| 16 এপ্রিল 2024
Categories
গল্প সাহিত্য

মনের সুদূর পারে

আনুমানিক পঠনকাল: 9 মিনিট
ঢাকা শহরের আসন্ন সান্ধ্য মূহুর্তকে গোধূলি না বলে জনধূলি,যানধূলি এধরনের নিজস্ব শব্দে প্রকাশ করে মুনা।বন্ধুরা এতে হৈচৈ বাঁধালে সে বরং পাল্টা প্রশ্ন তোলে,
—-গ্রামের পথে সন্ধ্যার মুখে ধূলি উড়িয়ে গরুর পালের বাড়ি ফেরার ব্যাপারটা থেকেই তো ‘গোধূলি’ কথাটা এসেছে,তাই না? তাহলে এই খটখটে শহরের পিচঢালা পথে ঘরে ফেরা মানুষের জুতার ধূলি উড়ানো,গাড়ির ধোঁয়া ছড়ানোকে জনধূলি,যানধূলি বলাতে ভুলটা কোথায়? বোঝা দেখি আমাকে।

অকাট্য যুক্তি খন্ডাতে না পেরে অগত্যা সবাই হার মেনে নেয়। তো আজ এই গোধূলি, জনধূলি অথবা যানধূলি বেলার উদাসী হাওয়া গায়ে মেখে হুড
খোলা রিকশায় অনেকক্ষণ থেকে এলোমেলো ঘুরছে মুনা।একা।মৈত্রী হল,নীলক্ষেত,এফ রহমান হল পেরিয়ে ফুলার রোড আর মল চত্বরের আশেপাশে বার কতক চক্কর মেরে টিএসসির রাজু ভাস্কর্যের মোড়ে চা- সিগারেট খাওয়ার বিরতি নেওয়া শেষে রিকশাওয়ালা এখন যাচ্ছে বাংলা একাডেমীর সামনের পথটা দিয়ে।মুনা আপনমনে গুনগুন করছে,
‘….ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় …
তোমার অশোকে কিংশুকে…
অলক্ষ্যে রঙ লাগলো আমার অকারণের সুখে…’

তিন নেতার মাজার বায়ে রেখে সোজা এগিয়ে দোয়েল চত্বর অবধি পৌঁছার একটু আগেই মামা থামেন,থামেন বলে রিকশা থেকে লাফ দিয়ে নেমে পড়ে সে,
—-ছোট্ট একটা কাজ সেরে আসতেছি, আপনি ততক্ষণে আরো এককাপ চা-সিগারেট খেয়ে নিতে পারেন ,দাম আমি দিবোনে।

রিকশাওয়ালার জবাবের অপেক্ষা না করেই পিছন ফিরে দ্রুতপায়ে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঢুকে পড়ে মুনা, প্রিয়তম গাছটায় হেলান দিয়ে গা ছেড়ে আরাম করে দাঁড়ায় ।আজ তার মন ভীষণ রকম ভালো। কেন ভালো তা সে জানেনা কিংবা হয়তো জানে কিন্তু এখনই স্বীকার করতে চাইছে না,আরো খানিকটা সময় পার হোক পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে তবেই সবটুকু উদযাপন করার ইচ্ছা।অবশ্য ভাবনাটা যদি সত্যি হয়েই যায় তবে তা কীভাবে কী উদযাপন করবে সে বিষয়েও যে খুব বিশেষ কিছু পরিকল্পনা আছে এমন নয়,শুধু এটুকু মনেহচ্ছে যে,তাহলে তার ভিতরের গুটিপোকাটা রঙিন পাখনা মেলে দেবে। উড়ে বেড়ানোর জন্য সে একটা নিজস্ব আকাশ পাবে।এই ই।সবকিছু পরিস্কার হওয়ার আগে তাই অস্পষ্ট ভাবনা মাথায় বয়ে নিয়ে এইযে একা একা রিকশায় ঘুরে বেড়ানো, পার্কের নীড়ে ফেরা পাখির গান শুনে নিজেকে সুখ সুখ অনুভব দেওয়া,এ যেন কেবল নিজের জন্য সবটুকু আয়োজন জাতীয় কিছু !

মুনার স্বভাবটাই এমন।মানে আনন্দ-দুঃখ প্রকাশের চেয়ে তা নিজের ভিতর পুষে রেখে নেড়ে ঘেঁটে দেখতেই সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।যদিও আনন্দ নামক ব্যাপারটার সাথে কদাচিৎই দেখা সাক্ষাৎ ঘটে বরং বিষাদ-বেদনাই যেন তার পোষ মানা পুষি বেড়াল,সারাক্ষণ পায়ে পায়ে ঘুরঘুর করে আর সুযোগ পেলেই আলগোছে কোলে চড়ে আহ্লাদী স্বরে ডেকে ওঠে , মিঁউ… মিঁউ ।

একুশ বছরের স্নিগ্ধ ,মেধাবী তরুণী মুনার সে অর্থে ঘনিষ্ঠ কোন বন্ধু নেই, যাকে অনায়াসে মনের সব কথা খুলে বলা যায়।যদিও স্কুল জীবন থেকেই রেজাল্ট ভাল বলে অনেকেই যেচে এসে উদ্দেশ্যমূলক বন্ধুত্ব পাতিয়েছে,দরকার ফুরালে তারা চলেও গেছে ।এ ধরণের সুযোগ সন্ধানীদের বন্ধু বলতে নারাজ সে। অসাধারণ রবীন্দ্রসংগীত গায় বলে মঞ্চের সামনের স্রোতা যেমন মন্ত্রমুগ্ধ তেমনি মঞ্চের পিছনের মানুষগুলো, যাদের সাথে সাংগঠনিক সূত্রে ওঠা বসা, প্রত্যেকেই তার বিনয়,মায়া আর আন্তরিকতার গুণমুগ্ধ ।কাজেই তার সার্কেল নেহায়েত ছোট নয়।সারাদিন এর ওর দেন দরবার , মুস্কিল আসান করে বেড়ানো মেয়েটাই দিনশেষে নিজের ভিতর নিঃসঙ্গ,একা। এর একটা গূঢ় মনস্তাত্ত্বিক কারণও অবশ্য আছে।ছয় বছর বয়সে বাবা মায়ের ছাড়াছাড়ি হবার পর মফস্বলে চাচার সংসারে দাদির আঁচলে মানুষ সে।ঐ ঘটনার পর স্বাভাবিক শৈশবে ছন্দপতন হওয়ায় তার বয়স যেন অলৌকিক ভাবে দশ বছর বেড়ে যায় ।অর্থাৎ ছয় এ ষোল, ষোল এ ছাব্বিশ এরকম আরকি।নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কৌশল করে বেড়ে উঠতে হয়েছে বলে সমবয়সীদের তুলনায় তার মেন্টাল ম্যাচিওরিটি খানিকটা এগিয়ে।তাছাড়া বাস্তবতার প্রেক্ষিতেই সমবয়সীদের আনন্দ বেদনার রঙ আর তার আনন্দ বেদনার রঙ ভিন্ন ।এইসব পার্থক্য অনায়াসে তার পারিপার্শ্বিকতায় অদৃশ্য বিভেদরেখা টেনে দেয় ফলে অন্যদের কাছে সে নির্ভরতার আশ্রয় হলেও আদতে দুর্বোধ্যই।সর্বদা হাসি লেখে থাকা মুখোশের আড়ালে লুকানো দুঃখী মুখটা দেখতে পাওয়ার মতো পরিণত দৃষ্টির কোন বন্ধু জোটেনা বলে একান্ত আলাপে কোথাও মনের ঝাঁপি খোলা হয় না তার।বরং ফুল,পাখি,গাছ,নদী এদের সাথেই মেলে ভাল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে নিজের ছোট্ট মফস্বল শহরে মুনার বিকেল কাটতো বাড়ির পাশে নদীর ধারে হেঁটে বেড়িয়ে।শেষ বিকেলে নদীর জলে ডুব দিয়ে সূর্যের তলিয়ে যাওয়ার পর অনেকটা সময় নিয়ে আকাশের গায়ে মেখে থাকতো সিঁদুরে আভা।সেই আলোর রেখা মিলিয়ে যেতে শুরু হলেই তীরঘেঁষা গাছগুলোর নীড়ে ফিরতো পাখিদের ঝাঁক।দিনশেষে ঘরে ফেরা পাখি দম্পতিদের সান্ধ্য আলাপ শুনে একা একা হাঁটতে হাঁটতে মনে হত এ বুঝি অপার্থিব মূহুর্ত।আবার বর্ষায় পোয়াতি নারীর পেটের মতো ফুলে ওঠা নদীটা কেমন ভয় ধরাতো ।শরতে কূলের কাশবনে দোলা দেওয়া হাওয়ারা উড়ে এসে মুনার গায়েও বুলিয়ে দিতো আলতো পরশ।দেখতে দেখতে শীত এসে যেত,তখন একে মনে হত মায়ের গালে শুকিয়ে যাওয়া কান্নার দাগের মতোই আবছা – শীর্ণ এক জলের ধারা। সাইকেল কাঁধে নিয়ে হেঁটেই মানুষ দিব্যি এপাড়-ওপাড় করতে পারতো।মুমূর্ষু মানুষ দেখলে যেমন কান্না পায় নদীটার দিকে তাকিয়ে তেমন মায়া হতো মুনার। এলোমেলো ভাবনায় বিভোর হয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঘরে ফেরার সময় জ্ঞান ভুলে বহুদিন দাদির কাছে বকাও খেয়েছে সে,
—–কালিসন্ধ্যায় নদীর পাড়ে বাউকুড়ানি বাতাস উঠে,পেত্নিরা চলাচল করে।কোনোদিন যে তর ঘাড় মটকাইবো তহন মজা ট্যার পাইবি ।

হলজীবন শুরু হলে প্রথম প্রথম যখন দাদির কথা মনেপড়ে ভীষণ মন কেমন করতো,নদীটার জলে পা ভেজাতে ছুটে যেতে ইচ্ছা করতো,যান্ত্রিক শব্দের শহরে পাখির ডাক শুনতে না পেয়ে বুকের ভেতর খাঁ খাঁ করতো সেইরকম বিউভল সময়ে একদিন কোনকিছু না ভেবেই হুট করে বিকেলের ক্লাস শেষে কলাভবন থেকে হাঁটতে হাঁটতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে প্রবেশ করেছিল সে।দীর্ঘসময় হাঁটাহাঁটি করে বেরিয়ে যাবার মুহূর্তে এই অশোক গাছটার আবিষ্কার ।এর পাশ দিয়ে যেতে গিয়ে অবাক হয়ে দেখে যে, ঢাকা শহরেও পাখির ডাক শোনা যায়।সেই থেকে খুব মন খারাপ কিংবা মন খুব ভালো লাগলে সন্ধ্যার মুখে এখানে এসে দাঁড়ায় ,প্রশান্তি অনুভব করে।

সেদিন পিয়ালকেও এনে দাঁড় করিয়েছিল।টিএসসিতে আড্ডা শেষে সবাই যে যার মতো চলে গেলে ওরা দুজন টুকটাক গল্প করছিল।পিয়াল আজিজ সুপারের ‘অন্তর’ এ গিয়ে নাস্তা খাওয়ার কথা বললে মুনা আপত্তি জানায় ,
—-এখন কিছু খেতে ইচ্ছা করতেছে না যে!হাঁটতে ইচ্ছা করতেছে।চলেন কিছুক্ষণ হাঁটি।ওহ্ হো,চলেন ..চলেন আপনাকে আমার একজন বিশেষ বন্ধুর সাথে পরিচয় করাই দেই।

—–তোমার বিশেষ বন্ধু মানে আবার কোন ভোটকা সাইজের গাছ নয়তো?সুন্দরী কোন বান্ধবী হইলে যাইতে পারি ভাই ,নইলে মাফ করো।

—–হায় রে! মাথায় খালি সুন্দরীর চিন্তা।যেখানে নিয়ে যাবো সেখানেই যেতে হবে,চলেন আমার সাথে ।

দুজনেই হাসতে হাসতে উঠে পা বাড়ায়।একই সংগঠনে যুক্ত থাকার সূত্রে দুই ইয়ারের সিনিয়র পিয়ালের সাথে গত তিন বছরের পরিচয় মুনার ।কাজে,আড্ডায় অনেক কথাই অনেক সময় বলা হয়ে যায়।এমনি একদিন রাতের বেলা হলে ফেরার সময় ভিসি চত্ত্বরের প্রকান্ড কড়ুই গাছটা দেখিয়ে মুনা বলেছিল,
—-এই হল আমার ক্যাম্পাসের বেষ্ট ফ্রেন্ড,নেন,
পরিচিত হয়ে নেন।

হুট করে এমন একটা কথা শুনে ক্ষণিক থমকে গেলেও সাথে সাথেই ঘুরে দাঁড়িয়ে স্বভাব সুলভ দুষ্টুমিতে জবাব দেয়,
—-নাহ্, তোমারে দিয়ে কিচ্ছু হবে না! সারাদিন চলাফেরা করো আমার মতো হ্যান্ডসামের সাথে আর বেষ্ট ফ্রেন্ড বানাইলা ঐ জাম্বো কড়ুই গাছটারে?যাও এহন তারেই বলো হলে পৌঁছাই দিতে,আমি তাইলে গেলাম না তোমার সাথে।

আজ আবার বিশেষ বন্ধুর কথা বলায় সেই খোঁচাটাই দিল পিয়াল।

ধীরপায়ে হেঁটে টুকরো কথার ফুল ছড়িয়ে অনেকটা সময় ব্যয় করে টিএসসি থেকে সোহরাওয়ার্দীর পথটুকুকে দীর্ঘ বানিয়ে ওরা যখন ভিতরে ঢুকে ততক্ষণে সন্ধ্যা প্রায় বাসি হয়ে এসেছে।শহরে এই এক সুবিধা, সময় অসময় মানা মানির বালাই নেই।হলে উঠার পর থেকে কোন কাজের কৈফিয়তও কাউকে দিতে হয়না।তাই নিঃশঙ্ক চিত্তে কথা বলে চলে মুনা।তাছাড়া সে লক্ষ্য করেছে পিয়ালের সাথে অকারণ,অপ্রাসঙ্গিক কথা বলতেও ভাল লাগে তার।অশোক গাছটার নীচে গিয়ে আঙুল তুলে দেখায় ,
—-কী !কড়ুই বন্ধুকে তো জাম্বো বলে খুব নিন্দা করছিলেন,এ কত হ্যান্ডসাম দেখছেন ?আপনি এইবার ডাউন!

গাছতলায় খোঁজাখুঁজি করে যুৎসই কোনটা না পেয়ে ছোট্ট করে লাফ দিয়ে নাগালে পাওয়া থোকা থেকে দুটো ফুল ছিঁড়ে কানে গুঁজে নেয় মুনা।তারপর গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে মিষ্টি করে বলে,
——ও গাছ তোমার দুটো ফুল ছিঁড়েছি মনে কষ্ট নিও না প্লিজ,কাল সকালে তো ঝরেই যেত!

এইকান্ড দেখে পিয়ালের চোখ কপালে,
——আরেহ ,এটা কী হল?

—-কেন,জানেন না?রাতের বেলা ফুল,পাতা ছিঁড়তে নাই।কিন্তু আমার খুব কানে ফুল গুঁজতে ইচ্ছা করছিল অগত্যা ফুলটা ছিঁড়ে গাছকে আদর করে বুঝিয়ে বললাম, ওর যাতে মন খারাপ নাহয়।

—-তুমি না,সত্যিই অদ্ভুত!

—–হ্যাঁ, আমি তাই-ই ।আর আপনি হলেন কিম্ভুত! তা মি: হ্যান্ডসাম কিম্ভুত, একটা প্রশ্নের জবাব দেন।অনেক দিন তো হলো আমাকে চেনেন,আমার দুটো দোষ অথবা গুণের কথা বলতে পারবেন?

একথা শুনে সোহরাওয়ার্দীর পুরো প্রান্তর কাঁপিয়ে হেসে ওঠে পিয়াল।সে দাপুটে হাসির শব্দে পাখিদের গেরস্থালিতেও বুঝি সাময়িক বিঘ্ন ঘটে।
হাসির দম ধরে রেখেই সে বলে,
—-জরিপ চালাচ্ছো? তা প্রশ্নকর্তার মনরাখা জবাব দিতে হবে নাকি উত্তরদাতার মনের কথা বলার সুযোগ আছে?

—–জরিপই বলতে পারেন তবে সিলেকটিভ মানুষদেরকে স্যাম্পল হিসাবে গ্রহণ করা হয়েছে । আর প্রশ্নকর্তা শতভাগ নির্ভেজাল উত্তরই আশা করে। রাগ,অনুরাগ,বিরাগের বশবর্তী হয়ে কোন উত্তর দিলে তা গ্রহণ করা হবে না।

—-হা হা হা , বুঝতে পেরেছি।এ আর এমনকি শক্ত কাজ!দাঁড়াও বলে দিচ্ছি ।আচ্ছা ,গুণ আগে বলি ,হ্যাঁ …শোন…গুণ…

এক নম্বর :
তুমি হচ্ছো লতার মতো ।অর্থাৎ প্রিয় জনদের আঁকড়ে,পেঁচিয়ে রাখো ।এরকম মায়াবতী,যত্নশীল মানুষের প্রিয়জনেরা সৌভাগ্যবান।

দুই নম্বর :
তোমার ইতিবাচক মনোভাবটা দারুণ ।কোথাও দেয়াল দেখলে তুমি সেটাকে শুরুতেই বিভেদবাচক মনে না করে ক্লান্তিতে হেলান দেওয়ার অবলম্বনও ভেবে নিতে পারো।এটা আমাকে বিস্মিত করে !
আর ..আর …নাহ থাক… গুণ আর না।এবার দোষ বলবো?রাগ করবা না তো ?

—-আরেহ দূর, কী বললাম একটু আগে?

—-আচ্ছা, ঠিকাছে তাহলে বলি,যদিও তোমার মতো স্বভাবের মানুষ পাশে থাকলে সমুদ্র সাঁতরানোর ঝুঁকি নেওয়া যায় তবু সত্যি বলতে তুমি আসলে বোকা,ভীষণ বোকা।যাকে বলে মোর দ্যান বোকা,দ্যাট ইজ গর্ধভ !এই কথাটার অবশ্য একটা চমৎকার ব্যাখ্যা আছে, দাঁড়াও বুঝিয়ে বলছি ।

এটুকু বলা শেষ হতেই হাতের মুঠোয় থাকা মোবাইল ফোনটা বেজে ওঠে আর অমনি পিয়াল ব্যস্ত হয়ে ওঠে,
—-সরি রে ,বাকিটা আরেকদিন বলবোনে।আমার হলে মিটিং আছে ,ভুলেই গেছিলাম।চলো আজ বেরিয়ে যাই।

—-ঠিকাছে অসুবিধা নাই আপনি যান, আমি আসতেছি ।

ক্যাম্পাসে যে অল্প দু’চারজন মানুষের হাতে মোবাইল ফোন আছে, পিয়াল তাদের একজন।বন্ধুরা তো ঠাট্টা করে বলে,রাতে মেয়েদের হলের কয়েনবক্স থেকে আসা কলের তোড়ে পিয়ালের রুমমেটদের ঘুম নাকি ভেসে যায়।কথা যে তারা খুব একটা মিছে বলে,তাও না।পিয়ালের ভক্ত অনুরাগীদের মধ্যে প্রমীলার সংখ্যা সত্যিই বাড়াবাড়ি রকমের বেশি।ক্যাম্পাসের কোথাও তার আবৃত্তি কিংবা গানের অনুষ্ঠান থাকলে দর্শক সারিতে দৃষ্টি দিলেই বিষয়টা পরিস্কার বোঝা যায়।যাইহোক, পিয়াল চলে যাওয়ার পর এতক্ষণের অন্য সব কথা ছাপিয়ে মুনার কানে কেবল হাসির শব্দই প্রতিধ্বনিত হয়। শব্দটাকে সে রিকশায় পাশের সিটে বসিয়ে নিয়েই হলে ফিরছিলো কিন্তু মাঝপথে কোথায় যেন টুপ করে নেমে হাওয়ায় মিলিয়ে যায় !

আজ একটা পত্রিকার সাহিত্য পাতায় পিয়ালের গল্প ছাপা হয়েছে ।গল্পের মূল চরিত্র বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একটা মেয়ে আর তার যে ঠিকানা দেয়া হয়েছে ওটা মুনার রুম নম্বর।এরকম হতেই পারে।
চেনা মানুষের লেখায় পরিচিত জনদের নাম-ঠিকানা ব্যবহার বিশেষ কোন অর্থ বহন করে না।কিন্তু মুনার খটকাটা অন্য খানে।গল্পের প্লট এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা পড়ে মনেহচ্ছে, তাকে কেন্দ্র করেই এটা লেখা।আরো পরিষ্কার করে বললে,পিয়াল হয়তো সরাসরি জানাতে না পেরে এই গল্পের মাধ্যমেই মুনাকে তার মনের ভাব প্রকাশ করেছে। গল্পের ইঙ্গিতপূর্ণ কথাগুলো তাকে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে।ওটা পড়ার পর থেকেই তাদের মধ্যকার বিভিন্ন কথোপকথন, ঠাট্টা,
নিত্যকার যাকিছু ,সবই চূলচেড়া বিশ্লেষণের চেষ্টা করছে সে।কেবলই মনেহচ্ছে সবকিছুর মধ্যে একটা যোগসূত্র থাকলেও থাকতে পারে,আছে নিশ্চয়ই!

এইতো সেদিন দুপুরে সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে বসে পড়ছিল মুনা।কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে এসে ধপাস করে পাশের চেয়ারটায় বসে পিয়াল, পড়াশোনার মনোযোগীতা নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করে খুব একচোট মজা নেয়। তারপর মুনার খাতার কোণায় লেখা,
রে দাম্ভিক নভেম্বর!
অভিমানী জুলাইকে বোঝা
কম্ম নয় তোর।

লাইন গুলো দেখে দুষ্টুমি জুড়ে দেয় ।

—আরে আরে, সিনিয়রদের তুই তুকারি কর ক্যান? আমার যে নভেম্বরে জন্মদিন সেটা জাইনাই এই গালাগালি করছো তাই না?আরে ভাই,মনটন আগে হস্তান্তর কর; নাড়াচাড়া কইরা দেখি-বুঝি।ফেল মারলে তারপর তো অভিমান টভিমানের পালা।আগেই কীসব লেখছো,হইলো কিছু!

মুনা অপ্রস্তুত হয়ে বলে,
—-ওটা অন্য বিষয় নিয়ে লেখা,আপনি খামাখ্খা নিজেরে মাখাইতেছেন।বেশি বুদ্ধিমানি করার দরকার নাই ।খাতা দেন আমার।

সে কী বুঝল, কে জানে?মুনার দিকে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে খাতা টেনে নিয়ে লিখলো,
—-সূর্যালোক কি আটকানো যায় দেয়াল দিয়ে?
এরপর হিজিবিজি হিজিবিজি আঁকিবুকি ।

এ ধরনের একটা অর্থপূর্ণ লাইন কেন লিখেছিল?এরকম অসংখ্য টুকরো মূহুর্ত,প্রশ্ন,কল্পিত যোগসূত্র সব মাথায় নিয়েই মুনার আজকের এই নিজের জন্য একান্ত সন্ধ্যা আয়োজন ।রিকশায় ঘুরে ফিরে খুশিমনে হলে ফিরতে ফিরতে সে সিন্ধান্ত নেয় এই অস্পষ্টতা কাটানো দরকার,কালই কথা বলবে পিয়ালের সাথে ।

গোলাপি রঙের মনিপুরী শাড়ি,কপালে ছোট্ট কালো টিপ,চুলগুলো হাতখোঁপায় বেঁধে তাতে একটা কাঠগোলাপ গুঁজে দিয়ে প্রজাপতির মতো উড়ে উড়ে চারুকলায় যায় মুনা ।পিয়াল একটু আগেই এসেছে ।ওকে দেখে হাতের সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে কায়দা করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ভ্রু নাচিয়ে বলে,
—কী যে ঝামেলা কর না তুমি ?এখন আমি হাওয়াই মিঠাই কৈ পাই?তোমার শাড়ির রঙ দেখে ঐ জিনিস খাওয়ার ইচ্ছা চাপলো তো!

মুনা বুঝতে পারে এটা পিয়ালের মুগ্ধতা প্রকাশ ।ও এমনই ।বুদ্ধিমান,প্রাণবন্ত,কৌশলী।এই তিন বছরের ক্যাম্পাস জীবনে যে বা যারাই তার প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে, কাউকেই সাড়া দেয় নাই মুনা।মন সায় দেয় নাই আসলে ।অথচ কিছু দিন থেকে মনের গহীনে তোলপাড়টা ভীষণ টের পাচ্ছে সে।একসাথে চলাফেরা,কাজের ফাঁকে কখন যে এই বেয়াড়া অনুভূতিটা জন্ম নিয়েছে কিচ্ছু জানা নাই শুধু বুঝতে পারছে এই অনুভূতি অপ্রতিরোধ্য গতিতে বাড়ছে।এর মধ্যে পিয়ালের নানা ইঙ্গিতপূর্ণ কথা-কাজ মুনাকে আরো উসকে দিয়েছে ।সবমিলিয়ে সত্যিটার মুখোমুখি হতেই আজ এখানে আসা।

চায়ের কাপ হাতে নিয়ে এলেবেলে,অনাবশ্যক
দু’চার কথা বলে কিছুটা ধাতস্থ হয়ে ব্যাগ থেকে গতকালের প্রকাশিত গল্পটা পিয়ালের সামনে মেলে ধরে মুনা।আন্ডারলাইন করা জায়গাগুলো বুঝিয়ে দিতে বলে।বড় একটা হলদে রঙা কাঁঠাল পাতা ভাঁজ করে ফড়িং বানিয়ে সেটা মুনার আঁচলে বাঁধতে যাচ্ছিল, হঠাৎ এরকম আবদারে আঁচলটা ছেড়ে দিয়ে মুনার চোখে চোখ রেখে সেই বুক কাঁপানো হাসিটা হাসে পিয়াল।দূরত্ব কমিয়ে এসে গা ঘেঁষে বসে,
—-তোমার চোখদুটো এতো মায়াবী কেন মুনা?তুমি এমন অদ্ভুত কেন?কেমন যেন বিষন্ন সুন্দর!

তাপে গলে যাওয়া মোমের মত নরম স্বরে মুনা বলে,
—-এটা আমার কথার জবাব হল না ।এই অস্পষ্টতা আমি আর নিতে পারছি না।ভিতরে ভিতরে জ্বলে যাচ্ছি ।এর অবসান হোক ।আজই …এক্ষুনি ….

—-আজই কিছু হবে না তো !কোনদিনই হয়তো হবে না।

—-কেন?

—-হবে না কারণ আমি হতে দিতে চাইনা বরং তোমাকে একটা অমীমাংসিত বিস্ময়চিহ্ন করে রাখতে চাই আমার মনে। তোমার মতো প্রজাপতিতে মুগ্ধ থাকতে চাই জনমভর কিন্তু তোমার সারল্য ধারণ করার সাহস আমার নাই।

—-মানে?

—-মানে,তোমাকে জীবনে না জড়িয়ে মনের গহীনে পুষে রাখতে চাই ।আরো স্পষ্ট করে বললে আমি রোদ্দুর হতে চাই মুনা,সেই যে অমলকান্তি রোদ্দুর হতে চেয়েছিল সেইরকম ।এই চ্যালেঞ্জটা টপকাতে আমাকে লম্বা পথ পাড়ি দিতে হবে তাই এখনই কোন মুগ্ধতার কারাগারে নিজেকে আটকাতে চাইনা।তবে তুমি একটা মায়া! দুর্দান্ত ঘোর !তুমি থাকবে আমার গান,গল্প,কবিতায় কিন্তু জীবনে নয়।রবিঠাকুরের বাঁশি কবিতা মনে নাই?
“ঘরেতে এলোনা যে,মনে তার নিত্য আসা যাওয়া …”
তুমি আমার সেই রকম কেউ !

এতক্ষণ ঝিম মেরে বসে শুনছিল মুনা।পিয়ালের চাহনি,স্পর্শে দূর্বল বোধ করলেও বক্তব্যের মূল সুরে নিজের ভিতর শক্তি ফিরে পায় সে।খানিকটা সরে বসে ধীরে ধীরে দৃঢ়ভাবে বলে,
—-হেঁয়ালি করে কাটানোর মতো যথেষ্ট সময়, সুযোগ,ইচ্ছা কোনটাই আমার নাই আপনি জানেন।হৃদয় নিয়ে বিলাসীতাও আমার স্বভাব বিরুদ্ধ।আপনার অস্পষ্ট আচরণের অস্বস্তি থেকে মুক্তি পেতেই এই জিজ্ঞাসা ছিল,অন্য কিছু ভাববেন না প্লিজ।হোন রোদ্দুর হোন…শুভকামনা রইল।

চলে যাওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ালে পিয়াল পথ আগলে দাঁড়ায়,
—-যেও না প্লিজ, আরেকটু বসো।শোন,ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার পর যদি কুড়ি কুড়ি বছর পর আবার আমাদের দেখা হয় অথবা দেখা না-ও হয় তবু তোমার প্রতি মুগ্ধতার হেরফের হবে না।তাঁতের শাড়ি পরে খোঁপায় ফুল গুঁজে রাখা কোন তরুণী দেখলেই আমার বুকের বাম পাশে সুখের মতো ব্যথা হবে,তোমার কথা মনে পড়বে।

—-আচ্ছা বেশ,আপনি এসব ভাবতে থাকুন।আমার টিউশনিতে যেতে হবে, দেরি হয়ে যাচ্ছে ।

—তোমাকে সেদিন বোকা কেন বলেছিলাম তার ব্যাখ্যাটা শুনবে না?

—-আজ আর কিছু শোনার ইচ্ছা নাই পিয়াল ভাই ।আপনার যা মনে হয়েছে বলেছেন।তাছাড়া ওটা তো নিছক ছেলেমানুষি প্রশ্ন ছিল।বাদ দেন।

—-আচ্ছা ঠিকাছে, বাদ।তুমি কী শক্তি চট্টপাধ্যায়ের ঐ কবিতাটা পড়েছো?
‘বুকের ভেতরে কিছু পাথর থাকা ভাল-ধ্বনি দিলে প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ‘

—-হ্যাঁ পড়েছি,’পাড়ের কাঁথা মাটির বাড়ি’ বইয়ের ‘একবার তুমি ‘।

—-ঠিক ।আমার খুব প্রিয় কবিতা ওটা, তুমি চাইলে শোনাতে পারি।

—–আচ্ছা ঠিকাছে, আরেকদিন শুনবো।কিন্তু কবি ওখানে বুকের ভেতর ‘কিছু পাথর’ থাকার কথা বলেছেন অথচ যাদের বুকে পাথর জমে জমে পাহাড় হয়ে যায় তাদের জন্য কোন কবিতা কী লিখেছেন? জানলে জানাইয়েন।সেটাই না হয় আগ্রহ ভরে শুনবো।

পিয়ালের কথার জালে আটকে রাখার ফাঁদ কেটে বেরিয়ে আসে মুনা,গেটের বাইরে রিকশার জন্য দাঁড়ায়।শাহবাগের দিক থেকে আসা খালি রিকশাকে হাতের ইশারায় ডাক দিয়ে দেখে গতকালের সেই মামা।আজ আবার দেখা হয়ে যাওয়ায় সে বিগলিত হাসির সম্ভাষণ জানায়,
কাছাকাছি এসে সিট থেকে নেমে অকারণ বেল বাজায়,
——কাইলকার মতন ঘুরবেন মামা?

—-হুম,চলেন ঘুরি ।

কড়া বেলের শব্দে গেটের কোণের ভ্রাম্যমান চায়ের দোকানের পাশে ময়লা খেতে থাকা দুটো কাক একসাথে উড়াল দিয়ে দুদিকে চলে যায়।মুনা একবার পিয়ালের দিকে তাকায় আরেকবার কাকেদের দিকে,তারপর রিকশায় উঠে পায়ের উপর পা তুলে বসে।লম্বা টানে বুকভর্তি বাতাস টেনে নিয়ে আস্তে আস্তে ছেড়ে দেয়। গুনগুন করে ,

‘ ….বহু বাসনায় প্রাণপণে চাই,
বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে….’

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত