| 5 মার্চ 2024
Categories
গল্প ধারাবাহিক সাহিত্য

নিকোলাই গোগোলের গল্প: নাক (পর্ব-২)

আনুমানিক পঠনকাল: 7 মিনিট

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.com

লেখক পরিচিতি: নিকোলাই গোগোল(১৮০৯-১৮৫২):

রুশ জাতীয় সাহিত্যে, বিশেষত রুশীয় সাহিত্যের স্বর্ণযুগের ইতিহাসে লেখক-নাট্যকার গোগোলের নাম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হয়। জন্মের পর আয়ানোভস্কি (Ianovskii) নামকরণ করা হলেও তাঁর দাদাজান নিজের বংশগৌরবের অংশ হিসেবে পৌত্রের নামকরণ করেন গোগোল। এবং কালক্রমে এ নামেই তিনি বিশ্ববাসীর কাছে অধিকমাত্রায় পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পুরো নাম নিকোলাই ভাসিলিয়েভিচ গোগোল। জন্মসূত্রে ইউক্রেনীয় হলেও তিনি মূলত রুশ ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করেছেন, যেখানে ইউক্রেনীয় সংস্কৃতির যথেষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। গোগোলের বয়স যখন দশ, তখন তাঁর ছোটো ভাই আইভানের আকস্মিক মৃত্যু হয়। সে ঘটনায় গোগোল শুধুমাত্র তার ভাইটিকেই হারাননি, একই সাথে সবচে প্রিয় বন্ধু হারানোর যন্ত্রণাও দিয়েছিল, আজীবন সে শূন্যতা যেন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

ছাত্র জীবন থেকেই তিনি স্কুল-কলেজের ম্যাগাজিনে লেখালেখি শুরু করেন। লেখালেখির শুরুটা তিনি সম্ভবত কবিতা দিয়ে শুরু করতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। যে কারণে নিজ খরচে তিনি তাঁর প্রথম মহাকাব্যিক কাব্যগ্রন্থ “হান্স ক্যুকলগার্টেন (Hanz Kuechelgarten)” প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যা তাঁর জার্মান রোমান্স পড়ার ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তাঁর কবিতাগ্রন্থটি পাঠকের সমাদর পেতে ব্যর্থ হয়। যে কারণে গোগোল অতিমাত্রায় হতাশ হয়ে কাব্যগ্রন্থটি নিজের হাতে পুড়িয়ে ফেলেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন জীবনে আর কোনোদিন কবিতা লিখবেন না। কবি হিসেবে সমাদৃত না হবার দুঃখটা হয়ত তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হতে পারলে ভুলে যেতেন। বিশ্বসাহিত্যের কপাল ভালো সেটাতেও তিনি সফলতা পাননি। যে কারণে লেখালেখিকেই গোগোল একমাত্র ধ্যানজ্ঞান এবং জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। যার ফলাফল আজও সাহিত্যপ্রেমী মানুষ উপভোগ করছেন।

মাত্র তেতাল্লিশ বছরের জীবনে নিকোলাই গোগোল বিশ্ব সাহিত্য ভাণ্ডারকে যে লেখনী উপহার দিয়ে গেছেন তার বুঝি তুলনা চলে না। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস “ডেড সোলস” কে আধুনিক রুশ উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া তাঁর আরেক বিখ্যাত সৃষ্টি ‘দ্য ওভারকোট’ নিয়ে ফিওদর দস্তোয়ভস্কি ভূয়সী প্রশংসা করেন।

স্বল্পায়ুর জীবনে তিনি সৃষ্টি করেছেন অনেক বিশ্বমানের সাহিত্যকর্ম। তাঁর রচিত নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাসগুলোতে সে স্বাক্ষর পাওয়া যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে: ইভেনিংস অন এ ফার্ম নিয়ার ডিকাঙ্কা (১৮৩১-১৮৩২), মিরগোরোদ (১৮৩৫), দ্য ওভারকোট (১৮৪২), দ্য ইন্সপেক্টর জেনারেল (১৮৩৬), ডেড সোলস (১৮৪২)। দ্য নোজ (১৮৩৫) যা অপেরা হিসেবেও বহুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।


মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য কোভালিয়ভের ঘুমটাও সেদিন (মার্চের ২৫ তারিখ) খুব সকালের দিকেই ভেঙে যায়। ঘুম ভেঙে অভ্যেসবশত তিনি বরাবরের মতো ঠোঁট নেড়ে বিচিত্র শব্দটা করলেন ‘ব্রবরর…’ যদিও তার ঠিক জানা নেই কেন এমন অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডটা তিনি করেন। আড়মোড়া ভেঙে কোভালিয়ভ তার খানসামাটিকে টেবিলের উপর থেকে ছোট্ট আয়নাখানা দিতে বললেন। আগের দিন সন্ধ্যায় নাকের উপর উদয় হওয়া ব্রণটা পেকে কী অবস্হা হয়েছে একবার যাচাইয়ের ইচ্ছে হলো তার। কিন্তু আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে কোভালিয়ভ বিস্ময়ে থ বনে গেলেন। তিনি দেখলেন মুখের যেখানে নাক থাকবার কথা সে জায়গাটা এক্বেবারে লেপাপোছা- সমান! ব্যাপক ঘাবড়ে গিয়ে কিছুটা দিশাহীন অবস্হায় খানসামার কাছে জল চাইলেন কোভালিয়ভ। মুখে চোখে জল ছিটিয়ে, তারপর তোয়ালেতে বেশ করে চোখ দুটো রগড়ে আরেকবার নিজেকে পরখ করলেন; নাহ্ সত্যিই, তার মুখের উপর থেকে নাক উধাও! তিনি যে ঘুমিয়ে নেই সেটা পরীক্ষার জন্য জায়গাটিতে চিমটি কেটে দেখলেন। উফ! ব্যথা জানান দিলো নাহ্ তিনি মোটেও ঘুমোচ্ছেন না। এবার তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত, তার নাক সত্যিই লাপাত্তা হয়েছে। এমন কথা কস্মিনকালে শুনেছে কেউ! কোভালিয়ভ  লাফিয়ে বিছানা ছাড়লেন, মাটিতে দাঁড়িয়ে শরীরে তীব্র একটা ঝাঁকুনি দিয়ে ব্যাপারটা আত্মস্হের চেষ্টা করলেন, নাক গেছে তার সকল শূন্য করে! তাতে খুব কাজ হলো বলে মনে হয় না। কারণ তার কিছু পরেই তিনি ভদ্রস্হ হয়ে বিষয়টা ফয়সালা করতে পুলিশ সুপারের কাছে অস্হির হয়ে ছুটে গিয়েছিলেন।

এখানে কাহিনি গড়ানোর এক ফাঁকে কোভালিয়ভ সম্পর্কে কিছু বলে নেয়া প্রয়োজন, যাতে পাঠকের পক্ষে বুঝতে সুবিধা হয়  মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য কোভালিয়ভ মশাই মানুষ হিসেবে ঠিক কেমন ধারার ছিলেন।

যে সব মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য তাদের অধীত বিদ্যার সার্টিফিকেট  ও ডিগ্রীর জোরে  এই পদবীর  অধিকারী হন, তাদের সাথে ককেশাস অঞ্চলের নিযুক্তদের তুলনা টানা মোটেও উচিত হবে না। এই দুটি গোত্র একেবারেই বিপরীতমুখী। এসকল সদস্য সবাই  বিশিষ্ট বিদ্বান… কিন্তু রাশিয়া এমন বিচিত্র এক দেশ যে এখানে কোনো সরকারি কমিটির সদস্যদের নিয়ে কিছু বলেই দেখুন না মশাই! অমনি রিগা থেকে কামচাটকা পর্যন্ত সব মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য একাট্টা হয়ে বিষয়টাকে ব্যক্তিগত আক্রমণ ভেবে নেবেন। অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে।

কোভালিয়ভ মাত্র দুবছরের জন্য ‘মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য’ ছিলেন। কিন্তু সেটা তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ভুলে থাকতে পারেন না। শুধু তাই না, ‘মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য’ পদবী ছাড়াও তিনি নিজেকে ‘মেজর’ হিসেবে পরিচয় দিতে বেশী তৃপ্তি বোধ করেন। (রাশিয়ান সরকারী পদবীর ক্ষেত্রে ‘মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য’ এবং মিলিটারীর ‘মেজর’ পদটি সমপর্যায়ের)।

পথে ফেরিওয়ালি কোনো বয়স্ক মহিলার সাথে দেখা হলে গায়ে পড়ে প্রায়শ বলতেন, “শোনো হে, বাড়িতে চলে এসো, চিনতে কোনো সমস্যাই হবে না। সাদোভায়া স্ট্রিটে আমার বাড়ি, যে কাউকে বললেই দেখিয়ে দেবে মেজর কোভালিয়ভ কোথায় থাকেন। এমন কি ছোট্ট শিশুটিও জানে আমার বাড়ি কোনটা।”

আবার যখন ফ্যাশন সচেতন কোনো তরুণীর সাথে দেখা হতো তখন অনুরক্ত গলায় বলতে দ্বিধা করতেন না, “সুন্দরী, শুধু জিজ্ঞেস করবে মেজর কোভালিয়ভ ফ্ল্যাটটা কোথায়।”

নিজেকে মেজর হিসেবে ভাবতে পছন্দ করা মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য কোভালিয়েভকে এখন থেকে তাই  আমরাও গল্পে মেজর বলে উল্লেখ করবো।

স্বাস্হ্য সচেতন মেজর কোভালিয়েভ নিয়মিত নেভস্কি অ্যাভিনিউয়ে হাঁটতে বের হতেন। সে সময় তার পরনে থাকতো কড়া করে মাড় দেয়া ঝকঝকে পরিষ্কার কলারের পোশাক। তার ছিলো নিদারুণ এক জুলফির বাহার, যে জুলফি প্রাদেশিক জরিপকারী, স্হপতি, সেনাবাহিনীর চিকিৎসক এবং গোলগাল লালমুখো উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা, যারা খুব ভালো তাস খেলতে পারে (বোস্টন তাস জাতীয় খেলা) তাদের সবার মধ্যে এখনো দেয়া যায়। সেই জুলফি তাদের রক্তিম গণ্ডদেশের প্রান্তর পেরিয়ে সোজা নাক বরাবর চলে যেত। মেজর কোভালিয়েভ সব সময় বুকে অনেকগুলো সীল ঝুলাতেন। সেগুলোর কিছুতে নানা প্রতীকচিহ্ন খোদাই করা আবার কয়েকটির উপর ‘বুধবার’ ‘বৃহস্পতিবার’, ‘সোমবার’  ইত্যাদি খোদাই  সম্বলিত। সেন্ট পিটার্সবার্গে আসার পেছনে মেজর কোভালিয়েভের বিশেষ একটা মতলব ছিলো। খোলাসা করে বলতে গেলে তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গে বসবাস করতে এসেছিলেন কারণ তিনি তার নতুন উপাধির উপযুক্ত একটি চাকরি পাওয়ার ব্যাপারে উদগ্রীব ছিলেন। তাতে সফল হলে তার প্রাপ্ত পদটি হবে প্রাদেশিক ভাইস গভর্ণরের সমপর্যায়ের। সেখানে যদি ভাগ্যের শিকে না ছিঁড়ে তবে গুরুত্বপূর্ণ কোনো বিভাগের প্রশাসনিক পদে বহাল হবার ইচ্ছা। কোভালিয়েভ বিয়ের বিরুদ্ধে ছিলেন না মোটেও। এক্ষেত্রে তার কেবল চাওয়া ছিলো হবু বউয়ের যেন কমপক্ষে লাখ তিনেক পুঁজি থাকে। সুতরাং এরকম একটা ভবিষ্যত পরিকল্পনার ছককাটা বৃত্তে থেকে মেজর যখন তার অদ্ভুত বাহারি নাকের জায়গাটা একেবারে লেপাপোছা দেখতে পেলেন তখন তার মানসিক অবস্হা কেমন হয়েছিল, পাঠকের পক্ষে সেটা সহজেই অনুমেয়।

এমন দুর্ভাগ্য যে সারা রাস্তায় একটা গাড়ির দেখা পাওয়া গেলো না, অগত্যা হাঁটতে হবে মনস্হির করেন কোভালিয়েভ। পরনের পোশাকের উপরে ঢিলেঢালা একটা জোব্বা চাপিয়েছেন তিনি, যেন নাক দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে সেরকম ভঙ্গিতে একটা রুমালে বেশ কায়দা করে মুখটা ঢেকে হাঁটতে শুরু করেন মেজর। হাঁটতে হাঁটতে ভাবলেন, “হয়ত এটা নিছকই কল্পনা? জলজ্যান্ত একটা নাক বেমক্কা উবে যাবে, এটা হতে পারে নাকি!” নাকটা দিব্যি মুখের উপর বহাল তবিয়তে আছে; এমন একটা ভাবনায় নিজের মুখটা একবার আয়নায় দেখে নেবার ভীষণ এক তাগিদে ঘুরে দাঁড়িয়ে সামনের রেস্তোরাঁটার দিকে হাঁটা দিলেন। সৌভাগ্যবশত সেসময় রোস্তরাঁয় কোনো খদ্দেরের ভিড় ছিলো না। শুধুমাত্র দোকানের কিছু কর্মচারী ঘর পরিস্কার আর টেবিল চেয়ারগুলো সাজানোর কাজে ব্যস্ত ছিলো। ওদিকটায় গুটিকয়েক কর্মচারী ঘুম ঘুম চোখে ট্রেতে নাস্তা, পেস্ট্রি সাজিয়ে রাখছিল। অবিন্যাস্ত টেবিল চেয়ারের উপর তখনও গতরাতের পরিত্যাক্ত কফির দাগমাখা খবরের কাগজ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছিল। “দারুণস্য দারুণ ব্যাপার, রেস্তোরাঁ এখন ফাঁকা”, খানিকটা গদগদ ভাবে স্বগোক্তি করলেন কোভালিয়েভ, “এই সুযোগে আরেকবার আয়নাতে মুখটা দেখে নেয়া যাবে।” দুরুদুরু বুকে আয়নার সামনে গিয়ে উঁকি দিলেন। পোড়া কপাল আমার! আয়না থেকে ঝটতি মুখ সরিয়ে ঝাঁঝের সাথে বলে উঠলেন তিনি।

“কোন পাপে এই দুর্গতি! আর এই জঘন্য অবস্থার মানেটাই বা কী!” বিড়বিড় করলেন তিনি। ” নাকটার জায়গায় কিছু একটা তো থাকতে পারতো, তা না… একদম লেপাপোছা!” 

কোভালিয়েভ বিরক্তির সাথে ঠোঁট কামড়ে দ্রুত রেস্তোঁরা থেকে বেরিয়ে এলেন। নিজেকে তিনি পইপই করে বোঝালেন, আজ আর স্বভাব মতো কারো দিকেই মুখ তুলে তাকাবেন না, সেরকম কাউকে দেখে হাত কচলে হাসতেও যাবেন না। 

চলতি পথে হঠাৎই তাকে সুবিশাল এক বাড়ির সামনে স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়তে হলো; কেননা তিনি তার চোখের সামনে এমন এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটে যেতে দেখলেন যার সহজ ব্যাখ্যা তার পক্ষে দেয়া সম্ভব নয়। তিনি দেখলেন সেই বাড়িটার সামনে একটা ঘোড়ার গাড়ি এসে থামলো। গাড়ির দরজা খুলে মাথাটা একটু কাত করে লাফিয়ে নামলেন ইউনিফর্ম পরা এক ভদ্রলোক। ভদ্রলোকটি দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে বাড়ির ভেতর অদৃশ্য হয়ে গেলেন। লোকটিকে দেখে কোভালিয়েভের মধ্যে বিস্ময় আর আতঙ্কের মিশ্র একটা অনুভূতি খেলে গেলো। কারণ লোকটির মুখের উপর বসে থাকা নাকটি তার বড্ড চেনা, ওটা যে তার নিজেরই নাক! এমন অভাবনীয় ব্যাপার দেখে কোভালিয়েভ চোখের সামনে দৃশ্যমান সবকিছুই কেমন ঘুরতে লাগলো, তার মনে হলো যে কোনো মুহূর্তে তিনি বুঝি মাথা ঘুরে পপাত ধরনীতল হবেন। 

কিন্তু শারীরিক অস্বস্তির তোয়াক্কা না করে, বুক ঠুকে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন যতক্ষণ না তার নাক আবার গাড়িতে ফিরে আসে, ততক্ষণ তিনি সেখানেই অপেক্ষায় থাকবেন। আতঙ্ক আর উত্তেজনায় তার গোটা শরীর তখন জ্বরগ্রস্হ রোগীর মতো কাঁপতে শুরু করেছে। মিনিট দুই পরে সত্যিই নাক গাড়িতে ফিরে এলেন।  ভদ্রলোকের পরনে জরির কাজ করা, উঁচু কলারের ইউনিফর্মটা বেশ চটকদার, হরিণের নরম চামড়ার তৈরি প্যান্ট, কোমরে ঝুলন্ত তলোয়ার। মাথায় থাকা পালকওয়ালা টুপি দেখে বলে দেয়া যায় ইনি একজন স্টেট কাউন্সিলর। তার আচরণ দেখে মনে হচ্ছিলো কারো সাথে দেখা করার উদ্দেশ্যে তিনি কোথাও রওনা দিচ্ছেন। আশপাশটা দেখে নিয়ে তিনি কোচোয়ানের উদ্দেশ্যে হাঁক দিলেন, ‘জলদি গাড়ি ছাড়ো!’ বলেই তিনি তাতে উঠে বসলেন এবং গাড়ি চলতে শুরু করলো।

বেচারা কোভালিয়েভের তখন মাথার ঘায়ে কুকুর পাগল অবস্থা। এমন অদ্ভুতুড়ে ঘটনা কিছুতেই তার মাথায় ঢুকছিল না। গতকাল পর্যন্ত যে নাক তার মুখের উপর বহাল তবিয়তে জাঁকিয়ে বসেছিল, যার পক্ষে গাড়িতে চড়ে কিংবা পায়ে হেঁটে ড্যাং ড্যাং করে ঘুরেফিরে বেড়ানো কোনভাবেই সম্ভব না, সে কীভাবে ইউনিফর্মে সাজতে পারে!  ভাবতে ভাবতে কোভালিয়েভ ছুটলেন গাড়ির পিছু ধাওয়া করতে, কপাল ভালো খুব বেশিদূর যায়নি গাড়িটা তখনও, নেভস্কি অ্যাভিনিউয়ের উপর বিশাল দালানের যে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরটা তার সামনে গাড়িটা দাঁড়িয়ে পড়েছে।

কোভালিয়েভ খুব তাড়াহুড়া করে দালানের সামনে অপেক্ষমান সরু চোখের কুৎসিত চেহারার ভিখিরি বুড়িগুলো, যাদের দেখলে তার খুব বিরক্ত লাগে- তাদের ভিড় ঠেলে দালানের ভেতরে ঢুকে পড়লেন। সেখানে গুটিকয় খদ্দের ছিলো মাত্র, কিন্তু কোভালিয়েভ এতই মর্মাহত ছিলেন যে প্রথম কয়েক মুহুর্ত তিনি কীভাবে লোকটার খোঁজ করবেন সেটা মনস্থির করতে পারছিলেন না। অবশেষে কোভালিয়েভ লোকটিকে একটা কাউন্টারের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেন, ইউনিফর্মের উঁচু কলারের আড়ালে মুখের পুরোটাই ঢাকা পড়েছে, সে অবস্থায় ভদ্রলোক খুব মনোযোগ দিয়ে দোকানের পণ্য সামগ্রী দেখায় ব্যস্ত। 

“কী করে ওর কাছে যাওয়া যায়?” কোভালিয়েভ ভাবলেন। “ইউনিফর্মের বাহার, টুপি এসব কিছু দেখেশুনে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে এই লোক বিরাট তালেবর। ছাতার মাথা! কোন বুদ্ধিও মাথায় আসছে না।  এ সময়ে কী করণীয় সেটা একমাত্র মুখপোড়া শয়তানের পক্ষেই জানা সম্ভব।”

কোভালিয়েভ তার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য খানিকটা কাছাকাছি গিয়ে কাশতে শুরু করেন, কিন্তু তাতে এক মুহূর্তের জন্যও নাক মহাশয়ের দাঁড়িয়ে থাকার ভঙ্গির কোন পরিবর্তন ঘটলো না।

‘জনাব…’ অনেক কষ্টে সাহস সঞ্চয় করে গলায় স্বর ফোটালেন কোভালিয়েভ, “শুনছেন জনাব, আমি মানে ইয়ে…”

“কী চাই আপনার?” ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চাইলেন নাক। 

“কঠিন অবস্থায় পড়ে গেছি জনাব। আমি মনে করি… আমি মনে করি যে… নিজের জায়গাতেই আপনার থাকা উচিত, সেটাই উপযুক্ত হতো আমার মতে। হন্যে হয়ে খোঁজাখুঁজি শেষে হঠাৎ আপনার দেখা পাওয়া গেলো, কোথায়? প্রশ্নটা বরং নিজেকেই করুন…।”

“ক্ষমা করবেন, আপনি কিসব বলছেন তার মাথামুণ্ড কিছুই বুঝতে পারছি না। যা বলার স্পষ্ট করে বলুন।”

“আমার অবস্হাটা কী করে বুঝিয়ে বলি…।” স্বগোক্তি করলেন কোভালিয়েভ, তারপর আবার সাহস সঞ্চয় করে বলতে শুরু করলেন, 

“দেখুন ইয়ে ব্যাপারটা হচ্ছে, আমি মানে…আমি একজন সম্মানিত মেজর। আপনি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন নাক ছাড়া চলাফেরা করা কেমন একটা অস্বস্তিকর ব্যাপার। অবশ্য ভজক্রেসেনস্কি ব্রিজের উপর বসে থাকা ফেরিওয়ালারা হয়তো নাক ছাড়াও বেচাকেনা করতে পারে, কিন্তু আমার পক্ষে কী তা সম্ভব?…কদিন পরই আমি আরো উচ্চপদ অধিকার করতে যাচ্ছি, … তাছাড়া শহরের অনেক সম্মানিত মহিলার সঙ্গে আমার পরিচয়, যেমন সরকারি উপদেষ্টা চেখতারিওভের স্ত্রী প্রমুখ আরো অনেকের সঙ্গে পরিচিতি থাকায়…. আপনি নিজেই ব্যাপারটা বিবেচনা করে দেখুন না বরং… আমার আর কী বলার আছে জানি না জনাব…।” কথাগুলো বলে মেজর কোভালিয়েভ অসহায় একটা ভঙ্গি করে কাঁধ ঝাঁকালেন। “ক্ষমা করবেন, আপনি নিজেই  এ ধরনের আচরণকে দায়িত্ব ও সম্মানের বিধি অনুসারে বিবেচনা করবেন কিনা তা আমি জানি না, তবে কমপক্ষে আপনি এটা বুঝতে পারবেন।”

“আপনার কথার এক বর্ণও বুঝিনি আমি।”  নীরবতা ভেঙে নাক মহাশয় বলে উঠলেন। “বুঝতে পারি সেরকম সহজ করে বলুন।” 

“বলছি ভায়া” কন্ঠস্বরে বেশ খানিক গাম্ভীর্য ফুটিয়ে বললেন কোভালিয়েভ, “যে জিনিসটি হারিয়েছে বলে বোঝাতে চাইছি সেটি আসলে আমার। অন্তত প্রাথমিকভাবে ব্যাপারটা আপনার বোঝা উচিত, যদি জিনিসটি আপনি জোর করে রেখে দিতে না চান।”

নাক মহাশয় একটু ভ্রুকুটি করে মেজরের দিকে তাকালেন। তারপর উত্তর দিলেন,

“আপনি ভুল করছেন ভায়া। আমি আমিই -নিজের কর্মদক্ষতায় আমি স্বয়ংসম্পূর্ণ। তাছাড়া আমাদের মধ্যে এমন কোন অন্তরঙ্গ সর্ম্পক আছে বলেও তো জানা নেই, যার সূত্রে এমন আলটপকা মশকরা শুরু করবেন! আপনার ইউনিফর্মের বোতামগুলো বলছে আপনি কোনোভাবেই আমার দপ্তরের নন, অন্য দপ্তরে কাজ করেন।” 

এই বলে নাক মশাই মুখটা ঘুরিয়ে নিলেন।

 

চলবে…

 

 

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

error: সর্বসত্ব সংরক্ষিত