দিয়ে কী সুন্দর মন-বিবশ-করা গন্ধ বার হচ্ছে। জোরে শ্বাস নেয় সরলা। টেনে নেওয়া বাতাসটা শ্বাসনালি দিয়ে তলার দিকে না গিয়ে যেন মাথায় উঠে আসে। মেয়েমানুষের গায়ে এমন ঝিম্‌ঝিম্ করা নেশা ধরানো গন্ধ থাকে! জানালাটা পুরোপুরি খুলে ফ্যালে সরলা। বউটার হাতের সঙ্গে হাত ঠেকে যায়। সরলা ভাবে, আরে, এ তো ননি! ননি কী রে, ননির বাপ! যেখানে আঙুল দাও সেখানেই দেবে যায়! সরলা বউটার দিকে পরিষ্কার দৃষ্টি দিয়ে জরিপ করে। প্রয়োজনের তুলনায় শরীরে মাংস একটু বেশিই। চোখ তুলে তাকালে সরলারই মনে হয় ভিরমি যাবে। সরলা বুঝতে পারে না — এত সুখী চেহারা এরা পায় কোথা থেকে!

চাঁপাপুকুর স্টেশন থেকে ফজিরন ওঠে। হাড়ের আস্তরণের ওপর সাদা-চামড়ার আবরণ। নেতিয়ে পড়া বাসি ঘুমের মতো বেগুনি-গোলাপি-হলুদ ছাপার শাড়ি জড়ানো। ফ্যাকাশে হাসির মতো বিবর্ণ লালরঙা ব্লাউজ, যা তার দৈন্যকে শুধু প্রকট করেনি – ক’রে তুলেছে তাকে শেষ-যৌবনের শুকিয়ে যাওয়া নারী। অথচ ফজিরন বয়সে সরলার থেকেও ছোট। ছ’বছরের বিবাহিত জীবনে পাঁচবার পেটে এসেছে, তিনটে এখনও নড়েচড়ে কথা বলে। পেটে মরেছে একটা। পেটের বাইরে এসে চোখ পিটপিট ক’রেই মরেছে একটা। রক্তশূন্যতা ফজিরনের সাদা চামড়ায় বকের পালক গুঁজে দেয়। সরলার রাখা নির্দিষ্ট সিটে সে গুটিসুটি মেরে বসে। ব’সেই ফ্যালফ্যাল ক’রে হেসে উঠে সরলার কানে ফিস্‌ফিস্‌ করে — সামনের বউটা কী সোন্দরপানা!

সরলার মনের ভিতর জ’মে থাকা তুঁতে রংটা যেন ফজিরনের কথায় মাছের পিত্তি গেলে লেজ থেকে মুড়ো গোটা অঙ্গই তেঁতো হয়ে ওঠে। সরলা ফজিরনের দিকে আড়চোখে তাকায়।

– ফিরতি পথে নিজের ছিট্‌ নিজে নে উঠ্‌পি। ছিট্‌ রাখা মহা ফ্যাক্‌রা।

ফজিরন কী যেন বলতে গিয়ে গলার কাছে গোত্তা খেয়ে থেমে যায়। সরলাকে সে একটু খুশি করার চেষ্টা করে – বউটা একটু মোটাপানা মতন।

গরম তেলে শুকনো লঙ্কা ফোড়ন দেওয়ার ঝাঁঝের মতো ঝাঁঝিয়ে ওঠে সরলা — ওই বউটা কি তোর ভাতার লাগে নাকি রে? ওঠা-ইস্তক বউটা বউটা করতিছিস!

বউটা মোবাইল ফোন নিয়ে খেলায় ব্যস্ত ছিল। সরলার ঝাঁঝে সরাসরি চোখ তুলে তাকায়।

বারাসাতের পর থেকে ভিড়টা যেন ছানা কেটে যায়। হকারদের বাড়বাড়ন্ত ভিড়ের চাপে-চাপে প্যাচপ্যাচে কপালে ভাঁজ পড়ে সকলের। পুলিশবাবুরা বারাসাতে নেমে যায়। নামবার সময় বিশ্বেশ্বর ফিসফিস ক’রে যায় –  পাত্তা লাগাস।

বউটা মোবাইলে নম্বর টিপে টিপে কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। কথা বলার সময় সরলার মনে হয় বউটার চোখ দুটোও যেন কথা বলছে। ফজিরন একটু ঢুলছিল। সরলার মুখের কঠিন বরফ না-গলায় ফজিরন যেন মরীয়া হয়ে ওঠে।

— সরো তো, জানলা থেকি ছ্যাপ ফেলবো।

বউটা উঠে জানালা-ধারের সিটটাই ফজিরনকে ছেড়ে দেয়।

সরলার কাটা গরুর গোস্তের মতো থম্‌থমে রাগ ফজিরনের ভিতরে চাগাড় দিয়ে উল্টোপথে নিয়ে গিয়ে বউটার ওপর গ’লে পড়ে – তুমি কনে যাবা গো?

– দমদম।

— এ-পথে আগে দেখিনি। কনে থাকো?

— শিলিগুড়ি। চিনবে না, দার্জিলিং পাহাড়ের কাছে।

ফজিরনের দু’চোখে পাহাড়ভরা বিস্ময় ঝিলিক মারে – পা-হা-ড়!

সরলা ফুট্‌ কেটে ওঠে – চিনবে না কেনে? কত দেকিচি পাহাড়। ক্যালেণ্ডারে, সিনেমায়। ওই তো, শাহরুখ খানের বইটা, কী যেন নাম?

— রাজু বন্‌গয়া জেন্টল্‌ম্যান।

ফজিরন ব’লে ওঠে — তুমি সিনেমা দ্যাখো?

— ওমা, দেখবো না কেন! শাহরুখকে তো আমার দারুণ লাগে!… আর জুহিকে তো জবাব নেই!

ফজিরন ফস্‌ ক’রে ব’লে ওঠে — ঠিক তোমার মতো দেখ্‌তি।

কাচের বাসন ভেঙে ছড়িয়ে যাওয়ার শব্দে বউটা হেসে ওঠে। সরলা জানালার বাইরে চোখ রেখে দেখতে পায় রোদ এবং বৃষ্টি দুটোই বাড়ছে। আর বিশ্বেশ্বর মাল হাতের পাতায় খৈনি ঝেড়ে নিচের ঠোঁট টেনে খৈনির টিপ্‌টা রাখতে রাখতে বউটাকে চোখ দিয়ে চেটে খাচ্ছে। ফজিরন দ্বিতীয়বার কাশির সঙ্গে শ্লেষ্মাজড়িত ছ্যাপ ফেলে এবং নিজের কৃতকর্মের জন্য বউটার কাছে যেন কৈফিয়ত খাড়া করে।

– রোজার মাস তো, তাই ঘনঘন ছ্যাপ উঠতেছে।

সরলা বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে — এরপর রক্ত ওঠ্‌পে।

— উঠুক। রোজা না-রাখলি পরে ধড়ে মুণ্ডু রাখপে?

— কে রাখবে না? তোর ভাতার! তুই বাড়িতে উপোস দিবি, বাইরে খেয়ে নিবি।

ফজিরনের চোখ কপালে ওঠে — কী বলতেছিস! তোদের মধ্যে এসপ হয়?

সরলা বেশ চিবিয়ে চিবিয়ে বলে — খেতে-না-পাওয়া বুকে-হাঁটু-লাগা সব মান্‌ষের মধ্যে হয়। ঈদের পর ফি-বছর দু’-তিন মাসের জন্যে তোর সোয়ামি বেপাত্তা হয় কেন জানিস? তোর এই বাঁশপানা আম্‌সি-গতর তার শুঁকতে ভালো লাগে না, তাই সোয়াদ বদলের জন্য ঘর ছাড়ে।

ট্রেনে উঠে নিশ্চিত বসবার জায়গার বিনিময়ে কার এতগুলো কথা শুনতে ভালো লাগে? মুখ হাঁড়ি ক’রে তাই ব’সে থাকে ফজিরন।

ডাউন দত্তপুকুর লোকাল না-ছেড়ে গেলে ডাউন ইছামতী সিগন্যাল পাবে না। বউটা বিরক্ত মুখে ঘড়ি দ্যাখে। এবার সে কোলকাতায় প্রচুর কাজ নিয়ে এসেছে। এগুলো সব সেরে একদিন পরেই শিলিগুড়ি ফিরতে হবে। দূরত্বের কারণে কলকাতায় এসে বসিরহাটে মায়ের কাছে ওঠাটা এক দুরূহ অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একা মেয়ে – কোনো হোটেলে জায়গা পাবে না, বা কেউ দেবেও না।

সরলা হাই তুলে মোচড় মেরে উঠে দাঁড়ায়। খোলা হাওয়া খাওয়ার জন্য দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বেশ্বর মাল লেডিস কম্পার্টমেন্টে দ্বিতীয়বার ফিরে আসে। এবার একলা একলা। বউটা জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে আঁতিপাতি ক’রে কী যেন খোঁজে। খোঁজে আর ভাবে, কোন্‌ ব্রিজটার ওপরে দীপঙ্করের সঙ্গে প্রথম লুকিয়ে দেখা হয়েছিল।

ফজিরন ঘেমো বগলের ডানপাশটা চুলকে একটু আরাম বোধ করে। বউটার কাছে ঝুঁকে এসে ভাব জমায় – তোমাদের ওখানে পাহাড়ে বরপ আচে?

– না-না, অনেক বছর বাদে গত ডিসেম্বরে দার্জিলিংয়ে তুষারপাত হয়েছিল। শিলিগুড়ি হিল-সিটি হ’লে কী হবে, তুমি পাহাড়ের নামগন্ধ পাবে না। পুরো সেকেণ্ড কলকাতা।

ফজিরন গেটের দিকে তাকায়। সেখানে সরলা এখন জ্যোতিষীর ভূমিকায় বিশ্বেশ্বর মালের হস্তরেখা বিবেচনা করছে। আর কী-সব কথায় যেন হেসে-হেসে গড়িয়ে পড়ছে।

ফজিরন বউটার মুখের কাছে এত ঝুঁকে আসে যে, ফজিরনের মুখের গহ্বর থেকে বাসি একটা পচা-পচা দুর্গন্ধ টের পায় বউটা। বউটার সমস্ত শরীর গুলিয়ে ওঠে। ফজিরনের ওসবে ভ্রূক্ষেপ নেই। সে ফিস্‌ফিস্ ক’রে বলে — সরলার স্বভাবটা ভালো না। ওর সোয়ামি কি এমনি-এমনি ভেগেছে। খুব মুখ-দোষ ওর।

বউটা এবার রীতিমতো বিরক্ত হয় – ও তো তোমার সিট রাখার জন্যই সকলের সঙ্গে এত ঝগড়া করে।

বউটার কথায় ফজিরন দ’মে গিয়ে পিছ্‌টান দিয়ে শরীরটাকে সিটের সঙ্গে লাগিয়ে রাখে। সিগ্‌ন্যাল পেয়ে ট্রেনটা তখনই চলতে শুরু করে। সিটে হেলান দিয়ে বউটা চোখ বুজিয়ে থাকে। সরলার মুখ থেকে গোপাল জর্দা দেওয়া পানের গন্ধ বের হচ্ছে। আর এই গন্ধটা তেতে উঠে ফজিরনকে মনে করিয়ে দেয় – সে রোজায় আছে।

 

দমদম ক্যান্টনমেন্টে ফজিরন নেমে যায়। দমদম জংশনে বউটা ও সরলা দু’জনেই একসঙ্গে নামে। মেট্রো ধরবে ব’লে বউটা ঊর্ধ্বশ্বাসে হাঁটতে থাকে। সরলাকে পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মে যেতে হবে। সেখানকার সাব্‌ওয়ে দিয়ে ঘুঘুডাঙা পুলিশফাঁড়ির পিছনে সাবানের কারখানায় সে ফুরনে কাজ করে। কিন্তু সে ওইদিকে না-গিয়ে বউটার পিছন-পিছন হাঁটতে শুরু করে। স্টেশন পেরিয়ে মেট্রোর কাউন্টারে পা রাখতেই বউটার চুড়িদারের ওড়নায় টান দেয় সরলা।

বউটার বিস্ময় আর বিরক্তি দুটোই চাপা থাকে না। কী চায় মেয়েটা!

– তুমি আজ ফিরতি পথে সাতটা পঁয়তাল্লিশের গাড়ি ধোরো না।

বউটার চাপা রাগ আর বিরক্তি গোপন থাকে না – তুমি কি আমায় ভয় দেখাচ্ছো?

– গেল সপ্তাহে ভাসিলা হল্টে কলেজে পড়া মেয়েডারে নামায়ে নেলো। দু’জন ছেলো। না, বোধহয় তিনজন। মেয়েডা মরেনি তবে আর কলেজে পড়বে না শোনলাম।

বউটা দাঁতে দাঁত চেপে বলে — কী বলতে চাইছো তুমি? আমি এক্ষুনি পুলিশ ডাকবো।

— ডাকো, ক্ষেতি নাই। তবে এত সুখী জেবনে এঁটো করবে কেন নিজেকে? তোমার সোয়ামি তো প্যাটে বাচ্চা থুয়ে পলায়নি। ফি-মাসে মান্থলি না-কেটি ট্রেনে চড়বার অপরাধে মাঝেমধ্যেই ভাসিলা-লেবুতলা হল্টে নেমি যেতে হয় না।

বউটার মুখের কথা হারিয়ে যায়।

সরলা পিছন ফিরে হাঁটতে গিয়েও থেমে যায়।

– হ্যাঁ জানো তো, কখনওসখনও চেকারবাবুরাও থাকে। মাসের পর মাস টিকিট না-কেটি ঘোরার কিছু দাম তো দিতি হয় বলো! অবশ্যি তুমি যদি আজ সাতটা পঁয়তাল্লিশে যাও, আমারে আর দু’মাস নামতি হবে না।

কলকল ক’রে হেসে ওঠে সরলা। পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকে শ্লথ পায়ে হাঁটতে শুরু করে।

বউটার মোবাইলে সুইট্‌ বার্ডটি ডেকে ওঠে।

– হ্যালো।

— হ্যালো, আমি বাতায়নের সম্পাদক অধীর বাগচি বলছি। লেখাটা এনেছেন তো?

– কোন্ লেখাটা?

— আরে নারীমুক্তি ও তার উপায়।

বউটার যেন হঠাৎ ক’রে কী মনে হয়।

– হ্যাঁ এনেছিলাম তো, কিন্তু আমাকে যে আবার নতুন ক’রে লিখতে হবে। প্লিজ আমাকে আর দুটো দিন সময় দিন না।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত