অসুখের নাম মেঘ

আজ ০৩ সেপ্টেম্বর কবি ও কথাসাহিত্যিক জয়ীতা ব্যানার্জী গোস্বামীর শুভ জন্মতিথি। ইরাবতী পরিবার তাঁকে জানায় শুভেচ্ছা ও নিরন্তর শুভকামনা।


 

মেঘমন ছেড়ে আসে নগরবিলাস
নির্বাসন যতটুকু লিখে রাখা হাতের মুঠোয়
তার চেয়েও বেশি কিছু এ অজ্ঞাতবাস
অচেনা গন্ধ বড় এখানের জলের সুতোয়
জানলার সিক ক’টা পাশে রেখে বাইরে শালিখের আশরীর ভিজে যাওয়া দেখি। বৃষ্টির ছন্দ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখি প্রাণপণ। অথচ মেঘের গর্জনের মধ্যেও নির্ভুল অন্ত্যমিল খুঁজে ফিরি নিয়ত। হাতঘড়ি’তে কাঁটা’দের নিজস্ব গল্পচরিত থমকাবার নয়… অথচ আমার ভূমিকাগুলোই বর্ষার জল পেয়ে মিইয়ে ওঠে বড়। লেন্সকার্টের ফ্রেম ফেলে এসেছি শহুরে রেস্তোরাঁয়। জীবনের এ আউলবাউল ফ্রেমেই বাকি আর আর ফেলে আসার গল্প পড়তে হয় কার্যত।
ফোর্থ পিরিয়ড চোখ কচলে উঠেই  মিড ডে মিলের পেয়ালা সাজায়। শুক্রবারের খিচুড়ির ভাপে ঝাপসা হয়ে আসা চোখগুলো থেকে রাশি রাশি স্বপ্নকুয়াশা ঝরে পড়ে।  আমি কি কেবল বিষাদই লিখতে জানি- নিজেকে নিজেই প্রশ্ন করি।  উত্তরে আপেক্ষিকতাবাদ শোনায় হাঁসের চোখ। দুদিনের একটানা বৃষ্টি প্রসাদে জমির গর্ভমাস ঘোষণা হয়ে যায় আনুষ্ঠানিক ভাবে। এদিকে বাতাসের তুমুল ব্যস্ততার আমি শরিক হতে পারিনি আজও। আমি ধানের হাসি দেখিনি এযাবৎ। মাটির কান্না চোখে পড়েনি কখনো।
”ভালো দিদিমণি ‘প্রায়ই অফ পিরিয়ডের দোহাই দিয়ে আড়াল হয়ে যায়।  ‘ভালো দিদিমণি’ ভালো হওয়ার লড়াই করে সবদিন। পোষা মাছেরা কাঁদে না বলে পুকুর নদী হয়ে যায়’না …নদীর সবটুকু সাগর হয়’নি কখনো। দূর থেকে বাইশে শ্রাবণ ডাক দিয়ে যায়। আশ্রয় খুঁজি… নিশ্চিন্ত আশ্রয় খুঁজি শেষ হয়ে আসা অধ্যায়ের কর্কটচালে।
২।
কতকিছু হারাবার কথা ভাবে পথ
ফেরি করা পণ্যের পিছে পিছে পায়ের আদল
নিশান হারিয়ে ফেলি ঠিকানারও নাম নাই জানি
অযথা নিরস্ত্র আমাকেই ঘিরে থাকে বর্ষ-বাদল
কত মানুষকে চিনে ফেলি রোজ… আমাকে কেউ চিনতে পারে’না বলেই। মুখোশ আর বর্ষাতির প্রভেদ বোঝেনা যারা… তাদের পাশদিয়েই হেঁটে আসি ফেরিঅলার ছদ্মবেশে। ওরা ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষা কেনে রোজ, আমি বেচি… পালিয়ে এসেছি বলে। আমি বেচি আড়াল চাই বলে। আমি বেচি …আবার পালিয়ে যাব বলে।
একটি ভুল নামের সাথে রাস্তা অগোচর হয় প্রতিটি বাঁকে। যতটুকু জানি অথবা জানতাম … সেসব গুছিয়ে নিয়ে বসে পাশের সিটের গৃহবধূটি। কোলের দুবছরটি আমায় দেখে দায় এড়িয়ে যায়। কচি হাতে টাটকা বিপদতারিনী’র সুতোয় নিজের অস্পষ্ট প্রতিচ্ছবি দেখে শিউরে উঠি। খানিক ঘুম আসার ভান করি। বাকি লুকিয়ে নিই কখনো ব্রতকথা না পড়তে জানা জিভের বেহায়াপন।  গন্তব্যের কাছাকাছি আসতেই আবার ঘিরে ধরে মেঘের অসুখ।  বিকেলের মুখের দিকে তাকিয়ে আমার তোমার কথা মনে পড়ে খুব। বাড়ি ফেরে কাদা জুতো ব্যাগ ছাতা শাড়ি ….আমি ফিরি না। আমি ফিরি না কোথাও ….তুমি ফিরে আসতে বল’নি কখনো।
৩।
আমরা নৌকা হ’ব বলে উঠে বসি
আলো নিভে এলে গুটিচোখ কাচপোকা খোঁজে
মেঘেদের ঘরবাড়ি সেজে ওঠে যেই ,তুমিও আসছি বলে-
ঝেড়ে ফেলো ধূলোবালি জলকাদা ভীষণ সহজে
সন্ধের পায়ে আলতা এঁকে গ্যাছে গোধূলি নামের মেয়েটি। তুলসী মঞ্চের আশেপাশে ঘুরঘুর করছে বিষন্নতা। অভ্যেসমত অংক কষতে বসে সান্ধ্যপ্রদীপ।  তাওয়া’য় ফোলা রুটির মতই ফুলে ফুলে ওঠে ঘরকন্না ….চামড়ায় হালকা পোড়ার দাগ রেখে যায় আগুন ছোঁয়াচ। আগুন’র কথায় মনে পড়ে যায় সেই ববকাট চুলের মেয়েটির কথা। আগুনপাখি নয়, বরং প্রজাপতিই হতে চেয়েছিল সে একসময়। তার শুঁয়োপোকাগুটিকোকুন পেরিয়ে আকাশ দেখা হয় নি। সে বুড়ো বটতলায় দাঁড়িয়ে বর্ষার উল্টোমুখ ঝুলে থাকা দেখেছে শুধু। সাইকেলের চাকায় মৃত্যু লিখে রেখে সময় সাঁতরে ঢুকে পড়েছে সাপের খোলসে প্রতিবার। একবার… দুবার… বারবার সে খুন করেছে পিউপা নামের সম্ভাব্য ইচ্ছেপসার।
মৃত্যুর প্রতি তীব্র একচোখামী তার আজ’ও পিছু ছাড়ে নি। কেবল জলের দরে বিক্রি হয়ে গ্যাছে যাবতীয় অস্ত্র ।প্রত্যাশিত বৃষ্টি মাথায় ব্যালকনি বেয়ে উঠে আসে রাস্তার দৃশ্যসমূহ। এমনসময় আমি ঘরের সবকটি আলো নিভিয়ে দিই। পোস্টের ভেপার ল্যাম্প বদলে দিয়ে গ্যাছে পৌরসভার ঠিকাদার। নতুন এল ই ডি আলোয় আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে মেঘেদের কান্না। আমি কান্না গুনতে শিখি শূন্য থেকে শুরু করে…আমি কান্না লিখি কয়েক পাতা…আমি কান্না আঁকি ফোনের স্ক্রিনে…আরো আরো কান্না খুঁজে পড়ি ।
৪।
মশারির ভেতর কুঁকড়ে শুয়ে থাকে সকালবিকেলরাত্রির স্বরলিপিরা। আমরা কেউ কারোর সুখনিদ্রা ভাঙিয়ে দিই না তবু। আমরা কেউ কারোর টানটান বেডসিট ছেড়ে নেমে আসি না কখনো। প্রিয়তম বিছানার লোভে জোনাকীদের মরে যেতে দিই অনায়াসেই। ঘুমঘোরে এক আধবার পাশ ফিরতে গিয়ে দেখি একঘর ফাঁকা প্লাটফর্ম নিয়ে বসে আছ তুমি। ঘোষণার মুহূর্ত আগেই মেইল ট্রেন ছেড়ে গ্যাছে নিস্তব্ধতা চিরে। সময়ের ভুল হয়’না কখনো ,তুমি প্রবোধ দিয়ে বলতে চাইলে। আমি বললাম , তাহলে বড্ড তাড়া ছিল বোধয়।   তোমার ট্রেন ধরা হয়’নি …তোমার পৌঁছনো হয়’নি কোথাও… তুমি আর চাকরি পাওনি ভালো। লাইটহাউসের কাছাকাছি কোয়ার্টারে থেকে  সারারাত আততায়ী জাহাজগুলো ফেরাও তুমি। আমরা আর কবে সমুদ্র হ’ব? প্রশ্ন শুনে দূর থেকেই হেসে ওঠে আমাদের জলজ জীবন।  আমাদের মেঘশরীর। এসব আমার কল্পনা মাত্র, এটুকুই তো বলে রোজ তোমার গুড নাইট ম্যাসেজগুলো।  আমি পপ আপ রিংটোন’র অপেক্ষা করি’না কোনদিন। বরং মাঝরাতে ঘুম ভেঙে তোমার লিখে যাওয়া ঘুম পাড়ানি গানটুকু শুনেই এক স্মার্টফোন চাঁদ জ্বেলে বসি। তুমি বলো, বারবার বলো, প্রতিদিন বলো ,কাঁদো মন… হালকা হওয়ার আর যে উপায় জানা নেই।
আমি বলি ,কাঁদার অনেক সময় আছে …কাঁদার অনেক সময় আছে বলেই ভোরের দিকে মেঘ সরে যায়। তুমি আর মেঘদূত হবে’না কখনো। আমিও আর যক্ষের মুখোমুখি হব’না… জেনেই সকালের জিয়নকাঠিতে সংসার আড়মোড়া ভাঙে। দু-একটি দিন রোদও এসে পড়ে মেঘের অসুখ সারাতে। আমি বহুল ব্যবহৃত একখানি স্মাইলি সহযোগে তোমায় জানাই, “আজ একটু ভালো আছি “…
মেঘের ওপার থেকে প্যয়গাম আসে…” ভালো থেকো মন।”

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত