দ্বীপের শেষ ট্রলার

 

ঘাটে পা দিয়েই অবিরত রায় দেখলেন চারদিকে নিঝুম নিস্তব্ধতা। এই সুনসান নীরবতা দেখে বোঝার উপায় নেই এখানে কিছুক্ষণ আগেও মানুষের কল কোলাহলে মুখর ছিল। চিৎকার চেঁচামেচি, ট্রলারে ওঠার জন্য ভিড়বাট্টা, তাড়াহুড়ো, ব্যাগ-বোঁচকায় টানাটানি, মাঝির সহযোগীদের হাঁকডাক। এখন খাঁ খাঁ করছে চারদিক। যেন কোনকালে এখানে মানুষের কোনো পা পড়েনি। ঘাটের অদূরে এই নির্জনতা সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কেবল টিনের ছাপড়ার একটি খাবার হোটেল। সেখানেও এখন কেউ নেই। মাছি মারা কেরানীর মতো বসে আছেন ম্যানেজার। দ্বীপের উদ্দেশ্যে রোজ শেষ ট্রলারটি ছেড়ে যায় বিকেল পাঁচটায়। সরকারের একটা শিক্ষা-প্রকল্পে কাজ করেন অবিরত রায়। বাবা-মা অবশ্য অবি বলেই ডাকেন। অবি দিনভর লক্ষ্মীপুর জেলার রামগতি-আলেকজান্ডার এলাকায় স্কুল পরিদর্শন শেষে পার্শ্ববর্তী নোয়াখালীর দক্ষিণ স্থলসীমান্ত চেয়ারম্যান ঘাটে ঠিক পাঁচটায় পৌঁছাতে পারেননি। দেশের বিশৃঙ্খল সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় তাই হওয়ার কথা। অবিরত ভাবলেন, অদৃষ্টের হাতে নিজেকে সমর্পণ করা ছাড়া এ মুহুর্তে আর তেমন কিছু করার নেই। দেশে এখন সময়মত কোথাও পৌঁছে যাওয়াই অস্বাভাবিক হয়ে দাঁড়িয়েছে। সামাজিক অনুষ্ঠানাদি, সভা সমাবেশগুলোও এজন্য কোনোদিন সময়মতো শুরু হয় না। সময় সকাল দশটা নির্ধারিত থাকলে দুপুর বারোটা বাজে। তিনটার অনুষ্ঠান শুরু হয় পাঁচটায়। অবির নিজেরও আজ এই ঘাটে পৌঁছতে পৌঁছতে ঘন্টাখানেকের বেশি দেরি। নির্ধারিত সময়েরও আধ ঘন্টা বেশি দেরী করে নোয়াখালীর সর্বদক্ষিণে হাতিয়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে চেয়ারম্যান ঘাট থেকে শেষ ট্রলারটি ছেড়ে যাওয়ার পর ঘাটে আর যাত্রী-সাধারণ কেউ অবশিষ্ট নেই।

 

ঘাটে দাঁড়ালে চোখে পড়ে দক্ষিণ-পূর্বে জেগে ওঠা চরে কিছু জায়-জঙ্গল। তারপর অকুল দরিয়া। অথৈ জল। পল্টুনে পরের দিনের যাত্রী পারাপারের সরকারি সি ট্রাকটি বাঁধা। রক্তিম সূর্য ততক্ষণে দিগন্তে বিলীন। সূর্যের শেষ রোশনাইটুকু মিলিয়ে ধীরে ধীরে অন্ধকার নামছে। ঘাটের অনতিদূরের চরে ভাসমান মানুষের কিছু নতুন বসতি চোখে পড়ে। চোখে পড়ে দূরে গোরু চরিয়ে মন্দ মন্থরে, সন্ধ্যা-তাড়ায় ঘরে ফিরতে উদাসী এক রাখাল বালকের আবছায়া। চোখে পড়ে বিস্তীর্ণ আকাশে কিছু সমুদ্রগামী পাখির ওড়াউড়ি। তীরের দিকে ক্রমাগত জলের ভাঙন। এমন মৌন মগ্ন আকাশ সমুদ্রের কিনার ছাড়া আর কোথাও সহসা চোখে পড়ে না। শুধু এমন ঘোরলাগা এক সন্ধ্যা দেখার জন্যেও এখানে ছুটে আসা যায়। কিন্তু ছক বাঁধা জীবন সব সৌন্দর্য উপভোগের অবসর দেয় না। বিরল জনবসতি বলে চোখে পড়ে নিঝুম নিস্তব্ধতা, হৃদি অনুভব; অন্ধকারে মেঘে মেঘে মিশে যাচ্ছে আর সব।

 

অন্ধকার নামছে বিলম্বে ঘাটে পৌঁছানো অবিরত রায়ের চোখে মুখেও। অচিন জায়গা। সন্ধ্যারাগের রোমাঞ্চ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। মাঝ দরিয়া থেকে ভেসে আসা ঢেউয়ের গন্তব্য কিনার থাকলেও অবির মনে হচ্ছে এ মুহুর্তে কোনো কূল কিনার নেই। চারিদিকে অথৈ জল। একাই হাবুডুবু খাওয়া। কিংকর্তব্যবিমূঢ়। ফিরে যাওয়ারও কোনো সুযোগ নেই। পূর্ব-নির্ধারিত কর্মকর্তব্য সম্পাদনে যেতেই হবে।

 

অবির কাছে সম্ভাব্য বিকল্পের একটি ঘাটের অদূরেই দু একটি নতুন থাকবার হোটেল তৈরি হয়েছে। সেই পরিশোধযোগ্য মুসাফিরখানায় আশ্রয় নেওয়া। আর বিকল্প অলৌকিক কিছুর অপেক্ষা করা। প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া তৃণখণ্ডের জন্য মানুষ হাত বাড়ায়। এমন গোপন আশা নিয়েই বিস্তীর্ণ নদীর বুকে নামা অন্ধকারের চাদরে চোখ পড়ে অবির। নদীর কিনার ঘেঁষে খাবারের সেই হোটেলটি। ঘাটে পোঁছে প্রথম দেখা টিনের ছাপড়ার সেই ঘর। পারাপারের সময় যাত্রীরা এখানে জিরোয়। কেউ হালকা চা-নাস্তা বা খাওয়া-দাওয়া সারে। জোয়ার-ভাটার নদীগুলোর কিনার খাড়া এবং সোজা ঢালু থাকে, বিশেষ করে ঘাটগুলো যেখানে। কিছু কাঠ আর বাঁশের উপর হোটেলটির মূল কাঠামো দাঁড় করানো। জলের কিনার ঘেষে হঠাৎ ঘরটির দিকে চোখ গেলে একটু ভয় লাগে। যদিও খুব মজবুত স্থাপনা। প্রায়ই ঝড়-ঝাপ্টার সঙ্গে যুদ্ধ করে টিকে আছে উপকূলে চিরকালের সংগ্রামী মানুষের মতো।

 

হোটেলের ক্যাশ বাক্সের টেবিল চেয়ারে বসে থাকা বয়োবৃদ্ধ ম্যানেজারের চেহারাও সংগ্রামী মানুষেরই অবয়ব। ক্লান্তিহীন নিরবিচ্ছিন্ন জীবন সংগ্রামেরই সাক্ষ্য দেয়। দেখলে মনে হয় বয়েসী বটবৃক্ষের অব্যক্ত আত্মজীবনী নিয়ে বসে আছেন বহু বহুকাল। চেহারায় প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করার চিহ্ন থাকলেও মানুষটা রূঢ় নয়। ভেতরটা অন্যরকম, আন্তরিক। মানুষই একমাত্র প্রাণী যার কিনা বাহির দেখে ভেতর চেনা যায় না। হিংস্র প্রাণীকে দেখলে চেনা যায়। কিন্তু মানুষ বড় আশ্চর্য আর অদ্ভূত। একে অপরকে আলিঙ্গন করতে এসেও বুকে ছুরি চালিয়ে দেয় অবলীলায়। কথা বলে অবশ্য টের পাওয়া গেল ম্যানেজার তেমন লোক নন। পারাবারের নিরুপায় যাত্রী দেখে অভয় দিয়ে ভেতরে বসতে বললেন। তাঁর কাছে এমন অবলম্বনহীন যাত্রীর দেখা এই প্রথম নয়। বুঝা গেল প্রায়ই এমন নিরালম্ব মানুষের সাক্ষাৎ তিনি পান। অবি কাঁধের ব্যাগ, ল্যাপটপের ব্যাগ সামনের টেবিলে নামিয়ে পাতানো লম্বা বেঞ্চিতে বসে টের পান গায়ে রাজ্যের ধুলোবালির আঁচড়। প্লাস্টিকের লাল জগ থেকে মুখে পানির ঝাঁপটা দিতে দিতে এক কাপের বদলে দুই কাপ চায়ের অর্ডার দেন। এইসব ছোট্ট কাপের চায়ে ঠিক পোষায় না। বাসায় মগ ভর্তি চা খেয়ে অভ্যস্ত। তা ছাড়া, ক্লান্তি দূর করতে গরম চা এ মুহুর্তে বড় দাওয়াই।

 

শুধু নদীর বুকে ঘনিয়ে ঘনিয়ে আসা বেশ জমাট অন্ধকারে নয়, জীবনের দীর্ঘ যাত্রা পথে নানা সময় ও সংকটে এমন অসহায় ও নিঃসঙ্গ বোধ প্রকট হয়ে ওঠে। উদ্বিগ্ন এলোমেলো ভাবনার মাঝেই দোকানের বেয়ারা চা দিয়ে যায়। গরম ধোঁয়া উড়ছে। ধোঁয়া মিলিয়েও যাচ্ছে অদৃশ্য হাওয়ায়। জীবনে আশা-নিরাশার দোলাচলের মতোই নিমিষে। এমন ভাবনার ফাঁকেই হোটেলটিতে আরেকজন ত্রস্ত যাত্রীর দেখা মিলল। অচিন হলেও অভিন্ন দূর গন্তব্যের যাত্রীদের পরস্পরের সঙ্গে দেখা হলে, মুখের আগে চোখই যেন কথা বলে ওঠে। কর্মজীবী মানুষ। ঢাকায় থাকেন। পাশের চেয়ারে বসেই পারাপারের একটা ফিকির আলোচনার পাশাপাশি নিজের জীবনেরও গল্পের ঝাঁপি খুলে বসলেন সাবলীল ভঙ্গিতে। এইসব জীবন খুব ব্যক্তিগত নয়। সংরক্ষিত নয়। যেন চিরকাল সমষ্টির। একটি কোম্পানীতে মার্কেটিংয়ে চাকরি। বাড়িতে অসুস্থ বৃদ্ধ বাবা ছাড়াও বউ আছে। দুটি বাচ্চা। ছয় বছর বয়েসী মেয়েটা এ বছর স্কুলে ভর্তি হলো। ছেলের বয়স দুই। দিনভর ঘরময় ঘুরে ঘুরে বাবা বাবা ডাকে। বাবাকে তো আর কাছে পায় না। বাড়িতে তাঁর মায়া পড়ে থাকে। সুযোগ পেলেই তাই ছুটে যেতে ইচ্ছে করে। বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি। উপরি আয় রোজগার নেই। ও দিয়ে সবাইকে নিয়ে শহরে থাকা যায় না। সহজে ছুটি-ছাটাও নেই। আজ বৃহস্পতিবার বলে অফিস থেকে শুক্রবারের সঙ্গে বাড়তি আরও একদিনের দিনের ছুটি নিয়ে আসা। পথে দেরী হয়ে যাওয়ায় এই দশা। তবে একই গন্তব্যের আরেকজনকে পেয়ে ধড়ে একটু প্রাণ এলো। যেন অন্ধকার সুড়ঙ্গে ক্ষীণ আশার আলো।

 

পারাপারের শলা-পরামর্শ চলছে। এমন সময় আরেকজন চল্লিশোর্ধ লোক হুড়মোড় করে সঙ্গে একজন মহিলাসহ হাজির হলেন। বিপাকে পড়ে তারাও এ সন্ধ্যারাতে ঘাটে। আলাপ পরিচয়ে দেরি হলো না। সঙ্গে থাকা নারীর বাবা মানে ভদ্রলোকের শ্বশুর আজ আসরের নামাজের পরে হঠাৎ করে মারা গেছেন। বয়স হয়েছিল বেশ। কিছুদিন ধরে বার্ধক্যজনিত জটিল রোগ শোকে ভুগছিলেন। আগামীকাল সকাল সকাল দাফন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছেন সঙ্গে থাকা ভদ্রমহিলা অর্থাৎ আগন্তুকের স্ত্রী। উদভ্রান্ত চেহারা দেখে বুঝাই যাচ্ছে খবরটা শোনার পর থেকেই অনবরত ঝরছে চোখের জল। সঙ্গী পুরুষের সঙ্গে বয়সের বেশ ফারাক আছে। দেখলে বুঝা যায় খুব বেশি আগে বিয়ে হয়নি। সদ্য ঘর ছেড়ে আসা মেয়েদের মনটা বাবা বাড়িতেই পড়ে থাকে। তা ছাড়া, মেয়েরা সবসময় বাবাকে একটু বেশি ভালোবাসে কিনা। বাবারা হন খররৌদ্রে বটবৃক্ষের ছায়া। চৈত্রের রোদে হাঁসফাঁস করা প্রাণে মৃদুমন্দ বাতাসের মত প্রশান্তির ঢেউ। আবাল্য সে ছায়ার সংস্পর্শ থেকে বড় হয় মেয়েরা। সে ছায়া হঠাৎ সরে গেলে আর পাওয়া যায় না। এই বাবাও নিশ্চয়ই এমন কেউ ছিলেন। যে-ভাবেই হোক দ্বীপে সন্ধ্যারাতে এই শোকবিহ্বল যাত্রীদেরও পৌঁছানোর তাড়া আছে, অন্তত প্রাথমিক আলাপে এইটুকু আন্দাজ করা গেল।

 

দেরি হয়ে যাচ্ছে, রাতটুকু লাশের পাশে দোয়া-দুরুদ পড়ে কাটাবেন বলে যৌথ আহাজারির সময় হোটেলটিতে আরেক তরুণও এসে হাজির। বয়স বিশের একটু বেশি হবে। তার উপস্থিতিও ঘাটের অন্ধকারে কিছুটা আলোর ঝলকানি। দরিয়া পাড়ি দেবার সম্ভাবনা বাড়ছে। কিন্তু কিসে কিভাবে পার হবেন এখনও অনিশ্চিত। উপায় নিশ্চয়ই একটা বের হবে। তবে অকস্মাৎ দরিয়া পারে যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে যাবে অবি ভাবতেই পারেন নি। কিন্তু তরুণের ছুটোছুটি দেখে বেশ অস্থির মনে হলো। কার সঙ্গে যেন বারাবার ফোনে কথা বলছে। হয়ত ঘাটের অবস্থা স্বজনদের জানাচ্ছিল। তাকে বেশ ভীতসন্ত্রস্ত মনে হলো এবং কিছুক্ষণ এদিক ওদিক করে জানাল এই অন্ধকার রাত্রিতে সে দরিয়া পাড়ি দেবে না। বাসার মানুষের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়েছে। রাত বিরেতে সবাই যেতে মানা করছে। সে ফিরে যাবে। সব তরুণ আসলে তরুণ নয়। বার্ধ্যকের জরা ও ভীতি থাকে কারও কারও উত্থাল যৌবনেও। কিন্তু অন্য সবাই একটা উপায় খুঁজে বের করতে মরিয়া। হোটেলের ম্যানেজার সবার কথাবার্তা শুনে শেষমেশ উপায় একটা অবশ্য বাতলে দিলেন। মাছ ধরা ট্রলার ভাড়া করে পাড়ি দেওয়া ছাড়া এ মুহুর্তে আর কোনো উপায় নাই। মাঝেমধ্যেই অগতির তিনি এভাবেই গতি করে দেন। হোটেলের বেয়ারা ছোকরাটিকে কাছাকাছি এক মাঝির নাম ধরে ট্রলারের খোঁজ খবর নিতে পাঠালেন। অবিরত উঠে জগ থেকে গ্লাসে জল ঢাললেন। এমন অস্থিরতার সময় গলা বারবার শুকিয়ে আসে, বড্ড তৃষ্ণা পায়।

 

ঘাটে উপস্থিত সবাই পথের বিড়ম্বনার শিকার। সময়ের অসহায় মজদুর। দুনিয়ার সকল মজদুর এক হও স্লোগানের মত এদেরও এক হতে সময় লাগেনি। অনন্যোপায় হলে যা হয় আরকি। এ মুহুর্তে নদী ও সাগরে মাছ ধরা নিষিদ্ধ। মা ইলিশের ডিম ছাড়ার সময়। অভিযান চলছে। জেলেরা অলস সময় পার করছেন ঘরে ও গঞ্জে। এ সময় অনেকেই গঞ্জের সন্ধ্যা কোলাহলে মত্ত। ছেলে ছোকররা হালকা নেশাটেশা করে। বিচিত্র মউজ মাস্তি করে, কেউ কেউ ঝগড়া ঝাঁটি করে বউ পিটিয়ে ক্ষণিকের জন্য নিরুদ্দেশ হয়, কেউ কেউ তাস খেলে সময় পার করে। আজকাল অবশ্য সদাশয় সরকার কর্মহীন এই দিনগুলিতে এদের কিছু সাহায্য সহযোগিতাও করে।                                                                                                                                                                              কাছাকাছি থাকা মাছ ধরা এক ট্রলারের মাঝি খবর পেয়ে হাজির হয়ে প্রস্তাব দিল উপস্থিত ক’জনকে নিয়ে যেতে পারবে যদি সবাই পাঁচশ টাকা করে জনপ্রতি ভাড়া দিতে সবাই রাজি থাকে। ট্রলারের রেগুলার ভাড়া দেড়’ শ টাকা। রাত বেশ হয়ে গেছে। অবি এ পথের অনিয়মিত যাত্রী। কাজের সুবাদে দিনের বেলা আরও বার দুয়েক গেলেও রাতের বেলা এই প্রথম। ভেবে পান না এই অন্ধকার দরিয়া মাঝি পাড়ি দেবে কেমন করে। দ্বীপ নিবাসী ভদ্রলোক অবশ্য অভয় দিলেন। দরিয়ার এখন উত্থাল না। মাঝ দরিয়ায় লার নেই। শেষ শরৎ। হেমন্ত আসি আসি করছে। নির্ভয়ে যাওয়া যায়। তবুও শঙ্কা কাটে না। বিশেষ করে অবিরত নিশ্চিত হতে চান এই রাত-বিরেতে অন্য কোনো নিরাপত্তা ঝুকি আছে কিনা? অর্থাৎ জলদস্যু ও ডাকাতের আক্রমণ, দূরে নির্জন কোনো চরে নিয়ে গিয়ে বন্দি এবং মুক্তিপণ! এরকম ঘটনা কথার হরহামেশাই শোনা যায়। পর্তুগীজ জলদস্যু হার্মাদরা নাই। কিন্তু দেশী হার্মাদরা তো আছেই। মাছধরা নৌকার মাঝি অভয় দেন। আগের সেই নৈরাজ্য নেই। তবে এক সময় হরহামেশা এই রুটে ডাকাতি ও লুট হতো। মূল ভূখণ্ড হতে ১০ কিলোমিটার দক্ষিণে চর রুহুল আমিনে (অধুনা স্বর্ণদ্বীপ নামে পরিচিত) আশপাশ এলাকা থেকে ধরে নিয়ে যেত অনেককে। আশির দশকের শেষে জেগে ওঠা চরটি এমন এক সময় বিভিন্ন জলদস্যু আর ডাকাতদের অভয়ারণ্য ছিল। সন্দ্বীপ আর হাতিয়ার আশপাশ থেকে এরা অনেক অপরাধকর্ম করে এখানে এসে আশ্রয় নিত। এটা ছিল অপরাধীদের অভয়াশ্রম। চরাশ্রয়ী দুর্ধর্ষ অপরাধীদের সংখ্যা অবশ্য আজকাল কমেছে।

 

এ রুটে অভ্যস্ত মাঝির অভয়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই উঠে পড়লে অন্ধকার জনপদের কোল ঘেষে ট্রলার ছাড়ে। মাছ ধরা ট্রলারের পেছনের অংশের ছইয়ে উঠে বসেন অবি। উপকূল জনপদ তাঁর কাছে একেবারেই নতুন। মাঝ দরিয়ায় বন্দরগামী জাহাজের আনাগোনা। সংকেত সমেত লাইটার জাহাজ দেখা যাচ্ছে। চারপাশ জুড়ে আবছা অন্ধকার। শীত আসছে। শেষ আশ্বিন। এমন তরঙ্গ বিক্ষুব্ধ নিস্তব্ধ যাত্রার সময় অতীত হানা দেয়। অবিরও হঠাৎ শৈশব-সঙ্গী দাদী মা’র কথা মনে পড়ে। দাদী মা বলতেন, অবি রে, জাইনা রাখ, ভাদ্র মাসের তেরো তারিখ শীতের জনম অয়। সেই দাদি’মা আর নেই। ঋতুপাকে ইতোমধ্যে অনেক বার শীত এসে চলে গেছে। তবু শীতের শুরুতে দাদী মার কথাটি সংবৎসর মনে পড়ে। এই সন্ধ্যারাতে শীতের আগমনী বার্তায়ও তার ব্যত্যয় হলো না।
            

চারদিকে হিমেল হাওয়া। আকাশে লক্ষ কোটি তারার খেলা। যেন বিস্তীর্ণ এক ঝুলন্ত উদ্যানে অজস্র তারার ফুল ফুটে আছে। ট্রলার প্রথমে জনবসতি শূন্য চর ঘেষে চলল কিছুক্ষণ। ক্রমেই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে জনপদ লোকালয় ছেড়ে গভীর জলের গর্ভে দক্ষিণে লীন হতে লাগলো। এ যেন গ্রহচ্যুত এক গ্রহের ব্লাকহোল জার্নি। উপরে আকাশ, নিচে অথই জল। জল আর হালকা ঢেউয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ার চাদর ভেদ করে অবিরাম ছুটে চলছে নৌকাবয়বে এক জলাশ্বারোহী। অভ্যস্থ এবং উদাসীন সহযাত্রীদের সঙ্গে টুকটাক তাদের বিনিদ্র শ্রমজীবনের গল্প, যন্ত্রসভ্যতার গল্প, পিতাহারা কন্যার অনুচ্চ আহাজারি, আর্তনাদ, আর সিংহভাগ সময় চুপ মেরে ক্রমাগত জলভাঙনের শব্দ শুনে শুনে আকাশ না দেখা শহরে থাকা বুকে হাহাকার নিয়ে অবি তাকিয়ে থাকেন রহস্যাবৃত্ত দূর দিগন্তে, নির্নিমেষ। জলের উপর হঠাৎ তারার খসে যাওয়া দেখা- গ্রাম জনপদ লোকালয় দিক চিহ্নহীন জলের দেশে ভেসে ভেসে দূর এক গন্তব্যের পানে ছুটে যাওয়া- এমন আশ্চর্য, অবিমিশ্র নিশিযাত্রার থ্রিল- ছোটবেলা বইয়ে পড়া দুঃসাহসিক অভিযানের কল্পকাহিনীকেও হার মানায়। যেখানে মিলনের উচ্ছ্বাস আছে। জীবন-মৃত্যুর হাহাকার আছে। অনন্ত বিচ্ছেদ আছে। দায়িত্ব পালনের সংকল্প আছে।

সাহিত্য ও সংস্কৃতির সমঝদার অবিরত রায় আচমকা টের পান উদাসী মনে গোপনে গুনগুনিয়ে গান আসে। ঢেউয়ের মতো আশ্চর্য সুন্দর শৈল্পিক সুর তুলে। শব্দের পর শব্দ। ভাটিয়ালি বিচ্ছেদী সুরে গুণগুনিয়ে গেয়েও উঠেন,

“ও বিষম দরিয়ার মাঝি তোমার নাও/কূল-কিনারা, দিগ চিহ্ন ছাড়া কেমন করে বাও/চুপি চুপি একবার তুমি আমায় কইয়া যাও…

ও বিষম দরিয়ার মাঝি রে… কত দুঃখে দুখি মানুষ, কত সুখে সুখী, তোমার নায়ে সবাইরে রাখি/কেমন করি বাও…ও বিষম দরিয়ার মাঝি রে…।”

হাল ধরে থাকা সদ্য তারুণ্য পেরিয়ে আসা মাঝিকে অথৈ দরিয়ায় দিকভ্রান্ত হবার আশঙ্কা নিয়ে অবিরত রায় জিজ্ঞেস করেন, “এই আইন্ধার রাইতে দরিয়ায় কেমন করে টের পান সকলকে নিয়ে ঠিক পথেই যাচ্ছেন মাঝি ভাই? গন্তব্যে আমরা পৌঁছতে পারব তো?” ইঞ্জিনের ভোঁ ভোঁ শব্দ ভেদ করে উত্তর আসে, ‘রাতে-বিরাতে মাছ ধরতে ধরতে এ জলদুনিয়ার খেলা জানা হয়ে গেছে, স্যার। টেনশন লিয়েন না। সময়মতো পৌঁছে যাব।’ মাঝির কথা শুনে অবি চমকে উঠেন। অচেনা জলভূগোলের সৌন্দর্যে তাকিয়ে থাকেন। কিছু ভাবনা বর্ণনাতীত। কিছু মুহুর্তের ফটোগ্রাফ হয় না। কিছু মুহুর্ত ও দৃশ্যের ছবি ধারণ করা যায় না। মনের ক্যানভাসে অদৃশ্য সুন্দর রঙ তুলি দিয়ে জগতের শ্রেষ্ঠশিল্পী হয়ে সকল মাধুরী মিশিয়ে একাই আঁকতে হয়। আঁকতে আঁকতে অবিরত রায়ের মনে ভাসে মাঝির কথা- জলদুনিয়ার খেলা, দিকচক্রবাল জানা হয়ে গেছে। সবাই জানতে পারে? জীবন যে অকূল পাথার। সেখানে পথের দিশা কী সবাই পায়? পথের সন্ধান? সবাই পৌঁছায় ঘাটে? কেউ কেউ গন্তব্যের হদিস পায় পায় রাত্রির ঘোরতর অন্ধকার ভেদ করেও। কেউ-বা হারায়। পথ হারালে নাকি আর ফিরে পাওয়া কঠিন। ঘোর লাগে। বিভ্রমে রাত কেটে যায়। এই মঝি এক আশ্চর্য জীবন-দার্শনিক। অথই জল আর ভাবনার দরিয়ায় ডিঙিয়ে তাঁর নৌকা গন্তব্যে পৌঁছে যায়। পথ হারায় না। ভাবনার তরঙ্গ-বিক্ষুব্ধ অবস্থায় হঠাৎ ট্রলারের ইঞ্জিনের গতি কমে। ওই তো সাগরের বুকে ভেসে থাকা একখণ্ড দ্বীপ জনপদে টিমটিমে আলো দেখা যায়। এক সময় অবিরাম দ্রুম দ্রুম গর্জন করা ইঞ্জিন বন্ধ হয়ে আসে। ট্রলার ভিড়ে কিনারে, দ্বীপের উত্তরে নলচিরা ঘাটে। উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা, আর অনিশ্চয়তার খণ্ড খণ্ড গল্প ফুরোয়। যাত্রীরা নামার জন্য তটস্থ এখন। সঙ্গে থাকা ব্যাগ-বোঁচকায় হাত দিচ্ছে সবাই। অবি নামতে নামতে ভাবতে থাকেন যতই ঘোর সন্ধ্যা নামুক, অনিশ্চয়তা থাকুক; মানুষ চাইলে আসলে পারে। পৌঁছে যায় যার যার গন্তব্যে। পেরিয়ে জীবন পথে দেখা এইসব সাগরসম অথৈ নদী।

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত