ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল (পর্ব-৫)

জীবন থেমে থাকে না। কাদম্বরী যখন চলে গেলেন ফুলতলির ভবতারিণী তখন নাবালিকা। তাকে স্বর্ণ মৃণালিনী হবার আশীর্বাদ করেছিলেন দ্বিজেন্দ্রনাথ। তারপর ভবতারিণী একদিন হারিয়ে গেলেন মৃণালিনীর মধ্যে। যদিও এই পরিবর্তন কোন আলোড়ন আনল না বহির্জগতে। একটুও তরঙ্গ তুলল না প্রগতিশীলদের মনে। তবু মৃণালিনীকে সামান্যা বলতে পারা যায় না। মাত্র দশ বছর বয়সে একহাত ঘোমটা টেনে যে ভবতারিণী ঠাকুরবাড়িতে ঢুকেছিলেন সেদিন তিনি বুঝতেও পারেননি কোন্ বাড়িতে তাঁর বিয়ে হচ্ছে, কাকে পেলেন তিনি।

রবীন্দ্রনাথ বলতেন, আমার বিয়ের কোন গল্প নেই, বলতেন, আমার বিয়ে যা-তা করে হয়েছিল। কিন্তু প্রথম দিকে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল বড় মাপে। দাসী, পাঠিয়ে মেয়ে পছন্দ করা পুরনো ব্যাপার তাই এবার একটা কমিটি তৈরি হল—জ্ঞানদানন্দিনী, কাদম্বরী, জ্যোতিরিন্দ্রনাথ ও রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে। তারা সদলবলে মেয়ে খুঁজতে গেলেন যশোরে—সেখান থেকেই ঠাকুরবাড়ির অধিকাংশ বৌ এসেছিলেন। জ্ঞানদানন্দিনীর বাপের বাড়ি নরেন্দ্রপুরে গিয়ে উঠলেও দক্ষিণডিহি, চেঙ্গুটিয়া প্রভৃতি আশেপাশের সব গ্রামের বিবাহযোগ্যা মেয়েই দেখা হয়ে গেল কিন্তু বৌঠাকুরাণীদের মনের মতো সুন্দরী মেয়ে পাওয়া গেল না। তাই শেষকালে ঠাকুর স্টেটের কর্মচারী বেণীমাধব রায়ের বড় মেয়ে ভবতারিণীর সঙ্গেই বিয়ে ঠিক করা হল। অবশ্য দাদাদের মতো রবীন্দ্রনাথ বিয়ে করতে যশোরে যাননি, জোড়াসাঁকোতেই বিয়ে হয়েছিল।

গুরুজনেরা যে সম্বন্ধ স্থির করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ বিনা দ্বিধায় তাকেই বরণ করে নিয়েছিলেন। বন্ধুদের নিজের বিয়ের নিমন্ত্রণ লিপি পাঠিয়ে দিলেও এ বিয়েতে ঘটাপটা বিশেষ হয়নি। পারিবারিক বেনারসী দৌড়দার জমকালো শাল গায়ে দিয়ে তিনি বিয়ে করতে গেলেন নিজেদের বাড়ির পশ্চিম বারান্দা ঘুরে। বিয়ে করে আনলেন অজ্ঞ বালিকা ভবতারিণীকে। কবির বাসর ঘরের সুন্দর বিবরণ পাওয়া যাবে প্রত্যক্ষদর্শী হেমলতার লেখায় :

বাসরে বসেই রবীন্দ্রনাথ দুষ্টমি আরম্ভ করলেন।…ভড় খেলার বদলে ভাঁড়গুলো উপুড় করে দিতে লাগলেন ধরে ধরে। তার ছোট কাকীমা ত্রিপুরাসুন্দরী বলে উঠলেন,

ও কি করিস রবি? এই বুঝি তোর ভাঁড় খেলা? ভাঁড়গুলো সব উল্টেপাল্টে দিচ্ছিস কেন?…

রবীন্দ্রনাথ বললেন, জানো না কাকীমা—সব যে ওলটপালট হয়ে যাচ্ছে। কাজেই আমি ভাঁড়গুলো উলটে দিচ্ছি।…

কাকীমা আবার বললেন, তুই একটা গান কর! তোর বাসরে আর কে গাইবে, তুই এমন গাইয়ে থাকতে? এরপর তার বাসর ঘরে একবার উঁকি দিলে দেখা যাবে সেখানে তিনি ওড়নাটক জড়সড় বধূর দিকে চেয়ে কৌতুক ভরে গান ধরেছেন আ মরি লাবণ্যময়ী…।

শোনা গেছে, কথায় প্রচণ্ড যন্তরে টান থাকায় ভবতারিণী প্রথম দিকে বেশ কিছুদিন কথাই বলতেন না। কবি কি এই অসম বিবাহকে খুশি মনে গ্রহণ করেছিলেন? তাই তো মনে হয়। ছোট ছোট ঘটনায় রয়েছে সুখের আমেজ। এরই মধ্যে শুরু হল ভবতারিণীর মৃণালিনী হয়ে ওঠার শিক্ষা। প্রথমে তিনি মহর্ষির নির্দেশে ঠাকুরবাড়ির আদব-কায়দা-বাচনভঙ্গির ঘরোয়া তালিম নিলেন নীপময়ীর কাছে। তারপর নীপময়ীর মেয়েদের সঙ্গে মৃণালিনীও পড়তে গেলেন লরেটো হাউসে। ফুলতলির ভবতারিণী হয়ত হারিয়ে গেলেন কিন্তু মৃণালিনী অতি আধুনিক হয়েও ওঠেননি কিংবা তার লরেটোর ইংরেজী শিক্ষা, পিয়ানো শিক্ষা, বাড়িতে হেমচন্দ্র বিদ্যারত্নের কাছে সংস্কৃত শিক্ষা কোন সৃষ্টিমূলক কাজেও লাগেনি। কারণ তাঁর জীবন সংসারের সকলের সুখে নিমজ্জিত ছিল। চারপাশে অতি সংব এবং সোচ্চার চরিত্রগুলির পাশে তার নির্বাক ভূমিকাটি আমাদের কাছে তেমন স্পষ্ট নয়। অথচ তিনিও বাড়ির অন্যান্য মেয়ে-বৌয়েদের মতো অভিনয় করেছেন, রামায়ণ অনুবাদ করেছেন, রবীন্দ্রনাথের নির্দেশে রূপকথা সংগ্রহ করেছেন, আমোদ-প্রমোদে-দুঃখে-শোকে সবার সবচেয়ে বেশি কাছে এসে দাঁড়িয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের রাজা ও রাণীর প্রথম অভিনয়ে মৃণালিনী সেজেছিলেন নারায়ণী আর দেবদত্তের ভূমিকায় কে অভিনয় করেছিলেন জানেন? তার মেজ ভাশুর সত্যেন্দ্রনাথ। ঘরোয়া অভিনয় নয়, বেশ বড় মাপের আয়োজন হয়েছিল। যদিও প্রথমবার, তবু তার অনাড়ষ্ট সাবলীল অভিনয় ভালভাবেই উৎরেছিল। অথচ নবনাটকে অভিনয় করার জন্যে, একটি স্ত্রীভূমিকা গ্রহণ করে, অয় চৌধুরী আর কিছুতেই স্টেজে এসে দাঁড়াতে পারেননি। মৃণালিনীরও এরকম অবস্থা হতে পারত। বিশেষ করে ভাশুরের সঙ্গে অভিনয়! কিন্তু কোন বিঘ্ন ঘটেনি। তবু রবীন্দ্রনাথের নাটক কিংবা অভিনয়ে যোগ দেবার আগ্রহও মৃণালিনীর ছিল না, একথা স্বীকার করতেই হবে। সখিসমিতির দু-একটা অভিনয়ে কিংবা মায়ার খেলার ছোটখাট চরিত্রাভিনয়ে যোগ দেওয়া ছাড়া আর কিছুতেই তাকে অংশ গ্রহণ করতে দেখা যায়নি। আসলে গন-অভিনয়সাহিত্যচর্চার মধ্যে মৃণালিনীর প্রকৃত পরিচয় খুঁজে পাওয়া যাবে না। স্বামীর মহৎ আদর্শকে কাজে পরিণত করবার জন্যে তিনি যখন রবীন্দ্রনাথের পাশে এসে দাঁড়ালেন, তখন শুধু তখনই তাঁর প্রকৃত পরিচয় প্রথম বার আমরা পেলুম। সামান্যার মধ্যে দেখা দিলেন অসামান্যা দেখা দিল সনাতন ভারতবর্ষের শাশ্বতী নারী। অবশ্য সে অনেক পরের কথা।

ঠিক সুগৃহিণী বলতে যা বোঝায় ঠাকুরবাড়িতে মৃণালিনী ছিলেন তাই। জোড়াসাঁকোতে সবার ছোট তবু সবাই তার কথা শুনতেন। সবাইকে নিয়ে তিনি আমোদ-আহ্লাদ করতেন, বৌয়েদের সাজাতেন কিন্তু নিজে সাজতেন না। সমবয়সীরা অনুযোগ করলে বলতেন, বড় বড় ভাশুর-পো ভাগ্নেরা চারদিকে ঘুরছে—আমি আবার সাজব কি? একদিন কানে দুটি ফুল ঝোলানো বীরবৌলি পরেছিলেন সবার উপরোধে। সেইসময়ে হঠাৎ কবি উপস্থিত হলে সঙ্গে সঙ্গে তিনি দু হাত চাপা দিয়ে বীরবেইলি লুকিয়ে ফেলেছিলেন। গয়না পরায় এতই ছিল তাঁর লজ্জা। তিনি আরো ভালবাসতেন রান্না করতে, আর পাঁচ জনকে ভালমন্দ বেঁধে খাওয়াতে। ঠাকুরবাড়িতে মেয়েদের গৃহকর্মে নানারকম তালিম দেওয়া হত। মহর্ষিকন্যা সৌদামিনী তার পিতৃস্মৃতিতে লিখেছিলেন যে তাদের প্রতিদিন নিয়ম করে একটা তরকারি রাধতে হত। রোজ একটা করিয়া টাকা পাইতাম, সেই টাকায় মাছ তরকারি কিনিয়া আমাদিগকে রাধিতে হইত।

নতুন বৌয়েদের শিক্ষা শুরু হত পান সাজা দিয়ে। তারপর তারা শিখতেন বড়ি দিতে, কাসুন্দি-আচার প্রভৃতি তৈরি করতে। ধনী পরিবারের বৌ হলেও এসব শিক্ষায় ত্রুটি ছিল না। বলাবাহুল্য মৃণালিনী এসব কাজে অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। তবে একটা কথা মনে রাখতেই হবে, এ সময় দিন বদলাচ্ছে। পালাবদল চলছে বাড়ির বাইরে, বাড়ির ভেতরেও। না বদলালে কি জ্যোতিরিন্দ্র কাদম্বরী তিন তলার ছাদে নন্দন কানন তৈরি করতে পারতেন? সে সভায় অনাত্মীয় পুরুষেরাও অবাধে আসতেন, অথচ সত্যেন্দ্র-বন্ধু মনোমোহনকে অন্তঃপুরে নিয়ে আসতে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি। যুগ বদলাচ্ছে। মৃণালিনী যখন লরেটো স্কুলে পড়তে গেলেন তখন আর কেউ ধিক্কার দিতে এল না। কারণ তার আগেই চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী অসাধ্য সাধন করে ফলেছেন। যাক সে কথা পরে হবে। এখন কথা হচ্ছে ঠাকুরবাড়ির সাবেকী {ণ নিয়ে। অন্দরমহলের ব্যবস্থা বদলাতে বড় দেরি হয়। যাই যাই করেও স্মিকালের শেষ-সূর্যের আলোর মতো মেয়েদের চিরকেলে অভ্যেস যেন যেতে চায় না। তাই বাইরের জগতে কয়েকটি মেয়ে বিরাট পরিবর্তন আনলেও। বৌয়েরা তখনও শিখতেন ঝুনি-রাইয়ের ঝাল কাসুন্দি, আমসত্ত্ব, নারকেল চিড়ে তৈরি করতে। মৃণালিনী নানারকম মিষ্টি তৈরি করতে পারতেন। তার মানকচুর জিলপি, দইয়ের মালপো, পাকা আমের মিঠাই, চিড়ের পুলি যারা একবার খেয়েছেন তারা আর ভোলেননি। স্ত্রীর রন্ধন নৈপুণ্যে কবিও উৎসাহী হয়ে মাঝে মাঝে নানারকম উদ্ভট রান্নার এক্সপেরিমেন্ট করতেন। শেষে। হাল ধরে সামাল দিতে হত মৃণালিনীকেই। শেষে তাকে রাগাবার জন্যে কবি বলতেন, দেখলে তোমাদের কাজ তোমাদেরই কেমন একটা শিখিয়ে দিলুম। মৃণালিনী চটে গিয়ে বলতেন, তোমাদের সঙ্গে পারবে কে? জিতেই আছ সকল বিষয়ে।

লেখাপড়া শেখার পর শিলাইদহে বাস করবার সময় মৃণালিনী কবির নির্দেশে রামায়ণের সহজ ও সংক্ষিপ্ত অনুবাদের কাজে হাত দিয়েছিলেন। শেষ হয়নি। কবি সেই অসমাপ্ত খাতাটি তুলে দিয়েছিলেন মাধুরীলতার হাতে, বাকিটুকু শেষ করার জন্যে। অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার আগেই অকালে মাধুরীর জীবনদীপ নিবে যাবার পর আর খাতাটির খোঁজ মেলেনি। রথীন্দ্রের কাছে আর একটি খাতা ছিল—তাতে মৃণালিনী মহাভারতের কিছু শ্লোক, মনুসংহিতা ও উপনিষদের শ্লোকের অনুবাদ করেন। এছাড়া কবির নির্দেশে তিনি বাংলাদেশের রূপকথা সংগ্রহের কাজেও হাত দিয়েছিলেন। অবনীন্দ্রনাথ তার সংগ্রহ থেকেই পেয়েছিলেন ক্ষীরের পুতুল গুল্পটি। মৃণালিনী ঠিক যেমন করে গল্পটি বলেছিলেন ঠিক তেমনি করেই লিখেছিলেন অবনীন্দ্রনাথ। রূপকথার যাদুকরের সেদিন হাতেখড়ি হল মৃণালিনীর কাছেই। সকৃতজ্ঞ অবনীন্দ্রনাথ বলেছেন, এই আমার রূপকথার আদিকথা। কিন্তু মৃণালিনীর লেখা আর কিছু কি ছিল? স্বর্ণকুমারীকে এ নিয়ে একবার প্রশ্ন করা হলে তিনি দৃপ্তভঙ্গিতে বলেছিলেন, তাহার স্বামী বাংলার একজন শ্রেষ্ঠ লেখক, সেইজন্য তিনি স্বয়ং কিছু লেখা প্রয়োজন বোধ করেন নাই।

খুবই সত্যি কথা, তবু মনটা খুঁতখুঁত করে বৈকি। ঠাকুরবাড়ির এই আমুদে বৌটি কি তার মনের মধু সবটাই ঢেলে দিয়েছিলেন নীরব সেবায়! কালের সীমা পেরিয়ে কিছুই কি আমাদের কাছে এসে পৌঁছবে না? দ্বিপেন্দ্রনাথের স্ত্রী হেমলতার লেখা থেকেই শুধু পাওয়া যাবে মৃণালিনীকে? সুরসিকা মৃণালিনীর একটা-দুটো চিঠি অবশ্য রক্ষা পেয়েছে। সেই ছোট্ট সাংসারিক চিঠির মধ্যেও তার পরিহাসপ্রিয় সহজ মনটি ধরা পড়েছিল। সুধীন্দ্রনাথের স্ত্রী চারুবালাকে লেখা একটা চিঠিতে দেখা যাবে মৃণালিনী তাকে অনুযোগ করছেন অনেকদিন চিঠি না লেখার জন্যে। তার মধ্যে যে অনাবিল স্বচ্ছতা আছে তার সৌন্দর্য বুঝি কোন সাহিত্যিক চিঠির চেয়ে কম নয় :

…তোমার সুন্দর মেয়ে হয়েছে বলে বুঝি আমাকে ভয়ে খবর দাওনি পাছে আমি হিংসে করি, তার মাথায় খুব চুল হয়েছে শুনে পর্যন্ত কুন্তলীন মাখতে আরম্ভ করেছি, তোমার মেয়ে মাথা ভরা চুল নিয়ে আমার ন্যাড়া মাথা দেখে হাসবে, সে আমার কিছুতেই সহ্য হবে না। সত্যিই বাপু, আমার বড় অভিমান হয়েছে, না হয় আমাদের একটি সুন্দর নাতনী হয়েছে, তাই বলে কি আর আমাদের একেবারে ভুলে যেতে হয়।

শান্তিনিকেতনে চলে গেলেও জোড়াসাঁকোর একান্নবর্তী পরিবারটির জন্যে মৃণালিনীর আন্তরিকতা কখনো হ্রাস পায়নি। শিলাইদহে তার কাছেই ছুটে যেতেন ভাশুরপো ও ভাশুরঝিরা। বলেন্দ্রনাথ সংস্কৃত, ইংরেজী, বাংলা যখন যে বই পড়তেন কাকীমাকে পড়ে শোনাতেন। শুধু কি আত্মীয় স্বজন? মৃণালিনী সবার সুখেই সুখী আবার সবার দুঃখেই সমদুঃখী। শিলাইদহে একদিন মুলা সিং নামে এক পাঞ্জাবী তার কাছে এসে কঁদতে কাঁদতে নিজের দুরবস্থার কথা জানিয়ে বললে, মাইজী, একটি চাকরি দিয়ে আমাকে রক্ষা করুন, নতুবা আমি সপরিবারে মারা পড়িব। রবীন্দ্রনাথ তখন শিলাইদহে ছিলেন না, মৃণালিনী তাকে কুঠিবাড়ির দারোয়ানের কাজে বহাল করলেন। কদিন পরে দেখলেন মুলা সিং তখনও বিষণ্ণ। মৃণালিনী কারণ জানতে চাইলেন। সে জানাল তার মাইনের সবটাই খরচ হয়ে যায় দুবেলা চার সের আটার রুটি খেতে। করুণাময়ী মৃণালিনী সেইদিন থেকে তার সংসার থেকে মুলা সিংয়ের জন্য চার সের আটা বরাদ্দ করলেন। মাইনে বাড়ল তবু আটার ব্যবস্থা আগের মতোই রয়ে গেল। দিনে দিনে তাঁর যে মূর্তিটি বড় হয়ে উঠেছে সে তার জননী মূর্তি। শান্তিনিকেতন আশ্রম বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় তার পূর্ণ পরিচয় পাওয়া গেল। সীমার্গের ইন্দ্রাণী সেখানে হয়ে উঠলেন অন্নপূর্ণা। মৃণালিনী রূপসী ছিলেন না, কিন্তু অপরূপ মাতৃত্বের আভা তার মুখে লাবণ্যের মতো ঢলঢল করত, একবার দেখলে আবার দেখতে ইচ্ছে হয়, এই ছিল প্রত্যক্ষদর্শীর অভিমত। পাঁচটি সন্তানের জননী মৃণালিনীর এই মাতৃমূর্তি আরো সার্থক হয়ে উঠেছিল শান্তিনিকেতনে ঘর থেকে দূরে আসা শিশুগুলিকে আপন করে নেওয়ার মধ্যে।

সহধর্মিণীর কাছে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যাশা কি ছিল জানতে ইচ্ছে করে। নিশ্চয়ই। কি ভাবে তিনি তাদের যৌথ জীবন গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন সেকথা জানা যায় মৃণালিনীকে লেখা কবির পত্র পড়ে। একটি পত্রে তিনি লিখেছেন, আমাকে সুখী করবার জন্যে তুমি বেশি কোন চেষ্টা কোরো না—আন্তরিক ভালোবাসাই যথেষ্ট। অবশ্য তোমাতে আমাতে সকল কাজ ও সকল ভাবেই যদি যোগ থাকত খুব ভাল হত-কিন্তু সে কারো ইচ্ছায়ও নয়। যদি তুমি আমার সঙ্গে সকল রকম বিষয়ে সকল রকম শিক্ষায় যোগ দিতে পার ত খুসি হই—আমি যা কিছু জানতে চাই তোমাকেও তা জানাতে পারি—আমি যা শিখতে চাই তুমিও আমার সঙ্গে শিক্ষা কর তাহলে খুব সুখের হয়। জীবনে দুজনে মিলে সকল বিষয়ে অগ্রসর হবার চেষ্টা করলে অগ্রসর হওয়া সহজ হয়—তোমাকে কোন বিষয়ে আমি ছাড়িয়ে যেতে ইচ্ছে করিনে—কিন্তু জোর করে তোমাকে পীড়ন করতে আমার শঙ্কা হয়। সকলেরই স্বতন্ত্র রুচি অনুরাগ এবং অধিকারের বিষয় আছে—আমার ইচ্ছা ও অনুরাগের সঙ্গে তোমার সমস্ত প্রকৃতিকে সম্পূর্ণ মেলাবার ক্ষমতা তোমার নিজের হাতে নেই-সুতরাং সে সম্বন্ধে কিছুমাত্র খুংথুং না করে ভালোবাসার দ্বারা যত্নের দ্বারা আমার জীবনকে মধুর–আমাকে অনাবশ্যক দুঃখকষ্ট থেকে রক্ষা করতে চেষ্টা করলে সে চেষ্টা আমার পক্ষে বহুমূল্য হবে।

কবির প্রত্যাশা পূর্ণ করেছিলেন মৃণালিনী। জীবনের সবক্ষেত্রে এমনকি শান্তিনিকেতনে অদিশ-বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বাসনা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ সেখানে গেলে মৃণালিনী ও তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন। এই ধরনের কাণ্ডজ্ঞানহীনতায় আত্মীয় স্বজনের উপদেশ, উপহাস, বিরুদ্ধতা, বিদ্রুপ সবই সহ্য করতে হয়েছিল। আত্মীয়দের খুব দোষ নেই, সর্বনাশের মুখোমুখি গিয়ে কেউ দাঁড়াতে চাইলে। তাকে তে সাবধান করবেনই। নাবালক পঁাচটি সন্তান, তার মধ্যে তিনটি মেয়ে অথচ কবি অঁরি যথাসর্বস্ব ঢেলে দিচ্ছেন আশ্রম বিদ্যালয়ে। লোকে বলবে না। কেন? মৃণালিনীর মনেও এ নিয়ে ভাবনা ছিল, তবু তিনি স্বামীকে সব কাজে হাসিমুখে সাহায্য করেছেন। যখনি কোন প্রয়োজন হয়েছে, তখনই খুলে দিয়েছেন গায়ের এক একটি গয়না। মৃণালিনী পেয়েছিলেন প্রচুর। বিয়ের যৌতুকের গয়না ছাড়াও শাশুড়ীর আমলের ভারী গয়না ছিল অনেক। সবই তিনি কবির কাজে গা থেকে খুলে দিয়েছিলেন। রথীন্দ্র লিখেছেন, শেষ পর্যন্ত হাতে কয়েক গাছ চুড়ি ও গলায় একটি চেন হার ছাড়া তার কোন গয়না অবশিষ্ট ছিল না।

শুধু গয়না দিয়ে নয়, আশ্রমের কাজেও মৃণালিনী স্বামীকে যথাসাধ্য সাহায্য করেছেন! আধুনিক অর্থে তাকে হয়ত প্রগতিশীল বলা যাবে না কারণ শিক্ষাদীক্ষায় ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের ছাড়িয়ে অন্যান্য মেয়েরাও ক্রমশঃ এগিয়ে যাচ্ছিলেন। উগ্র আধুনিকতা এ বাড়ির মেয়েদের রক্তমজ্জায় প্রবেশ করেনি। দীর্ঘকাল ধরে জ্ঞানদানন্দিনীই সেখানে উগ্র আধুনিকতার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। কিন্তু মহৎ নারীর পরিচয় মৃণালিনীর মধ্যে আছে। চারিত্রপূজা গ্রন্থ লেখবার সময় রবীন্দ্রনাথ এক জায়গায় লিখেছেন, মহাপুরুষের ইতিহাস বাহিরে নানা কার্যে এবং জীবন বৃত্তান্তে স্থায়ী হয়, আর মহৎ নারীর ইতিহাস তাহার স্বামীর কার্যে রচিত হইয়া থাকে। এবং সে লেখায় তাহার নামোল্লেখ থাকে না। এরই মধ্যে মামরা মৃণালিনীর আসল পরিচয় খুঁজে পাব। আজ আমরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের কথা খুঁটিয়ে বলতে বসেছি তাই, নয়ত মৃণালিনীকে নিয়ে স্বতন্ত্র প্রসঙ্গের শবতারণা করার সুযোগ বড় কম। তিনি রবীন্দ্রজীবনে, ঠাকুরবাড়িতে, শান্তিনিকেতনের আশ্রম-বিদ্যালয়ে মিশে আছেন ফুলের সুরভির মতো। দেখা যায় না, অনুভবে মন ভরে যায়।

মৃণালিনী আরো কিছুদিন বেঁচে থাকলে রবীন্দ্রনাথের আশ্রম-বিদ্যালয়ের পরিকল্পনা অরো সার্থক হতে পারত। তিনি ব্রহ্মচর্য আশ্রমের দেখাশোনা করতেন এবং অপরের কচিকচি শিশুদের অপরিসীম মাতৃস্নেহে নিজের কাছে টেনে নিয়ে, তাদের হোস্টেলে আসার দুঃখ ভুলিয়ে দিতেন। বাড়ির থেকে দূরে এসেও ছেলেরা, মাতৃস্নেহের আশ্রয় পেত। কিন্তু কঠোর পরিশ্রমের তীব্র অঘািত সহ্য করতে না পেরে, আশ্রম-বিদ্যালয় স্থাপনের মাত্র এগারো মাস পরেই বিদায় নিলেন মৃণালিনী। কবির সমস্ত সেবা যত্ন ব্যর্থ করে দিয়ে শীতের পদ্মটি ম্লান হয়ে এল, হারিয়ে গেল কবির প্রিয় পত্র-সম্বোধনটি ভাই ছুটি। কে জানত এত শীঘ্র জীবন থেকে, সংসার থেকে ছুটি নিয়ে তিনি চলে যাবেন! জীবনের প্রতি পদে লোকান্তরিত মৃণালিনীর অভাব অনুভব করেছেন রবীন্দ্রনাথ এমন কেউ নেই যাকে সব বলা যায়—। স্মরণের কবিতায় ঝরে পড়েছে লোকান্তরিত পত্নীর জন্য বেদনা। সংসারে যখন শুধুই কথার পুঞ্জ জমে উঠছে তখন তিনি বারবার স্মরণ করছেন লোকান্তরিতা স্ত্রীকে। অনুভব করছেন তাঁর আশ্রমবিদ্যালয় অসম্পূর্ণ থেকে গেছে কারণ আমি তাদের সব দিতে পারি, মাতৃস্নেহ তো দিতে পারি না। বাংলাদেশে আরো কয়েকজন আদর্শ জননীর পাশে মৃণালিনীর মাতৃমূর্তিটিও চিরস্থায়ী আসন লাভ করতে পারে।

ঠাকুরবাড়ির বৌয়েদের সঙ্গে আরো একজনের কথা এ প্রসঙ্গে সেরে নেওয়া যাক। যোগমায়াকে নিশ্চয় মনে আছে, গিরীন্দ্রনাথের সাহিত্যপ্রেমিকা ধর্মশীল স্ত্রী, যিনি সাবেকী লক্ষ্মীজনার্দন ঠাকুরকে নিয়ে উঠে এসেছিলেন বৈঠকখানা বাড়িতে। সেদিন থেকে জোড়াসাঁকোর বাড়ি দু ভাগ হয়ে গেল কিন্তু মনের মধ্যে দেয়াল ওঠেনি। বরং ঠাকুরবাড়ির সঙ্গে যোগ ছিল না নগেন্দ্রনাথের সন্দেহপরায়ণা স্ত্রী ত্রিপুরাসুন্দরীর। সম্পত্তি সংক্রান্ত নানারকম সন্দেহের বশবর্তী হয়ে তার ধারণা হয়েছিল, মহর্ষিপরিবার তাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলতে চান। তাই তিনি সদর টীটের বাড়ি থেকে এ বাড়িতে কদাচিৎ এলেও কিছু খেতেন না। সব সময় তার খাবার অন্য বৌদের চেখে দিতে হত। যাক সে কথা। যোগমায়ার পুত্রদের সঙ্গে মহর্ষির পুত্রদের সৌহার্দ্য ঘোচেনি। মানসিকতার দিক থেকেও গুণেন্দ্ৰপরিবার এঁদের সঙ্গেই ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলেন। তাই এ দুটি বাড়ি প্রকৃতপক্ষে এক বাড়িই রয়ে গেছে। আবার গুণেন্দ্ৰপরিবার ব্রাহ্ম না হওয়ায় পাথুরেঘাটা বা কয়লাহাটা ঠাকুরবাড়ির সঙ্গেও তাদের যোগ ছিন্ন হল না। এক কথায় এঁরা রইলেন দুই ঠাকুর পরিবারের ঠিক মাঝখানে। অন্যান্য ঠাকুরদের সঙ্গে রইল সামাজিক যোগ, মহর্ষিভবনের সঙ্গে হল মানসিক যোগ। তাই দ্বারকানাথ লেনের পাঁচ নম্বর আর ছ নম্বরকে এক বাড়ি বলাই ভাল। আর সত্যিই তো এক সীমানার মধ্যে ছিল দুটি বাড়ি, এখন অবশ্য নেই। পাঁচ নম্বর বা দ্বারকানাথের সাজানো গোছানো অমন সুন্দর বৈঠকখানা বাড়িটিকে ভেঙ্গে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হয়েছে, রক্ষা পেয়েছে শুধু অন্দরমহল সংলগ্ন বেনেবাড়িটি। এই বৈঠকখানা বাড়ির প্রকৃত গৃহিণী ছিলেন গুণেন্দ্রনাথের স্ত্রী সৌদামিনী।

বৃহৎ পরিবারে পাঁচটি সন্তানের জননী সৌদামিনীর কর্তৃত্বশক্তির পরিচয় প্রথমটায় পাওয়া যায়নি। বোঝা গেল, যেদিন তিনি ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে নানা সমস্যার সম্মুখীন হলেন।

যে বিচক্ষণতার সঙ্গে সৌদামিনী ভাঙা সংসারের হাল ধরেছিলেন, তার তুলনা হয় না। গুণেন্দ্রনাথের উদ্দাম-জীবন উৎসবের উন্মত্ততায় এমন আকস্মিকভাবে নিঃশেষ হয়ে গেল দেখে তিনি মনঃস্থির করেছিলেন, তার ছেলেদের তিনি বিলাসের ফাঁস থেকে, যেমন করে তোক রক্ষা করবেন। বঙ্গহীন প্রমোদের স্রোতে ভেসে যেতে দেবেন না। এই প্রতিজ্ঞা রক্ষা করা যে কত কঠিন, সেকথা আজ আমরা বুঝতে পারব না। উনিশ শতকের শিক্ষা-সংস্কৃতি-নবজাগরণের ফাঁক দিয়ে তখন বয়ে চলেছে বাবুয়ানির তীব্র পঙ্কিল স্রোত। একদিকে যেমন স্কুল খোলা, পত্রিকা প্রকাশ, সমাজসেবার ধূম অপরদিকে তেমনি নগরনটীদের নৃপুর নিক্কণ আর পেয়ালাভরা সুরার রক্তিম আহ্বান। ধনী সন্তানের দেশী বিলিতি উভয় ধরনের বিলাসিতাতেই অভ্যস্ত হয়ে উঠছেন।

বড়লোকের ছেলে বিলাসী হবে না? সে কি কথা? গোঁফ ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তো তাদের তালিম দিয়ে আলালের ঘরের দুলালে পরিণত করা হত। যখনকার যা দস্তুর! ঠাকুরবাড়িতে ধনের অভাব ছিল না, অভাব ছিল না বনেদিয়ানার। তবে? বাবুয়ানি না দেখালে আভিজাত্য থাকবে কি করে? কলকাতার আর পাঁচটা ধনী পরিবার কি করছে? সৌদামিনী শক্ত হলেন। যেখানে যা হয় হোক। পাশেই তো রয়েছে মহর্ষিভবন। সেখানে তে আনন্দের উপাদানের নীচে বয়ে যাচ্ছে না পঙ্কিল বিলাসের স্রোত। তাই হল শেষ পর্যন্ত। সেকেলে বাবুয়ানির ক্রমাগত হাতছানি অনায়াসে উপেক্ষা করে গগনেন্দ্র-সমরেন্দ্র-অবনীন্দ্র মহর্ষিপুত্রদের মতোই নানা গুণের অধিকারী হয়ে উঠলেন। সব দিকে থাকত সৌদামিনীর প্রখর দৃষ্টি। তিনি কখনো নিজের ইচ্ছের কথা জোর করে জানাতেন না, কোথাও ছিল না জেদ বা জবরদস্তির কোন চিহ্ন। তবু তাঁরই ইচ্ছায়, তারই প্রাণের প্রভাবে ছেলেরা চলেছে। কেউ এতটুকু প্রতিবাদ করতে পারেনি। বাইরে কঠিন ভেতরে কোমল এই অসামান্য নারী রবীন্দ্রনাথেরও অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা আকর্ষণ করেছিলেন। বহুদিন পরে কথা প্রসঙ্গে কবি রাণী চন্দকে বলেন, আমাদের গগনদের মা ছিলেন, যাকে ভুলেও শিক্ষিত বলা যায় না কিন্তু, কী সাহস আর কী বুদ্ধিতে তিনি চালিয়েছিলেন সবাইকে। তিন তিনটি ছেলেকে কী ভাবে মানুষ করে তুললেন। ছেলেরা তাদের মাকে যা ভক্তি করে অমন সচরাচর দেখা যায় না।

সৌদামিনী শুধু ছেলেদের মানুষ করেছিলেন তা নয়, ঋণের বোঝায় সংকটাপন্ন জমিদারীকেও একেবারে নতুন করে দিয়েছিলেন। তার কথা মনে হলেই যেন যোগাযোগ উপন্যাসের বড়বৌ অর্থাৎ কুমুর মাকে মনে পড়ে যায়।

সবদিকে নজর রাখতে গিয়ে সৌদামিনী অবশ্য নিজের দিকে একেবারেই তাকাতে পারেননি। সাহিত্য বা শিল্পচর্চার নজির না থাকলেও নানারকম মেয়েলি গুণের অধিকারী ছিলেন সৌদামিনী। মনে হয় তার নাতনীদের মধ্যে পরে যেসব গুণের প্রকাশ হয়েছিল সবই তার মধ্যে অল্পবিস্তর ছিল, নাহলে কারুর মধ্যে কোন গুণের সামান্য স্ফুলিঙ্গ দেখলেই তিনি তাকে চিনতেন কি করে। তাছাড়া তিনি বেশ ভাল চরকা কাটতে পারতেন। তার নিজের হাতে কাঁটা-সুতোয় বোনা কাপড় শান্তিপুরী কাপড়ের মতো মিহি দেখাত। নাতনীদেরও সবাইকে তিনি একটা করে চরকা কিনে দিয়েছিলেন। রোজ সুতো কেটে তাদের দেখাতে হত। হাতে তৈরি জিনিষ বা স্বদেশী কুটির শিল্পের প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। গ্রামাঞ্চল থেকে মেয়েরা তাদের হাতের তৈরি খেলনা বা পুতুল বিক্রী করতে এলে তিনি তাদের উৎসাহ দেবার জন্যে সব কিনে নিতেন। এমনকি স্বদেশী আন্দোলনের প্রতিও তার সহানুভূতি ছিল। অর্থ-সাহায্য ছাড়াও তার বাড়িতে গোপনে অনুশীলন সমিতির কাজ হত! এরকম ছোটখাট অনেক ঘটনা দেখে বোঝা যায়, সৌদামিনী প্রগতিশীল ছিলেন না ঠিকই কিন্তু অসাধারণ এবং দুর্লভ গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁকে এবং তাঁর মতে আরো কয়েকজন বন্ধুকে দেখে জানা যায়, ব্রাহ্ম সমাজ বা নারী প্রগতি-স্ত্রীশিক্ষা প্রভৃতি নবজাগ্রত-ধ্যান-ধারণার সঙ্গে যেসব মেয়ের যোগ ছিল না তারাও কম কৃতিত্বের পরিচয় দিয়ে যাননি। এঁদের কথা আলোচনা না করে শুধু প্রগতিশীল জ্ঞানদানন্দিনী-কাদম্বরী-স্বর্ণকুমারীর কথা মনে রাখলে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলের পরিচয় যেমন সম্পূর্ণ পাওয়া যাবে না, তেমনি জানা যাবে না এই মহীয়সীদের প্রভাবে এ পরিবারের পুরুষদের শিল্পীস্বভাব কি করে গড়ে উঠেছিল। যাক সে কথা।

মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের প্রতিভাময়ী নাতনীদের সংখ্যাও কম নয়। উপযুক্ত পরিবেশে, প্রতিভাবান পিতামাতার প্রভাবে, তারাও অনেকেই নানান গুণের অধিকারিণী হয়ে উঠেছিলেন। ভিন্ন পরিবার থেকে আসা কয়েকজন নাতবৌও যে কৃতিত্বের পরিচয় দেননি, তা নয়। আসলে এ সময় বাংলাদেশে অভাবনীয় নারী জাগরণের উদ্দীপনা দেখা দিয়েছিল। মেয়েরা নিজেরাই ঠেলেঠুলে বেরিয়ে এসেছিলেন বাইরে। প্রথম পর্যায়ে ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের কাজকর্ম দেখে যেমন মেয়েরা সবাই হতবা হয়ে গিয়েছিলেন এন ঠিক সে অবস্থা রইল না। মহর্ষির নাতনীদের সমবয়সী অনেকগুলি গুণবতী মেয়ের সন্ধান পাওয়া গেল। অবশ্য ঠাকুরবাড়ির মেয়েরাও যে দূরে সরে গেলেন, তা নয়। তারা এখন অস্পৃশ্য। মানবী নন বরং উঁচু মহলের আভিজাত্যের প্রতীক এবং অনুকরণযোগ্য। সমাজ ধিক্কারের বদলে তাদের রুচিবোধের প্রশংসা করল। শিল্পে-সাহিত্যে ঠাকুরবাড়ির সংস্কৃতির একটা নিজস্ব ছাপ পড়তেও শুরু হল। বস্তুতঃ ১৮৭৫ থেকে ১৯২৫ এই পঞ্চাশ বছরটাকে যদি এক ঝলকে, এক পলকে দেখে নেওয়া যেত তাহলে ঠাকুরবাড়ির সোনালি-সফল দিনগুলোকেও একসঙ্গে দেখা যেত। বাংলার নারী সমাজেও এই সময় এসেছে যুগান্তর। ঠাকুরবাড়ির অন্তঃপুরেও জ্ঞানদানন্দিনীস্বর্ণকুমারী-মৃণালিনী-সৌদামিনীর পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন প্রতিভা-ইন্দিরা-সরলাশোভনারা। সবাইকে আমরা পেয়ে যাচ্ছি একসঙ্গে। কিন্তু আলোচনার সুবিধের জন্যে একের পর এক নীতি মেনে নিতে হল ঠাকুরবাড়ির মেয়েদের সঙ্গে এবার পাল্লা দিলেন অন্যান্য মেয়েরাও। সবার দানেই নারীপ্রগতি আজকের দিনে এত বেশি সার্থক হয়ে উঠেছে।

মহর্ষির নাতনীদের মধ্যে সবার চেয়ে বয়সে বড় সৌদামিনীর মেয়ে ইরাবতী আর হেমেন্দ্রনাথের মেয়ে প্রতিভা। দৌহিত্রীদের সবাই না হলেও ঠাকুরবাড়িতে যারা মানুষ হয়েছেন। তাঁদের আমরা ঠাকুরবাড়ির মেয়েই মনে করব। যদিও ইরাবতীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ খুব বেশিদিনের নয়। তিনি রবীন্দ্রনাথের সমবয়সী ছিলেন। বিয়ে হয়েছিল পাথুরেঘাটার সূর্যকুমারের দৌহিত্রের পুত্র নিত্যঞ্জনের সঙ্গে। দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায়ের ভাইপো নিত্যরঞ্জন থাকতেন কাশতে। গোঁড়া হিন্দু-পরিবার হওয়ায় তাঁর। অনেকদিন ঠাকুকবাড়ির সঙ্গে যোগ রাখেননি। ইরাবতী বাপের বাড়ি এসেছিলেন বিয়ের দীর্ঘ আঠারো বছর পরে। তবে তার যে একটি কল্পনাপ্রবণ মন ছিল সেটি ধরা পড়ে সেই ছোটবেলাতেই, যখন তিনি রাজার বাড়ির কথা বলে, সমবয়সী মামাটিকে বোকা বানিয়ে দিতেন। তিনি হঠাৎ এসে তাকে বলতেন, আজ রাজার বাড়ি গিয়েছিলাম। বালকের কল্পনা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো ফুলে ফেঁপে উঠত। তাঁর মনে হত, রাজার বাড়ি খুব কাছে, এই বড় বাড়িটারই কোন একটা জায়গায়, কিন্তু কোথায় সেটা। বালকের ব্যাকুল প্রশ্ন বুক চিরে উঠে আসত, রাজার বাড়ি কি আমাদের বাড়ির বাহিরে?

ইরাবতী মজা পেয়ে বলতেন, না, এই বাড়ির মধ্যেই। তিনি জানতেও পারেননি এই ছোট্ট কথাটি তার মামার মনে কী আলোড়ন জাগায়। কল্পনার সোপানে সেই প্রথম পদার্পণ! বালক শুধু ভাবতেন, বাড়ির সকল ঘরই তো আমি দেখিয়াছি কিন্তু সে ঘর তবে কোথায়? রাজা কে কিংবা রাজত্ব কোথায় সে কথা তিনি জানতে পারেননি; শুধু মনে হয়েছে, তাঁদের বাড়িটাই রাজার বাড়ি। রবীন্দ্রনাথের শৈশব-কল্পনা উজ্জীবনে ইরাবতীর ভূমিকাটিকে তাই আমরা উপেক্ষা করতে পারি না।

ইরাবতীর ছোট বোন ইন্দুমতীর সঙ্গে ঠাকুরবাড়ির যোগ আরও কম। তার স্বামীর নাম নিত্যানন্দ (নিত্যরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। ঠাকুরবাড়িতে দুই জামাই বড় নিত্য ও ছোট নিত্য নামেই পরিচিত ছিলেন। ইন্দুমতী থাকতেন সুদূর মাদ্রাজে। নিত্যানন্দ সেখানকার ডাক্তার ছিলেন। খুব স্বাভাবিক কারণেই সেখানে তাঁরা এ্যাঙ্গলো ইণ্ডিয়ান সমাজের সঙ্গে বেশি মেলামেশা করতেন বলে ইন্দুমতী বিদেশী চালচলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন। তার যতগুলি ফটো আমরা দেখেছি সেগুলো সবই গাউন পরা, বিদেশিনীর সাজে। ইন্দুমতীর এক মেয়ে লীলার বিয়ে হয়েছিল প্রমথ চৌধুরীর ভাই মন্মথর সঙ্গে। চিত্রাভিনেত্রী দেবিকারাণী এই লীলারই মেয়ে।

প্রতিভা বা প্রতিভাসুন্দরী রবীন্দ্রনাথের চেয়ে মাত্র পাঁচ বছরের ছোট। মহর্ষির তৃতীয় পুত্র হেমেন্দ্রনাথের প্রথম সন্তান প্রতিভা। সত্যিই প্রতিভাময়ী তিনি। হেমেন্দ্র তাঁকে সর্বগুণে গুণান্বিত করে তোলার জন্যে একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিলেন। তাই প্রতিভা প্রথম জীবনে অবকাশ পেয়েছেন খুব কম। সাদাসিধে বেথুন স্কুলের বদলে তিনি ভর্তি হয়েছিলেন লরেটো হাউসে। লরেটোতে প্রতিভাই প্রথম হিন্দু (ব্রাহ্ম) ছাত্রী। তখনও মেয়েদের পরীক্ষা দেবার ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় প্রতিভা কোন পরীক্ষা দিতে পারেননি তবে ওপরের ক্লাস পর্যন্ত উঠেছিলেন।

আশ্চর্যের বিষয় এই যে, প্রতিভা বা তার বাবা হেমেন্দ্রনাথ কেউই এ সময় পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হবার কথা ভাবেননি অথচ তখনই বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধ দরজা খোলার চেষ্টা করছিলেন চন্দ্রমুখী বসু। তিনি সময়ের দিক থেকে প্রতিভার সমসাময়িক। মেয়েদের শিক্ষা প্রসারে চন্দ্রমুখীর দান অসামান্য। তিনি এনট্রান্স পরীক্ষা দেবার জন্যে প্রথমে দেরাদুনের নেটিভ ক্রিশ্চান গার্লস মিশনারী স্কুলের অধ্যক্ষ রেভারেণ্ড হেরনের কাছে প্রার্থনা জানালেন। হেরন প্রথমে তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুঝিয়ে পরীক্ষা দেবার সংকল্প ত্যাগ করতে বলেন। কিন্তু চন্দ্রমুখীর কাতর অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনুমতিও প্রার্থনা করলেন। সত্যিই তো, ছেলেরা যদি পরীক্ষা দিতে পারে তবে এই মেয়েটি পারবে না কেন? কি তার অপরাধ?

অপরাধ না থাকুক, সহজে চন্দ্রমুখীকে অনুমতি দেয়নি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। অনেক তর্কাতর্কির পর ১৮৭৬ সালের ২৬শে নভেম্বরের সিণ্ডিকেট সভা চন্দ্রমুখীকে এই শর্তে পরীক্ষায় বসতে দিতে রাজী হলেন যে তাকে নিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে গণ্য করা হবে না এবং পরীক্ষকরা তার খাতা দেখে যদি বা পাশের নম্বর দেন, তবু পাশকরা ছাত্রদের তালিকায় তার নাম থাকবে না। চমৎকার সিদ্ধান্ত। ধন্য কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়! চন্দ্রমুখী তাতেই রাজী হলেন এবং পাশও করলেন। এ সময়ও ঠাকুরবাড়ির কোন মেয়ে এগিয়ে এলেন না পরীক্ষা দিতে, অথচ ঘরে বসে তখন প্রতিভা চন্দ্রমুখীর মতোই শিক্ষিত হয়ে উঠেছেন। তাই ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা প্রথম স্কুলযাত্ৰিনীদের একজন হয়েও, প্রথম কলেজে পড়া ছাত্রীর গৌরব থেকে বঞ্চিত হলেন।

প্রথম মহিলা গ্র্যাজুয়েট হিসেবেও চন্দ্রমুখীর নাম করা যায়। সে সময় তার সঙ্গিনী ছিলেন মাত্র আর একজন, কাদম্বিনী বসু। পরে যিনি প্রথম মহিলা চিকিৎসক হয়েছিলেন। আর সবটাই যে শুধু এই দুটি মেয়ের চেষ্টায় সম্ভব হয়েছিল তা নয়। এদিকে অনেকেরই দৃষ্টি পড়েছিল। ঢাকার অবলাবান্ধব দ্বারকানাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের আপ্রাণ চেষ্টায় মেয়েরা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটা অতিরিক্ত টেস্ট পরীক্ষায় বসার অনুমতি পেলেন। সাহায্য করলেন নারী হিতৈষী ভাইস চ্যান্সেলার স্যার আর্থার হবহাউস। এবারে পাশ করলেন কাদম্বিনী। তিনি কলেজে পড়ার জন্য অনুমতি চাইলে শেষে বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মতি পাওয়া গেল। ১৮৮০ সালে এনট্রান্স পাশ করলেন চণ্ডীচরণ সেনের মেয়ে কামিনী সেন (রায়) ও সুবর্ণপ্রভা বসু। ১৮৮১-তে পাশ করলেন আরো ছজন মেয়ে। অবলা দাস (বসু), কুমুদিনী খাস্তগির (দাস), ভার্জিনিয়া মিত্র (নন্দী), নির্মল মুখোপাধ্যায় (সোম), প্রিয়তমা দত্ত (চট্টোপাধ্যায়) ও বিধুমুখী বসু। বাংলার নারী প্রগতি আন্দোলনে পরে এরা প্রত্যেকেই উল্লেখ যোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন এবং অসাধারণ কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছিলেন। পরের ইতিহাস তো সংক্ষিপ্ত। বেথুন কলেজের একমাত্র ছাত্রী হিসেবে কাদম্বিনী এবং ফিচার্চ অব স্কটল্যাণ্ড থেকে বি. এ. পড়লেন চন্দ্রমুখী। ১৮৮২ সালের ডিসেম্বর মাসে পরীক্ষার ফল প্রকাশ হলে দেখা গেল, সমস্ত ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের মধ্যে প্রথম দুটি মহিলা গ্র্যাজুয়েটের নাম চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী। চন্দ্রমুখী পরে এম. এ. পাশ করেন আর কাদম্বিনী হন চিকিৎসক। কাদম্বিনীকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়েই। ডাক্তার হতে হয়েছিল, সহজে হয়নি। ভারতে তিনি পরীক্ষকদের বিচারে ফেল করেছিলেন তবে তাকে চিকিৎসা করবার অনুমতি দেওয়া হয়। তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে তিনি গ্লাসগো ও এডিনবরা থেকে চিকিৎসকের ডিগ্রী নিয়ে আসেন। মাদ্রাজে ডাক্তারী পড়েছিলেন অবল দাস। কলকাতায় ভার্জিনিয়া মিত্র ও বিধুমুখী বসু। এভাবেই উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে মেয়েদের দরজা খুলে দিলেন চন্দ্রমুখী ও কাদম্বিনী। সে যুগে এই দুজনকে দেখবার জন্য রাস্তায় লোকের ভিড় জমে যেত। বিশেষ করে মেয়েরা তাদের দেখত শ্রদ্ধা মেশানো বিস্ময় নিয়ে। এদের সঙ্গে প্রতিভার নামটি যুক্ত হলেই হয়ত সব দিক দিয়ে সুন্দর দেখাত কিন্তু পরীক্ষার ব্যাপারে ঠাকুরবাড়ির মেয়েরা বেশ খানিকটা পিছিয়েই রইলেন। এগিয়ে গেলেন শিল্প-সংস্কৃতির জগতে।

সঙ্গীতের জগতে বাঙালী মেয়েদের জন্যে আরেকটি মুক্তির পথ খুলে দিয়েছিলেন প্রতিভা। প্রাচীন প্রথা না মেনে হেমেন্দ্র তার স্ত্রীকে গান শিখিয়েছিলেন। প্রতিভা চর্চা করেছিলেন দেশি-বিলিতি উভয় সঙ্গীতেরই। শুধু তাই নয়, চিরকালের ট্র্যাডিশন ভেঙ্গে প্রতিভা তার ভাইয়েদের সঙ্গে ব্রহ্মসঙ্গীত গাইলেন মাঘোৎসবের প্রকাশ্য জনসভায়। আর একটি নতুন নক্ষত্রের আত্মপ্রকাশে খুশি হলেন সুধীসমাজ। মেয়েকে গান শেখানোর ব্যাপারে কার্পণ্য করেননি হেমেন্দ্র। বাড়ির ওস্তাদ বিষ্ণু চক্রবর্তীর কাছে তালিম নেওয়া ছাড়াও বিদেশী গান ও পিয়ানো শিখতেন প্রতিভা। আরো নানারকম বাদ্যযন্ত্র ও শিখেছিলেন। ১৮৮২ সালে লেখা হেমেন্দ্রর একটি চিঠিতে দেখা যাচ্ছে তিনি প্রতিভাকে বিলিতি গান সম্বন্ধে উপদেশ দিচ্ছেন :

…কেবল নাচের বাজনা ও সামান্য গান না শিখিয়া যদি Beethoven প্রভৃতি বড় বড় German পণ্ডিতদের রচিত গান বাজনা শিক্ষা করিতে পার, এবং সেই সঙ্গে music theory শেখ তবেই আসল কম হয়।

প্রত্বিভা তাঁর বাবার ইচ্ছা সর্বাংশে পূরণ করে মেয়েদের মধ্যে গানের ব্যাপারে অভিজ্ঞ হয়ে উঠলেন। বিদ্যোৎসাহিনী সভায় তার গান আর সেতার শুনে খুশি হয়ে রাজা শৌরীন্দ্রমোহন তাঁকে দিলেন স্বরলিপির বই, রঘুনন্দন ঠাকুর দিলেন বিশাল তানপুরা। গান ছাড়াও আর একটা ব্যাপারে ট্র্যাডিশন ভাঙলেন প্রতিভা। চন্দ্রমুখী-কাদম্বিনী যেমন বাঙালী মেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দিয়েছিলেন, প্রতিভা তেমনি সুযোগ করে দিলেন গান করার ও অভিনয় করার। এই দুঃসাহসিক নজির তার কাকীমাদের ঘোড়ায় চড়া বা বিলেত যাওয়ার চেয়ে খুব কম সাহসের কথা নয়। তার কাকীমা, পিসীমার অভিনয় করেছিল ঘরোয়া আসরে। দর্শক হিসেবে যারা ছিলেন তারা সবাই আপনজন, চেনাশোেনা মানুষ সুতরাং লজ্জা ছিল না, সমালোচনার আশংকাও না। সাধারণ মানুষ, যাদের আমরা বলি পাবলিক, সর্বপ্রথম তাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলেন প্রতিভা। ঠাকুরবাড়ির যে কোন উৎসবে তাই মানুষ ভেঙে পড়ত। তারা শুনত বাঙালী মেয়েদের গান, অবাক হয়ে দেখত ভদ্রঘরের মেয়েরা আসরে বসে গান গাইছে। বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যেত। তারপর বিদ্বজ্জন-সমাগমের সভায় মেয়েরা অভিনয় করতেও এগিয়ে এলেন। সবার আগে প্রতিভা, বাল্মীকিপ্রতিভার সরস্বতী হয়ে।

রবীন্দ্রনাথ যখন বিলেত থেকে ফিরে এলেন তখন ঠাকুরবাড়িতে শুরু হয়েছে। গীতিনাট্যের যুগ। স্বর্ণকুমারী ও জ্যোতিরিন্দ্রর লেখা বসন্ত-উৎসব, মানময়ীর ঘরোয়া অভিনয় হয়ে গেছে কয়েকবার। এমন সময় রবীন্দ্রনাথ দেশী বিলিতি সুর ভেঙে লিখলেন একটি নতুন অপেরাধর্মী গীতিনাট্য। রামায়ণের সুপরিচিত রত্নাকর দস্তুর বাল্মীকিতে রূপান্তরের কাহিনীটিকে তিনি বেছে নিলেন। এই নাটকে তিনটি নারী চরিত্র রয়েছে। বালিকা, লক্ষ্মী ও সরস্বতী। নাটক লেখার পরেই যখন রিহার্সাল শুরু হল তখন রবীন্দ্রনাথ সরস্বতীর ভূমিকায় প্রতিভার অপূর্ব অভিনয় দেখে নাটকের সঙ্গে প্রতিভার নামটি জুড়ে নতুন নাম দিলেন বাল্মীকিপ্রতিভা।

এরপর স্থির হল, বিদ্বজ্জন-সমাগম সভায় বাল্মীকি প্রতিভার অভিনয় হবে। সেদিনটা ছিল শনিবার। ১৬ই ফান্তুন বাংলা ১২৮৭ সাল। সন্ধ্যেবেলা। বসন্তের মৃদুমন্দ দখিনা বাতাস বইছে। দর্শকরা উপস্থিত। এমন সময়ে শুরু হল বাল্মীকিপ্রতিভা। ডাকাতের আনাগোনা। গুরুগম্ভীর পরিবেশ। দর্শকেরা মুগ্ধ! স্তব্ধ। বিস্ময়ের ওপর বিস্ময়। ক্রৌঞ্চমিথুনের জায়গায় সত্যিকারের দুটো মরা বক। বুক দুটো অবশ্য জোগাড় করে এনেছিলেন জ্যোতিরিন্দ্রনাথ। ছোট ভাইয়ের নাটক মঞ্চস্থ হবে, জ্যোতিরিন্দ্র মহা উৎসাহে পাখি শিকারে বেরোলেন। কিন্তু কোথায় পাখি? সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে খালি হাতে ফিরে আসছেন, তখন দেখলেন, একজন অনেকগুলো বক বিক্রী করতে যাচ্ছে। তার কাছ থেকে দুটো বক কিনে, মেরে বাড়ি নিয়ে আসেন। সেকালে অনেকেই স্টেজের মধ্যে বাস্তব জগৎকে টেনে আনতে চেষ্টা করতেন। শুধু সেকালে কেন? একালেও রিয়্যালিস্টিক স্টেজ করার চেষ্টা কম হয় না। স্টেজের মধ্যে ট্রেন-সেতু। বন্যা-গাড়ি এসব আনার মধ্যেও সেই একই মানসিকতা কাজ করছে। কালমৃগয়ার অভিনয়ে জ্যোতিরিন্দ্রনাথের একটা পোষা হরিণকে স্টেজে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এই জাতীয় জিনিষের সূচনা হয় বেঙ্গল থিয়েটারের পুরুবিক্রম নাটকে। ছাতুবাবুদের বাড়ির শরচ্চন্দ্র ঘোষাল পুরু সেজেছিলেন। তিনি একটা সত্যিকারের সাদা তেজিয়ান ঘোড়ার পিঠে চেপে স্টেজে আসতেন।

বাল্মীকিপ্রতিভার অভিনবত্ব ছিল অভিনেত্রীর আবির্ভাবে। হাত বাঁধা বালিকার ভূমিকায় সত্যিই একটি অনিন্দ্যসুন্দরী বালিকা এসে বসল। প্রতিভাকে চিনতে পারলেন অনেকে। এই মেয়েটিই তো সেবার মুগ্ধ করেছিল গান শুনিয়ে, এবারও মুগ্ধ করল সরস্বতী রূপে। নাটকের শেষে এক অনির্বচনীয় তৃপ্তির রেশ নিয়ে ফিরে গেল সবাই। আর্যদর্শন কাগজে যখন এই অভিনয়র সংবাদ ছাপা হল, তখন দেখা গেল সমালোচক প্রতিভার অভিনয়ের প্রশংসা করে লিখেছেন, শ্ৰীযুক্ত বাবু হেমেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রতিভা নাম্নী কন্যা প্রথমে বালিকা পরে সরস্বতীমূর্তিতে অপূর্ব অভিনয় করিয়াছিলেন। প্রতিভা সৌভাগ্যবতী, তাই প্রথম মঞ্চাবতরণের পর তাকে সহ্য করতে হয়নি অপমানের গ্লানি। বরং কলারসিকেরা তাকে সশ্রদ্ধ স্বীকৃতিই জানিয়েছেন।

বাল্মীকি প্রতিভায় কিন্তু আরও একটি নারীচরিত্র ছিল—লক্ষ্মী। এই প্রথমবারে অভিনয়ে লক্ষ্মী হয়েছিলেন শরৎকুমারীর বড় মেয়ে সুশীলা। ইন্দিরা সেরকম ইঙ্গিতই করেছেন। অথচ আদর্শনের সমালোচক লক্ষ্মীর কথা উল্লেখ করেননি দেখে অবাক হতে হয়। তখনকার দিনের পক্ষে লক্ষ্মীর ভূমিকা দেখেও তো মুগ্ধ হবার কথা। বাইরের রঙ্গমঞ্চে অবশ্য তখন বড় বড় অভিনেত্রীর আবির্ভাব হয়েছে, নটী বিনোদিনীর অভিনয়ে কলকাতা সরগরম। তবু কোন সম্রান্ত পরিবারের মেয়ে তখনও অভিনয়ের কথা ভাবতেই পারতেন না। মনে হয়, সুশীলার অভিনয় খুব ভাল হয়নি। তবু তাঁর প্রথম প্রয়াস অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। সুশীলার কথা এর পরেও আর শোনা যায়নি। তারা ছিলেন চার বোন। অপর তিনজন সুপ্রভা, স্বয়ংপ্রভা ও চির প্রভা। শেষোক্ত দুজনের কথা বিশেষ কিছু জানা যায়নি তবে সুপ্রভা সম্বন্ধে একথা চলে না। ঠাকুরবাড়িতে বাস করেও এঁরা কেউ চারুপাঠের বেশি লেখাপড়া যেমন শেখেননি, তেমনি শিল্পকলার চর্চা করেছেন বলেও শোনা যায়নি, প্রত্যেকেই ছিলেন গৃহকর্মনিপুণ এবং সাংসারিক কাজ নিয়েই থাকতে ভালবাসতেন। সুপ্রভা তারই মধ্যে অসাধারণ প্রাণপ্রাচুর্যে পূর্ণা এবং সুরসিক ছিলেন। বিখ্যাত শিল্পী অসিত হালদার তাঁর সন্তান।

ঠাকুরবাড়িতে সুশীলার মতো সুপ্রভাও দু-একবার অভিনয় করেছিলেন। বোধহয় হিরন্ময়ীর বিয়ের সময়। স্বর্ণকুমারীর লেখা বিবাহ-উৎসবের অভিনয়ে সুপ্রভা সাজলেন নায়কের বন্ধু। ঠাকুরবাড়িতে প্রত্যেক বিয়েতে একটা করে থিয়েটার হত। অন্যান্য বড় লোকের বাড়িতে হত বাঈ-নাচ বা পেশাদার যাত্রা ও থিয়েটার। মহর্ষিভবনে বাঈ-নাচ কোনদিনই হত না। তার বদলে ছেলেরা ও মেয়েরা একটা করে নাটক অভিনয় করতেন। এই অভিনয়ের প্রয়োজন হয়েছিল আরেকটা কারণে। সে সময় ঠাকুরবাড়িতে সব অত্মীয়স্বজন অবাধে আসতে পারতেন না। এমনকি পাঁচ বা ছয় নম্বরের অধিবাসীরাও নয়। ইচ্ছে থাকলেও সামাজিক বাধা ছিল; মহর্ষিপরিবার ব্রাহ্ম, তারা হিন্দু বিয়েতে যেখানে শালগ্রাম শিলা আছে সেখানে যাবেন না। অপরদিকে গুণেন্দ্ৰপরিবারও ওবাড়ির কাউকে নিমন্ত্রণ করতেন না পাছে অন্য আত্মীয়ের ব্রাহ্মদের সঙ্গে পংক্তিভোজনে না বসেন। অথচ কে না চায় আনন্দ অনুষ্ঠানে সবাই আসুক। তাই বিয়ের পরদিন কিংবা আট দিনের দিন একটা নাটক অভিনয় হত এবং তাতে সবাই নিমন্ত্রিত হতেন। এ সময় মিষ্টান্ন বিতরণ হত হাতে-হাতে, পংক্তিভোজন না হওয়ায় জাত-পাতের বালাই নিয়ে কেউ মাথা ঘামাতেন না। এই রকমই একটা ঘরোয়া অনুষ্ঠানে সুপ্রভা সাজলেন নায়কের সখ। বিবাহ-উৎসব আরো একবার অভিনীত হয় সুপ্রভার বিয়ের সময়। বিয়ের কনে হয়ে যাওয়ায় সুপ্রভার ভূমিকাটি পান স্বর্ণকুমারীর ছোট মেয়ে সরলা।

বিবাহ-উৎসবের কথায় আরো কয়েকজনের কথা মনে পড়ে। একজন এ। নাটকের নায়ক, তাঁর নামও সুশীলা তবে তিনি ঠাকুরবাড়ির মেয়ে নন, বৌ। দ্বিজেন্দ্রনাথের জ্যেষ্ঠপুত্র দ্বিপেন্দ্রের প্রথম স্ত্রী। অপরজন এ নাটকের নায়িকা সোজাসুন্দরী। সরোজাসুন্দরী এবং উষাবতী দ্বিজেন্দ্রনাথের দুই মেয়ে। বিয়ে হয়েছিল রাজা রামমোহন রায়ের পুত্রের দৌহিত্র বংশে—মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় এবং রমণীমোহন চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে। মোহিনীমোহন ভারতীয় থিয়সফিস্ট আন্দোলনের উদ্যোক্তা, পরে তিনি দীর্ঘ সাত বছর আমেরিকায় বাস করেন। তাঁর দার্শনিক চিন্তা, কবিত্ব শক্তি আর ইংরেজী ভাষার ওপর চমৎকার দখল সেকালে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। অন্যান্য গ্রন্থ রচনা ছাড়াও তিনি ইংরেজীতে অনুবাদ করেন শ্ৰীমদ্ভগবদ্গীতা। এঁর আরেক ভাই রজনীমোহনের সঙ্গে বিয়ে হয়েছিল অবন-গগনের ছোট বোন সুনয়নীর এবং বোন হেমলতার সঙ্গে দ্বিপেন্দ্রনাথের বিয়ে হয় তার প্রথম স্ত্রী সুশীলার মৃত্যুর পরে।

সরোজা ছিলেন অসামান্যা রূপসী এবং সুগায়িকা। তাই বিবাহ-উৎসবে তিনি নিয়েছিলেন নায়িকার ভূমিকা। পরে অবশ্য সুগৃহিণী হিসাবে তিনি যতটা কৃতিত্বের পরিচয় দিয়েছেন বহির্জগতে ততটা ছড়িয়ে পড়তে পারেননি। দ্বিজেন্দ্রপরিবারের মেয়েদের ক্ষমতা ছিল ঠিকই কিন্তু সেভাবে স্ফুরণ হয়নি। উদাসীন দার্শনিক দ্বিজেন্দ্রনাথও এ সব বিষয়ে মনোযোগী ছিলেন না। তবে সমাজসেবিকারূপে সরোজার দুই মেয়ে গীতা চট্টোপাধ্যায় ও দীপ্তি চট্টোপাধ্যায় সারাজীবন নিরলসভাবে বহু কাজ করে গিয়েছেন। উদাবতী গান গাইতেন কোরাসে। একবার কালমৃগয়ায় তিনি ও ইন্দিরা সেজেছিলেন বনদেবী। ঠাকুরবাড়িতে এদের অভিনয় বা অন্যান্য ভূমিকা হয়ত খুব স্মরণীয় নয়। কিন্তু সম্মিলিতভাবে এঁরা ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহলকে যেভাবে আলোকিত করে তুলে। ছিলেন সে কথা ভোলা যায় না। তাছাড়া কোনদিন যদি রবীন্দ্র-নাটকের প্রতিটি অভিনয়ের পাত্র-পাত্রীদের খোঁজ করা হয় তাহলেও দেখা যাবে তার প্রথম দিকের নাটক এবং গানকে বাড়ির ছেলেমেয়েরাই সবার সামনে তুলে ধরেছিলেন।

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত