| 2 মার্চ 2024
Categories
গীতরঙ্গ

নাট্যকারের কলমে নাট্যদলের ইতিহাস । অভিজিৎ বিশ্বাস

আনুমানিক পঠনকাল: 3 মিনিট

নাট্যকারপরিচালকঅভিনেতা কুন্তল মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় দীর্ঘদিনের। একসময় তাঁর বাড়িতে আমার নিয়মিত যাতায়াত ছিল। মাঝে মাঝে আড্ডাও হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নিয়মিত যোগাযোগ খানিকটা কমেছে। কিন্তু বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠানে আজও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ হয়, কথা হয় তো বটেই। দ্বিধাহীন চিত্তে বলি, যে কোনো একাডেমিক বিষয়েই গভীর জ্ঞানের পরিচয় তাঁর প্রতি প্রতিনিয়ত আমাকে শ্রদ্ধাবনত করে রাখে। সেই সীমিত পরিসরের আড্ডাগুলোতে আমি ঋদ্ধ হতাম, তাঁর বিভিন্ন নাট্যরচনার গল্প শুনতাম, নাট্য প্রযোজনার নেপথ্য কাহিনিও। অনেকের মতে যেটিসংলাপ কোলকাতা শ্রেষ্ঠ প্রযোজনা, সেইশূদ্রায়ণরচনার সময়ে অনেকগুলো দিন তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। দেখেছি, ওই নাটকটি নিয়ে তিনি কী ভীষণ আবেগাপ্লুত থাকতেন। বলাবাহুল্য নাটকটি রচনার জন্য তাঁকে প্রচুর বই পড়তে হয়েছিল, বিশেষ করে আর.কে.নারায়ণ অনূদিত কম্বনের রামায়ণ। সেখান থেকে যখন অপর এক রামায়ণের সন্ধান পাচ্ছেন, যে রামায়ণ শুধুমাত্র রামরাবণসীতার রাজকাহিনি নয়, আর্যঅনার্যের গভীরতর সংঘাতের বাস্তবতাও বটে, তিনি তখন প্রায়ই আমাকে সেই রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের অচেনা ব্যাখ্যা শোনাতেন। আমি নিশ্চিত, আমারই মতো আরও বেশ কিছু জনকে।

এখন পিছু তাকিয়ে মনে হয়, সেই প্রতিক্রিয়াআবেগ শুধুমাত্রই একজন সৃজকের সৃষ্টিশীলতার জন্য ছিল না, তাঁর নিজের মনের মধ্যেও এই বিশ্বাস সঞ্চারিত হচ্ছিল, বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের ইতিহাসে এই নাটক একটা জায়গা করে নেবেই। সেই অর্জিত স্থান শুধুমাত্র তার একাডেমিক ভিত্তি তথা নৃতাত্বিকসামাজিকরাজনৈতিক ব্যাখ্যার কারণে নয়, নাট্যপ্রযোজনার বিশালত্বের কারণেও। মঞ্চের উপর অন্তত চল্লিশ জন অভিনেতাঅভিনেত্রী, অসাধারণ সব কোরিওগ্রাফি, সংগীতআলোপোশাক পরিকল্পনা, সবেতেই যেন এক চূড়ান্ত পেশাদারিত্বের ছোঁয়া অথচ সবই যেন একটি সুতোয় বাঁধা, সে নাটক যারা দেখেছেন নিশ্চয়ই মনে করতে পারবেন। পাশাপাশিশূদ্রায়ণ’, ‘কালচক্র’ বা সংলাপ কলকাতার বর্তমান প্রযোজনাধর্মায়ুধ’ দেখলে বা পড়লে বোঝা যায় নাট্যকারের অধ্যয়নের বিস্তৃতি কতখানি। ইতিহাস তাঁর কলমে এক অন্যমাত্রায় কথা বলে ওঠে।    

কিন্তু শুধু তো শূদ্রায়ণ নয়, সংলাপ কোলকাতার আরও বেশ কিছু প্রযোজনা একই সঙ্গে সমালোচকের প্রশংসাধন্য এবং দর্শক নন্দিত হয়েছে। কয়েকটির নাম উল্লেখ করি–‘ঘরে ফেরা‘, ‘স্বপ্ন নিয়ে‘, ‘হায় রাম‘,’অস্তরাগ‘, ‘অমল সিনড্রোমইত্যাদি। টিপু সুলতানথেকে শুরু করে শেষতম প্রযোজনাপঞ্চনারীর অগ্নিবীণাপর্যন্তসংলাপ’ প্রযোজিত অধিকাংশ মঞ্চসফল নাটকেরই আমি সাক্ষী। নাট্যদলটির কোনো সদস্যের অবদানকেই এতটুকু স্পর্শ না করেও বলা চলে, কুন্তল মুখোপাধ্যায় এবং সংলাপ কোলকাতা একপ্রকার প্রায় অবিভাজ্য। ডায়েরির ঢঙে লেখা এই বইটি নিঃসন্দেহে কুন্তল মুখোপাধ্যায়ের আত্মজীবনী নয়। যতদূর সম্ভব নিজেকে আড়ালে রেখে বলতে চেয়েছেন, শোনাতে চেয়েছেনসংলাপ কোলকাতা’-র কথাই। তবু ইতিহাসের কোনো বাঁকেই তো সমষ্টি, ব্যক্তিবিশেষ ছাড়া উত্তীর্ণ হয় না। বাংলা গ্রুপ থিয়েটার তো বটেই। এই উদাহরণ তো কিছু কম নেই যে ব্যক্তিকেন্দ্রিক গ্রুপ থিয়েটারের দল অনেক সময়েই হারিয়ে যায় তার গঠনগত শিথিলতার কারণে, দলের প্রধান ব্যক্তির প্রতি অনান্য সদস্যদের কেন্দ্রাভিমুখী প্রবণতায়। সংলাপ কোলকাতা তার ব্যতিক্রম হতে পারবে কিনা সময়ই তার উত্তর দেবে। যেহেতু আমাদের পশ্চিমবঙ্গের থিয়েটার অধিকাংশ ক্ষেত্রেইফটোগ্রাফডনয়, যে ভিডিওতে প্রযোজনাকে ধরে রাখা হয় তার মানও খুব একটা আশানুরূপ হয় না, এমন কি যেখানে বেশিরভাগ দলডক্যুমেন্টেশন‘-এই ব্যাপারটাতেই উৎসাহী নয়, সেই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে এই ধরণের চর্চা খুব প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। আর নাট্যদল ‘সংলাপ কোলকাতা’-র ইতিহাস লেখার জন্য তিনিই যে যোগ্যতম ব্যক্তি, তা কোনো বলার অপেক্ষা রাখে না।

নাট্যকার কুন্তল মুখোপাধ্যায়ের ছোটবড় সব মিলিয়ে শতাধিক নাটকের রচয়িতা, এছাড়াও অজস্র প্রবন্ধ তাঁর কলম থেকে উৎসারিত হয়েছে। ঝুলিতে রয়েছে ভারত বাংলাদেশের নাট্যকর্মীদের যৌথ প্রযোজনায় নির্মিতফুলরানী, আমি টিয়া মতো মঞ্চসফল প্রযোজনাও। বিভিন্ন বিষয়ের একাধিক বার তিনি পশ্চিমবঙ্গ নাট্য একাডেমির পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছেন। পেশাগত জীবনে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের অধ্যাপক মানুষটি নিজের কলমে বলতে চেয়েছেন দলেরই কথা, কথা আগেও উল্লেখ করেছি। খুব সামান্য পরিসরে কখনো কখনো উঁকি দিয়ে গেছেন ব্যক্তি কুন্তল মুখোপাধ্যায়ও। তবে তার পুরোটাই প্রায় থিয়েটার সংক্রান্ত। সংলাপ কোলকাতা নাট্যদলটির সম্পর্কে ৭২ পাতার এই বইটি একটি দলিল বিশেষ। নাট্য প্রযোজনার প্রস্তুতি এবং অভিনয় শেষে তার প্রতিক্রিয়া, মূলত এগুলিই আলোচিত হয়েছে অনাড়ম্বর ভাষায়, যথাসম্ভব অতিরিক্ত বাহুল্য এবং আবেগকে দূরে রেখে। আবার তারই মাঝখানে কখনো কখনো ঠিকরে উঠেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের আলো। সেই আলোর নাম কখনো বা কেয়া চক্রবর্তী, কখনো উৎপল দত্ত কিংবা তাপস সেন, মুরারি রায়চৌধুরী, শেখর গাঙ্গুলি, অরুণ মুখোপাধ্যায় এবং আরো বেশ কিছুজন। বারে বারেই উচ্চারিত হয়েছে বিভাস চক্রবর্তী, অশোক মুখোপাধ্যায়, বিষ্ণু বসু, সংগ্রামজিৎ সেনগুপ্ত, বিতানবিন্দু বন্দোপাধ্যায়, মায়া ঘোষ, সীমা মুখোপাধ্যায়, সুরঞ্জনা দাশগুপ্ত, রবীন্দ্রভারতীর একগুচ্ছ তরুণ অভিনেতাঅভিনেত্রীসহ শতাধিক মানুষের কথা, যাঁদের একটা বড় অংশ থেকে যান মঞ্চের নেপথ্যেই, মঞ্চ তৈরি করা থেকে শুরু করে রূপসজ্জা পর্যন্তএদের সবারই নাম উচ্চারিত হয়েছে স্নেহে শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়।

গুরুপদ মিত্রের প্রচ্ছদ ছিমছাম, ভিতরের লেখ্য ভাষ্যের সঙ্গে তাল মিলিয়েই। কিন্তু লকডাউনের সময় প্রকাশিত বলেই হয়ত বেশ কিছু মুদ্রণপ্রমাদ চোখে লাগে, পরবর্তী সংস্করণে এই ভুলগুলি থাকবে না বলেই বিশ্বাস রাখি। বইটি পড়তে পড়তে একটা ভালোলাগা জন্মায়। আশা রাখি, সেই ভালোলাগা লেখকের কলমের পাশাপাশি তাঁর দলের প্রতি অমনোযোগী দর্শক এবং পাঠককেও আগ্রহী করে তুলবে।  প্রযোজনার ব্যয়, বিজ্ঞাপনের খরচ, হলের সমস্যা ইত্যাদি নানা যাঁতাকলে পড়ে থিয়েটারের চরিত্রও ক্রমশ বদলে যাচ্ছে। সেইসময়ে দাঁড়িয়ে বাংলা প্রসেনিয়াম থিয়েটারের ইতিহাসকে পিছনে ফিরে দেখতে এই ধরণের বইয়ের প্রয়োজন সবসময়েই অনুভূত হবে।                    

সংলাপ কথা, কথা সংলাপ: কুন্তল মুখোপাধ্যায়। ১৫০ টাকা।

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত