ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল (পর্ব-৮)

সুনৃতার ছোট বোন সুষমার মন প্রথম থেকেই বিদ্রোহী। তাঁর দিদিরা সবাই লরেটোতে পড়লেও সুষমা বাড়িতেই লেখাপড়া শিখতেন, সেই সঙ্গে স্বপ্ন দেখতেন সব বন্ধন ছিঁড়ে এগিয়ে যাবার। অগ্রগতির পথে প্রথম বাধা বিবাহ। সুতরাং সুষমা ঠিক করলেন বিয়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির ট্র্যাডিশন আর মায়ের দৃঢ়তা ষোড়শী সুষমাকে নতুন পথে এগিয়ে যেতে বাধা দিল। নতুন ভাবে পথ দেখালেও ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা কেউই পরিণয়ে প্রগতি দেখাতে পারেননি। প্রেম ভালবাসার ক্ষেত্রেও নতুন দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় দিয়েছেন কি? মনে পড়ে না। সুষমার বান্ধবী প্রথম মহিলা ঈশান স্কলার লিলিয়ান পালিত প্রথম বিবাহ বিচ্ছেদের মামলা এনে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেন। তাঁর স্বামী। ছিলেন ব্যারিস্টার শিশির মল্লিক। বিবাহ বিচ্ছেদের পরে তিনি দ্বিতীয়বার বিবাহ করেন ভাগলপুরের জমিদার দীপনারায়ণ সিংকে। কেশব সেনের নাতনীরাও কম যান না। কুচবিহারের রাজকন্যা প্রতিভা ও সুধীর বিয়ে করেছিলেন জন ম্যাণ্ডার ও হেনরি ম্যাণ্ডারকে। সে নিয়েও কি কম হৈচৈ হয়েছে? কিংবা হরিপ্রভা তাকেদা? বুলবুল সোপ ফ্যাক্টরীর ওয়েমন তাকেদার সঙ্গে তার বিয়ে হয় ১৯০৭ সালে। ১৯১২ সালে জাপানী স্বামীর সঙ্গে চলে গেলেন জাপানে। আত্মীয়দের আপত্তি ও অনিচ্ছা অগ্রাহ্য করে। সেদিন সবাই চমকে উঠেছিল। কত আগ্রহ নিয়ে যে বাঙালীরা হরিপ্রভার লেখা বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা পড়েছে তার তুলনা হয় না। তুলনায় ঠাকুরবাড়ির অনেক মেয়েই বেশ প্রাচীনপন্থী এমনকি ভিন্ন প্রদেশের বরের সঙ্গে বিয়ে হলেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তাতে পূর্বরাগের ছিটে-ফোঁটা থাকত না।

সুষমার বিয়ে হয়েছিল গতানুগতিকভাবে যোগেন্দ্রনাথের সঙ্গে। বুধবার ১৯০৫ সালের ৭ই মার্চ। সুষমা তখন সবে টি-নিটি কলেজ থেকে পিয়ানোর পরীক্ষায় ফাস্ট হয়েছেন। য়ুরোপীয় ছাত্রীরাও পিয়ানোয় সুষমার কাছে হার মেনেছিলেন। কিন্তু গান-বাজনা বা সাহিত্য বা রান্নাঘর দিদিদের বাঁধাধর গতের কোনটার মধ্যেই সুষমা নিজেকে বেঁধে রাখেননি। তিনি সব কিছু শিখে তারপর এগিয়ে যেতে চেয়েছেন নারী প্রগতির বন্ধুর পথে। পায়ে বেড়ি পড়ত। যোগেন্দ্রনাথ ব্যারিস্টার কিন্তু তার মন ছিল অন্য দিকে। তিনি ভালবাসতেন অঙ্ক কষতে। তার মডার্ণ এরিথমেটিক খুব জনপ্রিয় স্কুলপাঠ্য অঙ্কের বই। স্ত্রীর প্রগতির পথে কোন বাধা দেবার প্রশ্নই ওঠে না। তবু সুষমা যেন শান্তি পান না। এগিয়ে যাবার মতো একটা পথ! একটা পথের খবর কি কেউ দিতে পারবে না? চিন্তায় ঘুম আসে না। মনের মধ্যে গুমরে ওঠে বোবা কান্না!

অবশেষে পথের সন্ধান পেলেন সুষমা। কোথা থেকে হাতের কাছে এসে পড়ল অঙ্কল টমস কেবিন বইটা। পাতার পর পাতা এগিয়ে যেতে চোখের পাতা ভিজে ওঠে। এই বইয়ের লেখক কে? হারিয়েট বিচার স্টো? তিনি একজন মহিলা। আচ্ছা তার কি ঘর-সংসার নেই। তবু কি করে তিনি এমন বই লেখেন? সুষমা মাদাম স্টোর জীবনচরিত পড়তে বসেন আগ্রহ নিয়ে। অসীম আগ্রহ! অবশেষে একটা তৃপ্তির আমেজ নেমে আসে। হ্যাঁ, এই তো। এই তো পথের সন্ধান পাওয়া গেছে। হারিয়েট যদি পেরে থাকেন সুষমাই বা পারবেন না কেন?

সুষমা মন দিলেন নারী জাগরণের দিকে। প্রথমেই তিনি স্থির করলেন মেয়েরা জাগো বা মেয়েদের জাগাতে হবে এসব ধুয়ে না ধরে তাদের সামনে কতকগুলো উদাহরণ তুলে ধরবেন। যারা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছেন তাদের যদি চোখের সামনে রাখা যায় তবে সবার পক্ষেই দাঁড়ানো সম্ভব। তার মনের দ্বিধা দ্বন্দ্ব যিনি ঘুচিয়েছিলেন সেই মাদাম স্টোর কথাই সবার আগে লিখলেন সুষমা। সমসাময়িক বিচারে সেটা বেশ নতুনও বটে। এর আগে বাঙালীরা কেউ খ্যাতনাম্নী মহিলাদের জীবনী লেখায় তেমন আগ্রহ দেখাননি। আর সেরকম মেয়েই বা তখন কোথায়? আজ আমরা যাদের মহিয়সী বা প্রগতিশীল বলে থাকি সমসাময়িককালে তো সেভাবে বিচার করা সম্ভব ছিল না। তবে ভক্তিমতী মহিলাদের নিয়ে কিছু লেখা হয়েছিল। তাই সুষমা শুরু করলেন বিদেশিনীদের নিয়ে। ইচ্ছে ছিল বাংলায় বিদেশিনীদের কথা বলে ভারতীয়দের নিয়ে লিখবেন ইংরেজীতে। একে একে পুণ্যে ছাপা হল হারিয়েট বিচার স্টো, হারিয়েট মার্টিনো, মাদাম দ্য স্টেল, সুইডিস গায়িকা লিণ্ডের জীবনী। এসব জীবনী সংগ্রহ করে সুষমা দেখাতে চেয়েছিলেন সাহিত্যিক, সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাঙ্গীতিক ক্ষেত্রে নারীর চরম সাফল্য। নিজের দেশের ললনাদের চোখ ফোঁটানোর জন্যে তো বটেই, সেইসঙ্গে সুষমা কলম ধরেছিলেন তাদের জন্যেও যাহারা বলেন যে স্ত্রীলোকদিগের বুদ্ধি পরিচালনা দ্বারা কোন কর্ম করিবার শক্তি নাই, মহিলাগণ কেবল সন্তান পালন করিতেই জানেন। স্বীয় বুদ্ধি বিবেচনা দ্বারা কিছুই করিতে পারেন না। চোখ থাকতেও যারা দেখতে পায় না তাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া ছাড়া উপায়ই বা কি?

সুষমার লেখা এসব বাংলা প্রবন্ধ ছাপা হয়েছিল পুণ্য পত্রিকায়। বাংলা ভ্রমণকাহিনী ছাপা হয় তত্ত্ববোধিনী পত্রিকায়। তাঁর কাশ্মীর ভ্রমণকাহিনীতে পথের বর্ণনা ও সৌন্দর্যের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে কাশ্মীরবাসীর জীবনযাত্রা দুঃখদুর্দশার কথা! প্রায় একই সময়ে তিনি ইংরেজীতে লেখা শুরু করেন আইডিয়ান্স অব হিন্দু উওম্যানহুড। ভারতীয় নারীর আদর্শরূপে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সতী, সীতা, শৈব্যা, সাবিত্রী, দময়ন্তী ও শকুন্তলাকে। লেখা হয়েছিল তবে ছাপা হয়নি। আজও পাণ্ডুলিপি আকারেই জীর্ণ খাতাটি পড়ে আছে, তাঁর নাতিদের কাছে। নারী নির্বাচনেও তিনি সনাতন দৃষ্টিভঙ্গিরই পরিচয় দিয়েছেন। ত্যাগ-তিতিক্ষা ও দাম্পত্য প্রেমে যারা উজ্জ্বল সেইসব নারীদের আত্মমর্যাদা ও সমবোধ তাকে আকৃষ্ট করেছিল।

সুষমার প্রকৃত পরিচয় পাওয়া গেল আরো কিছুদিন পরে। ১৯২৭ সালে সাতটি সন্তানের জননী ও গৃহবধূ হয়েও যখন তিনি নারীপ্রগতি ও শিক্ষাধারার সঙ্গে পরিচিত হবার জন্যে যাত্রা করলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রে। এর প্রায় পঞ্চাশ বছর আগে জ্ঞানদানন্দিনীও একা গিয়েছিলেন ইংলণ্ডে। সে যাত্রাও ছিল দুঃসাহসিক তবে তার সঙ্গে সুষমার যাত্রার তুলনা হয় না। সুষমা গিয়েছেন বিজয়িনী বেশে এবং গিয়েছেন বক্তৃতা দিতে। না, না, সর্বপ্রথম ভারতীয় বক্তা নন সুষমা। তার আগে মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায়, প্রতাপ মজুমদার, স্বামী বিবেকানন্দ ও রবীন্দ্রনাথ আমেরিকায় অসামান্য কৃতিত্বের পরিচয় রেখে এসেছেন। শুধু পুরুষেরা নয়, ভারতীয় নারী রমাবাঈও গিয়েছেন আমেরিকায়। এঁদের পরে সুষমা। তবু Hindi Poet and Philosopher রবীন্দ্রনাথের ভাইঝিকে নিয়ে সাড়া পড়ে গেল যুক্তরাষ্ট্রে। হা, রবীন্দ্রনাথকে যুক্তরাষ্ট্রের খবরের কাগজ কবি ও দার্শনিক রূপেই ব্যাখ্যা করেছে এবং সেই সঙ্গে সব সময় যোগ করা হত হিন্দু শব্দটি। সুতরাং Niece of Tagore সবার মনেই প্রচণ্ড আগ্রহ ও উৎসাহ জাগালেন।

কেন সুষমা বিদেশ সফরে গিয়েছিলেন? বেড়াতে? উহুঁ, বেড়াতে নয়। সুষমার দিদি মনীষা ও শোভনা হয়ত বেড়াতেই গিয়েছিলেন, বেড়িয়ে-টেড়িয়ে ফিরে এসেছেন সেযুগের অনেক শিক্ষিত এবং প্রগতিশীল। মেয়ের মতো। কিন্তু সুষমার কথা স্বতন্ত্র। ছোটবেলার সেই না-মেটা সাধ সার্থক করতে হবে না? ঘরে-বাইরে সমানভাবে কাজ করবার জন্যে তৈরি হলেন সুষমা। ছেলেমেয়েরা সবাই বড় হতে, বাইরের জগতের দিকে একটু তাকাবার সুযোগ পেলেন এতদিনে। প্রথমে একটা ছোটখাট স্কুল খুলে ফেললেন ১৯২২ সালে। একেবারেই মেয়েদের জন্যে। নাম বালিকা শিক্ষা সংঘ। স্কুল খোলার পর সুষমা বুঝতে পারলেন ভারতে অশিক্ষিতার সংখ্যা কত বেশি। এতদিন তিনি চিনতেন শিক্ষিত সমাজকে। এবার দেখলেন দেশের শতকরা নিরানব্বই জন মেয়েই নিরক্ষর। তাই তো প্রথম এম-এ পাশ চন্দ্রমুখী বসু এবং প্রথম ডাক্তার কাদম্বিনী গঙ্গোপাধ্যায়কে দেখবার জন্যে ভিড় জমে যেত। জমবে না কেন? শিক্ষিতা মেয়ে কই, সে তো গোনাগুন্‌তি কয়েকটা পরিবারে। অথচ তখন বিদুষীর সংখ্যা বাংলা দেশে মোটেই কম নয়। চন্দ্রমুখী-কাদম্বিনীর যুগ অনেকদিন কেটে গেছে। অধলা দাসের মাদ্রাজে মেডিকেল পড়তে যাওয়ও পুরনো খবর। বিধুমুখী বসু ও ভার্জিনিয়া মিত্রও কলকাতায় মেডিকেল কলেজে পড়েছেন। ভার্জিনিয়া সমস্ত ছাত্রছাত্রীর। মধ্যে প্রথম স্থান পেলেন (১৮৮৮)। তথন তটিনী গুপ্তও (দাস) সম্মিলিত বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার ম্যাট্রিক পরীক্ষায় প্রথম হয়েছেন, লিলিয়ান হয়েছেন ঈশান স্কলার, হিন্দু ঘরের বিধবা সরলাল মিত্র শিক্ষণশিক্ষার জন্যে বৃত্তি নিয়ে গেছেন ইংলণ্ডে। হরিপ্রভা গেছেন জাপানে। রাজনীতি ক্ষেত্রে আগ্নেয়াস্ত্র হাতে নিয়ে এগিয়ে আসছেন প্রীতিলতা ওহদেদার, কল্পনা দত্ত কিংবা বীণা দাসের মতো সাহসী মেয়েরা। পুলিশের অমানুষিক অত্যাচার সহ্য করেও দেশের জন্যে হাসিমুখে কারাবরণ করেছেন ননীবালা ও দুকড়িবালা। সুতরাং আপাতদৃষ্টিতে তো চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ারই কথা। সুষমার দিদিরাও শিক্ষিতা। ইন্দিরা আর সরলা। রীতিমতো অনার্স গ্র্যাজুয়েট। সুতরাং স্কুল খোলার আগে সুষমা বুঝতেই পারেননি নিরক্ষর মেয়েদের সংখ্যা কত বেশি। শুধু স্কুল নয়, এসময় সুষমা জড়িয়ে পড়েন উইমেন এডুকেশনাল সোসাইটি অব ইনডিয়ার সঙ্গে। এই সোসাইটির প্রেসিডেন্ট হয়ে তিনি অশিক্ষিত মেয়েদের জন্য আরো বেশি ভাবনা-চিন্তা করার সুযোগ পেলেন।

প্রথমেই সুষমার চোখ পড়ল যুক্তরাষ্ট্রের দিকে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর স্বাভাবিকভাবেই নিঃস্ব ক্ষতবিক্ষত য়ুরোপের চেয়ে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব অনেক বেশি। তার ওপর সেখানে গিয়ে স্বামীজী যে উন্নতমনা ও উদারহৃদয় মানুষের সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন সেকথাও সবার জানা, বিশেষ করে সুষমার কাকা রবীন্দ্রনাথ সেখানে বক্তৃতা দিয়ে এসেছেন ১৯১৬ সালে। সুতরাং একবার সে দেশের উন্নতি ও নারীপ্রগতির সঙ্গে পরিচিত হয়ে আসার জন্যে সুষমা প্রস্তুত হলেন। সেখানকার মেয়েদের বহুমুখী জীবন-প্রবাহ এদেশের মেয়েদের যদি বিভিন্ন দিক থেকে প্রভাবিত করতে পারে তাহলে তো ভালই হয়। আমেরিকায় সুষমা তার পৈতৃক উপাধিটি ব্যবহার করেছিলেন শুধু সহজে পরিচিত হবার জন্যে।

সুষমার বিদেশ সফর সাড়া জাগিয়েছিল। আমেরিকানদের মনে হয়েছিল এ আবার কি? তাঁরা যখন ভারতীয় মেয়েদের সম্বন্ধে একটা ভাসা ভাসা ধারণা গড়ে নিয়েছেন তখন কোথা থেকে এল এই গ্রহান্তরের মানবী? হিন্দু কবি ও দার্শনিক রবীন্দ্রনাথ একবার তাঁদের মনকে নাড়া দিয়ে গিয়েছেন। এবার এসেছেন তারই ভাইঝি; ভাইপো হলেও এতে চমকাতেন না আমেরিকার মানুষ। যত না বক্তৃতা শোনার জন্যে হোক ভারতীয়াকে একবার চোখে দেখবার জন্যে সবাই মনে মনে উৎসুক হয়ে উঠলেন।

সুষমা যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছলেন ১৯২৭ সালের ফেব্রুয়ারী মাসে। আমেরিকার নরনারী অবাক হয়ে দেখলে লুচিস্মিত-লাবণ্যে পূর্ণতঃ এক গরিয়সী তেজস্বিনীকে। যেন দীপ্ত অগ্নিশিখা। বক্তার দিকে শ্রোতারা চেয়ে থাকতেন মুগ্ধ হয়ে। ঘনপক্ষ্ম কৃষ্ণভ্রমর বিশাল দুটি চোখ তুলে তিনি সহজ স্বচ্ছন ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াতেন মঞ্চের ওপর। বিদেশীদের চোখে পড়ত a sari of purple silk with sleeves of green embroidered in gold, আপনিই বুঝি উত্তেজনায় ঝিমঝিম করে উঠত নীল রক্ত। বিস্ময় ঝরে পড়ত কলমের মুখে:

Miss Tagore is a charming bit of the Orient in an occidental settiug. Short of stature, quiet and demure, with lazy dark eyes that can flash fire when the occasion arises, it takes the native garb of India to really do justice to her Hindu beauty.

এরপর যখন নিখুঁত উচ্চারণে মিষ্টি অথচ তীক্ষ্ণ কণ্ঠে সুষমা বক্তৃতা শুরু করলেন তখন উল্লাসের হিল্লোল বয়ে গেল শ্রোতাদের মধ্যে। এত সুন্দর, স্পষ্ট উচ্চারণ, এত নিপুণ, নিখুঁত? উচ্চারণ বিভ্রাটের জন্যে অধিকাংশ ভারতীয়ই বিদেশীদের মনে ছাপ ফেলতে পারে না। সুষমা ভঁর আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের ছোঁয়া মেশালেন কঠে। বিদেশী সাংবাদিকরা লিখলেন :

She speaks softly, with never a trace of bitterness of the lot of her people, and her expression never changes, except when her deep dark eyes seem to sinile. আসলে সুষমার চোখ দুটি আকর্ষণ করেছিল বিদেশীদের। অনেকেই লিখেছেন :

Her eyes are very large, and very black. ডেলি টেক্সাসের সাংবাদিক সুষমার বক্তৃতার প্রশংসা করে শেষে তো বলেই। ফেললেন :

Not only is Miss Tagore ably qualified to discuss this subject (The Ideals of India) through extensive study and experience, but she is also capable of preseuting it iu clear and forceful English, which none of the people of India can do.

আমেরিকাবাসিনীদেরও নতুন লেগেছিল সুষমাকে। তাঁরা যখন শুনলেন সুষমা লম্বা চুল কাটতে রাজী নন বরং দীর্ঘ কেশকেই নারীর সৌন্দর্য মনে করেন তখন যেন চমকে উঠলেন। বিস্ময় চরমে উঠল সুষমা রুজ লিপস্টিক ব্যবহার করেন না শুনে; এমন কি তিনি ধূমপান করতেও রাজী নন। কেননা, এ সবই সুষমার কাছে most unladylike। প্রশ্নের পর প্রশ্ন ছুটে এল। সব উত্তরই তিনি দিলেন হাসিমুখে। হ্যাঁ, তিনি মনে করেন বৈকি, শিক্ষার প্রয়োজন আছে। এখানকার শিক্ষাপদ্ধতি দেখতেই তো এসেছেন। তবে তার মতে ভারতীয় মেয়েদের বিবাহিত জীবনের জন্যেই শিক্ষা দেওয়া উচিত : কারণ ভাল স্ত্রী ও ভাল মা হবার শিক্ষাই তাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ শিক্ষা। অর্থাৎ প্রথম জীবনে বিবাহ সম্বন্ধে তাঁর মনে যত বীতরাগই জমে থাকুক না কেন, পরবর্তী জীবনে তিনি সনাতন ভারতীয় রীতিকেই সত্য বলে গ্রহণ করেছিলেন। বিশ্বের নানাবিধ সমস্যার সমাধান সম্পর্কে তিনি তার নিজস্ব অভিমত জানিয়েছিলেন আমেরিকার মেয়েদের :

When women are united as wives, mothers and daughters they have more influence on man than has man on woman. If we would only remember that we are all children of one God, our women united would establish world peace.

তিনি আরো বলেন :

The supreme, traditional virtutes of the Hindu woman are fidelity, sincerity and self sacrificing love. A wife subordinates her wishes to those of her husband.

সুষমার মতে :

Real satisfaction lies in control and self restraint. Let us enjoy the inaterial side of life, but not lose ourselves in its glamour.

এসব বক্তৃতার কথা প্রকাশিত হয়েছিল আমেরিকার বিখ্যাত কাগজের পাতায় পাতায়। কিন্তু তার এসব বক্তৃতার প্রতিলিপি ভারতের কোথাও পাওয়া যায় না। আর একটু শোনা যাক সুষমার কথা। পশ্চিমের বিবাহ প্রথার প্রতি তার কোন শ্রদ্ধা ছিল না। নিউইয়র্কের একটা হলে, তিনি রক্তলাল শাড়ি পরে দৃপ্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে সন্ধ্যাতারার মতো দুটি উজ্জ্বল চোখ তুলে যখন বললেন :

Your idea of marriage, companionate marriage and love seems very strange to us. Your divorces startle us. We believe in the holiness of marriage, considering it a sacred and divine union of two souls. Our marriages are regarded as permanent; separation or divorce unspeakable, we stay married.

গুঞ্জন উঠল, সে কী! এতদিন যে আমরা শুনেছি ভারতে মেয়েরা পুরুষের হাতের খেলার পুতুল! আর তাদের সম্মান? সে তো নেই বললেই চলে। এ কথাই তো আমরা জেনেছি। বিদেশিনীদের কথায় হাসি পায় সুষমার। বলেন, আমাদের দেশের মেয়েরা অনেক বেশি প্রভাবশালিনী। তারা সৃষ্টির কাজে ঈশ্বরকে সাহায্য করে। তোমাদের কাছে ভগবান পিতা কিন্তু ভারতে আমরা তাকে বলি মা। আর অত দূরে যাবার দরকার কি, সুষমা প্রশ্ন করেন তাদের, এই যে আমি এত দূরে এসেছি, বাড়ি থেকে চোদ্দ হাজার মাইল দূরে, স্বামীর ওপর প্রভাব বিস্তার করবার ক্ষমতা না থাকলে পারতুম কি?

আমেরিকায় সুষমা যে সব বক্তৃতা দিয়েছিলেন তার মধ্যে ভারতের নারী, নারী শিক্ষা, ভারতের আদর্শ, ভারতের দর্শন, বিশ্বভগ্নীত্ববোব (Universal Sisterhood), রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, মহাত্মা গান্ধীর দর্শন ও বৈদিক সঙ্গীত খুন জনপ্রিয় হয়। বার বার নানান জায়গা থেকে তার ডাক আসে। শেষদিকে আরো দুটো বক্তৃতা দিয়েছিলেন মাই পিল গ্রীমেজ টু আমেরিকা ও এ্যাডভানটেজ এ্যাণ্ড ডিজএ্যাডভানটেজ অব ইণ্টার ম্যারেজ বিটুইন ইন্দো-এরিয়ানস এ্যাণ্ড ইউরো-এরিয়া। প্রায় দু বছর ধরে বিদেশ সফর করে ঘরে ফিরে আসেন। সুষমা ১৯২৯ সালের জুলাই মাসে। সঙ্গে নিয়ে আসেন শিক্ষণ ব্যবস্থার রীতিপদ্ধতি, মূল্যবান অভিজ্ঞতা ও দুর্লভ সম্মান। যুক্তরাষ্ট্রের আটত্রিশটি জায়গায় সুষমা বক্তৃতা দিয়েছিলেন। তার মূল উদ্দেশ্য ছিল অবশ্য শিক্ষা তাই তাকে ওয়াল্ড ফেডারেশন অব ন্যাশনাল এডুকেশনের কনফারেন্সেও ভারতের প্রতিনিধিত্ব করতে দেখা গেছে। তিনি সব সময় বলেছেন শিক্ষার মতো প্রয়োজনী আর কিছুই নয়, The general education for the masses is more important than any kind of agitation for political clauge. তাই কাকা রবীন্দ্রনাথের মতোই তিনিও গান্ধীজীর অসহযোগ আন্দোলনকে সমর্থন করতে পারেননি। বলেছেন, A word such as non-co-operation is meaningless to the great majority in India, education being permanet and political condition transitory.

ভারতবর্ষে ফিরে এসে সুষমা তাঁর বিপুল অভিজ্ঞতাকে খুব বেশি কাজে লাগাতে পারলেন না কারণ তার স্বামী ও এক কন্যার আকস্মিক মৃত্যু এবং দুই পুত্রের সন্ন্যাস গ্রহণ তাকে জটিল সমস্যার মুখোমুখি করে দিল। অবশ্য ভেঙে পড়েননি সুষমা। শিক্ষা এবং স্কুল সম্বন্ধে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির কথা ছাপা হল সংবাদপত্রে। জনশিক্ষা বিস্তারের জন্যে তার চিন্তা এবং পরিকল্পনা সত্যিই অভিনন্দনযোগ্য। তার পরিকল্পনার প্রধান তিনটি পদক্ষেপ হল :

১. ভারতের বিভিন্ন প্রদেশ থেকে অন্তত ২০ জন সদস্য নিয়ে ভারতের গ্রাম নিরক্ষরতা দূরীকরণ সমিতি নামে একটা সংঘ প্রতিষ্ঠা করা হবে।

২. প্রত্যেক প্রদেশে একটা করে প্রাদেশিক কমিটি প্রতিষ্ঠা করা হবে।

৩. যেখানে যেখানে ইউনিশ্লন বোর্ড আছে এবং সেই বোর্ডের অধীনে যত গ্রাম আছে, তাদের প্রত্যেক গ্রামের এক একজন প্রতিনিধি নিয়ে প্রাদেশিক কমিটি খুলবে গ্রাম্য শিক্ষা কমিটি। এছাড়া গ্রামের ছেলেমেয়েরা স্কুলে পড়তে আসছে কিনা সেটা দেখার ভার থাকবে গ্রাম্য শিক্ষা কমিটির ওপর। স্থানীয় চাঁদায় পাঠশালার জিনিষপত্র কেনা হবে, ক্লাস হবে খোলা হাওয়ায়, গাছের নীচে। আর যদি স্বতঃপ্রবৃত্ত শিক্ষক না পাওয়া যায় তাহলে তাকে সামান্য পারিশ্রমিক অর্থাৎ নগদে না হোক চাল ডাল জিনিষপত্র দিতে হবে। প্রত্যেক জমিদারকে দিতে হবে পাঁচ বিঘা জমি আর প্রত্যেক প্রদেশের জন্যে দরকার হবে পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকা।

মনে রাখতে হবে, সুষমা যখনকার কথা ভেবেছেন তখন ভারতের শাসক বিদেশী। সুতরাং সরকারী সাহায্যের কথা তিনি ভাবেননি। তার এই পরিকল্পনার মধ্যে পল্লীচিন্তা এবং শিক্ষাবিস্তারের বাস্তবানুগ ধারণার ছাপ স্পষ্ট। এখনকার দিনে বয়স্ক শিক্ষার প্রসারের কথাও ভাবা হচ্ছে। গ্রামের মধ্যে থেকেই এ ধরনের কমিটি গড়ে উঠলে শিক্ষার প্রসার আরও সহজ হবে বলেই মনে হয়। এর পরেও সুষমা দীর্ঘদিন ছিলেন। ইদানীংকালে আমেরিকায় নারীমুক্তি আন্দোলনের ঝড় তুলেছিলেন বেটি ফ্রিডান, গ্লোরিয়া স্টেনেম ও কেটি মিলেট— কিন্তু বৃদ্ধ বয়সে সুষমা আর নারীমুক্তি নিয়ে চিন্তা করেননি। কেউ তার মতামতও জানতে চাননি। অথচ এ সময় তিনি প্রবন্ধ লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন, স্কুলে পড়িয়েছেন কিন্তু সবই নীরবে প্রায় নিভৃতে। দুঃখের বিষয় এই যে, আন্তর্জাতিক নারীবর্ষেও সুষমা রয়ে গেলেন সবার অলক্ষ্যে।

সুষমা সম্বন্ধে আর একটি কথা বলে আমরা প্রসঙ্গান্তরে যাব। তাঁর লেখা একটি প্রবন্ধ আমেরিকায় বেদান্ত ধর্মের প্রভাব ও সমাদর। প্রবন্ধটি তৎকালীন কোন কাগজে ছাপা হয়নি বলে পাণ্ডুলিপি আকারেই পড়ে আছে। খানিকটা বাদ দিয়ে ১৩৩৬ সালের জ্যৈষ্ঠ সংখ্যা চতুরঙ্গে ছাপা হলেও আমাদেয় কৌতূহল উদ্রেক করে সুষমার মূল রচনাটি। কারণ এতে সুষমা স্বামী বিবেকানন্দ সম্পর্কিত কিছু খবর দিয়েছেন। যদিও এ খবর আমাদের অজানা নয়, তবু ঠাকুরবাড়ির একটি মেয়ে আমেরিকায় গিয়ে স্বামীজীর সংবাদ সংগ্রহ করতে আগ্রহী হয়েছিলেন জেনে ভাল লাগে বৈকি। রামকৃষ্ণ মিশন এবং সন্ন্যাসীদের প্রতি সুষমার শ্রদ্ধা ছিল। তার জ্যেষ্ঠ পুত্রও রামকৃষ্ণ মিশন থেকে সন্ন্যাস গ্রহণ করেন। সুষমার সঙ্গে আমেরিকায় স্বামী অভেদানন্দ, স্বামী পরমানন্দ, ভগিনী দেবমাতা ও ভগিনী দয়ার সঙ্গে সাক্ষাৎ পরিচয় হয়। যাইহোক, ভারতবর্ষে কিছু স্বার্থান্বেষী মানুষ স্বামীজীর আমেরিকাবাস ও ভ্রমণ সম্পর্কে নানারকম কুৎসা রটাচ্ছিলেন। দু একটি সংবাদপত্রও এ ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে ওঠে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা ইন্সে করেই এ সব কুৎসাকে প্রশ্রয় দিতে থাকলেও খবরের কাগজের এসব সংবাদ অধিকাংশ ভারতবাসীকে সেদিন মর্মাহত করেছিল। দুঃখ পেয়েছিলেন সুষমা। তাই আমেরিকায় গিয়ে তিনি এই পৃতচরিত্র সন্ন্যাসীর মিথ্যা দুর্নাম সম্বন্ধে বহু খোঁজ করেন। সুষমার অনুসন্ধান ব্যর্থ হয়নি। আমেরিকার বিভিন্ন মানুষ বিশেষ করে মহিলারা জানান স্বামীজীর নামে যা কিছু রটানো হয়েছে সবই মিথ্যা, এমনকি তার পেছনে তদানীন্তন সরকারেরও চক্রান্ত রয়েছে। স্বামীজীর প্রতি সুষমার শ্রদ্ধা এবং তার এই অনুসন্ধান স্পৃহা আমাদের মুগ্ধ করে।

আট বোনের মধ্যে সবার ছোট বোন সুদক্ষিণা। পোষাকী নাম পূর্ণিমা। জন্মের পরই বাবাকে হারিয়ে সুদক্ষিণা বড় হয়েছিলেন দাদা-দিদিদের আদর যত্নে। বাপের বাড়িতে যতদিন ছিলেন ততদিন তাকে চেনাই যায়নি। চাঁদের ষোলকলার মতো যখন তার রূপ আর অভিমান দুকূল ছাপিয়ে বন্যার মতো ছড়িয়ে পড়ল তখন যেন সবার চোখ খুলল। তাই তো! এ যে রাজরাজড়ার ঘরে যাবার উপযুক্ত। সুদক্ষিণা কি শুধু সাধারণ ঘরের শিক্ষিত ছেলের জীবনসঙ্গিনী হবেন, না হতে পারেন? তার জন্যে খুঁজতে হবে মনের মতো বর। অচিরেই পাওয়া গেল। বুধাওনের অধিবাসী হরদৈ জেলার জমিদার পণ্ডিত আলাপ্রসাদ পাণ্ডে। শোনা যায়, জমিদার হওয়া সত্ত্বেও তিনি নাকি ছিলেন। আই-সি-এস অফিসার। হিন্দুস্থানী কেতায় পালকি চেপে উত্তরপ্রদেশে স্বামীর ঘর করতে চলে গেলেন সুদক্ষিণা। ঠাকুরবাড়ির একটি স্ফুলিঙ্গ গিয়ে পড়ল অনেক দূরে। তারপর দাবানলে যখন পরিণত হলেন তখন জলপ্রসাদ পরলোকে।

সুদক্ষিণার কার্যক্ষেত্র উত্তরপ্রদেশের হরদৈ-বুধওন-শাজাহানপুরে, তাই বাংলা দেশে তিনি একরকম অপরিচিত। আমরা সুনৃতার মতো তাকেও পাই পুণ্য পত্রিকার পাতায়। রান্নার লক্ষ্মৌ প্রণালী লিখতেন তিনি। প্রজ্ঞার মতো হয়ত তাঁরও রান্নার হাতটি ভাল ছিল কিংবা বাপের বাড়ির দেশের লোকের মুখে শ্বশুরবাড়ির দেশের সুখাদ্য তুলে দেবার স্বাভাবিক ইচ্ছেয় তিনি কলম ধরেছিলেন। নয়ত রান্নাঘরের ঘোমটা-ঢাকা বৌটির ভূমিকায় তাকে মানায় না।

জ্বালা প্রসাদ সস্নেহে স্ত্রীকে জমিদারী পরিচালনা শিখিয়েছিলেন। তার কাছে সুদক্ষিণা শিখেছিলেন ঘোড়ায় চড়া ও বন্দুক ছোঁড়া। অর্থাৎ উগ্র আধুনিকারা সেকালে যা যা শিখতেন সে সবই শিখেছিলেন তিনি। ইংরেজী বলতেন মেম সাহেবের মতো। স্বামীর মৃত্যুর পরে ঘোড়া ছুটিয়ে তিনি গ্রামেগ্রামান্তরে গিয়ে নিজের জমিদারী দেখে আসতেন। বিধবা হয়েছিলেন মাত্র সাতাশ বছর বয়সে। কার্বাঞ্চল হয়ে হঠাৎ জলাপ্রসাদের মৃত্যু হয়। সবাই ভেবেছিল স্বদেশ থেকে এতদূরে অল্পবয়স্ক। নিঃসন্তান বিধবা-বিরাট জমিদারীটা এবার লাটে উঠতে দেরি হবে না। সাহেব-মহলেও আলোড়ন জাগেনি তা নয়। বিপুল সম্পত্তির অধিকারিণী, রূপসী বিধবা, ভরা যৌবন—কিন্তু হতাশ হতে হল সবাইকে। শোনা যায়, একজন ইংরেজ উচ্চপদস্থ কর্মচারী নাকি পাণিপ্রার্থনা করেছিলেন সুদক্ষিণার। দোষ ছিল না তাতে। কিন্তু সুদক্ষিণা কর্ণপাত করেননি। তবে এ সবই শোনা কথা। নিশ্চিত কি ঘটেছিল তা জানাবার মতো কেউ আর ইহজগতে নেই। অবশ্য এসব কথাকে অবিশ্বাস করারও কোন কারণ নেই। সুদক্ষিণা ছিলেন সত্যিকারের দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিত জমিদারের দোর্দণ্ডপ্রতাপান্বিতা পত্নী। তার প্রতাপে ইংরেজ অফিসাররাও তটস্থ হয়ে থাকতেন।

সুদক্ষিণা ইংরেজ কর্মচারীদের ওপর এত প্রতাপ দেখাতেন কি করে? কেন ভয় পেতেন না কাউকে? শোনা গেছে, জলপ্রসাদের পিতা সিপাহীবিদ্রোহের সময় কয়েকজন ইংরেজকে আশ্রয় দিয়ে সাহায্য করেন, তাই এর পুরস্কাররূপে তিনি লাভ করেন একটা বিশেষ অধিকার। তাঁর জমিদারীকে কোন কারণে নীলামে চড়ান চলবে না। ব্রিটিশ-আইন তাদের প্রতিজ্ঞা রেখেছিল। ফলে সুদক্ষিণা এবং জলাপ্রসাদের শক্তি অনেক বেড়ে যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর জমিদারীর ভার হাতে এলেও, সুদক্ষিণা ইংরেজ কর্মচারীদের মনে মনে বেশ অপছন্দ করতেন, যদিও প্রয়োজনে তাদের সঙ্গে যোগ রাখতেন ঠিকই কিন্তু একটু বাড়াবাড়ি বা বেটাল দেখলে, তৎক্ষণাৎ ওপরে নালিশ জানাতেন। তাই ইংরেজ রাজকর্মচারীরা পারতপক্ষে তাকে চটাতেন না।

শোনা গেছে, সুদক্ষিণা তার জমিদারীতে ছিলেন মুকুটহীন রাণী। ব্রিটিশ শাসকেরা তাকে দিয়েছিলেন C. I. E. খেতাব। দিতে চেয়েছেন মহারাণী খেতাব। একবার নয় তিন তিনবার। প্রতিবারই প্রত্যাখ্যান করেন সুদক্ষিণা! কি হবে ওদের দেওয়া খেতাব নিয়ে? কি সম্মান বাড়বে? মাঝ থেকে আমার জমিদারীতে ওদের উৎপাত বাড়বে। তার চেয়ে এসব দরকার নেই। তিনি থাকতেন তার নিজের সন্তানতুল্য প্রজাদের নিয়ে। অন্য গ্রামে বা অন্য জমিদারীতে ডাকাতি হয়, অনাচার হয়। সুদক্ষিণার জমিদারী এসবের ঊর্ধে। প্রজারা কপালে হাত ঠেকিয়ে বলত, রামরাজত্বে বাস করি। তিনি বেছে বেছে কয়েকটা ডাকাতকে নিয়ে তৈরি করেছিলেন ভয়ানক রক্ষীবাহিনী। নিজে ঘোড়ায় চেপে বন্দুক হাতে যেতেন গ্রাম দেখতে। লোকে বলত অভ্রান্ত নিশানা। রাইফেল সুটিংয়ের প্রতিযোগিতায় তিনি ইংরেজ পুরুষ প্রতিযোগীদেরও হারিয়ে দিতেন। এমন রণচণ্ডীর মতো তেজস্বিনী মেয়ে যেন বাংলাদেশেও খুব বেশি নেই। অবশ্য বাঙালী মেয়ের জমিদারী চালনায় চিরকালই দক্ষ। রাণী ভবানী বা রাণী রাসমণির কথা আমরা জানি। তারাও বিচক্ষণতার সঙ্গে জমিদারী চালাতেন। সত্যিকারের রাণী না হলেও প্রজাদের চোখে, শ্রদ্ধায় সম্মানে তিনি রাণীর আসনই পেয়েছিলেন। সুদক্ষিণা জমিদারী পেয়েছিলেন খুব অল্পবয়সে তায় বিদেশে, তবু কোন অসুবিধে হয়নি।

জমিদারী দেখা ছাড়াও সুদক্ষিণা মন দিয়েছিলেন জনকল্যাণে ও লোকসেবায়। তার জন্যে বলাবাহুল্য, পারিবারিক ট্র্যাডিশন অনুযায়ী তিনি একটা স্কুল প্রতিষ্ঠা করলেন উত্তর প্রদেশের অশিক্ষিত ও অনুন্নত মানুষের জন্যে। ঐ সব অঞ্চলে তখন মেয়েরা একেবারে অন্ধকারে বাস করত। সুদক্ষিণা তাদের মধ্যেও শিক্ষাপ্রসারের চেষ্টা শুরু করলেন। তবে অসহযোগ আন্দোলনের সময় যখন আংরেজী হঠাও আন্দোলন শুরু হল তখন সুদক্ষিণা আপত্তি জানালেন। ইংরেজ হঠাও তাতে ক্ষতি নেই কিন্তু ইংরেজী হঠাও কেমন কথা! সে তো একটা দরকারি ভাষা। বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সাহিত্যের সঙ্গে পরিচিত হবার সুযোগ করে দিয়েছে সে। প্রচণ্ড প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি বললেন যে, ইংরেজী না পড়ানো হলে তার স্কুল তিনি তুলে দেবেন। সাহেবী চালচলনে অভ্যস্ত সুদক্ষিণাকে তাই ভুল বোঝা সম্ভব ছিল। অথচ সমসাময়িক সমস্ত ইংরেজ রাজকর্মচারী জানতেন, সুদক্ষিণার মতো ইংরেজবিদ্বেষী আর দুটি নেই।

আগে বলেছি, সুদক্ষিণার পোষাকী নাম ছিল পূর্ণিমা। এই নামে তিনি একটি গানে সুর দিয়েছিলেন। সেই সুরের নাম দি ইনডিয়ান ভিলেজগার্ল। রেকর্ডে এই অর্কেস্ট্রা বেশ জনপ্রিয় হয়েছিল কিন্তু সুদক্ষিণা এর কৃতিত্ব সবটাই দিতে চাইতেন তার দাদা হিতেন্দ্রনাথকে। সম্ভবত হিতেন্দ্রের নির্দেশেই তিনি এই রেকর্ডটির সুর সৃষ্টি করেন।

মহর্ষির পৌত্রীদের মধ্যে বাকি রইলেন আর তিনজন, রবীন্দ্রনাথের তিন কন্যা। কিন্তু কবির মেয়েদের আগে আরও দুজনের কথা বলে নেওয়া যেতে পারে। এঁরা দুজন আর কেউ নয়, স্বর্ণকুমারীর দুই গুণবতী মেয়ে হিরন্ময়ী ও সরলা। সময়ের দিক থেকে তারা প্রতিভা, ইন্দিরা, সরোজা, প্রজ্ঞাদের সমসাময়িক। আসলে হিরন্ময়ী ও সরলা ঘোষাল বংশের মেয়ে কিন্তু তাদের ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হতে তেমন বাধা ছিল না। বরং তাঁরা ঠাকুরবাড়ির মেয়ে হিসেবেই সর্বজনপরিচিত। সেটাই স্বাভাবিক। হিরন্ময়ী ও সরলার শৈশব কেটেছে এই বিশাল মায়াপুরীর সোনালি দিনগুলোতে। স্বর্ণকুমারী থাকতেন তিন তলার এক অংশে। মেয়েরা থাকতেন বাড়ির অন্যান্য মেয়েদের সঙ্গে। পরে স্বর্ণকুমারী ও জানকীনাথ যখন অন্য বাড়িতে গিয়েছেন তখনও তার প্রতিদিন আসতেন ঠাকুরবাড়িতে কিংবা ঠাকুরবাড়ি থেকে কেউ না কেউ যেতেন তাদের বাড়ি। সুতরাং হিরন্ময়ী ও সরলা ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের সদস্য। রূপেই পরিচিত।

হিরন্ময়ী ছিলেন সব কাজেই মায়ের যথার্থ সঙ্গিনী। ভারতী পত্রিকা সম্পাদনায়, সখিসমিতি পরিচালনায় স্বর্ণকুমারী হিরন্ময়ীর সাহায্য পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। কিন্তু হিরন্ময়ীর হাতে যখন ভারতী সম্পাদনার ভার এল তখন তিনি প্রবাসিনী সরলাকেও সম্পাদনার কাজে টেনে নিলেন। তাই দেখা যাবে হিরন্ময়ীর সব কাজেই জড়িয়ে আছেন সরলা। এমনকি কর্মজীবনের শুরুতেও তারা দুই বোনে মিলে মেয়েদের জন্যে একটা পাঠশালা খুলেছিলেন কাশিয়াবাগানে, তাদের নিজের বাড়িতে। এখনকার বয়স্ক শিক্ষার আদিরূপ বলা যায় সেটাকে। তাদের বাড়ির পুকুরে জল নিতে আসত পাড়ার বৌঝিরা। তাদের মধ্যে থেকে গোটা কুড়ি কুমারী ও বালবিধবা নিয়ে এই স্কুল শুরু হয়েছিল। প্রধান শিক্ষিকা হিরন্ময়ীর তখন বয়স চোদ্দ-পনেরো বছর। সহশিক্ষিকা সরলা। দশে পড়েছেন। দুজনে মিলে ছাত্রীদের শেখাতেন বাংলা, ইংরেজী, গান আর সেলাই। প্রতিদিন বিকেল সাড়ে চারটে থেকে সাড়ে ছটা পর্যন্ত এই স্কুল বস্ত। জোড়াসাঁকো থেকে যারা আসতেন তারা ছাত্রীদের পরীক্ষা নিতেন। পুরস্কার দেওয়া হত। একবার রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে প্রাইজ বিতরণ করান হয়।

বিয়ের পরে হিরন্ময়ী তার মায়ের সখিসমিতিকে একটু অদলবদল করে বিধবা শিল্পাশ্রমে পরিণত করেন। সখিসমিতির তখন জীর্ণাবস্থা। ইতিপূর্বে হিরন্ময়ী শশিপদ বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতিষ্ঠিত বরানগরের একটি বিধবা শিল্পাশ্রমের সঙ্গে পরিচিত হন। তারপর তিনি সখিসমিতিকেও নতুন আদলে গড়ে তৈরি করলেন বিধবা শিল্পাশ্রম। তাঁর মৃত্যুর পরে এই আশ্রমের নাম হয় হিরন্ময়ী বিধবা শিল্পাশ্রম। মেয়েদের হাতের কাজ, সেলাই প্রভৃতির জন্যে এখান থেকে মেডেল দেওয়া হত। গগনেন্দ্রনাথের ছোট মেয়ে সুজাতাও এখান থেকে মেডেল পেয়েছেন হাতের কাজের জন্যে।

হিরন্ময়ীর সামাজিক কাজকর্মের আড়ালে লুকিয়েছিল একটি শিল্পীসত্তা। বেথুন স্কুল থেকে মাইনর পরীক্ষা পাশের পর হিরন্ময়ী আর স্কুলে পড়েননি তবে সাহিত্যের সঙ্গে তার যোগ ছিল। সখা, বালক ও ভারতীতে তার অনেক লেখা ছাপা হয়। সে সব লেখা আজও পুরনো পত্রিকার পাতাতেই ছড়িয়েছিটিয়ে পড়ে আছে। কেউ সযত্নে সংগ্রহ করে প্রকাশ করার চেষ্টা করেননি। ভারতী সম্পাদনা করবার সময় তিনি একাই সব কিছু দেখাশোনা করতেন। প্রবাসিনী সরল। ছিলেন নামে মাত্র যুগ্ম-সম্পাদিকা। কাজ হিরন্ময়ীকে ই করতে হত। তাঁর নিজের লেখা ভারতীতে আছে বোধহয় চব্বিশটি। তার মধ্যে বেশ কয়েকটি রাশিয়া নিয়ে লেখা। প্রবন্ধগুলি মৌলিক নয়, অনুবাদ-তাহলেও ভাষার ওপর তাঁর দক্ষতা ও বিষয় নির্বাচনের ক্ষমতা প্রশংসার যোগ্য। রুশিয়া, রুশিয়ার কারাগার, রুশিয়ার বাণিজ্য, রুশিয়ার ভাষা ও বাণিজ্য, রুশিয়ার শাসনপ্রণালী বেশ মননধর্মী রচনা।

হিরন্ময়ীর মৌলিক রচনা কয়েকটি সনেট। সরলার ভাষায় বলা যায়, যেমন কারুর কারুর গানের গলা মিষ্ট ও করুণ অথচ সে বড় গাইরে নয় তেমনি হিরন্ময়ীর কবিতাগুলোও করুণ-মধুর। ভারতীর প্রতি ছিল তার আন্তরিক অনুরাগ। তাই তার ভার নিয়েও মনে জমেছিল শংকা। কি জানি কি হয়? তিনি অনেক চেষ্টা করে ভারতীর ভার তুলে দিলেন তার মামা রবীন্দ্রনাথের হাতে। কবি ভার নিয়েছিলেন মাত্র এক বছরের জন্যে। তারপর কি হবে? সে কথাই হিরন্ময়ী প্রকাশ করেছেন একটি সনেটে। তাতে তিনি বলেছেন রবি যদি অস্ত যায় আসে অন্ধকার, তবু রব কাছে, বাস্তবিকই পরম আদরে তিনি রবিহারা ভারতীকে তুলে নিয়েছিলেন বুকে। তাঁর জীবৎকালে ভারতীর সঙ্গে তার বিচ্ছেদ হয়নি। ভারতী যখন বন্ধু হয়ে যায় হিরন্ময়ী তখন পরলোকে। হিরন্ময়ীর সাহিত্যানুরাগ সঞ্চারিত হয়েছে তার বিদুষী কন্যা কল্যাণীর মধ্যেও। নাথকাল্টের ওপর অত্যন্ত মূল্যবান ও পরিশ্রমসাধ্য গবেষণা করে তিনি পি-এইচ. ডি. উপাধি লাভ করেন বেশ কয়েক বছর আগে। তার গবেষণ! গ্রন্থটির নাম নাথসম্প্রদায়ের ইতিহাস দর্শন ও সাধনপ্রণালী।

স্বর্ণকুমারীর মধ্যে যে রাজনৈতিক চেতনা ও দেশভক্তির উন্মেষ দেখা দিয়েছিল। তার পূর্ণ বিকাশ ঘটল তাঁর মেয়ে সরলার মধ্যে। সরলার মতো তেজস্বিনী নারী বিরল-যেন কোষমুক্ত-কৃপাণলতা, বাংলার জোয়ান অব আর্ক, ভারতের প্রথম চারণী। সাহিত্য-সঙ্গীত-স্বাদেশিকতার ত্রিধারাকে তিনি বইয়েছিলেন এক খাতে, তবে আমাদের মনে হয় সঙ্গীত ও সাহিত্য দুই-ই তাঁর স্বদেশচেতনার অনুগামী। সরলার প্রথম জীবন কেটেছিল জোড়াসাঁকোতে আর সব বোনেদের মতোই—শুধু মনে ছিল একটা চাপ বেদনা। লেখাপড়ায় মগ্ন মা তাঁকে ভালবাসেন না। বাসেন না কি আর? তবে বহিঃপ্রকাশটা বড় কম। সেকেলে অভিজাত পরিবারের এই তো দস্তুর! একান্নবর্তী বিশাল পরিবার। সেখানে মা কেন মেতে থাকবেন নিজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে? তাদের জন্যে তে দেখাশোনা করবার জন্যে ঝি আছে। ঠাকুরবাড়ির ছোট ছেলেমেয়েদের জন্যে এক বা একাধিক খাস চাকর বা খাস ঝি থাকত। ছেলেদের জন্যে চাকর, মেয়েদের ঝি আর দুগ্ধপোষ্যদের জন্যে দুধ মা-এর নড়চড় হত না। সব দেখে মনে হয় সেকালের বড়লোকদের বাড়িতে শিশুরাই ছিল সবচেয়ে অসহায়। অবশ্য সরলা দেখতেন তার মা-মাসীরা নিজেদের সন্তানদের সম্বন্ধে যতটা উদাসীন ছিলেন মামীরা অর্থাৎ ঠাকুরবাড়ির বৌয়েরা তা ছিলেন না। তারা বাইরে থেকে আসতেন ভিন্ন পারিবারিক ধারা নিয়ে, সন্তানদের টেনে নিতেন বুকে। বিশেষ করে জ্ঞানদানন্দিনী, তিনি তার ছেলেমেয়েদের খুব ভালবাসতেন, তাদের ঘটা করে জন্মদিন হত। তাদের জন্যে দুধ মা বা খাস ঝি-চাকর থাকলেও মাতৃস্নেহে ভঁটা পড়ত না। দুঃখ শুধু সরলার। ক্ষুব্ধ অভিমানে ছোট্ট বুকটা ভরে উঠত।

হয়ত মায়ের উদাসীনতা অভিমানী মেয়ের বুকে একটা চাপা দীর্ঘশ্বাস সৃষ্টি করেছিল, তাই সরলা মন দিয়েছিলেন লেখাপড়ার দিকে। মাত্র তেরো বছর বয়সে বেথুন থেকে এনট্রান্স পাশ করে সরলা বোধহয় প্রথম সবার চোখে পড়লেন, এমনকি মায়েরও। চোখে পড়ার কারণও ছিল। এনট্রান্স পরীক্ষার সময়, ইতিহাসের প্রশ্নের মধ্যে মেকলের লেখা লর্ড ক্লাইভ গ্রন্থের ওপর ভিত্তি করে ক্লাইভের বঙ্গবিজয় সম্বন্ধে একটা প্রশ্ন করা হয়েছিল। সরল মেকলের আঁকা বাঙালী চরিত্রের হেয় তার প্রতিবাদ করে নিজেই বিপরীত মন্তব্যপূর্ণ উত্তর এমন যুক্তি তেজ ও আন্তরিকতার সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন যে, পরীক্ষক এন. ঘোষ এই ছাত্রীকে সর্বাধিক নম্বর দিয়ে, খোঁজ করেছিলেন মেয়েটি কে? ইতিহাসের পরীক্ষায় সরলাই সেবার প্রথম হয়েছিলেন। সবাই দেখলেন সরলা রাতারাতি বড় হয়ে উঠেছেন। তাই তো! কখন বড় হয়ে উঠল সরলা? রূপের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে থাকা সরলা এগিয়ে গেলেন সবার আগে। ঠাকুরবাড়িতে এর আগে কোনো মেয়ে পরীক্ষায় বসেনি। শুধু এনট্রান্স নয়, সরলা এরপর পাশ করলেন বি. এ. (১৮৯০)। সতেরো বছর বয়সে। বেথুন কলেজ থেকে ইংরেজীতে অনার্স নিয়ে। ইন্দিরা তখনও পরীক্ষা দেননি। সরলা সবচেয়ে বেশি নম্বর পেয়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পান পদ্মাবতী স্বর্ণপদক। তিনিই এ মেডেল প্রথম পান। সংখ্যার দিক থেকে তিনি ছিলেন সপ্তম মহিলা গ্র্যাজুয়েট। এরপর তিনি ভেবেছিলেন সংস্কৃতে এম. এ. পড়বেন, নানা কারণে পরীক্ষা দেওয়া হয়নি। বিষয় নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য থেকেই সরলার খেয়ালখুশি ও জেদের পরিচয় পাওয়া যায়। বি. এ. পড়বার আগে তিনি স্কুলে পড়েছিলেন সায়েন্স। সে সময় মেয়েদের সায়েন্স পড়ার সুযোগ ছিল না তাই সরলা জেদ করে দাদাদের সঙ্গে ডাক্তার মহেন্দ্রনাথ সরকারের সায়েন্স এ্যাসোসিয়েশনের সান্ধ্য-লেকচারে যাবার অনুমতি নিলেন। সেখানে সরলা একমাত্র ছাত্রী, তাই তিনি বসে থাকতেন অধ্যাপকদের ঘরে! তাঁরা ক্লাসে এলে সরলাও আসতেন। দুপাশে দুই দাদা—জ্যোৎস্নানাথ ও সুধীন্দ্রনাথ। তিনটে স্বতন্ত্র চেয়ার থাকত সামনের লাইনে, সেখানে বসতেন দুপাশে দুই দাদাকে নিয়ে সরলা আর বাকী ছাত্ররা বসত বেঞ্চে। আড়ালে ফিসফিস করে দুই দাদাকে দেখিয়ে ছেলেরা বলত বডি গার্ডস। কিন্তু এত কাঠ-খড় পুড়িয়ে যে সায়েন্স পড়া, সেই সায়েন্সের ওপর কোনো আকর্ষণই ছিল সরলার। থাকলে তিনি কাদম্বিনী গাঙ্গুলী বা অবলা বসুর মত চিকিৎসক হতে চাইতেন। কিংবা বিধুমুখী বসু ও ভার্জিনিয়া মিত্রের মতো। মনে রাখতেন ঐ মহিলাদের অবিস্মরণীয় ডাক্তারী পড়ার কাহিনীকে। কাদম্বিনীকে দেখে মনে হয় কোন বাধাই বুঝি বাধা নয়। অবলাও কম যান না, তিনি মাদ্রাজে গিয়েও ডাক্তারী পড়তে রাজী হয়েছিলেন। এমনকি স্বর্ণকুমারীর মতো বিজ্ঞানমনস্কতা থাকলেও সরলা বিজ্ঞানচর্চায় অনেক উন্নতি করতে পারতেন। কিন্তু ঠাকুরবাড়ির কোনো মেয়েই বিজ্ঞান-সচেতনতার পরিচয় দিতে পারেননি। পরবর্তী যুগেও তারা শুধু চর্চা করেছেন সাহিত্য ও শিল্পকলার। আর সরলার আগ্রহ ছিল অন্য দিকে তাই তিনি বিচিত্র বিষয় নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন, হয়ত খুজেছেন ঈপ্সিত পথ।

শুধু লেখাপড়া নয়, গানেও সরলার আগ্রহ কম ছিল না। ছোটবেলা থেকেই তিনি বাংলা গানে ইংরেজী কর্ড ব্যবহার করে ইংরেজী piece রচনা করতে পারতেন। রবীন্দ্রনাথের কয়েকটা গানের স্বরলিপি তৈরি করা ছাড়াও তিনি কয়েকটা গানকে য়ুরোপান্বিত করলে কবি খুব খুশি হয়ে ওঠেন। সকাতরে ঐ কঁদিছে গানটিকে সরলা যখন রীতিমতো একটা ইংরেজী বাজনার piece-এ পরিণত করলেন তখন সেটা পুরোদস্তুর ব্যাণ্ডে পিয়ানোতে বাজাবার যোগ্য হল। উৎসাহিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ তাকে বললেন নিঝরের স্বপ্নভঙ্গের পিয়ানো সংগত তৈরি করতে। সেও হল। সরলার তখন বয়স মাত্র বারো। কবি তাকে জন্মদিনে উপহার দিলেন একটা য়ুরোপীয় গান লেখার খাতা। দিয়ে বললেন, এইতে লিখে রাখ, ভুলে যাবি।

সরলার সঙ্গীতচর্চা মহর্ষিরও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। তিনি তাকে হাফিজের একটি কবিতায় সুর বসাতে দিলেন। এক সপ্তাহ পরে সরলা বেহালা বাজিয়ে গেয়ে শোনালেন হাফিজ। দেবেন্দ্রনাথ মজে মজে শুনলেন। খুব ভাল গান না হলে তিনি শুনতে চাইতেন না। বাড়ির লোকদের মধ্যে তিনি ভালবাসতেন রবীন্দ্রনাথের গান আর প্রতিভার পিয়ানো বাজানো শুনতে। যাইহোক, সরলার গান শুনে শুধু খুশিই হলেন না, গায়িকাকে উপহার দেবার ব্যবস্থাও করলেন। এল হাজার টাকা দামের হীরে-চুনি সেট করা জড়োয় নেকলেস। ঘরোয়া সভায় নেকলেসটি সরলার হাতে তুলে দিয়ে মহর্ষি বললেন, তুমি সরস্বতী! তোনার উপযুক্ত না হলেও এই সামান্য ভূষণটি এনেছি তোমার জন্যে।

গান সংগ্রহ ও সুর সংগ্রহ ছিল সরলার নেশার মতো। বাউল গান, আর দক্ষিণ ভারতীয় সঙ্গীতে ভরা একটি গানের ডালি তিনি উপহার দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথকে। কবি সেই গানকে ভেঙে-ভেঙে অনেক নতুন গান সৃষ্টি করেছেন। ইন্দিরাও এ ঘটনার উল্লেখ করেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীতের ত্রিবেণীসঙ্গমে। সরলার আনা সুরে রবীন্দ্রনাথ নিজের কথা বসিয়ে যে গান রচনা করেন সেগুলো হচ্ছে, আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে, এসো হে গৃহদেবতা, এ কি লাবণ্যে, চিরবন্ধু চিরনির্ভর ইত্যাদি।

এ তো গেল গানের কথা। অনেকেই জানেন না বন্দেমাতরম্ গানের প্রথম সুর রবীন্দ্রনাথের অনুরোধে সরলাই দিয়েছিলেন। কবি প্রথম দু লাইনের সুর বসান। সরলা নিজেও গান লিখতেন এবং সেইসব দেশাত্মবোধক গান প্রচুর উন্মাদনা সৃষ্টি করত। কিন্তু সে প্রসঙ্গে আমরা পরে যাব। আপাতত সরলার সাহিত্যচর্চার কথা সেরে নিই। এত কাজের ফাঁকে সরলা লিখেছেনও প্রচুর। বারো বছর বয়সেই একটা কবিতা লিখে পুরস্কার পেয়েছিলেন সখা পত্রিকা থেকে। প্রথম প্রবন্ধ পিতামাতার প্রতি কি ব্যবহার করা কর্তব্য। সেই শুরু, তারপর থেকে তো নিয়মিত লিখছেন ভারতীতে। প্রথমবারে যুগ্ম সম্পাদিকা থাকার সময় না হলেও পরে এককভাবে ভারতী সম্পাদনার সময় তিনি লিখতেন। প্রচুর। এ সময় তিনি মহীশূর থেকে ফিরে এসেছেন। বছর কয়েক আগে তিনি এম. এ. পড়া ছেড়ে মহীশূরের মহারাণী পাল স্ স্কুলে চাকরি নিয়ে চলে যান দক্ষিণ। ভারতে। ঠাকুরবাড়িতে এও নতুন ঘটনা। বাইরের অনেকেও সরলার চাকরি করতে যাওয়াটা ভাল চোখে নেয়নি। বঙ্গবাসী কাগজ ফোঁস করে মন্তব্য করল, এ ঘরের মেয়ের একলা একল। বিদেশে চাকরি করতে যাওয়ার দরকারটা কি? খাওয়া-পরার তো অভাব নেই? কেন খামোকা নিজেকে বিপদগ্রস্ত করা? এই ছিল সেকেলে দৃষ্টিভঙ্গির বৈশিষ্ট্য। যেন খাওয়া-পরার প্রয়োজনই সব। এর মেয়েদের এগিয়ে যাওয়াকে চিরকাল সন্দেহের চোখে দেখে এসেছেন। আর ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের তো কথাই নেই। তাদের কার্যকলাপ এদের একেবারে ভাল লাগেনি। মনে হয়েছে সব তাতেই বাহাদুরি দেখানোর চেষ্টা! কিন্তু ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা এগিয়েছেন প্রাণের দুর্বার আবেগে। বিপদকে তুচ্ছ করেছেন সরলা, তিনি কি ঘরে বসে থাকতে পারেন? আর তিনি তো একলা নন, আরো কত মেয়েই এগিয়ে গেছেন। তিনি যখন মহীশূরে গেলেন। তার আগেই সেখানে গিয়েছেন কুমুদিনী খাস্তগির।

যাইহোক, দেশে ফিরে আবার ভারতী নিয়ে বসলেন সরলা। কাগজে একেবারে বিজ্ঞাপন দিয়ে দিলেন আগামী মাসে শ্ৰীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একটি সামাজিক প্রহসন লিখবেন। কাগজ পড়ে তো রবীন্দ্রনাথের চক্ষুস্থির। সে কী! তিনি কিছুই জানেন না আর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়ে গেল! বকতে আরম্ভ করলেন, কেন তুই আমাকে না জানিয়ে বিজ্ঞাপন দিলি? আমি লিখব না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লিখতেই হল। সরলা নতুন সম্পাদিকা, তাকে বিপদে ফেলতে মন চাইল না। লেখা হয়ে গেল চিরকুমারসভা। তবে সরলার এই রকম কাজের জন্যে কিংবা লেখার তাগিদে কবি পরবর্তীকালে বেশ বিরক্ত হয়ে ওঠেন। কিন্তু নিরপেক্ষ বিচারে দেখা যাবে সরলার খুব একটা দোষ ছিল না। সম্পাদিকা হিসেবে সরলা খুবই বিচক্ষণতার পরিচয় দিতেন। লেখকদের পারিশ্রমিক দেবার প্রবর্তন করেন তিনিই। ভারতীকে নানাভাবে তিনি সার্থক করে তুলেছিলেন। বালক, সাধনা, পুণ্যর মতো ভারতী শুধু ঠাকুরবাড়ির কাগজ হয়ে যে। থাকেনি সে কেবল সরলার গুণে। তিনি গুণী লেখকদের খুঁজে বার করতেন এবং সুযোগ দিতেন। একটা উদাহরণ দেওয়া যাক। শরৎচন্দ্র বোধহয় সবে তখন গল্প লেখা শুরু করেছেন। কুণ্ঠা যায়নি। রয়েছেন বর্মায়। সেই সময় তার মামা বড়দিদি গল্পটির পাণ্ডুলিপি দিয়ে এলেন প্রবাসীতে। কিছুদিন পড়ে থাকার পর রামানন্দ চট্টোপাধ্যায় সেটি ফেরৎ দিলেন অমনোনীত রচনা বলে। সুরেন গঙ্গোপাধ্যায় আর কি করেন? তিনি সেটি নিয়ে এলেন ভারতীর অফিসে। সে সময় সরলা পাঞ্জাব থেকে এসেছেন কিছুদিনের জন্যে। ভারতীর সুব্যবস্থা করতে। তাঁকে গল্পটি দেখানো হল। তিনি পড়ে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করে বললেন, চমৎকার! এক কাজ কর, বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ় তিন মাসে ছাপাও বৈশাখ ও জ্যৈষ্ঠ সংখ্যায় নাম দিও না, সকলে মনে করবে রবীন্দ্রনাথের লেখা। আমাদের দেরির ক্রটি ঘুচবে এবং গ্রাহক-গ্ৰাহিকা বাড়বে। আষাঢ় সংখ্যায় বড়দিদি শেষ হবে, আর সেই সংখ্যায় শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেখকের নাম ছাপবে। তাই হল এবং দেখা গেল সরলার সব অনুমানই সত্যি। অনেকে রবীন্দ্রনাথকে গিয়ে প্রশ্ন করলেন বড়দিদির কথা। বিস্মিত রবীন্দ্রনাথ জানালেন লেখক তিনি নন, তবে গল্পটি নিঃসন্দেহে কোন শক্তিশালী লেখকের লেখা। তিনিও কৌতূহলী হয়ে উঠলেন। ঔৎসুক্য প্রকাশ করলেন গগনেন্দ্র অবনীন্দ্র ও আরো অনেকে। নাম না থাকায় বড়দিদি ক্রমশই কৌতূহল বৃদ্ধি করে এবং এরপর শরৎচন্দ্রের প্রতিষ্ঠাও সহজ হয়ে গেল।

শুধু নতুন লেখক আবিষ্কার নয়, সরলা ভারতীকে সমৃদ্ধ করেছিলেন কয়েকজন মনীষীর দুল ভ ইংরেজী রচনার অনুবাদ করিয়ে। এই রচনাগুলি হল?

ক) ভগিনী নিবেদিতার প্রত্যেক মা ছেলের জন্য কি করতে পারে (জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬), বঙ্গমাতার কর্তব্য। শ্রাবণ ১৩০৬)

খ) মহাদেব গোবিন্দ রানাডের-পূর্বকালের সমাজ শাসন (শ্রাবণ ১৩০৭)

গ) মোহনদাস করমচঁদ গান্ধীর-দক্ষিণ আফ্রিকার ভারতোপনিবেশ (বৈশাখ ১৩০৯)।

শোনা যায় এই ভারতী সম্পাদনাসূত্রেই সরলার সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল সাহিত্যিক প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়ের। বিপত্নীক, উন্নতরুচি, সাহিত্যপ্রেমিক প্রভাতকুমারের সঙ্গে বোধহয় সরলার বিবাহের কথাবার্তাও হয়েছিল এবং নিজেকে আরো যোগ্য করে তোলার জন্যে প্রভাতকুমার ব্যারিস্টার হবার জন্যে বিলেত যাত্রা করেন। শেষ পর্যন্ত অবশ্য বিয়ে হয়নি। প্রভাতকুমারের গোড়া হিন্দু জননীর প্রবল বিরোধিতায় বিয়ের প্রস্তাব নাকচ হয়ে যার। আরো কয়েকজনের নামও শোনা গেছে সরলার ভাবী বর হিসেবে। তবে মনে হয়, এ সবই অলীক কল্পনা। আমাদের দেশে বয়স্থা অনুঢ়া মেয়েকে নিয়ে জল্পনা করা চিরকেলে স্বভাব। সরলা বহুদিন অবিবাহিত ছিলেন, প্রায় তেত্রিশ বছর। বিয়ের বয়স হিসেবে বয়সটা আজকের যুগেও বেশি। তাই কথা তো উঠবেই। আসলে এ ব্যাপারে প্রথম দিকে সরলার আগ্রহ ছিল না। স্বদেশপ্রেমিকা তেজস্বিনী মেয়েকে দেশের কাজে কুমারী রাখার আগ্রহ ছিল স্বর্ণকুমারীরও। এমনকি মহষি ও প্রস্তাব করেছিলেন সরলার বিয়ে হবে খাপখোলা তলোয়ারের সঙ্গে। ফলে বয়স বাড়ে। শেষে যার সঙ্গে সরলার বিয়ে হল তিনি সত্যিই সরলার যোগ্য স্বামী, পাঞ্জাবের বিপ্লবী নেতা খাপখোলা তলোয়ারের মতো তেজস্বী রামভজ দত্ত চৌধুরী।

ভারতীতে সরলা নিজেও নানারকম রচনা লিখতেন। গান-কবিতা-গল্পউপন্যাস-রম্যরচনা সমালোচনা-অনুবাদ-আর বাকী রইল কী! স্মৃতিকথা? তাঁর শেষ জীবনে লেখা জীবনের ঝরাপাতা একটি অসাধারণ রচনা। সমসাময়িক যুগের দর্পণ বললেও অত্যুক্তি হবে না। এছাড়া তার সংস্কৃত কাব্য আলোচনা করে লেখা কয়েকটা প্রবন্ধ রতিবিলাপ, মালতীমাধব, মালবিকাগ্নিমিত্র, মৃচ্ছকটিক অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্ৰ শ্ৰশ মজুমদারকে এই প্রবন্ধগুলো দেখিয়ে বলেছিলেন, লেখিকার বয়স বিবেচনা করিলে বলিতে হয় ও বয়সে আমাদেরও অমন লেখা সহজ হইত না। তাহার সমালোচনা পড়িয়া নাটকগুলি আবার নতুন করিয়া পড়িতেছি। সরলার সব রচনার কোন সংকন আজও প্রকাশিত হয়নি।

মৌলিক রচনার হিসেবে সরলার প্রথম উল্লেখযোগ্য রচনা প্রেমিক সভ লেখকের নামহীন লেখাটি বেশ প্রশংসা পায়। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং অভিনন্দন জানিয়ে ভগ্নীকে লিখলেন, নাম দিসনি বলে তোর এ লেখার ঠিক যাচাই হল। নতুন হাতের লেখার মতো নয়, এ যেন পাকা প্রতিষ্ঠ লোকের লেখা। এ যদি আমারই লেখা লোকে ভাবত, আমি লজ্জিত হতুম না। এর চেয়ে বড় কমপ্লিমেন্ট আর কি হতে পারে? এরপর সরলা বেশ কয়েকটা সুখপাঠ্য গল্প লেখেন।

কিন্তু আগেই বলেছি, সরলার জীবনে সাহিত্য বা সঙ্গীত প্রধান নয়। তার জীবনে সবচেয়ে বড় ছিল তার স্বদেশপ্রেম। সাহিত্য বা সঙ্গীত তাঁকে স্বদেশহিতৈষণার পথে সাহায্য করেছিল কিংবা বলা যায় সরলা তার রাজনৈতিক কাজে এ দুটিকে ঠিকমতো ব্যবহার করতে পেরেছিলেন। ঠাকুরবাড়ির কোন ছেলেও তখন সরলার মতো চরমপন্থী রাজনীতি নিয়ে মেতে ওঠেননি। সৌম্যেন্দ্রনাথ এসেছেন অনেক পরে। সরলার মধ্যে স্বদেশচেতনার আগ্রহ জাগিয়ে দিয়েছিলেন তার বাবা-মা। জানকীনাথ ছিলেন ভারতীয় কংগ্রেসের মেরুদণ্ড। স্বর্ণকুমারী প্রথমে হিন্দুমেলায় যোগ দিয়ে মেয়েদের মধ্যে সর্বপ্রথম স্বদেশিয়ানার সুচনা করেন। তার সখিসমিতি, শিল্পমেলার মধ্যেও স্বদেশপ্রেমের বীজ লুকিয়েছিল। রল। স সেরি এলেন রাজনীতিতে। ১৮৯৫ সাল থেকেই তিনি ভারতীর মারফত বাঙালী যুবমানসকে বীমন্ত্রে দীক্ষা দেবার চেষ্টা করেন। মৃত্যুচর্চা, ব্যায়াম চর্চা, বিলাতি ঘুষি বনাম দেশী কিল বাঙালীর মুমূযু আত্মসম্মানকে জাগিয়ে দিল। সুস্থ সবল জীবন যাপন ও অপমানের প্রতিরোধে মৃত্যুও ভাল এই বোধে সবাই উদ্বুদ্ধ হতে শুরু করল। সারা দেশে বইল উদ্দীপনার জোয়ার। দলে দলে স্কুল কলেজের ছেলেরা এল সরলার কাছে। সরলা তাদের মধ্যে থেকে কয়েকজনকে বেছে বেছে একটা দল করলেন। ভারতবর্ষের কখানি। [চত্র তাদের সামনে রেখে প্রতিজ্ঞা করাতেন তনু মন দিয়ে ভারতের সেবা করার। শেষে হাতে একটি রাখি বেঁধে দিতেন তাদের আত্মনিবেদনের সাক্ষী হিসেবে। অবশ্য সরলার এই সমিতি ঠিক গুপ্ত সমিতি ছিল না তবে মুখে মুখে রটানো বারণ ছিল।

বছর কয়েক পরে এই লাল সুতোর রাখিবন্ধন দেশময় ছড়াল রবীন্দ্রনাথের জন্যে। ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের দিনে তিনি হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে সবার হাতে পরিয়ে দিলেন মিলনরাখি। সরলার রাখিবন্ধনের কথা মনে হলেই মনে পড়ে যায় চার অধ্যায়ের এলাকে। তার হাতের রক্ততিলক ছেলেদের মনে দারুণ উদ্দীপনা সৃষ্টি করত। এই জাতীয় দলনেতৃত্ব ঠাকুরবাড়িতেই প্রথম নয়, বাংলাদেশেও প্রথম। বিদেশেও কি সুলভ ছিল? ইংলণ্ডে তখন মেয়েরা ভোটাধিকারের জন্যে লড়াই করছেন। কল্পনা করা যায় কি ঠিক সেই সময়ে ছেলেদের বীর্যমন্ত্রে দীক্ষিত করছেন একটি বাঙালী মেয়ে!

ভারতী সম্পাদনাসূত্রে সরল। এ সময় পরিচিত হয়েছিলেন আরো দুটি অলোক সামান্য প্রতিভার সঙ্গে স্বামী বিবেকানন্দ ও ভগিনী নিবেদিতা। স্বামীজী চেয়েছিলেন সরলা বিদেশে যাবেন ভারতীয় নারীর প্রতিনিধি হয়ে। প্রতীচ্যের মেয়েদের শোনাবেন প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক বাণী। চিঠিতে লিখেছিলেন?

যদি আপনার ন্যায় কেউ যান তো ইংলণ্ড তোলপাড় হইয়া যাইতে পারে, আমেরিকার কা কথা!

স্বামীজী নিবেদিতাকেও বারবার বলেছিলেন সরলার কথা। নিবেদিতা লিখেছেন, তিনি (স্বামীজী) বলেন—সরলা নারীকুলের রত্ন; অনেক বড় জিনিয করবে। নিবেদিতা গল্প করেছিলেন সরলাকেও, স্বামীজী তাকে বলেছেন—সরলার education perfect; এইরকম education ভারতের সব মেয়েদের হওয়া দরকার। এরপরই নিবেদিত প্রস্তাব নিয়ে এলেন— স্বামীজীর সঙ্গে inext trip-এ সরলারও বিলেত যাওয়ার, সেখানে ভারতের মেয়েদের প্রতিনিধি হয়ে প্রাচ্যের আধ্যাত্মিক বার্তা প্রতীচ্যের মেয়েদের শোনাবার জন্যে।

স্বামীজীর আশা অবশ্য সফল করতে পারেননি সরলা, কারণ তিনি তার সঙ্গে বিদেশ যেতে পারেননি। স্বামীজী ও নিবেদিতার সঙ্গে খুব বেশি যোগাযোগ রাখাও সম্ভব হয়নি সরলার পক্ষে, তার পেছুটান ছিল ঠাকুরবাড়ি ও ব্রাহ্ম সমাজের। বরং স্বামীজীর স্বপ্ন আংশিকভাবে সফল করেছিলেন সুষমা। তাঁর আমেরিকাযাত্রার কথা আগেই বলেছি। সরলা ঝড় তুলেছিলেন বাংলায়, পাঞ্জাবে, সারা ভারতবর্ষে।

এর মধ্যে হঠাৎ একটা সভানেতৃত্বের আহ্বান এল। সরলা ইতস্তত করতে লাগলেন। মহীশূর ঘুরে এসেছেন বটে, তা বলে কলকাতা শহরে প্রকাশ্যে ছেলেদের সভায় যোগ দেওয়া! এ যে কল্পনার অতীত! মাঝে মাঝে স্বামীজীর আশ্রমেও গিয়েছেন কিন্তু তখন সঙ্গে থাকতেন মামাতো দাদা সুরেন কিংবা অগ্নিশিখার মতো অলোকসামান্য নিবেদিত। তবু রাজী হতে হল। তার নির্দেশে সভা হল পয়লা বৈশাখ। ঐ দিন যশোরেশ্বর প্রতাপাদিত্যের রাজ্যাভিষেক হয়েছিল। উৎসবের নাম হল প্রতাপাদিত্য উৎসব। তার জীবনী আলোচনা করে ছেলেরা দেখাল লাঠি খেলা, কুস্তি, বকসিং!

দিন বদলেছে বলে সরলাকে বিরূপ সমালোচনা শুনতে তো হলই না, উন্টে কাগজে কাগজে সমালোচনার বদলে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা শোনা গেল। মরি মরি কি দেখিলাম! এ কি সভা! বক্তিমে নয়, টেবিলে চাপড়াচাপড়ি নয়—শুধু বঙ্গবীরের স্মৃতি আবাহন, বঙ্গযুবকদের কঠিন হস্তে অস্ত্রধারণ ও তাদের নেত্রী এক বঙ্গললনা…দেবী দশভুজা কি আজ সশরীরে অবতীর্ণ হইলেন?

কিংবা, কলিকাতার বুকের উপর যুবক সভায় একটি মহিলা সভানেত্রীত্ব করিতেছেন দেখিয়া ধন্য হইলাম।

কাগজে লিখল, সরলাদেবীর সঙ্গে দৌড়ে দৌড়ে হাঁপিয়ে পড়ছি। রোজ ভোরে উঠে মনে হয়-অতঃ কিম?

আসলে সরলা বাঙালী মানসিকতার গতিপ্রকৃতিকে ঠিকমতো ধরতে পেরেছিলেন। যুক্তির চেয়ে আবেগ উত্তেজনায় তারা মেতে ওঠে বৈশি। তাদের জাগাতে হলে তাদের প্রবণতার পথ ধরেই এগোতে হবে। তাই তিনি বীরাষ্টমী, রাখিবন্ধন, প্রতাপাদিত্য উৎসব, উদয়াদিত্য উৎসবের সূচনা করে নিজের বাড়িতে শরীর চর্চার আখড়া খোলেন। তবে এই প্রতাপাদিত্য উৎসব নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সরলার মতবিরোধ শুরু হয়। রবীন্দ্রনাথ প্রতাপাদিত্যকে জাতীয় বীর বলে গ্রহণ করতে রাজী ছিলেন না কারণ তার চারিত্রিক আদর্শ মহান নয়। বৌঠাকুরাণীর হাটে তিনি প্রতাপাদিত্যকে সেভাবেই এঁকেছেন। অথচ সরলা সেই ব্যক্তিকে নিয়ে, যার ঐতিহাসিক গুরুত্ব সত্যিই আছে কিনা বিচার না করে, মেতে ওঠায় তিনি বিরক্ত হন। সরলার উত্তর, তিনি প্রতাপাদিত্যকে নীতির নিক্তিতে বিচার করেননি, করেছেন রাজনৈতিক মতাদর্শের দিক দিয়ে। একলা এক জমিদার হয়ে তিনি যে মোগল বাদশার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে বাংলার স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন, নিজের নামে সিক্কা চালিয়েছিলেন সে কথা তো সত্যি।

সব মিলে সরলা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ বাঁধিয়ে দিলেন। এর ওপর ছিল তার গান! সে যেন রুদ্রবীণার ঝঙ্কার! ১৯০১ সালের কংগ্রেস অধিবেশনে গাওয়া হয় তার নিজের গান নমে হিন্দুস্থান। প্রবল উদ্দীপনা ছড়িয়ে পড়ল। বিবেকানন্দের। আলমোড় আশ্রমের অধিনেত্রী মিসেস সেভিয়ার গান শুনে সরলাকে বলেছিলেন, আর কিছু না, শুধু যদি জাতীয় গান গেয়ে ফেরো তুমি ভারতের নগরে নগরে গ্রামে গ্রামে, সমস্ত দেশকে জাগাতে পারবে। কিন্তু সরল নিজে সন্ত্রাসবাদীদের সঙ্গে মিশে যেতে পারেননি। পেরেছিলেন নিবেদিতা। সরলা চেয়েছিলেন যুবমানস গড়ে তুলতে, তাদের ধমনীতে শক্তি সঞ্চার করতে। থুন বা স্বদেশী ডাকাতিতে তার সমর্থন ছিল না। শরীর শিক্ষা, আখড়া স্থাপন, লাঠি খেলা, কুস্তি, তলোয়ার শিক্ষা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার স্থাপন প্রভৃতি কাজেই তার উৎসাহ। পাঞ্জাবেও তাঁর সংগঠন শক্তির পরিচয় পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশের মেয়েরা এ সময় অভূতপূর্ব স্বাদেশিকতার পরিচয় দিয়েছিলেন। অন্যান্য ক্ষেত্রে যে তারা খুব এগিয়ে ছিলেন তা নয়, কিন্তু দেশের কাজে সাড়া দিয়েছিলেন সবাই। বেশির ভাগ এসেছিলেন সাধারণ সমাজ থেকে। তুলনায় উচ্চবিত্ত সম্ভ্রান্ত মহিলাদের সংখ্যা কম। সরলা অবশ্য ব্যতিক্রম। তার লক্ষ্মীর ভাণ্ডার ভরে উঠল স্বদেশী জিনিষে। সরলা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার খুলেছিলেন স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার ও প্রচার করবার জন্যে। তিনি অবাক হয়ে দেখেছিলেন, সেসময় যে-সমস্ত জাপানীরা সুরেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে আসতেন তারা নিজেদের দেশ থেকে বয়ে সব কিছু জিনিষ আনতেন, এমনকি চিঠি লেখার কাগজ পর্যন্ত। একদিন সরলা বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, এত কাগজ এনেছেন কেন? তারা জানালেন, ভারতবর্ষে কিছুই পাওয়া যায় না ভেবে তাদের বাড়ির মেয়েরা চিঠি লেখার কাগজ দিয়েছেন যাতে তাদের চিঠি লেখা বন্ধ না হয়ে যায়। আশ্চর্য! সরলা ভাবেন, জাপান জানে পরাধীন অসভ্য ভারতবর্ষ ভারতবর্যের লোক কিছুই করতে পারে না, করতে জানে না। তিনি স্বদেশী জিনিষ ব্যবহার শুরু করলেন। ভারতীর মলাট দিলেন দেশী হলুদ রঙের তুলট কাগজে। খুললেন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার। যোগেশ চৌধুরী প্রমুখ কয়েকজনের সাহায্যে বৌবাজারেও খুললেন স্বদেশী স্টোস। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের আগেই তারা স্বদেশী দোকান খুলেছিলেন। লক্ষ্মীর ভাণ্ডার-এ বিক্রী হত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা, শুধু মেয়েদের জন্যে, স্বদেশী কাপড় ও জিনিষপত্র। কোন উৎসবে যেতে হলে সরলা আপাদমস্তক স্বদেশী বেশভূষায় সেজে, লক্ষ্মীর ভাণ্ডার পরিচালনা উপলক্ষে পাওয়া স্বদেশী মেডেলটি দিয়ে তৈরি করা ব্রোচটি কাঁধের কাছে লাগিয়ে যেতেন। অপরূপ বেশে তার অনুপম লাবণ্য সকলকেই মুগ্ধ করত। এ সময় তাঁর ভারতী আর সরযূবাল দত্তের ভারত-মহিলা পত্রিকা ভার নিয়েছিল জাতীয়তাবোধে মেয়েদের উদ্বুদ্ধ করবার। তারা সফল হয়েছিলেন নিশ্চয়, না হলে স্বদেশী আন্দোলনে মেয়েরা এমন গৌরবময় ভূমিকা নেবেন কেন? নাটোরের মহারাণী গিরিবালা দেবী, অবলা বসু, সরোজিনী বস্তু বা বঙ্গলক্ষ্মী, ননীবালা দেবী, দেশবন্ধুর বোন উর্মিলা দেবী, শ্রী অরবিন্দের ভাইঝি লতিকা ঘোয—সকলেই এগিয়ে এসেছিলেন রক্তাক্ত শপথ নিতে। মেয়েদের দিক থেকে শ্রমিক আন্দোলন পরিচালনা করেন সন্তোষ কুমারী গুপ্তা। বিখ্যাত মেথর ধর্মঘট পরিচালনা করে তাদের সজাগ করে তুললেন প্রভাবতী দাসগুপ্তা, সরোজিনী বসু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, যতদিন বন্দেমাতরুম্ ধ্বনির বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না হয় ততদিন তিনি সোনার বালা পরবেন না। আসলে এই স্বদেশী আন্দোলনের যুগে বাংলাদেশের ঘরে ঘরে বহু নারী নীরবে সকলের অলক্ষ্যে আন্দোলনকে সাহায্য করে গেছেন। একেবারে সামনে এসে প্রত্যক্ষ কাজ না করলেও তাদের এই নীরব দানের মূল্য কম ছিল না। তবে এসব ঘটনা পরের কথা। সরলা তখন আর বাংলার প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে নেই। চলে গেছেন পাঞ্জাবে। সে সময় সর্বভারতীয় রাজনীতিক্ষেত্রে বাঙালী-মেয়েরা বিশেষ প্রভাব ফেলতে পারেননি। হায়দ্রাবাদের সরোজিনী নাইডু, মাদ্রাজের ম্যাজিস্টেট যতীন্দ্রনাথ রায়ের স্ত্রী বিভাবতী কিংবা এলাহাবাদে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়ের দুই মেয়ে সীতা ও শান্ত স্বদেশী আন্দোলনে প্রবাসে কিছু কিছু আলোড়ন জাগিয়েছিলেন। সরলা ঝড় তুলেছিলেন পাঞ্জাবে। লাহোরে প্রায় পাঁচশ জন বাঙালী যুবক সংগ্রহ করে তিনি প্রতিবাদ সভার আয়োজন করেন।

রামভজের সঙ্গে বিয়ের পরে সরলার কর্মজীবন শুরু হয় পাঞ্জাবে। রাজনৈতিক জীবনে রামভজ ছিলেন সরলার মতোই তেজস্বী ও চরমপন্থী। বাংলার বাঘিনী যেন খুঁজে পেল যথার্থ দোসর। তবে পাঞ্জাবে সরলা শুরু করলেন সমাজ সেবা। সখিসমিতি আর বিধবা-শিল্পাশ্রমের মধ্যে যে অভাব ছিল সেটা পূরণ করবার জন্যে তিনি স্থাপন করলেন ভারত স্ত্রী মহামণ্ডল। নারীর স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে এই প্রতিষ্ঠানটি বিশেষ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। পর্দানশীন মেয়েদের শিক্ষা দেওয়াই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই, প্রথমে এলাহাবাদে, পরে লাহোর, অমৃতসর, দিল্লী, করাচী, হায়দ্রাবাদ, কানপুর, বাকীপুর, হাজারীবাগ, মেদিনীপুর, কলকাতা ও আরো কয়েক জায়গায় এর শাখা খোলা হয়। কলকাতা শাখার ভার ছিল কৃষ্ণভামিনী দাসের ওপর। কয়েক বছরের মধ্যে তিনি ও তার সহকারিণীরা কলকাতার প্রায় তিন হাজার অন্তঃপুরবাসিনীকে লেখাপড়া শিখিয়েছিলেন। বিধবা হবার পর সরল আবার ফিরে এসে মহামণ্ডলেরই আরেকটা শাখা স্থাপন করেন ভারত স্ত্রীশিক্ষা সদন। এঁদের চেষ্টায় কলকাতায় পর্দাপ্রথা খুব দ্রুত উঠে যায়। মেয়েদের স্কুলের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ছাত্রীরাও দলে দলে আসে স্কুলে ভর্তি হতে। শিক্ষার সুবিধের জন্যে মহামণ্ডল থেকে এ সময় বেবিক্রেস আর মেয়েদের হস্টেল খোলার ব্যবস্থাও হয়েছিল।

পাঞ্জাবে সরকার কার্যকলাপ খুব স্পষ্ট নয়। সেখানে রামভজের উপযুক্ত সহধর্মিণী হয়ে তিনি হিন্দুস্থান পত্রিকাটির ভার নেন। শোনা যায়, লাহোরের চিফ কোর্ট আদেশ দিয়েছিল যে পত্রিকার সম্পাদক ও স্বত্বাধিকারী হিসেবে রামভজের নাম থাকলে তার ওকালতির লাইসেন্স বাতিল করে দেওয়া হবে। সরলা প্রস্তাব করলেন পত্রিকায় তাঁর নাম দেওয়া হোক। তাই হল। হিন্দুস্থানের একটা ইংরেজী সংস্করণ বার করে সরলা তাতে জ্বালাময়ী বক্তৃতা প্রকাশ করতে থাকেন। রোলট এ্যাক্ট চালু হলে হিন্দুস্থান বন্ধ করে প্রেস বাজেয়াপ্ত করা হল, রামভজ নির্বাসিত হলেন। একাকিনী সরলা শক্ত হাতে হাল ধরে পাঞ্জাবের বিদ্রোহকে নিয়ে গেলেন পরিণতির পথে। পাঞ্জাবের ব্রিটিশ অত্যাচার চরমে উঠল জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডে। এসময় সরলাকেও গ্রেপ্তারের কথা হয়েছিল, কিন্তু তখনও পর্যন্ত ব্রিটিশ আইনে রাজনৈতিক কারণে মেয়েদের আটক করার নিয়ম চালু হয়নি।

এরপর থেকে সরল মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের অতিমাত্রায় সমর্থক হয়ে পড়লেন। তাই চরকা-খদ্দর প্রবর্তনেও সরল গান্ধীজীর ডান হাত। সবে তার একমাত্র পুত্র দীপকের সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর নাতনী রাধার বিয়ে হয়েছিল। এই বিবাহ দুটি ভিন্ন পারিবারিক ধারার যোগ ঘটাল। স্বামীর মৃত্যুর পরেও সরলাকে দেখা যায় সমাজসেবিকারূপে। ১৯২৫ সালে তিনি নিখিল ভারত সামাজিক মহাসমিতির সভানেত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু বাঙালীর কাছে তার প্রথম জীবনের তেজস্বিনী মূর্তিটিই বেশি আদর পেয়েছে।

মহর্ষি ভবনে যখন গুণবতী মেয়েদের ভিড় তখন পাশের বৈঠকখানাবাড়িতেও দুটি পিঠোপিঠি বোন বড় হয়ে উঠেছেন। তারা গুণেন্দ্রনাথের মেয়ে বিনয়িনী ও সুনয়নী। এখন আর সৌদামিনীর দুঃখ নেই। তার তিন ছেলে বড় হয়েছেন! অবন-গগনের ছবি ফিরিয়ে এনেছে দেশের সম্মান। অবশ্য সে পরের কথা। তার অনেক আগেই বেজেছিল বিনয়িনীর বিয়ের সানাই, বড় করুণ সুরে। প্রথমে ঠিক হয়েছিল খুব ধুমধাম করে বিয়ে হবে। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আর। গুণেন্দ্রনাথের ছত্রিশ বছরের জীবন হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেল। কেউ জানলে না কিসের দুর্দমনীয় বেগ তাঁকে এমন নির্মমভাবে আত্মহত্যার পথে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিল। এ উক্তি গুণেন্দ্র-দৌহিত্রী প্রতিমার। মায়ের অভিমান ও বেদনার স্পর্শ পেয়েছিলেন তিনি, নয়ত মাতামহকে দেখবার কোন সুযোগই তাঁর হয়নি। গুণেন্দ্রের আকস্মিক মৃত্যুর পর খুব সাধারণ ভাবে বিয়ে হল বিনয়িনীর। হ্যাঁ, পূর্বনির্ধারিত পাত্র শেষেন্দুভূষণের সঙ্গেই। তারপর?

তারপর আবার কি? মসৃণভাবে দিন কেটে গেছে ঘর-সংসার জপ-তপ আর রান্না-বান্না নিয়ে। ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা সবাই বিকেলে গা ধুয়ে পছন্দমতো খোঁপা বাঁধতেন। তারপর শিউলি বা নটকনিয়াঙ্গা শাড়ি পরতেন সুন্দর করে। রূপটান করে মোমরাট, কাজল প্রভৃতি দিয়ে প্রসাধন সেরে আসতেন কর্তৃঠাকরুণকে সাজ দেখতে। তিনি প্রত্যেকের খোঁপায় জড়িয়ে দিতেন ফুলের মালা। হয়ত এ নিয়ম অন্যান্য সাবেকী বাড়িতেও ছিল। বিনয়িনী খোপা বাঁধতে পারতেন সুন্দর করে। বেনিঝি-ভাইঝিদের চুলে ফুটে উঠত নানা রকম ছাদবেনেবাগান, মনভোলানো, ফঁশজাল, কলকা, বিবিয়ানা আরো কত কী! হয়ত বিনয়িনী চিরকাল এভাবে সবার চোখের আড়ালে থেকে যেতেন যদি না তার নিজের লেখা আত্মজীবনীর পাণ্ডুলিপিটি অকস্মাৎ পাওয়া যেত। এটি এখনো অপ্রকাশিত আকারে তাঁর পৌত্র শ্রী সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়ের কাছে রয়েছে। তিনি তাঁর ঠাকুরমার হাতে লেখা জীর্ণ খাতাটি পান পিসীম। প্রতিমা ঠাকুরের কাছ থেকে। প্রচলিত রীতি অনুযাধী ঠাকুরমা বললুম বটে তবে ঠাকুরবাড়িতে পিতামহীকে বলা হত দাদু আর পিতামহ হতেন দাদামশায় বা কর্তাবাবা। দাদুর বদলে সম্ভ্রমে ঠাকুরমাকে অনেক সময় বলা হত কাম।

বিনয়িনী তাঁর জীবনী, যার নাম তিনি দিয়েছেন কাহিনী, লেখা শুরু করেন পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে। খাতার ওপরে ১৯১৬-১৭ লেখা থাকলেও তিনি নিজের কাহিনী শুরু করেন আরো পরে। ১২৮০ থেকে ১৩৩০-এর জীবনবৃত্তে তিনি কাহিনী লেখেন ১৩২৫ সালে, মৃত্যুর পাঁচ বছর আগে। এ বয়সে তার নিজের কথা বলতে ইচ্ছে করল কেন তা তিনি নিজেই জানেন না। ঠাকুরবাড়িতে আত্মকাহিনী লেখার রেওয়াজ বহুদিনকার। মহাভবনে পুরুষরা তো বটেই মেয়েরাও আত্মকথা লিখতে এগিয়ে এসেছিলেন। অবশ্য আত্মজীবনী রচনায় মেয়েদের পথ দেখিয়েছিলেন রাসসুন্দরী দেবী, তিনি ঠাকুরবাড়ির কেউ নন। প্রমথ চৌধুরীর মনে হয়েছিল, বাংলা ভাষায় মাত্মজীবনী লেখেন শুধু মেয়েরা। বলাবাহুল্য এই মন্তব্যের কারণও রসি সুন্দরী। কেশবচন্দ্র দেনের মা সারদাসুন্দরী দেবীর আত্মরিত আর এক থানি উল্লেখযোগ্য বই। বিনয়িনী কাহিনী লেখার আগে সৌদামিনীর পিতৃ স্মৃতি, স্বাকুমারীর সেকেলে কথা ও আরো অনেক আত্মজীবনী বেরিয়ে গেছে। এদের যে কোন একটা বিনয়িনীর মনে আগ্রহ জাগতে পারে। তবে লেখবার সময়, তিনি কাউকে অনুকরণ না করে, নিজের মনে নিজের কথা বলে গিয়েছেন।

নিয়মিত লেখাপড়ার চর্চা না থাকলেও বিনয়িনীর সাদামাটা আটপৌরে ধরনের লেখার হাতটি ভাল—কৃত্রিমতার স্পর্শ নেই। যেন আপন মনে আয়নায় নিজের মুখ দেখা! সহুজ, স্বচ্ছ, স্বচ্ছন্দ। প্রথমদিকে খানিক বাপের বাড়ির কথা লিখে বিনয়িনী লিখেছেন শ্বশুরবাড়ির কথা। অনেক তথ্য আছে, তবে সব। ছাপিয়ে বড় হয়ে উঠেছে তার ধর্মপরায়ণ ভক্তিনত রূপটি। ধর্মচেতনার উন্মেষ হয়েছিল শৈশবেই। মায়ের কথামতো ভোরবেলায় উঠে বাগান থেকে ফুল কুড়িয়ে আনতে হত তাদের দুবোনকে। কার্তিক মাসে হত শ্ৰীধর ঠাকুরের। পূজো। ভোর ছটার মধ্যে ফুল নিয়ে তারা হাজির হতেন ঠাকুরঘরে। বড় পিসী কাদম্বিনী নানা ভাবে ঠাকুরকে সাজাতেন। কোনদিন হলদে কলকে, কোনদিন রক্তকরবী, কোনদিন সাদা রজনীগন্ধা দিয়ে সাজিয়ে ভাইঝিদের ডেকে দেখাতেন। পাঁচ নম্বর বাড়ির এই ছবিটি আমরা পেয়েছি বিনয়িনীর ডায়রি কাহিনী থেকেই। দুটো বাড়ির মেয়েদের জীবনে এই যে আকাশপাতাল বিভেদ সেটা বেশি করে ধরা পড়ে ইন্দিরা-প্রতিভা-প্রজ্ঞা-সুষমার জীবনযাত্রার সঙ্গে বিনয়িণী-সুনয়নীর জীবনযাত্রার তুলনা করলে। তার শ্বশুরবাড়ি অর্থাৎ প্রসন্নকুমার ঠাকুরের বাড়ির কথাও কাহিনীতে আছে। সেখানে দুর্গোৎসব হত ঘটা করে। সন্ধ্যারতির মনোজ্ঞ ও মূল্যবান বিবরণ পাওয়া যায় বিনয়িনীর রচনায়! ..তখন সন্ধ্যায় আরতি আরম্ভ হল, চারজন ব্রাহ্মণব্রতী এসে বসলেন। দুইজন চণ্ডীপাঠ করতে আরম্ভ করলেন অর একজন পুরোহিত ঠাকুরকে পুথি দেখে মন্ত্র বলে দিতে লাগলেন। সেই আশী বংসরের পুরোহিত ভক্তিপূর্ণ হয়ে মাকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়ালেন। রূপোর প্রদীপদানীতে ১০০৮ ঘৃত-প্রদীপ দিয়ে রূপোর ঘণ্টা বাজিয়ে আরতি আরম্ভ হল। প্রতিমার দু পাশে মস্ত দুইটা পিতলের প্রদীপ, যার বুক পর্যন্ত উজ্জ্বল। প্রদীপে একসের ঘৃত ধরে। এইরূপ প্রদীপ তিন দিন তিন রাত জ্বলতে থাকল। নতুন উদ্যমের পাশে পুরনো। নিস্তরঙ্গ জীবনের অমন সহাবস্থান আর দেখা যাবে না।

বিনয়িনীর লেখা সর্বত্রই আশ্চর্য রকমের সাবলীল। স্বামীর মৃত্যুর কথাও তিনি ব্যক্ত করেছেন শান্তভাবে। পড়তে পড়তেই বোঝা যায় বিনয়িনী লিখেছেন একেবারে নিজের জন্যে। আর কারুর জন্যে নয়। একটু তাকে অনুসরণ করা যাক :

আগের দিন থেকে তার অসুখ বেড়েছে। আমাকে কোথাও উঠে যেতে। বারণ করলেন। পরদিন বিকেল ছটার সময় অকস্মাৎ তিনি চলে গেলেন। হাতে আমার হাত রেখে কি যেন বলে গেলেন সেটি আমি অনেক করেও বুঝতে পারলাম না। জীবনের সমস্ত সুখ এই সঙ্গে শেষ হল। তখন আমার যে ধৈর্যগুণ এল, এখন মনে হলে আশ্চর্য হয়ে থাকি। মনে হল এই যে যাওয়া আসা। এ তে কতকগুলো তৃণগুচ্ছ নদীর ঢেউয়ে কখনও একত্র হচ্ছে আবার সরে যাচ্ছে। এর জন্যে এত কাতরতা হচ্ছে কেন?

একজন সাধারণ নারীও যে শোকের সময় মাঝে মাঝে নির্বেদ বৈরাগ্যের সন্ধান পান তার দ্বিতীয় প্রমাণ বিনয়িনী। এর আগে পুত্রশোকে আচ্ছন্ন প্রফুল্লময়ীও দুঃখের মধ্যে হারানিধি সন্তানের বিচ্ছেদ ভুলতে পেরেছিলেন। যাইহোক, বিনয়িনীর কাহিনীর আরো একটি গুরুত্ব আছে। যতদূর মনে হয়, অবনীন্দ্রনাথের ঘোয়, জোড়াসাঁকোর ধারে এবং আপনকথা ও প্রতিমা ঠাকুরের স্মৃতিচিত্র লেখার প্রেরণা যুগিয়েছিল ৰিনঘিনীর আত্মকাহিনী। কেউ একজন পুরনো কথা বলতে বসলে সকলেরই স্মৃতি মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে। এখানে সেই পুরনো কথা বলবার দায়িত্ব প্রথমে নিয়েছিলেন বিনয়িনী।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত