East–West Schism

ইতিহাস: দ্যা গ্রেট স্কিজম । ইমরান হাসান কনক

Reading Time: 8 minutes

আমাদের আজকের এই পৃথিবীতে খ্রিস্টবাদ তিনটি ভাগ হয়ে গিয়েছে, একদিকে আছে ক্যাথলিক আর ইস্টার্ন অর্থোডক্স আর অপরদিকে আছে প্রোটেস্ট্যান্টরা, তবে জানলে অবাক লাগে যে ১০৫৩ সালের পুর্ব পর্যন্ত এরকম কোন ভাগ ছিলনা খ্রিস্টানদের মধ্যে, তারা সবাই ছিল এক নামেই পরিচিত আর তা হচ্ছে খ্রিস্টান, তাহলে কোন বিষয়টির কারণে পরবর্তী মধ্যযুগ(High Middle Age) তারা একসময় একে অপরের থেকে পৃথক হতে শুরু করল, এমনকি এক সময় দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেল, আর সেই দুইটি ভাগ একে অপরের চরমতম শত্রু পর্যন্ত হয়ে গেল।

আমরা যদি এর সুত্রপাতখুজতে যাই তাহলে দেখতে হবে ২৮৫ সাল থেকে ১০৫৩ পর্যন্ত এক শীতল যুদ্ধকে এক রাজনৈতিক টানাপোড়েনের ইতিহাস কে, এক প্রবল সামাজিক, ধর্মীয় ও ভু-রাজনৈতিক দন্দ্বকে। আর এর মুলভাগে রয়েছে একটি আগ্নেয় গিরি! যার কারণে শতাব্দী যাবত এক টানাপোড়েন শুরু হয় দুই খৃস্টান জগতের মাঝে।

সূচনা

এর প্রধান কারণ ছিল রাজনৈতিক, আর সেই রাজনৈতিক কারণ ছিল নিম্নরূপ

২৮৫ খ্রিস্টাব্দে, রোমান সাম্রাজ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ঘটে, মূলত অরেলিয়ানের সময়ে রোমান সাম্রাজ্য তিনভাগে বিভক্ত হয়ে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হবার পর থেকেই এই বিষয়টির দরকার ছিল,আর সেটি হচ্ছে রোমান সাম্রাজ্যের মাঝে ল্যাটিন আর গ্রীকদের মাঝে একটি প্রশাসনিক বিভেদ, এই কারণে ২৮৫ খ্রিস্টাব্দে জন্ম হয় পশ্চিম ও পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের, তখনও যদিও রোমান সাম্রাজ্য ছিল প্যাগান, তবে কন্সট্যান্টাইনদ্যাগ্রেটের  অধীনে এই সাম্রাজ্য ৩৩৮ সালে পুনরায় একত্রিত হয়, আর সেই বছরেই খ্রিস্টধর্ম যা গত তিন শতক ধরে ছিল নির্যাতিত রোমান সাম্রাজ্যের মাঝে সেটাই হয়ে দাঁড়ায় রাজধর্ম রোমান সাম্রাজ্যের।


East–West Schism
চিত্রঃ বিভক্ত রোমান সাম্রাজ্য

আর এই সাম্রাজ্যের মাঝেই ছিল খৃস্টান ইউরোপের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ৫ টি চার্চ,

East–West Schism
চিত্রঃরোমান সাম্রাজ্যের মাঝের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ৫ টি চার্চ

এ সমস্ত গির্জাসমুহ ছিল জেরুজালেম এন্টিওক, আলেকজান্দিয়া, কন্সট্যান্টিপোল ও সর্বশেষ রোমে। রোমান সাম্রাজ্যের মাঝের দুইটি সাংস্কৃতিক বিভাগ গ্রীকভাষাভাষী আর ল্যটিন ভাষায় কথা বলা মানুষদের মধ্যেকার বিভেদের মূর্তরূপ ছিল শুধুমাত্র, এই বিভাজনের ফলে রোমান সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চল ক্রমাগত দুর্বল হতে থাকে আর এরফলে ৪৭৬ খ্রিস্টাব্দে ভিসিগথদের দ্বারা লুন্ঠিত হয় প্রায় হাজার বছর ধরে চলে আসা এই অর্ধ পৃথিবী শাসনকারী মহানগরী।


East–West Schism
চিত্রঃরোমান সাম্রাজ্যর পতন

এরপর হতে ইস্টার্ন রোমান বা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যই হয়ে ওঠে একমাত্র রোমান সাম্রাজ্য, তবে সেই রোমান সাম্রাজ্যের মাঝে রোমান ব্যাসিলিকার যিনি অধিপতি পোপ তাকে পড়তে হয় এক নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে ষষ্ঠ শতকে  জার্মানিকলম্বার্ড যোদ্ধাগণ ইটালি অধিকার করেন, আর এর ফলে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের হাতছাড়া  হয় ল্যাটিন এলাকার বিশাল একটা অংশ, আর এর সাথে সাথে ল্যাটিন ভাষী খৃস্টান গনকেনব উত্থিত জার্মান শক্তির সাথে মানিয়ে চলার প্রতিযোগিতায় নামতে হয়।


East–West Schism
চিত্রঃলম্বার্ড যোদ্ধাগণ

সপ্তম শতকে আরব মুসলিম শক্তির সাথে পরাজিত হবার পরে একে একেএণ্টিওক, এক্রে আর আলেকজান্দ্রিয়া চলে যায় মুসলিম রাশিদুন খিলাফতের নিকট। এই কারণে ইউরোপে থাকে শুধুই দুইটি চার্চ যে গুলি প্রধান হয়ে ওঠে আর সেগুলি ছিল কন্সট্যান্টিনোপলেরহাজিয়া সোফিয়া আর রোমের ব্যাসিলিকা।

এর একটিতে অবস্থান করতেন পোপ ও  অপরটিতে অবস্থান করতেন, কন্সট্যান্টি নোপলের প্যাট্রিয়াক। এদের মাঝে পোপ সেই সময়ে খ্রিস্টান ধর্মের সবথেকেবৃহৎ ব্যক্তিত্ব ছিলেন, তবে  প্যাট্রিয়াকের নিকট রাজনৈতিক ক্ষমতা অনেক বেশী ছিল, এই কারণে পোপ হওয়াকে নির্ধারণ করতেন কন্সট্যান্টিনোপলের সম্রাট ও প্যাট্রিয়াক, এমনও হয়েছে অনেক প্রচেষ্টা করা স্বত্বেও অনেকে পোপ হতে পারেনি শুধুমাত্র কন্সট্যান্টিনোপলিসের সম্রাট তাকে অপছন্দ করতেন এই কারণে।

তো এরপরেই রঙ্গমঞ্চে আসেন রোমান সম্রাট লিও তৃতীয় আর এসেই তিনি শুরু করেন, রোমান সাম্রাজ্যের মাঝে জন্ম নেওয়া একটি অন্যতম উল্লেখযোগ্য আন্দোলনের, সেটির নাম ছিল আইকোনোক্লিজম, যাকে ল্যাটিন ভাষাভাষী রোমান অঞ্চলের ব্যক্তিবর্গ মোটেই  ভালো চোখে দেখেন নাই ।

এই আন্দোলনের মুল কথা ছিল যে কোনরকম ছবি বা মূর্তির মাধ্যমে যিশুর উপাসনা করা যাবেনা। আর এর পিছনে ছিল একটি আগ্নেয়গিরি! সেই সময়ে আমরা ট্রেডগোল্ডের ইতিহাস থেকে জানতে পারি যে স্যানটোরিনি দ্বীপে ৭১৮ সাল থেকে  সক্রিয় আগ্নেয়গিরি ৭২৬ খ্রিস্টাব্দেঅগ্ন্যুৎপাত করতে শুরু করে ,

সেই সময়ে রোমের সম্রাট লিও তৃতীয় মনে করেন এটি হচ্ছে, মূর্তিপুজা বা যিশুর মূর্তির উপাসনা করার দরুন।  এর কারণে তিনি একটি অধ্যাদেশ জারি করেন তার সাম্রাজ্য জুড়ে যে, আজ হতে রোমান সাম্রাজ্যে যিশুর সকল ধরণের মূর্তিপুজাকে বাতিল বলে ঘোষণা করা হল আর সকল গির্জার মাঝে রক্ষিত ক্রুশ ব্যতিরেকে বাকি সকল ধরণের চিত্রকর্ম সরিয়ে ফেলতে নির্দেশ দেন পাদ্রীগণকে। এই বিষয়ের সরাসরি বিরোধিতা করেন তৎকালীন পোপ গ্রেগরি ২য়।

গ্রেগরির এই আইকোনো ক্লিজমকে প্রত্যাখান করার কথা জানতে পেরে রাভেন্নারগভর্নর বা এক্সার সেট তাৎক্ষনিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেন  তার এই বিরোধিতা করার অনেকগুলি কারণের মাঝে একটি ছিল যে, ইটালিরোমান সাম্রাজ্যের সূচনাকালহতেই ছিল চিত্রকর্ম ও শিল্পের অন্যতম সূতিকাগার।

সেখানে প্রাথমিক রোমান যুগ হতেই ব্যাসিলিকা সমূহ ছিল বিপুল পরিমাণে চিত্র সম্মলিত, আর তাদের মাঝে ছিল রোমান সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রধান প্রধান চিত্র ও ভাস্কর্য।একারণেই পোপ এর বিরোধিতা করেন, ও ৭২৫ এবং ৭২৬ সালে পর পর দুইবার তিনি আততায়ীর হাত থেকে বেঁচে যান।রাভেন্নারএক্সকারসেট

প্যাট্রিয়াকএক্সার্চ পল ও লিও ২য় উভয়কেই বাতিল ঘোষণা করেন, ও তাদের সাথে যুক্ত হন পেণ্টাপলিসের ডিউক তাদের সম্মিলিত সেনাবাহিনী এমনকি কন্সট্যান্টিনোপলের দিকে মার্চ করে একে অধিকার করে নতুন সম্রাটকে সিংহাসনে বসাতে চান, তবে তাদেরকে গ্রেগরি বাধাদান করেন।

৭২৭ সালে গ্রেগরি একটি সাইনোড বা যাজক সমাবেশ আনয়ন করেন। সেখানে তিনি লিও এর এডিক্টকে পুরোপুরি প্রত্যাখান করেন, এবং একটি ভাষণ প্রদান করেন , তার ভাষণ নিম্নে প্রদান করা হল।

“সম্রাট, আপনি মনে করেন আমরা দেওয়াল আর মূর্তির পূজা করি কিন্ত আমরা মোটেই তা করিনা, এই দেওয়াল অথবা মূর্তি আমাদের উপাস্য নয়, এটি আমাদের শুধুমাত্র তাদেরকে মনে করিয়ে দেয় যাদের আমরা উপাসনা করতে চাই, এটি আমাদের অনুপ্রেরণা প্রদান করে মাত্র। ইশ্বর ক্ষমা করুন আমরা মোটেই তাদের পূজা করিনা। আপনি এমন কথা বলেছেন যাতে ছোট শিশুগনও আপনাকে উপহাস করবে, আপনি একটি বিদ্যালয়ে গিয়ে আপনার এই মতবাদ প্রচার করেন, তবে আপনার দিকে তারাও তাদের শ্লেট ছুড়ে মারবে, গির্জার বিষয় আপনার বিবেচ্য নয় সেটি বিশপ  গণের বিবেচ্য, ধর্মপ্রচারকগণের রাজপুত্র সেন্ট পিটারের শপথ আমরা আপনার উপর প্রতিশোধ নিতে পারতাম কিন্ত আপনি নিজেই সেটি বেছে নিয়েছেন দেখে আমরা আর কিছুই করিনি, আপনি আমাদের জ্ঞানী ব্যক্তিগণের নিকট হতে যদি উপদেশ না নিতে পারতেন তবে মুর্খদের কাছ থেকেও নিতে পারতেন, আমাদের ভাই জার্মানদের কাছ থেকে আপনি যাদেরকে আপনি আপনার উপদেশদাতা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন তাদের নিকট হতে আপনি জানতে পারতেন, তবে আপনি তা করেননি”


East–West Schism
চিত্রঃক্যারোলিঞ্জিয়ান সাম্রাজ্য সুত্রঃWikimedia Commons

এই বিদ্রোহ আর পরবর্তীকালের সাইনডেরদরুণবাইজেন্টাইনপোপগণের সময়কাল সমাপ্ত হয়ে যায় ইউরোপে, এরপর থেকে পোপ নির্বাচিত হতে আর কোন রকমের অনুমতির দরকার পড়ত না কন্সট্যান্টিপলের কাছ থেকে, এই কারণে পোপ গণ নিজেরা নিজেদের মত করে নিয়োগ প্রদান ও কার্য ক্রম শুরু করেন যার ফলে প্যাপাসি ও প্যাট্রিয়ার্কি এর মাঝে একটি বিশাল ব্যবধানের সৃষ্টি হয়। তবে এখানে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের কোনরূপ নিয়ন্ত্রণ বিদ্যমান থাকেনা এই পাওয়ার ভ্যাকুয়ামের সুযোগ  নিয়ে লম্বার্ডগণ আরও দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে রাভেন্না অধিকার করেন ও রোম অধিকার করার পাঁয়তারা ভাজতে থাকেন, এই কারণে রোমানগণ প্যারিস নগরীর ভিত্তি স্থাপনকারীমেরোভিঞ্জিয়ানদের নিকট আর্জি পেশ করেন। তবে ইতোমধ্যে ফ্র্যাঙ্কগণ যারা সেই সময়ে ফ্রান্সের একটি সুবিশাল অংশকে নিজের করে নিয়েছিলেন, তারা মেরোভিঞ্জিয়ান হতে ক্যারোলিঞ্জিয়ান যুগে প্রবেশ করেন, ফ্র্যাঙ্কিশগণ নিজেরা ল্যাটিন খ্রিস্ট মতবাদ গ্রহণ করেন, অনেক আগে থেকেই, আর সেই সময়ে ক্যারোলিঞ্জিয়ান রাজা পেপিনদ্যাশর্ট পোপকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেন ও লম্বার্ডগণকেসেখান থেকে বিতাড়িত করেন, তবে তিনি রাভেন্না ও রোম বাইজেন্টাইন গণকে ফিরিয়ে না দিয়ে ঘোষণা করেন যে রোম হতে রাভেন্না পর্যন্ত এলাকা পোপের অধীনে থাকবে, এর ফলে জন্ম হয় প্যাপাল স্টেট বা দ্যা স্টেট অফ চার্চের, যার শাসক ছিলেন স্বয়ং পোপ।


East–West Schism
চিত্রঃপ্যাপাল স্টেটস সুত্রঃThe Map Archive

তবে এই রাজ্য ছিল মূলত ফ্র্যাঙ্কদের এক ধরণের ভ্যাসাল, এর সাথে সাথে পরবর্তী প্রায় ৭০ বছর যাবত রোম ও পোপ নিজেকে ক্যারোলিঞ্জিয়ানদের পক্ষে নিতে শুরু করেন, ফ্র্যাঙ্কদের প্রতি নিরাপত্তা ও শাসনের জন্য, ও অন্য দিকে পূর্ব রোমান সাম্রাজ্যের ধর্মীয় বিষয়ের মাঝে প্যাট্রিয়াক নিজের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে শুরু করেন ।

৭৯৭ সালে ক্ষমতায় আসেন লৌহমানবী খ্যাত সম্রাজ্ঞী আইরিন, যদিও তিনি রাজ অভিভাবক হিসেবে এর পূর্বেই কন্সট্যান্টাইনসপ্তমের সহিত সাম্রাজ্যকে শাসন করছিলেন, তবে তিনি ৭৯৭ সালে আপন সন্তানকে নির্বাসন দেন  আর এর পূর্বে তিনি নিজ সন্তানের চোখ উপড়ে ফেলেন!

যদিও আইরিন শক্তিশালী সম্রাজ্ঞী ছিলেন তবে একজন নারীর শাসনকে পোপ মোটেই মেনে নেননি, পোপ তখন খ্রিস্টবাদেরচ্যাম্পিয়ন ও প্যালাডিন খ্যাত শার্লামেনের নিকট আরও অধিক হারে নির্ভরশীল হয়ে পড়েন ও খ্রিস্টিয় পৃথিবীর বিভাজন আরও অধিক হতে শুরু করে।

শার্লামেন স্যাক্সন ও অ্যাভার দুই প্যাগান গোত্রকে খ্রিস্টধর্ম মতবাদ গ্রহণ করতে বাধ্য করেন, ও এর ফলে পোপের প্রভাব আরও বৃদ্ধি করেন, যেহেতু পোপের নিকট আর কোন সম্রাট ছিলেন না সেই সময়ে এই কারণে তিনি শার্লামেনকেইরোমান  সম্রাট মানতে শুরু করেন, তার  রাজ্য প্যাপাল স্টেট হুমকির মুখে পড়তে গেলে শার্লামেন তাকে রক্ষা করেন ও পেপিনের ন্যায় তাকেও রাজ্য প্রদান করেন, ও তার স্বাধীনতা পুনঃবহাল করেন, এই কারণে পোপ তাকে উপাধি দান করেন তার রাজ্যভিষেকের মাধ্যমে “হলিরোমানএম্পেরর” হিসেবে, যার উপাধি কাইজার বিংশ শতক পর্যন্ত জার্মানিতে বিদ্যমান থাকবে এবং এর সাথে সাথেশার্লামেনের উপাধি হয় অগাস্টাস যা ছিল প্রথম রোমান সম্রাটের ন্যায়।


East–West Schism
চিত্রঃহলিরোমান এম্পায়ার সুত্রঃwikimedia commons.

আইরিন এতে অত্যন্ত রাগান্বিত হন

তবে আইরিন তেমন কিছু করতে পারেননি এই অপমানের বিরুদ্ধে, কেননা তাকে তখন লড়তে হচ্ছিল তুর্কী ও বুল্গেরিয়ান দস্যুদের বিপক্ষে,  তিনি শার্লামেনের সাথে ম্যারেজএলায়েন্স তৈরি করার চেষ্টা করেন, তবে তার এই প্রচেষ্টা আয়েটিয়াস নামের তার সবথেকে বিশ্বস্ত উপদেষ্টা, যিনি জাতে ছিলেন একজন ব্রিহন্নলা ব্যর্থ করে দেন। পরবর্তীতে আয়েটিয়াসের কারণে আইরিনক্ষমতাচ্যুত হন, ও এরপরে তিনি নির্বাসিত হন লেসবসে ৮০২ এ।


East–West Schism
চিত্রঃআইরিনের সময়ের কন্সটান্টিনোপল; সুত্রঃhttps://istanbulclues.com

পরবর্তীকালে রোমান সাম্রাজ্যের শাসক হন নিকোফেরস, তবে তিনি প্যাপাসির উপর নিজের কন্ট্রোল তৈরি করার কোনরকমের প্রচেষ্টা করেননাই। এরফলে সেই ৩৯৫ এরপরে ইউরোপে প্রথমবারের মত দুইজনরোমান সম্রাট  ক্ষমতায় ছিলেন, আর যেমন ১০০ বছর পূর্বে প্যাগানিজম ও খ্রিস্টবাদ একে অপরের সাথে মুখোমুখি হয়েছিল, এবার মুখোমুখি হয় দুই খ্রিস্টবাদ, ল্যাটিন ও গ্রীক খ্রিস্টবাদ।

এর সাথে সাথেল্যটিন এবং গ্রীক খ্রিস্টবাদের মধ্যে বেশ কিছু তফাত তৈরি হতে থাকে, যেমন হলিকমিনিউনের সময় অর্থোডক্সগণইস্টব্রেড বা  ফুলানো রুটি খেতেন, যেখানে ক্যাথলিকগণ হাতে সেকা রুটি খেতেন।  তবে এরপরেরসবথেকে  ফাটলটি তৈরি হয়, ফোটিয়ানকন্ট্রোভার্সি বা ফোটিয়ান বিতর্ক নিয়ে, এখানে সবথেকে বড় দুইটি বিতর্কের বিষয় ছিল যে বাইজেন্টাইনরোমান সম্রাট প্যাট্রিয়াক নিয়োগ করার ক্ষেত্রে পোপের অনুমতি নিবেন নাকি নিবেন না, এর সাথে সাথেবুলগেরিয়াতে যেহেতু গ্রীক ও ল্যাটিন উভয় ধরণের চার্চ প্রায় একই সংখ্যক ছিল সেকারণে এখানে কোন ধরণের চার্চ আধিপত্য বিস্তার করবে এটা নিয়ে গোলযোগ বেধে যায়।

এর সাথে যুক্ত হয় আরও একটি বিতর্ক, আর সেটি ছিল যে যিশুর সৃষ্টিতে কি গডদ্যা সনের ভুমিকা ছিল নাকি ছিল না। এই নিয়ে ক্যাথলিকগণ ও অর্থোডক্স গণের মাঝে দীর্ঘ বিতর্ক হয়, আর এর পর থেকে শুধুমাত্র কিছু নথিপত্রে স্বাক্ষর করা ছাড়া বাইজেন্টাইন সম্রাটের আর কোন কাজ থাকেনাপ্যাপালস্টেটের নিকট।

আর প্যাট্রিয়াকের ক্ষমতা পোপের থেকে পৃথক এটা পোপকে মেনে নিতে বাধ্য করা হয়।

তবে ১০৫৩ সালে পোপ একটি সুযোগ পেয়ে যান এই অপমানের প্রতিশোধ নিতে। আর এরফলেইস্কিজম বা বিভাজনের ওপর শেষ পেরেকটি পড়ে, এর শেষ অধ্যায় রচিত হয়।

১০৫৩ সালে ইতালির দক্ষিণাঞ্চল যেখানে তখনও বাইজেন্টাইন শাসন বিদ্যমান ছিল, সেটিকে লম্বার্ডগণ দখল করে নেয়। আর এরফলেইটালির উপর বাইজেন্টাইন আধিপত্য চিরতরে সমাপ্ত হয়ে যায়, আর ফোটিয়ানকন্ট্রোভর্সির ফলে ল্যাটিন চার্চের যে অপমান হয়েছিল, সেটা পোপ প্রতিশোধ নেন এটা বলে যে ইটালিতে কোন গ্রীক ভাবধারার চার্চ থাকতে পারবেনা, সমস্ত চার্চকে হয় ল্যাটিন ভাবধারা বা ক্যাথলিক হতে হবে আর নয়ত তাদেরকে বন্ধ করে দিতে হবে।

প্যাট্রিয়াক এই কথাতে প্রচন্ড রাগান্বিত হয়ে ঘোষণা করেন যে এশিয়া মাইনর ও গ্রীসে অবস্থানরত সকল চার্চকে গ্রীক বা ইস্টার্ন অর্থোডক্স হয়ে যেতে হবে।

আর এরফলে পোপ কার্ডিনালহুম্বার্ট কে প্রেরণ করেন কন্সট্যান্টিনোপলেহাজিয়াসফিয়াতে, তিনি গিয়ে সেখানে তার এক্সকমিউনিকেশান বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার ডিক্রি প্রদর্শন করেন, এরফলে সকল ল্যাটিন চার্চের নিকট ইস্টার্ন অর্থোডক্স চার্চ ধর্মবিরোধী (Heretic) হয়ে যায়। আর এর প্রতিবাদে সম্রাট কন্সট্যান্টাইন নবম ও প্যাট্রিয়াকউভয়েই ল্যাটিন চার্চকে এক্সকমিউনিকেট করেন।

এরফলে রচিত হয় গ্রিটস্কিজম বা খ্রিস্টান ধর্মের বিভক্তির এক উপাখ্যান।

তবে কমন পিপল বা সাধারণ মানুষ এর থেকে দুরেই থাকতেন, তাদের দৈনন্দিন জীবনে এর তেমন কোন প্রভাব পড়ত না,

তবে কন্সট্যান্টিনোপলেদ্যামোস্টসেরিন রিপাব্লিক অফ ভেনিস থেকে আগত একদল ধনী ব্যবসায়ী ছিলেন, যারা কন্সট্যান্টিনোপল(পরবর্তী ইস্তাম্বুল) এ নিজেদের একটি কোয়ার্টার বজায় রাখতেন ও ইস্টার্ন অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ধনরত্নইটালির ভেনিসে নিয়ে যেতেন। এরফলে জনতা ক্ষেপে উঠতে শুরু করে, ও নিজেদের হাতে সমস্ত ব্যাবসার নিয়ন্ত্রণ নেবার জন্য তারা ১১৮২ সালে ল্যাটিন কোয়ার্টারে দাঙ্গার সময় সকল ধনী ইটালিয়ান ব্যবসায়ীদের হত্যা করেন, এর জবাব স্বরূপ এনরিকোডোনাল্ডোর পরিকল্পনা ও একজন নির্বাসিতবাইজেন্টাইনরাজপুত্রের ষড়যন্ত্রের ফলে ১২০৪ সালে মিশরের দিকে ধাবিত একটি ক্রুসেডার সেনাবাহিনী কন্সট্যান্টিপোল অধিকার করেন, ও সেই রাজপুত্রকে ক্ষমতায় বসান, তবে তিনি তাদের প্রতিশ্রুতি মোতাবেক অর্থ দিতে না পারার কারণে তাদের মধ্যে প্রচন্ড যুদ্ধ হয়। ও ক্রুসেডার সেনাবাহিনী যেন সেই ১১৮২ এর প্রতিশোধ নিতে গিয়েই সমগ্র কন্সট্যান্টিপোলকে ধ্বংস করে দেন, এটা বলা হয় যে এমন কোন বাড়ি ছিলনা যা তারা লুট করেননি, এমন কোন নারী ছিলনা শহরের মাঝে যাদের তারা ধর্ষণ করেননি। তিনদিন যাবত এই ভয়ানক কাজ করার পরে তারা বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে নিজের মাঝে ভাগ করে নেন।


East–West Schism
চিত্রঃ১২০৪ সালের কন্সট্যান্টিপোলের লুণ্ঠন, সুত্রঃWikimedia Commons

আর এরফলেই যে দুইটি অংশ ছিল শুধুমাত্র বিভক্ত, তারা একে অপরকে দেখতে শুরু করে প্রবল শত্রু হিসেব। আমরা একে অপরের ইতিহাস কে আসলেই একে অপরকে ছোট ছোট কারণে যে ধ্বংস করে দেই, এটা প্রমান ছিল অন্যতম ভাবে দ্যা গ্রেট স্কিজম, যা আমাদের মাঝে জন্ম দেয় ছোট বড় প্রায় ৪৩ টি যুদ্ধের। তবে সেটি অন্য কোনদিনের জন্য। আজকের জন্য এতটুকুই।

         

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

You may use these HTML tags and attributes:

<a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>