মায়ের আঁচলে ভালোবাসার গন্ধ

“আমার মা ঠিক নদী কিংবা প্রাচীন বট আর জলমেঘ
ভোরের আলোয় ফুল…বেলফুল, জুঁইফুল ঘুমন্ত অতীত
ঘুমন্ত অতীতগুলি যদি স্পর্শ করো তবে পদতলে চাঁদ
ছেঁড়া চাঁদ, ছেঁড়া বাড়ি আর ছোট্ট সংসার… বাক্যহীন শীত”  (মা)
মা-কে নিয়ে দু’চার কথা লিখতে বসেছি। লিখতে গিয়ে নিজের এই লেখাটির কথাই মনে পড়ে গেল।ফলত চার পংক্তির এই কবিতাটি দিয়েই নিবন্ধটি শুরু করলাম।কবিতাটি আমার কবিতাচর্চার প্রথম দিকে লেখা।প্রথমে ‘রাতের জার্নাল ‘, পরবর্তীতে ‘নির্বাচিত ১০০’ তে সংকলিত হয়েছে।
              সম্প্রতি বেশ কিছু তরুণ প্রজন্মের কবির কবিতায় মা এসেছেন নানা রূপে নানা ব্যঞ্জনায় নানা চিত্রকল্পে।পড়তে পড়তে আকৃষ্ট হয়েছি। দ্রবিত হয়েছি তাঁদের চিন্তায়।কল্পনা ও ইশারায় অবিরত তাঁদের রচিত রূপকল্প ও দর্শন বোধ আমাদের ঋদ্ধ করেছে সন্দেহ নেই। যে অবারিত ছবি ও গ্রাম বাংলার সৌন্দর্য অনুভব করেছি তাই বলতে চাইব।নিজ জননী, গ্রাম জননী, দেশ জননী ও প্রকৃতি জননী এক হয়ে উঠেছেন। চিন্ময়ী কখনো মৃন্ময়ী; কখনো সর্বভূতে বিরাজমানা আধ্যাত্মিক পুরাণ-জননী হয়ে উঠেছেন। সন্তানকে তিনি ধারণ করেছেন। বরাভয় দান করেছেন।আর সন্তান মমতাময়ী মায়ের ছবি আঁকছেন। সেবা ও করুণায় আর্দ্র তিনি। মা-কে নিয়ে বাংলাভাষায় প্রচুর কবিতা লেখা হয়েছে। ভবিষ্যতেও হবে। তিনি আমাদের শেষ আশ্রয়। তা তিনি আপন জননী হোন বা দেশ-জননী বা আদিশক্তি জগৎ পালিতা জননী।
          অভিমান্য পাল সাম্প্রতিক বাংলা কবিতার পরিচিত মুখ। ‘ একালের কবিকন্ঠ’ বলে একটি লিটিল ম্যাগাজিনের সম্পাদক। সে লিখেছে :
” অকারণে কারণে গান গাইতে
দোলনা ঠেলে ঠেলে।
আমার কথার পাশে কথা দিয়ে
যখন বসতে , মনে আছে— গন্ধ
মা মা গন্ধ। মা থাকে ফুলে পাতায়
শিশির ভেজা ভোরে।”(মা-জন্ম)
কবিতাটি প্রথম পাঠেই ভালো লেগেছিল।অবগুণ্ঠনে প্রকাশিত। আসলে সব সন্তান-ই তার মায়ের আঁচলে তেল-হলুদের গন্ধ পায়।যা মায়ের নিজস্ব একটা মা মা গন্ধ— যা কেবল তার সন্তান-ই পায়। খুব সহজ করেই বলে অভিমান্য। এই সহজ ভাব-ই অভিমান্যের একটি বৈশিষ্ট্য।এই লেখাটি থেকে মায়ের প্রতি ওর ভালোবাসার গন্ধটি ছড়িয়ে পড়ছে; যা পাঠক-ও টের পায়। 
        পঙ্কজকুমার বড়াল এই প্রজন্মের আরেক সার্থক কবি প্রতিভা। ছোট ছোট বাক্যে , সহজ ভাবে গভীর দর্শনকে প্রকাশ করে। ফিলোসফি ওর কবিতার প্রধান ভিত্তি বলেই আমাদের মনে হয়। সম্প্রতি পঙ্কজের ‘করতলে আকাশ পেতেছি’ ব ইটিতে মা-কে নিয়ে কবিতা পড়েছি।যা বোধকে নাড়া দেয়—ইতিহাসচেতনায় আচ্ছন্ন করে পাঠকমনকে। দুটি কবিতার কথা বলব, একটি আঁচল , অন্যটি মা। ‘আঁচল’ কবিতার শেষে পঙ্কজ বলে : 
” সারাদিন যত পথ হাঁটি
মনে হয় পথ নয়,
মা এসে বিছিয়েছে শাড়ির আঁচল।”
‘মা’ কবিতায় সে লেখে ‘ মায়ের কাছে শিখেছি/ জন্মের পরেও কীভাবে জন্ম নেওয়া যায়।’ এই কবিতাটি শেষ হচ্ছে ইতিহাসচেতনার মধ্য দিয়ে–
” তবু কী এক অনুভব
মা আমার গৌতমী
আর আমি তাঁর সাতকর্ণী পুত্র হয়ে উঠি।”
আমাদের মনে পড়ে শৈশবে ইতিহাসে পড়া গৌতমীপুত্র সাতকর্ণীর কথা। একজন মায়ের লড়াই ও সন্তানের বিজয়– সিংহাসন লাভ তথা ইতিহাসে বিখ্যাত হ ওয়ার কথা।নিজের মায়ের জীবন সংগ্রামের সঙ্গে কবি পঙ্কজ মা গৌতমীর সংগ্রামকে ফুটিয়ে তুলেছে। ফলত কবিতাটির সর্বজনীন ব্যাপ্তি ছড়িয়ে পড়ল পাঠকের অন্তরমহলে। এখানেই হয়ত এই লেখাটির সার্থকতা।
     প্রিয়াঞ্জলি দেবনাথ। ধাত্রীগ্রামের মেয়ে। গল্প এবং কবিতায় অসাধারণ প্রতিভা। অবগুণ্ঠন থেকে প্রকাশিত ‘ শব্দের অরণ্যে আরো এক ক্রোশ’ কবিতার বইতে ‘ দেবী’ নামাঙ্কিত কবিতায় এক চিরন্তন জননী রূপের ছবি ভেসে ওঠে। সে বলে : 
” দেবী স্তুতিতে ওম্ বর্ণে ভেসে আসে
শ্বেতপদ্মের গায়ে লাল আলতা ছাপ,
গঙ্গা তখন দক্ষিণমুখী…” 
এর পরেই কবিতার শেষে সে দেখায় কীভাবে ‘ মা ক্রমশ দেবী হয়ে ওঠে…’এই যে মায়ের দেবী হয়ে ওঠার মধ্য দিয়েই কবিতাটি বিস্তার লাভ করে। সত্যিই তাই— আমরা অনুভব কবি:
” অসংখ্য সন্ন্যাস-জীবন পেরিয়ে
প্রান্তিক-মা তখন শিশুর জন্যে ভাত মাখে
গলা ভাতের গন্ধে শিশু হাসে
ওম্ মন্ত্রে তখন চরাচর ভাসমান’
প্রান্তিক-মায়ের সঙ্গে ওম্ মন্ত্রকে মিশিয়ে দেওয়ায় কবিতাটির আধ্যাত্মিক ব্যাপ্তি বহুদূর পৌঁছে যায়। মা কেবল প্রান্তিক হয়ে থাকেন না। তিনি হয়ে ওঠেন জগৎজননী। কালকে কলন করেছিলেন বলেই জগৎজননী হয়েছেন কালী। এখানেই কালী শব্দের অর্থ নিহিত। তাই প্রিয়াঞ্জলি যখন বলে,  ‘ ওম্ মন্ত্রে তখন চরাচর ভাসমান’ তখন ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার রূপটি চমৎকার ফুটে ওঠে। প্রথম থেকেই কবিতাটির মধ্যে স্পিরিচুয়াল সুর ধ্বনিত।
সন্তোষ চক্রবর্তীর কবিতায় মা অসংখ্য ভালোবাসার কোলাজে জড়ানো। আদরে-আবদারে এবং আশ্রয়ে। পরম নির্ভরতার আশ্রয়। এই বাৎসল্য রসধারাকে নিয়েই সে লিখেছে:
“মা প্রায়-ই অভিযোগ করে, খোকা
ভালোবাসা কমে যাচ্ছে। মা ভালোবাসা
মাপতে জানে। আমি উচ্চতা মাপি। পাহাড় বানাই
গাছ-ফুলে। মাটি জমাই।ফুল ফোটে। পাখি আসে।”
কবিতাটির নাম ভালোবাসা বিষয়ক। প্রথম চারটি পংক্তি উদ্ধৃত করলাম। পুরো কবিতাটির মধ্যেই আছে অকৃত্রিম এক ভালোবাসার গন্ধ। যেখানে বাঙালির মা ও সন্তানের চিরন্তন ভালোবাসার ছবি দেখি। ছেলে বৃষ্টিতে ভিজে এলে পর মা আঁচল দিয়ে মাথা মুছে দেয়। ‘ আমি আঁচলে ভালোবাসার গন্ধ পাই’। ভালোবাসার এক চিলতে জমিতে বাবার পরিশ্রমের ছবিও তুলে ধরে সন্তোষ। আসলে মা এখানে পাহাড় সমান উচ্চতায় আসীন। মায়েরাই সন্তান ও স্বামীকে সারাটা জীবন আগলে রাখে। সন্তোষের এই কবিতার ভরকেন্দ্র মা। যাঁকে ঘিরে ওর সমগ্র জীবন তথা কাব্যভুবন। এই রকম ভালোবাসার গন্ধ মাখা কবিতা পড়ার জন্য হে পাঠক, আমরা মাইল মাইল হাঁটতে পারি। ‘মা’ এই একাক্ষর শব্দের ভিতরে লক্ষ-কোটি শব্দের ব্যাপ্তি নিহিত।
          আবার তরুণ কবি প্রতাপ হালদারের ‘ ডোয়া’ কবিতার ব ইতে মা এসেছেন দৈনন্দিন গৃহকর্মে। প্রতাপ শান্তিপুর নিবাসী। তরুণ প্রতিভা। কবিতার নিজস্ব সুরটিকে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করতে পেরেছে বলেই বর্তমান আলোচকের বিশ্বাস। ওর ‘ভিটে’ কবিতায় মায়ের যে ছবি এঁকেছে তা চিরকালীন এক মায়ের ছবি। যিনি সংসার জীবনে সর্বত্র-ই ছড়িয়ে আছেন। মিশে আছেন পরিবারের সঙ্গে লগ্নগত হয়ে। আমরা তো জানি সবার খাওয়া শেষ হলে মা খেতে বসেন। হয়তো কখনো আধপেটা থাকতে হয় তাঁকে।
     প্রতাপের কবিতায় মা আসেন প্রবাদে-প্রবচনে। ” হাত থেকে বাসন পরে গেলে/ মা ভাবে কুটুম আসে”। ভিটে মাটি জমি গোলা বেস্পতিবার লক্ষ্মীপা তুলসীমঞ্চ ধানছড়া আলপনার মধ্যে প্রতাপ তাঁর মাকে খুঁজে পান। অঙ্কন করেন অপরূপ এক মাতৃমূর্তি। রচনা করে ভিটের মতো কবিতা। লিখে রাখে মাতৃকথা: 
” জানি তো, মায়েরা শেষেই খায়
আমি কোনো রূপকথা ভাবি না
ভিটে জুড়ে থাকুক শুধু মায়ের চোখের জলের অলংকার।”
এই চোখের জলের অলংকারকে যে লিখতে পারে সেই তো কবি। সরস্বতীর বরপুত্র। এইভাবে ক’জন-ই বা দেখেছেন ? করেছেন মায়ের চোখের জলের অনুবাদ? প্রতাপের কবিতার এই আত্মমগ্ন সুর ও নির্বিকল্প দেখাটুকু তাকে স্বতন্ত্র করে রাখে অন্যদের তুলনায়। ও কবিতা বলে গল্পের মতো করে– সহজ সরল অথচ শব্দের ও রূপকল্পের নিপুণ কারিগর সে। এই কবিতাটি পড়তে পড়তে আমার প্রিয়াঞ্জলির ‘ জ্যোৎস্না-বাড়ি’ কবিতাটির কথা মনে পড়ল। সেখানেও গ্রাম বাংলার কৃষ্টি , লোকাচার, ধর্মবোধ ইত্যাদির সঙ্গে জড়িয়ে আছেন মা– স্নেহময়ী জননী। সে লেখে: 
” মা বসেন পদ্মাসনে
দেখি মায়ের পল্লব-হীন কাঠাম হাতে উঠে আসে লক্ষ্মীর পাঁচালী
বেদমন্ত্রের মতো মা ময় গন্ধে ক্রমশ ভরে ওঠে
আমাদের মাটির দালান…”
এখানেও সেই মা ময় গন্ধ, বেদমন্ত্র, মাটির দালান। মা মানেই বেস্পতিবার হাতে লক্ষ্মীর পাঁচালী, ভালোবাসা-মাখা কবির জ্যোৎস্না-বাড়ি। 
        শূন্য পরবর্তী এইসব তরুণ কবিদের মা-কে নিয়ে লেখা কবিতাগুলো আমাদের জারিত করে , দ্রবিত করে । আমরা সমর্পিত হই এইসব মেধা ও নির্মাণকল্পের কাছে। অভিভূত হই কবিতার জাদু-বাস্তবতায়। এই নিবন্ধের মূল উদ্দেশ্য ছিল এই সময়ের কয়েকজন কবির মাতৃভাবনার স্বরূপ উন্মোচন। এই সময়ের আরো অনেক কবিই মা-কে নিয়ে লিখেছেন বা ভবিষ্যতেও লিখবেন । আবার পরবর্তীকালে তাঁদের মাতৃভাবনা নিয়ে লেখার ইচ্ছে থাকল । 
     লিখতে লিখতে মনে পড়ে যাচ্ছে কাটোয়ার কবি গুরুপ্রসাদ যশের কথা । তিনি গত বছর কাটোয়া লিটিল ম্যাগাজিন মেলায় তাঁর একটি কবিতার বই আমাকে উপহার দিয়েছিলেন । নাম– ” শ্রীচরণেষু মা”। প্রতিটি কবিতাই মা-কে নিয়ে লেখা। একটি কবিতায় তিনি লিখেছেন:” মায়ের অসুখ হলে/ দিনের অবসান/পৃথিবীর বুকে রাত নেমে আসে”। খুব সহজ কথা অথচ এর ভিতরে যোজন যোজন গভীরতা। সত্যিই তো মায়ের অসুখ হলে সন্তানের বুকে রাত নেমে আসে, অন্ধকার গ্রাস করে। আবার দেবাশিস সাহা একটি কবিতায় প্রশ্ন করেছিলেন: ” ঈশ্বরের কি মা আছে “?আমাদের অসম্ভব নাড়িয়ে দিয়েছিল। এখানেই তো কবিতার বিভূতি। যার মা নেই তার কেউ নেই। জগৎ যেন তাঁর কাছে শূন্য। 
   শেষ করব কবি জয় গোস্বামীর সেই অমোঘ পংক্তি দ্বয়ের মাধ্যমে। যা বাংলা কবিতায় কালজয়ী হয়ে আছে। 
” নাম লিখেছি একটি তৃণে
আমার মায়ের মৃত্যুদিনে।”(বাৎসরিক)

মন্তব্য করুন



আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত