পথের ভিখারি

বাড়ির বাইরেই আছে সমুখে চলার পথ।সে পথ এমনিই গেছে, নিরুদ্দেশে।এই দুনিয়া সংসারে একমাত্র পথ ই অনন্ত যাকে আমি ছুঁতে পারি।মানসলোকের অভ্যন্তরীণ যে পৌঁছানো, সেটি বহিরঙ্গের এই চলাটি নির্ধারণ করতো বরাবর। আকাশ ও অনন্ত , কিন্তু তাকে আমি ছুঁতে পারি না।আর কলকাতার হাইরাইজ তাকে চোখ রাঙায়। কিন্তু পথ ? সে বড় নিজের। সিঁড়ির নীচটুকু থেকে সে নিজেকে বিস্তার করেছে অনন্তে।কেউ অবরোধ করলেও এ চির সত্য যে” রাস্তা কারো একার নয়।”
পথ নিজেই অন্য দিশা খুঁজে নেয় , মানুষ খুঁজে পায় অন্য গলি।
মনখারাপ হলে চুপচাপ হাঁটি। যেতে যেতে পাড়ার মোড়ের কদম গাছটার অসংখ্য ফুল , আর তার মাতাল করা গন্ধে থমকে দাঁড়াই। মন ভালো হয়ে যায়। এই ফুল, এই গাছ, ওই বাড়ির মাথা দিয়ে উঁকি মারা সিঁদুর লাল শেষ বিকেলের সূর্য, সব কেমন পাগল করে, এরাও আমার মতো পথেরই।এইসব টা মিলিয়ে রাস্তা। রাস্তা সবসময় সামনে দিকে যায়। মানুষ ফেরে। পথ ফেরেনা। এগিয়ে চলাই তার একমাত্র নিয়তি।
আমার কাছে প্রেম এসেছে কামিনী ফুলের গন্ধ ভরা রাস্তা দিয়ে, আমার প্রথম গোপন অভিসার তোমার সঙ্গে পথে হেঁটে, আজও স্মৃতি হাতড়ে মাধবীলতার গন্ধ ভরা সেই পথ খুঁজে পাই। ” অভিসার মানে তো যাওয়া।”
কোন এক অনির্দিষ্ট পথে ভেসে পড়েছিলাম বলে প্রেমকে পেয়েছি তার সম্যকরূপে। আমার একলা গুনগুনিয়ে গাওয়া ” রঞ্জিশ হি সহি…দিল ইয়ে দুখানে কে লিয়ে আ…”
আমার নাগরিক জীবনে বৃষ্টি কে পাওয়া বা বসন্তের বেঁচে থাকা কৃষ্ণচূড়া লাল পথ আমাকে ঋতু চেনায়। ” যেদিকে দুচোখ যায় চলে যাবো।” ক’জন যেতে পারে? আমি কখনো পেরেছি। কখনো পারিনি। এই দুচোখ যেদিকে যায় চলে যাওয়াটায় প্রাপ্তির ভান্ডার অনেক।
একবার শিয়ালদহ স্টেশনের বাইরে ব্রিজের নীচে একটি মেয়েকে দেখেছিলাম, তার প্রেমিক তাকে সস্তা কাঁচের চুড়ি কিনে দিয়েছে, তার মুখে কনে দেখা নরম আলো, অভিভূত হয়ে যাওয়ার মতো আলো, আর সেই প্রেমিকের চোখে ‘দুনিয়া কিনে নিয়েছি’র আনন্দ। আমি তারপর থেকে প্রেমিকের থেকে কাঁচের চুড়ি চাইতাম আর বলতাম কায়দা করে, ” আহা তোমার নাম আমার হাতে রিনরিন করে বাজবে, এমনটা চাই।”
আসলে আমি ওই মেয়েটির সেই সময়ের অমূল্য সুখকে খুঁজেছি জীবনের পথের প্রতি বাঁকে।এমন অনেক দৃশ্য, দৃশ্য দূষণ আমাকে, পথই দেখিয়েছে, চিনিয়েছে জীবন।
যখন প্রেম ভেঙে গেছে সেইসব চেনা পথ যেখানে আমরা হেঁটেছি,হেসেছি খিলখিল, আমি হেঁটে বেড়িয়েছি, সেখানে বারবার ঘুরে মরেছি, নিজের কাছে ফিরতে চেয়েছি, এক ই পথে বারবার ঘুরে।
চা-ওয়ালির দুঃখের কথা শুনে চোখে জল এসেছে, সে বেশি লঙ্কা দিয়ে অমলেট বানিয়ে দিয়ে উলটে আমাকেই জীবনদর্শন শিখিয়েছে গম্ভীর ভাবে। এভাবেই পথ আমাকে কত সম্পর্ক দিয়েছে।শ্মশানের পথে বাবাকে নিয়ে যেদিন গেলাম, ফিরে আসার বোধটুকু ছিল না। শ্মশানের পথেই বোধহয় মানুষ নিজেকে নতুন করে খুঁজে পায়, পার করে ফেলে অনেকটা পথ।

সেই পথ আজ মুখ ফিরিয়েছে। ঘরের চার দেওয়ালের মধ্যে থেকে সে অভিমানীনির মুখ আমি দেখতে চাই। জীবনে যে‌ আমার সবচেয়ে বড় বন্ধু ছিল, সেই পথে বেরোন নাকি বন্ধ!
সব শেকল ভেঙে বেরিয়ে পড়ি। আগলভাঙা উচ্ছ্বাস মনের মধ্যে উপচে ওঠে।
চলা থেমে গেলে দেখা থেমে যায়। দেখা থেমে গেলে বোধ।

বোধ থেমে গেলে বোবা চোখ নিয়ে তোমার দিকে ভালোবাসার চাহনিটি কেমন করে চাইবো, অনিমেষ?

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত