নিকোলাই গোগোলের গল্প: নাক (পর্ব-৪)

Irabotee.com,irabotee,sounak dutta,ইরাবতী.কম,copy righted by irabotee.comলেখক পরিচিতি: নিকোলাই গোগোল(১৮০৯-১৮৫২):

রুশ জাতীয় সাহিত্যে, বিশেষত রুশীয় সাহিত্যের স্বর্ণযুগের ইতিহাসে লেখক-নাট্যকার গোগোলের নাম অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে উচ্চারিত হয়। জন্মের পর আয়ানোভস্কি (Ianovskii) নামকরণ করা হলেও তাঁর দাদাজান নিজের বংশগৌরবের অংশ হিসেবে পৌত্রের নামকরণ করেন গোগোল। এবং কালক্রমে এ নামেই তিনি বিশ্ববাসীর কাছে অধিকমাত্রায় পরিচিতি লাভ করেন। তাঁর পুরো নাম নিকোলাই ভাসিলিয়েভিচ গোগোল। জন্মসূত্রে ইউক্রেনীয় হলেও তিনি মূলত রুশ ভাষাতেই সাহিত্য রচনা করেছেন, যেখানে ইউক্রেনীয় সংস্কৃতির যথেষ্ট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। গোগোলের বয়স যখন দশ, তখন তাঁর ছোটো ভাই আইভানের আকস্মিক মৃত্যু হয়। সে ঘটনায় গোগোল শুধুমাত্র তার ভাইটিকেই হারাননি, একই সাথে সবচে প্রিয় বন্ধু হারানোর যন্ত্রণাও দিয়েছিল, আজীবন সে শূন্যতা যেন তাঁকে তাড়িয়ে বেড়িয়েছে।

ছাত্র জীবন থেকেই তিনি স্কুল-কলেজের ম্যাগাজিনে লেখালেখি শুরু করেন। লেখালেখির শুরুটা তিনি সম্ভবত কবিতা দিয়ে শুরু করতে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন। যে কারণে নিজ খরচে তিনি তাঁর প্রথম মহাকাব্যিক কাব্যগ্রন্থ “হান্স ক্যুকলগার্টেন (Hanz Kuechelgarten)” প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। যা তাঁর জার্মান রোমান্স পড়ার ফলাফল হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে তাঁর কবিতাগ্রন্থটি পাঠকের সমাদর পেতে ব্যর্থ হয়। যে কারণে গোগোল অতিমাত্রায় হতাশ হয়ে কাব্যগ্রন্থটি নিজের হাতে পুড়িয়ে ফেলেন এবং প্রতিজ্ঞা করেন জীবনে আর কোনোদিন কবিতা লিখবেন না। কবি হিসেবে সমাদৃত না হবার দুঃখটা হয়ত তিনি সেন্ট পিটার্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের শিক্ষক হিসেবে নিযুক্ত হতে পারলে ভুলে যেতেন। বিশ্বসাহিত্যের কপাল ভালো সেটাতেও তিনি সফলতা পাননি। যে কারণে লেখালেখিকেই গোগোল একমাত্র ধ্যানজ্ঞান এবং জীবিকা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বেছে নেন। যার ফলাফল আজও সাহিত্যপ্রেমী মানুষ উপভোগ করছেন।

মাত্র তেতাল্লিশ বছরের জীবনে নিকোলাই গোগোল বিশ্ব সাহিত্য ভাণ্ডারকে যে লেখনী উপহার দিয়ে গেছেন তার বুঝি তুলনা চলে না। তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস “ডেড সোলস” কে আধুনিক রুশ উপন্যাসের একটি উল্লেখযোগ্য সৃষ্টি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এছাড়া তাঁর আরেক বিখ্যাত সৃষ্টি ‘দ্য ওভারকোট’ নিয়ে ফিওদর দস্তোয়ভস্কি ভূয়সী প্রশংসা করেন।

স্বল্পায়ুর জীবনে তিনি সৃষ্টি করেছেন অনেক বিশ্বমানের সাহিত্যকর্ম। তাঁর রচিত নাটক, ছোটগল্প, উপন্যাসগুলোতে সে স্বাক্ষর পাওয়া যায়। তাঁর উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে: ইভেনিংস অন এ ফার্ম নিয়ার ডিকাঙ্কা (১৮৩১-১৮৩২), মিরগোরোদ (১৮৩৫), দ্য ওভারকোট (১৮৪২), দ্য ইন্সপেক্টর জেনারেল (১৮৩৬), ডেড সোলস (১৮৪২)। দ্য নোজ (১৮৩৫) যা অপেরা হিসেবেও বহুল জনপ্রিয়তা লাভ করে।


শেষমেশ কোভালিয়েভ যখন বাড়িতে ফিরে এলেন তখন তার পা দুটো অসাড় প্রায়। বাইরে ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমেছে। সারাদিনের পণ্ডশ্রম শেষে বাড়ি ফিরে নিজের ফ্ল্যাটটাকে তার বিষাদে ভরপুর আর শ্রীহীন বলে মনে হলো। সামনের ঘরটাতে ঢুকতেই তিনি দেখতে পেলেন তার খানসামা ছোকরা আইভান বেশ চমৎকৃত হবার মতো এক বিনোদনে মশগুল। দাগে ভরপুর চামড়ার ডিভানটিতে হতভাগা চিৎ হয়ে শুয়ে শুয়ে ছাদ বরাবর থুতু ছিটাচ্ছে, এবং বেশ দক্ষতার সাথে বার বার নিদির্ষ্ট একটা লক্ষ্য ভেদ করছে। ব্যাটার এহেন অনাসৃষ্টি দেখে কোভালিয়েভ রাগে ফেটে পড়লেন, তিনি তার হাতের টুপিটা দিয়েই ছোকরার মাথায় আঘাত করে হুঙ্কার ছাড়লেন, “হতচ্ছাড়া আমড়া কাঠের ঢেকি একটা। কাজকম্মে মন নেই খালি বেহুদা বাঁদরামি।”

হতচ্ছাড়া আইভান তড়াক করে উঠে একছুটে সাহেবের গা থেকে ঢিলে পোশাকটা খুলে নেবার জন্য গিয়ে সামনে দাঁড়ালো। ক্লান্ত আর হতাশ মেজর নিজের ঘরে ঢুকে একটা আরাম চেয়ারে গা এলিয়ে দিলেন, এরপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বগোক্তি করলেন-

“পোড়া কপাল আমার! এই দুর্ভোগ কোথা থেকে এসে হাজির হলো? যদি হাত কিংবা পা হারাতো সেটাও না হয় মেনে নেয়া যেত। কিন্তু নাক ছাড়া একজন মানুষ- তাকে কি বলা যায়?  এমন তো না যে সেটা একটা পাখি, না পাখিও নয়, কোনো মানুষ? না সেও নয়, কেবলি যেন একটা কিছু যাকে চাইলেই জানলা গ’লে ছুঁড়ে ফেলে দেয়া যায়! আর যদি এমন হতো যুদ্ধের মাঠে কিংবা কারো সাথে ডুয়েল লড়তে গিয়ে অথবা আমার নিজেরই কোনো দোষে, কিন্তু নাহ্, একদম বিনা কারণে খুইয়ে ফেললাম, খামোখাই, ফুটো পয়সার ফায়দা ছাড়াই.. না এটা মেনে নেয়া যায় না,”

খানিক কিসব ভেবেটেবে তিনি আবার বিড়বিড় শুরু করলেন, “এটা পুরোপুরি অবিশ্বাস্য, জলজ্যান্ত  একটা নাক লাপাত্তা হয়ে গেলো, একেবারেই অবিশ্বাস্য ব্যাপার। খুব সম্ভবত আমি স্বপ্ন দেখছি, অথবা গতরাতে বেহেড মাতাল অবস্হায় বাড়ি ফেরার পর এখনও আমি পুরোপুরি ধাতস্হ হইনি। আচ্ছা এমনও তো হতে পারে, মনের ভুলে পানির বদলে ব্র্যাণ্ডি খেয়ে ফেলেছি, যে ব্র্যাণ্ডি আমি রোজ দাড়ি কামানোর পর চিবুকে ঘষি। হতচ্ছাড়া আইভানটা সেসব জায়গা মতো সরিয়ে রাখেনি, যা সম্ভবত আমিই খেয়ে ফেলেছি।”

তিনি যে মাতাল নন সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার জন্য মেজর নিজেকে এত জোরে চিমটি কাটা শুরু করলেন যে যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলেন। ব্যথা পাওয়াতে তিনি নিশ্চিত হয়ে গেলেন যে তিনি সম্পূর্ণ ধাতস্হ এবং জেগেই আছেন। এরপর তিনি ধীর পায়ে হেঁটে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন, প্রথমে মনে একটা ক্ষীণ আশা নিয়ে চোখ বুঁজলেন যে, চোখ খুলেই তিনি আগের মতো সব ঠিকঠাক অবস্হায় দেখতে পাবেন। কিন্তু চোখ খুলেই তিনি পিছু হটলেন, “উফ্ কী জঘন্য দৃশ্য!” বলে চেঁচিয়ে উঠলেন।

যা ঘটেছে সেটা সত্যিই  দুর্বোধ্য। কারো হয়ত বোতাম, রূপার চামচ, ঘড়ি অথবা ওরকম কিছু জিনিস হারাতেই পারে, সেরকম কিছু খোয়া গেলেও না হয় একটা মানে দাঁড় করানো যেত। কিন্তু খোয়া গেলো তো গেলো এমন জিনিস? তাও আবার খোদ নিজের বাড়ি থেকেই!

মেজর কোভালিয়েভ গোটা পরিস্হিতিটা মনে মনে পর্যালোচনা করে এই স্হির সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন যে এই গোটা পরিণতির জন্য স্টাফ অফিসারের স্ত্রী ম্যাডাম পদতোচিনা ছাড়া আর কেউ  দায়ী নন। মহিলা ভীষণ ভাবে চাইতেন মেজর যেন তার মেয়েটাকে বিয়ে করেন। যদিও মেয়েটার সাথে দহরম মহরমে মেজরের আগ্রহের কোনো কমতি ছিলো না। তবে বিয়ে সংক্রান্ত বিষয়টা তিনি সযত্নে এড়িয়ে চলতে চাইতেন।  কিন্তু একদিন যখন মহিলা তাকে পাকড়াও করে বসলেন এবং সপাটে জানালেন তিনি চান তার মেয়েটিকে মেজর বিয়ে করুন, তখন বেশ কায়দা করেই মেজর পিছলে যান। বিনয়ের অবতার হয়ে মেজর তখন জানান যে বিয়ের জন্য তার বয়স এখনও তেমন পাকেনি, আর তার মেয়ের বয়সও যথেষ্ট কম, তাছাড়া বয়সটা বিয়াল্লিশ হওয়ার আগ পর্যন্ত ক্যারিয়ারের পেছনে তাকে এখনও আরো পাঁচ বছর সময় দেয়া লাগবে।

তার উপর খাপ্পা হওয়ার কারণ হিসেবে ম্যাডাম পদতোচিনার জন্য এটাই যথেষ্ট, আর সে কারণেই তিনি প্রতিহিংসাবশত তার উপর প্রতিশোধ নেবার আঁটঘাট বেঁধেছেন, যেন সামাজিকভাবে মেজরকে যথেষ্ট  অপদস্থ করা যায়। হয়ত এ জন্য তিনি জাদুটোনায় দক্ষ এমন কারো সাহায্যও নিয়েছেন। এটা তো নিশ্চিত যে তার নাকটা কেউ খচ্যাৎ করে কেটে নিয়ে পালায়নি, কেননা তার খাস কামরায় কারো ঢোকার কথা নয়। যদিও ব্যাটা নাপিত আইভান ইয়াকভলেভিচ তার দাড়ি কামিয়ে দিয়েছে, কিন্তু সেও তো গত বুধবারে। আর বৃহস্পতিবারের গোটা দিনটাতে যে তার নাকটা দিব্যি আস্তই ছিলো এটা তার স্পষ্ট মনে আছে এবং এ ব্যাপারে তিনি সুনিশ্চিত, তাছাড়া যদি সেরকম কিছু অঘটন ঘটতো তিনি তো অন্তত ব্যথা ট্যাথা অনুভব করতেন! তাছাড়া ভোজবাজির মতো কোনো ক্ষত এত দ্রুত শুকিয়ে গিয়ে জায়গাটার দিব্যি নিখুঁত লেপাপোছা একখানা প্যানকেকের আকার নেয়া সম্ভব নাকি!

কোভালিয়েভ নানা চিন্তায় আচ্ছন্ন হলেন। একবার ভাবলেন দেবো নাকি স্টাফ অফিসারের স্ত্রীর নামে আনুষ্ঠানিকভাবে একখানা মামলা ঠুকে? নাকি নিজেই সরাসরি তার বাড়ি গিয়ে মহিলার নামে বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ জানিয়ে আসবেন? ঘরের দরজার ফাঁকফোকর ভেদ করে খুচরো আলোর ঝলকে হঠাৎ মেজরের ভাবনা বাধা পেলো। তিনি বুঝে নিলেন ইতিমধ্যেই ঘরে ঘরে খানসামা আইভান মোমবাতি জ্বেলে দিয়েছে। একখানা মোমবাতি হাতে তার ঘরেও আইভান এসে হাজির হলো। আইভানের আনা মোমবাতির আলোতে গোটা ঘর ভরে ওঠার আগেই কোভালিয়েভ ক্ষিপ্র হাতে রুমালটা মুখের সেখানটা চাপা দিলেন, যেখানে গত সন্ধ্যাতেও একখানা আস্ত নাকের উপস্হিতি ছিলো। কারণ তিনি মোটেও চাননা তার চেহারার এমন বদখত অবস্হা দেখে বুদ্ধিনাশা আইভানটার মুখ হাঁ হয়ে যায়।

ঘরে বাতিটা রেখেই অবশ্য আইভানকে ফিরতে হয় কারণ বাইরের ঘরের দরজায় অপরিচিত একটা গলা শোনা যায়,

“মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য কোভালিয়েভ কি এখানে থাকেন?”  প্রশ্ন ভেসে আসে।

“ভেতরে আসুন।” প্রায় ছুটে এসে মেজর দরজা খুলতে খুলতে আগন্তুককে আহ্বান জানালেন।

সৌম্যকান্তি এক পুলিশ অফিসার ঘরের ভেতর এসে দাঁড়ালেন। তার সুন্দর চেহারার সাথে বেশ খাসা একজোড়া ধূসর রঙের জুলফি ভরাট গালটা জুড়ে একটা বিশেষত্ব দিয়েছে। ইনি হলেন সেই পুলিশ ভায়া, কাহিনির শুরুতে যাকে আমরা আইজাক ব্রিজের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি।

“আপনারই কি নাক খুইয়েছে জনাব?” ঘরে ঢুকেই তিনি প্রশ্নটা করলেন।

“ঠিক তাই।”

“মাত্রই ওটার হদিশ পাওয়া গেছে।”

“কী বললেন?” আকস্মিক পাওয়া আনন্দ সংবাদটি কয়েক মুহুর্তের জন্য মেজরকে বাকরুদ্ধ করে দিলো। তিনি বড় বড় চোখ করে অপলক দৃষ্টিতে অফিসারের দৃঢ়চেতা ঠোঁট আর গালের উপর মোমের আলোর প্রতিফলন দেখতে থাকলেন। তারপর প্রবল উত্তেজনার সাথে জিজ্ঞেস করলেন, “কিভাবে, কী করে এটা সম্ভব হলো?”

“দাঁড়ান বলছি খুলে। নাকটাকে পাওয়া গেছে একটা রাস্তার পাশে। রিগার উদ্দেশ্যে রওনা  দেবে তেমন একটা গাড়িতে উঠে বসেছিল ব্যাটা। সাথে ছিলো ভুয়া পাসপোর্ট যেটা ইস্যু করা হয়েছিল কোনো এক সরকারি কর্মকর্তার নামে। আমি নিজেও তো তাকে ভদ্রলোক বলেই ধরে নিয়েছিলাম শুরুতে। আমি আবার চোখে ভালো দেখতে পাইনা। এই যে আপনি সামনে আছেন, আপনার মুখটা দেখতে পাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু  আপনার নাক, মুখ, চিবুক কিছুই আলাদা করে বুঝতে পারছি না, আমার শাশুড়িরও একই দশা। ভাগ্যিস তখন চোখে চশমা ছিল। ভালো করে তাকাতেই বুঝলাম ভদ্রলোকটি একখানা নাক বাদে আর কিছুই নয়। তখনই গ্যাঁক করে চেপে ধরলাম ব্যাটাকে।” 

“ওটা এখন কোথায় আছে? কোথায়? আমি এক্ষুণি সেখানে যেতে চাই।” উত্তেজনায় কোভালিয়েভ রীতিমত চিৎকার করে উঠলেন।

“এত অস্হির হবেন না মশাই। ওটা আপনার বিশেষ প্রয়োজন জেনে সাথে করেই নিয়ে এসেছি। আর অস্বাভাবিক একটা ব্যাপার হচ্ছে  এই ঘটনার পেছনে জড়িত পালের গোদাটা হচ্ছে অ্যাসেনশন অ্যাভিনিউয়ের বাটপাড় এক নাপিত আইভান ইয়াকভলেভিচ, ব্যাটা ‌এখন জেল হাজতে বসে বসে কড়িকাঠ গুনছে। অনেকদিন ধরেই মাতলামি আর চুরিধারি নিয়ে ওর প্রতি আমার সন্দেহ হচ্ছিলো। গতকালের আগের দিনই এক দোকান থেকে সে বেশ কিছু বোতাম হাতিয়েছে। আপনার নাক একদম অক্ষত অবস্হায় আছে মশাই।”

বলতে বলতে পুলিশ অফিসার পকেটে হাত ঢুকিয়ে কাগজে মোড়ানো জিনিসটা বের করলেন।

“হ্যাঁ, নাকটা একদম ঠিক আছে। চেঁচিয়ে বললেন কোভালিয়েভ। এটাই তার কাঙ্খিত সেই নাক। আচ্ছা, আপনি বসুন না ভায়া, এককাপ চা কিংবা কফি হয়ে যাক এই আনন্দে।”

“খেতে পারলে খুশিই হতাম, কিন্তু সেটা সম্ভব হচ্ছে না। আমাকে এক্ষুনি একবার সংশোধনাগারে যেতেই হবে জনাব। আজকাল জীবনযাত্রার মান ধাই ধাই করে কেমন আকাশ ছুঁচ্ছে বলুন! এই অগ্নিমূল্যের বাজারে বাড়িতে স্ত্রীর মা মানে শাশুড়িও থাকেন আমাদের সঙ্গে। আমার বেশ কয়েকটা ছেলেপুলে, বড় সংসার। বড় ছেলেটা বেশ কাজের, মাথাটাও ভালো ছিলো। কিন্তু ছেলেটার পড়াশোনা করানোর মতো সঙ্গতি আমার নেই…”

পুলিশ অফিসার খুশি হয়ে চলে যাওয়ার পর মেজর কোভালিয়েভ কিছু সময় কেমন এক ভাবালুতায় ডুবে রইলেন। অপ্রত্যাশিত এক আনন্দে তিনি এতটাই আপ্লুত হয়েছিলেন যে বেশ কিছু মুহূর্ত লেগে যায় তার নিজেকে ফিরে পেতে, গোটা পরিস্হিতিটা আত্মস্হ করতে। ফিরে পাওয়া নাকটা তিনি দুহাতের তালুতে সযত্নে রেখে সেটাকে আরো একবার খুব মনোযোগ দিয়ে পর্যবেক্ষণ করলেন।

“হ্যাঁ, এটাই তার নাক বটে।” কোভালিয়েভ মনে মনে বললেন। “এই তো বাম পাশে গতকাল সন্ধ্যায় গজিয়ে ওঠা সেই ব্রণটা।”

আনন্দে মেজর গলা ছেড়ে হেসে উঠলেন।

কিন্তু এই দুনিয়ার কোনো আনন্দই চিরস্থায়ী নয়। ভীষণ আনন্দদায়ক ঘটনার রেশও পরমুহুর্তে ম্লান হয়ে মিশে যায় আর দশটি স্বাভাবিক ঘটনার সাথে। জলের বুকে ঢিল ছুঁড়ে তৈরি হওয়া আলোড়ন যেমন আবার মিশে যায় সেই জলের সাথে, ঠিক তেমন। কোভালিয়েভ আবারো চিন্তামগ্ন হয়ে পড়লেন। তার সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান এখনো হয়নি, নাক পাওয়া গেছে এটা ঠিক, কিন্তু সেটাকে যথাস্থানে বসানোর কাজটা এখনও বাকি।

“কিন্তু যদি ঠিক মতো বসানো না যায়?” নিজে নিজেই প্রশ্নটা করে কোভালিয়েভ কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন।

অসম্ভব এক আতঙ্কে তিনি ছুটে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালেন, যেন নাকটা কোনো অবস্হাতে বাঁকাভাবে বসানো না হয়, সেটা পরখ করতে চাইলেন। তার হাত রীতিমত কাঁপছিল। খুব সাবধানে, যত্নের সাথে নাকটাকে তিনি যথাস্হানে বসালেন। সর্বনাশ! এটা তো জায়গা মতো বসছে না! তিনি নাকটাকে মুখের কাছে নিয়ে মুখের ভাপে একটু গরম করে আবার জায়গা মতো বসালেন, কিন্তু সে কিছুতেই জায়গা মতো বসছে না।

“বসে থাক বলছি, ছাগল! যেখানে থাকার ঠিক সেখানে চুপচাপ বসে থাক বলছি।” ক্ষেপে ওঠে বললেন তিনি।

কিন্তু বেয়াদপ নাকটা একগুঁয়ে কাঠের টুকরোর মতো টেবিলের উপর পড়ে এমন বিদঘুটে আওয়াজ করলো যেন একটা বোতল ফসকে পড়ে যাওয়া ছিপি। প্রচণ্ড বিরক্তিতে মেজরের চেহারাটা কুঁচকে উঠলো।

“তাহলে কি নাকটা আর জোড়া লাগবে না?” অত্যন্ত উৎকন্ঠিত হয়ে ভাবলেন তিনি। নাকটা জোড়া লাগাবার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছিলো বারবার।

এই দালানের অন্য একটি ফ্ল্যাটে একজন ডাক্তার থাকেন। তিনি চিৎকার করে আইভানকে বললেন তক্ষুনি তাকে ডেকে আনতে। ডাক্তার ভদ্রলোক দেখতে সুদর্শন, গালের দু’পাশে তার কালো জুলফির বাহার, তার স্ত্রীটি বেশ স্বাস্থ্যবতী। ডাক্তার সাহেব খুব  স্বাস্থ্য সচেতন, নিয়ম করে রোজ তরতাজা আপেল খান, রোজ সকালে পাক্কা পয়তাল্লিশ মিনিট গার্গল করেন এবং পাঁচ ধরনের ব্রাশ ব্যবহার করে মুখমণ্ডলের স্বাস্থ্যের সুরক্ষা নিশ্চিত করেন।

ডাক পাওয়ামাত্র ডাক্তার এসে হাজির হলেন। ঘটনাটি কবেকার তা জিজ্ঞেস করে ডাক্তার সাহেব মেজরের চিবুক ধরে মাথাটা উপরে তুললেন এবং নাকের জায়গাতে নিজের বুড়ো আঙুল দিয়ে এমন করে একটা তুড়ি দিলেন তাতে কোভালিয়েভের মাথাটা পেছনের দিকে সরাতে গিয়ে দেয়ালের সাথে ঠকাশ্ করে ঠুকে গেলো। ডাক্তার বললেন তেমন বড় কোনো ব্যাপার না। এরপর মেজরের মাথা প্রথমে ডান দিকে হেলিয়ে নাকের জায়গাটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে বললেন , “হুম!”  তারপর আবার মেজরকে মাথা বামে হেলিয়েও “হুম!” শব্দে তুড়ি বাজাবার পর কোভালিয়েভকে এমনভাবে দাঁড় করিয়ে রাখলেন যেন এইমাত্র একটি দণ্ডায়মান সুবোধ ঘোটকের দন্ত পরীক্ষা সমাপ্ত হলো।

নিবিড় নিরীক্ষণ শেষ করে ডাক্তার সাহেব মাথা নেড়ে বললেন,

“নাহ্ কাজটা ঠিক হবে না। বরং চেহারা যেমন আছে তেমনই থাকুক ভায়া, জোড়াতালির কাজ করতে গেলে আপনার অবস্থা আরো খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা। আপনি চাইলে আমি অবশ্যই তা লাগিয়ে দিতে পারি, কিন্তু আমি নিশ্চিত তাতে অবস্হা খারাপ বৈ ভালো হবে না।”

“আমি সেটা পরোয়া করি না। আপনি নাকটা লাগিয়েই দেন। নাক ছাড়া আমি চলবো কীভাবে?” কোভালিয়েভ উত্তর দিলেন। “তাছাড়া এখনকার চেয়ে খারাপ আর কি হতে পারে? এমন হতচ্ছিরি চেহারা আমি লোকের সামনে দেখাবোই বা কীভাবে? মান্যগণ্য লোকসমাজে আমার চলাফেরা, আজ সন্ধ্যাতেই দুটো আসরে আমার দাওয়াত ছিলো, সরকারি পরামর্শদাতা চেখতারিওভের স্ত্রী, স্টাফ অফিসারের স্ত্রী পদতোচিনা এবং আরো কতজনের সাথে আমার ঘনিষ্টতা। যদিও ম্যাডাম পদতোচিনা যা করেছেন তার ব্যাপারে পুলিশী ব্যবস্থা নেয়া ছাড়া আমার উপায় নেই।… একটা কিছু করুন ভায়া, যে কোনো একটা উপায়ে যদি এটাকে বসানো যায়, ভালো মন্দ যা হয় হোক, ওটা লেগে থাকলেই হবে। তেমন বিপদ দেখলে আমি না হয় হাত দিয়ে ঠেকিয়ে রাখতে পারবো। তাছাড়া কোনো অনুষ্ঠানে গিয়ে আমি নাচিটাচিও না, কাজেই হঠাৎ অসাবধানবশত পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও নেই। আপনার ভিজিট আর আনুসাঙ্গিক খরচের ব্যাপারে দুশ্চিন্তা করবেন না, নিশ্চিত থাকতে পারেন ওটা বহনের সামর্থ্য আমার আছে।” খুব মিনতি করে বললেন মেজর কোভালিয়েভ।

“বিশ্বাস করুন ভায়া” ডাক্তার সাহেবের গলা উঁচুতেও গেলো না, আবার নীচেও নামলো না অদ্ভূত এক সম্মোহনীয় কণ্ঠে বলে উঠলেন, “আমি টাকার জন্য কখনও চিকিৎসা করি না। এটা আমার নীতি এবং শাস্ত্র বিরোধী। আমি যে ভিজিট নিয়ে থাকি সেটা এই কারণে নেয়া, যাতে রোগীরা প্রত্যাখ্যানজনিত অপমানবোধ না করেন। আপনার নাক আমি অবশ্যই লাগিয়ে দিতে পারতাম, কিন্তু নিশ্চিত হয়েই বলছি তাতে করে ফল অনেক বেশি খারাপ হবে। ব্যাপারটাকে বরং প্রকৃতির খেয়ালখুশির উপর ছেড়ে দিন। নাকের জায়গাটি আপনি নিয়মিত ঠাণ্ডা পানি দিয়ে ধোবেন। আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি নাক থাকলে আপনি যেরকম সুস্হ থাকতেন, না থাকলেও ততটাই থাকবেন। আর নাকটা, আমার পরামর্শ যদি রাখেন, স্পিরিট ভর্তি একটা বৈয়ামে ভরে রেখে দিন, আরো ভালো হয় যদি তার সাথে বড় দুই চামচ ঝাঁঝালো ভদকা ও সামান্য ভালো জাতের ভিনিগার মিশিয়ে নেন। এটার বিনিময়ে আপনি ভালো দাম পেতে পারেন কিন্তু! এমনকি জিনিসটা আমি নিজেও নিতে পারি, যদি আপনি চড়া দাম না হাঁকান।”

“পাগল নাকি! আমি কিছুতেই বিক্রি করবো না এটা।” মেজর কোভালিয়েভ চেঁচিয়ে উঠলেন। “তারচে’ বরং জিনিসটার আবার হারিয়ে যাওয়াই ভালো।”

“দুঃখিত ভায়া, আমি কিন্তু আপনার উপকারই করতে চেয়েছিলাম। আপনি তো দেখলেন আমার চেষ্টা ও আন্তরিকতার কোন ত্রুটি ছিলো না।” বলে ডাক্তার সাহেব বিষন্ন মুখে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে চলে গেলেন।

ডাক্তারের চলে যাওয়া নিয়ে কোনো গা করলেন না কোভালিয়েভ, বরং নির্লিপ্ত ভাব নিয়ে দেখলেন ডাক্তারের ঝুল কোটের হাতার ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে তার ধবধবে শার্টের পরিচ্ছন্ন হাতা।

পরদিন মেজর ঠিক করলেন অভিযোগ ঠোকার জন্য আগে স্টাফ অফিসারের স্ত্রী বরাবর একটা চিঠি লিখে জানতে চাইবেন আপোষে তার জিনিস তাকে ফিরিয়ে দিতে রাজী আছেন কিনা। চিঠির বয়ান ছিলো এমন,

“মহাশয়া আলেকজান্দ্রা পদতোচিনা,

আপনার অদ্ভূত কাণ্ডকারখানার উদ্দেশ্য আমি বুঝতে পারছি না। আপনি যত কায়দাই করুন না কেন, আমি আপনাকে নিশ্চয়তা দিতে পারি যে কিছুতে আপনার মেয়েকে বিয়ে করার ব্যাপারে আমাকে বাধ্য করতে পারবেন না। আমার নাকের ঘটনাটির আসল রহস্য বুঝতে বাকী নেই আর। আমি নিশ্চিতভাবেই জানি পুরো বিষয়টার পেছনে আপনিই কলকাঠি নেড়েছেন। হ্যাঁ আপনি ছাড়া অন্য কেউ নন। নির্ধারিত জায়গা ছেড়ে আমার নাকটির হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া, ছদ্মবেশ নেয়া, কখনো সরকারি কর্মচারীর বেশ নেয়া, কখনও স্বমূর্তিতে আসা, এই সবকিছু আপনার কিংবা আপনার মতো যারা এসব কাজে যুক্ত আছেন, তাদের তুকতাকের প্রভাব ছাড়া আর কিছুই নয়। তাই আপনাকে চুড়ান্তভাবে সাবধান করে দিতে চাই যে নাকটি যদি আজকের মধ্যে তার নিজস্ব ঠিকানায় ফিরে না আসে তবে আইনের আশ্রয় নিতে বাধ্য হবো।

আপনার বিনীত,

প্লাটন কোভালিয়েভ”

ম্যাডামের তরফ থেকে উত্তর আসতেও খুব একটা দেরী হলো না। তিনি লিখেছেন-

“প্রিয় মহাশয় প্লাটন কোভালিয়েভ,

“আপনার চিঠি পেয়ে যারপরনাই আশ্চর্য হয়েছি।  বলতে বাধ্য হচ্ছি, আপনি এমন অন্যায় আক্রমণ করতে পারেন দুঃস্বপ্নেও ভাবিনি। যে সরকারি কর্মচারীটির প্রতি আপনি ইঙ্গিত করছেন, ছদ্মবেশ কিংবা স্বমূর্তি, কোনো অবস্হাতেই তাকে আমার বাড়িতে  আপ্যায়ন করা হয়নি। তবে হ্যাঁ, একথা ঠিক ফিলিপ আইভানভিচ পতানচিকভ, প্রায়শই আমার বাড়িতে আসতেন। আর তিনি যথার্থভাবেই আমার মেয়েটিকে বিয়ের আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। যদিও তিনি অতিমাত্রায় একজন সুপাত্র, সংযত আচরণ, অগাধ জ্ঞানের অধিকারী, কিন্তু তা সত্ত্বেও আমি তাকে সে বিষয়ে কোনো রকম আশায় রাখিনি।  আপনি নাক প্রসঙ্গেও কিছু ইঙ্গিত দেবার চেষ্টা করেছেন। এখানে যদি আমার নাকউঁচু ভাবের ইঙ্গিত করে আমার মেয়ের প্রতি আপনার আগ্রহকে প্রত্যাখ্যানের কথা বুঝিয়ে থাকেন তাহলে অবাক হতেই হয়। কারণ এ ব্যাপারে আপনার ধারণার সম্পূর্ণ বিপরীত অবস্থানে আছি আমি। তাই আপনি যদি এখনো আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চান, আপনার ইচ্ছার স্বপক্ষে যাবতীয় ব্যবস্হা নিতে আমার কোনো রকমের ত্রুটি থাকবে না। বহুদিন থেকে ব্যক্তিগত ভাবে আমিও এমন আশাই লালন করে এসেছি।

ইতি-

আপনার গুণগ্রাহী আলেকজান্দ্রা পদতোচিনা”

চিঠিটা পড়বার পর কোভালিয়েভের প্রথম অনুভূতির প্রকাশটা ছিলো এমন, ‘নাহ্ যতদূর মনে হচ্ছে ভদ্রমহিলার কোনো দোষ নেই। তার পক্ষে নাক নিয়ে ঘোঁট পাকানো সম্ভব না বলেই মনে হচ্ছে। একজন অপরাধীর পক্ষে এমন চিঠি লেখাও সম্ভব না। এসব বিষয়ে তার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে।  কারণ ককেশাসে থাকাকালীন তাকে প্রায়শই সরকারিভাবে অপরাধ তদন্ত পরিচালনার জন্য নিযুক্ত করা হতো। কিন্তু কীভাবে কার চক্রান্তে এমন কাণ্ড ঘটলো? কোন শয়তান যে কলকাঠি নাড়ছে!’  ব্যাপক হতাশায় কোভালিয়েভ বলে ‌উঠলেন।

ইতিমধ্যে শহরময় এই অভাবনীয় ঘটনাটি রাষ্ট্র হয়ে গেছে এবং এসব ক্ষেত্রে যা হয় আসলের গায়ে বেশ কয়েক পরত রঙ চড়ে বসে। সে সময়কালটাই এমন ছিলো যে মানুষ চট করে অদ্ভূতুড়ে- অলৌকিক ঘটনাগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হতো; মাত্র কিছুদিন আগেও জনগণ সম্মোহনশক্তি সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে মেতে উঠেছিল। কনিউশেনাইয়া স্ট্রিটের ভাসমান চেয়ারগুলোর গল্পটা এখনও বেশ টাটকাই, তাই শীঘ্রই যখন  চাউর হলো যে মিউনিসিপ্যাল কমিটির সদস্য কোভালিয়েভের নাকটাকে প্রতিদিন ঠিক তিনটায় নেভস্কি অ্যাভিনিউতে হাঁটতে দেখা যায়, তাতে খুব একটা আশ্চর্য হওয়ার মতো কিছু ছিলো না। সে ঘটনা দেখার জন্য ঘটনার জায়গাতে এমন লোকের ভিড় জমে গেলো যে তাদের হটিয়ে পরিবেশ শান্ত করতে শেষ পর্যন্ত পুলিশের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলো।

ঘটনাটাকে কেন্দ্র করে সুযোগ সন্ধানী লোকদের ব্যবসা ফেঁদে বসতেও দেরী হলো না। থিয়েটারের প্রবেশ পথের সামনে নানা ধরনের কেক, মিষ্টির পসরা নিয়ে ভদ্র চেহারার জুলফিধারী জনৈক বিক্রেতাও এ ঘটনা থেকে ফায়দা লুটবার সুযোগ হাতছাড়া করলো না। সে শক্তপক্ত কিছু কাঠের বেঞ্চি বানিয়ে ঘটনার সাক্ষী হতে উৎসুক উপস্হিত অতিকৌতূহলী লোকজনকে সেই বেঞ্চির উপর দাঁড়িয়ে ঘটনা প্রত্যক্ষের আহ্বানে চটকদার প্রচার শুরু করে, এবং দর্শক প্রতি তার জন্য সে পয়সাও নিতে লাগলো।

এমন মজার ঘটনা থেকে নিজেকে বঞ্চিত না রাখার উদ্দেশ্যে এক প্রবীণ কর্ণেল আগেভাবে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন এবং অতি কষ্টে এর কনুইয়ের গুঁতো, ওর ধাক্কা খেয়ে এবং নিজেও সুযোগ মতো দিয়ে, ভিড় ঠেলে পথ করে সামনে এগিয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি যা দেখার আগ্রহে এতটা কষ্ট হজম করে এতদূর এলেন, তার বদলে তিনি দেখতে পেলেন একখানা ফ্লানেলের ওয়েস্ট কোট এবং একটা রঙচঙে ছাপানো ছবি, যাতে দেখা যাচ্ছে এক তরুণী তার পায়ের মোজা খুলে সেটি মেরামতে ব্যস্ত, আর বড় আপেল গাছের আড়াল থেকে এক সুদর্শন যুবক সে দৃশ্যটা উপভোগ করছে। ওই একই জায়গাতে বিগত দশ বছর ধরে ছবিখানা লটকে আছে। স্বভাবতই কর্ণেল আশাভঙ্গের ক্ষোভ নিয়ে বললেন, “আমাকেও বলিহারি! বুদ্ধিনাশা বেহুদা লোকজনের খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই, খামোখাই আজগুবি রটনার পেছনে হেদিয়ে মরছে, মানে হয় কোনো!”

এরপরে আরো একটা গুজব ছড়ালো, কোভালিয়েভের নাক নেভস্কি অ্যাভিনিউয়ে নয় বরং টাউরিস বাগানের লিলুয়া বাতাস সেবন করতে করতে ফড়ফড়িয়ে ঘুরে বেড়ায়। শল্যচিকিৎসা বিভাগের কিছু ছাত্র ঘটনা দেখার জন্য সেখানে গেছে। এক সম্ভ্রান্ত বংশীয় সজ্জন মহিলা উদ্যান রক্ষকের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়ে চিঠি লিখেন। চিঠিতে তার ছেলেমেয়েদের এই দুর্লভ দৃশ্য দেখার সুযোগ দেয়ার জন্য অনুরোধ রাখেন এবং সম্ভব হলে এই উপলক্ষে তাদের পক্ষে উপযুক্ত শিক্ষামূলক কিছু উপদেশও দেয়ার অনুরোধ জানান।

বলাই বাহুল্য এই ঘটনা সমাজে নানাভাবে নিজস্ব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে চলে। শৌখিন লোকজন সান্ধ্য আসরে নিয়মিত যাদের যাতায়াত, তারা এই ঘটনাকে তাদের হাস্যরসের খোরাক হিসেবে লুফে নিতে দ্বিধা করলো না। আসরে আগত লোকদের বিশেষ করে মহিলাদের হাসাতে তারা ভালোবাসতো, এদিকে তাদের হাসির উপকরণের বড় অভাব, কাজেই নাক বিষয়ক মজার ঘটনাটি হাতছাড়া করার বোকামিতে তারা  গেলো না।

অন্যদিকে সংখ্যালঘু একটা অংশ, যারা পরিমার্জিত রুচির, বিচক্ষণ এবং নিজের মতামতটা চাপিয়ে দেবার পক্ষপাতী, তারা বিষয়টা নিয়ে ভীষণ অসন্তুষ্ট ছিলেন। এক ভদ্রলোক অত্যন্ত ক্রোধের সাথে বললেন, কীভাবে এই আলোকিত সময়ে উদ্ভট রটনার জন্ম হয় কিংবা ছড়াতে পারে এটা তিনি বুঝে উঠতে অক্ষম, আর এ বিষয়ে সরকারের চরম উদাসীনতায় তিনি আরো বেশি অবাক হচ্ছেন। এই ভদ্রলোকটি স্পষ্টত সেই গোত্রের যারা তাদের দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়ে, এমনকি দাম্পত্যকলহেও সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেন।

কিন্তু এখানে সমগ্র ঘটনা আবারও কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়ে যায় এবং কাহিনি শেষ পর্যন্ত কোথায় গড়ালো তা সম্পূর্ণ অজ্ঞাতই থেকে যায়।

আগামী পর্বে সমাপ্ত…

 

মন্তব্য করুন




আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

সর্বসত্ব সংরক্ষিত