| 24 এপ্রিল 2024
Categories
গীতরঙ্গ

সাপ্তাহিক গীতরঙ্গ: বাংলা গান । অমিতাভ পাল

আনুমানিক পঠনকাল: 2 মিনিট

বাংলা গানের মূলভিত্তি লোকসঙ্গীত। তবে এই লোকসঙ্গীত এক ধরণের না। লোকের পরিবর্তন হলে সঙ্গীতেরও পরিবর্তনহয় এইভাষায়। অর্থাৎ লোকের ইন্টেলেক্টের ওপর নির্ভর করে আমাদের সঙ্গীতও পরিবর্তিত হয় সেই হিসাবে ভাটিয়ালী বা ভাওয়াইয়া যেমন লোকসঙ্গীততেমনি রবীন্দ্রসঙ্গীতনজরুলগীতি ও লোকসঙ্গীতকীর্তন বা ব্যান্ডেরগান ও লোকসঙ্গীত। গানগুলির লক্ষ্য শ্রোতা ভিন্ন হলেও তারা সবাই লোক। হয়তো জনরা আলাদাকিন্ তুআমাদের সব গানই লোকগান।

লোকসঙ্গীত মূলত থান কাপড়ের মতো। টানালম্বা– যাকে কেবল প্যাঁচানো যায় শরীরে। অর্থাৎ এই সঙ্গীত খোলামেলাবাতাসের মতো। র মেটেরিয়ালও বলা যায়। এর থেকেই তৈরি হয় ক্লাসিক। ক্লাসিক মূলত মাপঝোঁক করা একটা আকার। থান কাপড় থেকে যেমন তৈরি হয় এমএল এবং এক্সেল মাপের শার্ট– লোকসঙ্গীত থেকেও তেমনি তৈরি হয় ক্লাসিক গানের বিভিন্ন ধরন। এটা অনেকটা প্রকৃতি থেকে সভ্যতার দিকে যাত্রার মতো। যুক্তিনিষ্ঠবিজ্ঞানসম্মত এবং নতুন সম্পর্কের আলোয় আলোকিত এই যাত্রা আমাদের পৌঁছে দেয় নতুন এক কমিউনের উঠানে।

বাংলা সঙ্গীতজগতে ক্লাসিক খুব একটা জায়গা করে নিতে পারেনি জাতি হিসাবে আমাদেরই বিশেষ কিছু বৈশিষ্টের জন্য। নমনীয় মাটির নমনীয় প্রাণী হিসাবে আমরা যেমন সবকিছু সহজে আত্মস্থ করতে পারিতেমনি সহজ এবং স্বতস্ফুর্ত জিনিসগুলিকে গ্রহণ করায় আমাদের আগ্রহও বেশি। ক্লাসিকের শ্রীবৃদ্ধি এই জায়গায় এসে থমকে গেছে। ক্লাসিকের সব ভঙ্গি যদিও আমরা গলায় এবং যন্ত্রে আত্মস্থ করতে পারি কিন্তু সারাজীবনের সাধনাঘণ্টার পর ঘণ্টা রেওয়াজ এবং সঙ্গীত পরিবেশনের যে অপরিসীম ধৈর্য প্রয়োজন হয় ক্লাসিক সঙ্গীত শিখতে– তা আমাদের জীবনে সহজ না বলেই ক্লাসিক আমাদের সামাজিকতা তথা লোকজীবনে ওতপ্রোত হতে পারেনি। ফল খেয়ে বীজ ছুঁড়লেই যে মাটিতে গাছ হয়ে যায়সেখানে পরিশ্রম আর অপেক্ষা যে কি বিষময়– সেটা বাঙালি না হলে বোঝা যাবে না। অথচ উত্তর ভারতের রুক্ষ মাটিতে ফসল ফলানোর মতোই কঠিন তাদের ক্লাসিক সঙ্গীত। আসলে ভূপ্রকৃতির বৈশিষ্ট থেকেই জন্ম নেয় বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গীত। তাই চীনদেশে বাঁশপাতার কাঁপন শোনা যায় তাদের সঙ্গীতের তানেদিগন্ত বিস্তৃত ধানক্ষেতের ওপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাওয়ার স্বাচ্ছন্দ পাওয়া যায় আমাদের সঙ্গীতের সুরে।

ক্লাসিকের প্রতি এই অনাগ্রহ ক্লাসিক থেকে বাংলা সঙ্গীতকে বাঁক নিতে বাধ্য করেছে। এর প্রথম উদাহরণ পাওয়া যায় রামনিধি গুপ্তের টপ্পা গানে। এই গান ঠিক ক্লাসিকও নাআবার ক্লাসিকও। কিন্তু আয়তনেগায়ন পদ্ধতিতে এবং উপস্থাপনে একটা অন্য ভঙ্গির ইঙ্গিত দেয় এই গান। সাথেসাথে বাংলা গানকে এক নতুন দিকে যাবার লোভও দেখায় নিধুবাবুর এই টপ্পাগুলি।

আসলে নিধুবাবুর টপ্পা বাংলা গানের সামনে এক বিরাট দিগন্ত খুলে দিয়েছে। সেই দিগন্ত রবীন্দ্রনাথনজরুলরজনীকান্তঅতুলপ্রসাদ এবং দ্বিজেন্দ্রলালের মতো পাঁচ মহান সঙ্গীতকারের জন্মতো দিয়েছেইপাশাপাশি ভক্তিগীতি এবং লোকসঙ্গীতের জগতকেও দিয়েছে এগিয়ে যাবার তেজ। সেইসাথে ব্রিটিশ রাজত্বের স্পর্শে এসে ইউরোপের সঙ্গীতের স্বাদও পেয়েছে বাংলা গান। এই তেজস্বাদ এবং প্রতিভা বাংলা গানের যে ফর্মেশন তৈরি করেছে তার রাজত্বের অবসান খুব সহজে হবে বলে মনে হয় না। আধুনিক নামে পরিচিত এই গানের ধরনে আবার ফিরেছে সহজতা ও স্বতস্ফুর্ততা। ফিরেছে লোকসঙ্গীতের বৈশিষ্ট এবং ফল খেয়ে বীজ ছুঁড়লেই গাছ জন্মাবার ক্ষমতা।

বাংলা গানে এখন যুক্ত হয় ভালোবেসে পরিয়ে দেয়া বিভিন্ন সুরের গয়না। এই গয়নাগুলি মূলত আসে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের গানের শরীর থেকে। এতে কখনো তার রূপ খুলে যায়কখনো একটু বিসদৃশ লাগেও। যেখানে ভালোবাসা বেশিসেখানে রূপের সমালোচনা কম। আর যেখানে পারপাসিভসেখানে রূপের বিচার হয় অনুপুঙ্খ। এসব ক্ষেত্রে জুরির আসনে বসেন মূলত শ্রোতারা কেননা লোকসঙ্গীতের লোকতো তারাই। তাদের ভালোলাগাই তাই যথেষ্ট।

কিন্তু এর ফলে স্বভাব কবিত্বের মতো এক ধরনের আলুথালু ব্যাপার তৈরি হচ্ছে বাংলা গানের ক্ষেত্রে। সঙ্গীতকে কোথায় নিয়ে গিয়ে আরেকটু মুক্তি দেয়া যায়অবহেলিত হয়ে পড়ছে সেই চিন্তাভাবনাগুলি। ফলে আমাদের গানের বিকাশ হচ্ছে না। একই জায়গায় ঘুরপাক খেকে খেতে তারা ঘূর্ণীঝড় তৈরি করছে ঠিকই কিন্তু জনতার উদ্দীপনা তাতে নড়েচড়ে বসছে না মোটেও। এককালে অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো যে দেশাত্মবোধক গানের জন্ম দিয়েছিল এই ভাষার লেখকরাআজ তার ম্রিয়মানতা এই সত্যকে আরো স্পষ্ট করে। মনে হয় আমরা বুড়িয়ে গেছিআরো পাকা দাস হয়েছি এবং মোসাহেবের চরিত্রে ভরে গেছে আমাদের আগাপাশতলা।

বাংলা গানকে নতুন স্রোতে ভাসাতে আমাদের যুবকস্বাধীন ও নিজস্ব হতে হবে বোধহয়।

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত