রাজকন্যার বান্ধবী পরী

রাজকন্যার খুব ইচ্ছা। সে পরীর সাথে উড়বে। উড়ে উড়ে নানা রকমের পাখি দেখবে। রাজকন্যার মনের ইচ্ছা বুঝতে পারল পরী। একদিন রাজকন্যার বাসায় এলো পরী। গল্প শুরু করল দুজন। গল্প শেষে পরী তার পিঠে রাজকন্যাকে বসাল। রাজকন্যাকে দুই হাত দিয়ে পরীর দুই ডানা শক্ত করে ধরতে বলল। পরীর কথা মতো রাজকন্যা তাই করল। পাখি দেখার আনন্দে নিয়ে পরীর সাথে উড়তে বের হলো রাজকন্যা।

কিছুদূর যাওয়ার পর পরী বলল, ‘রাজকন্যা, ইচ্ছার কথা বলো।’

রাজকন্যা বলল, ‘আমার ইচ্ছার কথা তুমি তো জানো। তাই বলতে চাচ্ছি না। তোমার ইচ্ছা মতো উড়ে উড়ে দেখাও।’

পরী বলল, ‘ঠিক আছে। তুমি চুপচাপ থাক। তোমার ইচ্ছাপূরণ হবে।’

রাজকন্যা চুপচাপ বসে রইল। পরী উড়ছে।

পরী আর রাজকন্যাকে দেখে দোয়েল পাখি বলল, ‘পরী তুমি কোথায় যাও। কাকে সাথে নিয়ে যাচ্ছ?’

পরী বলল, ‘রাজকন্যাকে নিয়ে যাচ্ছি।’

দোয়েল পাখি বলল, ‘তুমি রাজকন্যার বন্ধু হয়েছ?’

পরী বলল, ‘হ্যাঁ, আমি তো সব শিশুর বন্ধু। শিশুদের আনন্দ দিতে ভালোবাসি। ওদের ঘুরাতে খুব খুব পছন্দ করি।’

দোয়েল পাখি বলল, ‘ঠিক কথাই বলেছ।’ এই বলে দোয়েল পাখি গান গাইতে গাইতে অন্য দিকে উড়ে গেল। রাজকন্যাকে নিয়ে পরী উড়ছে।

ময়না পাখির সাথে দেখা হলো। রাজকন্যাকে দেখে ময়না পাখি বলল, ‘পরীর সাথে কোথায় যাও?’

রাজকন্যা বলল, ‘অনেক জায়গায় ঘুরব। ঘুরতে ঘুরতে পাখি দেখ তারপর যাব পরীদের রাজ্যে।’

ময়না পাখি বলল, ‘যাও। শুভ কামনা রইল।’

ময়না পাখির কথা শুনে পরী বুঝতে পারল। সে মন খারাপ করেছে। তাই পরী বলল, ‘ময়না পাখি, তোমাকে একদিন আমাদের রাজ্য দেখাতে নিয়ে যাব। তুমি চিন্তা করো না। অপেক্ষায় থাক।’

পরীর কথা শোনার পর ময়না পাখির খুশি হয়ে বলল, ‘ঠিক আছে। অপেক্ষায় থাকলাম। তবে ভালো ভাবে যাও। ঝড় বৃষ্টির কবলে যেন না পড়ে আবার! সাবধানে থাকবে।’

পরী বলল, ‘আমাদের সতর্ক করে দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’

ময়না পাখি আশা নিয়ে দুই পাখা মেলে মনের আনন্দে উড়ে গেল।

পরী আর রাজকন্যা আবার উড়ছে। হঠাৎ মেঘের ডাক। রাজকন্যা মেঘের দিকে তাকিয়ে দূরের আকাশের এক কোনায় দেখে মেঘে একটা উঠ পাখির মূর্তি।  রাজকন্যা মনে মনে ভাবছে মেঘের উঠপাখি শিলা বৃষ্টি হয়ে যদি মাথায় পড়ে। তাহলে তো আমরা শেষ। অন্য দিকে আবার মেঘের ডাক। সব মিলিয়ে মনে ভয় নিয়ে রাজকন্যা বলল, ‘আকাশে উঠপাখি। মেঘের গর্জন। এ তো মহাবিপদ। একটু পর কী হবে!’

পরী বলল, ‘তুমি চুপ করে থাক। কিছুই হবে না। মেঘকে বলে দিচ্ছি। আমরা যেখান দিয়ে যাব। সেখানে যেন বৃষ্টি না হয়। তোমার শরীরে একও ফোঁটা বৃষ্টির পানি পড়ব না। তুমি শুধু আমাকে শক্ত করে ধর।’

পরীর কথা শুনে রাজকন্যা খুশি হয়ে বলল, ‘আমার কোনো চিন্তা নেই। তুমি তো আমার সাথে আছ। তুমি আমার শক্তি।’

পরী বলল, ‘আমার উপর বিশ্বাস রাখো। তোমার কোনো ক্ষতি হবে না।’

রাজকন্যা বলল, ‘ধন্যবাদ।’

ওরা বনের উপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছে। একটা বন মুরগী দেখতে পেল পরীর সাথে ছোট্ট একটা মেয়েকে।

বন মুরগী বলল, ‘মেয়েটাকে? কোথায় পেলে? তাকে নিয়ে যাচ্ছ কোথায়?’

পরী বলল, ‘ও মেয়ে না। রাজকন্যা। পেয়েছি কোথাও। সে কথা এখন তোমাকে বলা যাবে না।’

বন মুরগীর মন খারাপ হলো। তারপর বলল, ‘ঠিক আছে। রাজকন্যার কোনো ক্ষতি যেন না হয়। রাজ্যকন্যাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। রাজ্যকন্যাকে রাজ্য ঘুরে দেখাও।’

পরী বলল, ‘অবশ্যই। ঘুরে দেখাব। নিরাপত্তার জন্য রাজকন্যা মানুষের সাথে ঘুরতে বের না হয়ে আমার সাথে বের হয়েছে।’

বন মুরগী বলল, ‘ও আচ্ছা। ভালো করেছ।’

রাজ্যকন্যা বলল, ‘তোমাকে তো সবাই চেনে।’

পরী মুচকি মুচকি হাসতে হাসতে বলল, ‘চিনবে না আবার। আমি যে পরী। সব শিশুর বাবা-মা প্রথমেই সন্তানদের পরীর গল্প শোনায়। সেজন্য মনে হয় সবাই আমাদের চেনে। আর আমাদের পাখনা দেখেই অনেকে বুঝতে পারে আমরা পরী।’

মা বাবার কথা শোনা মাত্র রাজকন্যা মন খারাপ হয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, ‘ও তাই তো। ভালো কথা বলেছ। খুব ছোটবেলায় আমার মা মারা যাওয়ার কারণে আমি পরীর গল্প শুনতে পারিনি।’

পরী বলল, ‘তোমার মা নেই। মায়ের অভাবের কথা বুঝতে পেরেই তোমার কাছে এসেছি। তোমার মনের বেদনা বুঝতে পেরেছি আমি। তুমি তো আমার রাজকন্যা।’

রাজকন্যা বলল, ‘বোঝার জন্য ধন্যবাদ। তবে শোনো তুমি তো পরী। তোমার নাম সবাই জানে। কিন্তু তোমাকে সবাই দেখাতে পায় না কেন?’

পরী বলল, ‘তা ঠিক বলেছ। আমি তো সহজে সবাইকে দেখা দেই না। তবে মাঝে মাঝে দেখা দেই, আজ তোমাকে দেখা দিয়েছি।’

রাজকন্যা বলল, ‘আমাকে দেখা দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’

পরী এবার একটু জোরে উড়তে লাগল।

উড়তে উড়তে এবার এলো একটা পুকুরের পাড়ে। পুকুর দেখিয়ে পরী বলল, ‘জানো রাজকন্যা, এ পুকুরের একটা ইতিহাস আছে।’

রাজ্যকন্যা বলল, ‘কি ইতিহাস?’

এর মধ্যেই একটা পাতিহাঁস একটু রাগ ভাবে বলল, ‘পুকুরের ইতিহাস এত কম বয়সের শিশুকে জানানোর দরকার নেই। তুমি কাকে নিয়ে এসেছে? কে এটা। কী তার পরিচয়?’

পরী বলল, ‘তারপর পরিচয় সে রাজকন্যা। রাজকন্যাকে নিয়ে রাজ্য দেখতে বের হয়েছি।’

পাতিহাঁস বলল, ‘খুব ভালো কাজ করেছ। রাজ্যকন্যাকে রাজ্য দেখানো উচিত।’

পরী বলল, ‘ঠিক কথাই বলেছ। তাই তো বের হয়েছি।’

পাতিহাঁস বলল, ‘এই যে রাজকন্যা, তুমি বড় হও। একদিন এসো। আমি তোমাকে পুকুরের ইতিহাস শোনাব।’

মনের অপূর্ণতা নিয়ে রাজকন্যা বলল, ‘ঠিক আছে। আমি মনে রাখলাম। বড় হয়ে একদিন চলে আসব। পাতিহাঁসের কাছে শুনব পুকুরের ইতিহাস।’

রাজকন্যার কথা শুনে খুশিতে হাঁস প্যাঁক প্যাঁক করে বলল, ‘আমার সব মনে থাকে। তুমি কোনো চিন্তা করো না। সজা তুমি চলে আসবে।’

পরী বলল, ‘ঠিক আছে রাজকন্যা আসবে। আমরা এখন অন্য দিকে যাই।’

রাজকন্যা বলল, ‘তাহলে চলো।’

ওরা আবার উড়তে লাগল।

পরী আর রাজকন্যা এবার উড়তে উড়তে বনের মাঝে এলো। একটা গাছের ডালে বসল ওরা। বসা মাত্র দেখে একটা কাঠঠোকরা গাছে ঠোঁট লাগিয়ে ঠকঠক আওয়াজ করে কাঠ কাটছে।

রাজকন্যা ঠকঠক শব্দ শুনে তাকাল। দেখতে পেল একটা পাখি। পরীকে জিগ্যেস করল। গাছে ঠোঁট দিয়ে ঠক ঠক করছে। ওটা কি পাখি।

পরী বলল, ‘এটা কাঠঠোকরা পাখি।’

রাজকন্যা বলল, ‘ও তাই। এ পাখি পরিবেশ ধ্বংস করে দেব। ওই পাখিকে এখনি তাড়িয়ে দাও।’

রাজকন্যাকে খুশী করার জন্য পরী কাঠঠোকরা পাখিকে উড়িয়ে দিল।

বনের কিছু দূরে একটা প্যাঁচা উপর থেকে ছোঁ মেরে কি যেন ধরল।

রাজকন্যা দেখতে পেল। সাথে সাথে রাজকন্যা বলল, ‘পরী ওইটা কি?’

পরী বলল, ‘ওটা প্যাঁচা।’

রাজকন্যার মনে ভয় ছিল। সে ভয় কিছুটা দূর করে বলল, ‘ও, এবার বুঝতে পারলাম। ল²ীদেবীর বাহন প্যাঁচা। সেই প্যাঁচা। যাক, আজ বাস্তবে দেখলাম।’

পরী বলল, ‘আরও কত কিছু দেখতে পাবে। শুধু আমার সাথে থাক।’

রাজকন্যা বলল, ‘ঠিক আছে। আমি আছি তো তোমার সাথে।’

পরী বলল, ‘তুমি অনেক কিছু দেখবে আর জানতে পারবে।’

ওরা বন থেকে বের হলো।

ওরা উড়তে লাগল। বন পার হয়ে যাবে এমন সময়। রাজকন্যার চোখে গড়ল গাছের ডালে বাদুর ঝুলে আছে।

রাজকন্যা বলল, ‘বাদুর কি করে?’

পরী বলল, ‘বাদুড়ে রাতে ঘুরে ঘুরে গাছ থেকে কলা খায়।’

রাজকন্যা ভয়ে ভয়ে বলল, ‘ও এবার বুঝেছি। চলো আমরা এখন থেকে সরে পরি। কারণ বাদুর যদি আবার আমাদের কিছু করে।’

পরী বলল, ‘না না বাদু আমাদের কিছু করবে না।’

‘বনের ভেতর ভয় করছে যদি বাঘ আসে। তার আগেই আমরা চলে যাই।’

পরী বুঝতে পারল রাজকন্যা ভয় পাচ্ছে। তাই সে আর কোনো কথা না বাড়িয়ে উড়তে লাগল।

১০

হঠাৎ দেখে একটা চিল আকাশে ডানা মেলে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে উড়ে আসছে।

চিল আসা দেখেই রাজকন্যা বলল, ‘ওই দেখ। আমাদের দিকে কি পাখি আসছে!’

পরী বলল, ‘ও পাখির নাম চিল। উড়ে উড়ে শিকার করে। আমাদের কিছু বলবে না। ভয়ের কোনো কারণ নেই।’

‘তাই! তাহলে ভালো।’

চিল ওদের কাছে আসতে দেখে বাজপাখি। বাজপাখিকে দেখা মাত্র চিল তাকে ধাওয়া করল। দুই পাখি আকাশে উড়তে লাগল। রাজকন্যা ওদের উড়া দেখে মজা পেল। এই সুযোগে পরী রাজকন্যাকে নিয়ে উড়ে অন্য দিতে নিয়ে চলে গেল।

১১

বন থেকে বের হয়ে উড়তে উড়তে গ্রামে মাঠের উপর দিয়ে যাচ্ছে ওরা। মাঠের এক পাশে কয়েকটা শকুন কি যেন ঘিরে ধরে আছে। রাজকন্যার চোখে পড়ল।

রাজকন্যা বলল, ‘ওখানে কি হচ্ছে। ওই ওগুলো কি?’

পরী তাকিয়ে দেখে বলল, ‘ও গুলো শকুন। শকুন সাধারণত অসুস্থ ও মৃতপ্রায় প্রাণীর চারিদিকে উড়তে থাকে এবং প্রাণীটির মরার জন্য অপেক্ষা করে আর মারা যাওয়ার পর প্রাণীকে খেতে শুরু করে। এখানে হয়তো মৃত গরু পড়ে আছে। ওটা নিয়ে টানাটানি করছে।’

রাজকন্যা নাক ধরে বলল, ‘তাই! তাহলে চলো। এখানে আর থাকব না।’

পরী বলল, ‘কেন?’

রাজকন্যা বলল, ‘নাকে গন্ধ আসবে। পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। মরা গরু মাঠে ফেলে রাখা ঠিক হয়নি।’

পরী বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ। মরা গরু মাটির নিচে পুতে রাখা উচিত ছিল। এটা আসলে প্রত্যন্ত গ্রাম তো। তাই হয়তো ফেলে রেখেছে।’

পরী বলল, ‘আমার ভালো লাগছে না। তুমি চলো।’

ওরা উড়তে লাগল।

১২

ওরা উড়ে এলো বিলের পাড়ে। বিলের ধারে জলাশয়ের পাশে একটা বক চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। মাছ শিকার করার জন্য। রাজকন্যা দেখে বলল, ‘পানির ভেতর গলা লম্বা করে দাঁড়িয়ে আছে ওটি কি?’

পরী বলল, ‘ওই প্রাণীটার নাম বক। মাছ শিকার করার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।’

রাজকন্যা বলল, ‘না না বিলের ছোট মাছ ধরতে দেব না।’

পরী বলল, ‘তুমি ঠিক বলেছ। খাল-বিলের অনেক প্রজাতির মাছ এখন বিলুপ্তির তালিকায়। কয়েক বছর পর হয়তো দেশীয় অনেক মাছ আর পাওয়া যাবে না।’

পরীর কথা শুনে রাজকন্যা মাথায় হাত দিল। তারপর রাজকন্যা ধর ধর বলে চিৎকার দিল। চিৎকারের শব্দ শুনে বকটা ভয়ে ভয়ে উড়ে গেল।

১৩

কাকাকা করতে করতে একটা কাক উড়ে যাচ্ছে। রাজকন্যা কাক দেখে পরীকে বলল, ‘কালো ওটা কি?’

পরী বলল, ‘ওর নাম কাক। কাককে পাখিজগতের সর্বাপেক্ষা বুদ্ধিমান পাখি বলে মনে করা হয়। শুধু তাই নয়, প্রাণীজগতের অন্যতম বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে এদের গণ্য করা হয়।’

‘তাই!’

‘হ্যাঁ।’

‘আচ্ছা, কাকের বাসায় তো কোকিল ডিম রেখে যায়। সেটা আবার কাক নিজের ডিম ফেলে কোকিলের ডিমে নাকি তা দিয়ে বাচ্চা ফোটায়। তাহলে কাক কেন প্রাণীজগতের অন্যতম বুদ্ধিমান মনে করব?’

পরী বলল, ‘শোনো রাজকন্যা, কাকের মাথায় এমন এক নিউরন খুঁজে পাওয়া গেছে যা প্রমাণ করে যে, তারা খুব বুদ্ধিমান ও কৌশলী প্রাণী।’

রাজকন্যা হেসে বলল, ‘আচ্ছা, বুঝলাম, তবু আমি বলব, ডিম রাখার ব্যাপারে কাকের চেয়ে কোকিল বুদ্ধিমান।’

পরী বলল, ‘ঠিক আছে। কাক সম্পর্কে তোমাকে অন্যদিন বিস্তারিত বলব। এখন চলো অন্য দিকে যাই।’

‘ঠিক আছে। চলো।’

১৪

ওরা উড়ছে এমন সময় কয়েকটি টিয়া উড়ে যাচ্ছে। এর মধ্য আছে তোতা টিয়া, সবুজ টিয়া। রাজকন্যা টিয়া দেখে পরীকে বলল, ‘ওই সবুজ টিয়া দেখছ না। ঠোঁট লাল। শরীর সবুজ। এই সবুজ টিয়া দেখলে আমার বাংলাদেশের পতাকার কথা মনে পড়ে যায়।’

পরী বলল, ‘তাই! বেশ। তবে তোতা টিয়ার কথা বলি শোনো, তোতা টিয়া হলো প্রজাতির অতিপরিচিত ও সুদর্শন পাখি। সবুজ টিয়া সহজেই পোষ মানে এবং মানুষের মতো করে কথা বলতে পারে।’

রাজকন্যা বলল, ‘তাহলে আমি একটা সবুজ টিয়া বাসায় লালন-পালন করব।’

‘অবশ্যই। করবে।’

‘ধন্যবাদ।’

১৫

আবার উড়তে লাগল ওরা। একটু দূরে গিয়ে দেখে একটা তালগাছ। তালগাছে অনেক বাবুই পাখির বাসা ঝুলছে। বাসাগুলো দেখে রাজকন্যার ভালো লাগছে।

খুশিতে রাজকন্যা বলল, ‘এই বাসাকে তৈরি করেছে কে?’

পরী বলল, ‘তুমি জানো না। বাবুই পাখির বাসা তৈরির কাহিনি।’

রাজকন্যা বলল, ‘না তো তুমি কি একটু বলবে।’

পরী বলল, ‘বাবুই পাখিকে শিল্পী পাখি বলা হয়। একে কারিগর পাখিও বলা হয়। নিজের বাসা নিজেরা তৈরি করে। এদের বোনা বাসা সত্যই শৈল্পিক।’

রাজকন্যা বলল, ‘তাই নাকি। বাহ, কি সুন্দর।

পরী বলল, ‘আচ্ছা, তুমি মনে হয় কবি রজনীকান্ত সেনের ছড়াটা পড়েছিলে-

বাবুই পাখিরে ডাকি, বলিছে চড়াই,

“কুঁড়ে ঘরে থাকি কর, শিল্পের বড়াই,

আমি থাকি মহাসুখে অট্টালিকা পরে,

তুমি কত কষ্ট পাও রোদ, বৃষ্টি, ঝড়ে।”

রাজকন্যা বলল, ‘আমি মনে হয়ে কার মুখে থেকে কথাগুলো কোনো একদিন শুনেছিলাম। কিন্তু পড়া হয়নি। আমি ছড়াটা পড়ব।

পরী বলল, ‘ঠিক আছে। আমি তোমার পড়ার ব্যবস্থা করে দেব।’

আগ্রহ নিয়ে রাজকন্যা বলল, ‘তাড়াতাড়ি দেবে কিন্তু।’

‘অবশ্যই।’

১৬

ওরা মাঠে থেকে একটা বাড়িতে এলো। ওই বাড়িতে একটা ঘরের টিনের চালে অনেকগুলো কবুতর দেখতে পেল। কবুুতর দেখে অবাক হলো রাজকন্যা।

পরী বলল, ‘তুমি কি জানো। এই কবুতর শান্তির প্রতীক।’

রাজকন্যা বলল, ‘তাই! তাহলে কি বাসাবাড়িতে শান্তির জন্য মানুষ কবুতর লালন পালন করে?’

পরী বলল, ‘হ্যাঁ, অনেক শখের বসে বাসায় কবুতর লালন পালন করে। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী কবুতর উড়িয়ে উদ্বোধন করেন। দেখ না।’

রাজকন্যা খুশি হয়ে বলল, ‘ও তাই তো। আমি টিভিতে দেখেছি। বড় হয়ে প্রধানমন্ত্রীর মতো আমিও কবুতর উড়াব।’

রাজকন্যার কথা শুনে পরী খুশি হয়ে হেসে ফেলল।

১৭

বাড়ির পাশে লাউমাচা। মাচায় টুনটুনির বাসা। বাসার ভেতর থেকে মাথা বের করে আছে একটা টুনটুনি। আর একটা এ গাছ থেকে ও গাছে লাফাচ্ছে। তাই দেখে পরীকে রাজকন্যা বলল, ‘এগুলো টুনটুনি পাখি না?’

পরী বলল, ‘তুমি টুনটুনি পাখিকে চেন!’

রাজকন্যা বলল, ‘হ্যাঁ, আমাদের গ্রামের মাচায় দেখেছিলাম। আজ অনেক দিন পর টুনটুনিকে দেখে চিনে ফেললাম।’

পরী বলল, ‘তোমার তো স্মরণ শক্তি বেশ ভালো। এখন পর্যন্ত যত পাখি দেখালাম সব তো তোমার মনে থাকবে।’

রাজকন্যা বলল, ‘অবশ্যই মনে থাকবে।’

পরী খুশি হয়ে বলল, ‘তাহলে এখন বলো। আর কি কি পাখি দেখার বাকি আছে?’

রাজকন্যা বলল, ‘তুমি বলো। আমি জানি না।’

পরী বলল, ‘ঠিক আছে। একটু চিন্তা করে বলছি।’

উড়তে উড়তে পরী চিন্তা করছে।

১৮

ওরা উড়তে উড়তে রাজকন্যা বলল, ‘এবার আমরা কোন দিকে। এবং কোথায় যাচ্ছি।’

পরী বলল, ‘তোমাকে নিয়েই তো যাচ্ছি। তুমি চিন্তা করো না। তোমার সব ইচ্ছাপূরণ করার জন্যই যাচ্ছি।’

‘ঠিক আছে।’

কিছূদূর যাওয়ার পর বিশাল একটা আমগাছ দেখতে পেল। ওরা গাছের ডালে দেখতে পেল একটা মৌচাক। রাজকন্যা মৌচাক দেখে বলল, ‘এটা কি।’

‘এটা মৌচাক। এখানে মৌমাছি দলবদ্ধভাবে থাকে। ওরা মধু তৈরি করে।’

‘তাই! আমি খাঁটি মধু খেতে চাই।’

পরী ভেবে বলল, ‘অবশ্যই খাবে। তবে এখন না। এখন খেলে মৌমাছি তাড়া করে আমাদের কামড়াবে। সুযোগ-সুবিধা মতো খেতে হবে। তার আগে চলে আমরা অন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসি।’

রাজকন্যা বলল, ‘ঠিক আছে। তবে মনে রেখে খাঁটি মধু কিন্তু আমি খাবই।’

পরী বলল, ‘আমি খাঁটি মধু খাওয়ার ব্যবস্থা করব। তুমি কোনো চিন্তা কর না।’

রাজকন্যা বলল, ‘ঠিক আছে। অপেক্ষায় থাকলাম।’

১৯

ওরা উড়তে লাগল।

উড়তে উড়তে রাজকন্যার হঠাৎ পানি পিপাস লাগছে। তাই রাজকন্যা বলল, ‘আমি পানি খাব। কোথায় পাব পানি?’

পরী বলল, ‘পানির ব্যবস্থা আমি করছি। তুমি কোনো চিন্তা করো না। তার আগে একটা গল্প শোনো।’

রাজকন্যা বলল, ‘কি গল্প?’

পরী বলল, ‘শোনো, চাতক পাখি নামে একটা পাখি আছে। সে সব সময় উপর দিয়ে উড়া উড়া ঘোরাঘুরি করে। কিন্তু জানো সে পাখি বৃষ্টির জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁ করে থাকে। বৃষ্টি এলে মুখের মধ্যে ফোঁটা পড়ে। বৃষ্টির সেই পানি খায়। বৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত চাতক পানি পান করে না।’

রাজকন্যা বলল, ‘বলো কি এতদিন পানি না খেয়ে বেঁচে থাকে?’

পরী বলল, ‘হ্যাঁ, একসময় গলা শুকিয়ে গরম হয়ে যায়। তখন চাতক পাখি বৃষ্টির জন্য চিৎকার করে। তবু বৃষ্টি হয় না। তখন নাকি চাতকের গলা দিয়ে আগুনের ফুলকি বের হয়।’

রাজকন্যা অবাক হয়ে বলল, ‘বলো কী! ঘটনা কি সত্যি।’

পরী মুচকি হাসি দিয়ে বলল, ‘তবে শোনো এটা নাকি আসলেই একটা একটা গল্প। চাতক মোটেও বৃষ্টির পানির জন্য অপেক্ষা করে না।’

রাজকন্যা বলল, ‘আমি দেখতে চাই চাতক পাখিকে।’

পরী বলল, ‘ঠিক আছে দেখাব তোমাকে।’

ওরা উড়ছে।

২০

উড়তে উড়তে দেখে বুলবুলি পাখি। পরী দেখেই রাজকন্যাকে বলল, ‘ওই দেখ লড়াইবাজ পাখি।’

রাজকন্যা তাকাল। দেখে তুই পাখি লড়াই করছে। রাজকন্যা বলল, ‘এই পাখির নাম বুলবুলি।’

পরী বলল, ‘হ্যাঁ। বুলবুলি পাখি লড়াইবাজ পাখি হিসেবে দুনিয়াজোড়া খ্যাতি ছিল এক সময়। বাংলাদেশেও একসময় এদের লড়াই হত।’

‘তাই! আমার তো দেখার খুব ইচ্ছা হচ্ছে বুলবুলির লড়াই।’  

‘ঠিক আছে। তোমার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য বুলবুলি পাখিকে বলব।’

রাজকন্যার ইচ্ছা পূরণের কথা শুনে সে আনন্দে হাততালি দিল।

২১

ওরা উড়ছে। উপর থেকে দেখে কয়েকটা ঘুঘু ধান খেতের পাশে দাঁড়িয়ে আছে। রাজকন্যার চোখ নিচের দিকে গেল। তারপর পরীকে বলল, ‘ওই পাখিগুলো দাঁড়িয়ে আছে। ওগুলো কি পাখি?’

পরী বলল, ‘ওগুলো হলো ঘুঘু। এই ঘুঘু এখন গ্রাম বাংলায় দেখা যায় না।  গ্রাম বাংলার এক সময়রে চির পরিচিত ঘুঘু পাখি এখন হারিয়ে় যেতে বসেছে। অথচ একসময় গ্রাম বাংলার কৃষকের মাঠের ধান ঘরে উঠছে এই

আনন্দে ঘুঘুর ডাকে মুখরিত হয়ে উঠত পরিবেশ। তখন ধানের জমিতে ঘুঘু পাখির উৎপাত কৃষককে আনন্দ দিত। কৃষকরা মনের আনন্দে পরিশ্রমকে পরিশ্রম মনে করত না। ওদের ক্রান্তি দূর হতো।’

রাজকন্যা বলল, ‘তাই! বলো কি? আহ কি দৃশ্য ছিল তখন। গ্রাম বাংলার দৃশ্যই অন্য রকম।’

পরী বলল, ‘ঘুঘুর ধানই ছিল ঘুঘুর প্রধান খাদ্য। এখন আর তেমন চোখে পড়ে না। তোমার কপাল ভালো সেজন্য দেখতে পেলে ঘুঘু।’

‘তোমাকে ধন্যবাদ।’

ঘুঘুটা উড়ে গেল। ওরা উড়তে লাগল।

২২

কোকিল সুরেলা কণ্ঠে কুউ-উ, কুউ-উ করে ডাকছে। উড়তে উড়তে মিষ্টি সুরের কণ্ঠ শুনতে পেয়ে রাজকন্যা তাকাল। দেখে তাদের পাশে দিয়ে কোকিল উড়ে যাচ্ছে। রাজকন্যা বলল, ‘পরী তুমি একটু জোরে যাও। কোকিলকে ধর। আমি কোকিলের সাথে কিছু কথা বলব।’

পরী বলল, ‘তুমি কি কথা বলবে?’

রাজকন্যা বলল, ‘আমি কোকিলের কাছ থেকে দোয়া চাইব। কারণ আমি ভবিষ্যতে গান গাইব। আমার কণ্ঠ শুনে সবাই যেন বলে কোকিলের মতো কণ্ঠ।’

পরী হেসে বলল, ‘ঠিক আছে। আমি জোরে যাচ্ছি। তুমি কোকিলের কাছ থেকে দোয়া নেব।’

‘অবশ্যই দোয়া নেব।’

পরী আরও জোরে জোরে উড়তে লাগল। কোকিলের সামনে গিয়ে হাজির হলো ওরা। কোকিল তো অবাক। কোকিলের সামনে পরী হাজির। ভয়ে কোকিল বলল, ‘হঠাৎ আমরা সামনে! তোমার জন্য কি করতে পারি?’

পরী বলল, ‘তুমি শুধু রাজকন্যাকে দোয়া করে দাও। তার কণ্ঠ যেন তোমার মতো হয়।’

কোকিল পরীর কথা মতো রাজকন্যার মাথা উপর দিয়ে কুউ-উ, কুউ-উ করে ডাকতে লাগল। ওরা বুঝতে পারল দোয়া করার জন্য কোকিল এমন করছে। একটু পর কোকিল বলল, ‘যাও দোয়া করে দিয়েছি।’

রাজকন্যা খুব খুশি হলো। কোকিল উড়ে গেল। ওরাও উড়তে লাগল।

২৩

ময়ূর বসে তার রঙিন পেখমের মেলে দিচ্ছে। উড়তে উড়তে দেখে হঠাৎ ময়ূরের দিকে দৃষ্টি পড়ল রাজকন্যার। পরীকে রাজকন্যা বলল, ‘পরী একটু উড়া বন্ধ করো।’

পরী কিছু না বুঝে বলল, ‘কি হয়েছে তোমার। কোনো সমস্যা। না কি কোনো বিপদ।’

রাজকন্যা বলল, ‘না না। কোনো বিপদ না। তুমি শুধু একটু দাঁড়াও। আমি মনভরে ময়ূর দেখব।’

পরী বলল, ‘আচ্ছা, এ কথা আগে বলবে না। ঠিক আছে। তুমি দেখ। আমি এখন আর উড়ব না। তুমি ভালো করে দেখে নাও ময়ূরকে।’

রাজকন্যা মনভরে ময়ূর দেখল। ওরা আবার উড়তে লাগল।

২৪

আবার উড়তে উড়তে পরী বলল, ‘এবার বলো তোমার আর কি দেখার বাকি আছে।’

রাজকন্যা বলল, ‘অনেক পাখি তো দেখলাম। আমি ছোট শিশু। জানি না অনেক কিছু। কি কি পাখি দেখার বাকি আছে তুমি ভালো করে জানো।’

পরী বলল, ‘তোমাকে অনেক পাখি দেখালাম। বাকি দিনগুলো অন্য কোনো দিন দেখব। তুমি প্রস্তুতি থাক। আমি যে কোনো দিন এসে এভাবে তোমাকে নিয়ে যাব। ধীরে ধীরে তোমাকে পৃথিবীর অনেক কিছু দেখাব।’

‘ঠিক আছে পরী। আমি প্রস্তুত আছি। তোমাকে ধন্যবাদ।’

‘তাহলে এখনো চলো বাসায়।’

‘হ্যাঁ, চলো বাসায়।’

রাজকন্যাকে নিয়ে পরী বাসার উদ্দেশে উড়তে লাগল…।

রাজকন্যা যে বাসায় কাজ করে। সে বাসার ম্যাডাম এসে বললেন, ‘রহিমা ঘুম থেকে উঠ। তাড়াতাড়ি নাস্তা দে। তোর স্যার আজ তাড়াতাড়ি বাসা থেকে বের হবেন।’

রাজকন্যার ঘুম ভেঙে গেল। মন খাপার করে তাড়াতাড়ি নাস্তা তৈরি করতে লাগল আর মনে মনে ভাবছে- চার দেয়ালে বন্দী থাকতে ভালো লাগে না আমার। স্বপ্নে পরী যা দেখাল তা যদি বাস্তবে হতো তাহলে আমার কতই না ভালো লাগত। আমিও উড়ে উড়ে কত জিনিস ঘোরাঘুরি করে দেখতাম…।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত